আস্তাবলের ছাদের বীম থেকে ঝুলছে তিনটে জ্বলন্ত লণ্ঠন।
মেঝেয় চিত হয়ে শোয়া কলিন ফোর্বস, মাথায় প্রচণ্ড এক অঘাতে ছিটকে পড়েছে, ওকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে বিল ওয়ারেন, লুইস প্যাটেন আর চাক কনারস, রবার্ট ওয়ারেনের জন্যে অপেক্ষা করছে। ঢ্যাঙা লোকটার নাম প্যাটেন, গুফোর নাম কনারস।
ব্যাটা উদয় হলো কোন্ জাহান্নাম থেকে? জানতে চাইলে কনারস।
ঘরে ঢুকে দেখি ঘর আলো করে বসে আছে, জবাব দিলো বিল।
চুরির মতলব নাকি?
হতেও পারে।
তাহলে শালাকে খতম করে দিলেই হয়?
ওকে দিয়ে র্যাঞ্চ বিক্রির-দলিলে সই করাবে বাবা।
ওসব দলিল-ফনিল রাখো। বুড়োর কাছ থেকে পরে কিনে নিলেই হবে।
কিন্তু এভাবেই বাবার ইচ্ছে, বললো বিল, কেউ সন্দেহ করবে না।
রবার্ট ওয়ারেন ঢুকলে তার দিকে তাকালো বিল। লিনডা ঠিক আছে?
অঘোরে ঘুমাচ্ছে, বললো ওয়ারেন। সামনে এসে কলিনের দিকে তাকালে সে। সই দেবে?
কখনো না!
পিছিয়ে গেল ওয়ারেন, বললো, প্যাটেন, কনারস, শোনো, টেরেন্স মিচেলকে হত্যা করেছে ও, তোমরা মনের ঝাল মিটিয়ে ধোলাই দিতে পারো এবার ওকে, তবে দেখো, হাতদুটো যেন আস্ত থাকে, সকালে একটা দলিলে সই দিতে হবে ওকে।
সবুট লাথি হাঁকালো কনারস, পাজরে আঘাত অনুভব করলো কলিন। আবার লাথি মারতে গেল সে, চট করে জুতো সুদ্ধো কনারসের পা জাপটে ধরলো কলিন, সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাড়ালো, ধরে থাকা পা একটু উঁচু করে সজোরে ঠেলে দিলো সামনে। ছিটকে পেছনে চলে গেল কনারস, বেসামাল, আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তার গলা চিরে। প্যাটেনের মোকাবিলা করতে পাই করে ঘুরলো এবার কলিন, পরমূহুর্তে একটা রাম ঘুসি খেলে চোয়ালে, তারপর পেটে, ভজি হয়ে গেল ও। সামনে ঝাপিয়ে পড়লো কলিন, প্যাটেনকে নিয়ে মেঝে স্পর্শ করলো।
পরক্ষণে গড়ান দিয়ে সোজা হয়ে দাড়ালো ও, বাউলি কেটে কনারসের ছুড়ে দেয়া ঘুসি এড়ালো, পাল্টা ঘুসি কালো তার মুখ, লক্ষ্য করে, আবার। ওদিকে আবার উঠে পড়লো প্যাটেন, এগিয়ে এলো কলিনের দিকে এবং মারপিটে অংশ নেবে ঠিক করলো বিল ওয়ারেন।
একসঙ্গে কলিনের ওপর ঝাপিয়ে পড়লো ওরা তিনজন। ঘাড়ের পেছনে কোপ মারলো যেন কেউ, দুই হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেল ওর, আছড়ে পড়লে মাটিতে, কিন্তু অজান্তেই আবার উঠে দাঁড়ালো। তাল হারিয়ে যাচ্ছে বারবার, অসম্ভব ভারি লাগছে হাতদুটো তোলা যাচ্ছে না। তারপর এক সময় লুটিয়ে পড়লো আবার কলিন, ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। এবার ওকে লাথি মারতে শুরু করলো ওরা, লাগাতার; সেই সঙ্গে চললো অকথ্য গালিগালাজ। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল কলিনের। নিঃশ্বাস আটকে আসতে চাইছে, অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে চোখের সামনে, কিন্তু তারপরও চেতনা হারালো না ও।
আবার ওয়ারেনের চিৎকার শোনা গেল। ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে! এবার থামো! কলিনের উদ্দেশে আবার কথা বললো ওয়ারেন। ফোর্বস? শুনতে পাচ্ছে, ফোর্বস?
