আরলিসটাকে নিয়ে আর পারা যায় না! যেমন দুষ্টু তেমন বেয়াড়া। ঘর থেকে বেরোতে শেখার পর থেকেই একটা আজব অভ্যাস হয়েছে। যে প্রাণী দেখবে সেটারই পিছে লাগবে, ধরতে পারলে রেখে দেবে।

প্রতি রাতেই শুতে যাওয়ার আগে আটকায় তাকে আম্মা। সারা দিনের সমস্ত শিকার বের করে দিয়ে পকেট খালি করতে বলে। অদ্ভুত সব জিনিস পাওয়া যায় তার কাছে। ফড়িঙ, পোকা, প্রজাপতি, গিরগিটি সব তালগোল পাকিয়ে থাকে পকেটে। কোনটা মরা, কোনটা জ্যান্ত। কেঁচো, শুয়াপোকা, এসবকে পর্যন্ত ভয় পায় না সে। একদিন একটা শিংওলা ব্যাঙ ধরে নিয়ে এসেছিল। পকেট থেকে বের করতেই এমন ফুলতে শুরু করল ওটা, ফুলতে ফুলতে একেবারে গোল বল হয়ে গেল। রাগের চোটে রক্ত বেরিয়ে গেল চোখ দিয়ে। বাসা থেকে পড়ে যাওয়া পাখির ছানা, ঝর্নার পানিতে ভেসে বেড়ানো সবুজ ব্যাঙ, এমন কি সারা গায়ে হলুদ আঙটি আঁকা চোঁড়া সাপও ধরে নিয়ে আসে। একদিন তো পকেট ওল্টাতেই বেরিয়ে পড়ল একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা মারাত্মক কপারহেড সাপের বাচ্চা। দেখে তো প্রায় চোখ উল্টে দিয়েছিল আম্মা। সাপটা যে আরলিসকে কামড়ায়নি কেন সেটাই এক রহস্য। কিন্তু এর পর আর সাপের ব্যাপারে তাকে লাই দিল না আম্মা। এমন পিটান পিটাল, সাপ ধরার নাম ভুলিয়ে ছাড়ল।

পিটুনি খেয়ে সাপ ধরা বন্ধ করল বটে আরলিস, তবে জ্যান্ত সাপ। এরপর থেকে ধরার আগে ঢিল ছুঁড়ে মেরে নেয়, তারপর তুলে পকেটে ভরে। রাতে পকেট থেকে বের করার সময় একটু পচা গন্ধ বেরোয় এই যা, এছাড়া আর কোন অসুবিধে হয় না। এবং আরলিসের ধারণা, তার খাতিরে এটুকু অন্তত আম্মার মেনে নেয়া উচিত।

ইয়েলারটা আসার পর তার এই ধরাধরি আরও বেড়ে গেল। আরও বড় বড় জিনিস ধরতে শুরু করল কুকুরটার সাহায্যে। খরগোশ, পাখি, পোশামের বাচ্চা এসব। এই পোশমগুলো একটা মজার কাণ্ড করে। ধরা পড়লেই রোম ফুলিয়ে গোল হয়ে গিয়ে মরার ভান করে থাকে, একনাগাড়ে কয়েক ঘণ্টা একটুও না নড়ে একভাবে পড়ে থাকতে পারে, যতক্ষণ না নিশ্চিত হয় আরলিস ওকে কিছু করবে না।

রার কাজগুলো অবশ্য ইয়েলারই করে। তাড়া করে গিয়ে ধরে এনে তুলে দেয় আরলিসের হাতে। বাড়ি ফিরে সে কথাটা বেমালুম চেপে গিয়ে দিব্যি একটা রোমাঞ্চকর গল্প বানিয়ে বলে দেয় আম্মাকে আরলিস, বলে নিজে ধরেছে ওগুলো।

