আট
এই রায়-পরিবারের জমিদারিটি আয়তনে ছোট, কিন্তু তাহার মুনাফা নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর ছিল না। জমিদার চিরদিন প্রবাসে থাকেন, সুতরাং সমস্তই কর্মচারীদের হাতে; এ অবস্থায় কাজকর্ম নিতান্ত বিশৃঙ্খল হইবার কথা, কিন্তু প্রজারা ধর্মভীরু বলিয়াই হউক, বা অন্যমনস্ক-প্রকৃতি উদাসীন রে-সাহেবের ভাগ্যফলেই হউক, মোটের উপর ভালভাবেই এতদিন ইহা পরিচালিত হইয়া আসিয়াছিল। কেবল উত্তরোত্তর আয় বাড়ানোর কাজটাই এতকাল স্থগিত ছিল বটে, কিন্তু চুরিটাও তেমনি বন্ধ ছিল। আলেখ্যের হাতে আসিয়া এই স্বল্পকালের মধ্যেই ইহার চেহারায় একটা পরিবর্তন দেখা দিয়াছে। সুশৃঙ্খলিত করিবার অভিনব উদ্যম এখনও প্রজাদের গৃহ পর্যন্ত অতদূরে পৌঁছায় নাই বটে, কিন্তু তাহার আকর্ষণের কঠোরতা কর্মচারিবর্গ অনুভব করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। বৃদ্ধ নয়ন গাঙ্গুলীর আত্মহত্যার পরে হঠাৎ মনে হইয়াছিল বটে, হয়ত ইহা এইখানেই থামিবে, কিন্তু হাটের ব্যাপার লইয়া আলেখ্যের কর্মশীলতা পুনরায় চঞ্চল হইয়া উঠিল। যে আকস্মিক দুর্ঘটনা এই কয়দিন তাহাকে লজ্জিত বিষণ্ণ করিয়া রাখিয়াছিল, কাল অমরনাথের সহিত মুখোমুখি একটা বচসার মত হইয়া যাইবার পরে সে ভাবটাও আজ তাহার কাটিয়া গিয়াছিল। তাহার মনের মধ্যে আর সন্দেহমাত্র ছিল না যে, এ সংসারে যাহাদের কোথাও কিছু আছে, তাহা কোনক্রমে নষ্ট করিয়া দেওয়াটাকেই কতকগুলি লোক দেশের সবচেয়ে বড় কাজ বলিয়া ভাবিতে শুরু করিয়া দিয়াছে এবং অমরনাথ যত বড় অধ্যাপকই হউক, সে-ও এই দলভুক্ত।
স্থির হইয়াছিল, সম্পত্তির কোথায় কি আছে, নিজে একবার পরিদর্শন করিয়া আসিতে হইবে এবং এই উদ্দেশ্যেই আজ সকাল হইতে বৃদ্ধ ম্যানেজারবাবুকে সুমুখে রাখিয়া আলেখ্য কমলকিরণের সাহায্যে একটা ম্যাপ তৈরি করিতেছিল। পথঘাট ভাল করিয়া জানিয়া রাখা প্রয়োজন। উভয়ের উৎসাহের অবধি নাই, দিনের স্নানাহার আজ কোনমতে সারিয়া লইয়া পুনরায় তাঁহারা সেই কর্মেই নিযুক্ত হইলেন। এমনি করিয়া বেলা পড়িয়া আসিল।
পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত রচনা : জাগরণ Chapter : 8 Page: 58
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 267