পরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলো ওরা। কাজে লেগে গেল। বিমানটা মেরামত করতে গেল ওমর, কিশোর আর মুসা। ধাতুর পাত কেটে টুকরো করে ফুটোটা বন্ধ করবে। ডজ, ঝিনুক আর সাগরের হাসি গেল ঝিনুকগুলো খুলে দেখতে। পানির ধার থেকে দূরে সৈকতের ওপরে বসে খুলতে শুরু করল ওরা। মাঝে মাঝে শোনা যেতে লাগলো ওদের চিৎকার, মুক্তো পেলেই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠছে।

ভালই কাটলো দিনটা। বিকেলের শেষে আকাশের নীল যখন মলিন হয়ে এলো, মেরামতের কাজ তখন শেষ করে এনেছে ওমররা। আর মাত্র কয়েকটা ঝিনুক খোলা বাকি ডজদের। প্রথম দিনের মত এত ভাল আর বেশি ঝিনুক পাওয়া গেল না, তবে মন্দ পায়নি। ঝিনুকগুলো ঠিকমত পচার সময় পায়নি, নরম হয়নি, ফলে খুলতে সময় লাগছে।

সব মিলিয়ে ঝুড়ি না ভরলেও ডজের হ্যাটের অর্ধেকটা যে ভরা যাবে মুক্তো দিয়ে তাতে সন্দেহ নেই। নতুন সরঞ্জাম কিনে নিয়ে এসে খেতের বাকি ঝিনুকগুলোও সাবাড় করে দিয়ে যাবার ইচ্ছেটা তার একটুও কমলো না, বরং বাড়লো।

মুক্তোগুলো সব একসাথে রাখতে রাখতে ডজ বললো, তোমরা গিয়ে কিছু মাছ ধরে আনলে পার। খাওয়া যেত।

কাছে এসে দাঁড়িয়েছে কিশোর। হেসে বললো, প্রতি বেলাতেই যে হারে মাছ খাচ্ছি, শেষে না মাছের গন্ধই বেরোতে শুরু করে গা দিয়ে।

বড়শি নিয়ে রওনা হলো সাগরের হাসি আর ঝিনুক। কিশোরও তাদের সঙ্গে চললো।

পশ্চিমের আকাশে বিচিত্র রঙ। প্রশান্ত মহাসাগরের অপরূপ সূর্যাস্তের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ ওমর। তারপর চোখ ফেরালো আবার জায়গাটার দিকে, যেখানটা মেরামত করেছে। শেষবারের মত পরীক্ষা করে দেখলো সব ঠিক আছে কিনা। ককপিটে এসে ইনস্ট্রমেন্ট বোর্ডের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল দৃষ্টি। বেরিয়ে দ্রুত চলে এলো ডজের কাছে। মুসাও তখন ওখানে।

কি ব্যাপার? ওমরের মুখ দেখেই আন্দাজ করে ফেলেছে ডজ, খারাপ খবর আছে।

ব্যারোমিটারের রিডিং ভাল না, জানালো ওমর।

আকাশের দিকে তাকালো ডজ। কই, ভালই তো আবহাওয়া। খারাপ লাগছে না।

আকাশ-ফাঁকাশ দেখে বোঝা মুশকিল। রিডিং তিরিশের নিচে নেমে গেছে। পড়ছেই।

চমকে গেল ডজ। কী!

মাথা ঝাঁকাল ওমর। গিয়ে দেখ বিশ্বাস না হলে।

তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো ডজ। ব্যারোমিটার দেখতে গেল না। বললো, জলদি গোছগাছ করে নিতে হবে। যেরকম নামছে বলছো, বড় রকমের ঝড় আসবে। এখনি উড়তে হবে।

পারা যাবে না।

কেন?

জোয়ার না এলে পানিতে নামানো যাবে না প্লেনটাকে।

এতক্ষণ থাকা যাবে না। ঠেলেঠুলে নামাতে হবে। রাটুনায় গিয়ে পৌঁছতে পারলে যত বড় ঝড়ই আসুক, কিছু করতে পারবে না আমাদের। কিন্তু এখানে থাকলে পাঁচ মিনিটে ভর্তা বানিয়ে ফেলবে প্লেনটাকে চল।

ফুরফুর করে বাতাস বইছে। মনে হয় খুব ভাল, আসলে তা নয়। ইতিমধ্যেই লেগুনের বাইরে দেয়ালের গায়ে বড় হয়ে আছড়ে পড়তে শুরু করেছে ঢেউ। বজ্রের মত গর্জন করছে, আর সেই সাথে অনেক ওপরে ছিটিয়ে দিচ্ছে পানির কণা।

