আরও তাড়াতাড়ি, বোরিসভাই, তাগাদা দিল কিশোর।
ভেব না, তাড়াতাড়িই পৌঁছুব। আরও বেশি তাড়াতাড়ি করতে গেলে হয়ত পৌঁছুঁতেই পারব না কোনদিন, অ্যাক্সিডেন্ট করে মরব।
নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে আবার সিটে হেলান দিল কিশোর।
বাওরাড ডাইয়ের দ্বিতীয় জার্নালটা পড়তে পড়তে মুখ তুলল এড। কিশোর, বাওরাড কোথায় গিয়েছিল, লেখা নেই। কি করে জানছি? সান্তা বারবারা ছোট না।
বোরিস হাসল। হ্যাঁ, বড় শহর।
বড় হওয়াতেই তো ভাল, বলল কিশোর। পুরানো শহর, বেশি পুরানো রেকর্ড থাকবে। একটা সূত্র রেখে গেছেন বাওরাড ডাই, সেটার সাহায্যেই খুঁজে বের করব।
সূত্র? ভুরু কেঁচকাল এড।
একটা দোকান থেকে কিছু কিনেছিল, যেটা আগুনে পুড়ে গেছে। আঠারশো ছিয়ানব্বই সালে এখনকার মত ছিল না সান্তা বারবারা, অনেক ছোট ছিল। অগ্নিকাণ্ডে দোকান পুড়ে যাওয়ার মত খবর না ছাপার কথা নয়।
বিকেলের মাঝামাঝি সান্তা বারবারার উপকণ্ঠে পৌঁছল ওরা। খবর সংগ্রহের জন্যে দ্য লা গুয়েরা প্রাজায় অবস্থিত সান-প্রেস পত্রিকার অফিসটা খুঁজে বের করল বোরিস, কিশোরের নির্দেশে। দোতলায় উঠে জনৈক মিস্টার বুল-এর সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানাল রিসিপশনিস্ট। সম্পাদকের নাম বুল বটে, কিন্তু গায়েগতরে ষাঁড়ের মত নন মোটেও। ছোটখাটো একজন মানুষ, হাসিখুশি। আঠারশো ছিয়ানব্বই? কিশোরের চাহিদা শুনে বললেন। না, আমরা তখন ছিলাম না। লোকাল একটা পত্রিকা ছিল অবশ্য। তুমি ঠিকই বলেছ, ইয়াং ম্যান, বড় রকমের একটা অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল ওই সময়।
রেকর্ডগুলো, স্যার, আছে আপনাদের মর্গে?
ছিল। যা পেয়েছিলাম সব এনে ফাইল করেছিলাম। কিন্তু নানারকম দুর্ঘটনায়—এই ভূমিকম্পে আর আগুনে-উনিশশোর আগের সব রেকর্ড নষ্ট হয়ে গেছে।
গুঙিয়ে উঠল কিশোর। সব রেকর্ড, স্যার?
হ্যাঁ, সরি, বলে ভাবলেন এক মুহূর্ত। তবে, আরেক জায়গায় চেষ্টা করে দেখতে পার। একজন লেখককে চিনি, ষাট বছর আগে ওই পত্রিকায় ফিচার লিখত। তার ব্যক্তিগত একটা মর্গ আছে, পুরানো খবরের কাগজ আর কাগজের অনেক কাটিং সংগ্রহে আছে। হবি। তার কাছে গিয়ে দেখতে পার।
সান্তা বারবারায় থাকেন? হাতে যেন চাঁদ পেল কিশোর।
হ্যাঁ। ছোট একটা অ্যাড্রেস ফাইল বের করলেন সম্পাদক। নাম আলফ্রেড পেরিংটন। থাকে এগারশো অ্যানাক্যাপা স্ট্রীটে। যাও, লোক ভাল। পারলে অবশ্যই সাহায্য করবেন।
লম্বা পথের মাথায় ছোট্ট একটা অ্যাড়াব হাউস, ১১০০ নম্বর, বড় একটা বাড়ির পেছনে। ট্রাকে বসে রইল বোরিস। কিশোর আর এড নেমে এগোল বাড়িটার দিকে।
হঠাৎ থমকে দাঁড়াল কিশোর। দড়াম করে দরজা লাগার আওয়াজ, তার পর পরই ছুটন্ত পদশব্দ।
কিশোর, দেখ, দেখ!
