চাঁদ নেই। গাঢ় অন্ধকারে ড়ুবে আছে। ব্ল্যাক ক্যানিয়ন। তারার আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে টেরর ক্যাসলের অবয়ব।
আরিকবাপারে, কি অন্ধকারা ফিসফিসিয়ে বলল কিশোর। যা থাকে কপালে, চল ঢুকে পড়ি।
মুসার হাতে নতুন টর্চ। হাত খরচের পয়সা বাঁচিয়ে কিনেছে। আগের টর্চাটা এখনও উদ্ধার করা যায়নি, নিশ্চয় পড়ে আছে মমিকেসের কাছে। টেরর ক্যাসলের লাইব্রেরিতে।
সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠতে শুরু করল দুজনে। এক পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা, সামান্য খোঁড়াচ্ছে কিশোর। অখণ্ড নীরবতা। তাদের পায়ের চাপা শব্দই অনেক বেশি জোরাল মনে হচ্ছে। হঠাৎ কাছের একটা ছোট ঝোপের ভেতরে শব্দ হল। বেরিয়ে ছুটে পালাল কি যেন! টর্চের আলো ফেলল। মুসা। একটা খরগোশ।
মনে জানান দিয়েছে ব্যাটার, আজ গোলমাল হবে ক্যাসলে, বিড়বিড় করে বলল মুসা। বুদ্ধিমানের মত আগেই পালিয়ে যাচ্ছে।
কোন জবাব দিল না কিশোর। বারান্দা পেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। টান দিল হাতল ধরে। এক চুল নড়ল না পাল্লা।
এস, হাত লাগাও, বলল কিশোর। আটকে গেছে দরজা।
দুজনে চেপে ধরল। পিতলের বড় হাতল। জোরে হ্যাঁচকা টান লাগল। খুলে চলে এল হাতল। টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পেছনে পড়ে গেল দুজনে।
উফফা ওপর থেকে কিশোরকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করে। বলল মুসা, সর সারা পেটের ওপর পড়েছা দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমার!
মুসার পেটের ওপর থেকে গড়িয়ে সরে এল কিশোর। উঠে দাঁড়াল।
মুসাও উঠল। টিপেটুপে দেখছে কোথাও ভেঙেছে কিনা বুকের পাঁজরী। নাহ, ঠিকই আছে মনে হচ্ছে।
মুসার কথায় কান নেই কিশোরের। টর্চের আলোয় পরীক্ষা করে দেখছে হাতলটিা।
দেখেছ? বলল কিশোর। হাতলের ছিদ্রে আটকে আছে স্কুগুলো। মাথার খাঁজে খোঁচার দাগ।
ঘষা লেগেছে হয়ত কোন কারণে। গত পনেরো দিনে অনেকবার টানা হয়েছে। ওটা ধরে। পুরানো জিনিস। সইতে পারেনি। খুলে এসেছে।
আমি অন্য কথা ভাবছি, বলল কিশোর। খুলে আসতে সাহায্য করা হয়নি তো? মানে, চিল করে রাখা হয়নি তো?
খালি সন্দোহা বলল মুসা। দরজা খুলতে না পারলে ভেতরে ঢুকব কি করে? ফিরেই যেতে হবে।
না। ঢোকার অন্য কোন পথ বের করতে হবে। ওই যে, পাশে আঙুল তুলে দেখােল কিশোর। জানালা। ওদিক দিয়ে চেষ্টা করে। দেখি, চিল।
বারান্দার এক প্রান্তে চলে এল দুজনে। দেয়ালে বড় বড় জানালা, ফ্রেঞ্জ উইন্ডো। আঙিনার দিকে মুখ করে আছে। মোট ছয়টা। ঠেলোঁঠুলে দেখল ওরা। পাঁচটাই ভেতর থেকে আটকানো। একটা পাল্লার ছিটিকিনি ভাঙা। আধইঞ্চি মত ফাঁকা হয়ে আছে। ধরে টান দিল। কিশোর। জোর লাগল না, হা হয়ে খুলে গেল পাল্লা। ভেতরে উঁকি দিল সে। গাঢ় অন্ধকার।
টর্চের আলো ফেলল। কিশোর। লম্বা একটা টেবিল চোখে পড়ল। চারপাশে চেয়ার। টেবিলের শেষ মাথায় কয়েকটা বাসন পড়ে আছে।
ডাইনিং রুম, নিচু গলায় বলল কিশোর। এদিক দিয়ে ঢুকতে পারব।
জানোলা টপকে ভেতরে এসে ঢুকল দুজনে। আলো ফেলে। দেখল কি কি আছে। ঘরের ভেতরে। দেয়ালের একপাশে বসানো কাঠের বড় দেয়াল আলমারি। পাশে কয়েকটা তাক।
দরজা কয়েকটা, বলল কিশোর। কোনটা দিয়ে যাব?