আরও আগেই বোঝা উচিত ছিলো আমার, বিড়বিড় করলো ডজ।

এখন আর ভেবে লাভ নেই। চল দেখি নড়ানো যায় নাকি। মুসার দিকে ফিরে ওমর বললো, জলদি ওদের ডেকে নিয়ে এস। মাছ আর লাগবে না।

দৌড় দিলো মুসা। জরুরী অবস্থা এখন।

বিমানের নাকের কাছটায় রইলো ওমর। ঠেলতে লাগলো। নড়লও না বিমান। যেন বালিতে শেকড় গজিয়ে গেছে ওটার। পানির দিকে তাকিয়ে বললো, জোয়ার অবশ্য এসে গেছে। আর দশ মিনিট পরেই ভাসিয়ে ফেলবে। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললো, আল্লাহ! দেখতে দেখতে কি কান্ড হয়ে গেল!

ঢোকার মুখটা দেখুন না! মুসা বললো।

লেগুনে ঢোকার প্রণালীটাতে এখন আর পানি আছে বলে মনে হয় না। শুধু ফেনা। পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে। হ্যাঁ, হয়ে গেছে কাজ! ডজ বললো। আসছে। আর কোনই সন্দেহ নেই।

দশ মিনিটের মধ্যেই রওনা হতে না পারলে, উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ওমর বললো। রাটুনায় পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। ঝড়ের মধ্যে অন্ধকার সাগরের ওপর দিয়ে ওড়ার সাহস নেই আমার। রাটুনায় ল্যান্ডিং লাইটও নেই যে আলো দেখে নামতে পারব। সময় থাকতে এখানে একটা জায়গা খুঁজে বের করা দরকার, যেখানে একটু আশ্রয় মিলবে।

কিছু বলছে না ডজ। তাকিয়ে রয়েছে সাগরের দিকে।

পায়ের শব্দে ফিরে তাকাল ওমর। মুসা ফিরে এসেছে, একা।

ওরা কোথায়? জানতে চাইলো ডজ। আমরা এখুনি রওনা হব।

পেলাম না, জবাব দিলো মুসা।

পেলে না মানে? যাবে কোথায়? দ্বীপেই আছে।

সারাটা দ্বীপ খুঁজে এসেছি। ওরা নেই। কিশোরের জুতো পেয়েছি, আর বড়শি দিয়ে ধরা কিছু মাছ। ওদের চিহ্নও নেই।

জুতো কোথায় পেলে?

এই তো, কাছেই। প্রবালের ওপর পড়ে ছিলো। একটা খাড়ির ধারে।

ডজের দিকে তাকালো ওমর। ব্যাপারটা কি? গেল কোথায়?

মাথা নাড়লো ডজ। বুঝতে পারছি না। ক্ষতি হবে না কিশোরের। সাগরের হাসি আর ঝিনুক রয়েছে তার সঙ্গে। এসময় কি করতে হবে ভাল করেই জানে ওরা।

জানলেই ভাল। কিন্তু কথা হল, ওদেরকে না নিয়ে তো যেতে পারছি না আমরা। প্লেনটা ভাসিয়ে রাখি। তৈরি হয়ে থাকি। ওরা এলেই রওনা দেব।

পনের মিনিট পেরিয়ে গেল। টকটকে লাল হয়ে উঠেছে পশ্চিমের আকাশ। তার ভেতরে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। কেমন যেন রহস্যময় লাগছে দৃশ্যটা। ভয় ভয় করে। ইতিমধ্যেই দিগন্ত রেখার নিচে অনেকখানি নেমে গেছে সূর্য, যেন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

অবশেষে যেন টুপ করে ডুবে গেল। অন্ধকার নামতে শুরু করলো।

গেল! হাত নেড়ে বলল ওমর। আজকে ফেরার আশা শেষ। রাতে আর পারব না। কিন্তু ওরা গেল কোথায়? আর তো চুপ করে থাকতে পারছি না।

প্লেনটার একটা ব্যবস্থা করা দরকার। রীফের দিকে হাত তুলে দেখালো মুসা। এখুনি কিছু করতে না পারলে সর্বনাশ করে দেবে।

