বন্ধ ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল মুসা। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
বাঁচাও, বাঁচাও! শোনা গেল আবার।
অফিসের পেছন থেকে আসছে! বলে উঠল রবিন।
পেছনে তিনটে পার্ক করা কার আর একটা ভ্যান দেখা গেল। আবার শোনা গেল হিচড়ানোর আওয়াজ।
মনে হচ্ছে ভ্যানের ভেতরে, মুসা অনুমান করল।
বাঁচাও! শোনা গেল আবার চাপা চিৎকার। নরি! কিশোর বলল। ভ্যানটা খুলতে হবে!
দরজায় তালা নেই। টেনে খুলতেই দেখা গেল, মেকানিকরা মাটিতে যে ক্যানভাস বিছিয়ে কাজ করে, তার একটা বড় বাণ্ডিল। নড়ে উঠল বাণ্ডিলটা, ভ্যানের ছাত থেকে ঝুলে থাকা ভারি একটা পুলিতে বাড়ি লাগল, ওটা ঘষা লাগল ধাতব দেয়ালে। হিচড়ানোর মত আওয়াজ করছে ওটাই।
ক্যানভাসের বাণ্ডিল নিয়ে টানাটানি শুরু করল ছেলেরা। ভেতর থেকে বেরোল নরি। হাত-পা বাঁধা। বাঁধনমুক্ত হয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে কন্সল সে, চেহারা ফ্যাকাসে। তবে সাহস হারায়নি।
কি হয়েছিল, নরি? রবিন জিজ্ঞেস করল।
আমার মনে পড়ে গিয়েছিল, দাদা বলত, কিছু লোকের মাগ কুৎসিত, আর কিছু লোকের সুন্দর। আয়নার কথা আন্দাজ করলাম, গর্বের সঙ্গে বলল নরি। মাছটা দেখলাম, বুঝলাম মারলিনের কথা বলেছে। কারণ, প্রায়ই ওই মাছের গল্প করত সে। দেখলাম, ওটার নাক একটা ছবির দিকে। টাউন হলের ছবি। মিস্টার সানকে ফোন করে জেনে নিলাম আমার অনুমান ঠিক কিনা। আমিও রিসিভার রাখলাম, এই সময় পেছন থেকে হঠাৎ আমার মাথায় একটা ব্যাগ ঢুকিয়ে দিল লোকটা। চেহারা দেখিনি। তারপর হাত-পা বেঁধে গাড়িতে ফেলে রেখে চলে গেল। তোমাদের সাড়া পেয়েই চেঁচাতে শুরু করলাম।
ভাল করেছ,মুসা বলল।
এজারদের আর টেরিকে ঘুরঘুর করতে দেখেছি শপিং সেন্টারে। বোধহয় ফোনে বেশি জোরে কথা বলে ফেলেছিলাম, ওরা পেছন থেকে শুনেছে আমার কথা। এত কষ্ট সব মাঠে মারা গেল আমার,হতাশ দেখাল নরিকে।
ধাঁধার চমৎকার সমাধান করেছ, তুমি, প্রশংসা করল কিশোর। আর খুব সাহস তোমার। ভুল আমরা সবাই করি, বুঝলে। এতে এত দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। তবে ভবিষ্যতে আরও হুঁশিয়ার হয়ে কাজ করবে।
এখন তো তাহলে তোমাদের সঙ্গে কাজ করতে পারি? অনুরোধ করল নরি। প্লীজ! তোমাদের সব কথা মেনে চলব। যা করতে বলবে তাই করব। বিপদে ফেলব না।
কিন্তু…
অসুবিধে কি? মুসা বলল। ছেলেটা প্রমাণ করে দিয়েছে, তার সাহস আছে। তাছাড়া বুদ্ধিও কম নয়, একটা ধাঁধার সমাধান তো আমাদের আগেই করে ফেলল।
নেয়া যায়, রবিনও নরির পক্ষ নিল।
বেশ, অবশেষে রাজি হল কিশোর। নিতে পারি, যদি তোমার মা অনুমতি দেন।
নরি ভাল আছে শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তার মা। কিন্তু কিশোর যখন বলল, ছেলেকে সঙ্গে নেবে কিনা, দ্বিধা করল এলসা।
বুদ্ধিশুদ্ধি বেশ ভালই আছে আপনার ছেলের, কিশোর বলল। তাছাড়া বাড়িতে রেখেও নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না। যখন তখন আপনাকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বরং বিপদেই পড়ছে।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। ঠিক আছে। যাক। তবে ওর ওপর কড়া নজর রাখবে, প্লীজ।
সুখবরটা নরিকে শোনাল কিশোর।
চায়ের দোকানের কাছে পার্ক করে রাখা সাইকেলগুলো নিয়ে রকি বীচে চলল ওরা। রোববারের জনবিরল পথ। কোর্টহাউস আর টাউনহলের কাছে লোকজন বিশেষ নেই, দুচারজনকে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেল। রোববারে বিক্রি বন্ধ, কিন্তু তবু টুরিস্ট আকর্ষণের জন্যে দোকানপাটগুলো খুলে রাখা হয়েছে।
ম্যারিজ লাইসেন্স ব্যুরোর ছোট ঘরটা টাউন হলের দোতলায়, বাঁয়ে, পেছনে একেবারে শেষ মাথায়। শূন্য ঘরটায় ঢুকল ছেলেরা। নকল বের করে পড়ল কিশোর, হোয়্যার মেন বাই দেয়ার ট্রাবল অ্যাণ্ড স্ট্রাইফ, গেট আউট ইফ ইউ ক্যান।
নীরব ঘরটায় চোখ বোলাল ওরা। ডানে বিজনেস উইনডোগুলো বন্ধ। বাঁয়ে দেয়ালের সমান্তরালে লম্বা উঁচু একটা রাইটিং কাউন্টার। সামনের দিকে গরাদওয়ালা দুটো জানালার নিচে একটা কাঠের বেঞ্চ। নানারকম নোটিশ, আর গভর্নর এবং মেয়রের ছবি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে দেয়ালে।
এখানেই তাহলে স্ত্রী কেনে লোকে, মুসা বলল। মানে বিয়ের লাইসেন্স জোগাড় করে। কথা হল, গেট আউট ইফ ইউ ক্যান দিয়ে কি বুঝিয়েছে?