জবাব দিতে চাইলো কলিন, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোলো না ওর মুখ দিয়ে।
সই করবে, ফোর্বস? মাথা নাড়ার চেষ্টা করলো কলিন। মুখ খিস্তি শুরু করলো ওয়ারেন, একটু থেমে আবার বললো, অ্যাই, ওকে বেঁধে ফেলো। সকাল পর্যন্ত থাকুক ওভাবে। প্যাটেন, তুমি ওকে পাহারা দেবে, সকালে জ্যান্ত তুলে দেবে আমার হাতে, বুঝেছো?
ওকে ওরা বেঁধে ফেললো, তারপর প্যাটেন ছাড়া অন্যরা বেরিয়ে গেল আস্তাবল থেকে। এতক্ষণ বাতাসে ওড়া ধুলো থিতিয়ে এলো। আচমকা দপ করে নিভে গেল একটা লণ্ঠন। মাথা ঘুরছে কলিনের, বমি আসছে, চোখ বন্ধ করে অস্বস্তিভাব দূর করতে চাইলো ও। প্রচণ্ড মারে পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে এখন, জ্বর আসবে বলে মনে হচ্ছে। সকালে আরো ভয়ঙ্কর নির্যাতনের মোকাবিলা করতে হবে, সহ্য করতে পারবে কি? হয়তো না।
প্যাটেন? কর্কশ কণ্ঠে ফিসফিস করে ডাকলো ও। প্যাটেন?
চোপ রাও। বললো প্যাটেন, আমি যদি উঠি, লাথি মেরে তোমার থেতা মুখ ভোঁতা করে দেবে! কেন জানতে চাও? তোমার নাম ফোর্বস, সেজন্যে নয়, মিচেলকে খুন করেছ বলে। মিচেলের মতো মানুষ হয় না!
নীরব রইলো কলিন।
হাসিখুশি মানুষ ছিলো ও, বলে চললো প্যাটেন, মিচেল থাকতে এক মুহূর্তের জন্যেও কেউ গোমড়া মুখে থাকেনি র্যাঞ্চ হাউসে, হাসির লহর বয়ে গেছে। খুব সুন্দর গীটার বাজাতে পারতো ও, গানও জানতে, আবার কাজের কোনো খুত ছিলো না ওর। নিজের কাজ কখনো ফেলে রাখতো না। আর কাউকে যদি মারতে তুমি, আমরা এতটা দুঃখ পেতাম না, মিচেলের কথা কি বলবো–
একনাগাড়ে বকবক করে চললো প্যাটেন, ছ’ফুট দূরে একটা কাঠের বাক্সের উপর উবু হয়ে বসে রয়েছে। গালভতি তামাক, মুখের একপাশ ফুলে আছে তাই। পিক ফেলতে মাঝে মাঝে কথা থামতে বাধ্য হচ্ছে সে। কিন্তু প্যাটেনের কথায় কান নেই কলিনের, চিন্তার ঝড় চলছে মাথায়। সকালে যদি ওয়ারেন ওর হাতে সই করিয়ে নিতে পারে, সাজিয়ে গুজিয়ে শহরে নিয়ে যাবে ওকে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রির ঝামেলা মিটিয়ে ফেলবে প্রথমে, তারপর কোনো এক মিচেল অনুরাগী পিস্তল প্র্যাকটিস করবে ওর ওপর। মোট কথা জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই।
অনেক ভেবেও সমাধানের কোনো পথ দেখল না কলিন। হঠাৎ একটা চাপা শব্দে চমকে উঠলো ও। খেয়াল হলো এখন আর বকবক করছে না প্যাটেন। ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকালো কলিন।
প্যাটেনের আসনের কাছ থেকে সরে এলো লিনডা ওয়ারেন, ওর ডান হাতে এক টুকরো লাকড়ি, বাম হাতটা গলার কাছে তুলে রেখেছে। আস্তাবলের মেঝেয় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে প্যাটেনে, নিথর।
বেশি জোরে মেরে দিইনি তো। ফিসফিসিয়ে বললো লিনডা। নাইট গাউনের ওপর একটা লম্বা গাঢ় রঙের রোব চাপিয়েছে সে, ঘাড়ের ওপর লুটিয়ে আছে দুটোবেণী। হাত থেকে লাকড়ির টুকরো ফেলে দিলো লিনডা।
জলদি পালাও! বললো সে, ভোর হতে দেরি নেই! ঘোড়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি আমি।
আমার ঘোড়াটা ক্ৰীকের ধারে রেখে এসেছি, বললে। কলিন, হাত পায়ের বাঁধনটা খুলে দিতে পারো?
