পথে কোন বিপদ হলে না, সকালের প্রথম আলোয় নিরাপদেই ক্যাম্পে পৌঁছল ওরা। অবাক হয়ে গেল বেনন। গত দু’দিনে এক মাইল এগিয়ে এসেছে ক্যাম্প। প্রতিদিন আধ মাইল করে লাইন বসাচ্ছে জিমি নর্টনের শ্রমিক দল। আগের মতই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাবু আর কাঠের ছোট ছোট গুদাম-ঘর। দেখে মনে হচ্ছে প্রবল কোন ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে চারপাশ। ক্যাম্পের মাঝখানে জ্বলছে মস্ত একটা আগুন। বড় বড় কয়েকটা কড়াইতে নাস্তার আয়োজন হচ্ছে। ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করছে ক্রুরা। এটা নিশ্চিত যে রাতে ওয়াঙের লোকরা হামলা করেনি। ওয়াং এখন কোথায় আন্দাজ করতে পারল বেনন।

পরের চিন্তা পরে করা যাবে। ঘোড়া রেখে আগে বাড়ল বেনন। হ্যাটারকে ওয়াগন থেকে নামাতে লোক ডাকতে হবে, খবর দিতে হবে জিমি নর্টনকে, যাতে করে তাড়াতাড়ি একটা ট্রেনের ব্যবস্থা করে আহত র‍্যাঞ্চারকে শহরে পাঠানো যায়।

মাত্র হাত পাঁচেক গিয়েই ধরা পড়ে গেল বেচারা। ভাবতেও পারেনি এরকম বিপদ ঘাড়ে এসে পড়তে পারে। পেছন থেকে ভারী একটা হাত এসে চেপে ধরল ওর ঘেঁটি। কানের লতিতে পুরু ব্রাশের মত কর্কশ গোঁফের খোঁচা খেল বেনন। বোমার মত ফেটে পড়ল জিমি নর্টনের মোটা গলা: তাহলে তুমি আবার এসেছ! সাহস তো কম নয়! এইবার ঘুসিয়ে ভর্তা করে ফেলব!

শূন্যে পা ঝুলছে ওর, মরিয়া হয়ে রাগে-দুঃখে চেঁচাল বেনন, আমি তোমাকে আগেও বলেছি ওই টেলিগ্রামটা ভুয়া!

কথাটা ঠিক, ওকে সমর্থন করল ব্র্যান্ডন। ওয়্যাগন নিয়ে এসে পড়েছে ওরা। থেমেছে ঝুলন্ত বেননের পাশে।

বিদঘুঁটে চেহারা করে ওকে ছেড়ে দিল নর্টন। ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ওকে দেখলেই আমার ঝামেলাবাজ বলে মনে হয়!

আমারও তাই মনে হত, বলল হ্যারি হুলাহান। কিন্তু আসলে ও মন্ট্যানা সেন্ট্রালের লোক। আমাদের হয়ে লড়তে ওকে আমি নিজের চোখে দেখেছি।

ওয়্যাগনটাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে কৌতূহলী রেল রোডারা। হাতের ইশারায় তাদের চলে যেতে বলল ব্র্যান্ডন। লোকগুলো সরতে লেগেছে এমন সময় হুইসল বাজিয়ে ক্যাম্পের অস্থায়ী স্টেশনে থামল একটা লোকোমোটিভ। ওটা থেকে নামল চ্যাং টোয়াঙের পাঠানো নতুন শ্রমিকরা। সবার শেষে নামল মিস অ্যানা হ্যাটার, ব্যাগলে, ধোপদুরস্ত পোশাক পরা ভাউবয়েস সি. ভাউবয়েস নোয়াক আর এমব্রয়ডারি করা নাইটগাউন জড়ানো ফ্র্যাঙ্ক নোয়াক। দলটার মধ্যে সবার নজর কাড়ল ব্যাগলে তার দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা প্যান্টটার জন্যে।

ব্যাগলে কাছে আসতেই হাত বাড়িয়ে দিল উচ্ছ্বসিত নেন।

কেমন আছ, বুড়ো ঘোড়া?

