একটু পর আরও তিনটে নেকড়ে বেরোল বন থেকে। পাশাপাশি প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিশোর-মুসার দিকে। নেকড়েগুলোর হাঁ করা মুখের ভিতর থেকে লম্বা জিভ বেরিয়ে ঝুলে পড়েছে। কিশোরের মনে হলো, শিকারের অসহায়ত্ব দেখে নীরব হাসি ফুটেছে ওদের মুখে। খুব সামান্য লেজ নড়ানো বাদ দিলে একেবারেই মূর্তি।
কিশোর, কী করব? বিড়বিড় করল মুসা।
ওদের বলল, আমরা যুদ্ধে বিশ্বাসী নই, শান্তি চাই। ওদের নেতার কাছে নিয়ে যেতে বলো, বিড়বিড় করেই জবাব দিল কিশোর।
রসিকতা ছাড়ো। বাঁচার কোন বুদ্ধি আছে?
আছে। নড়বে না। ওদের মতই মূর্তি হয়ে যাও। আমরা ওদের হামলা করতে পারি, এ ধারণাটা যাতে কোনমতেই ওদের মাথায় না ঢোকে। আমরা যে ভয় পেয়েছি, সেটাও বুঝতে দেবে না।
বুঝলাম।
পিছিয়ে গিয়ে দেখতে পারি ওরা কী করে, কিশোর বলল। খুব ধীরে।
সাবধানে এক পা পিছনে সরল দুজনে। আরেক পা ফেলল। ওদের সঙ্গে যেন অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা রয়েছে নেকড়েগুলো, টান লেগে ঠিক ততখানিই এগোল, ওরা যতখানি পিছিয়েছে। তারপর দুই পাশের দুটো নেকড়ে ডানে-বাঁয়ে একটুখানি করে সরে গেল।
চলে যাবে? মুসার প্রশ্ন।
ভুলেও ভেবো না, সতর্ক করল কিশোর। আমাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। এভাবেই হামলা চালায় নেকড়েরা।
বাহ্, দারুণ একটা খবর শোনালে। কিন্তু তুমি তো নেকড়ে গবেষক নও। ওরা কী করবে জানলে কীভাবে?
বই পড়ে আর ন্যাশনাল জিওগ্রাফি দেখে।
নেকড়েগুলো আকারে হাস্কি কুকুরের চেয়ে বড়। দূর অতীতে কোনও এক সময় বোধহয় একই গোত্রের প্রাণী ছিল ওরা, রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। কুকুরের তুলনায় নেকড়েগুলো অনেকটাই রোগাটে, ছিপছিপে। চোখে রাজ্যের খিদে। কিশোর জানে, কুকুরের চোয়ালের চেয়ে নেকড়ের চোয়াল দ্বিগুণ শক্তিশালী।
কিশোর, মুসা জিজ্ঞেস করল, ওরা যেভাবে আমাদের ঘিরে ফেলতে চাইছে, একেই কি সাঁড়াশি আক্রমণ বলে?
জানি না। তবে ওরা যা চাইছে, সেটা ঘটতে দেয়া যাবে না।
ঠেকাব কীভাবে?
