জেলে ফিরল ক্লিফ ফ্যারেল। সময় গড়িয়ে চলল মন্থর গতিতে। দুপুর হলো। বিশ্রাম নিতে বেরিয়ে গেল শেরিফ জেস স্টোন। বাইরে কড়া রোদ, জেলের ভেতর একাকী ঘামছে ফ্যারেল।
ডেস্কে পা তুলে দিয়ে শেরিফের চেয়ারে বসে রয়েছে ও, ভারি হয়ে আসছে চোখের পাতা। কীভাবে যেন একটা মাছি ঢুকে পড়েছে ঘরে, খুব জ্বালাতন করছে, তন্দ্রা টুটে যাচ্ছে বারবার।
কিছুক্ষণ পর পর চেঁচিয়ে এটা ওটা চাইছে ক রেগান। না শোনার ভান করছে ক্লিফ।
গ্ৰে বাট এখন শান্তি, কিন্তু ফ্যারেল জানে, এই শান্তি বিপদের পূর্বাভাস মাত্র। চেয়ার ছেড়ে জানালার দিকে এগিয়ে গেল ও, বাইরে তাকাল। স্যালুন দুটোর সামনে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি লোকের আনাগোনা, এছাড়া পথঘাট মোটামুটি অন্যান্য দিনের মতো। তবু মনে হচ্ছে কোথাও একটা অস্বাভাবিকতা রয়েছেজেলের সামনে দিয়ে যাবার সময় বাঁকা চোখে এদিকে চাইছে সবাই,ক্রমশ খেপে উঠেছে ওরা…দিনের আলোয় অবশ্য অঘটন ঘটার আশঙ্কা নেই, রাতের অপেক্ষায় থাকবে জনতাআঁধারে পরিচয় গোপন করা সহজ।
ঘুরে গানরাকের সামনে এসে দাঁড়াল ক্লিফ। একটা ডাবল ব্যারেল্ড শটগান বের করল, কাল রাতে এটা দিয়েই দরজা ফুটো করেছে। আজও প্রয়োজন হতে পারে।
শটগান ভয় পায় না এমন লোক বিরল। স্বল্প দূরত্বে এটার ক্ষমতা ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে বড় কথা শটগানের গুলি সাধারণত ফস্কায় না।
কিন্তু আসামীর প্রাণ রক্ষা করার জন্যে ও কি পারবে শহরবাসীর ওপর গুলি চালাতে?-সময়েই এ-প্রশ্নের জবাব মিলবে। কিন্তু সঠিক সময় চিনে নিতে আবার ভুল হয়ে যাবে না তো?
গ্রে বাট-এর পেছনে পশ্চিমে ডুব দিল সূর্য। অন্ধকারের সাথে ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা নেমে এল শহরের বুকে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ফিরে এল স্টোন। দরজা খুলে দিল ক্লিফ ভেতরে ঢুকে ঠেলে কপালের ওপর থেকে টুপি পেছনে সরিয়ে শার্টের হাতায় মুখের ঘাম মুছে শেরিফ বলল, তুমি খেয়ে এসে গে, যাও।
আচ্ছা। শিগগিরই ফিরে আসব।
তাড়াহুড়োর কিছু নেই। বিপদের কোনও আশঙ্কা নেই এই মুহূর্তে।
তীক্ষ্ণ চোখে শেরিফকে জরিফ করল ক্লিফ। স্বাভাবিক চেহারা, উত্তেজনার লেশমাত্র নেই। জেল থেকে বাইরে এসে দরজা ভিড়িয়ে দিল ফ্যারেল। ভেতর থেকে হুড়কো লাগানোর আওয়াজ পাওয়া গেল না।
একটু ইতস্তত করল ক্লিফ, তারপর পা বাড়াল সামনে। চিন্তা নেই, হুড়কো লাগাতে স্টোনের ভুল হবে না।
এতক্ষণ জেলের ভেতর গুমোট পরিবেশে থাকার পর বাইরে আসায় বেশ ভালো লাগছে। শীতল হাওয়ার ছোঁয়া লাগছে গায়ে, হাঁটতে হাঁটতে হোটেলের দিকে এগোল ফ্যারেল।
হোটেলে পৌঁছে জন ক্যাশকে সাপারের ফরমাশ দিয়ে জানালার কাছে একটা টেবিল বেছে নিয়ে বসল ও, তাকাল বাইরে। চারদিক থমথমে। এই মুহূর্তে দুই স্যালুনের সামনে মহা হট্টগোল হওয়ার কথা, বেহেড মাতাল হয়ে জেলের সামনে লোকে ভিড় করলেই স্বাভাবিক দেখাত।
অস্বস্তিকর একটা অনুভুতি ঘেঁকে ধরল ক্লিফকে।
