দুটো বাজতে আর এক মিনিট বাকি। কিশোর দেখলো, উদ্বিগ্ন হয়ে ঘড়ি দেখহে হারিস বেকার। এই নিয়ে তিনবার এরকম করলো সে।

আর মিনিটখানেক বাদেই শুরু হবে পাগলদের দ্বিতীয় কুইজ শো, অথচ হাজির রয়েছে মাত্র তিনজন। মড়ার খুলি, শিকারী কুকুর আর কিশোর। নেলি আর ভারিপদ আসেনি।

দর্শকমণ্ডলীর দিকে তাকালে কিশোর। শেষের সারিতে বসেছে আজ মুসা। সে-ও বেকারের মতোই উদ্বিগ্ন। কিশোরকে তার দিকে তাকাতে দেখে অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে শ্রাগ করলো। জবাবে কিশোরও শ্রাগ করলো। ভারিপদর জন্যে ভাবছে না সে, নেলির জন্যে চিন্তিত।

আরও পেছনে দৃষ্টি দিলো কিশোর। কন্ট্রোল বুদে জায়গামতোই রয়েছেন সাইনাস। পরনে সেই দোমড়ানো ধূসর স্যুট, এলোমেলো সাদা চুল, চোখের নিচে গাঢ় ছায়। অতি ক্লান্ত বিধ্বস্ত একজন মানুষ।

ঘোরানো গলিতে একটা নড়াচড়া চোখে পড়লো কিশোরের। স্টেজের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে ভারিপদ। নিজের সীটে এসে বসলো।

ঠিক দুটো বাজে, কিন্তু নেলি এখনও অনুপস্থিত।

ভারিপদর দিকে ঝুঁকে নিচু গলায় বললো কিশোর, দেরি করে ফেলেছো।

হ্যাঁ, হাসলো ভারিপদ। পথে খারাপ হয়ে গেল মোটর সাইকেল। টাইয়ের সঙ্গে মাইক বাঁধলো সে। তবে না আসতে পারলেও কিছু হতো না। জেতার সম্ভাবনা একটুও নেই আমার। টাকাও পাবে না।

আবার বেকারের দিকে নজর দিলো কিশোর। ভারিপদ এসে বসার পর কিছুটা উজ্জ্বল হলো তার হাসি। কন্ট্রোল রুমকে তৈরি হওয়ার ইশারা করে দর্শকদের দিকে ফিরলো।

প্রিয় দর্শকমণ্ডলী, বলতে শুরু করলো সে, পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলো, আপনাদের জন্যে একটা দুঃসংবাদ আছে। আমাদের প্রতিযোগী নেলির কাছ থেকে একটু আগে একটা চিঠি পেয়েছি। চিঠিটা এসেছে আমার অফিসের ঠিকানায়। আপনাদেরকে পড়েই শোনাচ্ছি। হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে একটা সেকেণ্ড রিতি দিয়ে, তারপর জোরে জোরে পড়তে লাগলো, ডিয়ার মিস্টার বেকার। আপনাদেরকে এভাবে বেকায়দায় ফেলার জন্যে আন্তরিক দুঃখিত। কিন্তু আমার ছবি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই বিপদ, বহুবছর আগে যে যন্ত্রণায় পড়েছিলাম, রাস্তায় বোরোলেই আবার রিক্ত করছে লোকে। কুইজ শো জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই আর আমারবুঝতে পেরেই ভাবলাম আর ক্যামেরার সামনে যাবে না। সান ফ্রান্সিসকোয় আমার বাড়িতে চলে যাচ্ছি। ওখানে অন্তত শান্তিতে থাকতে পারবো, লোকে বিরক্ত করবে না আমাকে। আপনি, এবং পাগলদের বার প্রতি রইলো আমার শুভেচ্ছা। আবার নাটকীয় ভঙ্গিতে বিরতি দিয়ে বেকার বললো, নিচে সই করেছে, বটিসুন্দরী।

গুঞ্জন উঠলো দর্শকদের মাঝে। বিরক্ত নয়, সহানুভূতি, বটিসুন্দরীর মর্যাতনা উপলব্ধি করতে পারছে ওরা।

