অদৃশ্য সী ঈলের পনটুনগুলোর চারধারে সাবধানে তল্লাশী চালাচ্ছে মেনাচিমের গার্ডরা, রানা আর লীনার ফিট করা লিমপেট মাইনগুলো খুঁজছে। এক এক করে খুলে নিয়ে পানিতে ফেলে দিচ্ছে ওগুলো।

মেনাচিমও ওদের সঙ্গে যোগ দিল। তার বুদ্ধি খানিকটা ভোতা হলেও, ইন্সটিঙ্কট খুব চোখা। বিপদের গন্ধ পায় সে, মাঝে মধ্যে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যও পায়।

একটা সাপোর্টে তল্লাশী চালাচ্ছিল সে, সন্দেহ করছে এটার গায়ে রানা মাইন রেখে গেছে। খোজার শুরুতে পেয়েও গেল। খুলে নিয়ে মাইনটা পানিতে ফেলে দিল সে। সাপোর্ট ছেড়ে সরে যাবে, তার ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় সতর্ক করে দিল। ধীরে ধীরে ঘুরল সে, ফিরে এল আবার সাপোর্টের কাছে। ওটা বেয়ে খানিকটা ওপরে উঠল সে, হাত দিয়ে পিছন দিকটা হাতড়াচ্ছে। এবার রানার রেখে যাওয়া দ্বিতীয় মাইনটাও পেয়ে গেল। নিজেকে নিয়ে গর্ব অনুভব করল মেনাচিম, মাইনটা খুলে ফেলে দিল পানিতে। মনে মনে ভাবল, বস খুব খুশি হবেন।

মেনাচিম লক্ষ করেছে, মাসুদ রানার প্রসঙ্গে সমীহের সঙ্গে কথা বলেন বস। লোকটাকে তার পাওয়া উচিত ছিল। গুলি খেয়ে মারা গেল, তারপর সাগরে তলিয়ে গেল, এটা তাকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না। বস যতই সম্মান দেখাক, লোকটা বসের সর্বনাশ করার জন্যে এসেছিল। আর বসের সর্বনাশ করা মানে তারও সর্বনাশ করা। কাজেই ওই ব্যাটার মৃত্যু হওয়া উচিত ছিল তার হাতে।

তবে সান্ত্বনা এই যে লোকটার সঙ্গিনী এখন তার কজায়। মেয়েটাকে বস তার হাতে তুলে দিয়েছেন। মাসুদ রানাকে হাতে পেলে সে যা করত, এখন মেয়েটাকে নিয়ে তা-ই করবে মেনাচিম। টর্চারটা আরও বরং বেশি উপভোগ্য হবে। ধৈর্যে কুলাচ্ছে না, মাইনগুলো তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করা দরকার।

প্রাইভেট অফিসে পায়চারি করছে ম্যাডক ফাউলার। সামনে একটা কমপিউটর নিয়ে ঝড়ো গতিতে কাজ করছে খায়রুল কবির। এখনও মাঝে মধ্যে বিড়বিড় করছে সে, তবে ফাউলার তা শুনতে পাচ্ছে না। ফাউলারের ওপর খেপে আছে সে, এ তারই প্রতিক্রিয়া ম্যাডক ফাউলার! বাপ লম্পট হলেও তুখোড় ব্যবসায়ী ছিল, শালার ছেলেটা হয়েছে পাগলা কুত্তা কাজের ফাঁকে আবার বলল, বানচোত নিজেও ডুববে, আমাকেও ডোবাবে!

আর কতক্ষণ লাগবে? জানতে চাইল ফাউলার। ঢাকা কি এখনও রেঞ্জের মধ্যে আসেনি?

টার্গেটিং ডাটা সবেমাত্র কমপিউটরে ভরা হলো, জবাব দিল কবির। কয়েক সেকেন্ড সময় দিন।

গুড। কিন্তু গানবোট আর ফ্রিগেট? এই মুহুর্তে ওগুলো কোথায়? কত কাছে?

আপনাকে তো আগেই সাবধান করেছিলাম। মাসুদ রানাকে ছোট করে দেখা উচিত হয়নি, বলল কবির। সে হয়তো মারা গেছে, কিন্তু সর্বনাশ যা করার করে দিয়ে গেছে।

মানে?

আমাদের কৌশল ফাস করে দিয়ে গেছে সে, বলল কবির। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কয়েক ঘন্টা আগেই জেনে ফেলেছে আমরা কি করতে যাচ্ছি। হাতে সময় পাওয়ায় গানবোট পাঠিয়েছে ওরা। ব্রিটিশ ফ্রিগেট এইচএমএস নরফোকও ভারত মহাসাগর থেকে রওনা হয়েছে।

তাতে কি? সী ঈল ওদের রেডারে ধরা পড়বে না।

তা পড়বে না। কিন্তু আমরা যেভাবে একের পর এক মিসাইল ছুড়ছি, সী ঈলের পজিশন আন্দাজ করতে কতক্ষণ?