ট্রে-তে করে খাবার নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল জুলি ক্যাশ। ক্লিফের ভাবনায় ছেদ পড়ল। বাঁকা চোখে ওর দিকে তাকাল জুলি, ভাবটা: এ-শহরে মেয়েরা বোধহয় আর নিরাপদে থাকতে পারবে না। খাবার রেখে চলে গেল। জুলি। করুণ হাসি হাসল ফ্যারেল। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলে একথা বুঝতে কারও কষ্ট হবার কথা নয়, গ্রেপ্তারের পর বিচারে দোষী সাব্যস্ত আসামীকে ফাঁসি দেয়াই ন্যায়সঙ্গত, তাকে লিঞ্চিং মবের হাতে তুলে দেয়া নয়। কিন্তু বর্তমান মুহূর্তে এই সহজ সত্যটা স্বীকার করবে না কেউ।
জানালা দিয়ে আবার বাইরে তাকাল ফ্যারেল। ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে অন্ধকার।
খাবার শেষ করে কফির কাপ তুলে নিল ও। দ্রুত কফি শেষ করে ঝট করে উঠে দাঁড়াল, টেবিলের ওপর একটা মুদ্রা রেখে তুরিৎ পদক্ষেপে হোটেল থেকে বেরিয়ে এল। প্রয়োজনে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাবাজ্যাকব ফ্যারেল শহরবাসীদের আদর্শ; আপোসহীন নিষ্ঠুর আইনের প্রতীক।
গত কয়েক বছর ধরে হতাশার সীমাহীন সাগরে ডুবে থাকলেও, এখনও সবার মনে আছে স্পষ্ট, জেল ডাঙার বিরুদ্ধে অতীতে এই লোক প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
কেন যেন ক্লিফের মনে হচ্ছে, স্টোনের একার পক্ষে এখন আর পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে না। তা ছাড়া ওর চালচলনও সুবিধের ঠেকছে না, অচিরেই হয়তো রণেভঙ্গ দেবে সে। কিন্তু তিনজন একাট্টা হতে পারলে বাবা সাহায্য করলে হয়তো জেলখানার ওপর হামলা এলে ঠেকাতে পারবে ওরা।
হনহন করে প্রাক্তন শেরিফের বাড়ির দিকে এগোল ক্লিফ। কী ভেবে পেছনে তাকাল কয়েকবার। কেউ নেই কোথাও। খামোকা উত্তেজিত হচ্ছে, ভাবল ও!
বাবার বাড়ি থেকে আধ ব্লক দুরে পৌঁছুতেই আচমকা রাস্তার দুপাশ থেকে তিনজন লোক সামনে এসে দাঁড়াল। বুকটা ধক করে উঠল ফ্যারেলের ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাল ধীর কদমে এগিয়ে আসছে আরও চারজন।
হঠাৎ বুঝতে পারল ক্লিফ, ওর আশঙ্কা অমূলক ছিল না। জেলের বাইরে পা রাখার পর থেকেই ওর ওপর নজর রাখা হয়েছে। এদিকে না এলে হোটেল আর জেলহাউসের মাঝামাঝি কোথাও আক্রমণের মুখে পড়তে হত।
ওর জন্যেই শহরবাসীরা এখন ল্যুক রেগানকে ছিনিয়ে নিতে পারে নি। সুতরাং ওকে অক্ষম করে দেয়া গেলে রেগানকে জেল থেকে বের করে নেয়া পানির মতো সহজ হয়ে যাবে।
ঘাড় ফিরিয়ে আবার পেছনে দেখল, ফ্যারেল। ইচ্ছে করলে দৌড়ে পালাতে পারে ও জেল পর্যন্ত সবগুলো গলিপথ, সন্দেহ নেই, পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে ওরা; তবু ঝেড়ে দৌড় লাগালে পৌঁছুনো কঠিন হবে না।
কিন্তু পালাবে না ও। পালালে, এখনও যা আছে, সেই কর্তটুকুও হারাতে হবে।
চট করে ফুটপাথ-এ উঠে পড়ল ক্লিফ, দৃঢ় পদক্ষেপে সামনে এগোল। ওর দেখাদেখি সামনের তিনজনও ফুটপাথ-এ উঠল।
ঝড়ের গতিতে চিন্তা চলছে ক্লিফের মাথায়। এ মুহূর্তে বাবার সাহায্য আশা করা বৃথা, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও বাবা শুনবে না। পিস্তল বের করে ফাঁকা গুলি করা যেতে পারে, সেটাকেও মাতাল কাউহ্যান্ডের কাণ্ড বলে উড়িয়ে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পুরোপুরি।