হাঁ হয়ে খুলে আছে অ্যাড়াবের দরজা। ভেতর থেকে চিৎকার শোনা গেল। এই! কে আছ? এই!
বিপদে পড়েছে, বলেই দৌড় দিল কিশোর।
চিৎকারটা বোরিসেরও কানে গেছে। লাফ দিয়ে ট্রাক থেকে নেমে দৌড়ে এল।
খোলা দরজা দিয়ে ছোট একটা লিভিংরুমে ঢুকল ওরা। বই আর ফ্রেমে বাঁধাই খবরের কাগজের সামনের পাতা সুন্দর করে সাজানো।
এই, কে? বায়ের ঘর থেকে এল চিৎকার।
ঢুকে দেখা গেল, ওটা স্টাডি। গাদা গাদা পুরানো খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন। ডেস্কের ওপর একটা টাইপরাইটার। পাশের বাক্সে রাখা টাইপ করা কিছু পাতা। বই লেখা চলছে বোধহয়।
মেঝেতে পড়ে আছেন এক বৃদ্ধ। মুখের কাটা থেকে রক্ত পড়ছে। ছেলেদের দিকে তাকালেন।
মাই গড! বলে তাড়াতাড়ি গিয়ে বৃদ্ধকে তুলল বোরিস। একটা ইজি-চেয়ারে শুইয়ে দিল।
এক গেলাস পানি এনে দিল এড। ঢকঢক করে সবটা পানি খেয়ে ফেললেন বৃদ্ধ। দাড়িওয়ালা এক লোক! মৃদু হাঁপাচ্ছেন তিনি। গালে কাটা দাগ, নাবিকের জ্যাকেট… তা, তোমরা কে?
টিক বানাউ! চিৎকার করে উঠল এড়।
পরিচয় দিয়ে কিশোর বলল, মিস্টার বুল পাঠিয়েছেন, স্যার। সানপ্রেসের সম্পাদক। আপনিই তো মিস্টার আলফ্রেড পেরিংটন?
হ্যাঁ, মাথা ঝোঁকালেন বৃদ্ধ। টিক বানাউ? সে-ই হামলা করেছিল?
চেহারার বর্ণনায় তো তাই মনে হয়। কি চেয়েছিল আপনার কাছে?
লম্বা দম নিলেন পেরিংটন। তাঁর কাটা মুছে দিয়ে বোরিস জানাল, ক্ষত সামান্য।
জোর করে ঢুকে পড়ল, বৃদ্ধ বললেন। আঠারশো ছিয়ানব্বইর নভেম্বরে একটা অগ্নিকাণ্ডের কথা জানতে চাইল।
গুপ্তধন খুঁজছে ব্যাটা, রেগে গিয়ে বলল এড। লিটল মারমেইডের গুপ্তধন।
আছে নাকি?
কিছু জানেন মনে হচ্ছে?
মাথা ঝাঁকালেন পেরিংটন। অনেক গবেষণা করেছি ওটার ব্যাপারে। ওই সময়কার প্রচুর কাটিং আছে আমার মর্গে।
বানাউকে বলে দিয়েছেন, স্যার? শঙ্কিত হয়ে উঠেছে কিশোর।
কিচ্ছু বলিনি। লোকটাকে দেখেই বুঝেছি, খারাপ। বলিনি বলেই তো মারল, তারপর গিয়ে ফাইল ঘাটতে লাগল। পেয়ে গেছে মনে হয়। নিয়ে বেরিয়ে গেছে। কাটিং।
কাঁধ ঝুলে পড়ল কিশোরের। নিয়ে গেছে! কি লেখা ছিল? জরুরি কিছু?