আপনি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছেন। ইন্টারকমের বোতামে চাপ দিল ফাউলার। ক্যাপটেন, সী ঈলকে ফায়ারিং পজিশনে এনে থামান।

চোয়াল ডলছে ফাউলার, তবে এই মুহুর্তে এত বেশি উত্তেজনা বোধ করছে যে ব্যথাটা প্রায় অনুভবই করছে না। ঢাকা ধূলিসাৎ হওয়া সংক্রান্ত সমস্ত খবর কমপিউটরের সাহায্যে এরই মধ্যে লিখে ফেলা হয়েছে। খবরগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, মূল কাহিনী সংখ্যায় হবে একাধিক, তবে প্রতিটিতেই প্রকৃত বা বাস্তব পরিস্থিতির আংশিক হলেও বিস্তারিত বিবরণ থাকবে, বোতামে চাপ দেয়া মাত্র বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম থেকে ছড়িয়ে পড়বে সারা দুনিয়ায়। ঢাকায় নিউক্লিয়ার ডিভাইস বিস্ফোরিত হবার পর বিপর্যয়ের প্রকৃতি যা-ই হোক, হাতে বিভিন্ন বর্ণনা তৈরি থাকায় প্রকৃত অবস্থার বিবরণ প্রচার করতে কোন সমস্যা হবে না। হাতে অনেকগুলো বর্ণনা থাকায় বাস্তবের সঙ্গে যেটা মিলবে সেটাই সে সময় মত ব্রডকাস্ট করতে পারবে।

সমস্ত আয়োজন শেষ, এখন শুধু বোতামে চাপ দেয়াটা বাকি। বহু বছর পর নিজেকে অসম্ভব ক্ষমতাধর বলে মনে হচ্ছে তার, প্রায় ঈশ্বরের কাছাকাছি।

সী ঈলের ভেতরে ঢুকে পড়েছে রানা, বাল্কহেডের কাছাকাছি একটা লোয়ার ক্যাটওয়াকে রয়েছে। ক্যাটওয়াকের অপরপ্রান্তে তিনজন গার্ডকে দেখতে পেয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকাল ও, এই ফাঁকে দ্রুত সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের ম্যাগাজিনটা চেক করে নিল। সেরেছে, আর মাত্র দুটো বুলেট আছে। হাঁটুর নিচে ট্রাপ দিয়ে বাধা খাপ থেকে কমব্যাট নাইফটা বের করল, তৈরি হলো হামলার জন্যে।

গার্ড তিনজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, বাইরে বেরিয়ে মাইন খুঁজতে পাঠানো হয়নি বলে খুব খুশি। তার ওপর বস বলেছেন, সব যদি ভালভাবে ঘটে, সবাইকে মোটা অঙ্কের বোনাস দেয়া হবে।

ভাল বোনাস পেলে আরেকটা বিয়ে করব আমি, একজন গার্ড বলল।

ধ্যেত, বিয়ের ঝামেলায় কোন শালা যায়, দ্বিতীয় গার্ড বলল আমি একটা করে গার্লফ্রেন্ড ধরব আর ছাড়ব।

তৃতীয় গার্ড বলল, আমি বাজে খরচ পছন্দ করি না। বোনাসের টাকা ব্যাংকে রেখে দেব, বিপদের দিনে কাজে লাগবে।

ইতিমধ্যে চুপিসারে ওদের কাছাকাছি সরে এসেছে রানা। ওদের আলোচনায় বাধা দিল প্রথম গার্ডের সোলার প্রেক্সাসে ছোরার ফলা ঢুকিয়ে। একই সঙ্গে অপর হাতে ধরা পিস্তল থেকে দুটো গুলি বেরুল, বিস্ফোরিত হলো দ্বিতীয় ও তৃতীয় গার্ডের খুলি। পিছনে একটা শব্দ হতে ঝট করে ঘুরল ও, দেখল এই মাত্র আরও একজন গার্ড ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে এসেছে। লোকটা কিছু বুঝতে পারার আগেই রানার ছোরা তার বুকে গেঁথে গেল। মাত্র দুই সেকেন্ডের মধ্যে কাজ শেষ। ছোরাটা হ্যাচকা টানে বের করে ওই লোকের শার্টেই রক্ত মুছল ও।

ডাক্ট টেপের একটা রোল দেখা যাচ্ছে ক্যাটওয়াকে। চোখে পড়তে রানার মাথায় একটা আইডিয়া ঢুকল। রোলটা তুলে পকেটে ভরল ও।

কোথায় রয়েছে, এরপর কোনদিকে যাবে, ঠিক করার জন্যে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল রানা। সবচেয়ে আগে জানা দরকার লীনার কি হলো। মেয়েটা নিঃস্বার্থভাবে ওকে সাহায্য করতে এসেছে। সে কি এখন ওদের হাতে বন্দী?

