দয়াল। শুধু আমার দোষেই এই ভয়ানক অন্যায় হয়ে গেল মা, শুধু আমি এই দুর্ঘটনা ঘটালুম। কাল তোমরা চলে গেলে নলিনীর সঙ্গে আমার এই কথাই হচ্ছিল,—সে সমস্তই জানত। কিন্তু কে ভেবেছে নরেন মনে মনে কেবল তোমাকেই,—কিন্তু নির্বোধ আমি সমস্ত ভুল বুঝে তোমাকে উলটো খবর দিয়ে এই দুঃখ ঘরে ডেকে আনলুম। এখন বুঝি আর কোন প্রতিকার নেই?(তেমনি মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে দিতে) এর কি আর কোন উপায় হতে পারে না বিজয়া?

বিজয়া।(তেমনি মুখ লুকাইয়া ভগ্নকণ্ঠে) না দয়ালবাবু, মরণ ছাড়া আর আমার নিষ্কৃতির পথ নেই।

দয়াল। ছি মা, এমন কথা বলতে নেই।

বিজয়া। আমি কথা দিয়েছি দয়ালবাবু। তাঁরা সেই কথার নির্ভর করে সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করে এনেছেন। এ যদি ভাঙ্গি, সংসারে আমি মুখ দেখাব কেমন করে? শুধু বাকী আছে মরণ—

[বলিতে বলিতে পুনরায় তাহার কণ্ঠরোধ হইল। দয়ালের চোখ দিয়াও
আবার জল গড়াইয়া পড়িল। হাত দিয়া মুছিয়া বলিলেন—]

দয়াল। নলিনী বললে, বিজয়া কথা দিয়েছে, সই করে দিয়েছে—এ ঠিক। কিন্তু কোনটায় তার অন্তর সায় দেয়নি। তার সেই মুখের কথাটাই বড় হবে মামাবাবু, আর হৃদয় যাবে মিথ্যে হয়ে? তার মামী বললে, ওর মা নেই, বাপ নেই,—একলা মেয়ে,—আচার্য হয়ে তুমি এতবড় পাপ করো না। যে দেবতা হৃদয়ে বাদ করেন এ অধর্ম তিনি সইবেন না। সারা রাত চোখে ঘুম এল না, কেবলই মনে হয় নলিনীর কথা—মুখের বাক্যটাই বড় হবে, হৃদয় যাবে ভেসে? ভোর হতেই ছুটলুম কলকাতায়—নরেনের কাছে—

নরেন। আপনি আমার কাছে গিয়েছিলেন?

দয়াল। গিয়ে দেখি তুমি বাসায় নেই, খোঁজ নিয়ে গেলুম তোমার আফিসে, তারাও বললে, তুমি আসনি। ফিরে এলুম বিফল হয়ে, কিন্তু আশা ছাড়লুম না। মনে মনে বললুম, যাব বিজয়ার কাছে, বলব তাকে গিয়ে সব কথা—

[পরেশ গলা বাড়াইয়া দেখা দিল]

পরেশ। মা ঠান, একটা-দুটো বেজে গেল—তুমি না খেলে যে আমরা কেউ খেতে পাচ্চিনে।

[শুনিয়া বিজয়া ব্যস্ত হইয়া উঠিল]

বিজয়া।(ব্যস্তভাবে) দয়ালবাবু, এখানেই আপনাকে স্নানাহার করতে হবে।

দয়াল। না মা, আজ তোমার আদেশ পালন করতে পারব না। তারা সব পথ চেয়ে আছে। নরেন, তোমাকেও যেতে হবে। কাল না খেয়ে চলে এসেছ, সে দুঃখ ওদের যায়নি, এস আমার সঙ্গে।

[নরেন উঠিয়া দাঁড়াইল। বিজয়া ইঙ্গিতে তাহাকে একপাশে
ডাকিয়া লইয়া দয়ালের অগোচরে মৃদুকণ্ঠে বলিল]

বিজয়া। আমাকে না জানিয়ে কোথাও চলে যাবেন না ত?

নরেন। না। যাবার আগে তোমাকে বলে যাব।

বিজয়া। ভুলে যাবে না?

নরেন। (হাসিয়া) ভুলে যাব? চলুন দয়ালবাবু, আমরা যাই।

দয়াল। চল। আসি মা এখন।

(একদিক দিয়া দয়াল ও নরেন, অন্যদিক দিয়া বিজয়া প্রস্থান করিল

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়