এই প্রথমবার দেখলো, প্রবালের দেয়াল ছাপিয়ে লেগুনে ঢুকতে আরম্ভ করেছে সাগরের পানি। ঢেউ এসে ঝাপিয়ে পড়ছে ওপাশে, ঠেলে পানি ঢুকিয়ে দিচ্ছে লেগুনের ভেতর, ফলে ভেতরেও ঢেউ উঠছে এখন। পানি ফুলে ওঠায় বিমানটাও ভেসে উঠেছে। ভীষণ দুলছে।

নোঙরে ভার বেঁধে দেয়া দরকার, ওমর বললো। তাহলে দুলুনি কিছুটা কমতে পারে।

সত্যি সত্যি যদি ঝড় আসে, এক ডজন নোঙর বাঁধলেও লাভ হবে না, ডজ বললো। ছিড়ে নিয়ে চলে যাবে। চোখের পলকে।

জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেললো ওমর। সেজন্যে তো হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। কিছু একটা করতেই হবে। বড় বড় প্রবালের চাঙড় এনে নাক আর লেজের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে রাখব। নোঙরের কাজ করবে।

এটা অবশ্য করা যায়, ডজ বললো। টিকবে বলে মনে হয় না। তবু, চেষ্টা করি।

মুসা, আরেকবার গিয়ে দেখ কিশোরদেরকে পাও কিনা। আমি আর ডজ কাজটা সেরে ফেলি।

মাথা ঝাঁকিয়ে তাড়াহুড়া করে রওনা হয়ে গেল মুসা।

আধ ঘণ্টা পরেই ফিরে এল। ততক্ষণে ছয়টা নোঙর বেঁধে ফেলা হয়েছে বিমানের, ভাল সময়ে এর যে কোন একটাই বিমানকে আটকে রাখতে যথেষ্ট। পেলাম না, মুসা জানালো। কিশোরের জুতো আগের জায়গাতেই পড়ে রয়েছে। সাঁতার কাটতে নেমেছিলো মনে হয়। ওমর ভাই, ভয় লাগছে আমার। কিছু হলো তো?

একটা মুহূর্ত নীরব হয়ে রইলো ওমর। হ্যাঁ, ধীরে ধীরে বললো সে। কিছু একটা হয়েছে। নইলে ফিরে আসতো। পানিতেই কোন একটা ব্যাপার ঘটেছে। ডুবে মরেছে, এটা ভাবতে পারছি না। তবে কোন ভাবে বাইরের সাগরে গিয়ে পড়লে কি হবে বলা যায় না। ঢেউয়ের টানে ভেসে চলে যেতেই পারে।

তাহলে তো আরও অনেক কিছুই ঘটতে পারে, বললো ডজ। হাঙরে ধরে খেয়ে ফেলতে পারে…

তা পারবে না, বাধা দিয়ে বললো ওমর। একজনকে হয়ত খেতে পারে, একসঙ্গে তিনজনকে সম্ভব না। বিশেষ করে ঝিনুক আর সাগরের হাসিকে। ওই একটা ঘটনাই ঘটে থাকতে পারে। দেয়ালে চড়েছিল হয়ত কিশোর। ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়েছে তাকে। বাঁচানোর জন্যে লাফিয়ে পড়েছে তখন সাগরের হাসি আর ঝিনুক। ওরাও ভেসে গেছে। ঢেউয়ের জন্যে এখন আর ফিরতে পারছে না। এক মুহূর্ত ভাবল সে। অন্ধকার না হলে উড়ে গিয়ে দেখতে পারতাম। কিন্তু এখন প্লেন নিয়ে ওঠাই যাবে না। উঠলে আর নামতে পারবো না। যা ঢেউ, নামতে গেলেই বাড়ি মেরে উল্টে ফেলবে। এক মিনিট লাগবে ডোবাতে।

বিশাল ঢেউয়ের ভারি গর্জন যেন সমর্থন করল ওমরের কথা। ভয়ংকর গতিতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দেয়ালের গায়ে, তার আঘাতে কাঁপছে এখন দ্বীপটা। বাতাসের বেগ বাড়ছে। নারকেলের পাতা ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়েছে।

এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই, ওমর বললো।

করবটা কি তাহলে? বিড়বিড় করলো ডজ। কিছু তো করা দরকার। চুপ থাকতে পারি না।

চল, সবাই মিলে আরেকবার খুঁজি, গম্ভীর হয়ে বললো ওমর। ফল হবে বলে মনে হয় না। মুসা, তুমি পুবে যাও। ডজ মাঝখানটায় গিয়ে খোঁজ। আমি যাচ্ছি পশ্চিম দিকে।

