ধীরে ধীরে অন্ধকার নামল প্ৰেয়ারিতে। ম্যালপেই রীজের ঢাল বেয়ে নেমে এল গাঢ় একটা ছায়া। দীর্ঘ আঁচড়ের মত আড়াআড়ি চলে যাওয়া অগভীর অ্যারোয়ো ধরে এগোল, নরম মাটিতে স্বতঃস্ফুর্ত পা ফেলছে। ব্রাভো ক্রীকের দক্ষিণ শাখার। কাছে শেষ হয়েছে অ্যারোমোটা, আর ব্রাভো ক্রীকের মূল শাখা ঘুরপথে লেযি-এন র‍্যাঞ্চ হাউসের পেছন দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

টম নোলানের পরিকল্পনায় কোন খুঁত নেই। আশপাশের জমি থেকে বেশ উঁচুতে হেডকোয়ার্টার তৈরি করেছে। বেন প্রায়ই ভাবত বাড়িটা তৈরি করার সময়। বুড়োর মনে কি ছিল, কারণ বাড়িটার অবস্থান এমন যে ইচ্ছে করলে যে কেউ হামলা করতে পারবে; এবং এও সত্যি সেই হামলা ঠেকানোর উপযুক্ত ব্যবস্থাও রেখেছে লেযি-এন বস্। প্রচুর খাবার-পানি, লোকবল, পর্যাপ্ত অ্যামুনিশূন…কিসের অভাব আছে এখানে? বিশাল অ্যাডোবি দালানে হানা দিয়ে সফল হতে বোধহয়। দানবীয় শক্তি দরকার, একমাত্র কোন আর্টিলারির পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু এখন মাত্র একজন তোক সেই কাজটা করতে যাচ্ছে।

ব্রাভো ক্রীকের কাছে এসে অ্যারোয়ো ছেড়ে উঠে এল ও, পশ্চিম পাড় ধরে এগোল এবার। কিছুক্ষণের মধ্যে বাঙ্ক হাউসের কাছাকাছি পৌঁছে গেল, সেটাকে। পাশ কাটিয়ে মূল দালানের দিকে এগোল। জানালায় হলুদ আলো চোখে পড়ছে। কাছে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে মিশে গেল, তারপর সন্তর্পণে সরে এল একটা জানালার কাছে, উঁকি দিল ভেতরে।

স্টোভের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে তিনজন লোক। স্লিম, কার্লি আর অপরিচিত এক লোক। পোশাক আর ভাবভঙ্গি দেখে অনায়াসে পরিচয় বোঝ যাচ্ছে: লেযি-এন ভ্যাকুয়েরো।

জানালাটা আধ-খোলা। তিনজনের কথাবার্তা শোনার জন্যে কিছুটা ঝুঁকতে হলো ওকে।

চাঁদ ওঠার পর কারাঞ্চোকে সঙ্গে নিয়ে মালপেই ভ্যালিতে চক্কর দিতে বলেছে স্টিভ, বলছে অপরিচিত লোকটা। ওর সন্দেহ…

সশব্দে স্টোভে থুথু ফেলল কার্লি। ও ভাবছে ওখানেই আছে স্নেজেল, তাই, রেড?

শ্রাগ করল লোকটা। তাই তো মনে হচ্ছে। বোঝো অবস্থা, এমনিতে দিনের বেলায় জায়গাটা পছন্দ হয় না আমার, তারওপর সঙ্গে একটা র্যাটলকে নিয়ে যেতে হবে! ওর সঙ্গে চলতে গেলে যে কারও পেটে শিরশিরে অনুভূতি হবে।

সমঝদারের ভঙ্গিতে নড় করল স্লিম। স্লেজেলের জন্যে করুণাই হচ্ছে আমার। কঠিন, এক শত্রু তৈরি করেছে ও, আর যেই হোক কারাঞ্চো অন্তত সেদিনের কথা ভুলবে না। হারলোর মত কারাঞ্চোকেও খুন করা উচিত ছিল ওর। একে তো ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তারওপর ন্যাংটা করে ফেরত পাঠিয়েছে এখানে। একজন ইন্ডিয়ানের জন্যে এটাই সবচেয়ে বড় অপমান। তাছাড়া কারাঞ্চো পুরো ইন্ডিয়ানও নয়, দো-আঁশলা হওয়ায় ওর রক্তে তেজও বেশি।

রাইফেল তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগোল রেড। বাড়িতে আছে কে?

