ধুত্তরি। মুখ গোমড়া মুসার। কখনও পারি না-ওর সঙ্গে। কথার প্যাঁচে ফেলে দিয়ে ঠিক কাজ আদায় করে নেয়।
ঠিক, সায় দিল রবিন। আর কিছু বলল না।
গিরিপথে এসে দাঁড়িয়েছে দুজনে। সামনেই পাহাড়ের ঢালে টেরার ক্যাসল আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে সূর্য। তেরছাভাবে রোদ এসে পড়েছে বিশাল টাওয়ারের গায়ে। পেঁচিয়ে ওঠা আঙুর-লতার ফাঁকে ফাঁকে শাৰ্শিভাঙা জানালার ফোকর, ভয়াবহ দানবের চোখ যেন।
শিউরে উঠল একবার রবিন। চল, ঢুকে পড়ি। সুরুজ ড়ুবতে বড়জোর আর দুঘন্টা। তারপর ঝাপাৎ করে নামবে অন্ধকার।
ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল দুজনে। মাঝামাঝি উঠে পেছনে ফিরে চাইল একবার মুসা। বাঁকের ওপারে। পাথরের স্তুপের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রোলস রয়েস। অপেক্ষা করছে। হ্যানসন।
কি মনে হয়? উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করল মুসা। এবারেও শুটকি ফলো করছে আমাদের?
না, এদিক ওদিক মাথা নাড়ল রবিন। পা ভাঙা। উঠতে কষ্ট হচ্ছে তার, কিন্তু মুসাকে বুঝতে দিচ্ছে না। আমি খেয়াল রেখেছিলাম। ওর নীল গাড়ির ছায়াও দেখিনি। কিশোরের ধারণা, টেরর ক্যাসলের ধার মাড়াবে না। আর শুটকি।
আমরাও মাড়াতে চাইনি, জোর করে পাঠানো হয়েছে। তবে, শুটকিকে হয়ত জোর করেও পাঠানো যাবে না।
রবিনের কাঁধে বুলছে ক্যামেরা। মুসার হাতে টেপ রেকর্ডার। কোমরের বেল্টে আটকে নিয়েছে টৰ্চ, দুজনেই। টেরর ক্যাসলের বারান্দায় উঠে এল ওরা। হলে ঢোকার বড় দরজাটা বন্ধ।
তাজ্জব ব্যাপার তো! ভুরু কুঁচকে গেছে মুসার। শুটকি দরজা খোলা রেখেই পালিয়েছিল, দেখেছি।
বাতাসে বন্ধ হয়ে গেছে হয়ত, বলল রবিন।
হাত বাড়িয়ে দরজার নব চেপে ধরল। মুসা। ঘোরাল। ঠেলা দিতেই তীক্ষ্ণ ক্যাঁ-অ্যাঁ-চ্- চ্- চ্ শব্দ করে খুলে গেল ভারি দরজা।
মরচে পড়ে গেছে কবজায়, মন্তব্য করল রবিন। ওই শব্দে ভয় পাবার কিছু নেই, নিজেকেই যেন বোঝাল সে।
কে বলল, ভয় পেয়েছি? স্বীকার করতে রাজি না মুসা।
দরজা খোলা রেখেই হলে ঢুকে পড়ল। ওরা। হলের এক পাশে একটা বড় ঘর। ঢুকাল ওরা। পুরানো আসবাবপত্রে বোঝাই। কাঠের ভারি ভরি চেয়ার টেবিল, বিরাট ফায়ার প্লেস। রহস্যজনক কিছু দেখলেই ছবি তুলে নিতে বলে দিয়েছে কিশোর। কিন্তু তোলার মত তেমন কিছুই চোখে পড়ল না রবিনের। তবু ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘরের গোটা দুয়েক ছবি তুলে নিল সে।
তারপর ইকো রুমে এসে ঢুকাল ওরা। ঘরে আবছা আলো আঁধারির খেলা! গা শিরশিরে একটা অনুভূতি আবহাওয়ায়, অস্বস্তিকর। বিচিত্র আর্মার স্যুট আর বিভিন্ন ভঙ্গিতে তোলা জন ফিলবির ছবিগুলোর দিকে চাইলে আরও বেড়ে যায় অস্বস্তি ভাবটা। একপাশে সিঁড়ি, দোতলায় উঠে গেছে। মাঝামাঝি জায়গায় একপাশের দেয়ালে কয়েকটা জানালা। কাচের শার্শি। ধুলোর পুরু আস্তরণ। ওপথেই আসছে আলো।
মিউজিয়ম মনে হচ্ছে, বলল রবিন। জানই তো, যে-কোন মিউজিয়মে ঢুকলেই কেমন জানি হয়ে যায় মন।
ঠিক, সায় দিল মুসা। ঠিক ধরেছ। সেই অনুভূতি। মিউজিয়মে ঢুকলে এমন হয়। কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেল সে। ধুলো-বালি, পুরানো, কেমন যেন মরা মরা…।
মরা-অরা-অরা-অরা-অরা-অর!
