ঠিক দুই ঘণ্টা পর জ্যাক চেম্বারল্যান্ডের সেলুনের দেয়ালে প্রথম নোটিশটা টানাল ড্যানি লসন।

চোর ডাকাত, খুনী এবং জোচ্চোর জুয়াড়ীদের একটা তালিকা দেয়া হলো নিচে। এদের কাউকে জেরেমি টাউনের প্রয়োজন নেই। অচিরেই শহর ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হচেছ এদের, নইলে দেখা মাত্র গুলি করা হবে।

পরদিন, সকালে জিম কেলি যখন নোটিশটা দেখছিল, পেছন থেকে একজন তার সঙ্গীকে বলল: চলো হে, এবার মানে মানে কেটে পড়ি!

কি ব্যাপার, ভয় পেয়েছ নাকি? সন্দিহান সুরে জানতে চাইল কেলি।

পেয়েছি বৈকি। ড্যানি লসন কিভাবে শহর পরিষ্কার করে, তুমি তো জানো, আমি জানি। সেজন্যেই কেটে পড়ছি। তালিকার প্রত্যেককে খুঁজে বের করবে ও, প্রথমে হয়তো মনে করিয়ে দেবে নির্দেশটা। কিন্তু কেউ যদি বেতাল কিছু করে, কিংবা যদি ওর কথা না শোনে…স্রেফ নরক নামিয়ে আনবে সে। নির্দিষ্ট সময় পেরোনোর পর কাউকে ছাড় দেবে না ও, কোন অজুহাতও শুনবে না। ওর ধাতটাই এমন। একজনের পর একজনকে ধরবে।

সকাল থেকেই সারা শহরে চক্কর মারছে ড্যানি, লসন। চোখে সতর্ক দৃষ্টি, কান খাড়া। প্রতিটি ইঞ্চি মেপে নিচ্ছে মনে মনে। পথে সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা হলো ওর।

কেমন চলছে, ডিক?

ভাল! তুমি যখন দায়িত্ব নিয়েছ, সবকিছু তখন ভাল ভাবে চলা উচিত।

সমস্যায় পড়লে আমাকে খবর দিয়ো।

ধন্যবাদ, ভ্যান। তবে আমার সমস্যা আমিই সামলাতে চেষ্টা করব।

পত্রিকা অফিসের কিছু দূরে পাশের এক গলিতে ডানা সুলিভানের ঘর। মেয়েটা সুন্দরী এবং আকর্ষণীয় ছিল একসময়। এখন পড়তির দিকে ওর শরীর।

তোমার বিরুদ্ধে আউট-লদের সহযোগিতা করার কিছু অভিযোগ আছে, ডানা। তোমাকে সরে পড়তে হবে।

নির্বিকার মুখে তাকিয়ে থাকল মেয়েটা, তারপর ক্ষীণ হাসল। কিন্তু এ শহরের অনেকেই যে চায় থাকি আমি, সেক্ষেত্রে তুমি কি করবে, লসন?

তালিকায় ওদেরও নাম আছে, ডানা, সবাই এ শহর ছাড়বে ওরা।

থমসন তোমাকে মেরে ফেলবে, লসন।

হতে পারে। থমসনেরও নাম আছে তালিকায়।

বলে আর দাঁড়াল না লসন। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরতে শুরু করল। জ্যাক চেম্বারল্যান্ডের সেলুনে ঢুকল ও এবার। বৈধ-অবৈধ সব উপায়ে মাইনারদের ঠকিয়ে দুহাতে পয়সা কামাচ্ছে লোকটা, এমনকি ব্যবসায়ী বা ভবঘুরেরাও রেহাই পাচ্ছে না। সারা জেরেমি টাউনে সবচেয়ে চড়া দামের হুইস্কি বিক্রি হয় এখানে, পোকার টেবিলে নিয়মিত জোচ্চুরি হয়। একপাশে ড্যান্স হল তৈরি করেছে চেম্বারল্যান্ড, মন্টানা থেকে তিনটে মেয়েকে আনিয়েছে। রক্স, কিনকেড আর থমসনের সঙ্গে বিশেষ খাতির আছে নোকটার।