মুখ তুলে তাকাল কার্লি। বুড়ো, স্টিভ, ফ্রেড আর ওই ছেলেটা।

জানালা থেকে সরে গেল বেন, কিছুটা দূরে এসে দরজার ওপর চোখ রাখল। বেরিয়ে এসে পেছনে দরজা ভিড়িয়ে দিল রেড। পোর্চে দাঁড়িয়ে দূরে ম্যালপেই। ভ্যালির দিকে তাকাল সে, ঘুণাক্ষরেও টের পেল না দু’হাত দূরে চলে এসেছে বেন। জ্ঞান হারানোর আগেও তার মগজে রুক্ষ কঠিন জায়গাটার স্মৃতিই জমা থাকল, বাম কানের পেছনে রাইফেলের বাটের আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে চেতনা হারাল সে।

দুই কজি চেপে ধরে টেনে রেডের অজ্ঞান দেহ বার্নে নিয়ে এল বেন। মুখে ব্যান্ডানা গুঁজে দিয়ে বাঁধল তাকে, তারপর খড়ের গাদায় ফেলে রেখে বেরিয়ে এল। তবে তার আগে লোকটার হোলস্টার থেকে কোল্ট বের করে নিজের বেল্টে খুঁজে নিয়েছে। দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল ও, দেখল অস্পষ্ট একটা ছায়া। নড়ছে দরজার কাছে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না ওকে। ছুটে এল গাঢ় ছায়াটা, প্রায় নিঃশব্দে। খানিকটা নিচু হয়ে গেল বেন, কাঁধ দিয়ে আঘাত করল ছুটে আসা শরীরটাকে। বেমক্কা আঘাত পেয়ে হুঁক করে পেটের সব বাতাস ছেড়ে দিল লোকটা, ককিয়ে উঠল যন্ত্রণায়। লোকটা কারাঞ্চো, হাতে ভয়াল দর্শন একটা চুচিলো, এক পোচে বেনের গলা কেটে ফেলার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

সজোরে কারাঞ্চোকে ঠেলে দিল বেন, একটা পোস্টের সঙ্গে সংঘর্ষ হলো হাফ-ব্রীডের। কিন্তু এরই মধ্যে ছুরি চালিয়েছে সে, বেনের জ্যাকেটে আদুরে স্পর্শ বুলিয়ে চলে গেল ধারাল ফলা। অজান্তে কিছুটা পিছিয়ে এল বেন, দেখল এবার বুনো আক্রোশে এগিয়ে আসছে লোকটা। বাতাসে কয়েকবার ছুরি চালাল, যেন বুঝিয়ে দিল একটু পর এভাবেই কচুকাটা করবে ওকে।

পিছাচ্ছে বেন, দ্রুত লয়ে শ্বাস ফেলায় কর্কশ শব্দ হচ্ছে। এদিকে একেবারেই নিরুদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে কারাঞ্চোকে। শিকার কোণঠাসা হয়ে গেছে বুঝতে পেরে রীতিমত উল্লাস বোধ করছে।

গুলি করে কাজটা শেষ করে ফেলার ইচ্ছে অদম্য হয়ে উঠছে বেনের মনে, কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে সামলে রাখল। গুলির শব্দে সমস্ত পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে। সুতরাং খালি হাতে হাফ-ব্রীকে মোকাবিলা করতে হবে।

দেয়ালে ঠেকে গেল ওর পিঠ, ঠিক সেসময় ছুটে এল কারাঞ্চো। এড়ানোর উপায় নেই দেখে আগেই হামলা করা মনস্থ করল বেন, এক পা এগিয়ে লাথি হাঁকাল হাফ-ব্রীডের শরীরের ডান পাশে, একইসঙ্গে হাত বাড়িয়ে কারাঞ্চোর ডান কজি চেপে ধরল। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে এবার ওপর-নিচে টান দিল। অস্ফুট শব্দে ককিয়ে উঠল দো-আঁশলা, এই প্রথম কোন শব্দ বেরোল মুখ দিয়ে। সপাটে লোকটার মুখে ঘুসি হাঁকাল বেন, থ্যাচ করে শব্দ হলো হাতের গাঁটের সঙ্গে ঘর্মাক্ত মুখের সংঘর্ষে। দু’পা পিছিয়ে গেল কারাঞ্চো, টলমল করছে। তাকে সুযোগ দিল বেন, চটজলদি একটা হুক কষাল হাফ-ব্রীডের, চিবুকে। উড়ে গিয়ে মাটিতে পড়ল সে, কিন্তু ওঠার সুযোগ পেল না। ততক্ষণে তার পিঠের ওপর চেপে বসেছে বেন, হাতে কারাঞ্চোর ছুরি। নিষ্ঠুর আক্রোশে ছুরি চালাল ও, অনুভব করল আড়ষ্ট হয়ে গেছে লোকটার দেহ, কয়েকটা খিচুনি দিয়েই স্থির হয়ে গেল।

উঠে দাঁড়াল বেন। ঘাম জমেছে মুখে, হাতের চেটো দিয়ে ঘাম মুছল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। ইশশ, আরেকটু হলে গেছিল আজ!

