জ্যাঠাইমা। সে পরশুর কথা। আজ আমার কর্ম-বাড়িতে চেঁচামেঁচি হাঁকাহাঁকি করতে আমি নিষেধ করচি। আমি সকলকেই নিমন্ত্রণ করব, কাউকে বাদ দিতে পারব না।

পরাণ। কিন্তু আমরা কেউ এখানে জলটুকু পর্যন্ত মুখে দিতে পারব না।

জ্যাঠাইমা। আমাকে ভয় দেখাতে বারণ কর রমেশ। দেশে অনাথ-আতুর কাঙালের অভাব নেই। আয়োজন আমার ব্যর্থ হবে না।

রমেশ। (ব্যাকুলকণ্ঠে) কিন্তু সমস্ত এঁরা পণ্ড কোরে দিতে চান। এর সকল দায় যে তোমার মাথায় পড়বে জ্যাঠাইমা!

জ্যাঠাইমা। এ তোর অন্যায় রমেশ। আমার বাড়ির কাজের দায়িত্ব আমার মাথায় পড়বে না ত কি পরের মাথায় পড়বে? এখন ওঁদের যেতে বলে দে। ঢের কাজ পড়ে আছে, নষ্ট করবার সময় নেই।

[জ্যাঠাইমা অন্তঃপুরে চলিয়া গেলেন। সদর দ্বার দিয়া গোবিন্দ, ধর্মদাস
ও পরাণ হালদার ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল]

রমেশ। ভেবেছিলাম বুঝি আমার কেউ নেই,—কিন্তু সবাই আছে যার তুমি আছ জ্যাঠাইমা।

তৃতীয় দৃশ্য

গ্রাম্য পথ

[দীনু ভটচায শ্রাদ্ধবাটী হইতে নিমন্ত্রণ খাইয়া ঘরে ফিরিতেছে। সঙ্গে পটল, ন্যাড়া, বুড়ী প্রভৃতি বালক-বালিকা। সকলেরই হাতে ছোট-বড় পুঁটলি, অন্য হাতে খুরিতে করিয়া দধি, ক্ষীর প্রভৃতি]

খেঁদি। (সভয়ে) বাবা, ভোজো আসচে—

[শুনিয়া সকলে চকিত হইয়া উঠিল।
রমেশের ভৃত্য ভজুয়া প্রবেশ করিল]

দীনু। এই যে ভজুয়াবাবু, কোথায় যাওয়া হচ্ছে?

ভজুয়া। আরে ই-সব কি লিয়ে যাচ্চে ভটচায-মোশা—

দীনু। কিছুই নয় বাবা,—এই দুটো এঁটো-কাঁটা—পাড়ার ছোটলোক গরীব-দুঃখীর ছেলেমেয়ে আছে ত, গেলেই সব হাত পেতে দাঁড়াবে, তাদেরই দেবার জন্যে—

ভজুয়া। আরে, কমতি কি আছে। পুরি মিঠাই কেত্‌না গরীব-দুঃখী উহই বএঠকে খা রহা—

দীনু। খাচ্চে বৈ কি বাবা, খাচ্চে বৈ কি। রাজার ভাণ্ডার, অভাব কি! তবে সবাই কি আসতে পারবে? তাদের জন্যেই দুটো-একটা—

ভজুয়া। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক ঠিক। বড়ি খারাব গাঁও ভটচায, কিত্‌না গুলমাল। ই উঠে তো উ বোসে, ই ভাগে তো উ খিঁচকে লাগে—হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ—

দীনু। হয় বাবা হয়, বিরদ কাজে-কর্মে—বুড়ী, পটলার হাতটা একবার বদলে নে মা আমাদের গাঁ ত তবু পদে আছে বাবা—হোরে, পথপানে চেয়ে চল না। হোঁচট খেয়ে দইয়ের ভাঁড়টা ফেলে দিবি যে। যে কাণ্ড দেখে এলাম খেঁদির মামার বাড়িতে,—বিশ-ঘর বামুন-কায়েতের বাস নেই বাবা—দশটা দলাদলি। পটলা, হাঁ করে স্বগ্‌গ-পানে তাকিয়ে যাচ্ছিস যে? তবে একটা কথা বলতে পারি বাবা, ভিক্ষে-শিক্ষে করতে অনেক জায়গাতেই ত যাই, অনেকে অনুগ্রহও করেন, আমি দেখেচি তোমার বাবুর মত ছেলে-ছোকরাদেরই যা কিছু দয়ামায়া আছে। নেই কেবল বুড়ো ব্যাটাদের। বাগে পেলেই একজন আর একজনের গলায় পা দিয়ে জিভ বার করে তবে ছাড়ে।

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়