তালিকাটা পড়ে দেখো, জ্যাক চেম্বারল্যান্ডকে বলল লসন। সম্ভবত তোমার নামও আছে।

দাঁত কেলিয়ে হাসল চেম্বারল্যান্ড। থাকুক…কিন্তু অপেক্ষা করব বলে ঠিক করেছি আমি। যতক্ষণ না থমসন তোমার দফা রফা করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত থাকছি

আমি।

বেশ, অপেক্ষা করো। কিন্তু আগেই বলে রাখছি, থমসনকে পিটিয়ে শেষ করার পর তোমার মুখ আর দেখতে চাই না। দেখলে তোমারও একই অবস্থা করে ছাড়ব।

পেছনে উচ্চস্বরে হেসে উঠল চেম্বারল্যান্ড, কিন্তু জ্বক্ষেপ করল না লসন। বাইরে এসে রাস্তায় নামল। দেখল জিম কেলির সঙ্গে কথা বলছে আরও দুজন। হঠাৎ করেই পেছনে চেনা একটা কণ্ঠ শুনতে পেল ও।

আইক জেসাপ।

ঋরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল লসন। ঠিক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহী জুয়াড়ী, ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। পথচলা লোকজন দাঁড়িয়ে গেছে, কৌতূহল শেষে কি ঘটবে।

আঙুল তুলে নোটিশটা দেখাল জেসাপ। আমার নাম তালিকায় দেখছি না যে, লসন? ব্যাপার কি?

কারণ তুমি ভদ্রলোক, জেসাপ। তাসে তোমার হাত অসম্ভব রকম ভাল, কিন্তু এই অহঙ্কার বিসর্জন দাওনি তুমি, খেলায় চুরি করোনি কখনও।

মুখটা পাথরের মতই নির্বিকার, বোঝা গেল না লসনের কথায় কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে, কিন্তু আইক জেসাপ যখন কথা বলল সামান্য বিস্ময় ফুটে উঠল স্বরে। তুমি আমাকে ভদ্রলোক বলেছ, ডান?

তুমি কি তা নও, জেসাপ? পাঁচ-ছয় বছর ধরে চিনি তোমাকে। আমার জানা মতে এ সময়ে অন্য কিছুই করোনি তুমি। তাস খেলেছ কিন্তু চুরি করোনি। যাও, নিশ্চিন্তে তোমার ব্যবসা চালাও, তবে নিতান্ত বাধ্য না হলে কাউকে গুলি কোরো না।

কথা শেষ করে এক মুহূর্তও দাড়াল না লসন।

স্থির দৃষ্টিতে পেছন থেকে নতুন মার্শালকে দেখল আইক জেসাপ, ভুরু কুঁচকে গেছে। ধীরে ধীরে সিধে হলো ভু, স্মিত হাসি ফুটল জুয়াড়ীর নিষ্ঠুর ঠোঁটের কোণে। ঝটিতি ঘুরেই নিজের সেলুনে ঢুকে পড়ল সে।

জুয়াড়ীরা অপেক্ষা করছিল এর জন্যে। একসঙ্গে চোখ তুলে তাকাল সবাই।

মার্শালের সঙ্গে কি কথা হলো, নিশ্চয়ই শুনেছ তোমরা? নিরুত্তাপ স্বরে বলল জেসাপ। বুঝতেই পাছ কি করা যাবে, তার কি করা যাবে না। যদি এরপরও খেলতে বসে কেউ দুই নম্বরী করতে চাও, তাহলে আমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে তাকে। বুঝেছ? জুয়া চলবে এখানে, কিন্তু ফেয়ার হবে খেলাটা।

একটা টেবিলের পেছন থেকে উঠে দাড়াল ম্যানেন ব্লেজ নামের এক লোক। এই আসর ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমি, নিজেই একটা আসর বসাব! আর নিজের ইচ্ছেমত চালাব সেটা।

চেষ্টা করে দেখতে পারো।

আর ড্যানি লসন সম্পর্কে বলছি। ওর নামই শুধু শুনেছি, কিন্তু ওর গুলিতে মরেছে এমন কারও কবর দেখিনি আমি।

স্মিত হাসল আইক জেসাপ দেখবে, ব্লেজ, নিশ্চয়ই দেখবে।

পিস্তলে আদুরে চাপড় মারল ব্লেজ। দেখাচ্ছি তোমাদের! নিকুচি করি ড্যানি লসনের, সেকে যে তার কথা শুনতে হবে?

