তৃতীয় অধ্যায়
১ম প্রকরণ—বিদ্যাসমুদ্দেশ; ত্রয়ী স্থাপনা

সামবেদ, ঋগবেদ ও যজুৰ্ব্বেদ—এই তিন বেদের নাম ত্রয়ী। অথৰ্ব্ববেদ ও (মহাভারতাদি) ইতিহাসও বেদপৰ্য্যায়ে পতিত হয়। শিক্ষা (বর্ণের উচ্চারণাদির উপদেশক শাস্ত্র), কল্প (যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান-সম্বন্ধে উপদেশক শাস্ত্র), ব্যাকরণ (শব্দানুশাসন), নিরুক্ত  (শব্দনিৰ্ব্বচনের উপদেশক শাস্ত্র), ছন্দোবিচিতি (ছন্দ নিরূপণের শাস্ত্র) ও জ্যোতিষ—এই ছয়টিকে (বেদের) অঙ্গ বলিয়া নির্দেশ করা হয়।

এই ত্রয়ীতে উপদিষ্ট বা প্রতিপাদিত ধৰ্ম্ম, (ব্রাহ্মণাদি) চারি বর্ণের ও (ব্রহ্মচৰ্য্যাদি) চারি আশ্রমের নিজ নিজ ধৰ্ম্মে (কর্তব্যে) সকলকে নিয়ন্ত্রিত করিয়া রাখে বলিয়া, (লোকের) পরম উপকার সাধন করিয়া থাকে।

(সম্প্রতি চারি বর্ণের নিজ নিজ ধৰ্ম্ম বলা হইতেছে)। অধ্যয়ন (বেদাদিপঠন), অধ্যাপন (বিদ্যা-বিতরণ), যজন (যজ্ঞকরণ), যাজন (যজ্ঞ করান), দান ও প্রতিগ্ৰহ (দানগ্রহণ) এইগুলি ব্রাহ্মণের স্বধৰ্ম্ম বলিয়া গৃহীত হয়।

অধ্যয়ন, যজন, দান, শাস্ত্রদ্বারা জীবিকার্জন ও প্রাণীদিগের রক্ষণ—এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বধৰ্ম্ম। অধ্যয়ন, যুজন, দান, কৃষিকাৰ্য্য, (গবাদি) পশুপালন ও বাণিজ্যকরণ–এইগুলি বৈশ্যের স্বধৰ্ম্ম।

(ব্রাহ্মণাদি) দ্বিজগণের শুশ্রূষা (সেবা), বার্তা (অর্থাৎ কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্য) এবং কারুকৰ্ম্ম (শিল্পীর কার্য্য) ও কুশীলব কৰ্ম্ম (গীতিবাদিত্রাদি কৰ্ম্ম ও ভাটচারণদিগের কৰ্ম্ম) এইগুলি শূদ্রের স্বধৰ্ম্ম। (সম্প্রতি চারি আশ্রমের স্ব স্ব ধৰ্ম্ম বলা হইতেছে)। (সৰ্ব্ববর্ণের অন্তভুক্ত) গৃহস্থের স্বধৰ্ম্ম হইল— নিজ বর্ণের জন্য ব্যবস্থিত কৰ্ম্মদ্বারা জীবিকানিৰ্বাহ, নিজকুলের সমান কুলে জাত, অথচ অসমাপ্ত ঋষির গোত্রে সম্ভূত ব্যক্তিদিগের মধ্যে বিবাহ সম্পাদন, ঋতুরক্ষার্থ স্ত্রী-গমন-শীলতা, দেবতা, পিতৃলোক, অতিথি ও ভৃত্যাদিকে (খাদ্যাদি—) দান ও তদ্দত্তাবশিষ্টের ভোজন।

ব্রহ্মচারীর স্বধৰ্ম্ম হইল—স্বাধ্যায় (স্ববেদের অধ্যয়ন), অগ্নিকাৰ্য্য ও স্নান ও ভিক্ষাচর্য্যা, (আর নৈষ্টিক ব্রহ্মচারীর পক্ষে) জীবন পৰ্য্যন্ত আচাৰ্য্য-সমীপে অবস্থান এবং আচার্য্যের অভাবে গুরুপুত্র-সমীপে, অথবা সমানশাখাধ্যায়ী বৃদ্ধসমীপে অবস্থান।

বানপ্রস্থের স্বধৰ্ম্ম হইল—নিজের ব্রহ্মচৰ্য্যব্রতরক্ষা (অর্থাৎ উর্দ্ধরেতাঃ হইয়া থাকা), ভূমিতে শয়ন, জটা ও অজিন (মৃগচৰ্ম্ম) ধারণ, অগ্নিহোত্র ও (ত্রিকাল) স্নান এবং বনজাত (কন্দমূলাদি) দ্রব্যের আহার।

পরিব্রাজক বা সন্ন্যাসীর স্বধৰ্ম্ম হইল—নিজের ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত রাখা, কোন কৰ্ম্মেই প্রবৃত্ত না হওয়া (নৈক্য), কোন বস্তুতেই স্বত্ব রক্ষা না করা, লোকসঙ্গ ত্যাগ করা, অনেক স্থানে যাইয়া ভিক্ষান্ন সংগ্রহ, অরণ্যে নিবাস এবং বাহ্য ও আভ্যন্তর শৌচ বা শুচিভাব (অর্থাৎ কায়, মন ও বাক্য বিষয়ে শুদ্ধভাব রাখা)।

সকল বর্ণের ও সকল আশ্রমের পক্ষে সাধারণ ধৰ্ম্ম হইল—অহিংসা, সত্যবচন, শৌচ বা শুদ্ধতা, অসূয়ার অভাব (অর্থাৎ গুণপক্ষপাতিত্ব), অনিষ্ঠুরতা ও ক্ষমা।

(বর্ণাশ্রমবর্গের) স্বধৰ্ম্ম পালিত হইলে, ইহা স্বর্গ ও আনন্ত্যের (অনন্তসুখ বা মোক্ষের) সাধন হইতে পারে। স্বধৰ্ম্মের উল্লঙ্ঘন ঘটিলে, লোকসকল কৰ্ম্মসংকর ও বর্ণসংকরবশত: উচ্ছেদ প্রাপ্ত হয়। অতএব রাজার উচিত কাৰ্য্য হইবে সমস্ত ভূতগণকে (প্রাণিবর্গকে) স্বধৰ্ম্ম হইতে ভ্ৰষ্ট হইতে না দেওয়া। যে রাজ (সকলকে) স্বধৰ্ম্ম আচরণ করাইতে পারেন, তিনি ইহলোকে ও পরলোকে সুখী হইতে পারেন ॥১।।

যে প্রজা-লোকের আর্য্যমর্যাদা (সদাচারনিয়ম) ব্যবস্থিত আছে, যে প্রজালোক বর্ণ ও আশ্রমের নিয়মাদি মানিয়া চলে, এবং যে প্রজা-লোক ত্রয়ীর বিধান দ্বারা রক্ষিত হয়, সে প্রজা-লোক প্রসন্ন (মুখসমৃদ্ধ) থাকে এবং কখনই নষ্ট হয় না।।২৷৷

কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্রে বিনয়াধিকারিক-নামক প্রথম অধিকরণে বিদ্যাসমুদ্দেশ প্রকরণে ত্রয়ীস্থাপনা-নামক তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত।

Super User