স্টোনের কাছ থেকেও সাহায্য মিলবে না। জেলে পাহারা দিচ্ছে সে, শত কোলাহলেও বেরোবে না। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে রেগানকে হারাতে হবে।
কোমরে পিস্তল আছে, খাপমুক্ত করে এদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করা যায়। কিন্তু গুলি ছোঁড়া ওর পক্ষে সম্ভব হবে না; এবং এরা সেটা ভালো করেই জানে। আত্মরক্ষার তাগিদ ছাড়া মানুষ খুন করতে পারবে না ও।
এখন গজ পঞ্চাশেক দূরে আছে সামনের তিনজন। পেছনের চারজনও এগিয়ে আসছে দ্রুত।
থামল না ক্লিফ ফ্যারেল। দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলল। এখন থামলে দুর্বলতা প্রকাশ পাবে, মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে তাহলে। দিগুণ উৎসাহে ছুটে আসবে ওরা। সুতরাং এমন কিছু করা যাবে না যাতে মনে হয় ও ভয় পেয়েছে।
আরও কমে এল মাঝের দূরত্ব।
তিরিশ ফুট…
পঁচিশ ফুট…
এগিয়ে চলল ক্লিফ, স্থির দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে আছে।
সামনের একজন হঠাৎ নড়ে উঠল, পথ ছেড়ে দিচ্ছে বলে মনে হলো। কিন্তু সরল না ওরা।
পেছনে সমবেত ছুটন্ত পায়ের শব্দ, আসছে ওরা…
শালাকে মার! চিৎকার করে উঠল কে যেন, শুইয়ে দাও। তারপর বদমাশটাকে জেল থেকে বের করে ঝোলাও!
আর পাঁচ ফুট…পাঁচশো গজ হলেই কী! প্রাচীরের মতো পথ আগলে রেখেছে সামনের তিনজন।
সোজা গিয়ে ওদের ওপর পড়ল ক্লিফ ফ্যারেল। সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে ধাক্কা মারল একজন।
তাল হারিয়ে হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ল ক্লিফ, পড়তে পড়তে পিস্তল বের করে আনল হোলস্টার থেকে। ফুটপাথএ শায়িত অবস্থাতে আক্রমণকারীর মাথায় পিস্তল তাক করল।
ঘাবড়ে গিয়ে ওকে ছেড়ে দিল লোকটা। কিন্তু ওঠার সুযোগ পেল না ক্লিফ। বৃষ্টির মতো কিল, চড় আর লাথি পড়তে শুরু করেছে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। বুটের প্রচণ্ড আঘাতে মট করে পাঁজরের হাড় ভাঙার শব্দ হলো।
সবচেয়ে কাছের লোকটার পা আঁকড়ে ধরল ক্লিফ, শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে হ্যাচকা টান মারল। কাটা কলাগাছের মতো মুখ থুবড়ে পড়ল লোকটা। প্রাণপণ চেষ্টায় এই সুযোগে হাঁটু গেড়ে বসল ক্লিফ।
ডান হাতের কজিতে রিভলবারের ব্যারেলের বাড়ি লাগাল কেউ একজন। মুহূর্তে অসাড় হয়ে গেল হাতটা। খসে পড়ল হাতের পিস্তল। লাথি মেরে ওটা দূরে সরিয়ে দিল আরেকজন
নিরস্ত্র ক্লিফ ফ্যারেল, অসহায়। সাতজনের বিরুদ্ধে একা। তবু হার মানবে ও, প্রাণ গেলেও না।
আচমকা সামনে ঝাঁপ দিল ও সংঘর্ষ হলো প্রতিপক্ষের একজনের সঙ্গে। একসঙ্গে আছাড় খেলো ওরা। পরক্ষণে আরও একজনকে ধরাশায়ী করল, কনুইয়ের আঘাত হানল তার কণ্ঠনালীতে। হাঁ হয়ে গেল লোকটার মুখ, বাতাসের জন্যে হাঁসফাস শুরু করে দিল।