লীনা বন্দী হলে ক্রুজ মিসাইলের ব্যবস্থা একাই করতে হবে ওকে। যদিও রানা জানে না কিভাবে সেটা সম্ভব।

 

*

ফায়ারিং পজিশনে পৌছে ধীরে ধীরে থেমে গেল সী ঈল। চাঁদের আলোয় গাঢ় একটা ছায়া, ঢেউয়ের মাথায় দোল খাচ্ছে, যেন পানির গায়ে শান্তভাবে ঘুমাচ্ছে একটা তিমি।

স্টার্নের দিকে ওঅর্ক প্ল্যাটফর্মে একা টহল দিচ্ছে একজন গার্ড। কাছেই একটা লকার রুম, ভেতরে টুলস ও সাপ্লাই রাখা হয়। প্লে পেইন্টের কয়েকটা ক্যান লকার রূমের সামনে গড়াগড়ি খাচ্ছে, পাশেই একটা ইলেকট্রিক করাত, লকার থেকে তার বেরিয়ে এসেছে। সন্দেহ হওয়ায় সাব-মেশিনগান বাগিয়ে ধরে লকারটার দিকে এগোল গার্ড। তিন পর্যন্ত গুনে লকারটা খুলে ফেলল সে। ভেতরে হাত-পা বাধা ও মুখে কাপড় গোজা দুজন গার্ডকে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ল। সতৰ্ক হবার সময় পেল না, ঘাড়ে প্রচন্ড এক রদ্দা খেয়ে ছিটকে পড়ল ধাতব লকারের গায়ে, কপালের কাছ থেকে খুলিটা দুফাঁক হয়ে গেল। লোকটা ঢলে পড়তে তার হাত থেকে হেকলার অ্যান্ড কোচ সাব-মেশিনগানটা তুলে নিল রানা। লোকটাকে লকারে ভরল ও, প্রে পেইন্টের একটা ক্যান আর ইলেকট্রিক করাতটা হাতে নিল। এ-ধরনের আরও কয়েকটা জিনিস সংগ্রহ করেছে ও।

নিঃশব্দে জাহাজের সবচেয়ে উঁচু লেভেলে উঠে এল রানা। স্টার্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ভারী একটা মেশিনারির দিকে ঝুকল। যা খুঁজছিল পেয়ে গেছে।

প্ল্যাটফর্মের কিনারা থেকে ঝুকে নিচে তাকিয়ে জাহাজের পিছন দিকে ফাঁকা একটা জায়গা দেখতে পাচ্ছে রানা, সেই সঙ্গে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে ক্রুজ মিসাইলটাও। ওটা শুয়ে আছে। ভারী একটা ইস্পাতের লঞ্চ টিউবে, টিউবটা সী ঈলের পাশে সমান্তরাল রেখায় রয়েছে। আশপাশে কোন গার্ডকে দেখা যাচ্ছে না।

লঞ্চ টিউবের কাছে নেমে এসে ফ্রজ মিসাইলটা দ্রত পরীক্ষা করল রানা। ওর জানা আছে ক্রুজ মিসাইল একাই বিশাল এলাকা জুড়ে ব্যাপক ধ্বংসকাণ্ড ঘটাতে পারে। তার সঙ্গে যদি একটা নিউক্লিয়ার ওঅরহেড ফিট করা হয়, ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশো বা হয়তো কয়েক হাজার গুণ বেড়ে যাবে। নিউক্লিয়ার ওঅরহেড সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ না হলেও, মিসাইলের মাথায় লকিং স্ক্রু দিয়ে আটকানো। ওঅরহেডের আকার দেখে আন্দাজ করল, জিনিসটা পঁয়ত্রিশ মেগাটনের কম হবে না। গুনে দেখল রানা, আঠারোটা স্ক্রু দিয়ে আটকানো রয়েছে ওটা। একটা একটা করে খুলতে গেলে অনেক বেশি সময় লেগে যাবে, কাজেই খোলার চেষ্টা না করাই ভাল। তবে মিসাইলের সঙ্গে ওটাকে বিচ্ছিন্ন করার অন্য উপায়ও আছে। কেটে আলাদা করার জন্যেই ইলেকট্রিক করাতটা দেখতে পেয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে রানা, কিন্তু তাতেও সময় অনেক বেশি লাগবে। কাটার কাজ শেষ করতে পারবে না, তার আগেই হয়তো বোতামে চাপ দিয়ে মিসাইল ছুড়বে ফাউলার।

পেন্সিল টর্চ জ্বেলে ওঅরহেডটাকে আরও খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল ও। ওটার মাথায় একটা কন্ট্রোল সিস্টেম আছে, কাচ দিয়ে মোড়া, ভেতরে লাল আর সবুজ কাটা–দুটোই স্থির হয়ে আছে। সম্ভবত কমপিউটর বা রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে অ্যাকটিভেট করা হয় কন্ট্রোল সিস্টেম, সঙ্গে সঙ্গে লাল কাটা জিরো পয়েন্টে চলে যায়, ধীর গতিতে সেটাকে অনুসরণ করে সবুজ কাটা। দ্বিতীয় কাটা লাল কাটার সঙ্গে এক হলে বিস্ফোরণের উপযোগী হয় ওঅরহেড। মিসাইল ইতিমধ্যে আকাশে উঠে যায়, তারপর যখন টার্গেট আঘাত করে, তখনই বিস্ফোরিত হয় ওঅরহেড।

রানা দ্রুত চিন্তা করছে। সবচেয়ে ভাল হয় যদি মিসাইলটাকে অকেজো করতে পারে ও। কিন্তু ক্রুজ মিসাইলের মেকানিজম সম্পর্কে ওর কোনও ধারণা নেই। ওটা অ্যাকটিভেট করার জন্যে যে কমপিউটর বা রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করা হবে তা-ও ওর নাগালের বাইরে। জানা কথা জাহাজের ভেতর কোথাও ওগুলো আগলে বসে আছে খায়রুল কবির।