জানি না। তবে চেষ্টা করলে হয়ত বলতে পারব।
করবেন, স্যার? এড মিনতি করল, করুন না, স্যার, প্লীজ।
আমার সমস্ত ফাইল মাইক্রোফিল্ম করে রেখেছি। দেখি, ওই বাক্সটা আন তো।
ডেক্সের ওপর থেকে লম্বা, সরু একটা বাক্স এনে দিল এড। ভেতর থেকে মাইক্রোফিল্মের একটা ছোট বাক্স বের করলেন লেখক। এই যে, আঠারশো ছিয়ানব্বই। নাও, ওই রিডিং মেশিনে লাগাও।
ভিউয়ারে চোখ রেখে পড়তে আরম্ভ করল কিশোর। ছিয়ানব্বইর সেপ্টেম্বর থেকে শুরু। এই যে! হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল গোয়েন্দাপ্রধান। নভেম্বর, পনের। ডাইক অ্যাণ্ড সনস, শিপ শ্যাওলারস। আগুনে ওদের স্টোর হাউস পুড়ে গিয়েছিল। নিশ্চয় এটাই।
শিপ শ্যাণ্ডলার কি? জিজ্ঞেস করল এড।
জাহাজের খাবার আর দরকারি জিনিসপত্র সরবরাহ করে যারা।
ডাইক অ্যাণ্ড সনস? পেরিংটন বললেন। এখনও ব্যবসা করে ওরা। বন্দরে গিয়ে খোঁজ করলেই অফিস পেয়ে যাবে।
জলদি চল তাহলে, কিশোরকে বলল এড।
আগে ডাক্তার ডাকা দরকার, বোরিস বলল।
মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। না না, লাগবে না, আমি ভালই আছি। ডাক্তার ডেকে নিতে পারব। তোমরা গিয়ে দাড়িওয়ালা লোকটাকে ধর। ওকে ধরতে পারলেই আমি সুস্থ হয়ে যাব। যাও, জলদি যাও।
এক মুহূর্ত দ্বিধা করল কিশোর। তারপর মিস্টার পেরিংটনের দিকে চেয়ে হেসে, মাথা নেড়ে দরজার দিকে পা বাড়াল।
সহজেই খুঁজে পেল ওরা, ডাইক অ্যাণ্ড সনসের অফিস। বন্দরের একটা সরু গলিতে, পানির ধারেই। স্বাগত জানালেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক, এস এস, কি চাই?
আঠারশো ছিয়ানব্বই সালের রেকর্ড আছে আপনাদের? জানার জন্যে তর। সইছে না এডের। ব্যবসার খতিয়ান? জার্নাল, কিংবা ডায়েরী?
কিশোর বলল, আমার…।
ওই দাড়িওয়ালা শয়তানটার অ্যাসিসটেন্ট নাকি? নিমেষে হাসি হাসি মুখটা কঠোর হয়ে গেছে ভদ্রলোকের। যেতে পার।
না, না, স্যার, হাত নাড়ল কিশোর। পরিচয় দিল। সংক্ষেপে জানাল কি জন্যে এসেছে।
বাওরাড ডাই? আফসোেস করে বললেন ভদ্রলোক, পুরানো রেকর্ড নষ্ট হয়ে গেছে ভূমিকম্পে। দাড়িওলাকেও একথাই বলেছি।
দমে গেল কিশোর। রেকর্ড নেই! তাহলে বাওরাড ডাই কি কিনেছিলেন, কোনদিনই জানা যাবে না?
না… আচ্ছা, দাঁড়াও তো দেখি…।
প্রাইভেট লেখা একটা দরজা ঠেলে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন দ্রলোক।
অস্থির ভাবে অপেক্ষা করছে ছেলেরা। হঠাৎ হাত তুলল এড, কিশোর?
তাড়াতাড়ি জানালার কাছে এগিয়ে গেল কিশোর, এডের পাশে। কী?
স্টোরের ওপর চোখ রাখছে মনে হয়?
কোথায়?
ওই যে, রাস্তার শেষ মাথায়। আরি, চলে গেল, একটা বিল্ডিঙের আড়ালে। আমরা যে দেখেছি বোধহয় বুঝে ফেলেছে। টিক বানাউ না তো?