দ্রুত বেরিয়ে গেল সে। সিভ হ্যামারটনের জেনারেল স্টোরের পোর্চে জিম কেলির সঙ্গে কথা বলছিল লসন, কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছে কয়েকজন।

রাস্তার মাঝখানে এসে চেঁচাল ব্লেজ। ড্যানি লসন?

ফিরল লসন, সরু চোখে দেখল ব্লেজকে। নির্বিকার মুখ দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই। ধীর পায়ে পোর্চ ছেড়ে রাস্তায় নেমে এল ও।

তোমার নির্দেশ আমি মানি না, লসন!

বেশ।

তুমি এই শহরের কেউ না?

তো?

নিজে এই শহর থেকে বেরিয়ে যাবে, নাকি জোর খাটাতে হবে?

জোর খাটাতে হবে। চেষ্টা করে দেখতে পারো! স্মিত হাসল লসন, ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।

ঈশ্বরের নাম নাও, লসন, বিদ্যুৎ খেলে গেল ব্লেজের হাতে, চোখের পলকে হাতের তালুয় চলে এল জোড়া পিস্তল

এবং পরমুহূর্তে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে। দুচোখে অবিশ্বাস। হতে পারে না, এ হতেই পারে না, এত দ্রুত ড্র করতে পারে না কেউ! মৃদু মাথা নাড়ল সে, তারপর চিরদিনের মত ধূলিময় রাস্তায় শুয়ে পড়ল।

হোলস্টারে পিস্তল ভরে রাখল ড্যানি লসন। তারপর রাস্তার অন্যদিকে সরে গেল টিম কার্টিস আর রবার্ট অ্যালেনের সঙ্গে।

সেলুনের ভেতরে এক ওয়েটারকে ডাকল আইক জেসাপ, বহু কষ্টে হাসি সামলে রেখেছে। বিগবী, কাউকে দিয়ে একটা কবর খোড়ো তো, আর কবরের পাশে একটা ফলকে লিখে দিয়ো: এ লোক ড্যানি লসনের বিরুদ্ধে পিস্তল বের করেছিল।

এবার কি করবে, ড্যান? এগোতে এগোতে জানতে চাইল কার্টিস।

বড় মাছটাই ধরব এখন। থমসন। প্রথমে তালিকাটা পড়াব ওকে। চূড়ান্ত ফয়সালার আগে ওর সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।

আগে ল-অফিসে এল লসন, ডাবল-ব্যারেল শটগানটা তুলে নিল। বেরিয়ে এসে শেইন থমসনের কেবিনের উদ্দেশে এগোল।

শহরের একেবারে শেষে থমসনের ডেরা। ছোট্ট কেবিন। একটাই দরজা, কোন জানালা নেই। দরজার কাছে পৌঁছে এক পা পিছিয়ে এল লসন। তারপর গায়ের জোরে লাথি হাঁকাল কবাটের ওপর। লাথি সহ্য করতে পারল না দরজা, হাট হয়ে সরে গেল পাল্লা দুটো! কোমরের কাছে শটগান ধরে রেখে ভেতরে ঢুকে পড়ল ও।

বিছানায় শুয়ে ছিল শেইন থমসন, চোখ পিটপিট করছে। পাশেই শুয়ে আছে বেনি ডুবিন। কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে খানিকটা উঁচু হলো সে; হতবাক, অবিশ্বাস্য ঘটনায় বিস্ফারিত হয়ে গেছে চোখ জোড়া।

উঠে বসে, থমসন জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। সময় হয়েছে।