তাহলে? কিছুই কি করার নেই ওর? ইলেকট্রিক করাতটা কোন কাজেই লাগবে না? তারপর রানা ভাবল, আচ্ছা ওঅরহেডের কন্ট্রোল সিস্টেম যদি ভেঙে ফেলা হয়? কন্ট্রোল সিস্টেম কাজ না করলেও কি ওঅরহেড বিস্ফোরিত হবে? হয়তো হবে না, হয়তো হবে। ওর জানা নেই।

চারদিকে আরেকবার চোখ বুলিয়ে কাউকে দেখল না রানা। নিজেকে আর চিন্তা করার সুযোগ ন৷ দিয়ে ইলেকট্রিক করাতটা চালু করল ও, ওঅরহেডের কন্ট্রোল সিস্টেমের ঢাকনিটা ভেঙে করাতটা তলার দিকে এমন ভাবে বসাল, যেন নিচে থেকে চেঁছে আলাদা করা যায়। কাজটা শেষ করতে মাত্র দেড় মিনিট লাগল। এত সহজে গোটা কন্ট্রোল সিস্টেম হাতে চলে আসায় সন্তুষ্ট হতে পারল না রানা। জায়গাটায় একটা গর্ত তৈরি হয়েছে, ভেতরে হাত গলিয়ে এক মুঠো তার ধরে হ্যাচকা টান দিল ও, ছিড়ে আনল সবগুলো।

কিন্তু সংশয় আর সন্দেহ তবু গেল না। আরেকবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে সংগ্রহ করা জিনিসগুলো থেকে তুলে নিল বড় সাইজের একটা স্ক্রু-ড্রাইভার।

আঠারোটা স্ক্রু, প্রতিটি খুলতে দেড় মিনিট করে সময় লাগছে রানার। দ্বিতীয় একটা স্ক্রু-ড্রাইভার আর লীনা থাকলে কাজটা আরও তাড়াতাড়ি সারা যেত। কে জানে, ওরা হয়তো তাকে মেরেই ফেলেছে।

দশটা খোলার পর বিপদের গন্ধ পেল রানা। দ্রুত হাত চালাল ও, বাকি আটটা পুরোপুরি না খুলে শুধু আলগা করে রাখল। যদি সময় পাওয়া যায়, ফিরে এসে শেষ করবে কাজটা। ওপরের প্ল্যাটফর্মে একটা ছায়ামূর্তিকে দেখতে পেয়েছে ও। নিঃশব্দ পায়ে মই বেয়ে উঠল রানা। একটু আগেও কেউ একজন ছিল এখানে, এখন নেই। একবার ভাবল, আবার টিউবটার কাছে ফিরে যায়। কিন্তু হাতে আরও কাজ আছে, সেগুলোও কম জরুরী নয়। সংগ্রহ করা জিনিসগুলো এক জায়গায়

জড়ো করল ও–একটা ডাক্ট টেপ, ইলেকট্রিক করাত, প্রে পেইন্ট ক্যান, গ্যাসোলিন ভরা একটা মেটাল ক্যানিস্টার। স্ক্রু-ড্রাইভারটা মিসাইলের কাছে রেখে এসেছে। কয়েক টুকরো টেপ ছিড়ল ও গ্যাসোলিনের ক্যানটাকে ওগুলো দিয়ে মুড়ছে। উঁকি দিয়ে আরেকবার নিচে তাকাল, ক্যাটওয়াক ধরে মিসাইলের দিকে এগোচ্ছে একজন স্ক্রু। সঙ্গে কোন অস্ত্র নেই। সাব-মেশিন গান তুলে একটা মাত্র গুলি করল রানা, লক্ষ্যস্থির করল লোকটার পায়ের সামনে। ধাতব ক্যাটওয়াকে লেগে আরেক দিকে ছিটকে গেল বুলেট। ঠিক কি ঘটেছে বুঝতে পারেনি। চারদিকে তাকিয়ে ইতস্তত ভঙ্গিতে আরও এক পা সামনে বাড়ল সে। আরেকটা গুলি করল রানা। এবার সেটা লাগল লোকটার বাম পায়ের আধ ইঞ্চি দূরে। ঘুরল লোকটা, খিচে দৌড় দিল।

আরও দুই মিনিট নির্বিঘ্নে কাজ করার সময় পেল রানা।

*

ঢাকা, বাংলাদেশ।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দফতরে ইমার্জেন্সী কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে এক সারিতে বসে রয়েছেন বিসিআই চীফ রাহাত খান, ওদের সামনে নৌ ও বিমান বাহিনীর কমিউনিকেশন অফিসাররা স্যাটেলাইট টেলিফোন  ও ওয়্যায়েরলেসের মাধ্যমে সারাক্ষণ যোগাযোগ রাখছেন বাংলাদেশী গানবোট ডি-ফাইভ রুস্তম, একজোড়া মিগ আর ব্রিটিশ ফ্রিগেট এইচএমএস নরফোকের সঙ্গে।

রাহাত খানের সামনের ডেস্কে কয়েকটা ফোন রয়েছে, এই মুহুর্তে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। বাহিনী প্রধানরা তার দিকে তাকিয়ে আছেন, তিনজনের চেহারাই থমথম করছে। বোঝা না গেলেও, রাহাত খানও অত্যন্ত নার্ভাস বোধ করছেন।

