পড়ন্ত বিকেল।
ছটফট করছে ইয়াসীনের মনটা। বেড়ার কোল ঘেঁষে হেঁটে বেড়াচ্ছে ও অস্থির পায়ে। মন বলছে, ক্যাম্পকেডিতে ফিরে যায়নি লেফটেন্যান্ট সাইমন। এদিকেও আসেনি। তা হলে গেল কোথায়!
ম্যাকহার্ডি ফিরল ফাড়ির অন্য সৈন্যদের নিয়ে। সেই মাঠটাতে ঘোড়াগুলো চরাতে নিয়ে গিয়েছিল ওরা। খুব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তবে ফিরেছে সবাই।
তোমার লেফটেন্যান্টের কী হলো, ইয়াসীন? ম্যাকহার্ডিরও সেই একই প্রশ্ন। কোথায় সে? কোথায় হারিয়েছে বারোজন জলজ্যান্ত সৈনিক?
এই মরুভূমিতে গোটা একটা আর্মি হারিয়ে যেতে পারে। হতাশ ভঙ্গিতে মন্তব্য করল ফাউলার।
ওর চূড়ায় উঠে চারদিক একটু দেখে আসতে পারি আমি। দক্ষিণের পাহাড়টা দেখাল ম্যাকর্ডি।
কথাটা ইয়াসীনও ভেবেছিল। কিন্তু বিপদের পরিমাপে বাতিল হয়ে গেছে সে ভাবনা। কাছাকাছি যে কোন জায়গা থেকে পাহাড়ের চূড়াটা দেখা যায়। শত্রুর সহজ টার্গেট।
পাহাড়টার এত কাছে ফাঁড়ি বানানো ঠিক হয়নি, মন্তব্য করল ইয়াসীন। ওরা ওখান থেকে সুযোগ নেয় না তোমাদের ওপর?
একবার নিয়েছিল। ইন্ডিয়ানটার খুলি উড়িয়ে দিই আমরা। ম্যাকহার্ডির কণ্ঠে তৃপ্তি। তারপর আর কখনও চেষ্টা করেনি।
তোমারও চেষ্টা করা উচিত নয়। বিশেষ করে এই মুহূর্তে।
কিন্তু কিছু একটা করা উচিত। কেবিন থেকে সরকারী ম্যাপটা নিয়ে এল ও। দেখা যাক এটা কোন আইডিয়া দিতে পারে কিনা।
একেবারে নিখুঁত নয় ম্যাপটা। তবে যথেষ্ট ভাল। ডট লাইন দিয়ে পুবের সরকারী রুট দেখানো হয়েছে। বিস্তীর্ণ উপত্যকাটা পার হয়ে সেটা সিডার ক্যানিয়নে থেমেছে। তারপর হারিয়ে গেছে মিড হিল-এ। তার ওপাশে গভর্নমেন্ট হাল ও রকম্প্রিং। পুবদিকটা ক্রমেই রূপান্তরিত হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে। ওদিকে, অনেক পুবে রয়েছে ফোর্ট পিউট। পকেটে জুলিয়ানের ম্যাপটার কথা মনে পড়ল ইয়াসীনের।
মানসপটে সেই ম্যাপটা দেখতে পাচ্ছে ও। একই অঞ্চলের ম্যাপ তবু এটার সাথে মেলে না সেটা।
উপত্যকা এবং ওপাশের মিডহিল সে ম্যাপেও আছে। তবে সিডার ক্যানিয়নের উল্লেখ নেই। মাইল দশেক উত্তরপুবের একটা বিচ্ছিন্ন গিরিশিখর দেখানো আছে তাতে। আছে আরও উত্তরের কিংস্টোন পাহাড়। গভর্নমেন্ট হোলের দক্ষিণে একটা চেপটা চুড়ো পাহাড় ও তার পিছনের ঝর্ণাগুলো চিহ্নিত করা আছে যত্নের সাথে। অথচ রকম্প্রিং–এর রুট দেখানো হয়নি ওটায়।
