পাহাড় বেয়ে নেমে খামারের দিকে এগিয়ে গেল দুজন পুলিশ। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো ছেলেমেয়েরা। রাফিও দুপায়ের ফাঁকে লেজ ঢুকিয়ে দিয়ে চেয়ে রয়েছে। সে জানে না কি হয়েছে, কিন্তু বুঝতে পারছে খারাপ কিছু ঘটেছে।

এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আর লাভ নেই, কিশোর বললো। প্রজাপতি মানবদের কাছে কিছু পাবে না। মথ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়বে না ওদের। সামনে দিয়ে হাতি হেঁটে গেলেও না।

যাবার জন্যে সবে ঘুরেছে ওরা, এই সময় কানে এলো তীক্ষ্ণ চিত্তার। থমকে দাঁড়য়ে কান পাতলো সবাই। নিশ্চয় মিসেস ডেনভার, মুসা বললো। তার আবার কি হলো?

চলো তো দেখি, বলে এগোলো কিশোর। তার পেছনে সবাই এগিয়ে চললো কটেজের দিকে।

কাছে এসে শুনতে পেলো একজন পুলিশের গলা। বলছে, আহহা, এতো ভয় পাচ্ছেন কেন? আমরা শুধু কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছি।

যাও! ভাগো! তীক্ষ্ণ কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো আবার বৃদ্ধা। কাঠির মতো সরু হাতটা নাড়ছে জোরে জোরে। তোমরা এখানে কিজন্যে এসেছো? যাও, যাও!

শুনুন, মা, শান্তকণ্ঠে বোঝানোর চেষ্টা করলো আরেকজন, আমরা মিস্টার ডাউসন আর মিস্টার ডরির সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। তারা কি নেই?

কে? কার কথা বললে? ও, পাগল দুটো। বেরিয়ে গেছে, জাল নিয়ে, মহিলা বললো। আমি ছাড়া আর কেউ নেই এখন। অপরিচিত লোক দেখলে আমি ভয় পাই। যাও, যাও।

শুনুন, বললো আরেকজন, মিস্টার ডাউসন আর মিস্টার ডরি কাল রাতে পাহাড়ে কোথায় গিয়েছিলো বলতে পারবেন?

রাতে তো আমি ঘুমাচ্ছিলাম। কি করে বলবো? যাও। আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও?

পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিরাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো দুই পুলিশ। মহিলাকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। কিছু জানা যাবে না।

বেশ, যাচ্ছি আমরা, একজন আলতোভাবে বৃদ্ধার কাঁধ চাপড়ে দিলো। অযথাই ভয় পেয়েছেন। ভয়ের কিছু নেই তো।

ওদের সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেল কিশোরদের। কিশোর বললো, মহিলার চিৎকার শুনে দেখতে এলাম কি হয়েছে।

জাল নিয়ে বেরিয়ে গেছে তোমাদের প্রজাপতি মানব, বললো একজন পুলিশ, দুজনেই। আজব লোক, আজব জীবন! এতোসব কিলবিলে খুঁয়াপোকার মাঝে যে কি করে বাস করে…করুক, যেভাবে খুশি। হ্যাঁ, যা বুঝতে পারছি, কাল রাতে বোধহয় ওরা কিছু দেখেনি। আর দেখার আছেই বা কি? দুজন পাইলট দুটো প্লেন উড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে। এটা দেখলেই বা কার সন্দেহ হবে?

তবে ওই দুজনের একজন যে আমার ভাই জ্যাক নয়, এ-ব্যাপারে আমি শিওর, জনি বললো।

শ্রাগ করলো লোক দুজন। তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল।

আবার পাহাড়ের ঢালে এসে উঠলো ছেলেমেয়েরা। নীরব। অবশেষে কথা বললো কিশোর, কিছু খাওয়া দরকার। লাঞ্চের সময় পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। জনি, এসো, আমাদের সাথেই খাও।

না ভাই, আমি কিছুই মুখে দিতে পারবো না।

ক্যাম্পে ফিরে রবিন আর জিনাকে খাবার বের করতে বললো কিশোর। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে সবারই, জনি বাদে। জোর করে তার হাতে একটা স্যাণ্ডউইচ তুলে দিলো মুসা। সেটা চিবানোর চেষ্টা করতে লাগলো জনি।

