সঙ্গীর অভাবে ইন্দু মাঝে মাঝে গিয়া তাহাদের টেব্‌লে বসিতেছিল, কিন্তু সেখানে তাহার প্রয়োজন নাই, তাই অধিকাংশ সময়ই বাটীর চারি পাশে একাকী ঘুরিয়া বেড়াইয়া সময় কাটাইবার চেষ্টা করিতেছিল। এমনি সময়ে দেখিতে পাইল, সাহেব পদব্রজে বাহির হইয়া যাইতেছেন। দ্রুতপদে তাঁহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইতে সাহেব চকিত হইয়া কহিলেন—তুমি একলা যে ইন্দু?

ইন্দু কহিল—দাদারা ম্যাপ তৈরি করছেন, এখনও শেষ হয়নি।

কিসের ম্যাপ?

ইন্দু কহিল—তাঁরা জমিদারি দেখতে যাবেন, পথ-ঘাট কোথায় আছে না আছে, সেই সমস্ত ঠিক করে নিচ্ছেন।

সাহেব সহাস্যে বলিলেন—আর সেখানে তোমার কোন কাজ নেই, না ইন্দু?

ইন্দু হাসিয়া সে কথা চাপা দিয়া কহিল—আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কাকাবাবু?

এই সম্বোধন আজ নূতন। সাহেব পুলকিত বিস্ময়ে ক্ষণকাল তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া কহিলেন—আমার ছেলেবেলার এক সঙ্গী পীড়িত হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন, তাঁকেই একবার দেখতে যাচ্ছি, মা।

—আপনার সঙ্গে যাব কাকাবাবু?

সাহেব কহিলেন, সে যে প্রায় মাইল-খানেক দূরে, ইন্দু। তুমি ত অতদূরে হাঁটতে পারবে না, মা।

আমি আরও ঢের বেশী হাঁটতে পারি, কাকাবাবু।—এই বলিয়া সে সাহেবের হাত ধরিয়া নিজেই অগ্রসর হইয়া পড়িল। গাড়িখানা প্রস্তুত করিয়া সঙ্গে লইবার প্রস্তাব সাহেব একবার করিলেন বটে, কিন্তু ইন্দু তাহাতে কান দিল না।

গ্রাম্যপথ। সুনির্দিষ্ট চিহ্ন বিশেষ নাই। পুকুরের পাড় দিয়া, গোয়ালের ধার দিয়া, কোথাও বা কাহারও প্রাঙ্গণের ভিতর দিয়া গিয়াছে, ইন্দু সঙ্কোচ বোধ করিতে লাগিল। ছেলেমেয়েরা ছুটিয়া আসিল, পুরুষরা জমিদার দেখিয়া কাজ ফেলিয়া সসম্ভ্রমে উঠিয়া দাঁড়াইতে লাগিল, বধূরা দূর হইতে অবগুণ্ঠনের ফাঁক দিয়া কৌতূহল মিটাইতে লাগিল। একটুখানি নিরালায় আসিয়া ইন্দু কহিল, এরা আমাদের মত মেয়েদের বোধ হয় আর কখনও দেখেনি, না?

সাহেব ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন—খুব সম্ভব তাই।

ইন্দু কহিল, এদের চোখে আমরা যেন কি এক রকম অদ্ভুত হয়ে গেছি, না কাকাবাবু? —কথাটি বলিতে হঠাৎ যেন তাহার একটুখানি লজ্জা করিয়া উঠিল।

সাহেব জবাব দিলেন না, শুধু একটু হাসিলেন। দুই-চারি পা নিঃশব্দে চলিয়া ইন্দু বলিয়া উঠিল—এরা কিন্তু এক হিসেবে বেশ আছে, না কাকাবাবু?

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়