কি হচেই এসব? গর্জে উঠল শেইন থমসন, সনের শার্টের ওপর ব্যাজটা এতক্ষণে চোখে পড়ল। তার আচ্ছা এই তাহলে ব্যাপার! আমি তো এজন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।

খুব দ্রুত কাজ কবল সন। শটগানটা প্রয়োজন পড়ালই ববহার করতে পারবে, এমন ভাবে হাতে রেখে এক হাতে খামচে ধরল থমসনের শাট, তারপর হ্যাচকা টানে কে তুলে আনল বিছানা থেকে। শেষে আছড়ে ফেলল।

মুহূর্তের জন্যে হকচকিয়ে গেল দ্বিশালদেহী, তারপর উঠে দাঁড়াঃ।

এসো, থমসন, বাইরে এসো, আউট-লর পেটের দিকে শটগান তাক করে বলল লন।

কোথায়?

রাস্তায়। তুমিও এসো, ডবিন। ভুলেও অন্য কিছু করার চিন্তা কোরো না, এফোড়-ওফোড় করে দেব তাহলে।

কঠিন চোখে তাকাল থমসল, বুনো আক্রোশ দেখা যাচ্ছে চাহনিতে। একটা সুযোগ দাও আমাকে, তারপর দেখব কে কাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে!

ম্যানেন ব্লেজও তাই ভেবেছিল। ব্লেজ!

থমকে গেল থমসন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে ওর।

মারা গেছে ও।

এসবই তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম আমি, শেইন, বলল বেনি ডবিন। কিন্তু যে পরিমাণ গিলেছ, আমার কথা শোনার সময় কোথায়! কাল রাতে নিকোলাস গ্রীনকেও খুন করেছে ও।

মুহূর্ত কয়েক নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকল শেইন থমসন। তারপর ভারী পা ফেলে কেবিনের বাইরে চলে এল। পেছনে বেনি ডবিন। বাইরে তখন ডজন দুয়েক লোক জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, তামাশা দেখছে। রাস্তার মাঝখানে দুই বন্দীকে হটিয়ে নিয়ে এল লসন। চারপাশে ভিড় ক্রমশ বাড়ছে।

সরে গিয়ে জায়গা দেবে এদের, তালিকাটা দেখুক ওরা? জনতার উদ্দেশে বলল লসন। খেয়াল করল ভিড়ের মধ্যে জেফরি হ্যালার্ড, কার্টিস আর ডিক ফেল্টনও রয়েছে। একজনের হাতে রাইফেল, দুজনের হাতে শটগান।

খুব বাহাদুরি দেখাচ্ছ, না? শটগান হাতে নিরস্ত্র লোকের সঙ্গে?

গানবেল্ট খুলে ফেলল লসন, পিস্তল সহ জোড়া হোলস্টার ডিক ফেল্টনের হাতে তুলে দিল। লক্ষ্য রেখে যাতে কেউ আমাদের মধ্যে নাক গলাতে না পারে। থমসন খুব গর্ব করে বেড়ায়, ও নাকি দুহাতে যে কোন লোককে ভেঙেচুরে দিতে পারে। হয়তো ঠিকই বলে।

ঠিকই বলে। বাজি ধরতে পারো।

স্মিত হাসল লসন। কিন্তু আমিও নাছোড়বান্দা মানুষ, কোন কিছু পরখ না করে সিদ্ধান্ত নিই না! ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশালদেহী তস্করের দিকে ফিরল ও।

বুনো আক্রোশে জ্বলজ্বল করছে থমসনের চোখ, আয়েশী ভঙ্গিতে এগিয়ে এল সে; লোকটার চোখের গভীরে তাকিয়ে মনের ভাবনা স্পষ্ট পড়তে পারল লসন-থমসন ভাবছে দারুণ উপভোগ্য একটা মুহূর্ত পড়ে আছে সামনে! দুবৃত্তের চলাফেরা স্বতঃস্ফূর্ত, ক্ষিপ্র। বুনো উল্লাসে দুবাহু ঝকাল সে, কিলবিল করে উঠল পুরুষ্টু পেশী; ভঙ্গিটায় স্পষ্ট বোঝা গেল পেশাদার লড়িয়ে সে, বহুবার আসুরিক শক্তি নিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, কৌশল বা মগজ না খাটাক, স্রেফ গায়ের জোরেই যে কাউকে টলিয়ে দিতে সক্ষম।