মাথা দোলালো লিনডা, পা টিপে টিপে দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল, একটা হারনেস নাইফ হাতে ফিরে এলো আবার, কলিনের বাধন কেটে দিলে। দ্রুত। হাত কাঁপছে ওর, লক্ষ্য করলো কলিন, ছুরিটা পড়ে গেছে মেঝেয়, প্যাটেনের দিকে তাকিয়ে আছে এখন।
উঠে বসলো কলিন, তারপর হাঁটু ভেঙে দাড়ালো; এক সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো শরীরের প্রতিটি পেশী। সঁতে দাঁত চেপে সোজা হয়ে দাড়ালো ও, ঘুরে উঠলো মাথাটা, লিনডা না ধরলে পড়েই যেতো, ওকে সোজা হয়ে দঁাড়াতে সাহায্য করলো লিন, তারপর বললো, জলদি, কলিন, সকাল হয়ে এলে বলে, ওকে সঙ্গে নিয়ে দরজার দিকে এগোল।
প্রচণ্ড অবসাদে ভেঙে পড়তে চাইছে কলিনের শরীর। চোখ জোড়া একবার বন্ধ করে আবার খুললো ও, উঠোনের ওপাশে ক্রীকের দিকে তাকালো। অন্ধকারে গাছপালার গাঢ় ছায়া ছাড়া কিছু বোঝা যায় না। দুরত্বটুকু পার হতে পারবে কিনা বুঝতে পারলো না কলিন। হাঁটু কাঁপছে, ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে না। মাথা নাড়লো ও, বিড়বিড় করে উঠলো, লিনডা বুঝছি না, আমি—
কিন্তু কিছুতেই এখানে থাকা হবে না তোমার, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললো লিনা, আমি তোমাকে ঘোড়ার কাছে পৌঁছে দিয়ে আসছি।
না, তুমি এখানে থাকো। আস্তাবলের মেঝে থেকে তোমার পায়ের ছাপ মুছে ফেলো।
চট করে আস্তাবলে ঢুকে পড়লো লিনডা। দরজার চৌকাঠে ভর দিয়ে দাঁড়ালো কলিন, কিঞ্চিৎ স্বস্তি বোধ করলো। একটু পরিষ্কার হয়ে এসেছে মাথাটা। ও পালিয়েছে টের পাওয়ামাত্র ধাওয়া করতে শুরু করবে ওয়ারেন রাইডাররা। ট্রেইল করে ক্রীকের তীরে ঘোড়া বেঁধে রাখার জায়গা পর্যন্ত যেতে পারবে অনায়াসে, ওখান থেকে ওকে অনুসরণ করা আরো সহজ হবে। তবে ও শহরেই যাচ্ছে, এমন একটা ধারণা ওদের মনে জন্মাতে পারলে হয়তো ওরা ওকে অনু সরণ বাদ দিয়ে দ্রুত ওয়াগোনারে পৌঁছুনোর জন্যে সোজা রাস্তা ধরবে, অন্তত সে সম্ভাবনা আছে। অস্থির স্বভাবের লোক রবার্ট ওয়াবেন, ঝোঁকের মাথায় কাজ করে, সেখানেই ভরসা।
আবার বাইরে এলো লিনডা। আমাকে কেউ সন্দেহ করবে না, বললে ফিসফিস করে।
কিন্তু কেউ একজন এসেছিল ঠিকই বুঝবে, বললে কলিন, প্যাটেনের কপালে ইয়া বড় একটা আলু বানিয়ে দিয়েছ!