একলাফে ফাঁকায় বেরিয়ে এল ফ্যারেল, পড়তে পড়তে কোনওমতে সামলে নিল নিজেকে; তারপরই চরকির মতো ঘুরে মুখোমুখি হলো জনতার।
এখনও কেটে পড়া যায়। আর হয়তো বাধা দেবে না। প্রতিপক্ষের একজন জ্ঞান হারিয়েছে; জবাই করা মুরগীর মতো তড়পাচ্ছে আরেকজন, দুহাতে গলা চেপে ধরেছে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে প্রতিক্ষণে। খানিক দূরে সরে দাঁড়িয়েছে অন্য একজন, চেহারা বলছে চোট পেয়েছে সে।
হাঁপাচ্ছে ক্লিফ, হাপরের মতো অনবরত ওঠানামা করছে বুক। না, পালাবে না ও, শেষ দেখে ছাড়বে।
চারদিক থেকে ক্লিফের দিকে এগোতে শুরু করল অবশিষ্ট চারজন, সতর্ক ভঙ্গি। পিছোতে লাগল ফ্যারেল। বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। দেখছে কোনও দেয়াল আছে কিনা…
এগোচ্ছে চারজন, পিছিয়ে আসছে ক্লিফ। ওকে দিশেহারা করে দিতে চায় ওরা। ক্ষোভ হচ্ছে ক্লিফের। এরা ওর চেনা মানুষ, এই শহরেরই লোকঅথচ শত্রুর মতো আচরণ করছে।
শোনো! চাপা কণ্ঠে ফুসে উঠল ফ্যারেল, আমি বলছি সবাই ফিরে যাও! রেগানকে ঝোলাতে চাইছ, কিন্তু জানো তারপর তোমাদের অবস্থা কী হবে? দু-তিনদিন পর যখন রাগ কমে যাবে তখন বিবেককে বোঝাবে কী করে?
দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ল লোকগুলো সুযোগটা হাতছাড়া করল না ক্লিফ, ছুটে গিয়ে একটা দালানের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল।
তুমি একটা হারামজাদা, ফ্যারেল! ক্রুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল একজন। সোনি আমার বউ হলে!
ঘৃণায় কেঁপে উঠল ক্লিফের শরীর। বুঝতে পারছে যুক্তি-জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে এরা। এখন এদের বোঝানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। আর দেরি কেন? পাল্টা জবাব দিল ও, এসো যা করার করো!
অদ্ভুত এক উন্মাদনা জেগেছে জনতার মাঝেচেনা মানুষগুলো একেবারে বদলে গেছে। বিশ্বাস হতে চায় না। গলা পর্যন্ত মদ গিলে বেসামাল হয়ে গেছে, কিন্তু ওদের উন্মত্ততার কারণ মদ নয়, অন্ধ আক্রোশে জ্বলছে ওরা, খুনের নেশায় মেতেছে, তার ছাপই পড়েছে চেহারায়।
ধীর অথচ অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে আসছে চারজন। আর কয়েক ফুট। হঠাৎ ছুটে এসে ডান হাতে ক্লিফের দিকে ঘুসি ছুঁড়ল একজন, তারপর হাঁটু চালাল তলপেট লক্ষ্য করে। সাথে সাথে তার চোয়াল বরাবর সজোরে পাল্টা ঘুসি ঝাড়ল ক্লিফ। থপ করে শব্দ হলো। পরক্ষণে পেটে ঘুসি খেয়ে উবু হয়ে গেল লোকটা, লুটিয়ে পড়ল।
এবার অন্য তিনজন ঝাঁপিয়ে পড়ল ক্লিফের ওপর। ওদের পায়ের নীচে পড়ে চিড়ে চ্যাপটা হলো ধরাশায়ী লোকটা।
যা ভেবেছিল ক্লিফ, সংক্ষেপেই চুকে গেল ব্যাপারটা। ওর প্রতিটি ঘুসি লক্ষ্য ভেদ করলেও সামান্যতম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিতে ব্যর্থ হলো; কিন্তু প্রতিপক্ষ আঘাতে আঘাতে চেহারা পাল্টে দিল ওর। অসহনীয় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল ও নির্দয় প্রহারে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
এভাবে মার খেলে আর উঠতে হবে না, ভাবল ফ্যারেল।
