আমিও আম্মার সঙ্গে একমত। এখানকার কাজ করতে পারবে না লিজবেথ। গায়ে কিছু নেই ওর। বরং আম্মার জন্যে বাড়তি আরেকটা ঝামেলা হবে।

কিন্তু আমরা দুজনেই ভুল করেছি। ঠিকই বলে গেছে বাড সারসি। সত্যিই কাজের মেয়ে লিজ। ঝর্না থেকে পানি আনা, মুরগীকে খাবার খাওয়ানো, কাঠ জড় করা, রুটি তৈরি, বাসন মাজা, আরলিসকে গোসল করানো, সব পারে। মাঝে মাঝে এসে আমার পায়ে নতুন করে ব্যাণ্ডেজও বেঁধে দিয়ে যায়।

কোন কাজের জন্যেই তাকে বলতে হয় না। কোনটা কখন করতে হবে জানে। ঘরের কাজে আম্মার জন্যে আমিও এতটা সহায়ক নই। আর আমাদের কাজ, অর্থাৎ পুরুষের কাজেও সে পিছিয়ে যায় না। জাস্পার আর ঠেলাগাড়িটা নিয়ে শস্য তুলে আনতে যায় আম্মা। লিজও যায়। এসব কাজেও কোন খেদ নেই তার, নিজের ইচ্ছেতেই সব করে। অথচ এই কাজটা আমারও ভাল লাগে না। ভীষণ পরিশ্রমের, বিরক্তিকরও বটে। যবের ডাটা গায়ে লাগলে খুব চুলকায়। রাতেও চুলকাতে চুলকাতে ঘুম ভেঙে গেছে একেক দিন। মনে হয়েছে বিছুটি ডলে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু লিজের যেন কিছুই হয় না। বরং দেখেশুনে আমার মনে হতে লাগল শস্য তুলতে গিয়ে চমৎকার সময় কাটছে আম্মা, লিজ আর আরলিসের। আমার দরজার সামনে দিয়েই যায় গাড়িটা। শস্যের আঁটির ওপর বসে থাকতে দেখি তিনজনকে। হাসাহাসি করে, কথা বলে। ওদের আনন্দ দেখে হিংসে হয় আমার। রাগ হয় পা-টার ওপর। উঠতে দিচ্ছে না বলে।

আত্মসম্মানেও লাগল। লিজবেথের মত একটা ছোট মেয়ে এসে এমন সব কাজ করে দিচ্ছে যেগুলো সামলানোর দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিল আব্বা। খারাপ লাগল আরও একটা ব্যাপারে। আমি মনে করেছিলাম, আব্বার পরে একমাত্র আমি ছাড়া এসব কাজ আর কেউ করতে পারবে না। অথচ দিব্যি করে ফেলছে আম্মা আর লিজ। ভাবাই যায় না। যাই হোক, বনে গিয়ে শুয়োরকে চিহ্ন দেয়া, শিকার করা, কাঠ কাটা, এসব পারবে না; এগুলো শুধুই আমার কাজ, ভেবে মনে মনে খানিকটা সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করলাম…

শস্য তোলা শেষ হওয়ার আগেই মারাত্মক বিপদ এসে হাজির। আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। বুঝতে পারলাম না এ বিপদ থেকে কি করে রক্ষা পাব।

শুরুটা হলো এভাবে। দুধ দোয়ানোর সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু বাড়ি এল না আমাদের চিত্রা গাইটা। খেত থেকে আসতে আসতে আমাদেরও দেরি হয়ে গেল। খুঁজতে যে যাবে তারও আর সময় নেই। রাত হয়ে যাচ্ছে। পরদিন ছাড়া আর হবে না।

তবে পরদিন সকালে আর যেতে হলো না তাকে। গরুটাই এসে হাজির। আমিই ডাক শুনতে পেলাম প্রথমে। আমার পায়ের ফোলা প্রায় চলে গেছে। ব্যথাও নেই। তবে শরীর এত দুর্বল, উঠতে গেলেই বৃষ্টিতে ভেজা মুরগীর ছানার মত কাঁপতে থাকি।

ডাকতে ডাকতে এল চিত্রা। বাছুর হারিয়ে গেলে কিংবা দুধের ভারে ওলান টনটন করলে যেমন করে ডাকে, অনেকটা তেমনি।

ডাকটা আমি যেমন চিনতে পারলাম, তার বাছুরটাও পারল। গোয়াল ঘরে সারা রাত না খেয়ে থেকেছে। দুধের জন্যে পাগল হয়ে আছে। মায়ের সাড়া পেয়েই যেন উন্মাদ হয়ে গেল। বেরোনোর জন্যে গোয়ালের মধ্যে ছুটাছুটি করছে শুনতে পেলাম।

আম্মাকে ডেকে বললাম, আম্মা, চিত্রা অমন করে ডাকছে কেন দেখো তো?