অর্ধেক খাওয়া হয়েছে, এই সময় চিৎকার শুরু করলো রাফি। কে এলো দেখার জন্যে ফিরে তাকালো সবাই। কিশোরের মনে হলো, নিচে একটা ঝোপের ভেতরে কি যেন নড়লো। তাড়াতাড়ি ফীল্ডগ্নাস বের করে চোখে লাগালো সে।

মনে হয় মিস্টার ডাউসন, দেখতে দেখতে বললো কিশোর। জাল দেখতে পাচ্ছি। প্রজাপতি ধরছেন বোধহয়।

ডাকি, কি বলো? মুসা বললো। তাকে জানাই, মিলিটারি পুলিশেরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলো।

গলা চড়িয়ে ডাকলো কিশোর।

সাড়া এলো।

আসছেন, বললো মুসা।

মিস্টার ডাউসনকে এগিয়ে আনতে গেল রাফিয়ান। ঢাল বেয়ে উঠে এলেন প্রজাপতি মানব, পরিশ্রমে হাঁপ ধরে গেছে।

তোমাদের কাছেই আসছিলাম, ডাউসন বললেন। বনেবাদাড়ে ঘোরাঘুরি করো, হয়তো চোখে পড়ে যেতে পারে, সেকথা বলতে। সিনাবার মথ, দেখলেই আমাকে খবর দেবে। পারলে ধরে নিয়ে যাবে কটেজে। দেখতে কেমন বলে দিচ্ছি। পাখার নিচটা…।

চিনি, বাধা দিয়ে বললো কিশোর। একটু আগে দুজন মিলিটারি পুলিশ গিয়েছিলো আপনার সাথে কথা বলতে। কাল রাতে কোথায় ছিলেন, জিজ্ঞেস করার জন্যে। ভাবলাম, মিসেস ডেনভার তো বুঝিয়ে বলতে পারবে না, আমরাই বলি।

শূন্য দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকালেন ডাউসন। মিলিটারি পুলিশ গিয়েছিলো আমার বাড়িতে?

হ্যাঁ, কাল রাতে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েছে কিনা আপনার জিজ্ঞেস করার জন্যে। মথ শিকারে বেরিয়েছিলেন তো তখন। দুটো এরোপ্লেন…

তাকে কথা শেষ করতে দিলেন না ডাউসন। মথ শিকারে। আমি বেরিয়েছিলাম? পাগল নাকি। ঝড় আসছিলো তখন। শুধু আমাদের এই এলাকা কেন, দুনিয়ার কোনো অঞ্চলেই ওরকম সময়ে মথ বেরোয় না। রাতের বেলা হলেও না। আবহাওয়া খারাপ হলে মানুষের অনেক আগেই বুঝতে পারে ওরা।

ডাউসনের কথা শুনে অবাক হলো কিশোর। কিন্তু আপনার বন্ধু ডরি যে বললো, দুজনেই মথ শিকারে বেরিয়েছেন?

এবার ডাউসনের অবাক হওয়ার পালা। ডরি? কাকে দেখতে কাকে দেখেছো! ও তো আমার সাথেই ছিলো বাড়িতে। দুজনে মিলে নোট লিখেছি।

চুপ হয়ে গেল কিশোর। ভাবছে। ব্যাপার কি? মিস্টার ডাউসন কি কিছু ধামাচাপা দিতে চাইছেন? কাল রাতে যে বেরিয়েছিলেন কোনো কারণে স্বীকার করতে চাইছেন না?

দেখুন, স্যার, শেষে বললো সে, কাল রাতে আমি মিস্টার ডরিকেই দেখেছিলাম। অন্ধকার ছিলো বটে, কিন্তু জাল আর চোখের চশমা লুকাতে পারেনি। কালো কাচের চশমা।

ডরি কালো কাচের চশমা পরে না, আরও অবাক হয়ে বললেন ডাউসন। কি সব আবল-তাবল বকছে!

