জুলিয়াসকে রূঢ়ভাবে ঠেলতে ঠেলতে গুদাম ঘরে নিয়ে গেল ওরা। সেখানে একটা খড় গাদা দেয়ার খুঁটিতে ওর হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা হলো।
একটু পরেই নকার ঢুকল। একটা লাল বর্ডার দেয়া নীল গেঞ্জি পরেছে সে। বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছে ওকে। আমি ভাবিনি তোমাকে ওরা এত জলদি ধরতে পারবে, বলল নকার।
ইন্ডিয়ান ব্লাফে তোমার সাথে তো কোন বিবাদ হয়নি আমার!
হয়নিই তো! হাসতে হাসতে বলল সে, ওইসব অজুহাতের কোন দরকার ছিল না আমার, ওটা মেডকের ফন্দি।
উঠানে কয়েকজনের সাড়া পাওয়া গেল। কয়েক সেকেন্ড পরেই মেডককে ঘরে ঢুকতে দেখল জুলিয়াস। ওর সাথে এড, জারভিস আর মাডিও রয়েছে। মেডককে খুব খুশি দেখাচ্ছে। জারভিসের মুখ উত্তেজনায় লাল। ঢোকার সময়ে কি যেন বলছিল সে, কিন্তু মেডকের ধমক খেয়ে চুপ হয়ে গেল। এডের মুখ দেখে ওর মনের ভাব বোঝা যাচ্ছে না। চিরাচরিত কৌতুকের হাসিটা এখন মুছে গেছে ওর মুখ থেকে। মাড়ি দাঁত বের করে হাসছে।
তুমি দেখা দেবে এটাই আশা করেছিলাম, বলল মেডক। তোমার বাবা বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পরও শিক্ষা হয়নি তোমার, আবার বেহায়ার মত ফিরে এসেছ কিছু হাতানোর আশায়!
বাবার সাথে দেখা করে সম্পত্তির ভাগ চাইতে আসিনি আমি।
গপ ছেড়ো না।
বিশ্বাস না হয় পেপিকে জিজ্ঞেস করে দেখো।
জবাব শুনে একটু থমকাল মেডক। এড, যাও, পেপির কাছ থেকে শুনে এসো ওর কি বক্তব্য আছে। তাড়াতাড়ি করো, সারারাত লাগিয়ো না।
আসছি, বলেই সাঁই করে গোড়ালির ওপর ঘুরে রওনা হয়ে গেল এড।
এই ঘটনা প্রবাহ জারভিসের ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। সে বলে উঠল, এর মধ্যে পেপিকে টেনে আনার কি দরকার? জুলিয়াসের প্রতি দুর্বলতা আছে ওর, সে তো ওকে বাঁচানোর চেষ্টাই করবে।
চুপ করো! ধমকে উঠল মেডক।
ধীর গতিতে ঘুরে মেডকের মুখোমুখি হলো জারভিস। মুখ সামলে কথা বলো, মেডক। মালিকের সাথে কথা বলছ তুমি!
কয়েকটা মুহূর্ত নীরবতার মধ্যে কাটল। সবার চোখ ওদের দু’জনের ওপর। মেডকের হাত তার পিস্তলের দিকে নেমে গেছে, কিন্তু পিস্তল ছুঁলো না সে। মুখটা লাল হয়ে উঠেছে-মনের মধ্যে একটা বোঝাপড়া চলছে। শেষ পর্যন্ত তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, জারভিস, খামারের সব ব্যাপারে তুমিই বস, কিন্তু শৃঙ্খলা বজায় রাখা আমার কাজ। এটা আমাকে আমার মত করেই দেখতে দাও। পেপির কি বলার আছে জানতে চাই আমি। তবে সে যা বলবে তাই বিশ্বাস করতে হবে এমন কোন কথা নেই।
অর্ধেক বিজয় হলো জারভিসের। এতেই সন্তুষ্ট সে। জোর করে শব্দ করে হেসে উঠে বলল, ঠিক বলেছ তুমি, মেডক। আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি না। হওয়াই ভাল। দু’জন মিলেমিশে কাজ চালিয়ে যাব আমরা।
জুলিয়াস ভাবছে: জারভিস কি বুঝতে পারল মৃত্যুর দুয়ার থেকেই এইমাত্র ফিরে এল সে?