আর কি জন্যে ডাকবে? বিরক্ত কণ্ঠে জবাব দিল আম্মা, রাতে আসেনি। বাছুর ফেলে গেছে। ওলানে দুধ। ভেবেছিলাম স্বভাব ভাল হয়ে গেছে। কিন্তু একবার খারাপ হলে কি আর ঠিক হয়।

চিত্রাকে ডাকতে ডাকতে গোয়ালের দিকে চলে গেল আম্মা। একটু পরেই খেপা ষাঁড়ের মত বাআআ বাআআ করে উঠল গাইটা, সেই সঙ্গে শোনা গেল আম্মার তীক্ষ্ণ চিৎকার। আরলিসকে নিয়ে লিজকে তাড়াতাড়ি চলে আসার জন্যে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে এল কেবিনের দিকে। ভয় পেয়েছে। বিছানায় উঠে বসলাম। আরলিসের হাত ধরে দৌড়ে এল লিজ।

ঘরে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিল আম্মা। আমার দিকে ঘুরে বলল, আমাকে গুঁতোতে এল। আশ্চর্য! চিনলই না যেন আমাকে!

আস্তে করে দরজাটা একটুখানি ফাঁক করল। বাইরে একবার উঁকি দিয়েই একটানে পুরো পাল্লাটা খুলে ফেলে গোয়ালের দিকে তাকাল।

আরি, কাণ্ড দেখো! বাছুরটার দিকেও খেয়াল নেই। চলে যাচ্ছে। বিষটিষ খেয়ে এল নাকি?

পাহাড়ে এক ধরনের লতা জন্মায় শীতকালে। বসন্তে ফুল ফোটে। মৃদু মিষ্টি একটা গন্ধ ছড়ায়। ঘাসের সঙ্গে এই লতাও খেয়ে ফেলে গরু-ঘোড়ারা। খুব ভাল প্রোটিন পায় এ থেকে। চর্বি লাগে গায়ে, মোটা হয়। মাঝে মাঝে ঘাস বাদ দিয়েই ওই লতা বেশি খেয়ে ফেলে। শুরু হয় বিষক্রিয়া। মাতলামি আরম্ভ করে। টলে টলে পড়ে, ঠিকমত দাঁড়িয়েও থাকতে পারে না। অনেক বেশি খেলে মারাও যায়।

বসে বসে চিত্রার ডাক শুনতে থাকলাম। আবার ডাকছে। প্রথমবার যেমন ডেকেছে তেমন করেই। বাচ্চাকে দুধ না খাইয়েই আবার চলে যাচ্ছে বনের দিকে। অবাক লাগল আমার। এই সময় এমন মাতাল করে দেয়ার মত লতা কোথায় পেল সে?

আম্মা, লতা খায়নি। সব এখন মরে গেছে। খাওয়ার উপযুক্ত নেই।

আমার দিকে একবার তাকিয়েই আরেক দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল আম্মা। জানি। সে জন্যেই তো চিন্তা হচ্ছে।

বার্ন স্যান্ডারসনের হুঁশিয়ারি মনে পড়ে গেল আমার। কোন জানোয়ার অস্বাভাবিক আচরণ করলেই বুঝতে হবে…

আম্মা, গরুর নিশ্চয় জলাতঙ্ক হয় না?

চমকে গেল লিজ। বড় বড় চোখজোড়া ঘুরে গেল আমার দিকে।

আম্মা বলল, জানি না। কুকুরের হতে দেখেছি। গরুর হয় বলে শুনিনি কখনও।

পরের কয়েকটা দিন খুব উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটল। কড়া নজর রেখেছি জলাতঙ্কের দিকে। দ্রুত সেরে উঠছি এখন আমি আর ইয়েলার।

চিত্রার আচরণে কোন পরিবর্তন নেই। আসে যায়, আসে যায়, ডেকে ডেকে সারা হয়। অনেকখানি জায়গা নিয়ে চক্কর দিয়ে বেড়ায়। দিনে অন্তত দুবার চলে আসে বাড়ির কাছাকাছি। থামে না। হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় আবার পাহাড়ের দিকে। মাথা তোলার শক্তি নেই। ঝুলিয়ে রেখে টলে টলে হাঁটে। খুবই দুর্বল ভঙ্গি। কিন্তু হাঁটাও থামায় না, ডাকও বন্ধ করে না।

তারপর এল একটা ষাঁড়। চিত্রার মতই আচরণ করতে লাগল। তবে ষাঁড় তো, অনেক বেশি বিপজ্জনক। ডগ রানে চেয়ারে বসে আছি আমি। পায়ের কাছে শোয়া ইয়েলার। ওর কাটা কানের গোড়াটা আস্তে আস্তে চুলকে দিচ্ছি। এটা তার খুব পছন্দ। আম্মা রয়েছে রান্নাঘরে। রান্নায় ব্যস্ত। আরলিস আর লিজ গেছে ক্ৰীকের নিচের ঝর্নায়। ক্যাটফিশ ধরতে। কুকুরের বাচ্চাটা নিয়ে গেছে সঙ্গে করে। ওদেরকে দেখা যাচ্ছে। হাসাহাসি করছে। মাছের টোপের জন্যে ঘাসফড়িং খুঁজছে।