ঘরের ঠিক মাঝামাঝি গিয়ে শেষ শব্দটা উচ্চারণ করছে মুসা, বেশ জোরে। এক লাফে পিছিয়ে এল।
ওরে-ব্বাপরে! এত জোরালা বলতে বলতেই ঘরের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল রবিন। প্ৰতিধ্বনি।
ধ্বনি-অনি-অনি-অনি-অনি-অনি!
হাত চেপে ধরে একটানে রবিনকে সরিয়ে আনল। মুসা। ওখানে দাঁড়িয়ে জোরে কথা বললেই ওই কাণ্ড ঘটে।
প্ৰতিধ্বনি পছন্দ করে রবিন। জোরে হাল্লো বলার ইচ্ছেটা চাপা দিতে হল। ইকো হলের প্রতিধ্বনি মজার নয়, বরং কেমন অস্বস্তি জাগায়।
চল, ছবিটা দেখি, বলল রবিন। ওই যে, যেটা চোখ টিপেছিল তোমার দিকে চেয়ে।
ওই তো, হাত তুলে দেখাল মুসা। জলদস্যুর সাজে জন ফিলবি।
চল, ভালমত দেখি, বলল রবিন। একটা চেয়ারে দাঁড়িয়ে দেখ তো, নাগাল পাও কিনা।
ভারি, পিঠবাঁকা একটা কাঠের চেয়ার ছবিটার তলায় নিয়ে এল মুসা। উঠল চেয়ারে। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েও নাগাল পেল না ছবিটার।
ওই যে একটা ব্যালকনি, ছবিটার ওপর দিকে চেয়ে বলল রবিন। ওখান থেকে লম্বা তার দিয়ে বুলিয়ে দেয়া হয়েছে ছবি। চল উঠে যাই। তার ধরে টেনে তুলে নিতে পারব ছবিটা।
সিড়ির দিকে এগোনোর জন্যে ঘুরে দাঁড়াতে গেল। রবিন। আধাপাক ঘুরেছে, এই সময় তার ক্যামেরা-কেসের চামড়ার ফিতে আটকাল কেউ। চমকে ফিরে চাইল রবিন। ঠিক তার পেছনে, আবছা! অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা এক মূর্তি। গলা চিরে বিকট চিৎকার বেরিয়ে এল। তার, খিচে দৌড় মারতে চাইল দরজার দিকে।
পারল না। ফিতোয় হ্যাঁচকা টান লাগল, আবার পিছিয়ে গেল। রবিন। ভারসাম্য হারাল। কান্ত হয়ে গেল এক পাশে। মুখ ফিরিয়ে চাইল কি আছে পেছনে। আর্মর সুট পরা এক বিরাট মূর্তি, কোপ মারার ভঙ্গিতে মাথার উপর তুলে রেখেছে তলোয়ার।
আবার চিৎকার বেরোলি রবিনের গলা চিরে। পড়ে গেল। মার্বেলের মেঝেতে। সঙ্গে সঙ্গে গড়ান দিয়ে সরে গেল একপাশে।
খটাং করে মেঝেতে পড়ল তলোয়ার, মুহূর্ত আগে ঠিক ওই জায়গাতেই ছিল রবিন। তলোয়ারের পাশেই পড়ল। মূর্তিটা। বদ্ধ ঘরে বিকট আওয়াজ হল। ইস্পাতের খালি ড্রােম পড়ল যেন একটা।
ফিতেয় টান নেই। আর এখন। গড়িয়ে দূরে সরে গেল। রবিন। দেয়ালে এসে ঠেকার আগে থামল না। ফিরে চাইল। খাড়া হয়ে গেছে ঘাড়ের চুল। তার দিকে তেড়ে আসছে না। আর্মর সুট পরা মূর্তি। ধড় থেকে মাথা আলাদা হয়ে গেছে। ওটার। গড়াতে গড়াতে চলে যাচ্ছে মেঝের ওপর দিয়ে। থেমে গোল দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে।