প্রথম আঘাতটা লসনই করল। ঝটিতি ডান হাত চালাল ও। ঘুসিটা গিয়ে পড়ল শেইন থমসনের মুখে। কেঁপে উঠল বিশালদেহ। যতটা অবাক হয়েছে, তারচেয়ে যেন ব্যথাই বেশি পেয়েছে সে। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ঠোঁটের রক্ত মুছল, স্থির দৃষ্টিতে তাকাল ওর দিকে। তারপর দুহাত বাড়িয়ে ঝুঁকে এল। থমসন ভেবেছিল সরে যাবে লসন, কিন্তু উল্টো দুবাহুর ফাঁকে ঢুকে পড়েছে ও। পরপর দুটো জবর ঘুসি হাঁকাল পেটে। পরমুহূর্তে একটা, আপারকাট খেয়ে টলে উঠল থমসন।

খালি হাতের মারপিটে বহু দিন ধরে অভ্যস্ত থমসন। ঘুসি সে আগেও খেয়েছে, আক্রোশ আর জেদ দিয়ে কিভাবে সেগুলো হজম করতে হয় সে-ও ভাল জানা আছে তার। মাথা নিচু করে এগোল এবার। লসন হামলা চালাতে পাল্টা আঘাত করল, পিছু হটতে বাধ্য করল মার্শালকে। সুযোগ পেয়ে বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল থমসন। ঘুসির চোটে শরীর কেঁপে উঠল লসনের। কিন্ত পড়ে যাওয়ার আগে থমসনের থুতনিতে প্রচণ্ড ঘুসি হাঁকাল। ব্যথায় কুঁকড়ে গেল বিশালদেহী গানম্যানের দেহ।

কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে পরস্পরকে নিরীখ করতে থাকল ওরা; ফেঁসফোস করে নিঃশ্বাস ফেলছে। আয়েশী ভঙ্গিটা চলে গেছে থমসনের, বুঝতে পারছে মুখে যতই বড়াই করুক লসনকে সহজে কাবু করা যাবে না। মার্শালের ঘুসিগুলো তাতিয়ে তুলেছে ওকে, শীতল আক্রোশ অনুভব করছে দুর্বৃত্ত। আমি তোমাকে মেরে ফেলব, লসন! চিরদিনের মত শেষ করে ফেলব!

বেশ তো! চেষ্টা করে দেখো! নিঃশ্বাস নেওয়ার ফাঁকে বলল লসন।

কিছুটা হলেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে থমসন। বিশাল দেহে অসুরের মত শক্তি, নিজের সামর্থ্য এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। স্রেফ ঘুসি চালিয়ে এর আগে একজনকে খুন করেছে সে। জানে লসনকে একবার বাগে পেলেই হলো, কাজ সারতে বেশিক্ষণ লাগবে না।

চারপাশে লোকজনের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। বিগ থমসনকে হালকা ভাবে নিয়েছিল, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে লসন। জানত খালি হাতে ভাল লড়িয়ে দুর্বৃত্ত, আশা করেছিল শক্ত লড়াই হবে। কিন্তু লোকটার গায়ে এমন দানবীয় শক্তি থাকবে কিংবা এত ক্ষিপ্রতা আশা করেনি।

সতর্ক ভঙ্গিতে বৃত্তাকারে ঘুরছে ওরা। চাইছে আগে অন্যজন আক্রমণ করুক। ড্যানি লসন নিজেও শক্ত কাঠামোর মানুষ, অবশ্য থমসনের চেয়ে অন্তত ষাট পাউন্ড কম ওজন ওর। খালি হাতে লড়াই করার অভিজ্ঞতা আছে। এতদিন জানত বিশাল দেহ থাকলে লড়তে হয় কম, কারণ শারীরিক সুবিধের কারণে অন্যরা সাধারণত এদের এড়িয়ে চলে; কিন্তু ছোট শরীরের লোকদের আত্মরক্ষার খাতিরে খালি হাতে মারপিট করতে হয় বেশি; সুতরাং তুলনামূলক ভাবে এরাই বেশি কৌশল জানে। কিন্তু বিশালদেহী শেইন থমসনের ক্ষেত্রে কথাটা খাটে না। শরীরটাই কেবল বিশাল নয় ওর, বরং লড়াইয়ের খুঁটিনাটি সব কৌশলই জানা আছে।