ববের নতুন লোকগুলোর সঙ্গে ওর সম্পর্ক ভালো নয়, মনে করবে কাজটা ওদের কারো, আমার কথা মাথায় আসবে না।
তাহলে জলদি ঘরে ফিরে যাও।
আর তুমি?
ঠিক নেই।
বেসিনে থেকো না যেন, কলিন।
হাসলে কলিন। আমার জন্যে অনেক করেছে তুমি, লিনডা। ধন্যবাদ। ক্যানসাস সিটিতে যদি সত্যিই যেতে চাও, জানিয়ো, তোমাকে সাহায্য করার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো আমি।
নিশ্চয়ই চাই। এই নরকবাস আর সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু টাকা পাবে কোথায়?
ভেবো না, একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। বাংকহাউসের দিকে তাকালো কলিন। অন্ধকারে ডুবে আছে, নীরব। কোরালে কয়েকটা ঘোড়া দেখা যাচ্ছে, এদিকে তাকিয়ে আছে, যেন বুঝতে পেরেছে কিছু একটা হচ্ছে এখানে। আবার লিনডার দিকেফিরলো ও। আবারো ধন্যবাদ, লিনডা বলে হাঁটতে শুরু করলো।
মাতালের মতো চলছে ও, এপাশ ওপাশ দুলছে, বেসামাল অবস্থা। আস্তাবলের কোণে এসে দড়াম করে পড়লো ও, উঠে দাড়ালো, এলোপাতাড়ি পা ফেলে এগোলে আবার। ঘোড়র কাছে পেীছার আগে আরো দুবার পড়লে তারপর কখন কিভাবে স্যাডলে উঠে বসেছে জানে না, ব্যথার তীব্র হামলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে চাইছে সারা শরীর, এখুনি ফুলে উঠবে যেন, ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। রাস্তার দিকে মোড় নিলো ও, ওয়াগোনারের দিকে মাইলখানেক এগিয়ে বাক নিয়ে উঁচু ঘাসের ভেতর দিয়ে ক্রীকের দিকে এগোলে। ফের, ফিরতি পথ ধরলো, পানির ভেতর হাঁটিয়ে নিয়ে চললো ঘোড়াটা।
কলিন যখন ওয়ারেন র্যাঞ্চের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, ভোরের আলোর আভাস পুব আকাশে। এতক্ষণে বাবুর্চির উঠে পড়ার কথা, কিন্তু তাকে দেখতে পেলো না ও, আর বড় জোর আধ ঘণ্টা, তারপরই জেগে উঠবে সবাই, সাথে সাথে জানবে কলিন উধাও। শুরু হবে মানুষ শিকার অভিযান।
ওর ভাগ্য যদি ভালো হয়, ওয়ারেন রাইডাররা ট্রেইল করে প্রথমে রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে তারপর সোজা শহরের পথ ধরবে। ও ফাঁকি দিয়েছে বুঝতে বুঝতে বিকেল হয়ে যাবে ওদের। পালানোর জন্যে যথেষ্ট সময় মিলবে। কিন্তু পালানোর কথা ভাবছে না ও–আপাতত।