কয়েকটা বস্তার পেছনে টেনে নিয়ে এল কারাঞ্চোর লাশ, তারপর ফিরে এসে মেঝে থেকে রক্তের দাগ মুছে ফেলল। বস্তার ফাঁকে ছুরিটা ছুঁড়ে ফেলল। কারাঞ্চোকে নিয়ে ম্যালপেই রীজে যাওয়ার কথা রেডের, মনে হয় না আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওদের খোঁজ করবে কেউ। মানুষ শিকার করতে গিয়ে নিজেই শিকার হয়ে গেছে কারাঞ্চো, আর আরেকজন জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে সবচেয়ে ঘৃণ্য লোকটির পাশে!

বাঙ্ক হাউসের কাছে ফিরে এল বেন, জানালা দিয়ে চোখ রাখল আবার। এখনও স্টোভের পাশেই রয়েছে স্লিম আর কার্লি। দেয়ালের লাগোয়া মই বেয়ে ছাদে উঠে এল ও, চিমনির দিকে এগোচ্ছে। ব্যান্ডানা আর বার্ন থেকে আনা চটের বস্তা দিয়ে চিমনির মুখ মুড়ে দিল। দেখল ছাদে শুকাতে দেয়া হয়েছে বেশ কিছু কাঠের চেলা। ওগুলোর পেছনে এসে অবস্থান নিল ও। বাঙ্ক হাউসের ভেতরে খিস্তি করল কেউ, অস্পষ্ট ভাবে শুনতে পেল বেন। চিমনির মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নগদ ফলাফল শুরু হয়েছে।

মিনিট খানেক পর মই বেয়ে উঠে এল এক লোক। পরিষ্কার আকাশের বিপরীতে স্লিমের দেহ স্পষ্ট ফুটে উঠল। চিমনির দিকে এগোচ্ছে লোকটা। বন্ধ চিমনির ওপর ঝুঁকে পড়ল সে, ঠিক তখনই কানের পাশে কোল্টের শীতল নলের অস্তিত্ব অনুভব করল। অজান্তে কেঁপে উঠল লোকটার দেহ।

অজ্ঞান করে তাকেও বাঁধল বেন, মুখে কাপড় ঢুকিয়ে দিয়েছে। হেঁটে ছাদের অন্য কিনারে চলে এল ও, তারপর কিনারা ধরে শরীর ঝুলিয়ে দিল। ছোট্ট লাফে নেমে এল নরম মাটির ওপর। বাঙ্ক হাউসের চারপাশে এক চক্কর দিয়ে দরজার পাশে এসে দাঁড়াল। খোলা দরজা দিয়ে ধোয়ার মেঘ বেরিয়ে আসছে।

নিকুচি করি তোমার, স্লিম! খেপা স্বরে চিৎকার করল কার্লি। করছটা কি? এখনও চিমনির মুখ পরিষ্কার করতে পারোনি?

উত্তর এল না।

কিছুক্ষণ পর রেগেমেগে বেরিয়ে এল কার্লি।

আঘাত করল বেন। কিন্তু যুৎসই হয়নি মারটা। হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল কার্লি। আরে! হচ্ছেটা কি…! সবিস্ময়ে বলে উঠল সে, কিন্তু বেনের বুটের লাথি চিবুকে এসে পড়তে প্রশ্নটা আর করা হলো না।

অন্যদের মত কার্লিরও গতি করল বেন, বাঙ্ক হাউস থেকে দূরে সরিয়ে নিল তাকে। তারপর ছাদে উঠে ব্যান্ডানা আর চটের বস্তা সরিয়ে দিল চিমনি থেকে, মই বেয়ে নেমে এল মাটিতে। মই সরিয়ে বাঙ্ক-হাউসের দরজা বন্ধ করে দিল।