হঠাৎ থেমে এক পা পিছিয়ে এল লসন, তারপর আগে বেড়ে ঘুসি হাকাল থমসনের পেটে। অভিজ্ঞতা থেকে ও জানে চিবুক বা চোয়ালে ঘুসি খেলে সহ্য করতে পারে অধিকাংশ মানুষ, কিন্তু পেটে ক্রমাগত ঘুসি খেলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে খুব কম লোক।

ঘুসি মেরেই সরে এল ও। এবার ভান করল থমসন, পড়ে যাচ্ছে যেন, আধচক্কর ঘুরেই ঝটিতি ডান হাত চালাল। বাতাস কাটার শব্দ হলো, কিন্তু মাথা নিচু করে সময়মত সরে যেতে সমর্থ হলো লসন, সরে যাওয়ার ফাঁকে বাম হাত চালাল। থমসনের পাজরে ওর হাতটা ছুঁয়ে গেল কি গেল না, চোখ বড়বড় হয়ে গেল বিশালদেহীর, সশব্দে দম নিল সে। এই সুযোগে এগিয়ে এল. লসন। ক্রমাগত কয়েকটা ঘুসি হাঁকাল থমসনের মুখে। নুয়ে পড়তে পড়তে ওর কোমর জাপটে ধরল তস্কর। বিশাল দুই বাহু দিয়ে চাপ দিচ্ছে। অসহ্য ব্যথায় চোখে অন্ধকার দেখল লসন, দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা হজম করার চেষ্টা করল। থমসনের দুহাতে শরীরের ওজন ছেড়ে দিয়ে মাটি থেকে পা তুলে দিল ও, তারপর জোড়া পায়ে লাথি হাকাল লোকটার হাঁটুতে। হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ল দুজনেই। সাঁড়াশি বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল ড্যানি লসন, হাপরের মত ওঠা-নামা করছে বুক।

উঠে দাঁড়ানোর সময় হাঁটু দিয়ে থমসনের মুখে আঘাত করেছে ও। থোক করে থুথু ফেলল সে, রক্তমাখা একটা দাঁত পড়ল ধূলিময় মাটিতে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গেছে দুর্বৃত্ত, বুনো আক্রোশে ছুটে এল। এক বিন্দু সরল না লসন। নাগালের মধ্যে আসা মাত্র যেন পাঁচ টনী ট্রাককে থামাল পরপর দুটো ঘুসি হাঁকিয়ে। থমসন একরকম গ্রাহ্যই করল না মারগুলো। দুহাত দিয়ে গায়ের জোরে ধাক্কা মারল লসনের বুকে।

ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল লসন। দ্রুত ওর বুকের ওপর বুট তুলে দিল থমসন, চাপ দিল। দুহাতে বুট সহ পা-টা ধরে মোচড় দিল লসন, অস্ফুট স্বরে ককিয়ে উঠল বিশালদেহী, তারপর হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ল মাটিতে।

দুজনেই লাফিয়ে উঠে সিধে হলো। পাজরে একটা ঘুসি খেল লসন, যেন ছুরির আঘাত। থমসনের চওড়া নাক আরও চওড়া করে দিল ও দুই ঘুসিতে, গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল।