আরও কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে উঠল রবিন। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল পড়ে থাকা ধড়টার দিকে। পাশে গিয়ে বসল ভয়ে ভয়ে। ধড়ের গলার ভেতরে একবার উঁকি দিয়েই হাঁপ ছাড়ল। খালি। আসলে ওটা একটা আর্মর সুট। আস্ত। কায়দা করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল দেয়ালে ঠেকা দিয়ে। একটা হাত ওপরের দিকে তুলে আটকে দেয়া হয়েছিল কোনভাবে। হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল তলোয়ার। খুব কাছাকাছি গিয়েছিল রবিন। বেঁধে গিয়েছিল ফিতে। রবিন পাশে ঘোরার সময় টান লেগেছে, পড়ে গেছে মূর্তিটা। চোট সইতে না পেরে গলা থেকে আলগা হয়ে গেছে লোহার শিরস্ত্ৰাণ।
চোখ বড় বড় করে সুটটার দিকে চেয়ে আছে। রবিন। চমকে উঠল অট্টহাসির শব্দে। হো হো করে ঘর ফাটিয়ে হাসছে মুসা।
হাসিতে যোগ দিল না। রবিন। বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ে থাকা সুটের ধড়ের একটা ছবি তুলল। আরেকটা ছবি তুলল। মুসার।
যাক, বলল রবিন। ক্যাসলের এক ভূতের ছবি তুললাম। চেয়ারে দাঁড়িয়ে হাসছে। দেখে নিশ্চয় মজা পাবে কিশোর।
ক্যামেরাটা আমার হাতে থাকা উচিত ছিল, রবিন, চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল মুসা। কত হয়ে পড়ে যাচ্ছ তুমি। পেছনে তলোয়ার উচিয়ে আছে আর্মর সুট পরা এক মূর্তি। আহ, যা দারুণ একখান ছবি হত না আবার হাসতে লাগল সে।
আর্মর সুটটার দিকে একবার তাকাল রবিন। দৃষ্টি দিয়ে ওটাকে ভস্ম করার চেষ্টা চালাল যেন। ব্যর্থ হয়ে ফিরল দেয়ালে ঝোলানো ছবির দিকে। ক্যামেরা চোখের সামনে তুলে এনে শটাশট শাটার টিপে চলল। একের পর এক।
কয়েকটা ছবি তুলে নিয়ে মুসার দিকে ফিরল রবিন। হাসি। থামবে এবার? অনেক কাজ পড়ে আছে। ওই যে দরজাটা, চল ওঘরে ঢুকি। দরজার কপালে বসানো প্লেটের লেখা পড়ল, প্রোজেকশন রুম।
চেয়ার থেকে নেমে এল মুসা। বাবার মুখে শুনেছি, আগে বড় বড় অভিনেতার বাড়িতে নিজস্ব প্রোজেকশন রুম থাকত। ঘরে বসেই নিজের ছবি দেখত, বন্ধুদের দেখাত। চল দেখি ঘরটা।
হাতল ধরে জোরে টান দিল রবিন। ধীরে ধীরে খুলে গেল পাল্লা, যেন ওপাশ থেকে টেনে ধরে রেখেছে। কেউ। এক ঝলক হাওয়া এসে ঝাপটা মারাল গায়ে, নাকে এসে লাগল ভ্যাপসা গন্ধ। দরজার ওপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নিরেট অন্ধকার।
বেল্টে ঝোলানো টর্চ খুলে নিল মুসা। আলো ফেলল ভেতরে।
অন্ধকারের কালো চাদর ফুড়ে বেরিয়ে গেল আলোক রশ্মি। চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রোজেকশন রুম। বেশ বড় একটা হলঘর। কয়েক সারিতে রাখা হয়েছে শখানেক চেয়ার! একপ্ৰান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট এক পাইপ অর্গান!