ক্রীক বরাবর এগিয়ে চললল কলিন। এখনো বনবন ঘুরছে মাথা টা। যতবার সামনে পা ফেলছে ঘোড়া, সাথে সাথে ছলকে উঠছে মাথার রক্ত। কোন্ দিকে যাচ্ছে জানে না ও। একটা পরিকল্পনাখাড়া করা প্রয়োজন, জানে, কিন্তু পারছে না। সূর্য উঠছে আস্তে আস্তে। বেশ কিছু সময় এগোনোর পর কনি বুঝতে পারলো ওয়ারেন র্যাঞ্চ থেকে অনেক উঁচুতে এসে পড়েছে ও, পাহাড়ের দিকে উঠে যাচ্ছে ঘোড়াটা। দুরে দেখা যাচ্ছে গাছে ছাওয়া পাহাড়চূড়া।
দুপুর নাগাদ ঘোড়া থামালো কলিন। ডান পাশে একটু দুরে পাহাড়ের মাঝখানে একটা র্যাঞ্চ। গ্রেবার র্যাঞ্চ, যদি এখনো আগের মালিকানা বহাল থাকে। হঠাৎ রবার্ট ওয়ারেনের কথা মনে পড়ে গেল ওর। স্ট্যামপিড প্রসঙ্গে কথা বলার সময় সে বলেছিলো : …সময় পেলে ডেনিস স্মিথের সঙ্গে আলাপ করো, জিজ্ঞেস করে দেখো ডেভিড স্পেক্টরকে; বেলিনড গ্রেবারের র্যাঞ্চে পাওয়া যাবে ওকে। শেরিফের কাছে দেয়। ওদের জবানবন্দী জেনে নাও। ডাক্তার মারভিনের মুখেও ডেভিড স্পেক্টরের নাম উচ্চারিত হয়েছে, মেরির হাত ভালো না হলে ডেভিড স্পেক্টরকে দিয়ে খবর পাঠাতে বলেছিলো সে বেলিনডাকে।
অনেক কষ্টে তথ্যগুলো সমন্বিত করার চেষ্টা করলে কলিন ফোর্বস। বেলিনডা, যাকে বেলিনডা কারলাইল নামে চিনতো ও, সম্ভবত হেনরী গ্রেবারকে বিয়ে করেছে এবং এখন গ্রেবার র্যাঞ্চেই আছে। কিন্তু হেনরী গ্রেবারের বদলে র্যাঞ্চটা বেলিনডা গ্রেবারের বললো কেন ওয়ারেন? হেনরীর কি হয়েছে?
প্রশ্নটা পরের জন্যে তুলে রাখলে কলিন। ডেভিড স্পেক্টর আছে গ্রেবার র্যাঞ্চে, হয়তো স্ট্যামপিড সম্পর্কে অনেক কিছু তার জানা আছে। কোণাকুণিভাবে রাস্তার দিকে এগোলো ও। গ্রেবার রাঞ্চের পথ ধরলো।
উঠোনে পৌঁছুতে পৌঁছুতে স্যাডলের ওপর নুয়ে পড়লো কলিন, রাশ টেনে ঘোড়া থামালো, এপাশ ওপাশ দুলছে। কেউ একজন গিয়ে এলো বারান্দায়। আস্তাবলের দরজায় এসে দাড়ালো, তিনজন, দুজন লোক আর বার-তেরো বছর বয়সী এক কিশোর।
সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করলো কলিন, হাত বাড়িয়ে মাথার টুপি স্পর্শ করলে। হ্যালো, বেলিনডা, বললো ও, নামলো স্যাডল থেকে। পা দুটো মাটি স্পর্শ করামাত্র হাঁটু ভাজ হয়ে গেল, টান চিত হয়ে পড়ে গেল ও। চিৎকার করে কি যেন বলে উঠলো বেলিনডা, ছুটে এসে ওর পাশে হাটু গেড়ে বসলো। বিব্রত বোধ করলে কলিন, বিড়বিড় করে বললো, বেলিনডা, আসলে আমি–
পরে বলো এসব, বললো বেলিনডা। ডেভিড, ওকে ঘরে নিয়ে এসো।
