আলেখ্য মনে মনে লজ্জা পাইয়া সবিনয়ে কহিল—আজ্ঞে না; শুধু আজ বড় ক্লান্ত ছিলাম বলেই নিমাই বলিলেন সে আমি শুনেছি দিদি, অমরনাথ আমার কাছে সমস্ত বলেই তবে গেছেন। বড় ভাল ছেলে, এতখানি বয়সে তার আর জোড়া কোথাও দেখলাম না। পাগলা দুঃখের জ্বালা সইতে পারলে না, আপনাকে হত্যা করে ফেললে,—আহা! তাই ভাবি, দিদি, ভগবান শক্তি হরণ করে নিলে মানুষ কি-ই বা! আসবার পথে তাদের বাড়ির পাশ দিয়েই আসছিলাম, শ্মশান থেকে এখনও তারা ফেরেনি, ভেতরে মেয়েটা ডাক ছেড়ে চেঁচাচ্ছে,—আহা! সংসারে লঘু পাপে কত গুরু দণ্ডই না হয়! জিনিস হয়ে বয়ে চুকে যায়, কিন্তু দাগ তার সারা জীবনে মিলোয় না। ভাবলাম, একবার ভেতরে ঢুকে গিয়ে বলি, দুর্গা, অভিসম্পাত করে আর লাভ কি মা, সে যদি জানত, এতবড় ভয়ানক কাণ্ড হবে, তা হলে কি কখনও তোমার বাবাকে জবাব দিতে পারতো? তাকে আমি চিনিনে, তবু বলছি কখ্খনো না। যা হবার তা হয়েছে, কিন্তু যে বেঁচে রইল, তার মনস্তাপ কি কখনও ঘুচবে! এ কলঙ্কের দাগে তাকে চিরকাল দাগী হয়ে থাকতে হবে। অথচ তলিয়ে দেখলে এ ত সত্য নয়। তোমার মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারছি দিদি, তার মেয়ের চেয়ে এ দুর্ঘটনা তোমাকে ত কম আঘাত করেনি!
এই আগন্তুকের অবাঞ্ছিত আগমনে আলেখ্যের পীড়িত চিত্ত তিক্ততায় পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। তাঁহার মন্তব্য শেষ হইলে সে সবিস্ময়ে ক্ষণকাল তাঁহার মুখের প্রতি চাহিয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করিল—আপনাকে কে বললে আমি আঘাত পেয়েছি?
বৃদ্ধ কহিলেন—অমরনাথ আমাকে ত তাই বলে গেলেন।
আলেখ্য তেমনিই আস্তে আস্তে বলিল—অমরনাথবাবুর এরূপ অনুমানের হেতু কি, তা তিনিই জানেন। গাঙ্গুলীমশাই সম্পূর্ণ কাজের বার হয়ে গিয়েছিলেন। আমার জমিদারি সুশৃঙ্খলায় চালাবার চেষ্টা করা ত আমার অপরাধ নয়।
নিমাই বলিলেন—তোমার অপরাধের উল্লেখ ত সে একবারও করেনি দিদি।
আলেখ্য প্রত্যুত্তরে শুধু কহিল—আমি আমার কর্তব্য করেছিলাম মাত্র।
তাহার জবাব শুনিয়া বৃদ্ধ অন্ধকারে ঠাহর করিয়া তাহার মুখের চেহারা লক্ষ্য করিবার চেষ্টা করিয়া শেষে একটুখানি হাসিলেন।
পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত রচনা : জাগরণ Chapter : 4 Page: 30
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 211