একদিন বার্ডসং ক্রীকে একটা নীল ক্যাটফিশ ধরতে দেখলাম ওদেরকে। কি করে যেন অল্প পানিতে চলে এসেছে মাছটা। পানি এতই অল্প, ওটার পিঠের কাটাও ডোবে না। আমি যখন দেখলাম, একই সময়ে আরলিস আর ইয়েলারও দেখে ফেলল ওটাকে। দৌড় দিল। শরীর মুচড়ে মুচড়ে বেশি পানির দিকে যেতে শুরু করল মাছটা, কিন্তু তার আগেই পৌঁছে গেল ইয়েলার। বিশাল হাঁ করে মাছটাকে দাঁত দিয়ে চেপে ধরে তুলে আনল ডাঙায়, ঘাসের ওপর ছেড়ে দিল। এমনই কায়দা করে ধরেছে একটা দাঁতও বসেনি। ঘাসের মধ্যে লাফাতে লাগল ওটা। দৌড়ে গিয়ে ধরল আরলিস। ভঙ্গিটা দেখার মত। যেন কি সাংঘাতিক কষ্ট করে পানি থেকে ধরে তুলে এনেছে। কিন্তু ধরার পর পরই কাঁটা ফুটিয়ে দিল ক্যাটফিশ, চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল সে, কিন্তু হাত থেকে মাছ ছাড়ল না।

চেঁচাতে চেঁচাতে বাড়ির দিকে দৌড় দিল আরলিস। আম্মার সামনে নিয়ে গিয়ে মাটিতে ফেলে দিল মাছটা। হাতে রক্ত। যেখানে কাটা ফুটিয়েছে তার চারপাশটা গোল হয়ে ফুলে উঠেছে। মেসকিটের কাটাও অত বিষাক্ত নয়, অত যন্ত্রণা দেয় না ক্যাটফিসের কাঁটা যতটা দেয়।

তাড়াতাড়ি প্রিকলি-পারের মূল ছেঁচে জখমের ওপর লাগিয়ে বেঁধে দিল আম্মা। বিষ টেনে নেবে এই ওষুধ। ব্যথার কথা ভুলে যেতে দেরি হলো না আরলিসের।

সে রাতে খাওয়ার সময় পাতে দেয়া হলো ভাজা ক্যাটফিশ। গল্প ফেঁদে বসল আরলিস। ডুব দিয়ে চলে গিয়েছিল নাকি গভীর পানিতে। সেখানে পাথরের নিচে দেখে একটা গর্ত। তাতে ঢুকে পড়ল। টেনে বের করল মাছটাকে। তারপর ওটাকে ধরে রেখেই সাঁতরে এসে উঠল তীরে। গর্তে ঢুকে আরেকটু হলেই কি করে ডুবে মারা যাচ্ছিল, সেটার গা-শিউরানো বর্ণনা দিল অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে।

আরলিসের গপ মারা সহ্য হলো না আমার। সেটা আম্মাকে বলতে যেতেই আমাকে থামিয়ে দিল আম্মা। বলল, বলুক না। বলতে ভাল লাগছে ওর বলুক, কারও তো কোন ক্ষতি হচ্ছে না।

প্রতিবাদ না করে পারলাম না, দেখো আম্মা, এভাবে লাই দিয়ো না। তুমি আর ওই ইয়েলারটা মিলে টেক্সাসের সব চেয়ে বড় মিখ্যাক বানিয়ে ছাড়বে আরলিসকে।

হেসে ফেলল আম্মা। আরলিস ওখান থেকে উঠে গেলে বলল, ওসব বানানো গল্প শুনতে তার ভালই লাগে। মুচকি হেসে যোগ করল, ছোটবেলায় এসব ব্যাপারে কেউই কম যায় না। আরলিসের চেয়ে অনেক বেশি গপ মেরেছে তার বড়রা, সেগুলো যদি হজম করতে পেরে থাকে, তারটাই বা পারবে না কেন?

খোঁচাটা যে কাকে মারল, বড়রা বলতে কাকে বোঝাল, বুঝতে অসুবিধে হলো না আমার। চুপ হয়ে গেলাম। আরলিস যদি টেক্সাসের বড় মিথ্যেবাদী হয়ই, তাতে আমার কি? হোক।

সাপ-ব্যাঙ ধরতে ধরতে এমন অবস্থায় চলে গেল আরলিস, এমন দুঃসাহসী হয়ে উঠল, শেষে ভালুককে হাতে পেয়েও ছাড়ল না। মারাই গিয়েছিল সেদিন আরেকটু হলে, অল্পের জন্যে বেঁচেছে।