ভাবছে কিশোর। ভোলা জায়গায় রয়েছে ওরা। বনের ভিতর কি নিরাপদ? না বিপদ আরও বেশি? বনে ঢোকা ছাড়া আর কোন উপায়ও দেখছে না। বন পেরিয়ে শহরের সীমানায় চলে যেতে হবে। কিন্তু তাতেও কি রক্ষা পাবে? সত্যিই কি শহরের সীমানায় ঢোকে না নেকড়েরা? সন্দেহ আছে কিশোরের।
মুসা, ডানে দেখো! ফিসফিস করে বলল মুসা।
ডান দিকের বন থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা বড় হাস্কি। দুলকি চালে হেঁটে আসতে লাগল ওদের দিকে।
ওটাই বোধহয় রেড লাইট, কিশোর বলল।
মনে হয়, মুসা জবাব দিল। রেড লাইট হোক বা না হোক, ওটা আমাদের পক্ষে থাকলেই আমি খুশি।
নেকড়েগুলোর কাছাকাছি এসে থেমে গেল কুকুরটা। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গরগর শুরু করল। চাপা, ভয়ঙ্কর শব্দ। থেমে গেল নেকড়েগুলো। তুষারে ঢাকা বনের এই মরণ-নাটকের নতুন অভিনেতার দিকে নজর দিল।
এটাই সুযোগ, কিশোর বলল। পিছাতে থাকো। বনের মধ্যে ঢুকেই দেবে দৌড়।
কয়েক সেকেণ্ডেই বনে ঢুকে পড়ল দুজনে। একটা মুহূর্ত আর দেরি করল না। দৌড়ানো শুরু করল। বুটের চাপে ভাঙছে পাতলা তুষারের স্তর। জুতো ডেবে যাওয়াটা একটা অসুবিধে। আরেক অসুবিধে, দৌড়ালে হাঁপাতে হয়। দ্রুত শ্বাস টানার সময় নাক দিয়ে ঢুকে যায় কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। এ রকম আবহাওয়ায় এভাবে দ্রুত বাতাস টানার কারণে ফুসফুস জমে গিয়ে মানুষ মারা যাওয়ার গল্প শুনেছে কিশোর। তবে সেটা পরের ভাবনা। আপাতত নেকড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচতে হবে।
পাতলা হয়ে এল বন। পায়ে চলা একটা পথের ওপর এসে পড়ল দুজনে। শহরের দিকে মুখ করে দৌড়াতে থাকল। দূরে একটা টিলার মাথায় উঠে আসতে দেখল জোসি আর ওর কুকুরের দলকে। থেমে গেল কিশোর। ওর প্রায় ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল মুসা। তবে ধাক্কাটা লাগল না। ধপ করে পথের ওপরই বসে পড়ল দুজনে। হাঁপাতে লাগল বিপজ্জনকভাবে।
কাছে এসে স্লেজ থামাল জোসি। গাড়ি থেকে নেমে এল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
ভারী দম নিল কিশোর। ঢোক গিলে বলল, নেকড়ে।
আমাদের ঘিরে ফেলা শুরু করেছিল, মুসা জানাল। রেড লাইট আমাদের বাঁচিয়েছে।
অসীম সাহসে নেকড়েগুলোর মুখখামুখি হলো কুকুরটা, কিশোর বলল। ধমকানো শুরু করল। সুযোগ পেয়ে দৌড় দিলাম। ভুল করেছি। ওকে এভাবে ফেলে আসাটা উচিত হয়নি।
না, ভুল করনি। এটাই চেয়েছিল ও, জোসি বলল। তোমাদের পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে। তোমরা যাও। আমি রেড লাইটকে আনতে যাচ্ছি। নেকড়েগুলো যেই বুঝবে কুকুরটা ওদের দলে যোগ দিতে চায় না, ধরে মেরে ফেলবে।
একা যাবে? কিশোর বলল। আমরা আসি?
দরকার নেই, জোসি বলল। নেকড়ে আমাদের কিছু করতে পারবে না। দেখছ না, কত কুকুর নিয়ে যাচ্ছি। গম্ভীর হয়ে গেল ও। আমি ভয় পাচ্ছি রেড লাইটের কথা ভেবে। ওকে জ্যান্ত পেলে হয়! ওকে হারালে…
স্লেজে ধাক্কা দিল জোসি। কুকুরগুলোকে বলল, হাইক! হাইক!
ছুটতে শুরু করল কুকুরের দল। মুহূর্তে টিলার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সেদিকে তাকিয়ে থেকে চিন্তিত ভঙ্গিতে কিশোর বলল, কিন্তু কুকুরটার দড়ি কাটল কে? অবাক লাগছে আমার!
শহরের দিকে রওনা হলো দুজনে।
দড়ি কাটার খবরটা কি জোসি জানে? মুসার প্রশ্ন।
মনে হয় না। তবে জানার পর কী খেপা যে খেপবে সেটা আন্দাজ করতে পারছি। এই কুকুরগুলোই ওর সব।
শহরের কেবিন আর কাঠের ছাউনিগুলো নজরে এল। খপ করে মুসার হাত চেপে ধরে কিশোর বলল, দেখলে?
কী? এদিক ওদিক তাকাল মুসা।
আস্তে কথা বলো! ওই ছাউনিটার দিকে তাকাও।
একটা ছাউনির দরজা ফাঁক হয়ে আছে। সেটা দিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে এল একটা ছায়ামূর্তি।
কী করছে ও? মাংস চুরি?