ফিরে তাকাল কিশোর। ভদ্রলোক এখনও ফেরেননি। জাহাজের একটা পুরানো ঘড়ি দেখছে মন দিয়ে বোরিস। ইশারায় এডকে আসতে বলে দরজার দিকে পা বাড়াল কিশোর।
জাহাজ ঘাটের দিকে এগিয়ে চলল দুজনে। বাড়িঘরের আড়ালে আড়ালে থাকছে যতটা সম্ভব। একটা বাড়ির কোণে এসে থমকে গেল এড। কিশোর। সবুজ ফোক্সওয়াগেন।
চওড়া রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে ছোট গাড়িটা। তার ওপাশে, গোঁফওয়ালা এক তরুণ তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে যাচ্ছে একটা কাঠের বার্জের দিকে।
টিক বানাউ নয়, ফিসফিস করে বলল কিশোর। নোবল।
পানির কিনারে ভেজা বালি। বার্জের অর্ধেকটা বালিতে বসে গেছে, বাকি অর্ধেক পানিতে। অচল। ওটার অন্যপাশে হারিয়ে গেল তরুণ।
কারও সাথে দেখা করতে গেছে, অনুমান করল কিশোর।
টিক বানাউ?
চল, দেখি।
রাস্তা পেরিয়ে, সাবধানে বার্জের দিকে এগোল ওরা। কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেল। কান পাতল, ওপাশে কি কথা হয় শোনার জন্যে। কিন্তু কিছুই শোনা গেল না।
বেশি দূরে, এড বলল। চল ঘুরে গিয়ে দেখি।
না। দেখে ফেলবে। তারচে উপরে উঠি।
বার্জের এক পাশে একটা মই লাগানো। কাত হয়ে আছে ঝর্জটা, ফলে মই বেয়ে উঠতে অসুবিধে হয়। অনেক কায়দা কসরত করে শেষ পর্যন্ত উঠল ওরা। পা টিপে টিপে এগোল ডেকের ওপর দিয়ে। অন্য ধারে যাওয়া আর হল না, তার আগেই মড়মড় করে ভাঙল প্লচা তক্তা।
হুঁক! করে উঠল কিশোর। ভেজা, নরম কিছুর ওপর পড়েছে।
পুরানো বস্তা। বস্তার ওপর পড়েছি।
মাথার ওপরে গোল ফোকর-হ্যাচের ঢাকনা ভেঙে পড়েছে ওরা, আবছা আলো আসছে সেখান দিয়ে। বার্জের খোলে পড়েছে। ভেজা, ভ্যাপসা দুর্গন্ধ। খোলের পাশেও এক জায়গায় তক্তায় ফাটল, হালকা আলো আসছে ওপথেও। মাথার ওপরের ফোকরটা বারো ফুট ওপরে।
কোন কিছুর ওপর দাঁড়াতে পারলে ধরা যেত, কিশোর বলল।
পিচ্ছিল খোলে হেঁটে বেড়াল ওরা। উঠে দাঁড়ানোর মত কিছুই চোখে পড়ল। বস্তা ছাড়া আর কিছু নেই। বাক্স, তক্তা, দড়ি, মই, কিছু না। অন্ধকার কোণে খচমচ করে নড়ছে কি যেন।
ইঁদুর, এড বলল। কিশোর, এখান থেকে বেরোনোর কোন রাস্তা নেই।
দেখি আরেকবার খুঁজে। এমাথা থেকে ওমাথা, কোথাও বাদ দেব না
পেছনের শেষ প্রান্তে এসে ছপ করে পানিতে পা দিয়ে ফেলল কিশোর। অল্প পানি জমে রয়েছে। ঢোক গিলল সে। এড, গলা কাপছে। জোয়ারের সময় পানিতে ডুবে যায় এটা।
দ্রুত আবার ফোকরটার নিচে ফিরে এল ওরা।
চেঁচাই?.এড বলল।
এই সময় ফোকর দিয়ে উঁকি দিল একটা মুখ। তরুণ। কালো গোঁফ। চেঁচিয়ে লাভ হবে না, হেসে বলল সে। শীতকালে এদিকে বড় একটা আসে না কেউ। তাছাড়া রাস্তা এখান থেকে অনেক দূরে, গাড়িঘোড়ার গোলমাল। গলা ফাটিয়ে চেঁচালেও কেউ শুনবে না। আবার-হাসল লোকটা। তার চেয়ে এক কাজ করা যাক, এস, কথা বলি।
<