চাঁদের আলোয় চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠার আগেই মূল বাড়িতে ঢুকতে হবে। সময় কম কিন্তু বেন এখনও নিশ্চিত জানে না ভেতরে স্টিভ হারকার। আছে কিনা। নিচু হয়ে খিচে দৌড় দিল ও, গেট পেরিয়ে বাগানে ঢুকে পড়ল। বাড়ির দক্ষিণ অংশে ফুলের বাগান। এখনও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে বাগানটা, কিন্তু একটু পরেই চাঁদের আলোয় ভেসে যাবে সবকিছু। প্রশস্ত ব্যালকনি থেকে অনায়াসে যে কারও চোখে পড়ে যাবে ও।

গেটের হুড়কো খুলতে যেতে আচমকা পদশব্দ শুনতে পেল বেন? ঝটিতি ঘুরে দাঁড়াল। পাঁচ ফুট দূরে ক্ষীণ একটা কাঠামো দেখা যাচ্ছে। স্রেফ রিফ্লেক্সের বশে পিস্তল বের করে ফেলেছিল, কিন্তু লোকটাকে চিনতে পেরে নিজেকে সামলে নিল। জেফরি ব্রেনেল।

বেন!

কষে যেন চড় মেরেছে ওকে কেউ, নিখাদ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকল বেন। জেফরি যেন মেয়েলি কণ্ঠে কথা বলছে, কারণ স্বরটা ওর নিজের বোনের মিরিয়ামের।

আমি, বেন!

হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে নিজের দিকে টেনে আনল বেন, গেটের আড়ালে দাঁড়াল। আরেকটু হলে তোমাকে গুলি করে ফেলেছিলাম! অস্ফুট স্বরে বলল ও।

জেফরির পোশাক পরেছি আমি, দূর থেকে দেখলে হয়তো…

এখানে কি করছ?

ওর চোখে চোখ রাখল মেয়েটা। একা এসেছ তুমি, কারও না কারও সাহায্য তো তোমার দরকার হতেই পারে।

ঈশ্বরের কৃপা দরকার, আর কিছু নয়! বিড়বিড় করে অসন্তোষ প্রকাশ করল বেন।

জ্যাকেট খামচে ধরে নিজের দিকে বেনকে ফেরাল মিরিয়াম। না, বেন! এভাবে বিপদের মধ্যে তোমাকে যেতে দেব না আমি!

একটা শব্দও উচ্চারণ করল না বেন, ঝুঁকে মিরিয়ামের কপালে ঠোঁটের আলতো স্পর্শ বুলিয়ে দিয়েই ঘুরে দাঁড়াল। নিঃশব্দে হুড়কো সরিয়ে গেটের পাল্লা সরিয়ে দিল। ভেতরে ঢুকে পড়ল ও, পেছনে তাকাল না। জানে অনুসরণ করছে মেয়েটা। ছায়াঘেরা গাছের আড়ালে পৌঁছে ফিরে তাকাল ও, পাশে এসে দাঁড়ানো মিরিয়ামের দিকে ফিরল এবার। এখানেই থাকো, চাপা স্বরে নির্দেশ দিয়ে বাড়ির দিকে এগোল ও। দেয়াল টপকে বাগানের নরম মাটিতে পা রাখল। চোখ তুলে দেখল দোতলায় টম নোলানের স্টাডিতে বাতি জ্বলছে।

বাগানের দেয়াল থেকে দোতলার ব্যালকনিতে উঠতে সমস্যা হওয়ার কথা। নয়। নিচু রেলিং-এ উঠে এসে থেমে কান পাতল বেন। ওর বামে আলোকিত একটা জানালা দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত অ্যাগনেসের কামরা। নিচে বাগানের দিকে তাকাল, অস্পষ্ট ভাবে স্ট্রবেরির শাখা দেখা যাচ্ছে। মিরিয়ামকে দেখা যাবে না। মেয়েটির সঙ্গে যে চালাকি করেছে, সেটা মনে পড়তে আনমনে হাসল বেন। স্টিভ হারকারকে ধরা পর্যন্ত মেয়েটা ওখানে থাকলেই স্বস্তি বোধ করবে।

ব্যালকনি ধরে এগোল ও, অ্যাগনেসের কামরার জানালার নিচে এসে দাঁড়াল। চৌকাঠ ধরে জানালা গলে ভেতরে ঢুকল। দেখল নরম কার্পেটে পায়চারি করছে মেয়েটা, লো-কাট গলার একটা ড্রেস পরনে, রেশমী চুলের গোছা তুলে রেখেছে মাথার ওপর। মুখে কালসিটে দাগ থাকার পরও, সত্যিই সুন্দর দেখাচ্ছে। অ্যাগনেসকে, যে কোন লোকের কাছেই কাক্ষিত মনে হবে, যদি না বেন স্লেজেলের মত একে চেনে সে।