নেলি, বেকার বললো ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে, আমাদের এই অনুষ্ঠান যদি এই মুহূর্তে দেখে থাকো তুমি, তাহলে বলছি তোমার এই সিদ্ধান্তের জন্যে আমরা খুব কষ্ট পেলাম। তোমাকে পেয়ে সত্যিই খুশি হয়েছিলাম আমরা। তোমাকে মিস করছি এ মুহূর্তে।

দর্শকরাও বেকারের সঙ্গে সায় দিয়ে গুঞ্জন করে উঠলো। নানারকম কথা বলতে লাগলো ওরা। হাত তুলে ওদেরকে শান্ত হতে অনুরোধ করলো বেকার, দয়া করে চুপ করুন আপনার। আমাদের শো শুরু হতে যাচ্ছে। পাগলদের দ্বিতীয় এবং ফাইন্যাল কুইজ শো।

নিভে গেল আলো। পর্দার দিকে তাকালো কিশোর। দুই মিনিটের টুকরো ছবি দেখানো আর হলো। ওতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারছে না সে, মাথায় ঘুরছে নানারকম চিন্তা। তবে যেটুকু পারলো, তাতেই পুরো দুটি রেকর্ড হয়ে গেল তার অসাধরণ স্মৃতিতে।

জনাব গণ্ডগোলের জন্যে একটা কুকুর চুরি করছে শজারুকাঁটা। ডোরাকাটা একটা স্ট্রর সাহায্যে স্ট্রবেরি মিল্ক শেক খাচ্ছে বটিসুন্দরী। ভুট্টা পোড়া দেয়ার জন্যে বনের ভেতর আগুন জ্বেলেছে মড়ার খুলি আর শিকারী কুকুর। একটা জলাশয়ে ডাইভ দিয়ে পড়ছে ভারিপদ। দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে বনে, তার মধ্যে আটকা পড়েছে মোটুরাম। চেককাটা একটা টেবিলক্লথ দিয়ে ভারিদ্র মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে শিকারী কুকুর। আগুনের ভেতর থেকে মোটুরামকে উদ্ধার করে আনছে নেলি।

ছবি দেখছে আর ভাবছে কিশোর, নিশ্চয় ওই চিঠি নেলি লেখেনি। কারণ, কিছুতেই বটিসুন্দরী লিখে সই করবে না সে। কিশোর যেমন মোটুরামকে ঘৃণা করে, তেমনি নেলি ঘৃণা করে বটিসুন্দরীকে। তাছাড়া, সে বাড়িও যায়নি। হোটেলের ঘর হাড়েনি। অথচ সারা সকাল তাকে হোটেলে দেখা যায়নি, ছিলো না।

নিশ্চয় বিপদে পড়েছে নেলি। তাকে আটকে রাখা হয়েছে কোথাও। তারপর তার নাম সই করে দিয়ে একটা জাল চিঠি পাঠানো হয়েছে। যে এসব করেছে, সেই একই লোক হুমকি দিয়ে ফোন করেছে কিশোরকে।

দুই মিনিট পর ছবি শেষ হয়ে গেল। জ্বলে উঠলো আলো।

ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডের দিকে তাকালো কিশোর। পঁয়তাল্লিশ নম্বর পেয়েছে সে। মড়ার খুলি চল্লিশ। নেলি পঁয়তিরিশ। ভারিপদ আর শিকারী কুকুর আরও অনেক কম।

সুইভেল চেয়ার ঘুরিয়ে প্রতিযোগীদের মুখোমুখি হলো বেকার।

নেলি না থাকায় প্রথম জবাব দেয়ার পালা এলো মড়ার খুলির।

বলতো, বটিসন্দরী, যে স্ট দিয়ে মিল্ক শেক খাচ্ছিলো, ওটার বিশেষত্ব কি?

ডোরাকাটা, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো মড়ার খুলি। লাল, সাদা আর নীল।

হাততালি পড়লো। কিশোরের সমান নম্বর হয়ে গেল তার।

শিকারী কুকুরের পালা। কি ধরনের মিল্ক শেক খাচ্ছিলো?

দ্বিধা করলো শিকারী। মড়ার খুলির আগের মুহূর্তে কিশোরের হাত উঠে গেল।

চকলেট? জবাব নয়, যেন বেকারকে প্রশ্ন করলো শিকারী কুকুর।

না না না, চেঁচিয়ে উঠলো দর্শকরা। হলো না।

হলো না, যেন খুবই দুঃখিত হয়েছে এমন ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে কিশোরের দিকে ফিরলে বেকার। বলো?