আলাদা হয়ে খুঁজতে বেরোল তিনজনে। কিশোর আর দুই পলিনেশিয়ানের নাম ধরে জোরে জোরে ডাকছে।

ঘণ্টাখানেক পরে আগের জায়গায় ফিরে এসে ওমর দেখলো, মুসা আর ডজ দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করতে হলো না, ওদের মুখ দেখেই যা বোঝার বুঝে নিলো। আর কিছু করার নেই আমাদের, তিক্ত কণ্ঠে বললো সে। সকালের জন্যে বসে থাকতে হবে। ঝড় যদি থামে, আর প্লেনটা আস্ত থাকে তাহলে আরেকবার খুঁজতে বেরোব আরকি। থমথম করছে তার মুখ। আল্লাই জানে ওদের কি হলো!

ধীরে ধীরে কাটছে সময়।

মুসার মনে হলো কয়েক শো বছর পরে অবশেষে হালকা হয়ে এলো পুব আকাশের অন্ধকার। ভোর যতই এগিয়ে এলো, বাড়তে থাকলো-ঝড়ের বেগ। দেয়ালের ওপর দিয়ে পানি পাঠাতে আর চেষ্টা করতে হচ্ছে না এখন ঢেউকে, আপনাআপনিই ঢুকে পড়ছে। সাগর আর লেগুন এখন প্রায় এক হয়ে গেছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও নীরব আর শান্ত ছিলো যে সৈকত সেখানে এখন ঢেউ আছড়ে ভাঙছে। বাঁধা গরুর মতো দড়ি টানাটানি করছে বিমানটা, যেন দড়ি ছিড়ে পালাতে চাইছে।

আরেকটু জোর বাড়লে টিকবে না, ওমর বললো। ব্যারোমিটারটা দেখে আসিগে। কোমর পানিতে ভিজে এসে অনেক কায়দা কসরৎ করে বিমানে উঠলো সে। ককপিটে ঢুকলো। ইনট্রুমেনটস বোর্ড দেখে ফিরে এসে নামলো আবার পানিতে। কিংবা বলা যায় পানিতে ছুঁড়ে ফেলা হলো তাকে।

কি দেখলে? জিজ্ঞেস করলো ডজ।

উনত্রিশ।

ভাল। এসেই গেল তাহলে।

এখন উড়তে না পারলে আর কোনদিনই পারব না। লেগুনের দিকে হাত তুললো ওমর। অবস্থা দেখেছ। আরেকটু পরেই বাইরের সঙ্গে এর কোন তফাৎ থাকবে না। মহাবিপদে পড়ে গেলাম। কিশোররাও ফিরল না। এই ডজ, কি করি?

যাওয়াই উচিত, গলায় জোর নেই ডজের। ঝড় থামলে আবার ফিরে আসা যাবে। খুঁজতে হবে ওদের। আর বসে থেকে এখন প্লেনটাই যদি ভেঙে যায়, আমরাও ফিরতে পারবো না। ওরা এলে ওরাও পারবে না। মোটকথা সবাই আটকা পড়বো তখন।

বেশ, ওঠ গিয়ে, ওমর বললো। খুব সাবধান। যে হারে টানে পানি, পা ফসকে ভেসে গেলে আর আসতে পারবে না।

একজন আরেকজনের হাত ধরে একটা শেকল তৈরি করলো ওরা। পানির টানের সঙ্গে লড়াই করতে করতে কোনমতে যেন নিজেদেরকে টেনে তুললো বিমানে। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল ওমর। ইঞ্জিন, ঢেউ, বাতাস আর নারকেল পাতার মিলিত শব্দকে ছাপিয়ে চিৎকার করে বললো, দড়ি কেটে দাও! কণ্ঠস্বরটা নিজের কানেই বেখাপ্পা শোনালো। ডজ, আগে সামনেরগুলো কাট। মুসা, তুমি পেছনে যাও। আমি না বললে কাটবে না। সাবধান।

এমনিতেই টান টান হয়ে আছে দড়ি। ডজ ছুরি ছোঁয়াতে না ছোঁয়াতেই আলাদা হয়ে গেল। এক হ্যাচকা টানে বিমানটাকে সরিয়ে নিয়ে গেল ঢেউ। এমন টানতে শুরু করলো, যেন লেজ ছিড়েই নিয়ে চলে যাবে। থ্রটল দিলো ওমর। চেঁচিয়ে বললো, মুসা, কাট।

