‘হায়, পোড়া কপাল!’

আনন্দ আর উত্তেজনায় এলোমেলো হয়ে গেল বেলিন্দা। ‘সীন তুমি?’ পিছনে ফিরল সে। আন্টি-দেখে যাও কী আবিষ্কার করেছি আমি।’

বেলিন্দার খালা, মিসেস মার্থা ম্যাকডোনাল্ড এসে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। মায়ের কথা মনে করার চেষ্টা করছে ইয়াসীন। মনে নেই!

‘আচ্ছা ছন্নছাড়া ছেলে তুই, ইয়াসীন। এখানে আছিস, একটা চিঠিও তো লিখতে পারিস? নাকি ভুলে গেছিস এই বুড়ীকে’।

‘ভুলিনি, খালা। শুধু সময় পাই না।’

‘চুপ, আসলে ফাঁকিবাজ কোথাকার। কিন্তু তুই এখানে কেন, ইয়াসীন! যতদূর জানি-মেজর আব্রাহাম সাইক এখানকার কমান্ডিং অফিসার। তার সাথে তো তোর থাকার কথা নয়?’

‘তার সাথে নেই আমি। সে সবেমাত্র এসেছে আর আমি এই যাচ্ছি বলে। মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে আমার’।

‘ওহ্ ফাইন! উৎসাহের সাথে বলল বেলিন্দা। এই নরকের চাকুরিতে আবার নিশ্চয়ই ফিরে আসছ না?’

বেলিন্দার চোখে চোখ রাখল ইয়াসীন। ‘তা ছাড়া উপায় কী বল? ঘরে বেঁধে রাখার মত কেউ তো নেই আমার’।

‘বেঁধে রাখার মত কেউ না থাকলেই তো মানুষ বেছে নেয় বুনো পশ্চিম। চোখ নামাল বেলিন্দা। নতুন বাঁধনের সন্ধান খুঁজে ফেরে।

‘আমাদের সাথে থাকতে আসবি, বাবা?’ এবারে কথা বলেন মার্থাখালা। ‘তোর খালু একটা ভেড়ার খামার খুলেছে নেভাডায়। বুড়ো মানুষ। পেরে ওঠে না একা। তোর মত শক্ত সমর্থ জোয়ান ছেলে যদি থাকত আমাদের!’

মেজর সাইক এসে দাঁড়াল পাশে। ‘এখানে দাঁড়িয়ে গল্প করা নিশ্চয়ই তোমার ডিউটি নয়, সার্জেন্ট’। ইয়াসীনের উদ্দেশে উষ্মা প্রকাশ করল সে।

‘অবশ্যই নয়, সার’।

ঘুরে কোয়ার্টারের দিকে রওনা হলো ইয়াসীন। মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। মেজর সাইকের অহেতুক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নয়। বেলিন্দার জন্য। ভুলে যাবার ঠিক আগের মুহূর্তটায় আবার দেখা হয়ে গেল ওর সাথে। নেভাডায় যাচ্ছে ওরা। যে কোনও জায়গায় যেতে পারে। সে সব শুনে ইয়াসীনের কী লাভ?

ম্যাকডোনাল্ড পরিবারকে বহুদিন ধরে চেনে ইয়াসীন। অন্য ঘটনার মধ্য দিয়ে। একবার অ্যাপাচি ইন্ডিয়ানদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করেছিলেন জন ম্যাকডোনান্ড। সেই থেকে ওদের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে গেছে সে। মায়ার বাঁধনে।

জন খালু তাহলে এখন নেভাড়ায়! সব ছেড়েছুড়ে ভেড়ার খামার খুলেছেন? জীবনে ত ক কিছু করলেন জন ম্যাকডোনাল্ড। তবু স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারলেন কোথাও।

কিছু মানুষ আছে যারা স্থির হতে পারে না কোনওদিন। বারবার অচেনা দিগন্তে ছুটে যায় তারা। আর একটু এগিয়ে গেলেই বিশ্রামের নিশ্চিন্ত মরূদ্যান মিলবে এই আশায়। অথচ পূরণ হবার মত আশা সেটা নয়। আশাই নয়। নেশা! অবিরাম অনিকেত গতির উল্লাস। জন খালুকে ভাল লাগে আমার-ভাবল ইয়াসীন।

