তিন

বিষয়-সম্পত্তির কাজে কন্যার উৎসাহ ও মনোযোগ দেখিয়া রে-সাহেব অত্যন্ত প্রীত হইলেন। ঝাড়া-মোছা হইতে আরম্ভ করিয়া চুন দেওয়া, রং দেওয়া, আসবাবপত্রের পরিবর্তন, পরিবর্জন ইত্যাদিতে সমস্ত বাড়িটারও একদিকে যেমন সংস্কার শুরু হইল, অন্যদিকে শৃঙ্খলাহীন, ঢিলাঢালা জমিদারী সেরেস্তাতেও তেমনিই অত্যন্ত কড়া নিয়ম-কানুনসকল প্রত্যহই জারি হইয়া উঠিতে লাগিল। সাংসারিক সকল ব্যাপারেই অনভিজ্ঞ এই মেয়েটির মধ্যে যে এতখানি কর্মপটুতা ছিল, তাহা পেনশনপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ম্যানেজারবাবু পর্যন্ত স্বীকার না করিয়া পারিলেন না। তাঁহার ত সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবসর নাই। দাখিলা, চিঠা, কবজ, খতিয়ান, রোকড়, রোডসেস্‌, কাহাকে কি বলে এবং কোথায় কি হয়, জমিদারী কাজের এইসকল পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা লইয়া আলেখ্যের কাছে তিনি ত প্রায় গলদঘর্ম হইয়া উঠিলেন। কর্মচারীদের মধ্যে কাহার কি কাজ, কত বেতন, ফাঁকি না দিলে কতখানি কাজ করা যায়, এ-সকল বুঝিয়া লইতে আলেখ্যের বিলম্ব হইল না। কয়েকটি স্থবির-গোছের লোকের প্রতি প্রথম হইতেই তাহার দৃষ্টি পড়িয়াছিল, জেরার চোটে ম্যানেজার স্বীকার করিয়া ফেলিলেন যে, এইসকল লোকের দ্বারা বস্তুত: কোন উপকারই হয় না, এবং এ কথা তিনি ইতঃপূর্বে সাহেবকে জানাইয়াছিলেন, কিন্তু কোন ফল হয় নাই। ইনি এই বলিয়া জবাব দিয়াছিলেন যে, এই সংসারে চাকরি করিয়া আজ যাহারা বুড়া হইয়াছে, তাহাদের প্রতি জুলুম করিয়া কাজ আদায় করিবার আবশ্যকতা নাই, নূতন লোক বাহাল করিলেই জমিদারির কাজ চলিয়া যাইবে। এইজন্যই এত লোক বেশী হইয়া পড়িয়াছে।

আলেখ্য কহিল—এবং এইজন্যেই বাবার খরচে কুলোয় না!

ম্যানেজার ব্রজবাবু চুপ করিয়া রহিলেন।

আলেখ্য কহিল—আমি কাজ চাই, দানছত্র খুলতে চাইনে।

ব্রজবাবু সবিনয়ে কহিলেন, আপনি যেমন আদেশ করবেন, তেমনি হবে।

রে-সাহেব দিন দুই-তিন হইল কলিকাতায় তাঁহার পুরাতন বন্ধু-বান্ধবগণের সহিত দেখা-সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিলেন, বাটীতে উপস্থিত ছিলেন না, এই অবকাশে আলেখ্য একদিন ম্যানেজারকে ডাকাইয়া তাঁহার হাতে একখানি ছোট কাগজ দিয়া কহিল—এদের আপনি এই মাসের মাইনেটা চুকিয়া দিয়ে জবাব দিয়ে দেবেন।

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়