চাবুকের মত লাফিয়ে উঠলো কাটা দড়ির মাথা। গায়ে বাড়ি লাগলে চামড়া উঠে যেত। সরে এল সে। সাংঘাতিক দুলে উঠল বিমান। মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল মুসা। পড়েই থাকলো। দাঁড়ানোর চেয়ে এটা সহজ।

ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ছুটতে শুরু করেছে বিমান। সামনে পানির ছিটে ফোয়ারার মত হয়ে এসে ককপিটের জানালায় লাগছে। এর ভেতর দিয়ে কিছু দেখাই মুশকিল। অনুমানের ওপরই সামনে ছোটালো ওমর। কোন ভাবে এখন দেয়ালে বাড়ি লেগে গেলে সব শেষ। পর পর দুই বার ঢেউয়ের খাঁজে পড়ল বিমান, যেন হঠাৎ করে শূন্য থেকে নিচে এসে পড়লো। ধক করে উঠলো ওমরের বুক। মনে হলো, এই বুঝি বাড়ি লাগল দেয়ালে। তবে নিতান্ত অলৌকিক ভাবেই যেন বেঁচে গেল দুবারই।

ঢেউয়ের মাথায় উঠে সারতেও পারলো না বিমানটা, নাকের ওপর এসে ভেঙে পড়লো আরেকটা ঢেউ। চুবিয়ে মারতে চাইছে। ঘোরানোর চেষ্টা করলো ওমর। কিছু করতে পারলো না। নিয়ন্ত্রণ নাগালের বাইরে চলে গেছে। তবে কয়েকটা মুহূর্তের জন্যে। আবার সাড়া দিলো বিমানের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। ততক্ষণে আরেকটা ঢেউয়ের খাজে নেমে পড়েছে বিমান। ঢেউয়ের দিকে আর নাক না ঘুরিয়ে দুটো ঢেউয়ের মাঝের খাঁজ দিয়ে তীব্র গতিতে ট্যাক্সিইং করে ছুটলো ওটা। দ্রুত কমে যাচ্ছে মাঝের ফাঁক। বুঝতে অসুবিধে হলো না সাগরের দিক থেকে গড়িয়ে আসছে আরেকটা ঢেউ। যদি বিমানের পিঠে ভেঙে পড়ে, তাহলে আর বাঁচতে হবে না। মরিয়া হয়ে জয়স্টিক ধরে টান দিলো ওমর। ওড়ার এটাই শেষ সুযোগ।

মাতাল হয়ে গেছে যেন বিমানটা। ঢেউয়ের কথা শুনবে, না ইঞ্জিনের বুঝতে পারছে না। অবশেষে টলমল করে যেন ওড়ারই চেষ্টা করলো। মায়া কাটালো পানির। ফ্লোটের গায়ে এসে বাড়ি মারলো ঢেউ। কাঁপিয়ে দিলো বটে, তবে রুখতে পারলো না বিমানটাকে। জোর করতে পারলো না। মস্ত একটা উড়ুক্কু মাছের মত যেন ঢেউয়ের নিচ থেকে লাফ দিয়ে বেরোল ফ্লাইং বোট। ককপিটের জানালায় এসে পড়লো পানির ফোয়ারা। সামনের সব কিছু চোখের আড়াল করে দিল ক্ষণিকের জন্যে।

চেপে রাখা দমটা ফোঁস করে ছেড়ে সীটে হেলান দিলো ওমর। সীট বেল্টের বাঁধন শক্ত করলো। রাটুনার দিকে কোর্স ঠিক করলো বটে, তবে সরাসরি যেতে পারছে একথা বলা যাবে না। কারণ সরাসরি সেদিক থেকেই ধেয়ে আসছে বাতাস। নাকটা কোণাকোণি করতে বাধ্য হলো সে। তারমানে দ্বীপের দিকে না গিয়ে চলে যাবে খোলা সাগরের দিকে, এই পথে চললে। চট করে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো ব্যারোমিটারে। সাড়ে আটাশ।

রাটুনা দেখা গেল। শাদা হয়ে গেছে সাগর। তার মাঝে যেন ফ্যাকাসে সবুজ মরুদ্যান। আতঙ্কিত হয়ে ল্যান্ড করার জায়গা খুঁজলো সে। শাদা আর সবুজের মাঝখানে এক জায়গায় সরু এক চিলতে পানি দেখা গেল, সাগরের সঙ্গে যেটার রঙের অমিল রয়েছে। নিশ্চয় ওটাই লেগুন। দেয়াল ডিঙিয়ে এখনও সাগরের ঢেউ ঢুকতে পারেনি ওখানে।