মুভি-থিয়েটারের মত সাজানো হয়েছে, বলল মুসা। অর্গানটা দেখেছ? রাশেদ চাচারটার চেয়েও অনেক বড়।
নিজের টর্চ খুলে আনল রবিন। সুইচ টিপল। আলো জ্বলল না। ভাল করে দেখে বুঝল, ভেঙে গেছে। কাচ। সে যখন মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল, বাড়ি লেগেছিল তখনই।
একটা টর্চের আলোই যথেষ্ট। প্রোজেকশন রুমের ভেতরে এসে ঢুকল দুজনে। এগোেল পাইপ অর্গানটার দিকে।
হাসাহাসি করে হালকা হয়ে গেছে মন।। ভয় কেটে গেছে। দুজনেরই। অর্গানের কাছে এসে দাঁড়াল ওরা।
ছাতের কাছাকাছি উঠে গেছে বিশাল পাইপগুলো। ধুলোবালি আর মাকড়সার জাল লেগে আছে। অর্গানের একটা ছবি তুলল রবিন।
আলো ফেলে ফেলে পুরো ঘরটা দেখল ওরা। যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চেয়ারগুলো। জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে ছাল-চামড়াগদি। ছবি দেখানোর পর্দার জায়গায় বুলিছে এখন কয়েক ফালি সাদা কাপড়। গুমোট গরম ঘরে।
এখানে কিছু নেই, বলল মুসা। চল, ওপরে যাই।
প্রোজেকশন রুম থেকে বেরিয়ে এল ওরা। ইকো হল পেরিয়ে এক প্রান্তের সিড়ির গোড়ায় চলে এল। উঠতে শুরু করল সিঁড়ি বেয়ে। আধাপাক ঘুরে দোতলায় গিয়ে শেষ হয়েছে সিঁড়ির আরেক মাথা। মাঝামাঝি উঠে থামল ওরা। ধুলোয় ঢাকা জানালার শার্শি দিয়ে বাইরে তাকাল। চোখে পড়ছে গিরিপথ।
আরও ঘন্টা দেড়েক আলো থাকবে, বলল রবিন। এরমধ্যেই দেখে নিতে হবে যা দেখার।
আগে জলদস্যুর ছবিটা ভালমত দেখি, চল, পরামর্শ দিল মুসা।
ব্যালকনিতে এসে থামল ওরা। দুজনেই ধরল। ছবির তার, টান দিল। ভীষণ ভারি ফ্রেম। দুজনে টেনে তুলতেও বেগ পেতে হল।
উঠে এল ছবি। ওটার ওপর টর্চের আলো ফেলল। মুসা। সাধারণ ছবি। তেল রঙে আঁকা, এজন্যেই আলো পড়লে সামান্য চকচক করে। রবিনের ধারণা হল, হয়ত বিশেষ কোন একটা দৃষ্টিকোণ থেকে ছবির চোখের দিকে চেয়েছিল মুসা, চকচক করতে দেখেছিল। জ্যান্ত চোখ বলে মনে হয়েছিল তখন। সেটা তাকে বলল রবিন।
কিন্তু সন্দেহ গেল না মুসার। জ্যান্তই মনে হয়েছিল! কি জানি, ভুলও দেখে থাকতে পারি। যাকগে, আবার নামিয়ে রাখি ছবিটা, এস।
আবার আগের জায়গায় ছবিটা বুলিয়ে রাখল। ওরা। সরে এল ব্যালকনি থেকে। আবার চলে এল সিঁড়িতে।