জলদিই ফিরল এড। বলল, পেপির সাথে কথা হলো, সে বলছে সেবাস্টিন দত্তের সাথে নয়, ওর সাথেই দেখা করতে এসেছিল জুলিয়াস।
কেন? প্রশ্ন করল মেডক।
আমাকে বলেনি তা, বলল ওটা ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।
ব্যক্তিগত না ছাই! দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল মেডক। তারপর জুলিয়াসের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, কি জন্যে এসেছিলে তুমি?
সত্যি কথা বলতে গেলে এখনই খুন হয়ে যাবে জুলিয়াস। বানিয়ে কিছু বলতে গেলেও ওরা বিশ্বাস করবে না। দৃঢ় কণ্ঠে সে জবাব দিল, আমার বোনের সাথে ব্যক্তিগত আলাপ করেছি আমি-এখানে সেসব কথা বলব না।
সামনে ঝুঁকে উল্টো হাতে চড় কষাল মেডক। জুলিয়াসের মুখের ওপর পড়ল আঘাতটা। চোখ দিয়ে পানি আর নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল।
নকার! হঠাৎ ডেকে উঠল মেডক। জুলিয়াসের সাথে তোমার ঝগড়ার নিস্পত্তি করতে চাও?
অবশ্যই চাই। উৎসাহের সাথে জবাব এল।
তাহলে হাতের বাঁধন খুলে ওকে ওর পিস্তল ফিরিয়ে দাও!
হঠাৎ হেসে উঠল এড। বলল, মেডক, জুলিয়াসকে যদি নকার হারাতে পারে তবে তুমি যা বাজি ধরবে তার দশগুণ টাকা দিতে আমি রাজি।
নিজেকে খুব বাহাদুর মনে করো, না? খেপে উঠল নকার। আমি একশো ডলার বাজি ধরছি।
তোমার সাথে বাজি ধরে লাভ নেই, নির্ঘাত মারা পড়বে তুমি-আমার কথা বিশ্বাস না হয় জারভিসকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো জুলিয়াস কেমন পিস্তল চালায়।
রেগে আগুন হয়ে গেছে নকার। তুমি যা শুনেছ তা শিকেয় তুলে রাখো। নিজেকে খুব বড় ওস্তাদ মনে করছ, তোমার সাথেই না হয় হয়ে যাক এক হাত? এডের দিকে ঘুরে দাঁড়াল নকার।
সরে এসে দু’জনের মাঝখানে দাড়িয়ে কটমট করে এডের দিকে চাইল মেক। তোমার মতলবটা কি? তোমার কি বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে?
না, তোমাদের মত বুদ্ধি হারায়নি আমার, জবাব দিল এড। তোমরা যা করতে যাচ্ছ তা আমার মোটেও পছন্দ হচ্ছে না। এটা শহরে ঘটলে বিবাদের ফল বলে চালানো যেত, কিন্তু এখানে ঘটলে কি হবে ভেবে দেখেছ? বিভিন্ন রকম কথা উঠবে না?
তাহলে তোমার মতে ওকে ছেড়ে দেয়াই উচিত?