স্টাফ অফিসার রিপোর্ট করলেন, স্যার, ব্রিটিশ ফ্রিগেট থেকে রিপোর্ট আসছে, ওরা কোন শিপ দেখতে পাচ্ছে না। আমাদের গানবোট আর মিগ থেকেও বলা হচ্ছে, কোথাও কিছু নেই।

ঠিকই আছে, ক্ৰেডলে রিসিভার রেখে দিয়ে রাহাত খান বললেন। অদৃশ্যই যখন দেখতে পাবার কথা নয়।

স্যার, ব্রিটিশ ফ্রিগেটের ক্যাপটেন বলছেন, ওটাকে খোঁজার জন্যে আর কোন সময় তিনি দিতে পারবেন না। কারণ আশঙ্কা করছেন, যে-কোন মুহুর্তে আবার ফ্রিগেট লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়া হবে।

আমাদের গানবোট ফ্রিগেটের চেয়ে এগিয়ে আছে,বললেন রাহাত খান। ওরা কি বলছে?

ওই একই কথা বলছে ওরা, স্যার। যে-কোন মুহুর্তে আবার মিসাইল আক্রমণের আশঙ্কা…

সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিন, বললেন রাহাত খান, কোন অবস্থাতেই পাল্টা মিসাইল ছোড়া যাবে না। অন্তত আমরা এখান থেকে অর্ডার না দেয়া পর্যন্ত। কেন পাল্টা আক্রমণ করা যাবে না তা তিনি তিন বাহিনীর প্রধানকে ইতিমধ্যে ব্যাখ্যা করেছেন, এই মুহুর্তে নতুন করে সে প্রসঙ্গে কিছু বললেন না।

সী ঈলে রানা থাকতে পারে, কথাটা রাহাত খান ভুলতে রাজি নন।

কিন্তু, স্যার, স্টাফ অফিসার বললেন, একটা ব্রিটিশ ফ্রিগেটকে আমরা আত্মরক্ষা করতে নিষেধ করতে পারি না!

পারি, কারণ আমাদের অনুরোধে তারা আমাদেরকে সাহায্য করতে এসেছে, কাজেই আমাদের সুবিধে-অসুবিধে তাদেরকে বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে।

কিন্তু কতক্ষণ, মি. খান? নৌ-বাহিনী প্রধান খানিকটা কঠিন সুরেই প্রশ্ন করলেন। আপনার একজন মাত্ৰ এজেন্টের প্রাণ কি এত বেশি মূল্যবান যে ঢাকা ধ্বংস হবার ঝুঁকি আমরা নিতে পারি?

আমাদের গানবোট, মিগ বা ব্রিটিশ ফ্রিগেট সী ঈলকে দেখতেই পাচ্ছে না, জবাব দিলেন রাহাত খান। আর আমার এজেন্ট এই মুহুর্তে সী ঈলে রয়েছে। এখন আপনারাই বলুন, ঢাকাকে রক্ষা করার সম্ভাবনা কার বেশি?

বাহিনী প্রধানদের কেউই তার প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করলেন না।

ফাউলারের প্রাইভেট কোয়ার্টারে ইন্টারকম বেজে উঠল। কিন্তু ফাউলার তাকিয়ে আছে কবিরের দিকে। কবির বিজয়ীর ভঙ্গিতে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে হেলান দিল চেয়ারে, হাত দুটো ভাঁজ করল বুকে, দাঁত বের করে হাসল। ফাউলারের চোয়াল উঁচু হয়ে উঠল, দাঁতে দাত ঘষছে। মানে? জানতে চাইল সে।

আমার কাজ শেষ, বলল কবির, কাজটা যেন পানির মত সহজ ছিল।

গুড।

ইন্টারকম এখনও বাজছে। রিসিভার তুলল ফাউলার। তাকে বলা হলো জরুরী ও বিপজ্জনক একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, এখুনি তাকে একবার মিসাইল প্ল্যাটফর্মে আসতে হবে। সব কথা না শুনেই হুঙ্কার ছাড়ল ফাউলার, স্নাইপার মানে? স্নাইপার কোথেকে আসবে? ঠিক আছে, আমি আসছি।

কবিরকে নিয়ে ওখানে পৌঁছুতেই দেখা গেল চারদিকে ছুটোছুটি করছে গার্ডরা। একজন স্ক্রু রিপোর্ট করল, বাইরে বেরুলেই কে যেন গুলি করছে, স্যার। লকগুলোর কাছে এগোতেই পারছি না। মিসাইলের পাশের প্ল্যাটফর্মটা হাত তুলে দেখাল সে।

লক? কিসের লক? জানতে চাইল ফাউলার।

কবির ব্যাখ্যা করল, আমরা যখন সাগরে থাকি, লঞ্চ টিউব তালা দিয়ে রাখা হয়। লঞ্চিং মেকানিজম আনলক করা না হলে ওটা ছোঁড়া যাবে না।

ফাউলারের চোখ সরু হয়ে গেল। দেয়াল থেকে ফোনের রিসিভার নিয়ে বললেন, মেনাচিম! মেয়েটাকে নিয়ে এখুনি চলে এসো এখানে। মাসুদ রানা এখনও বেঁচে আছে। রিসিভার রেখে দিয়ে সবার দিকে চোখ গরম করে তাকাল। তারপর ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে বেরিয়ে এল।