সিঁড়ি ভেঙে উঠতেই থাকল। ওরা। একটু পরেই মোটা থামের মত একটা টাওয়ারের ভেতরে আবিষ্কার করল নিজেদেরকে। চারদিকে ছোট ছোট জানালা। বাইরে তাকাল। ক্যাসলের চুড়ার কাছে উঠে এসেছে ওরা। অনেক নিচে ব্ল্যাক ক্যানিয়ন। যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়।
আরো দেখেছা হঠাৎ বলে উঠল মুসা। একটা এরিয়্যালা টেলিভিশনের
চাইল রবিন। ঠিকই। ওদের একেবারে কাছের পাহাড় চুড়োয় দাঁড়িয়ে আছে একটা এরিয়্যাল। হয়ত পাহাড়ের ওপাশেই রয়েছে কোন বাড়ি। ভাল রিসিপশনের জন্যে এরিয়্যালটা লাগিয়েছে বাড়ির লোকো
পাহাড়ের মাঝে মাঝে অনেক গিরিপথ রয়েছে, দেখেছ? আঙুল তুলে একটা দিক দেখিয়ে বলল মুসা। ব্ল্যাক ক্যানিয়নের মত নির্জন নয় ওগুলো।
ডজন ডজন সরু গিরিপথ আছে। এদিকে পাহাড়ের ভেতরে ভেতরে, বলল রবিন। আমি ভাবছি। এরিয়্যালটার কথা। পাহাড়ের ঢাল কি খাড়া দেখেছ? ওতে চড়তে চাইলে… মনে হচ্ছে, ওদিক দিয়ে ঘুরে যেতে হবে।
আমারও তাই ধারণা, বলল মুসা। চল, নামি। এখানে আর কিছু দেখার নেই।
খানিকটা নেমে একটা বড় ঘরে এসে ঢুকাল ওরা। গাদা গাদা বই র্যাকে। লাইব্রেরি। এখানকার দেয়ালেও অনেক ছবি ঝোলানো, ইকো হলের ছবিগুলোর চেয়ে আকারে ছোট।
চল, দেখি ছবিগুলো, প্ৰস্তাব রাখল মুসা।
রবিন রাজি।
জন ফিলবির অভিনীত ছবির দৃশ্য। কোথাও সে জলদস্যু, কোথাও ছিনতাইকারী, ওয়্যারউলফ, জোম্বি, ভ্যাম্পায়ার, আবার কোথাও বা সাগর থেকে উঠে আসা কোন নাম-না জানা ভয়াবহ দানব।
ইস্স্ ফিল্মগুলো যদি দেখতে পারতাম! বলল মুসা। একই লোকের মত চেহারা!
লোকে এজন্যেই তাকে লক্ষ্যমুখে ডাকত, মনে করিয়ে দিল। রবিন। আরে, দেখ দেখ!
এক জায়গায় দেয়ালের একটা চারকোণা ফোকরে একটা বাক্স, মমিকেস। ডালা বন্ধ। রূপার একটা প্লেট লাগানো বাক্সের গায়ে। এগিয়ে গিয়ে প্লেটে টর্চের আলো ফেলল। মুসা। খোদাই করে। ইংরেজিতে লেখা রয়েছেঃ
জন ফিলবি,
তোমার অভিনীত ছবি দেখে অনেক মজা পেয়েছি বেঁচে থাকতে। মৃত্যুর পর আমার দেহের এই বিশেষ অংশগুলো তোমাকেই দান করে গেলাম। তোমার মিউজিয়মে সাজিয়ে রেখা।
— পিটার হেনশ।
সেরেছে, চাপা গলায় বলল মুসা। ভেতরে কি আছে।
আর কি? নিশ্চয় মমি-টমি কিছু।
অন্য কিছুও হতে পারে! এস, দেখি!