না, তা কেন? মাডিকে ব্যবহার করলেই হয়। ওকে মারপিট করতে দেখেছ কখনও? ওর হাতে মার খাওয়ার পর জুলিয়াসের আর কারও ক্ষতি করার মত অবস্থা থাকবে না।
চোখ দুটো ছোট করে এডের প্রস্তাবটা ভেবে দেখল মেডক। ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। মাড়ির দিকে তাকাতেই সে বক্সিং করার ভঙ্গিতে হাত দুটো তুলে দাঁড়াল। তার বিশাল মুঠি দুটোয় অতীতের মারপিটের চিহ্নগুলো। ফুটে রয়েছে।
আগের ব্যবস্থাটাই তো ভাল, আপত্তি জানাল নকার। বাজিতে কিছু বাড়তি টাকা রোজগার করার সুযোগ পেতাম।
বাড়তি টাকা কামাবার সুযোগ পরেও পাবে তুমি, জবাব দিল মেডক। আজ ওকে আমি মাডির হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি।
জুলিয়াসের হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হয়েছে, কিন্তু পিস্তলটা তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়নি-হবেও না। মাডির সাথেই মারপিট করতে হবে ওকে।
মাডির দিকে চেয়ে মনে মনে জরিপ করে নিল জুলিয়াস। বিশাল হলেও ওর দেহের কোথাও মেদ নেই। দড়ির মত পেশীওয়ালা শক্তিশালী হাত দুটো গিয়ে মিশেছে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কাঁধের সাথে। হয়তো একটু ধীর হতে পারে ওর গতি। কিন্তু তাই বা কি করে বলা যায়? বিশাল লোককেও অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতি হতে দেখেছে জুলিয়াস।
আর একটা কথা মনে রাখতে হবে, দু’জনের ঘুসাঘুসি শেষ পর্যন্ত বীভৎস আকার নিতে পারে। এই রকম মারামারিতে একবার একটা লোককে ঘুসি খেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়তে দেখেছিল সে, তবু রেহাই পায়নি, মাথায় বুটের লাথি খেয়ে মারা পড়েছিল লোকটা। এইসব মারপিটে ফাউল বলে কিছু থাকে না, সবই চলে। আজ রাতেও কোন বিধি-নিষেধ থাকবে না।
মাডির দিকে চেয়ে স্থির হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবছে জুলিয়াস। দৈত্যের সাথে মানুষ কি করে মারপিট করে? ওর হাতের একটা ঘুসি ঠিকমত পড়লেই ছিটকে মাটিতে পড়বে সে। সাথে সাথে উঠে দাঁড়াতে না পারলেই বুটের লাথি খেয়ে ছাতু হয়ে যাবে ওর মাথা।
ঘরের সবাই ওদের দু’জনকে জায়গা করে দিয়ে পেছনে সরে দাঁড়িয়েছে। পাশ থেকে মেডক বলে উঠল, আমি পঞ্চাশ ডলার বাজি রাখছি, জুলিয়াস পাঁচ মিনিটও টিকবে না।
আমি নিলাম ওই পঞ্চাশ, বলল এড। আর কেউ?
অন্যেরাও কমবেশি বাজি ধরল। কিন্তু সেদিকে খেয়াল করছে না জুলিয়াস, সতর্ক চোখে মাতিকে দেখছে ও। ঝুঁকে পড়ে খেলার ছলে সে একটা হাত ছুঁড়ল জুলিয়াসের মাথা লক্ষ্য করে। ঝটকা দিয়ে তাকে ঘুসি এড়িয়ে মাথা সরিয়ে নিতে দেখে হাসল মাড়ি। আবার এগিয়ে এল সে, আবারও মাথা নিচু করে ঘুসি কাটিয়ে সরে গেল জুলিয়াস। কিন্তু এবারে সরে যাবার সাথে সাথে পা চালাল সে। বুটের শক্ত মাথাটা গিয়ে সজোরে লাগল মাড়ির হাঁটুতে। ব্যথায় আর্তনাদ বেরিয়ে এল ওর গলা থেকে। দারুণ আক্রোশে ঘুসি চালাল মাড়ি। সরে গিয়েই শক্ত একটা ঘুসি বসাল জুলিয়াস ওর বাঁকা নাকের ওপর। রক্তের রেখা নেমে এল ঠোঁট বেয়ে চিবুকে। বুটের লাথি মারল আবার জুলিয়াস ওর হাঁটুর নিচে শিন বোনের ওপর। তীব্র যন্ত্রণায় পিছিয়ে গেল মাড়ি। সাথে সাথেই আর একটা ঘুসি পড়ল ওর মুখে। চট করে ডাইনে বা বামে মাথা সরিয়ে মাড়ির ঘুসিগুলো এড়িয়ে গেল জুলিয়াস। কিন্তু সবগুলো কাটাতে পারল না, একটা জোরাল ঘুসি এসে পড়ল ওর কপালের ওপর।