জানালার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল মেয়েটা, একটা সিগারেট ধরাল। তারপর ঘুরে আবার পায়চারি শুরু করল। পেছনে নীল ধোয়ার মেঘ ছুটছে। অন্য কেউ হলে হয়তো ভাবত অনুশোচনায় পুড়ছে মেয়েটা, কিন্তু অ্যাগনেস ব্রেনেলের। মধ্যে জিনিসটা নেই, জানে বেন। কোন একটা পরিকল্পনা করছে নোলান-কন্যা, এবং সেটা নিশ্চয়ই ভাল কিছু নয়।

দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা ওয়ার্ডরোবের পাশে এসে দাঁড়াল বেন। দ্রুত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু উদ্দিষ্ট লোকটাকে এখনও খুঁজে পায়নি। জানালা পথে চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত প্ৰেয়ারি চোখে পড়ছে। ওর পাশেই দরজা খুলে গেল, ব্যালকনিতে বেরিয়ে এল অ্যাগনেস ব্রেনেল। রেলিং-এ হাতের ভর রেখে বাগানের দিকে তাকাল সে। গভীর চিন্তায় কুঁচকে আছে ভুরু দুটো। আচমকা কি যেন দেখতে পেল মেয়েটা, চিৎকার করার জন্যে মুখ হাঁ হয়ে গেছে।

অ্যাগি? বাধ্য হয়েই ডাকল বেন, বাগান থেকে অ্যাগনেসের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে।

চরকির মত ঘুরে দাড়াল অ্যাগনেস, চোখ সরু হয়ে গেছে। বেন! কি করছ এখানে?

ক্ষীণ হাসল ও। সেদিন জানতে চেয়েছিলে কেন ডাবল-বি ছাড়ছি না, মনে আছে? একটা প্রস্তাবও দিয়েছিলে, তোমার বাপের সঙ্গে যাতে হাত মেলাই।

ওকে নিরীখ করছে মেয়েটা। মিথ্যে বলছ, রেন? যদি তাই করে থাকো, খোদার কসম, কিছুক্ষণের মধ্যে ধরে ফেলব আমি এবং চিৎকার করব। স্টিভ হারকার, ফ্রেড মোরিস আর জেফরি ব্রেনেল মুহূর্তের মধ্যে নিচ থেকে চলে আসবে।

গ্লেসিয়াস, ভাবল বেন, ওদেরঅবস্থান আমাকে জানিয়ে দিয়েছ তুমি। কিন্তু নিচে যাওয়ার আগে সামনের মূর্তিমান আপদ টপকে যেতে হবে। এক হিসেবে মেয়েটা সত্যিই ভয়ঙ্কর, হয়তো স্টিভ হারকারের চেয়েও ভয়ঙ্কর।

দেখো, অ্যাগি, দ্রুত বলল ও। জানি ডাবল-বি শেষ হয়ে গেছে। ফুটো পয়সাও ওদের কাছ থেকে পাব না। বিল মারা গেছে, তোমাদের পক্ষে যোগ দিয়েছে জেফরি। কিছু দিনের মধ্যে ডাবল-বির দখল নিয়ে নেবে তোমার বাবা, দুটো বাথান মিলে নিউ মেক্সিকোর সেরা বাথান হয়ে যাবে এটা। যে কোন লোক এখানে রাজার মতই বাস করবে, অ্যাগি।

সিগারেটের ছাই ঝাড়ল অ্যাগনেস, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভেতরে এসো, শেষে নিস্পৃহ স্বরে আমন্ত্রণ জানাল ওকে।

ভেতরে ঢোকার আগে আড়চোখে বাগানের দিকে তাকাল বেন। মিরিয়ামের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না।

দরজা আটকে পর্দা নামিয়ে দিল অ্যাগনেস। দুটো সিগারেট জ্বালিয়ে একটা বেনের ঠোঁটে তুলে দিল, তারপর বেন যে-চেয়ারে বসেছে তার হাতলে বসল। আরও কিছু বলল, এত সহজে সন্দেহ যাবে না আমার, মৃদু স্বরে বলল মেয়েটা, এক আঙুলে আলতো টোকা দিল বেনের বুকের তারায়। এটা কি ধরনের বোকামি?