সেদিকেই চললো ওমর। লেগুনের ওপরে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। বাইরে সাগরের তুলনায় একেবারে শান্ত রয়েছে ওখানকার পানি, বলা চলে। বাতাসে উড়ছে নারকেলের ছেড়া পাতা। অনেক পাতা এসে পড়েছে পানিতে। সরের মত ভাসছে। কতটা পুরু হয়ে, বোঝা কঠিন। বেশি পুরু হলে বাড়ি লেগে ফ্লোটের ক্ষতি হতে পারে। তবে এখন আর বিমান বাঁচানোর কথা ভাবছে না ওমর, নিজেদের বাঁচার কথা ভাবছে। রাটুনায় যখন একবার পৌঁছতে পেরেছে, ঝড় থামলে ডজ আইল্যান্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেই।

কোথায় নামাবে জায়গা বাছাই করে নিলো সে। গতিবেগ একটুও কমলো না, পুরো খুলে রেখেছে থ্রটল। পানিতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো যেন বিমান। সঙ্গে সঙ্গে ঝটকা দিয়ে ঘুরে গেল একপাশে। নারকেল পাতার স্তূপ আঁকড়ে ধরেছে ওদিকের উইং ফ্লোট। কয়েক গজ এগোতে এগোতেই অন্য ফ্লোটটাকেও ধরল। থামাতে পারলো না। টেনেহিচড়ে আরও কয়েকগজ গিয়ে তারপর থামল বিমান।

আরও গজ বিশেক যেতে পারলে নামা যেত। তীরের কাছাকাছি, পানি আছে, তবে মাটি নাগাল পাওয়া যাবে।

ইঞ্জিন বন্ধ করে অন্য দুজনের দিকে ফিরলো ওমর। মনে হচ্ছে কিছু সময় থাকতে হবে এখানে। তা নাহয় থাকলাম, আসল বিপদ কাটিয়ে এসেছি। কিশোরদের জন্যে ভয় লাগছে এখন।

ঝড় থামলে না হয় গিয়ে দেখা যেত, ভীষণ মুষড়ে পড়েছে মুসা। তার কণ্ঠস্বরেই বোঝা যাচ্ছে। কিশোর মারা গেছে, এটা বিশ্বাস করতে পারছে না সে। ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সাগরের হাসি আর ঝিনুক থাকতে, এটাও বিশ্বাস করে না। তাহলে হলোটা কি?

এখানে থাকার চেয়ে চল গাঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, ডজ বললো। ঝড় থামলে লোক নিয়ে এসে পাতা কেটে প্লেনটা বের করে দ্বীপে যাব আবার। মুসা, ভয় পেয়ো না। সাগরের হাসি আর ঝিনুক থাকতে কিশোর মরতে পারে না। নিশ্চয় কোথাও নিরাপদেই আছে ওরা। আমাদের অজানা কোনখানে।

এই ঝড়ের মধ্যে নামবে? ওমরের প্রশ্ন। শুনেছি, ঝড়ের সময় কামানের গোলার মতো নারকেল ওড়ে এসব অঞ্চলে। মাথায় লাগলে ছাতু বানিয়ে দেবে।

তাই তো! ভুলে গিয়েছিলাম। বাতাস না কমলে বেরোনো যাবে না।

ঠিক আছে, বসেই থাকি। সীটে হেলান দিলো ওমর। পাতায় ঢেকে যাবে আরকি আমাদের ওপরটা। তা যাক। ভাল কথা, মুক্তোগুলো কোথায় রেখেছ?

মুক্তো! চোখ মিটমিট করলো ডজ। তুমি আননি? আমার কি আনার কথা নাকি?

দেখার মত হলো ডজের চেহারা। মাথা নাড়তে নাড়তে বিড়বিড় করে বললো সে, আগেই বলেছি, আমি একটা হতভাগা! পোড়া কপাল! মুক্তো কি আর আমার মত লোকের কপালে সইবে! দুহাতে মাথা চেপে ধরলো সে। রয়ে গেছে দ্বীপেই। পাথরের নিচে যেখানে রেখেছিলাম।

ঘুরতে ঘুরতে এসে মাথার ওপরে হাতে পড়লো একটা নারকেল পাতা।

বাহ, চমৎকার! এভাবে পড়তে থাকলে ছাতটাও কতক্ষণ সহ্য করতে পারবে আল্লাহই জানে! ওমরের কণ্ঠে সন্দেহ।

<

Super User