ছিটকে পিছিয়ে এসে টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল জুলিয়াস। তেড়ে ছুটে এল মাডি, ওর চোখে-মুখে বিজয় উল্লাস। জুলিয়াসের মাথা লক্ষ্য। করে বিদ্যুৎ বেগে বুটের লাথি চালাল মাডি। ওটা লাগলে এখানেই মারপিটের, সমাপ্তি ঘটত-গড়িয়ে কোনমতে সরে গিয়েই জোড়া পায়ে লাথি চালাল জুলিয়াস। লাথি খেয়ে পড়ে গেল মাড়ি। সাথে সাথেই আবার দুজনে উঠে দাঁড়াল।
একটু দম নেয়ার ফুরসত পাওয়া যাবে মনে করেছিল জুলিয়াস। কিন্তু মাডি সে সুযোগ দিল না। উঠে দাঁড়িয়েই তেড়ে এল। দু’হাত মুখের সামনে তুলে ঘুসি ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে পিছিয়ে গেল জুলিয়াস। পা ফেলে একপাশে একটু সরে গিয়েই মারপিটের ধারা পাল্টে আক্রমণ করে বসল সে। প্রথম ঘুসিটা চোয়াল, ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল, দ্বিতীয়টা ঠিকমত গিয়ে পড়ল মাড়ির চোয়ালে। জুলিয়াসের মনে হলো যেন পাথরের ওপর পড়ল ওর ঘুসি। হাত কেটে গেছে-ঠিক করল এই রকম ঘুসি আর মারবে না সে। ভীষণ বেগে পেটের ওপর ঘুসি চালাল জুলিয়াস। কেঁপে উঠল মাডি, কিন্তু ক্লান্ত হবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না ওর।
সামান্য নিচু হয়ে দু’হাতে জুলিয়াসকে জড়িয়ে ধরল মাডি। পাঁজরের ওপর কঠিন চাপ পড়ছে। হাত দুটো যেন লোহা দিয়ে তৈরি। পিছন দিক থেকে হাত বাড়িয়ে চুলের মুঠি ধরে প্রাণপণে টান দিল জুলিয়াস। বেকায়দা দেখে ওকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল মাডি। তারপরেই দু’হাতে ঘুসি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে এল।
ঘুসির তোড়ে পড়ে গেল জুলিয়াস। সাথে সাথেই বুটের লাথি মুখের পাশ ছুঁয়ে ওর গালে আগুনের জ্বালা ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। পরবর্তী লাথিটা পড়ল পাজরে। বুকের ওপরই শক্ত করে পা-টা চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল জুলিয়াস। ভারসাম্য হারিয়ে টলমল করে উঠল মাডি। সামলে ওঠার সুযোগ না দিয়ে কষে লাথি চালাল জুলিয়াস। লাথির আঘাতে পিছিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে একটা গড়ান দিয়েই আবার উঠে ঘুরে দাঁড়াল মাডি।
মুখটা রক্তাক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে, মাডিকে আর চেনা যাচ্ছে না। কিন্তু তার নিজের চেহারাও আর এখন সুদর্শন নেই তা জানে জুলিয়াস। দেহের সব ক’টা পেশী টনটন করছে, মুখের ভিতর ধুলোবালি কিচকিচ করছে। ক্লান্তিতে হাত দুটো আর তুলে রাখতে পারছে না সে। চোখের দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে এসেছে-পায়ের ওপর নিজের ভার রাখাটাই কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে। সে বুঝতে পারছে না মাডির কেমন অবস্থা, কিন্তু সে আর পারছে না।