আবার উল্টো কথা বলেনি তো? রবিন বলল।
বোঝা যাবে, কিশোর বলল। আগে পরের ধাঁধাটা পড়ে দেখি কিছু বোঝা যায় কিনা। ইন দ্য পশ কুইনস ও নেড, বি ব্রাইট অ্যাণ্ড নেচারাল, অ্যাণ্ড দ্য প্রাইজ ইজ ইওরস। এ-ঘরের কোন জিনিস হয়ত কোন রানী কিংবা বিছানা দেখাবে আমাদের।
কোথায়? নরি বলল।.ওরকম কিছু তো দেখছি না।
না, ধীরে ধীরে বলল কিশোর, পশ কুইনস ও নেড এঘরে থাকবেই এমন কোন কথা নেই। গেট আউট ইফ ইউ ক্যান দিয়ে কি বোঝায়, বোঝার চেষ্টা করে দেখি। গেট আউটের মানে এসকেপ বা পালানো হয়।
তবে কি ফায়ার এসকেপ? কিন্তু ঘরটা দোতলায়। কাছাকাছি কোন ফায়ার এসকেপ নেই। এসকেপ যদি হয় তাহলে তো রাইম হল না, রবিন বলল।
হলে নেই, মানে হলেই হল, বলল মুসা। জানালা? ওটা দিয়েও পালানো যায়। তবে এখানকারগুলো দিয়ে বেরোনো খুব মুশকিল।
তবু জানালার কাছে এসে বাইরে তাকাল ওরা। বাড়ন্ত ঝোপ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না।
ক্যান-এর সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে শব্দ বল তো,কিশোর বলল।
ব্যান, ফ্যান, ম্যান, প্যান, র্যান, ট্যান, গড়গড় করে বলে গেল রবিন।
এই, দেয়ালটা ট্যান কালারের, নরি বলল।
তাতে কোন সুবিধে হচ্ছে না ধাঁধা সমাধানের, বলল কিশোর। তবে এখানে। ম্যান আছে, দুজন, গর্ভনর আর মেয়র।
নোটিশে কোন ব্যান-এর ঘোবণা নেই তো? রবিনের প্রশ্ন।
নোটিশগুলো পড়তে ছুটল সবাই। বেশ কিছু নতুন নিয়ম জারি করা হয়েছে, নিষিদ্ধ করা হয়েছে কিছু কিছু ব্যাপার, তবে ওগুলো থেকে ধাঁধার সমাধান হবে না।
অবশেষে কিশোর ঘোষণা করল, আমার মনে হয় না এটা রাইমিং স্ন্যাং।
কারমলের আরেক শয়তানী বুদ্ধি! গো গোঁ করে বলল মুসা।
এখান থেকে বেরোনোর কথাই বলা হয়েছে মনে হয়।
কিভাবে? জিজ্ঞেস করল রবিন। জানালা আটকানো। ফায়ার এসকেপ নেই। দরজা মাত্র একটা, যেটা দিয়ে ঢুকলাম। তাতে স্পেশাল কিছু নেই।
এই দেখ!দরজার কাছের মেঝে দেখিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল কিশোর। মেঝে কেমন ক্ষয়ে গিয়েছে দেখছ লোক যাতায়াতের ফলে?
শ্রাগ করল রবিন। তাতে কি? এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু বেঞ্চের কাছের মেঝে দেখ।
সবাই দেখল। ক্ষয়া একটা সরু পথ যেন গিয়ে ঠেকেছে পাশের দেয়ালে।
গোপন দরজা! একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল রবিন আর মুসা।
দেয়ালের কাছে দৌড়ে এল ছেলেরা। খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু দেয়ালের অন্যান্য জায়গার মতই এখানেও মসৃণ, প্লাস্টারের ওপর রঙ করা, সামান্যতম চিড় ধরেনি কোথাও। আশা আবার নিভে গেল ওদের।
শূন্য দেয়াল, কেঁদে ফেলবে যেন রবিন, আর কিছু নেই!
আরও ভালমত দেখে মুসা বলল, মনে হয় দরজা-টরজা ছিল এককালে। রঙ দেখ। আশেপাশের দেয়ালের চেয়ে হালকা। নিশ্চয় গত দুতিন মাসের মধ্যে বন্ধ করা হয়েছে দরজাটা, কিংবা এখানে নতুন করে রঙ লাগানো হয়েছে। এখানে দরজা থাকলে বেরোনো মোটেই কঠিন হত না।
দেয়াল গেঁথে বোজানো হয়েছে? বিড়বিড় করল কিশোর। মুসার দিকে তাকিয়ে চোখ মিটমিট করতে করতে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, বাইরের রাস্তাটা কোন রাস্তা? এটা দিয়ে বেরোলে যেটাতে পড়া যাবে?
রাস্তা? অবাক হল রবিন। কেন স্যালসিপুয়েডস স্ট্রীট, তাই তো হবার কথা। কিন্তু…
কথা শেষ হল না তার। ঝড়ের গতিতে খোলা দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। কিশোর।
<