তবে তার সাথে দুস্তর ব্যবধান জন ম্যাকডোনাল্ডের। চালচুলোহীন ভবঘুরে কোনও সৈনিক নন তিনি। ব্যাংকে বিস্তর অর্থ আছে। আগে একটা বিশাল র্যাঞ্চ ছিল, বর্তমানে সেটা ভেড়ার খামারে রূপান্তরিত। আর আছে মিসেস মার্থা ম্যাকডোনাল্ড। ভাগ্য বটে।

অথচ তেমন আহামরি কিছু নয় মিসেস ম্যাকডোনাল্ড। ছিলেনও না কোনও কালে। এই বুনো পশ্চিমে রূপ মানুষের কোন্ কাজটায় লাগে! প্রয়োজন তো গুণ। প্রয়োজন টিকে থাকার সাহস। কোলের বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে স্বামীর রাইফেল রিলোড করতে জানাই এখানে আসল প্রয়োজন।

মিসেস মার্থা অবশ্য এতসব প্রয়োজন মিটাতে পারেননি। কোলে দুধের বাচ্চা ছিল না। তবে সে-ভাবেই গড়ে তুলেছেন বেলিন্দাকে। স্বামীর রাইফেল রিলোড করাও হয়নি। কারণ সে-রকম সময়ে নিজে আর একটা রাইফেল তুলে নিয়েছেন হাতে। সর্বোপরি-এই বুনোপশ্চিমে অপ্রয়োজনীয় কমনীয়তা ছিল তার।

আর ছিল স্বামী জন ম্যাকডোনাল্ডের মতই অবিরাম গতির উল্লাস। এখনও আছে। জনের পাশে, যে কোনও দিগন্তে হারিয়ে যেতে সদা প্রস্তুত তিনি। শুধু সহধর্মিণী নন, সহযোদ্ধা। এই বিপদসংকুল জীবনযাত্রায়-সহযাত্রী।

সৌভাগ্যবান জন ম্যাকডোনাল্ড। ওরকম একটা বউ আছে বলেই বুড়ো বয়সে নতুন ভেড়ার খামার করতে পেরেছেন তিনি।

ওরকম একটা বউ থাকলে আমিও পারতাম! আত্মমগ্ন অস্পষ্ট হাসিতে প্রকাশ পেল ইয়াসীনের ভাবনা। বেলিন্দার কথা মনে হলো।

নামজাদা রাষ্ট্রদূতের একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। বাবা গুরুত্বপূর্ণ মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশদেশান্তর। অবশেষে তাকে মানুষ করার আর পড়ল খালার উপর।

মিসেস মার্থা ম্যাকডোলাল্ডের কুমারী সংস্করণ হিসাবে বড় হয়ে উঠল বেলিন্দা। বিত্ত ও প্রতিপত্তির শীর্ষে পৌঁছোনো কোনও কুমার জন ম্যাকডোনাল্ডের জন্য!

নাহ্। মানায় না। চালচুলোহীন এক ভেতো ভারতীয়র হাতে নিছক বেমানান ওই দুস্প্রাপ্য ক্যাকটাস ফুল। মেজর সাইককে বরং মানায়। অস্তাচলে তাকাল ইয়াসীন। দিগন্তের ওপাশে এখনও রোদ। কিন্তু সেই রোদে কোনওদিনই গড়ে উঠবে না ইয়াসীনের স্বপ্নের খামার!