কি করে বলি! উদাস হয়ে গেল ব্যাগলে। সামনে ভদ্রমহিলা আছে যে!

মিস্টার ব্যাগলে সদ্য হেলেনা ঘুরে এসেছেন; তারপর থেকেই এরকম উদাস হয়ে যাচ্ছেন তিনি, জানাল ফ্র্যাঙ্ক নোয়াক।

বাবাকে দেখতে শুকনো মুখে ওয়্যাগন বক্সে গিয়ে উঠেছে ডেইজি আর মিস হ্যাটার। এদিকে ব্র্যান্ডন আর হুলাহান পাগলা হ্যাটারের আহত হওয়ার ব্যাপারটা ভাউবয়েসকে জানাচ্ছে। মাঝপথেই তাদেরকে থামিয়ে দিল ভাউবয়েস। বলল, এখন নয়, পরে শোনা যাবে বাকিটা। এখন হচ্ছে দায়িত্ব পালনের সময়। আহত মানুষটাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। টেইল হল্টে ভাল ডাক্তার আছে?

আছে, বলল ডেইজি, যদি কোন ঘোড়া অসুস্থ হয়ে পড়ে।

মানে?

পশু চিকিৎসক।

ব্র্যান্ডন, এক্ষুণি হেলেনায় টেলিগ্রাফ করো, এঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকিয়ে ষাঁড়ের মত গর্জন ছাড়ল ভাউবয়েস। সেরা ডাক্তারকে পাঠাতে বলবে। লোকটা পৌঁছনোর আগেই হ্যাটারকে নিয়ে টেইল হল্টে পৌঁছে যাব আমরা। আমার ব্যক্তিগত কোচে করে যাবে হ্যাটার। চট করে মিস অ্যানা হ্যাটারকে এবার দেখে নিল ভাউবয়েস। আমরা আমাদের হ্যাটারকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করব; আমরা বুঝিয়ে দেব যে মন্ট্যানা সেন্ট্রাল রেল রোড হৃদয়হীন কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়; আমরা শুধু মানুষের উপকারের জন্যেই মন-প্রাণ ঢেলে সেবা করব বলে ব্রতী হয়েছি।

মিস্টার হ্যাটার জমি না বেচলে রেল রোডের খরচ অনেক বেশি পড়বে সে-কথা তোমার মনেই নেই, তাই না, বাবা? নীরিহ ভঙ্গিতে জানতে চাইল ফ্র্যাঙ্ক। চোখ পিটপিট করে বাবাকে দেখছে।

চুপ করো, ফ্র্যাঙ্ক, ধমক দিল ভাউবয়েস। কাছে দাঁড়ানো উদ্দেশে হাঁক ছাড়ল, এই তোমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছ, কয়েকজন মিলে মিস্টার হ্যাটারকে আমার কোচে তুলে দাও।

ওয়্যাগন থেকে নেমে কাজটা তদারকি করতে শুরু করলেন মিস হ্যাটার। আপনি জেনে খুশি হবেনন সেই স্পারটা আমরা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করতে পেরেছি, তাঁকে এক ফাঁকে বলল বেনন। ওটা এখন ব্র্যান্ডনের কাছে আছে।

বাহ, চমৎকার! বললেন অ্যানি। তদারকি থামিয়ে বেননকে পাকড়াও করলেন। অনেকক্ষণ কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলেননি। বুঝলেন, মিস্টার বেনন, দারুণ একটা সুসংবাদ দিলেন। স্পারটা না পেলে কাজিন লুকাসের সঙ্গে দেখা করার মুখ থাকত না আমার। অথচ কী যে বিরক্তিকর একটা শহর টেইল হল্ট! ওটা ছাড়া আসতেও পারছি না, আবার শহরেও মন টিকছে না! শেষ পর্যন্ত এন্ড অভ স্টীল পরিদর্শনের জন্যে মিস্টার ভাউবয়েসকে অনুরোধটা করেই ফেললাম। ভাগ্যিস আমি এসেছিলাম! ভাগ্য ভাল শেয়ার হোল্ডারদের। বিশ্বাসই করতে পারবেন না এখানে কি পরিমাণ অরাজকতা চলছে। এই ক’দিনে মিস্টার ব্র্যান্ডনের জন্যে ছিয়াত্তরটা উপদেশ লিখে আমি লিস্টি বানিয়েছি।