বারান্দার পাটাতন থেকে এক টুকরো কাঠ ভেঙে নিল একজন। এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করল ওকে।
জীবনে এই প্রথম অদম্য ক্রোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল ক্লিফের। বুকে হেঁটে সরে যেতে চাইল ও, ওঠার চেষ্টা করল। মরার আগেই মরবে না, পাল্টা আঘাত হানবে।
কিন্তু কঠিন আর বেপরোয়া হলেও এক সময় সহ্যের শেষ সীমা ছাড়িয়ে গেল ফ্যারেলের। চোখের সামনে নিকষ কালো পর্দা নেমে এলো। ধূলিধূসর রাস্তায় পড়ে রইল এর জ্ঞানহীন দেহ।
অবশেষে মার থামাল লোকগুলো ঘোলাটে চোখে পরস্পরের দিকে তাকাল, তারপর ঘুরে ক্লান্ত দেহে হাঁটতে শুরু করল। উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, এখন আর ওদের বাধা দিতে পারবে না। ফ্যারেল-ধীরে সুস্থে রেগানকে লটকে দেয়া যাবে।
নিসঙ্গ অচেতন ফ্যারেল পড়ে রইল।
অন্ধকার আরও গাঢ় হলো।
.
প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে জ্ঞান ফিরল ক্লিফের। যেন জাগানোর চেষ্টা করছে ওকে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করছে। লোকটাকে চেনার চেষ্টা করল ও। কে? অবশেষে চিনতে পারল।
জ্যাকব ফ্যারেল, ওর বাবা! প্রয়োজনের মুহূর্তে ঠিক এগিয়ে এসেছে। চারদিকে রাতের অন্ধকার, তবু বাবাকে চিনতে পারছে ও।
শুয়োরের বাচ্চারা! ক্ষোভের সঙ্গে বলল প্রাক্তন শেরিফ, সব কটাকে ধরে ফাঁসি দেওয়া উচিত! দেখি, ক্লিফ আমার ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াও। ঘরে চলো, হাত মুখ ধোও; তারপর একসঙ্গে জেলে ফিরব আমরা, শহরের লোকেরা কী করতে পারে দেখব!
বাবার সাহায্যে উঠে দাঁড়াল ফ্যারেল। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা, হাঁপাচ্ছে, জ্যাকব ফ্যারেলের কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোল। গজ পঞ্চাশেক এগিয়ে থমকে দাড়াল। আমার পিস্তল ফেলে এসেছি।
ঠিক আছে, নিয়ে আসছি। পিস্তল আনতে ফিরে গেল জ্যাকব ফারেল কোনওমতে, দাঁড়িয়ে রইল ক্লিফ একটু পরেই ফিরল জ্যাকব। মন্থর গতিতে আবার এগোল ওরা।
ঘরে ঢুকেই একটা চেয়ারে এলিয়ে পড়ল ক্লিফ আলমারি থেকে হুইস্কির বোতল বের করে এগিয়ে দিল বুড়ো ফ্যারেল। খানিকটা গলায় ঢালোলা, ভালো লাগবে!
বিনা আপত্তিতে নির্দেশ পালন করল ক্লিফ। জ্বলতে জ্বলতে গলা বেয়ে নীচে নেমে গেল তরল আগুন। মুহূর্তে,চাঙা বোধ করল ও। বোতলের হুইস্কি দিয়ে এক টুকরো কাপড় ভিজিয়ে ক্লিফের মুখ মুছে দিল জ্যাকব।
ক্ষতস্থানে হুইস্কি লাগতেই জ্বলে উঠল, তবে কিছুটা কমল যন্ত্রণা।
মুখ মোছা শেষ করে জ্যাকব ফারেল জানতে চাইল, হাড়টাড় ভাঙেনি তো?
পাঁজরের একটা হাড় বোধহয় ভেঙেছে! যাকগে, ও নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এখন জলদি চলো জেলে ফিরি সময় বায়ে যাচ্ছে!
উঠে দাঁড়াল ক্লিফ। দুলে উঠল পৃথিবী। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়ে এল। অসংলগ্ন পা ফেলে দরজার দিকে এগোল ও, ওকে অনুসরণ করল জ্যাকব।এখনও যদি রেগানকে কেড়ে না নিয়ে থাকে, বলল সে, আর পারবে না!
<