দ্রুত শেষ হলো সংক্ষিপ্ত সাঁঝ। এরপর একটানা রাত। এবং আগামী প্রত্যুষে বেলিন্দার প্রস্থান। এই মরুভূমি পাড়ি দিতে নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে ওদের। হবারই কথা। পশ্চিমের অশান্ত আগুনে তাতানো অনেক ইস্পাতকঠিন মানুষও মোযেভে এসে এলিয়ে যায়।

তার উপরে আছে ইন্ডিয়ান আক্রমণের ভয়। এখান থেকে লাসভেগাস অবধি পথের যে কোনও জায়গায় আক্রমণ করতে পারে তারা। এমনকী খোদ লাসভেগাসও আশঙ্কামুক্ত নয়।

খুব বেশি বয়স নয় শহরটার। আঠারোশো সাতান্ন সালে মরমন ইন্ডিয়ানরা ভেগাস স্প্রিং ছেড়ে চলে যায়। গ্যাস নামের এক বিত্তবান র্যাঞ্চার কিনে নেয় ওখানকার জলসত্তা।

প্রথমে গড়ে ওঠে ফোর্টবেকার সেনানিবাস। তারপর তাকে ঘিরে গোড়াপত্তন হয় লাসভেগাস শহরের। ফোর্টে সৈন্যসংখা কম হওয়াতে ইন্ডিয়ানদের দৌরাত্ম কখনও কমেনি ওখানে।

বেলিন্দাদের নিরাপদে লাসভেগাসে পৌঁছে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে ইয়াসীনের। কিন্তু উপায় নেই। সরকার বেতনভুক সৈনিক সে। মেয়াদ যদিও শেষ হয়েছে, তবু ছাড়পত্র এখনও মেলেনি। আর বিনা ছাড়পত্রে সে যদি যায়-পরিণতি কী হবে সহজেই অনুমেয়। বিশেষ করে কমান্ডিং অফিসার যখন মেজর সাইক।

রাইফেল পরিষ্কার করতে বসে পায়ের শব্দ পেল ইয়াস্ত্রীন। সামনের বালিতে একজোড়া বুট। অন্ধকারেও চকচকে। পা বেয়ে উঠতে শুরু করল তার দৃষ্টি। চওড়া কাঁধ। রুক্ষ চিবুক। অন্ধকারেও চকচকে একজোড়া চোখ।

‘ইয়াসীন তোমার নাম, তাই না?’

‘তাই।’

‘লেফটেন্যান্ট জুলিয়ানের সাথে ছিলে তুমি তাই না?

‘তাই’।

‘মৃত্যুর আগে কিছু বলেছিল সে? বিশেষ কিছু?’ পকেট থেকে একটা স্বর্ণঈগল বের করল লোকটা।

রাইফেলে মনোযোগ দিল ইয়াসীন। ‘তার মৃত্যুর ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিয়েছি আমি অফিসারকে। সে-ই ভাল বলতে পারবে এ সম্পর্কে’।

ঠক করে রাইফেলের উপর পড়ল মুদ্রাটা। ‘জুলিয়ানের জিনিসপত্র কোথায়?’

লোকটার স্পর্ধায় বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল ইয়াসীন। ‘পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তার আত্মীয়স্বজনের কাছে’। কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে বলল। পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। খপ করে তার হাত চেপে ধরল লোকটা।

‘হাত সরাও!’ কঠিন স্বরে বলল ইয়াসীন। ‘নইলে ভেঙে দেব।’

হাত ছেড়ে পিস্তল বের করল লোকটা। ‘মুখ সামলে কথা বল। নইলে খুন করে ফেলব’।

হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে, শরীর ঢিলে করে দাঁড়াল ইয়াসীন। সামান্য তুলল চিবুক। চোখের কোণে করুণা। ‘এখনও সময় আছে, খোকা। ভাল হয়ে যাও। নইলে প্যান্ট নষ্ট হয়ে যাবে পরে’।

‘সাবধান!’ পিস্তল দোলাল লোকটা। ‘লী ফাউলার দাঁড়িয়ে আছে তোমার সামনে’। সাপের ছোবলের মত উচ্চারিত হলো নামটা।

এক পায়ে ভর দিয়ে আরও একটু আয়েশী ভঙ্গিতে দাঁড়াল ইয়াসীন। ‘লী ফাউলার? মানে যে জুয়েলের নামে কতগুলো বেহদ্দ মাতালকে গুলি করেছিল অন্যায় ভাবে?’ চিবুক সামান্য কাত করল সে। ভ্রূতে বিদ্রুপের কুঞ্চন। ‘তুমি তা হলে সেই জোচ্চোর কাপুরুষ!’