চারদিকে কোথাও কেউ নেই। রানা? চিৎকার করে ডাকল। চেম্বারের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল তার গলা।

ফাউলারের পিছন থেকে উঁকি দিল রানা। এই ফাউলার ইস্পাতের তৈরি মূর্তি, ভারী একটা মেশিনের মাথার কাছে মাচায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতের অস্ত্রটা রক্ত-মাংসের প্রতিপক্ষের দিকে তাক করল ও।

আমাকে আপনি গুলি করবেন না, মি. রানা। মেয়েটা আমার হাতে, আপনি জানেন। আমাকে আপনি মেরে ফেললে মেনাচিম মেয়েটাকে সত্যি সত্যিই চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে, জ্যান্ত অবস্থায়, বিলিভ মি। কাজেই ধরা দিন।

রানা কথা বলছে না।

খবরটা লেখা হয়ে গেছে, মি. রানা। প্রেসে পাঠিয়েও দিয়েছি। আজ রাতে নতুন কোন সংস্করণ বের হবে না। আপনি অাত্মসমর্পণ করলে, কথা দিচ্ছি আপনাকে বা মেয়েটাকে মেনাচিম টর্চার করবে না। বিসিআই আর ঢাকার অস্তিত্ব না থাকলে আপনার বিষও ঝরে যাবে, তখন আপনি একটা ঢোঁড়া সাপে পরিণত হবেন, কাজেই আপনাকে ছেড়ে দিতেও পারি আমি।

রানা জবাব দিল ক্যাটওয়াকে এক পশলা গুলি করে। আঁতকে উঠে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হলো ফাউলার।

স্টার্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ভারী একটা মেশিনারি আগেই দেখে রেখেছিল রানা। সেটার মাথায় উঠে স্নাইপারের ভূমিকা নিয়েছে। মেশিনটা এত উঁচু, এখান থেকে সী ঈলের মাথার নাগাল পেতে পারে। আগেই একটা কনট্রাপশন তৈরি করে রেখেছে, ডাক্ট টেপ দিয়ে সেটা খোলের ভেতরের সারফেসে আটকাল, তারপর নিচে নামতে শুরু করল। নিচের ক্যাটওয়াকে একটা শব্দ হতে দাঁড়িয়ে পড়ল, পরমুহুর্তে লাফ দিয়ে নিজের স্নাইপার পজিশনে ফিরে এল, হাত তুলল গুলি করার জন্যে।

ক্যাটওয়াকে লীনা! হ্যান্ডকাফ পরা। হাত দুটো সামনে, ওটা থেকে একটা লোহার শিকল নেমে এসেছে পায়ের গোড়ালিতে। পিছনে মেনাচিম, লীনাকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে।

গুলি করো, গুলি করো! চিৎকার করছে লীনা। ওরা আমাকে এমনিতেও মেরে ফেলবে।

পরিস্থিতিটা বিবেচনা করছে রানা। সিলিঙে রেখে আসা কনট্রাপশনটার দিকে আড়চোখে তাকাল একবার। রেইলিং থেকে কতটা দূরে রয়েছে ও, সেটাও আন্দাজ করল। তারপর দেখে নিল লীনাই বা রেইলিং থেকে কত দূরে। চীনা ভাষায় কিছু একটা বলল ও, লীনার উদ্দেশে।

ফরওয়ার্ড প্ল্যাটফর্ম থেকে রানার চিৎকার শুনতে পেল ফাউলার, দাঁতে দাঁত ঘষল। মেনাচিম! সাবধান! কিছু একটা করতে যাচ্ছে…

হাতের অস্ত্রটা ওপর দিকে তুলল রানা, চীনা ভাষায় গুনছে, এক…দুই..তিন…

সিলিঙে রেখে আসা হাতে তৈরি বোমায় গুলি করল রানা। কান ফাটানো আওয়াজ হলো, বিস্ফোরণের ফলে খোলের বাইরের একটা অংশও উড়ে গেছে। একই মুহুর্তে নিজের পজিশন থেকে নিখুঁত ডাইভ দিল রানা, পড়ল দুই পনটুনের ঠিক মাঝখানের পানিতে। লীনাও দেরি করেনি। বিস্ফোরণ ঘটায় মেনাচিম হতভম্ব, সেই সুযোগে সে-ও ক্যাটওয়াকের রেইলিং লক্ষ্য করে লাফ

দিয়েছে। কিন্তু মেনাচিম অসম্ভব ক্ষিপ্ৰ বেগে হাত বাড়াল। রেইলিং টপকে নেমে যাচ্ছে লীনা, তার গোড়ালিতে জড়ানো চেইনটা খপ করে ধরে ফেলল সে। তারপর ধীরে ধীরে রেইলিং থেকে নামিয়ে আনল ক্যাটওয়াকে।

গার্ডরা গুলি করছে রানাকে। পানির আরও গভীরে নেমে যাচ্ছে রানা, ওর চারধারের পানিতে আঘাত করছে বুলেটগুলো। দ্রুত সাতার কেটে সী ঈলের নিচ থেকে বেরিয়ে এল ও। পানির ওপর মাথা তুলে বুক ভরে বাতাস নিয়ে দ্রুত চোখ বুলাল চারদিকে। লীনাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে হতাশায় ছেয়ে গেল মনটা। এখন উপায়? লীনাকে ফেলে যাওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়।