সরে গেল ওরা, বড়বড় নিঃশ্বাস ফেলছে। মুখ বিকৃত হয়ে গেছে থমসনের, সারা মুখে রক্তের ছোপ, প্রায় আধবোজা হয়ে গেছে একটা চোখ, কিন্তু অন্য চোখে-স্পষ্ট দেখতে পেল লসন-খুনের নেশা ফুটে উঠেছে। মরিয়া হয়ে উঠেছে। দুর্বত্ত, এখন আর কৌশল বা লড়াইয়ের নিয়মের ধার ধারবে না। ওকে হাতের মুঠোয় পাওয়া মাত্র চূড়ান্ত আঘাত হানবে—বুকে চেপে ধরে একটা চাপে ভেঙে ফেলতে চাইবে ওর পাজর।

পরস্পরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ার আগে কৌশল বদল করল লসন। থমসনের একটা হাত ধরে ফেলল আচমকা, তারপর নিজের শরীর নিয়ে এল বিশাল দেহের কাছে; কাঁধের ওপর তুলে নিল হামসনের বগল, মাটিতে দুই পা-র ভর রেখে গায়ের জোরে ছুঁড়ে ফেলল তাকে।

উড়ে গিয়ে রাস্তার ওপর আছড়ে পড়ল শেইন থমসন। নিশ্চল পড়ে থাকল, প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে; কিছুটা হলেও হকচকিয়ে গেছে, বিশ্বাস করতে পারছে না ভরাডুবি হতে যাচ্ছে তার।

তাকে আর উঠতে দিল না লসন। কষ্টেসৃষ্টে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বিশালদেহী, ঠিক তখনই চূড়ান্ত আঘাত করল। পরপর তিনটে ঘুসি মেরে থমসনের মুখ বিকৃত করে দিল। তারপর দুবৃত্তের বুকের কাছে শাট খামচে ধরে দাঁড় করাল তাকে, সামান্য বিরতির পর আরও কয়েকটা ওজনদার ঘুসি হাকাল মুখে।

এমন ভাবে সরে এল লসন যেন জানে এরপর কি হবে। সত্যিই তাই হলো। রক্তাক্ত শরীরটা হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল, বালির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল শেইন থমসন। স্থির, নিশ্চল পড়ে থাকল।

একটু দূরে সরে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে তাকাল লসন, দ্রুত শ্বাস ফেলছে। হাপরের মত ওঠা-নামা করছে প্রশস্ত বুক, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে নিঃশ্বাস। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি চালাল ও, জানে যে কেউ এই সুযোগে পিস্তলের দিকে হাত বাড়াতে পারে। কিছুক্ষণ বাদে, সাংবাদিকের কাছ থেকে হোলস্টার নিয়ে উরুতে ঝোলাল ও, বিড়বিড় করে ধন্যবাদ জানাল। তারপর পানির ট্যাঙ্কের কাছে গিয়ে হাত-মুখ ধুলো। টের পেল মুখ আর হাতের ক্ষতগুলো জ্বালা করছে, কিন্তু গ্রাহ্য করল না।

কার্টিসের কাছ থেকে শটগানটা নিল ও, তারপর বিমূঢ় বেনি ডবিনের দিকে ফিরল। ওকে সরিয়ে নাও এখান থেকে। সকাল হওয়ার আগেই শহর ছাড়বে, ভবিন! তোমাদের দুজনের কাউকে যেন এই শহরে আর না দেখি। কথা দিচ্ছি—পরেরবার কিন্তু এত সহজে ছেড়ে দেব না।

নীরবে মাথা ঝাঁকাল ডবিন, বিস্ময় কাটেনি তার এখনও। বিশ্বাসই করতে পারছে না অজেয় শেইন থমসনের পতন হয়েছে।

লোকজনের ভিড় এতটুকু কমেনি। তাদের দিকে ফিরল ড্যানি লসন। দয়া করে প্রত্যেকে নোটিশটা পড়ো। যার যার নাম আছে, তাদের কাউকে দরকার নেই আমাদের। যে যাবে না তাকে গুলি খেতে হবে। এ শহর পরিষ্কার করতে চাই আমি, একদম পরিষ্কার।

কথা শেষ করে আর দাঁড়াল না ও। সরাসরি ল-অফিসে এসে একটা চেয়ারে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিল। চোখ বুজে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ। একটু পর খেয়াল করল একা নয় ও, কার্টিস চলে এসেছে।

আঘাত কেমন? জানতে চাইল সে।

থমসন ঘুসি মারতে জানে বটে!