এতটা আশা করেনি ফাউলার। মুখের উপর আজ পর্যন্ত কেউ তাকে জোচ্চার কাপুরুষ বলার সাহস পায়নি। বিস্ময়ে থমকে গেল সে। সামলে নিয়ে ট্রিগার টেপার আগেই ইয়াসীনের ঘুসিটা লাগল তার চোয়ালে।

মাটি ছেড়ে আঙুল চারেক উঠে গেল চকচকে বুট জোড়া। চওড়া কাঁধে বালি ছুঁয়ে চিৎ হয়ে পড়ল ফাউলার। হাতের পিস্তল ছিটকে পড়েছে দশ হাত দূরে।

‘ইয়াসীন!’ ঘটনাটা দেখতে পেয়ে ছুটে এল সাইক। এসব হচ্ছে কী এখানে?

‘লোকটা তালকানা, সার’। অ্যাটেনশন হয়ে বলল সে। ‘চলতে জানে না মরুভূমিতে, তাই হোঁচট খেয়ে পড়েছে।’

এগিয়ে গিয়ে পিস্তলটা তুলল সাইক। ‘আই সী! তোমার বন্ধুগুলোও তা হলে বিধাতার অপসৃষ্টি এক একটা’।

‘আমার না, সার, জুলিয়ানের বন্ধু। অন্তত ও তাই বলছিল’।

উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে ফাউলার। প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলো তার। আবার পড়ে গিয়ে মাথা ঝাঁকি দিল সে কয়েকবার। তারপর টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল।

‘কাল সকালের স্টেজ কোচটায় এখান থেকে দূর হয়ে যাবে তুমি,’ ফাউলারের উদ্দেশে বলল সাইক। ‘তার আগ পর্যন্ত বেরোতে পারবে না কোয়ার্টার হতে’।

‘বললেই হলো?’ খেকিয়ে উঠল ফাউলার। ‘ফৌজের সিপাই পেয়েছ নাকি আমাকে?’

‘উইলী!’ অন্ধকারে ঢেউ তুলল সাইকের স্বরযন্ত্র। ‘চত্বরে পাহারা দেবে তুমি। ইন্ডিয়ানরা আসতে পারে রাতে। কারও চলাফেরার সামান্য আভাস পেলেই ফায়ার ওপেন করবে। বুঝেছ?’

‘বুঝেছি, সার’। গ্যালারির উৎফুল্ল দর্শকের মত বলল উইলী। ‘লোকটাকে কোয়ার্টারে পৌঁছে দেব, সার?’

‘ইয়েস’।

ফাউলার চলে যেতেই কাছে এগিয়ে এল মেজর। ‘ওই লোকটাকে কতটুকু চেনো, সার্জেন্ট?’

‘খুব বেশি না, সার। শুনেছি পাক্কা জুয়াড়ী ওই ফাউলার। বাজে লোকজনের সাথে মেলামেশা করে। এ পর্যন্ত গোটাতিনেক খুন করেছে গানডুয়েলের ছুতোয়। কোনওটাই সমানে সমান লড়াই ছিল না’।

‘আই সী। তুমি বললে-হোঁচট খেয়ে পড়েছে ফাউলার?’

‘রাত হয়ে এসেছে, সার। অহেতুক নাড়াচাড়া করছিল পিস্তলটা। এমন সময় হোঁচট খেল যেন কীসের সাথে। তারপরেই দেখি পড়ে আছে বালিতে’।

‘ঠিক আছে যাও তুমি’।

‘একটা কথা বলতে পারি, সার?’ গেল না ইয়াসীন।

‘ইয়েস’।‘চেহারার যে বর্ণনা আমি পেয়েছিলাম, তাতে মনে হয় ফাউলারই সেই লোক। লস অ্যাঞ্জেলস-এ যে বদলীর কাগজপত্র পকেট থেকে বের করে দিয়েছিল জুলিয়ানের হাতে।’ কথাগুলো বলে আর দাঁড়াল না ইয়াসীন।

<

Super User