ঘটনাটা যেদিন ঘটল, সেদিন ক্রীকের নিচে একটা জায়গায় বেড়া মেরামত করার জন্যে কাঠ কাটছিলাম আমি। গাছ কেটে বেড়া তৈরি খুব মেহনতের কাজ। ডিনারের পর পরই সেখানে চলে গেছি। কাজ করতে করতে ভারি হয়ে এল হাত। কুড়ালটা মনে হচ্ছে দশ মন ভারি। দরদর করে ঘামছি। পিঠ ব্যথা করছে। নিঃশ্বাস ভারি। কোপ বসানোর জন্যে আর কুড়াল তুলতেই ইচ্ছে করছে না।

সূর্য ডুবতে ঘণ্টাখানেক বাকি আছে তখনও। বসে পড়লাম। অবশ হয়ে এসেছে হাত। আব্বা হলে এত তাড়াতাড়ি কাহিল হত না। সূর্য ডোবার পরেও আরও এক ঘণ্টা অনায়াসে কাজ করতে পারত। আব্বা যে কি করে পারে! কিন্তু আমার পক্ষে মনে হচ্ছে অসম্ভব। কয়েক মিনিট জিরিয়ে নিয়ে কুড়ালটা কাঁধে ফেলে বাড়ি রওনা হলাম।

আম্মা যদি জিজ্ঞেস করে এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম কেন, কি জবাব দেব ভাবতে ভাবতে চলেছি, এই সময় শোনা গেল আরলিসের চিৎকার।

আরলিসের কাজই হলো কারণে-অকারণে চেঁচানো। যখন আনন্দে থাকে তখনও চেঁচায়, যখন কষ্ট পায় কিংবা খেপে যায় তখনও চোয়, অন্য সময় কোন কারণ ছাড়াই চেঁচায় শুধু চেঁচিয়ে মজা পাওয়ার জন্যে। তাতে অবাক হই না। কিন্তু এখনকার চিৎকারটা অন্য রকম। শুনেই ধড়াস করে উঠল বুক। বুঝে গেলাম ভীষণ বিপদে পড়েছে সে।

দিলাম দৌড়। মুহূর্ত আগেও এত ক্লান্ত লাগছিল, মনে হচ্ছিল, হেঁটে ঘরেই ফিরতে পারব না। পা আর চলছিল না। এখন আমার দৌড় দেখলে সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না।

আবার চেঁচিয়ে উঠল আরলিস। আরও জোরে, আরও তীক্ষ্ণ স্বরে। সেই সঙ্গে শোনা গেল চাপা গোঙানি আর ফোঁপানি মেশানো কান্নার মত আরেকটা শব্দ। আরলিসের নয়, তবে শব্দটা চেনা চেনা। আগেও কোথাও শুনেছি, ঠিক মনে করতে পারলাম না ওই মুহূর্তে।

শোনা গেল খকখক কাশি মেশানো ভয়াবহ গর্জন। খেপা ভালুকের তেড়ে আসার শব্দ চিনতে ভুল হলো না। আরও একবার শুনেছি এই গর্জন, সেই যখন শুয়োর মারতে দেখে একটা ভালুককে গুলি করে জখম করেছিল আম্মা। যন্ত্রণায়, রাগে এমন করেই গর্জে উঠেছিল ওটা। শুয়োর ছেড়ে আমার দিকে ছুটে আসছিল। ইয়া বড় এক ছুরি হাতে সামনে গিয়ে দাঁড়াছিল আব্বা। ছুরি দিয়ে খুঁচিয়েই মেরে ফেলেছিল ভালুকটাকে।

ধড়াস ধড়াস করছে আমার বুক। মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডটাই বুঝি ছিড়ে যাবে। প্রাণপণে ছুটছি। আরও জোরে ছোটানোর চেষ্টা করলাম পা-দুটোকে। কতটা বিপদে পড়েছে আরলিস, জানি না। ভালুকটা যদি সত্যি সত্যি খেপা হয়ে থাকে, তবেই হয়েছে।

গাছপালার ফাঁক দিয়ে তেরছা হয়ে পড়ছে পড়ন্ত রোদ। বনের ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা। রোদের বর্শাগুলো এসে চোখে লাগছে, অন্ধ করে দিতে চাইছে, সামনেটা দেখতে পাচ্ছি না ভালমত। খোলা জায়গায় বেরিয়েই ঘুরলাম। ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে।