হারকার বিলকে খুন করেছে, শুনেছ নিশ্চয়ই?

অ্যাগনেসের সুন্দর মুখে বিষাদ বা বেদনার কোন চিহ্ন নেই। বিল বরাবরই মাথামোটা ছিল, সহজ জিনিসটাও ধরতে সময় লাগত ওর। খারাপ লাগলেও বলতে হচ্ছে, এমন কিছুই পাওনা ছিল ওর। সবকিছু আমাকে খুলে বলেছে জেফরি, ক্ষীণ হাসল নোলান-কন্যা। তুমি সত্যিই ভাগ্যবান, বেন, নইলে বেঁচে গেলে কিভাবে! হারকার অনায়াসে তোমাকে ফেলে দিতে পারত!

পুরো রিও ফ্রিয়ো উপত্যকার মালিক হতে যাচ্ছে টম নোলান, তুমিই বলেছ। তখন অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল ব্যাপারটা, কিন্তু কালই জানতে পারলাম কার কাছে ডাবল-বি বন্ধক রেখেছে বিল। কোনভাবেই দেনার টাকা শোধ দিতে পারবে না ওরা।

ওর দিকে ফিরে তাকাল অ্যাগনেস, চোখে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি। বন্ধকের কথা কার কাছ থেকে শুনেছ?

মিরিয়াম বলেছে।

বাতাসে একটা রিং তৈরি করল মেয়েটা। ব্যাপারটা এমন ভাবে ঘটেছে যে বাবাকে জানানোর সুযোগ হয়নি…এখনও জানে না।

স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল বেন। কি বলতে চাইছ?

আরেকটা রিং তৈরি করল অ্যাগনেস। আমি নিজেই রফা করেছি। মদ্যপ স্বামীকে ধার দিয়েছি এবং বন্ধক হিসেবে ডাবল-বিকে রেখেছি। বিল যেহেতু বেঁচে নেই এবং ওর উত্তরাধিকারীদের যথেষ্ট টাকা নেই, ডাবল-বি এখন আমার।

এমনিতেও ডাবল-বির একটা অংশ তোমার, অ্যাগি, তুমি যেহেতু বিলের স্ত্রী।

তীক্ষ্ণ হয়ে গেল চাহনি। তখন কিন্তু এভাবে ভাবিনি! যাকগে, আসল কথা হচ্ছে, এখন পুরো বাথানটাই আমার।

কাজটা নোংরা হয়ে গেল না?

বিতৃষ্ণায় নাক সিটকাল অ্যাগনেস, শেষে স্মিত হাসল। বিলের মদ কেনার টাকা জোগান দেয়ার বিনিময়ে কিছু একটা তো পাওনা ছিল আমার, তাই না?

সবকিছু কখন তোমার বাবাকে জানাবে?

ফের হাসল মেয়েটি। যখন সময় আর ইচ্ছে হবে আমার। এবার কিন্তু বাবাকে একহাত দেখিয়ে দিয়েছি আমি! বহু বছর ধরে ডাবল-বিকে হাতের মুঠোয় পেতে চাইছে সে, চেষ্টাও কম করেনি। শেষপর্যন্ত কি হলো? তার মেয়ে ছোট্ট অ্যাগিই কিন্তু সফল হলো।

টম নোলানের চেষ্টায় গাফিলতি ছিল না, জানে বেন, কিন্তু মেয়ের মত নোংরা কোন কৌশল খাটায়নি সে; হয়তো সেজন্যেই সফল হতে পারেনি। নিজের মুখে ফুটে ওঠা বিতৃষ্ণা আর অসন্তোষ ঢেকে রাখতে ব্যর্থ হলো বেন, অ্যাগনেস যাতে দেখতে না পায় দৃষ্টি সরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।

এক পাশে মাথা কাত করল অ্যাগনেস। স্টিভ হারকারকে সত্যিই চাও, তাই?