ওটা পেলে খুবই খুশি হবেনন মিস্টার ব্র্যান্ডন, গম্ভীর চেহারা করে বলল বেনন। আমার ধারণা ততটাই খুশি হবেনন যতটা খুশি হতেন জুতোর তলায় একটা কেন্নোকে পিষে ফেলতে পারলে।

জুতোর তলায় একটা কেন্নোকে পিষে ফেলতে পারলে? ভ্রূ কুঁচকে কথাটার তাৎপর্য বুঝতে চাইলেন মিস হ্যাটার। তারপর বোধহয় ভাবলেন ব্যাগলের ভাই আর কী তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলবে। অসন্তুষ্ট চেহারায় মাথা নাড়লেন তিনি। বললেন, খামোকা একটা নীরিহ কেন্নোকে পিষে দিয়ে মিস্টার ব্র্যান্ডন খুশি হতে যাবে কেন?

কয়েকজন লোক ধরাধরি করে হ্যাটারকে নিয়ে ভাউবয়েসের কোচের দিকে চলল। পাশে ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাঁটছে ডেইজি। এছাড়া দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে সারারাত ওয়্যাগন চালিয়ে এখানে পৌঁছেছে মেয়েটা।

নির্দেশের পর নির্দেশ দিয়ে চারদিক সরগরম করে রেখেছে ভাউবয়েস। মস্ত বস্তু নিয়ে এখানে ওখানে ছুটে বেড়াচ্ছে সে। তার কোচের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে একটা লোকোমোটিভ। ওদিকে টেলিগ্রাফারের অফিসে চলছে মহা ব্যস্ততা। ডাক্তারের জন্যে খবর পাঠানো হচ্ছে হেলেনায়।

কি করলে গত দু’দিন? পাশেই ব্যাগলেকে দেখে জিজ্ঞেস করল বেনন।

কি করেছি সেটা বড় কথা নয়, কি করব সেটাই আসল, শীতল স্বরে বলল গম্ভীর ব্যাগলে। আচ্ছা বেনন, আইনের চোখে আমি কতখানি অপরাধী চিহ্নিত হব যদি পিচ্ছি ফ্র্যাঙ্ক নোয়কের সমান কাউকে অ্যাম্বুশ করি?

হঠাৎ এপ্রশ্ন কেন? কি হয়েছে?

খুলে বলল ব্যাগলে। কথা শেষে চেহারা দেখে মনে হলো কেঁদে ফেলবে।

সান্ত্বনা দিল না বেনন। জানে লাভ নেই। এই শোক কাটিয়ে উঠতে অনেকদিন লেগে যাবে বেচারার। জিজ্ঞেস করল, চ্যাং টোয়াং তাহলে চেনে ডক্টর ওয়াংকে?

তাহলে একটু আগে কি বললাম? পাল্টা প্রশ্ন করল ব্যাগলে। নিজেই আবার জবাব দিল, বলিনি বুঝি? কি করে বলব, ওই ফ্র্যাঙ্ক ছোড়া আমার মাথাটা খেয়ে ফেলেছে!…ডক্টর ওয়াং হচ্ছে বদমাশের হাড্ডি এক ভাড়াটে খুনে। টোয়াংকে ঠকিয়েছে লোকটা। ওর মত আর যারা ব্যবসা করে তাদেরও অনেক ক্ষতি করেছে। চায়না টাউনে ওকে ধরতে পারলে মেরেই ফেলবে। ছয়জন ব্যবসায়ী ওর মাথার ওপর চড়া দাম ঘোষণা করেছে।