আবার সেই পানির গর্তটায় গিয়ে নেমেছে আরলিস। পানিতে প্রায় শুয়ে আছে, দেহের অর্ধেকটা পানিতে, অর্ধেকটা শুকনোয়। ছোট কুনের সমান একটা কালো ভালুকের বাচ্চার পেছনের পা চেপে ধরে আছে। বাচ্চাটা রয়েছে ডাঙায়। ছাড়া পাওয়ার জন্যে টানাটানি করছে। তিন পা দিয়ে আঁচড় কাটছে পাথরে, থাবা মারছে, নখ বসিয়ে দিয়ে উঠে যেতে চাইছে। সেই সঙ্গে চলছে ফোঁপানি আর গোঙানি। চেপে ধরে রেখেছে আরলিস। আতঙ্কে চিৎকার করছে গলা ফাটিয়ে। এতটাই ভয় পেয়েছে, পা ছেড়ে দেয়ার কথাও ভুলে গেছে। বাচ্চাটার এত কাছে গেল কি করে? ধরল কি করে?

ইচ্ছে করলেই ঘুরে হাতে কামড়ে দিতে পারে বাচ্চাটা। সেটা কেন করছে না তা-ও বুঝলাম না। হয়তো আরলিসের মতই ভয়ে মাথা খারাপ হয়ে গেছে ওটারও, চিন্তা করার শক্তি নেইI

বাচ্চাটাকে নিয়ে মাথাব্যথা নেই আমার, ভাবনা হলো তার মাকে নিয়ে। বাচ্চার চিৎকার শুনে ওটাকে বাঁচাতে ছুটে এসেছে ঝোপঝাড় ভেঙে। বার্ডসং ক্রীকের অন্য পাশে দেখতে পেলাম তাকে। ভীষণ রাগে গর্জন করছে। নামতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। বাচ্চা বাঁচাতে আরলিসকে খুন করতেও দ্বিধা করবে না।

আমার কাছ থেকে অনেকটাই দূরে। সময় মত পৌঁছতে পারব না ওখানে।

আরলিসের চিৎকার শুনে আম্মাও ছুটে এসেছে। ঝর্নার দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে বলছে বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিতে। কিন্তু ছাড়ছে না আরলিস। পা চেপে ধরে রেখে সমানে চেঁচিয়ে চলেছে।

ক্রীকের পানিতে নেমে পড়েছে মা ভালুক। অল্প পানি ওখানটায়। লাফাতে লাফাতে পানি ভেঙে ছুটছে। পানি ছিটকে উঠছে, রোদ চমকাচ্ছে তাতে। রাগে রোম দাঁড়িয়ে গেছে ভালুকটার। বিকট হাঁয়ের ভেতরে দেখা যাচ্ছে হলদেটে ভয়ানক দাঁত। গিরিখাতের সবখানে ছড়িয়ে যাচ্ছে তার গর্জনের শব্দ। যত জোরেই ছুটুক না কেন আম্মা, যত জোরেই ছুটি না কেন আমি, ভালুকটার আগে কিছুতেই পৌঁছতে পারব না আরলিসের কাছে।

তাই বলে বসে রইলাম না। মরিয়া হয়ে ছুটছি। আরলিসের কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝে দিশেহারা হয়ে গেলাম। ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা দেখতে চাই না। চোখ বুজে ফেলতে চাইলাম, বন্ধ হলো না পাতা। চিৎকার করতে চাইলাম, স্বর বেরোল না।

ভালুকটা আরলিসের অনেক কাছে চলে গেছে। আর কোন আশাই নেই। এই সময় ঝোপের ভেতর থেকে ছুটে বেরোল সে। তীব্র গতিতে একটা হলুদ ঝিলিকের মত ছুটে গেল ভালুকটার দিকে।

বিশাল সেই ইয়েলার কুকুরটা। পাগল হয়ে গেছে যেন, ঘেউ ঘেউ করে কান ঝালাপালা করছে। কুকুর হিসেবে যত বড়ই হোক, আকারে ভালুকের তিন ভাগের এক ভাগও নয় সে, তবু দুর্দান্ত সাহস। একপাশ থেকে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিকই কাত করে ফেলে দিল জানোয়ারটাকে। জাপটে ধরল একে অন্যকে। ভীষণ গর্জন করতে করতে গড়িয়ে নেমে যেতে শুরু করল ঢাল বেয়ে।