ম্যাপটায়, চিহ্ন ছাড়া কোন কিছু লেখা দেখেনি ইয়াসীন। চিহ্নগুলো আঁকা হয়েছে একটু ডানদিকে কাত করে। একটা বিশেষ প্যাটার্নে কলম ঘোরানোর অভ্যাস থাকলে হয় অমন। সম্ভবত কোন স্প্যানিশ এঁকেছিল ম্যাপটা। খুব পুরোনো ম্যাপ। হয়তো অনেকদিন আগে-এ অঞ্চলে এসেছিল লোকটা।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোন ম্যাপ। যা এঁকেছে কিছুটা দিকভ্রান্ত একজন মানুষ, আরও উত্তরে কোথাও বসে। তার সাথে আনুষঙ্গিক কিছু চিহ্ন হয়তো পরে সে কারও কাছে শুনে, আন্দাজে বসিয়েছে। হয়তো একটা নির্দিষ্ট স্থানের অবস্থান চিহ্নিত করতে গিয়ে বাধ্য হয়ে গোটা একটা অঞ্চল আঁকতে হয়েছে তাকে অনিচ্ছায়।
কী দেখছ? কাঁধের উপর দিয়ে উটের মত গলা বাড়াল ফাউলার।
কল্পনা থেকে বাস্তবের সরকারী ম্যাপে ফিরে এল ইয়াসীন। ম্যাপ, ছোট্ট করে বলল।
আমাদের বোধহয় এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত, বলল ফাউলার।
‘কোথায়?’
অন্য যে কোন জায়গায়। এখানে এভাবে গর্তে লুকিয়ে থাকলে জীবনটাই কেটে যাবে।
ঘোড়াগুলোকে আরও একটু জিরোতে না দিলে অন্য কোথাও যেতে পারব না আমরা, বলল ও।
আসলে লেফটেন্যান্টের অপেক্ষায় দেরি করছে এখানে। তাকে জানতে হবে লেফটেন্যান্ট কোথায়। একটা সামরিক টহলদলের সদস্য সে। অফিসারসহ অন্যান্যদের কী হলো তা না জেনে, ফাউলারের মত অন্য কোথাও যেতে পারে না। অথচ খাবার ফুরিয়ে এসেছে ফাঁড়ির। এখানেও থাকা যায় না আর।
ওধারে বেড়ার কাছে বসে আছে ম্যাকহার্ডি আর রস। ম্যাপ গুটিয়ে সেদিকে গেল ইয়াসীন। সাইমনকে খুঁজতে বেরোব আমি, সিদ্ধান্তটা ওদের জানাল।
কোথায়, কোনদিকে? অবাক হলো রস।
যেখানে হারিয়েছিলাম সেখানে ফিরে গিয়ে ওদের চিহ্ন খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।
এখান থেকে বেরিয়ে একমাইলও তোমাকে যেতে দেবে না ওরা, তা তুমি যতবড় নবাবপুরই হও না কেন, ফোড়ন কাটল ম্যাকহার্ডি।
কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। আজ রাতেই।
তার চোখেমুখে সংকল্প ফুটে উঠতে দেখল ম্যাকহার্ডি। ঘাবড়ে গিয়ে উঠে গেল সে। ইয়াসীনও উঠে দাঁড়াল। আবার শুরু হলো তার অস্থির পদচারণা।
গেটের কাছে বেলিন্দা এসে যোগ দিল ওর সাথে। কী ভাবছ?
টহলদলের কথা। হয়তো কোন ওয়াটারহোলের একশো গজের মধ্যে তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছে ওরা। এ অঞ্চলটা অচেনা ওদের।
তুমি নাকি খুঁজতে বেরোবে?