টাটকা খাবার আর কয়েক কাপ কড়া কফি পেটে পড়তেই অনেকটা চাঙা বোধ করলো কলিন ফোর্বস। রান্নাঘরের টেবিলে বসে আছে ও, সারাদিনে এই প্রথম স্থির বোধ করছে। যদিও পেশীগুলো এখনো অসাড়, দপদপ করছে মাথার ভেতর, মুখের একপাশ ফুলে আছে, কাঁধ নাড়লেই খোঁচা লাগছে পাজরে, চিনচিন করছে, একটা হাড় বোধ হয় ভেঙে গেছে। তারপরও আরাম লাগছে ওর।
উঠোন থেকে ফিরে এলো ডেভিড স্পেক্টর, বয়সের ভারে কুজো হয়ে গেছে এখন, চাপদাড়ি পেকে শাদা, চোখ দুটো কোটরে বসে গেছে, কোঁচকানো চেহারা, মাথায় টাক।
বিকেলের আগেই এসে যাবে ওরা, বললো সে, ওয়ারেনের কথা বোঝাতে চাইলো। তোমার ঘোড়ার সামনের ডানপায়ের নাল খসে গেছে, ট্রেইল করা সহজ হবে। আমি হোসেকে বলেছি ওটাকে নিয়ে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে দক্ষিণে যেতে, ওখান থেকে স্টোনি রিভারের কাছে যাবে ও, ঘোড়াটা ছেড়ে দিয়ে ওয়াগোনারে চলে যাবে; কাল পরশু ওখানে যাচ্ছি আমি, আমার সঙ্গে ফিরে আসবে।
ধন্যবাদ, ডেভিড, বললো কলিন।
এসব তোমার জন্যে করিনি আমি, বললো ডেভিড, কুচকে উঠলে ওর চোখমুখ। বেলিনডা বললো, তাই। তাছাড়া ওয়ারেনের সঙ্গে গোলমাল করার সাধ্য আমাদের নেই।
ঘাড় ফিরিয়ে ওদের দিকে তাকালো বেলিনডা, চুলের আগুনের আঁচে লাল হয়ে উঠেছে চেহারা। ওর পরনে লেভিস প্যান্ট, গায়ে শার্ট, হাতা গোটানো, বাদামী হাতদুটো দেখা যাচ্ছে; গভীর ওর চোখজোড়া, খাড়া নাক, কপট কাঠিন্য দুঠোঁটে।
হেনরী হলে একথাই বলতে, ডেভ, বললো বেলিনড়া।
হয়তো, সায় দিলো ডেভিড স্পেক্টর।
ডেভিড, বললো কলিন, আমি কয়েকটা কথা জানতে চাই।
কি ব্যাপারে?
স্ট্যামপিড।
এই সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।
কিন্তু ওয়ারেন তো বললো জানে।
মিথ্যে বলেছে।
শেরিফের কাছে নাকি তুমি জবানবন্দী দিয়েছো?
এক পা থেকে অপর পায়ে শরীরের ভর বদল করলো জেভিড স্পেক্টর। দিয়েছি। কিন্তু স্ট্যামপিড সম্পর্কে কিছুই বলিনি।
তাহলে কি বলেছে?
বলেছি স্ট্যামপিডের রাতে ক্লেব্যাংকসের দিক থেকে তোমার বাবা, এডি এবং আরো তিনজনকে আসতে দেখেছিলাম আমি, তখন মাঝরাত হবে–ব্যস।
সত্যিই দেখেছিলে?
আমি মিথ্যে বলিনি, ফোর্বস।
ওরা অন্য কোথাও থেকে আসেনি কিভাবে জানো?
মাথা নাড়লো স্পেক্টর। সম্ভব নয়। এখান থেকে ক্লেব্যাংকসের দূরত্ব কয়েক মাইলের বেশি না। তোমার বাবা, এডি আর তাদের তিন সঙ্গীকে যেখানে দেখি, জায়গাটা ক্লেব্যাংকসে যাবার পথেই পড়ে। শহর থেকে আসছিলাম আমি।
ওরাই ওয়ারেনের গরু স্ট্যামপিড করেছে বলতে চাও?
অন্য কিছু হতে পারে না।
এগিয়ে এলে বেলিনডা তোমার কি মনে হয়, কলিন?
আমি বিশ্বাস করি না।
কেন?