হ্যাঁ।

ধরো, ওকে তোমার হাতে তুলে দিলাম আমি। এমনিতে সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে কখনোই ওকে হারাতে পারবে না তুমি, বেন। তুমি নিজেও সেটা ভাল করে জানো।

কিন্তু চান্সটা নেব বলেই এসেছি আমি।

হেসে উঠল নোলান-কন্যা। নিচের লিভিংরূমে আছে ওরা। যাও, পারলে ধরো তোমার পছন্দের লোকটাকে, বেন…যদি সত্যিই বোকা হও, চেষ্টা করতে পারো।

তুমি বোধহয় অন্য আয়োজন করে রেখেছ ওখানে, অ্যাগি।

পুরুষ্টু ঠোঁটে তামাকের কণা দেখা যাচ্ছে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে মেয়েটা। তুমি চাইলে ওকে এখানে নিয়ে আসতে পারি আমি, তোমার হাতে তুলে দেব।

কিভাবে কাজটা করবে মেয়েটা, জিজ্ঞেস করার দরকার হলো না বেনের। একেবারে সহজ উপায়।

বরাবরই আমার ওপর আগ্রহ ছিল ওর, বেন, এখনও আছে। কিন্তু বাবার কারণে আমার কাছাকাছি হওয়ার দুঃসাহস করেনি।

বিশ্বস্ততা নাকি ভয়, অ্যাগি?

স্মিত হাসল অ্যাগনেস। নিজেই বুঝে নাও।

বিনিময়ে কি দিতে হবে তোমাকে?

চেয়ারের হাতলে বসল মেয়েটা। আগেও বলেছি তোমার বিরুদ্ধে ক্ষোভ নেই আমার। আমি যখন লেযি-এনের কর্তৃত্ব পাব, পাশে যোগ্য এবং সত্যিকার অফ একজন লোকের দরকার হবে আমার। তুমিই সেই লোক।

গ্রেসিয়াস, শুকনো স্বরে বলল বেন।

তাহলে রাজি তুমি?

নড করল বেন।

উঠে দাঁড়াল অ্যাগনেস, গাউনের ভঁজ ঠিক করে দরজার দিকে এগোল। ব্যালকনিতে অপেক্ষা করো, বাঁকা স্বরে বলল ও। পাঁচ মিনিট সময় দাও আমাকে, ওকে এমন অবস্থানে নিয়ে যাব যে ড্র করতে পারবে না। বাজি ধরতে পারো তুমি। দরজা খুলে বেরিয়ে গেল মেয়েটা, পেছনে পাল্লা দুটো ভিড়িয়ে দিল।

এমনিতেই পারব আমি, বাজি ধরছি, নিচু স্বরে স্বগতোক্তি করল বেন। ব্যালকনির দিকে এগোতে গিয়ে বুটের তলায় কিছু একটা পড়তে হোঁচট খেল ও। সামলে নিয়ে জিনিসটা দেখল। এক জোড়া ছোট্ট বুট। নিপুণ ভাবে তৈরি, কারুকাজ করা। টেক্সাসের রূপালী স্পার লাগানো। অ্যাগনেসের বুট, বলে দিতে হলো না কাউকে। ডাবল-বি ছেড়ে আসার রাতে মেয়েটির পায়ে বুট জোড়া দেখেছে বেন।

পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়াল ও। কি যেন নেই একটা বুটে। বাম পায়ের বুটের দিকে তাকাল। রূপার একটা জ্যাংলার আছে ওটায়, কিন্তু অন্য বুটে নেই।

তৎক্ষণাৎ জ্যাকেটের পকেট হাতড়ে জিনিসটা বের করল বেন। ধুলো-মাখা এই জ্যাংলারটা খুঁজে পেয়েছিল রিও ফ্রিয়োর পাড়ে, কার্ল ব্রেনেলের খুনী যেখানে অপেক্ষা করেছে বহুক্ষণ, অন্তত ডজন খানেক সিগারেট ফুকেছে সে।

হুবহু একই জিনিস। হাঁটু মুড়ে কার্পেটের ওপর বসে পড়ল বেন, অজান্তে জিভ চালিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। দুটো জিনিস পাশাপাশি রেখে তুলনা করল। দারুণ ম্যাচ করছে। শীতল একটা শিহরণ বয়ে গেল ওর মেরুদণ্ডে। মার্কসম্যান লোকটার হাত সত্যিই অসাধারণ ছিল, তিনশো গজ দূরে নিচু জমিতে নিখুঁত নিশানায় গুলি করেছে, তাও চাঁদের আলোয়; কার্ল ব্রেনেলের ঠিক মাথার পেছনে লেগেছে বুলেটটা।

উঠে দাঁড়াল বেন। টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি মনের পর্দায় দোলা দিচ্ছে, ডাবল-বি র‍্যাঞ্চ হাউসের লিভিংরূমে অ্যাগনেসের সঙ্গে একাকী কাটানো কিছু মুহূর্ত মনে পড়ছে। ও নিজেই অস্ত্রে অ্যাগনেসের দক্ষতার কথা বলছিল, রাইফেল বা পিস্তলে লেযি-এন ভ্যাকুয়েরোদের অনায়াসে হারিয়ে দিত অ্যাগনেস। কিছুটা তাচ্ছিল্য করতেও দ্বিধা করেনি তখন, কিন্তু সত্যিই কি অ্যাগনেসের কৃতিত্বকে ছোট করা যায়, নাকি ভ্যাকুয়েরোদের বদান্যতাই সব?

