ভাল, সেই কথাই যদি উঠলো, তবে বলি দিদি, আমার জীবনেই আমি দেখেছি, ছ’টা পয়সা ও এক পাতা দোক্তার বদলে একটা লোক সারাদিন মজুরি করে তার পরিবার প্রতিপালন করেছে। দুঃখে নয়, সচ্ছলে—আনন্দের সঙ্গে। দেশে টাকা ছিল না, কিন্তু প্রচুর খাদ্য ছিল। রেল ছিল না, জাহাজ ছিল না—বিদেশী সাহেব আর ততোধিক বিদেশী মারবাড়ীতে মিলে দেশের অন্ন বিদেশে চালান দিয়ে তখন সহস্র কোটি লোকের জীবন-সমস্যা এমন দুঃসহ, এমন ভীষণ জটিল করে তোলবার সুযোগ পেত না। তখন ক্ষুধাতুরের মুখের গ্রাস জুয়ার আড্ডার মধ্যে দিয়ে এমন করে সোনা-রূপোয় রূপান্তরিত হয়ে যোগ্যতমের সিন্দুকে গিয়ে উপস্থিত হ’ত না।—বলিতে বলিতে হঠাৎ বৃদ্ধের দুই চক্ষু সজল হইয়া উঠিল, কহিলেন—দিদি, আমার ছেলেবেলায় অক্ষম অযোগ্যের বেঁচে থাকবার অধিকার নিয়ে এমন নিষ্ঠুর পরীক্ষা ছিল না। আজ একমুঠো শাকান্নও দেশে নষ্ট হবার নয়, বুদ্ধিমান ও ব্যবসায়ীতে মিলে তাঁবার টুকরোয় তাকে দাঁড় করাতে দেরি করে না—অর্থবিজ্ঞানের পণ্ডিতরা বলবেন, এর চেয়ে মঙ্গল আর কি আছে। কিন্তু আমার মত যাকে গ্রামে গ্রামে দুঃখীদের মাঝখানে ঘুরে বেড়াতে হয়, সেই জানে মঙ্গল এতে কত!
এই বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর ও মুখের ভাবে আলেখ্যের নিজের চিত্তও করুণ হইয়া আসিল, কিন্তু সে আপনাকে সামলাইয়া লইয়া প্রশ্ন করিল—ট্রেন এবং স্টীমারকে আপনি ভাল মনে করেন না?
বৃদ্ধ হাসিয়া ফেলিলেন। কহিলেন—কোন কিছুর ভাল-মন্দই কি এমন বিচ্ছিন্ন করে নির্দেশ করা যায় দিদি? আর সকলের সঙ্গে যুক্ত করে, সামঞ্জস্য করে তবেই তার ভাল-মন্দের সত্যকার বিচার হয়।
আলেখ্যও হাসিল, কহিল—ওটা শুধু আপনার কথার মারপ্যাঁচ। আসল কথা, আপনাদের পণ্ডিত-সমাজ বিলাতী শিক্ষার অত্যন্ত প্রতিকূলে। ওদের যা-কিছু সমস্তই মন্দ এবং আপনাদের যা-কিছু সমস্তই ভাল, এই আপনাদের বদ্ধমূল ধারণা। যতক্ষণ না তাদের বিদ্যা, তাদের বিজ্ঞান আপনারা আয়ত্ত করবেন, ততক্ষণ কোনমতেই নিরপেক্ষ বিচার করতে পারবেন না।
পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত রচনা : জাগরণ Chapter : 4 Page: 34
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 208