ডালা ধরে ওপরের দিকে টান দিল মুসা। বেজায় ভারি। তুলতে কষ্ট হচ্ছে।
ডালাটা অর্ধেক উঠে যেতেই ভেতরে চাইল মুসা। ওরেকবাপারে! বলেই ছেড়ে দিল ডালা। সরে এল এক লাফে।
কি, ক্কি হল? রবিনের গলায় উৎকণ্ঠা।
দাঁত বের করে হাসছে। কঙ্কাল! উরিববাপারে!
বার দুই ঢোক গিলিল রবিন। কঙ্কাল নড়েচড়ে ওঠেনি তো!
বুঝতে পারলাম না!
এস তো, আবার তুলে দেখি!
ভয়ে ভয়ে এসে আবার ডালা ধরল মুসা। রবিনও হাত লাগাল।
ডালা তুলে ভেতরে উঁকি দিল দুজনেই। সাধারণ একটা কঙ্কাল পড়ে আছে চিত হয়ে। না, নড়ছে না। একেবারে স্থির।
খামোকা ভয় পেয়েছ, বলল রবিন। নিশ্চয় ওটা পিটার হেনশর কঙ্কাল। একটা ছবি তুলে নিই। কিশোর খুশি হবে।
ছবি তুলে নিল রবিন। মুসা নেই ওখানে। জানালার ধারে সরে যাচ্ছে।
সর্বনাশ! হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল মুসার। রবিন, জলদি কর! অন্ধকার…
তা কি করে হয়? হাতঘড়ির দিকে চাইল রবিন। এখনও এক ঘন্টা আলো থাকার কথা!
কি জানি! দেখে যাও!
জানালার ধারে সরে এল রবিন। ঠিকই, বাইরে গিরিপথে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। উঁচু পাহাড়ের ওপারে হারিয়ে গেছে সূৰ্য।
ভুলেই গিয়েছিলাম, রবিনের গলায় শঙ্কা, এসব পাহাড়ী অঞ্চলে সূর্য একটু তাড়াতাড়িই ডোবে।
চল, বেরিয়ে পড়ি, তাগাদা দিল মুসা। অন্ধকারে এখানে এক মুহূর্ত থাকতে রাজি নই আমি।
বারান্দায় বেরিয়ে এল ওরা। দুই প্ৰান্ত থেকেই সিঁড়ি নেমে গেছে। দেখতে ঠিক একই রকম। কাছের সিড়িটার দিকে এগিয়ে গেল ওরা। নামতে শুরু করল।
এক জায়গায় এসে শেষ হল সিড়ি। একটা হল ঘরে এসে ঢুকেছে। ওরা। আবছা অন্ধকার। এক নজর দেখেই বুঝল, এটা ইকো রুম নয়, অন্য ঘর। এক প্ৰান্ত থেকে সিড়ি নেমে গেছে।
এদিক দিয়ে যাইনি আমরা, বলল রবিন। চল ফিরি। ওপর তলায় উঠে অন্য সিড়ি দিয়ে নামব।
কি দরকার? বাধা দিল মুসা। ওই তো সিঁড়ি নেমে গেছে। নিশ্চয় নিচের তলায়ই নেমেছে।
অপ্ৰশস্ত সিঁড়ি। গায়ে গায়ে ঠেকে যায়। দ্রুত নেমে চলল। দুজনে। কয়েক ধাপ নেমেই সরু ছোট একটা প্যাসেজে শেষ হয়েছে সিঁড়ি। প্যাসেজের দুপাশে দেয়াল। ও মাথায় দরজা।
তাড়াতাড়ি দরজার কাছে চলে এল ওরা। ঘন হয়ে আসছে অন্ধকার। নব ঘুরিয়ে ঠেলা দিতেই দরজা খুলে গেল! ওপাশ থেকে আবার সিঁড়ি নেমেছে। মুসা চলে গেল ওপাশে। ছেড়ে দিতেই বন্ধ হয়ে যেতে চাইল স্প্রিং লাগানো পাল্লা। খপ করে আবার ধরে ফেলল। সে। রবিনও চলে এল এপাশে। পাল্লা ছেড়ে দিল মুসা।
দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই গাঢ় অন্ধকার গ্ৰাস করল ওদেরকে।
চল ফিরে যাই। আবার বলল রবিন। এই অন্ধকারে অচেনা পথে চলতে মন সায় দিচ্ছে না।
ঠিকই বলেছ। এখন আমারও কেমন কেমন লাগছে! ফিরে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল মুসা। দরজার নব ধরে মোচড় দিল। অন্ধকারে তার শঙ্কিত গলা শোনা গেল। ইয়াল্লা রবিন, নব ঘুরছে না! অটোমেটিক লকা পুশ বাটন ওপাশে। তাড়াহুড়োয় চাপ লেগে গেছে হয়ত!