বোটটার দিকে আবার এগোল রানা।

ঢাকা, বাংলাদেশ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইমার্জেন্সী কন্ট্রোল রুম। গানবোট থেকে নতুন একটা রিপোর্ট আসছে। স্টাফ অফিসার স্যাটেলাইট ফোনের রিসিভার নামিয়ে রেখে তিন বাহিনী প্রধান ও বিসিআই চীফের দিকে ফিরলেন। গানবোটের রিপোর্ট, স্যার, বললেন তিনি। ওদের রেডারে একটা টার্গেট ধরা পড়েছে। বেয়ারিং ওয়ান ওয়ান টু ডিগ্রী। অত্যন্ত দুর্বল সিগনাল, সঠিক রেঞ্জ বোঝা যাচ্ছে না। তবে গানবোটের ক্যাপটেন শপথ করে বলছেন, এক সেকেন্ড আগেও ওটা ওখানে ছিল না।

টার্গেটের আকৃতি সম্পর্কে কিছু জানা যাচ্ছে না? জানতে চাইলেন নৌ-বাহিনী প্রধান।

ক্যাপটেন বলছেন, এক ধরনের জলযানই হবে। নৌ-বাহিনী প্রধান কিছু বলবেন বলে মনে হলো, তার আগেই বিসিআই চীফ বলে উঠলেন, ব্রিটিশ ফ্ৰিগেট, আমাদের মিগ আর আমাদের গানবোটকে নির্দেশ দিন–ডু নট ফায়ার। রিপিট, ডু নট ফায়ার। গানবোট আর ফ্রিগেটকে বলুন, স্পীড দশ নটে নামিয়ে আনতে হবে।

তিন বাহিনী প্রধান পরস্পরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলেন, তবে এবারও তারা কোন কথা বললেন না। বিসিআই চীফ রাহাত খানকে তাঁরা খুব ভালভাবে চেনেন, তার ওপর তাঁদের আস্থা আছে।

ফাউলার আর কবির ক্যাটওয়াক ধরে ছুটে এসে সী ঈলের মাথার দিকে তাকাল। সিলিঙে তৈরি ফাঁকটার বাইরে কয়েকটা তারাকে মিটমিট করতে দেখা গেল। খোল ভেঙে গেছে, বিড়বিড় করল কবির। যে-কোন রেডার এখন আমাদেরকে দেখতে পাবে।

কবিরের কথা শুনে মাথাটা ঘুরে উঠল, ছুটে ফরওয়ার্ড প্ল্যাটফর্মে বেরিয়ে এল ফাউলার, রাগে কাঁপছে। মেনাচিম! যে কজন লোক লাগে, সবাইকে নিয়ে ফাঁকটা আগে বন্ধ করো, তারপর অন্য কাজ! লীনাকে ধরে থাকা গার্ডদের দিকে ফিরল। সাগরে ফেলে দাও ওকে। কোন ঝুকি নেবে না। আগে গুলি করবে।

ক্যাটওয়াকে ফিরে এসে ইন্টারকমে নির্দেশ দিল, ক্যাপটেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জায়গা ছেড়ে সরে যান!

একজন গার্ড হাতের অস্ত্র তুলে লীনার মাথায় ঠেকাল। দেখতে পেয়ে ফাউলার দাতে দাত চাপল। এখানে নয়, হারামীর বাচ্চা! বটম লেভেলে নিয়ে যা!

লীনার হ্যান্ডকাফ ধরে হ্যাচকা টান দিল গার্ড, তারপর ঠেলে দিল সিড়ির দিকে।

কবিরকে ইঙ্গিত দিলেন ফাউলার, আসুন! ক্যাটওয়াক থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

**

ঢাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইমার্জেন্সী কন্ট্রোল রুম। বাংলাদেশী গানবোট আর ব্রিটিশ ফ্রিগেট থেকে আরেকটা রিপোর্ট এসেছে। রেডারে ক্ষীণ যে টার্গেট ধরা পড়েছে সেটা যে ম্যাডক ফাউলারের সী ঈল, এ-ব্যাপারে তারা এখন প্রায় নিশ্চিত। স্টাফ অফিসার বললেন, আমাদের গানবোটের মিসাইল রেঞ্জের মধ্যে এখনও ওটাকে পাচ্ছে না, তবে কিছুক্ষণের মধ্যে পেয়ে যাবে।

আর ব্রিটিশ ফ্রিগেট? জানতে চাইলেন নৌ-বাহিনী প্রধান।

ওরা এখুনি মিসাইল ছুড়তে পারে, রেঞ্জের মধ্যে পেয়ে যাবে, স্টাফ অফিসার জানালেন।

এবার তিন বাহিনী প্রধানই বিসিআই চীফ রাহাত খানের দিকে তাকালেন তার মতামত শোনার জন্যে। এক সেকেন্ড চিন্তা করে ডেস্ক থেকে লাল টেলিফোনের রিসিভার তুললেন রাহাত খান, কথা বললেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে।

ত্রিশ সেকেন্ড কথা হলো। রিসিভারটা ধীরে ধারে নামিয়ে রাখলেন বিসিআই চীফ। সবাই অপেক্ষা করছেন তিনি কি বলেন শোনার জন্যে।