চেষ্টা করে দেখব। এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা অর্থহীন। চেষ্টা করে দেখতেই হবে আমাকে। নইলে শান্তি পাচ্ছি না।
তারপর? তার চোখে চোখ রাখল ইয়াসীন। চোখ নামাল বেলিন্দা।
যদি না ফিরি? মৃদু ভাবে হাসল ও। স্টেজের সাথে চলে যেও তোমরা। প্রয়োজন হলে ম্যাকহার্ডিকে নিও সাথে। খুব ভাল লোক।
ম্যাকহার্ডি তোমার দেশের গল্প বলছিল।
ও গল্প বলতে ভালবাসে।
ফিরে যাবে না?
সেও এক রণাঙ্গন। আর আমার ফেরার প্রতীক্ষায় সেখানে থেমে থাকবে না কিছু। স্বাধীনতার যুদ্ধ মানুষ না জিতে ছাড়ে না। ভাতরবাসী একদিন স্বাধীন হবে…এই ইন্ডিয়ানরাও হয়তো একদিন স্বীকৃত হবে এই মাটিতে। বিশ্বের আঙিনা থেকে আমেরিকার জন্যে ওরাও গৌরব বয়ে আনবে সেদিন..
চুপ করে আছে বেলিন্দা। কথা বলতে ভাল লাগছে না তার। বুকের মধ্যে বিরহ বৃষ্টি। ওই অবাক লোকটা কাছে না থাকার ভয়! সন্ধ্যা নামছে। ভিতরে-বাইরে-সবখানে।
অস্পষ্ট আলোয় দূরে কি কিছু নড়ল! এক দৃষ্টিতে গেটের ফাঁক দিয়ে চেয়ে আছে ইয়াসীন। মোযেভরাও কি ধৈর্য হারিয়েছে? সাঁঝ নামতেই এগিয়ে আসছে হামলা করতে? নাকি অন্য কেউ!
‘রস, ম্যাকহার্ডি-জলদি এদিকে এসো!’ অনুচ্চ কণ্ঠে ওদের ডাকল। হাতে বেরিয়ে এসেছে পিস্তল। রাইফেল নিয়ে ওর কাছে ফিরে এল সবাই।
ওখানে। গেটের সামনে একটা চওড়া চত্বর। তার পশ্চিমে টিলার মত পাহাড়গুলোকে দেখাল ইয়াসীন। কাউকে দেখেছি আমি। আমাদের কেউ হতে পারে। তা হলে এখানে আসার চেষ্টা করবে লোকটা। আর ইন্ডিয়ানরা ওই চত্বরে দেখে ফেলবে তাকে।
‘অলরাইট!’ বলল ম্যাকহার্ডি। কভার ফায়ার দেবার জন্য পজিশন নিচ্ছি। আমরা। বেড়ার ফোকরে রাইফেলের নল ঢুকিয়ে পজিশন নিল ওরা। সাবধানে গেটটা সামান্য খুলল ইয়াসীন। কয়েক মিনিট কেটে গেল ঘটনাহীন। তারপর দেখা গেল লোকটাকে। একটা পাহাড়ের ওপাশ থেকে বেরিয়ে সোজা ছুটে আসছে এদিকে।
চত্বরের মাঝামাঝি চলে এসেছে লোকটা। সাঁৎ করে একটা তীর গেঁথে গেল লোকটার পায়ের কাছে বালিতে। আর একটা কাঁধ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। আরও তীর আসছে ওদিকের পাহাড় থেকে। বেড়ার এপাশ থেকে কভার ফায়ার গুরু করল এরা। বন্ধ হয়ে গেল তীর।
প্রায় পৌঁছে গেছে লোকটা। এমন সময় দূরের পাহাড়ের কোথাও গর্জে উঠল একটা রাইফেল। চমৎকার হাতের সই ইন্ডিয়ানটার। পড়ে গেল। বালিতে নিঃসাড় পড়ে আছে লোকটার দেহ। এদিকে শব্দ লক্ষ্য করে শুরু হয়েছে পাল্টা ফায়ার।
বেঁচে থাকতে পারে ভেবেই গেট পেরিয়ে সেদিকে ছুটল ইয়াসীন। দেহটা কাঁধে তুলে সে-ও প্রায় ফিরে এসেছে। আবার গর্জে উঠল দূরের সেই রাইফেল। গেটের দরজা কাঁপিয়ে দিল বুলেটটা।
ভিতরে এনে দেহটা কাত করে শোয়াল ইয়াসীন। গ্যারিককে চিনতে পারল সে। টহলদলের একজন। পিঠের বামদিকে লেগেছে গুলি। বেঁচে আছে!