স্ট্যামপিভ করে লড়াই করার মানুষ বাবা নয়। বাবা অস্ত্র হাতে ওয়ারেনকে হত্যা করতে ছুটে গেছে বলে অবিশ্বাস করতাম না। কিন্তু এই কথা মরে গেলেও বিশ্বাস করতে পারবে না। ব্যাপারটা বাবার চরিত্রের সঙ্গে একদম খাপ খায় না।
তোমার বাবা অস্বীকার করেনি শুনেছে তো?
শুনেছি। তবু ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লেব্যাংকসের ওপর থেকে পনেরো শ’ গরু স্ট্যামপিড করে মেরেছে বাবা, বিশ্বাস হয় না।
মানুষ বদলায়, কলিন।
তাই বলে এত?
আট বছর দুরে ছিলে তুমি, আট বছর অনেক লম্বা সময়।
দরজার দিকে ঘুরলো ডেভিড স্পেক্টর। আমার আর দরকার আছে, বেলিনডা?
না। ওয়ারেনরা আসে কিনা খেয়াল রেখো, বললে বেলিনডা। ওরা এলে কি করতে হবে জানো তো? কলিন এসেছিলো, কিন্তু চলে গেছে।
ওয়ারেনকে শত্রু বানাতে চাই না আমি, অস্বস্তির সঙ্গে বললো স্পেক্টর। র্যাঞ্চটা মাটিতে মিশিয়ে দেবে সে, দেশছাড়া করবে আমাদের।
এটা আমাদের জায়গা, বললো,বেলিন, আমাদের উৎখাত করার সাধ্য কারো নেই। মিস্টার ওয়ারেন অাসছে দেখলে আমাকে জানিয়ে, যা বলার আমি বলবো।
বেলিনডার কণ্ঠে ভর্ৎসনার সুর থাকলেও ডেভিড স্পেক্টর লক্ষ্য করেছে বলে মনে হলো না। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল সে।
আরেকটু কফি দেবো? জিজ্ঞেস করলে বেলিনডা।
মাথা দোলালে কলিন। মেরি কোথায়, দেখছি না যে?
আস্তাবলে ওর একটা খেলাঘর আছে, এলেনার সঙ্গে ওখানে খেলছে। এলেনা, হলে হোসের মা, ওর বাবা হুয়ান মেরিনো। এখানে চাকরি করতো। তুমি হেনরীর কথা ভাবছে, না?
কাপে কফি ঢাললো বেলিনডা।
হ্যাঁ বললো কলিন। হেনরীর কথা বলো।
আজ থেকে তিনবছর আগে স্যাডল থেকে ছিটকে পড়ে মারা গেছে, ও মারা যাবার পর আমি হয়তো র্যাঞ্চ বিক্রি করে দিতে পারতাম–এখনো পারি-কয়েক মাস আগে ওয়ারেন কেনার প্রস্তাবও দিয়েছে–কিন্তু শহরের চেয়ে এ জায়গাটাই আমার বেশি পছন্দ।
হেনরীর কথা শুনে দুঃখ পেলাম, বললে কলিন।
হেনরীকে স্পষ্ট মনে আছে ওর। দীর্ঘদেহী সুদর্শন হেনরী ছিলো ধীর স্থির, মৃদু ভাষী, বয়সে বেলিনডার চেয়ে দশ বছরের বড়।
ওর মৃত্যুর পর খুব কষ্ট গেছে আমাদের, বললো বেলিনডা, পুরুষের মতো ঘোড়া হাঁকানো আর ল্যাসে ছোঁড়া শিখতে হয়েছে আমাকে। এখনো খুব ভালো রকম আয়ত্ত করতে পারিনি, তবে ট্রেনার হিসেবে ডেভের জুড়ি নেই, ধৈর্যের সঙ্গে শেখানোর চেষ্টা করছে ও। কিন্তু আসল সমস্যা মেরিকে নিয়ে, ওকে একেবারেই সময় দিতে পারি না। আমার চেয়ে এলেনার সাথেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে ওর সম্পর্ক।
আবার বিয়ে করলে না কেন?