ভ্রূ কুঁচকে খানিক চিন্তা করল বেনন। তারপর আনমনে বলল, ওয়াং তাহলে ভাড়াটে খুনী! এবার কে ওকে ভাড়া করেছে জানি না; তবে লোকটা হ্যাটারের ক্ষতি চায়। ব্যাগলের দিকে তাকাল সে। ব্যাগলে, তুমি হ্যাটারকে পাহারা দিয়ে টেইল হল্টে নিয়ে যাবে। আমি এখানেই থাকছি; সেটে ঘুম দেব; তারপর যাব সোবার সুয়েড নামের সেই খনিটাতে। আমার বিশ্বাস সব রহস্যের সমাধান আছে ওখানে। ইচ্ছে করলে হ্যাটারকে টেইল হল্টে পৌঁছে দিয়ে আমার খোঁজে ওখানে চলে আসতে পারো তুমি। জায়গাটা হ্যাটারের র‍্যাঞ্চের কাছেই।

মাথা কাত করে সায় দিল বিষণ্ণ ব্যাগলে। গত কদিন ধরে জেগে জেগে ফ্র্যাঙ্ক নোয়কের দুঃস্বপ্ন দেখছে ও। সর্বক্ষণয়াবহ একটা ভূতের মত পেছনে লেগে আছে ছোঁড়াটা!

কাছেই দাঁড়িয়ে ব্যাঙ্কার। বেননের কথা শুনে বলল, আমিও শহরে ফিরছি। ওয়াংকে কখনও বিপজ্জনক মনে হয়নি যদিও, তবু মিস্টার ব্যাগলের সঙ্গে আমিও হ্যাটারকে পাহারা দেব। হতাশ একটা ভঙ্গি করে কাঁধ ঝাঁকাল সে। বুঝতে পারছি না সোবার সুয়েডের ব্যাপারে ওয়াঙের এত আগ্রহ কিসের। কিছু নেই ওই খনিতে! এক তিল সোনাও নেই। আমার মনে হয় না ওখানে গিয়ে সময় নষ্ট করবে বুদ্ধিমান কোন লোক।

চুপ করে থাকল বেনন। একমত হতে পারেনি লোকটার সঙ্গে।

হ্যাটারকে ভাউবয়েসের কোচে তোলা হলো। একই কোচে উঠল ডেইজি, হ্যারি হুলাহান, ব্যাগলে, ভাউবয়েস আর তার সুপুত্র। স্বেচ্ছাসেবী উপদেষ্টা মিস হ্যাটারকে কোথাও দেখতে পেল না বেনন। এতক্ষণে বোধহয় ক্যাম্পের খুঁত ধরতে বেরিয়ে পড়েছেন।

তাঁর কথা ভেবে সময় নষ্ট করল না বেনন। ঘুম দরকার ওর। নির্বিঘ্ন গভীর একটা ঘুম।

ঘুরতে ঘুরতে টেলিগ্রাফারের ঘরে আশ্রয় মিলল ওর। হাড়ের মত শক্ত বাঙ্কে পিঠ ছোঁয়ানো মাত্র ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল বেনন; চারপাশের ধাতব আওয়াজ বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটাল না ওর ঘুমে।

দুপুরে জেগে উঠল বেনন। শেভ, গোসল সারার পর ঝরঝরে লাগল নিজেকে। বিগ জিমি নর্টনকে খুঁজে বের করে একটা ঘোড়া ধার চাইল ও। ব্র্যান্ডনের ঘোড়াটা দেয়া হলো ওকে।

দেরি না করে রওয়ানা হয়ে গেল বেনন। ডেইজি যে পথে ওয়্যাগন চালিয়ে এনেছে সেই পথটা খুঁজে নিয়ে এগিয়ে চলল ও হ্যাটারের র‍্যাঞ্চের দিকে। মেঘলা হয়ে আছে আকাশ। তাকিয়ে দেখল কালচে মেঘের তলায় ঘুরে ঘুরে উড়ছে একটা বাজ। বৃষ্টি নামতে দেরি আছে। তার আগেই বাড়ি ফিরে যাবে পাখিটা।