দাড়িয়ে মাতালের মত মাড়ির দিকে চেয়ে টলছে জুলিয়াস। লোকজন চিৎকার করে মাডিকে উৎসাহ দিয়ে মারামারির সমাপ্তি ঘটাতে বলছে বারবার। পিছন থেকে কে যেন ধাক্কা দিল ওকে! মাডি এগিয়ে আসছে ঘুসি তুলে। কাটাবার সুযোগ পেল না জুলিয়াস। ঘুসিটা ওর চোয়ালের ওপর পড়ল। সে-ও শেষ চেষ্টায় ঘুসি চালাল মাডির নাক বরাবর। মাথার ভিতর বিস্ফোরণ ঘটেছে মনে হলো জুলিয়াসের। চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে আসছে। মাটিতে পড়ার ব্যথাটা অনুভব করল না জুলিয়াস।
গুণে গুণে এডের পঞ্চাশ ডলার মিটিয়ে দিয়ে মাডি আর জুলিয়াসের দিকে চাইল মেডক। দুজনেই ধরাশায়ী-কেউই নড়ছে না। দেখে মনে হচ্ছে মাডিকে অন্তত এক সপ্তাহ বিছানায় থাকতে হবে-অনেক মার খেয়েছে বেচারা।
এডের পেছন পেছনই বেরিয়ে এল মেডক। বলল, তুমি না বলেছিলে মাডি ঘুসাঘুসিতে ওস্তাদ?
ওকে তো দেখেশুনেই কাজে নিয়েছ, জবাব দিল এড। আর তাছাড়া চেষ্টার ত্রুটি করেনি ও। এরচেয়ে ভাল মারপিট আর কি আশা করো?
কিন্তু এতে জুলিয়াসের ব্যাপারটার কোন সুরাহা হলো না।
ওকথা কেন বলছ? আবার ভাল করে দেখে এসো। আধমরা অবস্থা জুলিয়াসের।
কিন্তু ওকে একেবারে শেষ করাটা বাকি রয়ে গেল।
এমন একটা ব্যবস্থা করো যেন সব কূল রক্ষা হয়। ওর মৃত্যুতে দোষটা তোমার কাঁধে পড়লে ফল শুভ হবে না। শুধু তুমি কেন, এখানকার কারও ওপর দোষ চাপানোই ঠিক হবে না।
মেডককে চিন্তামগ্ন দেখাচ্ছে। গুম করে ফেলতে হবে ওকে, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল সে। জুলিয়াস পার্ক ছেড়ে চলে গেছে, এই কথাটা ছড়িয়ে দিতে হবে। এর চেয়ে সহজ বুদ্ধি আর কিছু মাথায় আসছে ন!।
আমি যাই, পেপিকে ঘটনাটা জানিয়ে আসি।
ওকে এসব জানানোর কি দরকার?
মাথা খাটলও, মেডক। সে জানে তার ভাই এখানেই আছে। কিছু একটা গল্প বানিয়ে ওকে বুঝ দিতে হবে তো?
ধীর পায়ে বাড়ির ভিতরে এগিয়ে গেল এড। পেপির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ভয় করছে ওর পেপি যে ব্যাপারটা কিভাবে নেবে কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
পেপিকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি এড। বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছে ওদের মধ্যে, কিন্তু তবু মাঝে মাঝে মনে হয় যেন ও অনেক দূরের মানুষ। এর আগে যত মেয়েকে সে জেনেছে তাদের কারও সাথেই মিল নেই পেপির ওর প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কিছুটা ভাব হওয়ার পর ওকে নিজের অতীত সম্পর্কে খানিকটা আভাস দিয়েছে এড। পূর্ব অভিজ্ঞতায় সে দেখেছে এতে ভাল কাজ হয়। বেশির ভাগ মেয়েই এতে একটা অজানা পুলক অনুভব করে! সে দেখেছে অবস্থার ফেরে পড়ে তাকে ওই পথে যেতে হয়েছিল জেনে কিছু মেয়ে ওর জন্যে উদ্বিগ্ন হয়, আর অন্যেরা তাকে নতুন করে গড়ে নেয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগে যায়। কিন্তু পেপি ওদের কোন দলেই পড়ে না। ওর কথা শুনে সে হেসে বলেছিল, তোমার অতীত সম্বন্ধে আগেই শুনেছি আমি। জানি তুমি কেন এসেছ। তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও কারণ বাবার মৃত্যুর পর অনেক সম্পত্তির মালিক হব আমি। সব জেনেও হয়তো তোমার কথায় ভুলতে পারি আমি-কে বলতে পারে? এটা আবার কি ধরনের কথা হলো?