তাহলে আর কি করা! গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল রবিন। না চাইলেও সামনেই বাড়তে হবে। আমাদের!
কিছুই দেখা যাচ্ছে না! দেখি, টর্চ জ্বলি …আরে, টর্চ কোথায় গেল আমার! …কোথায়! ..নিশ্চয়, মমি-কেসের ডালা তোলার সময় নামিয়ে রেখেছিলাম!
খুব ভাল করেছি! আমার টর্চাটাও নষ্টা এখন? কি উপায়?
কাচ ভেঙেছে, বালব তো ভাঙেনি। দেখি, টর্চটা দাও আমার হাতে, অন্ধকারে রবিনের বাহুতে হাত রাখল মুসা।
সঙ্গীর হাতে টর্চ তুলে দিল রবিন।
টর্চের গায়ে বার দুই থাবা লাগাল মুসা। জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিল বার কয়েক। সুইচ টিপল। জ্বলে উঠল বালব। নিভে গেল। আবার ঝাঁকুনি দিতেই আবার জ্বলল, মিটমিট করে। ম্লান আলো।
ঠিকমত ব্যাটারি কানেকশন পাচ্ছে না, মন্তব্য করল মুসা। তবে কাজ চালানো যাবে। এস, নামি।
ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে সরু সিঁড়ি। আগে নেমে চলল। মুসা। তাকে অনুসরণ করল রবিন। শেষ হল সিঁড়ি। স্নান আলোয় দেখল, ছোট একটা ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা। দুদিকে দুটো দরজা। বেরোবে কোন দরজা দিয়ে?
সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা দরজার দিকে পা বাড়াল রবিন। সঙ্গে সঙ্গে তার বাহু খামছে ধরল মুসা। শুনিছা শুনতে পাচ্ছ।
কান পাতল রবিন। সে-ও শুনতে পেল।
বাজনা। মৃদু, কাঁপা কাঁপা, বহুদূর থেকে আসছে যেন। প্রোজেকশন রুমের ভাঙা অর্গান পাইপ বাজছো অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। রবিন। হঠাৎ করেই।
ওদিক থেকে আসছে, আঙুল তুলে একটা দরজা দেখিয়ে বলল মুসা।
তাহলে চল ওদিকে যাই। উল্টো দিকের আরেকটা দরজা দেখাল। রবিন।
না, ওটা দিয়েই যাওয়া উচিত, আগের দরজাটা আবার দেখাল মুসা। নিশ্চয় প্রোজেকশন রুমে ঢুকব গিয়ে। ঘরটা চেনা। অচেনা কোন ঘরে ঢুকতে আর রাজি নই। আমি। এখন তো নয়ই।
দরজা খুলল মুসা। অন্ধকার একটা ঘরে ঢুকল দুজনে। স্নান আলোয় পথ দেখে এগিয়ে চলল। বাড়ছে বাজনার শব্দ। এখনও অনেক দূরে মনে হচ্ছে। তীক্ষ্ণ ক্যাঁচক্যাঁচ। আর চাপা চিৎকার কেমন ভূতুড়ে করে তুলেছে। অর্গানের বাজনাকো
এগিয়ে চলেছে দুজনে। সামনে মুসা। তার ঠিক পেছনেই রবিন। যতই এগোচ্ছে, বাড়ছে অস্বস্তি-বোধ।
হলের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়াল ওরা। একটা দরজা। ঠেলে দিল মুসা। খুলে গেল পাল্লা। প্রোজেকশন রুমে ঢুকল দুজনে।
সামনেই পোড়ে আছে সারি সারি চেয়ার। ম্লান আলোয় সামনের কয়েকটা চেয়ার দেখা যাচ্ছে। আবছাভাবে। অর্গান পাইপটা রয়েছে। অন্য প্রান্তে। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। যেদিক থেকে বাজনার শব্দ আসছে, সেদিকে তাকাল মুসা। খপ করে চেপে ধরল রবিনের একটা হাত।