গানবোটের ক্যাপটেনকে নির্দেশ দিন, স্টাফ অফিসারকে বললেন রাহাত খান। রেঞ্জের মধ্যে পাওয়া মাত্র তিনি যেন মিসাইল ছুড়ে সী ঈলকে ডুবিয়ে দেন। ব্রিটিশ ফ্রিগেটকে নির্দেশ দিন, তারা যেন কোন মিসাইল না ছোড়ে।

তিন বাহিনী প্রধানের চেহারায় পরিস্কার স্বস্তির ছাপ ফুটল।

কিন্তু রাহাত খান পাথর হয়ে গেছেন। মনে মনে জানেন, নির্দেশটা দিয়ে তিনি তার প্রাণপ্রিয় সন্তানতুল্য মাসুদ রানার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছেন।

কবিরকে নিয়ে সী ঈলের ব্রিজে উঠে এল ফাউলার। ক্যাপটেন সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করল, ব্রিটিশ ফ্রিগেট স্পীড কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশী গানবোট এগিয়ে এসেছে। দূরত্ব মাত্র দশ মাইল।

আমাদের রেডার টেকনলজির মাহাত্ব তো এখানেই, বলল কবির। ফাঁকটা বন্ধ হওয়া মাত্র ওরা আমাদেরকে দেখতে পাবে না।

একটা ৪.৫ ইঞ্চি স্টার শেল বিস্ফোরিত হলো সী ঈলের মাথা থেকে অনেকটা ওপরে। ফ্লেয়ার গানের একটা শট-এর মত, তবে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।

কবির মন্তব্য করল, ব্রিটিশ ফ্রিগেট পিছিয়ে পড়লেও, স্টার শেল ছুঁড়ে বাংলাদেশী গানবোটকে সাহায্য করছে ওরা।

খেপে গিয়ে ক্যাপটেনকে নির্দেশ দিল ফাউলার, মিসাইল ছুঁড়ুন! মিসাইল ছুঁড়ুন!

টার্গেট ব্রিটিশ ফ্ৰিগেট, স্যার? ক্যাপটেন হতভম্ব।

আবার জিজ্ঞেস করে! একবার তো বললাম! গর্জে উঠল ফাউলার।

বিকট একটা বিস্ফোরণ সী ঈলকে কাপিয়ে দিল। গানবোটের রেডারে যেহেতু এখন সী ঈল দেখা যাচ্ছে, ওটা থেকে এখন হাই এক্সপ্লোসিভ শেল ছুড়ছে গানাররা।

চোখ ধাধানো সাদা আলোয় সী ঈলকে এখন পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। এমনকি রানাও সী ঈলের প্রকাণ্ড আকৃতি দেখে বিস্মিত না হয়ে পারল না। আলো থাকায় বোটে আরও দ্রত উঠতে পারছে।

সী ঈল পালাচ্ছে না, ফুল স্পীডে এঁকেবেঁকে সামনের দিকেই ছুটছে। ফাউলারের স্ক্রুরা শর্ট রেঞ্জের মিসাইল ছুড়তে অভ্যস্ত হলেও, আগে কখনও ক্রুজ মিসাইল ছোড়েনি। ওঅরহেড ফিট করা কোন মিসাইল ছোড়ার অভিজ্ঞতাও তাদের নেই। ফাউলারকে আগেই তারা জানিয়ে দিয়েছে, সী ঈল টার্গেটের খুব কাছাকাছি না পৌঁছুনো পর্যন্ত ক্রুজ মিসাইল ছুড়ে কোন লাভ নেই। অন্তত তারা কোন নিশ্চয়তা দিতে পারবে না যে টার্গেটে ওটা আঘাত হানবে।

সী ঈলের মাথায় তৈরি ফাঁকটার ওপর চোখ রেখে ওপরে উঠছে রানা। এই সময় সা ঈলের ঠিক পিছনের পানিতে একটা শেল বিস্ফোরিত হলো। মস্ত একটা ঢেউ ছুটে এসে আছড়ে পড়ল ওর গায়ে। এক মিনিট পর আলোর এক জোড়া ঝলক ছুটে গেল সী ঈলের পনটুন থেকে দুটো অ্যান্টিশিপ মিসাইল ছোড়া হয়েছে। এক মুহুর্ত পর ঝট করে মাথা নিচু করল রানা, সরাসরি ওর মাথার ওপর দিয়ে আরও দুটো মিসাইল ছুটে গেল।

ম্যাডক ফাউলার যে সত্যিই বদ্ধ এক উন্মাদ, এখন আর তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশী গানবোটকে নয়, সী ঈলের ক্রুরা ব্রিটিশ ফ্রিগেটকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছুঁড়ছে। কিংবা হয়তো টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্যে সরাসরি ঢাকার দিকে। ব্যাপারটা রানা ধরতে পারল মিসাইলগুলোর যাত্রা পথ লক্ষ্য করে। বাংলাদেশী গানবোট বা ব্রিটিশ ফ্রিগেট খুব বেশি হলে সী ঈলের কাছ থেকে দশ থেকে পনেরো মাইল দূরে আছে। কিন্তু মিসাইলগুলো এত দূরের পথ পাড়ি দিচ্ছে, যেন তিনশো বা সাড়ে তিনশো মাইল দূরের কোন টার্গেটে আঘাত হানবে।

<

Super User