পেপির ঘরের দরজায় টোকা দিল এড। সাথে সাথেই দরজা খুলে দিল পেপি। জামা ছাড়েনি সে-চেহারাটা ভীত-সন্ত্রস্ত আর মলিন দেখাচেছ। এড… আর কিছু বলতে পারল না সে।
এখানে সুস্থির হয়ে একটু বসো তুমি, হাত ধরে টেনে নিয়ে পেপিকে বিছানার ওপর বসাল এড।
ওকে…ওকে কি মেরে ফেলা হয়েছে?
না, পেপি। এখনও মারেনি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারবে?
দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আবার ফিরে এসে পেপির পাশে বসল এড়। গুদাম ঘরের ঘটনাটা সংক্ষেপে বর্ণনা করল সে। তারপর বলল, আমার মতে এটাই ভাল হয়েছে। এছাড়া অন্য কোন পথ বেছে নিলে এতক্ষণে ওর মৃত্যু ঘটত।
নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল পেপি। জুলিয়াস কি খুব খারাপভাবে আহত হয়েছে?
সেটা ঠিক জানি না, তবে সে যে জখম হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
তাহলে? এরপরে এখন কি ঘটবে?
মাথা নাড়ল এড সে ভাল করেই জানে এরপর কি ঘটবে। উপায়টা জানে না বটে, কিন্তু মেডক যখন চায় তখন জুলিয়াসকে মরতেই হবে
এডের দিকে একটু ঝুঁকে এল পেপি। বলল, ওর পালাবার একটা ব্যবস্থা তোমাকে করে দিতে হবে, এড।
সেটা কি করে সম্ভব, পেপি? আমি আর কি করতে পারি?
তা জানি না, কিছু একটা করতেই হবে।
কিন্তু সেটা যে অসম্ভব!
এডের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থেকে সে বলল, আমার এটাই সান্তনা যে আমাকে মিথ্যে বুঝ দিচ্ছ না তুমি।
তার মানে?
তুমি নিজেই স্বীকার করেছ আমাকে ভালবাসার অভিনয় দিয়ে ভুলিয়ে বিয়ে করার জন্যেই তুমি এসেছিলে। তারপর হেসে বলেছিলে, আমাকে ভোলাতে এসে এখন নিজেই ফাঁদে পড়ে গেছ-অভিনয় করতে করতে সত্যি সত্যিই ভালবেসে ফেলেছ আমাকে। সেটাও কি তোমার অভিনয়?
অব্যক্ত ব্যথায় ম্লান হয়ে গেল এডের মুখ। না, পেপি। ওটা মন ভুলানো কথা নয়। নিজের অজান্তেই ভালবেসে ফেলেছি তোমাকে।
কিন্তু আমার চেয়ে মেডককেই বেশি দাম দিচ্ছ তুমি।
না! কখনোই না! তীব্র প্রতিবাদ করল এড।
কিন্তু ভাব দেখে তো আমার তাই মনে হচ্ছে।
বিছানা ছেড়ে উঠে অস্থিরভাবে ঘরে পায়চারি করতে শুরু করল এড। এর আগে নিজেকে কোনদিন তার এতটা অসহায় আর বিভ্রান্ত মনে হয়নি। আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে সে? জানে না। আগামীকাল কি অবস্থা হবে? তা-ও জানা নেই। পায়চারি থামিয়ে পেপির দিকে চাইল এড। সত্যিই কি মেয়েটা তাকে ভালবাসে? আসলে পেপির জন্য উপযুক্ত পাত্র সে নয়। জীবনে ওকে কি দিতে পারবে এড? যে কোন সময় ওকে গা ঢাকা দিয়ে পালাতে হতে পারে।
একটা বিষাদ মাখা হাসি ফুটে উঠল এডের ঠোঁটে। তার পেটের ভিতরে একটা গিট লেগে গেছে-কিন্তু তার চেহারায় এর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সে বলল, ঠিক আছে, আমি জুলিয়াসকে পালাতে সাহায্য করব। কিন্তু বিনিময়ে তুমি আমায় একটা কথা দেবে?