না, স্যার, আবল-তাবল নয়, এবার কথা বললো মুসা। কাল নিজের চোখে দেখে এসেছি তাকে, কালো কাচের চশমা পরতে। একটা প্রজাপতি ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম, বিকেলে। আমাদের কাছ থেকে ওটা নিয়ে একটা ডলার দিলো।

তোমাদের মাথা খারাপ! নাকি ইয়ার্কি মারছো আমার সঙ্গে! রেগে গেলেন ডাউসন। অযথা সময় নষ্ট! আমার বন্ধু, আমি জানি না? ডরি কালো কাঁচের চশমা পরে না। কাল বিকেলে বাড়িতেও ছিলো না সে। আমার সঙ্গে বেরিয়েছিলো। দুজনেই শহরে গিয়েছিলাম কিছু দরকারী জিনিস কিনতে। আর তোমরা বলছো কাল তার সাথে দেখা হয়েছে, প্রজাপতি নিয়ে এক ডলার দিয়েছে, রাতে পাহাড়েও আবার কথা বলেছো!

রাগ করবেন না, স্যার, মোলায়েম গলায় বললো কিশোর। কিন্তু আমরা সত্যিই…

আবার বলছে সত্যি! গর্জে উঠলেন প্রজাপতি মানব। চমকে গেল রাফিয়ান। গরগর করে উঠলো।

আর দাঁড়ালেন না ওখানে মিস্টার ডাউসন। গটমট করে নেমে যেতে লাগলেন ঢাল বেয়ে। রাগতঃ ভঙ্গিতে বিড়বিড় করছেন আপনমনে।

খুব অবাক হয়েছে সবাই। তাকালো একে অন্যের দিকে।

মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না! দুহাত নাড়লো কিশোর। কাল রাতে কি তাহলে স্বপ্ন দেখলাম নাকি? একজনকে যে দেখেছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাফিও দেখেছে। হাতে জাল, চোখে চশমা। কথা বলেছি। মথ না ধরলে ওরকম ঝড়ের রাতে কি করতে বেরিয়েছিলো সে?

জবাবটা দিলো জনি, হয়তো পেন চুরির সঙ্গে ওই লোকের কোনো সম্পর্ক আছে।

কিশোরও একই কথা ভাবছে। চুপ করে তাকিয়ে রইলো জনির দিকে।

উঁহুঁ, মাথা নাড়লো মুসা, আমার তা মনে হয় না। কাল দেখলাম তো কটেজে। ওই লোক আর যা-ই করুক, প্লেন চুরি করতে পারবে না। দেখে ওরকম মনে হয় না।

কিন্তু আমাদেরকে যে টাকা দিয়েছে, সে যদি সত্যিই ডরি না হয়ে থাকে? প্রশ্ন তুললো রবিন।

নাকি ওই ব্যাটাই মিসেস ডেনভারের ছেলে? জিনা বললো।

দেখতে কেমন? জনি জানতে চাইলো। মিসেস ডেনভারের ছেলেকে আমি চিনি। বলেছি না, আমাদের ওখানে মাঝে মাঝে কাজ করতে যায়। ওর ওপর মোটই বিশ্বাস রাখা যায় না। বলো তো কেমন চেহারা, টেড কিনা বুঝতে পারবো।

খাটো, রোগাটে, চোখে কালো কাঁচের চশমা, বলে চেহারার বর্ণনা দিলো মুসা।

ও টেড ডেনভার নয়, মাথা নাড়লো জনি। টেড লম্বা, মোটা, ঘাড় এতো মোটা, নাড়তেই কষ্ট হয়। কোনো রকম চশমাই পরে না।

ব্যাটা তাহলে কে? নিজেকে ডরি বলে চালিয়ে দিলো? সবার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো মুসা।

কেউ তার প্রশ্নের জবাব দিতে পারলো না। হঠাৎ তার চোখ পড়লো খাবারের দিকে। আরি, আরি, সব তো নষ্ট হয়ে গেল! অর্ধেক খাওয়াই এখনও বাকি!

নীরবে খেয়ে চললো সকলে।

ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললে জনি। প্লেন চুরির সঙ্গে এ-সবের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা বুঝতে পারছি না…

থাক বা না থাক, ঘোষণা করলো যেন কিশোর, ওই প্রজাপতির খামারের ওপর চোখ রাখতে হবে আমাদের। রহস্যময় কিছু একটা ঘটছে ওখানে, আমি এখন শিওর!

<

Super User