‘তুমি…’ ওকে দেখছে গ্যারিক। আমরা ভেবেছিলাম…তুমি মারা গেছ। শ্বাস নিতে নিতে বলল সে।
লেফটেন্যান্ট কোথায়?
ওখানে, হাত তুলে দেখানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলো তার। এখনও বেঁচে আছে। ওরা…ওরা অনেকদূর তাড়িয়ে নিয়ে গেছে… ঘোড়াগুলো নেই…টার্নার নেই…
কোথায় গ্যারিক, কোনদিকে?অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করল ইয়াসীন।
উত্তরে…দশ মাইল…’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলার চেষ্টা করল সে। বেলিন্দা একটা পানির কাপ ধরল তার ঠোঁটে। সামান্য ঝুঁকে একঢোক কোনমতে খেল সে। একটা উঁচু…গম্বুজ…’ খুব কষ্ট হচ্ছে তবু বলতে চেষ্টা করল নিস্তেজ হয়ে আসা গ্যারিক। তার ওপাশে…একটা চূড়া…তার ওপাশে পাহাড়…পানি…’ আবার পানির কাপটা তার ঠোঁটে ধরল বেলিন্দা। খাওয়ার আগেই মারা গেল গ্যারিক।
মৃতদেহটা ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বেড়ার কোলে। কাল ভোরে কবর দেয়া হবে। মোকাটো চেয়ে আছে ওর দিকে। জায়গাটা চেনো? জিজ্ঞাসা করল।
মাথা নাড়ল ইয়াসীন, চেনে না।
আশপাশে অনেকগুলো ওয়াটারহোল আছে।
এবং সবগুলো পাহারা দিচ্ছে ইন্ডিয়ানরা।
শ্রাগ করল মোকাটো। সম্ভবত।
চূড়া থেকে ওয়াটার হোলগুলোর দূরত্ব কত?
তার দিকে চেয়েই আছে মোকাটো। আমি আসি তোমার সাথে?
অভিসারে যাচ্ছি নাকি আমি? ধমকে উঠল ইয়াসীন। একা যাচ্ছি বলেই হয়তো ওদের চোখে ধূলো দেওয়া যাবে।
হাল ছেড়ে দিয়ে হাসল মোকাটো। ওদের চোখে ধূলো দেওয়া? কোন ভাবেই তা সম্ভব নয়।
বালিতে আঙুলের আঁচড় কেটে লোকেশনটা আঁকল মোকাটো। এই হলো ওয়াইল্ডক্যাট চূড়া। সোজা ওটার দিকে এগোবে চড়াই ভেঙে। উঠতে উঠতে প্রথমে গম্বুজের ছাদ, তার ওপাশে ওয়াইল্ডক্যাট। ওটা পার হলে উত্তরে আর একটা পাহাড়। গ্যারিকের কথা অনুযায়ী সেটার কোলেই আছে অফিসার।
লোকেশনটা ভালমত বুঝে নিয়ে উঠল ইয়াসীন। ও, কে। মোকাটোর দিকে তাকাল। ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নেব আমি। ঘোড়াটা রেডি রেখো।
তাকে কেবিনে ঢুকতে দেখল বেলিন্দা। মার্থা খালার দিকে চাইল সে। খালা, কি করতে যাচ্ছে ও জানো?
না! দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মিসেস ম্যাকডোনাল্ড। তোর খালুও ওরকম। মুখ বুজে কাজ করে, বিপদে-আপদে নিজেই কাঁধে তুলে নেয় সব দায়িত্ব।
কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়েছে ইয়াসীন। ঘুমিয়ে পড়ল।
<