কাজের ব্যস্ততার মধ্যে ইহাদের আকস্মিক আগমনে আলেখ্য খুশী হইতে পারে নাই। ঘোষ-সাহেবদের আসার দিন নিকটবর্তী হইয়া আসিতেছে, অথচ বাটী সাজানো-গুছানোর কাজ এখনও বিস্তর বাকি; কহিল—নিতান্ত জরুরী কাজ নাকি?

ব্রজবাবু ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, নয়ন গাঙ্গুলীর কামাইয়ের দরুন পাঁচ টাকা মাইনে কাটা হয়েছিল, কিন্তু পরে বিবেচনা করবেন বলে একটা ভরসা দিয়েছিলেন—

আলেখ্য অপ্রসন্নমুখে বলিল—সে বিবেচনার আমি আর প্রয়োজন দেখিনে।

ব্রজবাবু প্রতিবাদ করিতে বোধ হয় সাহস করিলেন না, ছেলেটিকে লইয়া নিঃশব্দে ফিরিয়া যাইতেছিলেন, আলেখ্য কৌতূহলবশে সহসা জিজ্ঞাসা করিল—ছেলেটি কে ম্যানেজারবাবু, তাঁর নাতি বোধ করি?

ছেলেটি নিজেই ঘাড় নাড়িয়া বলিল—হ্যাঁ, এবং বলিয়াই কাঁদিয়া ফেলিল। ব্রজবাবু তখন আস্তে আস্তে কহিলেন, চাকরি নেই শুনে মুদী কাল আর চাল-ডাল কিছু দিলে না, হয়ত তার বাকীও ছিল—সারাদিন খাওয়া-দাওয়া কারও হ’ল না। ছেলে-জামাইয়ের শোকে বুড়ো বয়সে ইদানীং গাঙ্গুলী মশায়ের মাথাটাও তেমন ভাল ছিল না,—কি ভাবলে কি জানি, রাত্রেই কতকগুলো কলকে ফুলের বীচি বেটে খেয়ে আত্মহত্যা করে ফেলে—এখন আবার পুলিশ না এলে দাহ পর্যন্ত হওয়া—

আলেখ্য চমকাইয়া উঠিয়া কহিল—কে আত্মহত্যা করলে?

ছেলেটি কাঁদিতেছিল, বলিল—দাদামশাই।

দাদামশাই? নয়ন গাঙ্গুলী? আত্মহত্যা করেছেন?

ব্রজবাবু বলিলেন—হাঁ, ভোরবেলায় মারা গেছেন। টাকা পাঁচটা পেলে, এদের বড় উপকার হয়। ছেলেটিকে কহিলেন—মণি, হাতজোড় করে বল, মা, আমাদের পাঁচ টাকা ভিক্ষে দিন। বল!

ছেলেটি কাঁদিতে কাঁদিতে হাতজোড় করিয়া তাঁহার কথাগুলা আবৃত্তি করিল। আর তাহার প্রতি অনিমেষ-চক্ষে চাহিয়া আলেখ্য মূর্তির মত স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

মণিকে লইয়া ব্রজবাবু চলিয়া গেলেন। নয়ন গাঙ্গুলীর মৃতদেহের প্রায়শ্চিত্ত হইতে শুরু করিয়া সৎকার পর্যন্ত কিছুই টাকার অভাবে আর আটকাইয়া থাকিবে না, যাবার সময় তাহা তিনি বুঝিয়া গেলেন; কিন্তু আলেখ্যের কাছে ঘরের পেন্টিং হইতে সাজানো-গোছানো যা-কিছু কাজ সমস্তই একেবারে অর্থহীন হইয়া গেল। সেখান হইতে বাহির হইয়া সে তাহার বসিবার ঘরে আসিয়া চুপ করিয়া বসিল।

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়