হঠাৎ গোঙানি কানে এল। তাকিয়ে দেখি ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসছে ষাঁড়টা। সেই লালুটা, লড়াইয়ের সময় যাকে ঠেলাগাড়িতে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল ঝোলা শিংওয়ালা চোঙ্গো। কিন্তু ও যেভাবে হেঁটে এল এভাবে আর হাঁটতে দেখিনি কোন ষাঁড়কে। মাথা নিচু। টলছে। এলোমেলো পা ফেলছে। কোথায় যাবে তা-ও যেন জানে না। একটা মেসকিট গাছের দিকে সোজা এগোল। যেন চোখেই পড়েনি ওটাকে। গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল। কোনমতে উঠে দাঁড়াল আবার। আবার এগোল। ঘোৎ-ঘোৎ করছে, গোঙাচ্ছে। টলতে টলতে রওনা হলো ঝর্নার দিকে।

বন থেকে তুলে আনার পর এই প্রথম গরুর চামড়াটা থেকে নামল ইয়েলার। ষাঁড়টার ঘ্যানঘ্যানানিতে কান দেয়নি। কিন্তু এখন হঠাৎ করেই সতর্ক হয়ে গেছে। নিশ্চয় ষাঁড়ের গায়ের গন্ধ এসে লেগেছে তার নাকে। রোগের গন্ধ।

উঠে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ শুরু করল। টলোমলো পায়ে এগোল ষাঁড়টার দিকে। দুর্বল ভঙ্গি। সোজা হয়ে ঠিকমত দাঁড়াতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। ঠোঁট তুলে ফেলেছে ভেঙচি কাটার ভঙ্গিতে। দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। ঘাড়ের রোম দাঁড়িয়ে গেছে।

তার এই চেহারা দেখে আমারও ঘাড়ের কাছটায় শিরশির করে উঠল। সাংঘাতিক বিপদ না দেখলে এরকম আচরণ করে না সে।

বুঝলাম, আমি আর আম্মা ব্যাপারটাকে জোর করে এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছি। বুঝেও বুঝতে চাইছি না। ভান করছি শুধু শুধু। মিথ্যে আশায় থেকে ভাবছি, চিত্রার রোগ সেরে যাবে। কদিন ধরে ওটার বাছুরটাকে অন্য গরুর দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। খেতে দিতে কি আর চায়। লাথি মেরে সরিয়ে দেয়। শেষে গরুটার পেছনের পা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিয়েছে আম্মা আর লিজ। আম্মা আশা করছে, এই অবস্থা বেশি দিন থাকবে না। শীঘ্রিই ভাল হয়ে যাবে চিত্রা। ফিরে আসবে। দুধের সমস্যা আর থাকবে না তার বাছুরের।

কিন্তু এখন আমি নিশ্চিত, চিত্রা আর কোন দিনই ভাল হবে না। ভাল হবে না এই ষাঁড়টাও। মারাত্মক জলাতঙ্কে ধরেছে ওদেরকে। ওই ভয়াবহ রোগের গন্ধ পেয়েই এমন আতঙ্কিত চিৎকার শুরু করেছে ইয়েলার।

ভয় পেয়ে গেলাম আরলিস আর লিজের জন্যে। ঝর্নায় রয়েছে ওরা। ষাঁড়টাও গেছে সেদিকেই। চেয়ার থেকে উঠে চিৎকার করে আম্মাকে ডাকলাম, আম্মা, জলদি আমার বন্দুকটা এনে দাও।

দৌড়ে এল আম্মা। কি হয়েছে?

জলাতঙ্ক! ওই দেখো, ষাঁড়টা কি করছে। আরলিসরা ওখানে…

একবার তাকিয়েই আঁতকে গেল আম্মা, সর্বনাশ! সোজা দৌড় দিল ক্ৰীকের দিকে। চিৎকার করে আরলিস আর লিজকে বলছে গাছে উঠে পড়ার জন্যে। ষাঁড়টার কাছ থেকে সরে যেতে বলছে।

আম্মার চিৎকার কানে গেল ষাঁড়টার। থমকে দাঁড়াল। গুতো মারার জন্যে ঘুরতে গেল। তাড়াহুড়ায় গেল হাঁটু ভেঙে পড়ে। আবার উঠে দাঁড়াল। টলতে টলতে এগোল। গরুটা অসুস্থ না হলে কোন সুযোগই পেত না আম্মা। কিন্তু এখন তাকে ধরতে পারল না চোঙ্গো। কয়েক কদম এগিয়েই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। গোঙাতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত একভাবে পড়ে থেকে আবার উঠল।

ততক্ষণে তার কাছে পৌঁছে গেছে ইয়েলার। ঘেউ ঘেউ করছে। বেশি শয়তানি করলে জ্যান্ত খেয়ে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।

আর দাঁড়ালাম না। ঘরে গিয়ে বন্দুকটা বের করে নিয়ে চলে এলাম ষাঁড়টার কাছে। ঠিকমত হাঁটতে পারি না আমিও। মুখোমুখি দাঁড়ালাম ওটার। অহেতুক ঝুঁকি নেয়ার কোন মানে হয় না। ঠিক মগজে একটা গুলি ঢুকিয়ে দিতে চাই।

<

Super User