জানি না, তাকিয়ে আছে কিশোর। তবে ওর ভাবভঙ্গি সুবিধের মনে হচ্ছে না। শয়তানি মতলব আছে। চলো তো দেখি।
ওদের দেখে ফেলল লোকটা। ছুটতে শুরু করল। ছাউনির পাশ ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঢাল বেয়ে যত দ্রুত সম্ভব ছাউনির কাছে নেমে এল কিশোর ও মুসা। কোথাও দেখল না লোকটাকে।
বুঝলাম না, চারপাশে তাকাতে তাকাতে বলল বিস্মিত মুসা, কোথায় উধাও হলো?
ফিরে তাকাল কিশোর। দেখল লোকটাকে। পাহাড়ের ওপরের বনে ঢুকে যাচ্ছে। ওই যে যাচ্ছে! বলেই দৌড় দিল ও। মুসা ছুটল ওর পিছনে।
পাঁচ মিনিট পর হাল ছেড়ে দিল ওরা। ওদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে লোকটা। পিছু নিয়ে এখন ধরা অসম্ভব। তা-ও যদি নেকড়েগুলোর কাছ থেকে পালাতে গিয়ে শক্তি খরচ করে না ফেলত, এক কথা ছিল।
ধূর, গেল চলে! হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মুসা। ছাউনিতে কী করছিল?
কিছু একটা কুমতলব তো নিশ্চয় ছিল, নইলে পালাল কেন? জবাব দিল কিশোর। ভালমত দেখেছ?
দেখেছি। সবুজ পার্কা। সামান্য এই সূত্র দিয়ে ওকে চিনতে পারব বলে তো মনে হচ্ছে না। কী করতে ঢুকেছিল, ছাউনিটাতে ঢুকে দেখা দরকার।
মাথা নাড়ল কিশোর। চুরি করে অন্যের ঘরে ঢোকাটা ঠিক হবে। তবে ছাউনিটা কার, সেটা জানা যেতে পারে। জেফরি আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করব।
কেবিনে ফিরে শুধু মুনকে পেল ওরা। মুন জানাল, বাবার শরীর ঠিক হয়ে গেছে। ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগছিল না, মাকে নিয়ে তাই মিটিঙে গেছে। আমিও রওনা হচ্ছিলাম। যাবে নাকি?
কীসের মিটিং? জানতে চাইল মুসা।
ভোটের আগের শেষ মিটিং। শহরের সব লোক যাবে অ্যাসেম্বলি হলে, থিম পার্ক নিয়ে আলোচনার জন্য। জোসি কই? সে-ও তো যেতে চেয়েছিল।
রেড লাইট দড়ি ছিড়ে পালিয়েছে। ওকে খুঁজতে গেছে, কিশোর জানাল।
সর্বনাশ! কুকুরটাকে না পেলে মস্ত ক্ষতি হয়ে যাবে। রেড লাইট ওর দলের সবচেয়ে ভাল কুকুরগুলোর একটা। ইডিটারোড রেসেরও আর দেরি নেই। এ সময় রেড লাইটকে খোয়ালে খুব বেকায়দায় পড়ে যাবে।
পার্কা পরে বেরিয়ে এল মুন। অ্যাসেম্বলি হলে রওনা হলো তিনজনে। হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুকে বলল মুসা, ওকে কি ওখানে পাওয়া যাবে?
কাকে? বুঝতে পারল না কিশোর।
যাকে আমরা তাড়া করেছিলাম।
কী জানি। যদি যায়ও ও, চিনতে পারব না। শহরের অনেকেই সবুজ পার্কা গায়ে দেয়। কোনজন আমাদের লোক বুঝব কীভাবে?