তুমি যা চাও তাই দেব, এড, দ্বিধাহীন স্বরে জবাব দিল পেপি।
আগামীকাল যখন মেডক জানতে পারবে পাখি উড়ে গেছে তখন আমি যেন বলতে পারি তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছ। জুলিয়াসকে যেতে দেয়ার একটা অজুহাত আমার থাকতেই হবে, নইলে আমার বেঁচে থাকাই দায় হয়ে উঠবে।
উঠে দাঁড়াল পেপি। সত্যিই কি আমাকে বিয়ে করতে চাও তুমি?
তুমি তো জানো আমি কি চাই।
আমিও তাই চাই।
এগিয়ে গিয়ে পেপির দুই কাঁধে হাত রাখল এড। ওর ভিতরটা এক অব্যক্ত জ্বালায় জ্বলছে। না, পেপি ওই ভাবে নয় আমি তোমাকে চাই সত্যি, কিন্তু জুলিয়াসকে বাঁচানোর বিনিময়ে নয়! কেবল মাত্র নিজের বিনিময়েই আমি পেতে চাই তোমাকে আমাদের মাঝে আর কেউ থাকবে না, শুধু তুমি আর আমি
কিন্তু, এড…
না, আর কথা নয়। কথা অনেক হয়েছে, এবারে কাজ করতে হবে আমাকে-অনেক কাজ বাকি।
দরজার দিকে এগিয়ে গেল এড যাবার আগে পেপিকে নরম গলায় শুভরাত্রি জানিয়ে গেল।
গোলাঘরে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। ধীরে ধীরে জুলিয়াসের জ্ঞান ফিরে আসছে। একে একে সব মনে পড়ছে তার। মারপিটটা ঠিক কিভাবে শেষ হলো মনে পড়ছে না। গা-হাত-পা সব টনটন করছে ব্যথায়। মুখ ফুলে উঠেছে, হাতের। মুঠি দুটো আড়ষ্ট-মাথার ভিতরে হাতুড়ি পেটা চলেছে।
অন্ধকার থেকে একটা গলা শোনা গেল, কেউ আর একজনকে প্রশ্ন করছে, কি খবর ওর? জ্ঞান ফিরেছে?
দু’একবার সামান্য নড়েছে, জবাব দিল লোকটা। মনে হয় না এখনও জ্ঞান ফিরেছে। বেচারা বেশ জখম হয়েছে।
মার মাডিও কম খায়নি, বলল এড। ওর ভাই ওকে ধাক্কা দিয়ে বেসামাল করে না দিলে ড্র হত না, জুলিয়াসই জিতত। ভাইয়ের সাথে কি কেউ এই ব্যবহার করে?
খুব ভেঁপো ছেলে ওই জারভিস-জানি না মেডক কেমন করে ওকে সহ্য করে।
আর বেশিদিন হয়তো সহ্য করবে না সে যাক, তুমি যাও, সকাল পর্যন্ত আমি নিজেই পাহারা দেব।
কিন্তু মেডক আমাকে এখান থেকে নড়তে মানা করেছে।
মত পালটেছে সে, সকালে তোমাকে কি একটা কাজে পাঠাবে। যাও, একটু ঘুমিয়ে নাও।
উঠে দাঁড়াল লোকটা, সেই ভাল, ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে আমার। সকালে দেখা হবে।
চলে গেল, লোকটা। একটু পরে জুলিয়াসের কাছে গিয়ে এড় নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, জুলিয়াস, জেগে আছ?