ওদুটোর পাশ দিয়ে ছুটে পার হওয়ার সময় দেখলাম, মানুষের মত দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে ভালুকটা। ধারাল বাঁকা নখ দিয়ে থাবা মেরে গলা কামড়ে ঝুলে থাকা কুকুরটাকে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। কি ঘটল, দেখার জন্যে দাঁড়ালাম না। একছুটে গিয়ে টান দিয়ে ভালুকের বাচ্চার পা থেকে আরলিসের আঙুলগুলো ছুটিয়ে দিলাম। হাতের কব্জি ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে তুলে আনলাম পানি থেকে। গমের বস্তার মত প্রায় ছুঁড়ে ফেললাম আম্মার দিকে। চেঁচিয়ে বললাম, আম্মা, পালাও! নিয়ে যাও ওকে! বলেই চরকির মতো পাক খেয়ে ঘুরলাম ভালুকটার দিকে। কুড়ালটা তুলে নিলাম কোপ মারার ভঙ্গিতে। প্রথম চোটেই বসিয়ে দেব মাথায়।

তবে মারার সুযোগ হলো না আমার। প্রয়োজনই পড়ল না। ভালুকটাকে আমার কাছেই ঘেঁষতে দিল না ওল্ড ইয়েলার। ওটার সঙ্গে পারবে না সে, ভাল করেই জানে। তবু পিছিয়ে আসছে না।

দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে শাই শাই থাবা চালাচ্ছে ভালুকটা। যতবারই নাগালে পাচ্ছে, থাপ্পড় মেরে ফেলে দিচ্ছে কুকুরটাকে। ভাবছি, এই শেষ, আর উঠতে পারবে না ইয়েলার, কিন্তু ঠিকই উঠে দাঁড়াচ্ছে সে। মার খেয়ে বিকট চিৎকার করছে, চেঁচিয়ে গিরিখাত মাথায় করছে, পড়েও যাচ্ছে বার বার, কিন্তু হার স্বীকার করছে না। গড়ান দিয়েই উঠে দাঁড়াচ্ছে আবার।

কুড়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছি। কতক্ষণ কাটল বলতে পারব না, হঠাৎ ঘরের দিক থেকে শোনা গেল আম্মার চিৎকার, ট্র্যাভিস, পালিয়ে আয়! ওখানে থাকিসনে, জলদি পালিয়ে আয়!

চমকে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম যেন। মনে হচ্ছিল, ভালুকটার সঙ্গে লড়াই করা ছাড়া গত্যন্তর নেই আমার, পালানোর কথা মাথায়ই ঢোকেনি এতক্ষণ, এইবার ঢুকল। ঢুকতে আতঙ্ক এসে চেপে ধরল। একটা মুহূর্ত দেরি করলাম না। ঘুরেই দিলাম দৌড়।

কিন্তু এবারেও দৌড়ের পাল্লায় হেরে গেলাম ইয়েলারটার সঙ্গে। যেই দেখল আমরা সব নিরাপদ জায়গায় সরে গেছি, সে-ও আর দেরি করল না। পালিয়ে এল।

ঘরের কাছে এসে দেখলাম, আমার আগেই এসে বসে আছে সে। আম্মা বলল, পিছে পিছে কিছুদূর তেড়ে এসেছিল ভালুকটা। কুকুরটাকে ধরতে পারবে না বুঝে ফিরে গেছে।

মারাত্মক বিপদ থেকে বেঁচে এসেছে ইয়েলার। কিন্তু ভয়ের কোন লক্ষণই নেই ওর মধ্যে। একেবারে স্বাভাবিক। চেঁচানো থেমেছে আরলিসের। থরথর করে কাঁপছে এখনও। আঁকড়ে ধরে রেখেছে আম্মাকে। ঘরের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে পড়েছে আম্মা। আরলিসকে জড়িয়ে ধরে নীরবে কাঁদছে। তার এই কান্না যেন আর জীবনে থামবে না। আমারও চোখে পানি এসে যাচ্ছিল, অনেক কষ্টে ঠেকালাম।

খুব খুশি ইয়েলার। ঘরে ঢুকে লাফালাফি জুড়ে দিল। তখন চেঁচিয়ে গিরিখাত মাথায় করেছিল, এখন করল ঘর। কানে তালা লাগিয়ে দেয়ার জোগাড় করল। যাকেই সামনে পেল তারই মুখ চেটে দিল।

ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ওরকম লড়াই সে হরহামেশাই করে। এসব কিছুই না তার জন্যে। তুড়ি মেরে চিত করে দিতে পারে যে কোনও ভালুককে।

<

Super User