এবার কি শেষ হবে সবকিছু?

না, দীর্ঘশ্বাস ফেলল লসন। সবে তো শুরু হলো। এখন থেকে বন্দুক ব্যবহার করতে হবে। থমসনকে পিটিয়েছি শুনে মোটেও ক্ষান্ত হবে না রক্স বা কিনকেড।

চুলোয় কেতলি চাপাল কার্টিস, পানি ফুটিয়ে লসনের ক্ষতের পরিচর‍্যা শুরু করল।

কিনকেড বা রক্সকে দেখেছ নাকি? জানতে চাইল লসন।

না। লাপাত্তা হয়ে গেছে ওরা।

রবার্ট অ্যালেন আর জেফরি হ্যালার্ড এল একটু পর।

বব, আমার হয়ে রাস্তায় কিছুক্ষণ নজর রাখতে পারবে?

তারচেয়ে বরং একটা চক্কর দিয়ে আসি। কাউকে না কাউকে পেয়ে যাব, যার কাছে কিছু খবর পেতে পারি। কিনকেডের দলের অনেককেই চিনি আমি।

বিল লারকিন এল এবার। তার কাছ থেকে জানা গেল ইতোমধ্যে শহর ছেড়ে চলে গেছে যোলোজন।

এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল হ্যালার্ড। এবার বোধহয় মুখ খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ড্যান, তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। নিজেই নিজেকে বোকা বানিয়েছি আমি এতদিন।

কিন্তু চেষ্টা করেছ তুমি। তুমি ভদ্রলোক, হ্যালার্ড, কিন্তু ভদ্রতা ওদের ব্যবসা নয়। দ্রতা হচ্ছে ওদের কাছে দুর্বলতা, এবং একইসঙ্গে সুযোগও। এতদিন সভ্য এলাকায় বাস করেছ তুমি, এ অঞ্চল তো তা নয়।

হাতের মুঠি খুলে-বন্ধ করে আঙুলের আড়ষ্টতা কাটাতে চাইছে লসন। দেখলে তো, আমি আসলে ওদেরই একজন, নেকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে আমিও নেকড়ে হতে পারি?

ধন্যবাদ, ড্যান।

কথা শেষ করে আর দাঁড়াল না হ্যালার্ড। বাইরে এসে জো হারপারকে বলল, ওর আঙুলগুলো দেখেছ তো, থেতলে গেছে? প্রয়োজন পড়লে কিভাবে পিস্তল চালাবে, কে জানে! তবে, জানো কি, চোখে না দেখলে আমি বিশ্বাসই করতাম না ওভাবে শেইন থমসনকে পেটাতে পারে কেউ!

কফির আয়োজন করেছে কার্টিস।

কিছুক্ষণ পরই ফিরে এল বব অ্যালেন। কি খবর পেলে? কফিতে চুমুক দিয়ে জানতে চাইল লসন।

জ্যাক চেম্বারল্যান্ড এখনও শহর ছাড়েনি। কে জানে, হয়তো তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছে সে! মার্শালের পক্ষ থেকে জামাই আদর না পেলে বোধহয় শহর ছাড়ার ব্যাপারে মত হবে না ওর।

আর কিছু?

শহরের ঠিক বাইরে দলবল সহ অবস্থান নিয়েছে কিনকেড। রক্সের নির্দেশের অপেক্ষায় আছে হয়তো। এদিকে এক লোককে ভাড়া করার জন্যে বিগ বে-তে লোক পাঠিয়েছে রক্স, ওখানে গিয়ে টেলিগ্রাম করবে লোকটা।

কাকে আনার জন্যে?

আমি যেমন জানি, তুমিও জানো, ড্যান। আশপাশে মাত্র একজন লোকই আছে যে পিস্তল হাতে তোমার মুখোমুখি দাঁড়ানোর হিম্মত রাখে।

আনমনে মাথা নাড়ল লসন। জানে ও।

লোকটা আর কেউ নয়। কোবিন উইন্সটন।

<

Super User