বিকেলে পৌঁছে গেল সেই টিলাটার গোড়ায় যেখানে ওয়াঙের লোকদের সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিল ও। আরও সামনে, ঢেউ খেলানো ঘাসে ছাওয়া প্রান্তরের মাঝে দেখা যাচ্ছে হ্যাটারের র‍্যাঞ্চ। আধঘণ্টার মধ্যে ওখানে হাজির হয়ে গেল ও। কাউহ্যান্ডদের হ্যাটারের খবর জানিয়ে ওখানেই খাওয়ার পালাটা চুকিয়ে নিল। তারপর এগোল আবার।

হ্যাটারের গরুগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘাস খাচ্ছে। ওগুলোর মাঝ দিয়ে পথ করে হাঁটার গতিতে চলল ওর ঘোড়াটা। তাড়া দিল না বেনন। সন্ধের আগে সোবার সুয়েডে পৌঁছতে চাইছে না, কাজেই সময়ের অভাব নেই ওর হাতে। সতর্ক দৃষ্টি রাখল চারপাশে। চায় না হঠাৎ করে ওয়াঙের লোকদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাক। কাউকে দেখা গেল না। লোকগুলো হ্যাটারের ওপর হামলা করতে গেছে ভেবে দুশ্চিন্তা হলো ওর। তারপর আবার খানিকটা স্বস্তি পেল, ব্যাগলে আছে হ্যাটারের দায়িত্বে, দরকারে জীবন দিয়ে হলেও দায়িত্ব পালন করবে মানুষটা।

সূর্যটা মেঘের আড়ালে আড়ালে মুখ লুকিয়ে ডুবে যেতেই আঁধার নামল ধীরে ধীরে। টিলার গোড়ায় বনের প্রান্তে পৌঁছে গেল বেনন। উত্তেজনা বোধ করছে। গত কয়েকদিন অনেক ভেবেও স্পার রহস্য আর রেল ক্যাম্পে হামলার কোন যোগসূত্র আবিষ্কার করতে পারেনি ও। কোথা থেকে শুরু করলে কূল-কিনারা করতে পারবে তা-ই বুঝতে পারেনি। কিন্তু গতকাল আহত হ্যাটারের মুখে খুনিটার নাম শোনার পর থেকেই ওর মনে হচ্ছে কিছু একটা আছে ওখানে। এমন কিছু যা জানলে সমাধান হয়ে যাবে সব রহস্যের।

ঘোড়া হাঁটিয়ে পাথর ধসের জায়গাটায় চলে এলো বেনন। সামনে বেশ কিছু ঝোঁপঝাড়, ওগুলো পেরলেই দেখতে পাবে ও বড় বড় পাথর পড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া খনিমুখ। জায়গাটা আর বিশগজও নয়।

হঠাৎ থমকে দাঁড়াল বেনন। সামনে আওয়াজ হচ্ছে। কিসের শব্দ বুঝতে পারল না ও। পাথরে পাথরে ঠোকাঠুকি। কিন্তু এত জোরাল হয় কি করে! পাথর ধস? না! তাহলে আগেই শুনতে পেত ও। আওয়াজটা একটানা নয়। আবার হলো শব্দটা; এবার সঙ্গে ধাতব ক্যাঁচকোচও আছে।

বড় একটা বোল্ডারের আড়ালে ঘোড়া বেঁধে সাবধানে এগোল কৌতূহলী বেনন। খনি থেকে বের করা পাথর আর ধুলোর স্তুপের আকৃতি দেখে বুঝল খনির ভেতর অনেকদূর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ খোড়া হয়েছে। বোল্ডারের ফাঁক ফোকর দিয়ে আরও কিছুদূর এগোল বেনন। তারপর একটা পাথরের আড়াল থেকে উঁকি দিল।

