ষষ্ঠ অধ্যায়
৩য় প্রকরণ—ইন্দ্ৰিয়জয়
; কামাদি ছয় রিপুর বর্জন

কাম, ক্ৰোধ, লোভ, মান (নিজ বুদ্ধির অনুপমত্ববিষয়ে অভিমান), মদ (গর্ব) ও হর্ষের (ইষ্টপ্রাপ্তিতে মুখামুভবের) বর্জন দ্বারা ইন্দ্ৰিয়জয় লাভ করিতে হইবে—এবং এই ইন্দ্ৰিয়জয় বিদ্যাজনিত বিনয়ের (শিক্ষার) কারণ হয়। কর্ণ, ত্বক, নেত্র, জিহবা ও নাসিকা—এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের (যথাক্রমে) শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধরূপ বিষয়-পঞ্চকের প্রতি (স্বভাবতঃ) অবিরোধসহকারে প্রবৃত্তির নাম ইন্দ্রিয়জয়। শাস্ত্রে প্রতিপাদিত বিষয়ের অনুষ্ঠানকেও ইন্দ্রিয়জয় বলা যায় (অর্থাৎ তারাও ইঞ্জিয়জয় লব্ধ হয়)। কারণ, এই শাস্ত্রটি সম্পূর্ণই ইন্দ্রিয় জয় বলিয়া অভিহিত হইতে পারে (অর্থাৎ এই শাস্ত্রে প্রতিপাদ্য সব বিষয়ই ইন্দ্রিয়জয়ের কারণ হইতে পারে।

যে রাজা শাস্ত্রবিহিত কর্ত্তব্যের বিরুদ্ধ অনুষ্ঠান করেন এবং যিনি নিজ ইন্দ্রিয়বর্গকে স্ববশে আনিতে পারেন নাই, তিনি চাতুরন্ত হইলেও (অর্থাৎ চতুসমুদ্রান্ত পৃথিবীর অধীশ্বর হইলে) তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হয়েন। যথা—ভোজবংশীয় দাণ্ডক্য নামক রাজা ও বিদেহাধিপতি করাল-নামক রাজা—উভয়েই কামবশতঃ ব্রাহ্মণের কন্যাকে পাইতে ইচ্ছুক হইয়া (তাহদের পিতাদ্বারা অভিশপ্ত হওয়ায়) নিজ বান্ধব ও রাষ্ট্রসহ বিনাশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কোপবশতঃ জনমেজয় রাজা ব্রাহ্মণের উপর বিক্রম প্রকাশ করিতে যাইয়া (তদীয় শাপে) ও তালজঙ্ঘ রাজা ভৃগুদিগের উপর সেরূপ কাৰ্য্য করিয়া বিনাশপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। লোভের বশবৰ্ত্তী হইয়া ইলানন্দন (পুরূরবাঃ) এবং সৌবীর দেশের রাজা অজবিন্দুও পীড়াদানপূর্ণক (ব্রাহ্মণাদি) চারি বর্ণ হইতে অতিমাত্রায় ধনাপহরণ করায় (তাহাদের কোপেই) বিনষ্ট হয়েন। অভিমানবশতঃ রাবণ পত্নীকে (রামপত্নী সীতাদেবীকে) না ফিরাইয়া দিয়া ও দুৰ্য্যোধন স্বরাজ্য হইতে অংশমাত্রও (পাণ্ডবদিগকে) প্রত্যর্পণ না করিয়া বিনাশপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। মদ বা গর্ব্বের বংশগত হইয়া সমস্ত প্রজাদিগকে অপমানিত করিয়া ডম্ভোদ্ভব রাজ (নরনারায়ণের হস্তে) এবং হেয়য় দেশের অধিপতি অর্জুন (কীৰ্ত্তবীর্য্যার্জ্জুন পরশুরামের হস্তে) নাশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এবং হর্ষের বশীভূত হইয়া বাতাপি-নামক (অসুর) অগস্ত্য ঋষিকে অতিমাত্রায় আক্রমণ করিয়া এবং দ্বৈপায়ন ঋষিকে (ব্যাসদেবকে) তেমনই আক্রমণ করিয়া বৃষ্ণিসঙ্ঘও (যাদবসংঘও) নাশপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

এই রাজার ও অন্যান্য বহু রাজা (কামাদি) শক্ৰষড়্‌বর্গের বশীভূত হইয়া ইন্দ্রিয়জয়ে অসমর্থ হওয়াতে বান্ধব ও রাষ্ট্রসহ বিনাশপ্রাপ্ত হইয়াছেন ॥১৷৷

আবার এই শক্ৰষড়্‌বর্গকে বিসর্জন করিয়া জিতেন্দ্রিয় হওয়ায় জমদগ্ন্য (পরশুরাম), অম্বরীষ ও নাভাগ চিরকাল পৃথিবী ভোগ করিতে পারিয়াছিলেন ৷৷২৷৷

কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্রে বিনয়াধিকারিক নামক প্রথম অধিকরণে ইন্দ্ৰিয়জয় নামক প্রকরণে অরিষড্‌বর্গত্যাগ-নামক ষষ্ঠ অধ্যায় সমাপ্ত।

Super User