বিষণ্ণ হাসি হাসলো বেলিনডা। এ-নিয়ে আমিও ভেবেছি, তবে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি।
বেলিনডার দিকে তাকালো কলিন। র্যাঞ্চ বিক্রি করে শহরে চলে গেলে সহজেই ভালো একটা চাকরি যোগাড় করতে পারতো মেয়েটা, ভাবলো ও, করেনি, কেন? র্যাঞ্চিং মেয়েদের কাজ নয়। একাজে প্রয়োজনীয় শারীরিক ক্ষমতা খুব কম মেয়েরই থাকে।
হঠাৎ চুলোর কাছ থেকে সরে কলিনের দিকে এগিয়ে এলো বেলিনডা।
আবার বেসিনে কেন ফিরলে, কলিন? তোমার বাবা সবাইকে বলে বেড়াতে ওয়াইওমিংয়ে নাকি দারুণ একটা চাকরি করছে। তুমি, কোন এক সিনডিকেটের র্যাঞ্চ চালাও, তুমিই নাকি ওদের এক নম্বর লোক।
ভালো লোকের অভাব নেই ওদের।
কিন্তু তুমি ফিরলে কেন?
শহরের কেউ একজন চিঠি লিখেছিলো আমাকে, বাবা আর ভাইয়ের খবর দিয়ে বেসিন থেকে দূরে থাকতে বলেছে আমাকে। এ অবস্থায় আমার কি করণীয় ছিলো বলে মনে করো?
তার মানে প্রতিশোধ নিতে এসেছে। গোলমালটা জিইয়ে রাখতে চাও।
বেলিনডার কণ্ঠে রাগের আভাস, ঠোঁটের হাসি মুছে গেছে।
ওয়ারেনের গরু স্ট্যামপিডের জন্যে বাবা আর এডি দায়ী–একথা আমি মানি না, গোয়ারের মতো বললে কলিন।
কোন্ ভরসায় ওয়ারেনের সঙ্গে লাগতে চাইছো, বলবে?
আমি কি তাই বলেছি? আমি কেবল এখানে কি ঘটেছে জানার চেষ্টা করছি।
আচ্ছা, ধরো, জানা গেল তোমার বাবা আর এডিই স্ট্যামপিডের জন্যে দায়ী, তাহলে?
বলেছি তো, ওরা নির্দোষ!
যদি দোষী হয়?
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো কলিন। এভাবে চিন্তা করেনি ও। এখনো ভাবতে পারছে না। বেলিনডার কথায় অস্বস্তিতে ছেয়ে গেল মন। একটু আগে মানুষ বদলে যাবার কথা বলছিলো বেলিনডা, বাবা আর এডি হয়তো সত্যি বদলে গিয়েছিলো। আচ্ছা, যদি জানা যায় যে ওয়ারেনের গরু বাবাই স্ট্যামপিড করেছে, তখন কি করবে ও? ভুরুজোড়া কুচকে উঠলো কলিনের।
দরজায় উঁকি দিলো ডেভিড স্পেক্টর। ওরা আসছে! জানালো সে।
মিসটার ওয়ারেন আছে ওদের সাথে? জানতে চাইলে। বেলিনডা।
বোঝা যাচ্ছে না।
এলেনাকে বলে দাও, মেরিকে নিয়ে আস্তাবলেই থাকতে, বললে বেলিনডা, তুমিও যাও।
উঠে দাড়ালো কলিন, পা বাড়ালো দরজার দিকে।
না, তুমি ভেতরেই থাকো, বললো বেলিনডা, আমি বিদায় করার ব্যবস্থা করছি ওদের।
আমার জন্যে এত না করলেও পারতে, অস্বস্তির সঙ্গে বললো কলিন।
এখানে র্যাঞ্চিংয়ের চেষ্টা না করলেও পারতাম, প্যানট-এ হাত মুছলো বেলিন। কিন্তু অনেক সময় না করে উপায় থাকে না।
দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে, বারান্দায় এসে অপেক্ষা করতে লাগলো।
<