খনিমুখের সামনে আর বোল্ডার নেই। একমনে একা কাজ করে যাচ্ছে ডক্টর ওয়াং! নিশ্চয়ই সারাদিন ধরে খাটছে। আঁধার ঘনিয়েছে সেদিকেও কোন খেয়াল নেই।

তিনটা গাছ কেটে একটা তেপায়া বানিয়েছে লোকটা। তাতে একটা পুলি ঝুলিয়ে দিয়েছে। সরিয়ে ফেলেছে বেশির ভাগ পাথর।

শেষ বোল্ডারটাকে সরিয়ে কোদাল হাতে নুড়ি পাথর সরাতে ব্যস্ত হয়ে গেল লোকটা। ভ্রূ কুঁচকে ওয়াঙের কাজ দেখছে বেনন। মনটা এখানে নেই ওর। ভাবছে কোথায় গেল ওয়াঙের সঙ্গীরা। দু’রাত আগে লোকটা কাসিদের বলেছিল খনিতে সবাই মিলে কাজ করবে। হঠাৎ মত পরিবর্তন করল কেন? মত বদলেছে, নাকি হ্যাটারকে মারার জন্যে ওদের পাঠিয়েছে বলে একা খাটতে বাধ্য হচ্ছে?

ঘটনা যাই হোক, অপেক্ষা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল বেনন। ওয়াঙের মতই ওরও জানা প্রয়োজন কি আছে ওই খনির মধ্যে। লোকটা খনিমুখ পরিষ্কার না করলে কাজটা ওকে করতে হত ভাবতেই মনটা ভাল হয়ে গেল ওর। লোকটা হাড় ভাঙা পরিশ্রম করছে। ওয়াঙের খাটনির ফসল ওর ঘরেও উঠবে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জঞ্জাল সরিয়ে চিপা একটা টানেল দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল ওয়াং। অনুসরণ করল বেনন। খনিমুখের কাছে চলে এসেছে এমন সময় ওর পায়ের তলায় পড়ে গড়িয়ে গেল ছোট একটা নুড়ি। স্তব্ধ পরিবেশে আওয়াজটা এত জোরাল শোনাল যে থেমে গেল ও। অপেক্ষা করল। ওয়াঙের তরফ থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই। টের পায়নি লোকটা তাহলে! বোধহয় এতক্ষণে সুড়ঙ্গের গভীরে চলে গেছে। উবু হয়ে বসে জুতো খুলে ফেলল বেনন। তারপর মোজা পরা পায়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোল। নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল আঁধার টানেলে। টানেলটা দু’মানুষ চওড়া। ছাদটা নিচু। হামাগুড়ি দিতে হচ্ছে। একটু পরই অবশ্য ছাদের উচ্চতা বেড়ে গেল। কয়েক পা-এগিয়ে চোখ সইয়ে নিতে থামল বেনন। শিউরে উঠল তারপর। খুব কাছেই কাপড়ের খসখস শব্দ! সরে গেল ওয়াং! লোকটা জানে সুড়ঙ্গে ঢুকেছে ও।

অন্ধকারে প্রাচীন খনির ভেতর গমগম করে উঠল ওয়াঙের গলা: তুমি এসেছ আমি খুশি হয়েছি, বেনন। মৃত্যুর জন্যে তৈরি হও। আমার হাতে একটা পিস্তল আছে; নলটা তোমার বুকে তাক করা। বাইরে পাথরের স্তুপে বোকার মত আওয়াজ করাটা তোমার উচিত হয়নি।

নিজের ওপর রাগে, তিক্ততায় ছেয়ে গেল বেননের অন্তর। দীর্ঘশ্বাস ফেলল ও। ঠিকই বলেছে ওয়াং, নিজের বোকামিতেই বিপদে পড়েছে ও।

শরীর শক্ত করল বেনন। ঝাঁপ দেবে। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। এখন হাল ছেড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া।

<

Super User