ফিরে গেলেই ভাল…ওরেকবাপারে! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। কথা বেরোল না। আর। গলা টিপে ধরেছে যেন কেউ।
কি, ক্কি হল? কাছে সরে এল কিশোর।
ও-ওই যো তোতলাচ্ছে মুসা। ও-ওটা।
মুসার নির্দেশিত দিকে তাকাল কিশোর। স্থির হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। আবছা আলোয় দেখল, লম্বা একটা মেয়ে চেয়ে আছে তাদের দিকে। পরনে তিনশো বছর আগের পোশাক। গলায় দড়ির ফাঁস। দড়ির অন্য মাথা বুকের ওপর দিয়ে ঝুলছে, নেমে এসেছে মাটিতে।
আপলকে চেয়ে আছে মুসা আর কিশোর। মেয়েটাও চেয়ে আছে ওদের দিকে।
মুসা ধরেই নিয়েছে, ওটা প্ৰেতাত্মা। বাড়ি ছিল ইংল্যান্ডে। ফাঁসি দিয়ে মরেছে, ওই যার কথা বলেছে হ্যারি প্রাইস।
দীর্ঘ কয়েকটা মুহূর্ত। তারপর কিশোর বলল, আমি বললেই সরাসরি ওটার ওপর আলো ফেলবো ফেল!
নড়ে উঠল মেয়েটা। নড়ে উঠল একটা চকচকে কি যেন।
একই সঙ্গে ঘুরে গেল দুটো টর্চ।
কিন্তু কোথায় মেয়ে! একটা বড় আয়নার ওপর আলো পড়েছে। প্রতিফলিত হয়ে এসে লাগছে দুজনের চোখে।
আয়না অবাক গলায় বলল মুসা। তারমানে আমাদের পেছনে রয়েছে মেয়েটা।
পাই করে ঘুরল মুসা। আলো ফেলল। পেছন দিকে। নেই। কোন মেয়ে নেই। শুধু দেয়াল।
চলে গেছে। মুসার গলায় ভয়। আমিও যাচ্ছি। এই ভূতের আড্ডায় আর আমি নেই। পা বাড়ল সে।
দাঁড়াও! সঙ্গীর হাত চেপে ধরল। কিশোর। আয়নার দিকে চেয়েছিলাম আমরা। মেয়েটেয়ে নয়, চোখের ভুলও হতে পারে। বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল আমাদের।
হলে না কেন? ক্যামেরা তো তোমার কাঁধেই। ছবি তুললে না কেন?
ভুলেই গিয়েছিলাম। ক্যামেরার কথা। নিজের ওপর ওপরই বিরক্ত কিশোর।
মনে থাকলেও লাভ হত না। ছবি ওঠে না ভুতের। ওরা অশরীরী। ভুতের।
ওরা তো অশরীরীর প্রতিবিম্ব হয় না, মনে করিয়ে দিল কিশোর। মানে দাঁড়াচ্ছে, সে অশরীরী নয়। আয়নার ভেতরে ছিল, তাই বা বিশ্বাস করি কি করে। আয়না-ভূতের কথা শুনিনি কখনও! আবার যদি দেখা দিত মেয়েটা।
দেখা না দিলেই ভাল, জোরে বলল মুসা, ভূতকে শোনাল যেন। আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কি হবে? কি দেখবে? টেরর ক্যাসলে। ভূত আছে, এটা প্রমাণ হয়ে গেল। চল, ফিরে গিয়ে সব জানাই মিস্টার ক্রিস্টোফারকে।
এখুনি ফিরে যাব কি? মাত্র তো এলাম। আরও অনেক কিছু জানার আছে। নীল ভূতকে না দেখে যাব না। ছবি তুলব। ওটার, স্থির শান্ত গলা কিশোরের।
কিশোর ভয় পাচ্ছে না, সে অত ঘাবড়াচ্ছে কেন?—নিজেকে ধমক লাগাল মুসা। কাঁধ ঝাঁকাল। ঠিক আছে। আচ্ছা, এক কাজ করলে তো পারি? এ ঘর থেকেই চকের চিহ্ন রেখে যাই আমরা।
ঠিক বলেছা হল কি আমার! সব খালি ভুলে যাচ্ছি।
খোলা জানালাটার কাছে এগিয়ে গেল কিশোর। এটা দিয়েই ঢুকেছে। ওরা। পাল্লায় বড় করে একটা প্ৰশ্নবোধক আকল। ডাইনিং টেবিলে আকল একটা। তারপর গিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। প্ৰশ্নবোধক আঁকবে। আমরা এ ঘরে ছিলাম, জানবে হ্যানসন আর রবিন।
আমরা আর ফিরে না গেলে, তখন তো? প্রশ্ন করল মুসা।
জবাব দিল না কিশোর। আয়নায় প্রশ্নবোধক আকার চেষ্টা করল। প্রথমবারে চকের দাগ বসল না ঠিকমত। দ্বিতীয়বার জোরে চাপ দিয়ে আঁকতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘটল একটা অদ্ভুত কাণ্ড। নিঃশব্দে পেছনে সরে গেল আয়না, দরজার পাল্লার মত। ওপাশে প্যাসেজ। গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা।
<