জেগেই আছি আমি, বিরক্ত স্বরে জবাব দিল জুলিয়াস।
গোলাঘরের পিছনে ঘোড়ায় জিন লাগিয়ে রেখে এসেছি, তোমাকে ওই পর্যন্ত পৌঁছে দিলে যেতে পারবে?
অবাক হয়ে মুখ তুলে চাইল জুলিয়াস। এডই তাকে বন্দী করেছিল, এখন আবার সে-ই তাকে ছেড়ে দিচ্ছে। ঘোড়ার পিঠে টিকে থাকতে পারব, জবাব দিল জুলিয়াস। কিন্তু আসলে সে নিজেও এ সম্বন্ধে নিশ্চিত নয়।
মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবে পার্ক ছেড়ে চলে যাওয়াই এখন তোমার জন্যে ভাল।
তুমি ভাল করেই জান! আমি যাব না।
ওরা পিটিয়ে ছাতু করবে তোমাকে।
মুখ তুলে চাইল জুলিয়াস তুমি আমাকে সাহায্য করছ কেন?
পেপির জন্যে।
উঠে বসল জুলিয়াস। দুর্বল শরীরে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। নিজেকে সামলাতে চোখ বন্ধ করল সে। একটু পরেই সামলে নিয়ে চোখ খুলে এডের দিকে চাইল। আমি জানি কিসের লোভে তুমি পার্কে এসেছ। তোমার সব। মতলব বুঝেছি আমি। একটা নীচ আর লোভী লোক তুমি এড।
ওসব কথা ছাড়ো।
কেন ছাড়ব? আমি চাই না তুমি আমার বোনকে বিয়ে করো।
কে বলেছে আমি তা করব? জানতে চাইল এড।
কেন, তাই কি তুমি চাও না?
হ্যাঁ, চাই, স্বীকার করল সে। জানি না সেটা সম্ভব হবে কিনা, তবে পারলে আমি তাই করব। যাক, সে ব্যাপারে কথা বলার সময় এখনও আসেনি।
আমাকে একটা পিস্তল দাও।
কি লাভ? হাতের মুঠোয় পিস্তল ধরার ক্ষমতা এখন আর নেই তোমার।
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জুলিয়াস জিজ্ঞেস করল, আমার চলে যাওয়াটা মেডক কি চোখে দেখবে?
কৌতুকপূর্ণ হাসি হাসল এড। মেডক রাগে ফেটে পড়বে তর্জন গর্জন করবে, চিৎকার করে রাগ দেখাবে আমার ওপর, আর নিজের নখ কামড়াবে। মনে মনে আমাকে খুনও করতে চাইবে ও, কিন্তু ওই পর্যন্তই। পেপির থেকে স্বার্থসিদ্ধি করতে হলে আমাকে ওর দরকার, তাই ইচ্ছা থাকলেও সে মারতে পারবে না আমাকে।
তাহলে ওর কাজটা আমিই শেষ করব, বলে উঠল জুলিয়াস। এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটা পিস্তল যোগাড় করে আবার ফিরে আসব।
তার আগে তোমার বোনের সাথে একটু আলাপ করে নিয়ো।
কেন?
কারণ ঘটনা যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে এতে তিনটে পক্ষ থাকবে। একটা তোমার, একটা মেডকের আর বাকিটা পেপি আর আমার। দেখি, উঠে দাড়াও তো?
প্রথমে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে কোনমতে উঠে দাঁড়াল জুলিয়াস। চট করে এড ওকে ধরে না ফেললে সে ঠিক পড়েই যেত। একটু পরে ধাতস্থ হয়ে নিজেই দাড়াতে সক্ষম হলো সে। একবার ঘোড়ায় উঠতে পারলে টিকে থাকতে পারবে বলেই মনে হচ্ছে ওর।
শব্দ কোরো না, নিঃশব্দে চলার চেষ্টা করো।
রোষের সাথে এডের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে জুলিয়াস বলল, জাহান্নামে যাও তুমি। ভবিষ্যতে সাবধান থেকো।
দরজার দিকে এগিয়ে গেল ওরা।
<