রবিনও তাকাল। স্থির হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। মেঝের ফুট চারেক উঁচুতে বাতাসে ঝুলে আছে অদ্ভুত নীল আলো। নির্দিষ্ট কোন আকার নেই। মুহূর্তে মুহূর্তে বিভিন্ন আকৃতি নিচ্ছে আলোটা, কাঁপছে থিরথির করে। ক্রমেই বাড়ছে অর্গান পাইপের বাজনা, সেই সঙ্গে তীক্ষা ক্যাঁচকোঁচ। আর চাপা চিৎকার যেন সঙ্গত করছে।
নীল ভূতা ফিসফিস করে বলল রবিন। অস্বস্তিবোধ উৎকণ্ঠায় রূপ নিয়েছে। ভয়ে বুক কাঁপছে দুরু-দুরু। তীব্র আতঙ্কে রূপ নিতে বেশি দেরি নেই। আর। কোন দরজা দিয়ে গেলে ইকো রুমে যাওয়া যায়, আন্দাজ করে নিল ওরা। ছুটল।
ধাক্কা দিয়ে পাল্লা খুলে ফেলল। মুসা। প্রায় ছিটকে এসে পড়ল ইকো রুমে। হলের দিকে ছুটল।
হল, সদর দরজা পেরিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল দুজনে তবু থামল না। সিঁড়ি টপকে নেমে চলল। মুসার সঙ্গে পেরে উঠছে না। রবিন, পা ভাঙা। পেছনে পড়ে গেল সে।
খিঁচে দৌড়াচ্ছে মুসা। পা টেনে টেনে যত জোরে সম্ভব, ছুটছে রবিন।
অন্ধকার। ঢাল বেয়ে নামতে নামতে হঠাৎ পা পিছলাল রবিন। হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বার দুই ডিগবাজি খেল, তারপর গড়াতে শুরু করল। তার দেহ। কিছুতেই ঠেকাতে পারছে না। কয়েক গড়ান দিয়ে একটা পাথরের ভূপে এসে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল দেহটা। কান্নার মত ফোঁপানি বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে।
ধরেই নিয়েছে। রবিন, পেছনে তাড়া করে আসছে নীল অশরীরী। অপেক্ষা করছে। ওটার জন্যে। বুকের ভেতরে হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে যেন। হাপরের মত ওঠা নামা করছে বুক।
শব্দটা হঠাৎ কানে এল রবিনের। পায়ের আওয়াজ। চাপা। এক কদম… দুই কদম করে এগিয়ে আসছে। নিশ্চয় নীল ভূতা অন্ধকারে খুঁজছে তাকো
থামছে না, এগিয়েই আসছে শব্দটা। কাছে, আরও কাছে। ঠিক পেছনে। থেমে গেল শব্দ।
ফিরে চাইবার সাহস নেই রবিনের। পাথরে মুখ গুজে পড়ে আছে।
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল মূর্তিটা। তার শ্বাস ফেলার চাপা ফোঁস ফোঁস কানে আসছে। রবিনের। হঠাৎ পিঠে ছোঁয়া লাগল, হাতের তালুর আলতো চাপ। তারপর আলতো ঘষা, ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। নিশ্চয় গলা খুঁজছে, আন্দাজ করল রবিন। নড়ার শক্তি নেই যেন, অবশ আসছে দেহ।
ঘাড়ের কাছে এসে থামল হাতটা। চাপ বাড়ল একটু। চেঁচিয়ে উঠল। রবিন। তীক্ষ্ণ তীব্র চিৎকারে খান খান হয়ে ভেঙে গেল অখণ্ড নীরবতা। প্ৰতিধ্বনি তুলল পাহাড়ে পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে।
<