দ্বিধা করার ভান করলো কিশোর। তার ভালো করেই জানা আছে জবাবটা কি। কিন্তু বললো, আমারও মনে হয় ওটা চকলেট।

আশা করেছিলো দর্শকরা, কিশোর পারবেই, কিন্তু তাদেরকে নিরাশ হতে হলো। খুব আফসোস করলো তারা। পাঁচ নম্বর হারালো সে। এরপর থেকে হারাতেই থাকলো। তার নিজের প্রশ্ন যখন এলো, জিজ্ঞেস করা হলো কি দিয়ে শিকারী কুকুরের মাথায় ব্যান্ডেজ বাধছিলো ভারিপদ, আবরও দ্বিধায় অভিনয় শুরু করলো সে।

টিসু পেপার? বলে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে বেকারের দিকে তাকালো।

জোর গুঞ্জন উঠলো দর্শকদের মাঝে। ওরা বিশ্বাসই করতে পারছে না যেন কিশোর ভুল করবে।

পঞ্চম এবং শেষ রাউণ্ডে দেখা গেল পঁয়ষট্টি নম্বর পেয়ে এগিয়ে রয়েছে মড়ার খুলি। শেষ জবাবটাও ঠিক ঠিক দিলো সে। শিকারী কুকুর আর ভারিপদ ভুল করলো। কিশোরের পালা এলো।

তোমাকে এবার খুব সহজ একটা প্রশ্ন করি, বেকার বললো। জনাব গণ্ডগোলের জন্যে কি চুরি করেছে শজারুকাঁটা?

জবাব দেয়ার আগে স্কোরবোর্ডের দিকে তাকালো কিশোর।

মাথা চুলকালো। নেরি চেয়ে ইতিমধ্যেই পাঁচ নম্বর কম পেয়েছে। আবারও ভুল জবাব দিলো, ইয়ে, একটা বেড়াল।

গুঙিয়ে উঠলো দর্শকরা। প্রশ্ন-পর্ব শেষ হলো।

অনেক সময় নিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিযোগীরা কে কতো নম্বর পেয়েছে, পড়তে লাগলো বেকার। মড়ার খুলি পেয়েছে সত্তর। নেলি পঁয়তিরিশে রয়েছে। তার চেয়েও পাঁচ নম্বর কম পেয়েছে কিশোর, অর্থাৎ তিরিশ। কাজেই নেলি দ্বিতীয় শোতে যোগ না দিয়েও দ্বিতীয় হয়ে আছে।

তিনটে ক্যামেরার চোখেই মড়ার খুলির দিকে ঘুরে গেল, যখন সে হাসিমুখে বিশ হাজার ডলারের চেকটা নেয়ার জন্যে হাত বাড়ালো। সেদিকে তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করলো না কিশোর। সে উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকিয়ে রয়েছে দর্শকদের মাথার ওপর দিয়ে পেছনে, রবিনকে দেখার আশ্রয়।

অবশেষে ঘোরানো গলি দিয়ে রবিনকে ছুটে আস দেখা গেল। দর্শকদের সারির মাঝ দিয়ে প্রায় দৌড়ে এলো স্টেজের দিকে। তার পেছনে এলো মুসা। হাতের বড় ম্যানিলা খামটা কিশোরের হাতে তুলে দিলো রবিন। ফিসফিসিয়ে বললো, খুব পরিষ্কার উঠেছে।

রবিন আর মুসা ফিরে গেল সীটে। খামটা খুললো কিশোর। যা আশা করেছিলো, তার চেয়ে ভালো উঠেছে ছবিটা। মড়ার খুলির একটা চমৎকার হবি, বাতাসে চুল উড়ছে পেছনে।

তার বাঁ কানটা স্পষ্ট।

লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, বেকার বলছে হাসি হাসি কণ্ঠে, এখন আমি পাগলদের সবাইকে একটা করে পুরস্কার দিতে চাই।

দর্শকদের গুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে গেল। ছবিটা আবার খামে ভরে ক্যামেরার চোখের দিকে তাকাতে তৈরি হলো কিশোর।

অ্যানি, ডাকলো বেকার, পুরস্কারগুলো নিয়ে এসো।

আলোচনার দিন যে মেয়েটা কাপের বাক্স নিয়ে এসেছিলো, সে-ই এলো আরেকটা সোনালি কাগজে মোড়ানো বাক্স হাতে। একটা ভুরু উঠে গেল কিশোরের। এবার আর একা আসেনি মেয়েটা, সঙ্গে রয়েছে ইউনিফর্ম রা একজন গার্ড।