খোদার দয়া! বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করল ও। অসম্ভব মনে হচ্ছে, কিন্তু প্রমাণ দেখেও কিভাবে অস্বীকার করবে? এবার সিরেনোয় ফিরে এসে আগ্রাসী, হিংসুটে এবং স্বেচ্ছাচারী অ্যাগনেস ব্রেনেলকে আবিষ্কার করেছে ও। দরকার হলে সবচেয়ে জঘন্য কাজটাও করতে পারবে এই মেয়ে।

প্রশস্ত হলওয়েতে কয়েকজনের কণ্ঠ শুনতে পেল বেন। দরজা গলে দ্রুত ব্যালকনিতে সরে এল ও, দেখল পেছনে স্টিভ হারকারের উদ্দেশে হাসছে। অ্যাগনেস। কামরার দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গানম্যান, হাতে হ্যাট।

কথা রেখেছে মেয়েটা।

এক পা পিছিয়ে এল বেন, কোল্টের দিকে হাত বাড়াল। স্টিভ হারকার যাই করুক কিংবা যে-কাজেই ব্যস্ত থাকুক না কেন খোলা পিস্তল হাতে কামরায় ঢুকতে হবে ওকে। দুজনকেই চাই ওর। একজন খুনের আসামী, আরেকজন খুনের সম্ভাব্য আসামী; দু’জনকেই ধরতে হবে। কাজটা হয়তো নোংরা হবে, কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন নোংরা জিনিস নিয়ে খেলে, জিনিসটা হাতে না লাগালে কাজ উদ্ধার হয় কিভাবে?

পিস্তলটা সবে হোলস্টার মুক্ত করেছে বেন, ঠিক তখনই পেছনে শীতল হুমকি শুনতে পেয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল শরীর।

হ্যাঁ, বের করো ওটা, স্নেজেল, তারপর পোর্চে ফেলে দাও, শীতল স্বরের হুমকি এল পেছন থেকে। জিনিসটার দরকার হবে না তোমার। শক্ত গোলাকার কিছু একটা দিয়ে ওর পিঠে গুতো মারল লোকটা।

হাতের কোল্ট ফেলে দিল বেন। জানে যে কোন ছুতোয় ওর লাশ ফেলে দেবে ফ্রেড মোরিস।

দরজায় লাথি হাঁকাল সে। মুহূর্ত পরই দরজা খুলল লেযি-এন র্যামরড। বুয়েনস নচেস, স্নেজেল, শীতল স্বরে সম্ভাষণ জানাল সে। ভাবছিলাম কখন তোমার চাঁদমুখ দেখতে পাব।

গানম্যানের কাঁধের ওপর দিয়ে অ্যাগনেস ব্রেনেলের শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকাল বেন। বিশ্বাসঘাতিনী!

কোল্টের ব্যারেল নির্দয় ভাবে ওর মাথায় নামিয়ে আনল ফ্রেড মোরিস। টলে উঠল বেন, স্খলিত পায়ে দু’পা এগিয়ে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করল। অনুভব করল চাদি বেয়ে নেমে আসছে উষ্ণ রক্তের ধারা, স্থির দৃষ্টিতে অ্যাগনেসের দিকে তাকিয়ে থাকল ও। মেয়েটির সুন্দর মুখে ক্ষীণ তাচ্ছিল্যের। হাসি, কিন্তু আয়ত চোখে নিষ্ঠুরতা।

বুড়োর কাছে নিয়ে যাব ওকে? জানতে চাইল মোরিস।

অ্যাগনেসের দিকে ফিরল হারকার। কিন্তু মাথা নাড়ল নোলান-কন্যা। এখন নয়। আগে বাবার সঙ্গে কথা বলব। পছন্দ না করলেও বেনকে সমীহ করে সে, হয়তো ওর মাথায় অন্য কোন চিন্তা খেলে যেতে পারে। বুঝতে পেরেছ, স্টিভ? লিভিংরুমে নিয়ে যাও ওকে। ওখানে বসে পালক-ভাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প। করতে দাও ওকে।

<

Super User