অ্যাসেম্বলি হলে এসে দেখল লোকে ভরে গেছে। পিছনের সারিতে সিট পেল ওরা। নেতা গোছের একজন সভা আরম্ভ করার নির্দেশ দিলেন। তাঁকে চেনে না কিশোররা।
মিস্টার সিউল, টেডের বাবা, ফিসফিস করে বলল মুন।
প্রথমে বিগসকে কিছু বলার অনুরোধ জানালেন মিস্টার সিউল।
গ্লিটারে থিম পার্ক হলে শহরবাসী কী কী সুবিধে ভোগ করবে, তার ওপর বক্তৃতা দিল বিগস্। ঘুম পাচ্ছে কিশোরের। হাততালির শব্দে চমকে জেগে গেল। দেখে বিগ বসে পড়েছে। গোল্ড ফেরানি উঠে দাঁড়িয়েছে। বক্তৃতা শুরু করল। পুরো সজাগ এখন কিশোর। কান খাড়া করে শুনতে লাগল।
গ্লিটারে আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম আমরা করে যেতে পারব, কোনটাই বন্ধ হবে না, গোল্ড বলছে। আমি খনিতে কাজ করতে পারব, শিকারীরা শিকার করতে পারবে, জেলেরা মাছ ধরতে পারবে। অমানুষিক পরিশ্রম করেও কোনমতে টিকে আছি এখন আমরা। অবস্থা যা দেখা যাচ্ছে, আর কিছুদিন পর না খেয়ে থাকতে হবে। খনিতে এখন আর সোনা মেলে না। সোনা এখন টুরিস্টের পকেটে, ডলার হয়ে ঢুকে গেছে। ওদের পকেট থেকে ওগুলো বের করে আনতে না পারলে আমাদের উন্নতি হবে না। কিন্তু বের করার জন্য গ্লিটারে ওদেরকে ডেকে আনা দরকার। থিম পার্ক কোম্পানি নিজেরাও টাকা কামাতে চাচ্ছে, আমাদেরও ভাগ দিতে চাচ্ছে, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এ সুযোগ আমাদের হাতছড়া করা উচিত হবে না।
অর্ধেকের মত শ্রোতা জোর করতালি দিয়ে স্বাগত জানাল গোল্ডের বক্তব্যকে। যারা দিল না, তাদেরও অনেককেই এই বক্তৃতা শোনার পর দ্বিধান্বিত মনে হচ্ছে। থিম পার্কের পক্ষে ভোট দেবে কি না সেটা ভাবছে বোধহয়।
জেফরি উঠে দাঁড়ালেন। গোল্ড ঠিকই বলেছে।
অবিশ্বাসের গুঞ্জন উঠল শ্রোতাদের মাঝে। পার্কের পক্ষ নিয়েছেন ঘোর বিরোধী জেফরি! অবাক হলো কিশোর।
ঠিক বলেছে গোল্ড, আবার বললেন জেফরি, অন্তত একটা ব্যাপারে। আমাদের আয় কমে গেছে। আর কমলে না খেয়ে থাকতে হবে। আমরা সেটা জানি। আয়ের নতুন পথ খোঁজা উচিত আমাদের, তা-ও জানি। কিন্তু আমার মতে থিম পার্কই এর সমাধান নয়।
পাশে বসা মুনকে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে শুনল কিশোর। স্বস্তির।
শত শত বছর ধরে, জেফরি বলে চলেছেন, এখানকার মাটি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিলে-মিশে বাস করেছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা, আমরাও করছি। শীতের আগে আমরা বনে গিয়ে মুজ শিকার করি, গরমে স্যামন ধরি নদীতে। দীর্ঘ শীতের মাসগুলোতে আমরা কুকুরের ট্রেনিং দেই। আমাদের হস্তশিল্পের কদর দুনিয়াজোড়া। আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য, সব আমরা নষ্ট করব টাকার লোভে টুরিস্ট ডেকে আনলে। আমাদের স্বকীয়তা বলতে আর কিছু থাকবে না তখন। আমাদের শহর আমাদের থাকবে না। হাজার হাজার মাইল দূরের অফিসে বসে এ শহরটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে এমন কিছু মানুষ, গ্লিটারবাসীর কাছে যারা পুরোপুরি অচেনা। আমরা কি ওদের ডেকে এনে নিজের সর্বনাশ করতে চাই? ভালমত ভেবে দেখা দরকার।
বসে পড়লেন জেফরি। আবার অর্ধেকের মত শ্রোতা জোর করতালি দিয়ে তাঁকে সমর্থন করল।
বিগস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জেফরি, আপনার বক্তব্যকে আমি যথেষ্ট সম্মান করি। আপনার উদ্বেগের কারণও আমি বুঝি। কিন্তু একটা কথা কি আপনি জানেন, থিম পার্ক কোম্পানি আপনাদের প্রতি আকৃষ্টই হয়েছে আপনারা আপনাদের ঐতিহ্য বজায় রাখতে পেরেছেন বলেই? আপনার কি মনে হয় সে-সব ধ্বংস করে দিতে চাইব আমরা? তাতে নিজের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারব। পুরানো সব কিছু ধ্বংস করে দিলে টুরিস্টদের কী দেখাতে আনব? আমি আপনাকে পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই…
কথা শেষ হলো না ওর। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল অ্যাসেম্বলি হল।
<