বাক্সটা খুললো বেকার। নাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে। সব শেষে বললো, …পাগলদেরকে একটা করে রূপার কাপ উপহার দেবো আমরা।

নানারকম কথা বলে আর শব্দ করে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো দর্শকরা, পাগলরা যখন পুরস্কার নিতে এগোলো।

নেলির কাপটা ডাকযোগে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হবে, বেকার বললো। নেলি, তুমি যদি এ-অনুষ্ঠান দেখে থাকো, আবার ধন্যবাদ তোমাকে। উপস্থিত পাগলবৃন্দ, দর্শকমণ্ডলী, আর যারা আমাদের এই অনুষ্ঠান দেখেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি আমাদের অনুষ্ঠান। গুড বাই।

ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লো বেকার। পৃর্ণিমার চাঁদের মতো ঝলমল করছে তার হাসি। জোরে জোরে হাততালি দিচ্ছে দর্শকরা। শো শেষ।

থেমে গেল ক্যামেরার নড়াচড়া। নড়তে শুরু করেছে পাগলেরা। স্টেজের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে মড়ার খুলি। বেকার, শিকারী কুকুর, ভারিপদ, ক্যামেরাম্যান আর দর্শকদের কেউ কেউ তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

পেছনে দুই সহকারীকে নিয়ে ওই ভিড় ঠেলে ভেতর ঢুকলো কিশোর। চামড়ার অ্যাকেট পরা সোনালি-চুলোর মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। ছবিটা বের করে দেখিয়ে বললো, এই ছবিটা কি তোমার?

কেন? ছবির দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি ফুটলো মড়ার খুলির চোখে। কিন্তু অস্বীকার করতে পারলো না যে ছবিটা তার নয়। আশপাশের সকলে ঝুঁকে এলো ছবিটা দেখার জন্যে। হ্যাঁ, এটা আমারই হবি। কেন?

কারণ এখানে তোমার কান ঢাকা নেই, কিশোর বললো। পাশে দাঁড়ানো বেকারের দিকে তাকালো সে। বয়েস বাড়লে মানুষের চেহারা অনেক বদলে যায়, সন্দেহ নেই। শিকারী কুকুর, ভারিপদ, আমি, আমাদের সবার চেহারাই বদলেছে। পরিচয় না দিলে ছেলেবেলার সেসব ছবি দেখে লোকে এখন আমাদের চিনতে পারবে না। ঠিক?

ঠিক, শিকারী কুকুর বললো।

মাথা ঝাঁকালো বেকার।

কিন্তু কিছু কিছু জিনিস কখনও বদলায় না, বড় হলে আকারে বাড়ে এই যা, বললো কিশোর। তার মধ্যে একটা অঙ্গ হলো মানুষের কান। মড়ার খুলির কান ছিলো অস্বাভাবিক বড়, কানের লতি এতো ঝোলা, মনে হতো জেলি লেগে আছে, ঝাড় লাগলেই খসে পড়বে। কিন্তু ছবিতে যার কান দেখছেন, এইমাত্র যে বিশ হাজার ডলার পুরস্কার জিতলো, এর কান সম্পূর্ণ অন্যরকম। বয়েস বাড়লে কি কানের এরকম পরিবর্তন হয়?

থাবা দিয়ে কিশোরের হাত থেকে ছবিটা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করলো চামড়ার জ্যাকেট পরা তরুণ। খপ করে তার চেপে ধরে ঠেলে পিছনে সরিয়ে দিলো মুসা।

কি-ক্কি বলতে চাও তুমি? কিশোরের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালো মড়ার খুলি।

বলতে চাই, শান্তকণ্ঠে বললো কিশোর, তুমি কোনোদিনই পাগল সংঘে অভিনয় করোনি। এই কুইজ শোতে অংশ নেয়ার কোনো অধিকার তোমার ছিলো না। আর মিস্টার বেকার নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন, এই পুরস্কার তোমার প্রাপ্য হতে পারে না, কারণ…

ছবিটা তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে নাচালো কিশোর। কারণ, তুমি আর যেই হও, পাগল সংঘের মড়ার খুলি হতেই পারো না।

<

Super User