১০.
ইনলেটের মুখ-সোজা এবড়োখেবড়ো স্তম্ভটার দুশো গজের মধ্যে পৌঁছে প্রথমবার মাথা তুলল মাসুদ রানা। কবৃজিতে বাধা কম্পাসের লাবার লাইন আগে থেকে সেট করা ছিল বলে দিক ভুল হলো না। ঘুরে তাকাল। নাহ, তাড়া করে আসেনি কোন ফ্রগম্যান। ওয়াচ বোটও নেই। আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিশ্চিত হয়ে নিল ও, তারপর পুরো স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। এর মানে ওরা দেখেনি ওকে। নাকি দেখেছে?
ফাঁদে আটকা পড়া রক্তাক্ত রিক ক্লের কথা ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল রানার। ওরা কি মেরে ফেলেছে তাকে? নাকি জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে বাঁচিয়ে। রেখেছে? নির্যাতন করে কথা বের করার চেষ্টা করবে ওর মুখ থেকে? পরেরটাই মনে ধরল রানার। নিশ্চয়ই কমান্ডোরা জানতে চাইবে কেন সে গিয়েছিল ইনলেটে। হঠাৎ অন্য একটা সম্ভাবনার কথা খেয়াল হলো। ফ্রগম্যানরা যদি ওকে দেখে ফেলে থাকে, তাহলে হয়তো ছুটে আসতেও পারে। বলা যায় না। ব্যাটারা ওকে দেখেছে কি দেখেনি, জানে না রানা। কিন্তু তাই বলে সময় নষ্ট করার ঝুঁকিও নেয়া যাবে না। আগে সরে পড়তে হবে এখান থেকে, তারপর অন্য কথা।
সাঁতরাতে শুরু করল ও, মন জুড়ে আছে ইনলেট, বাংলার গৌরব, রিক ক্লে। জোর করে মন থেকে সব চিন্তা দূর করে দিল। চিন্তায় কাজ হবে না, এখন অ্যাকশন চাই। টিলায় পৌঁছল ও এক সময়, বয়ালি ট্যাঙ্ক খালি করে দুই জেট রেইডার ওপরে তুলল। একটার সাথে অন্যটা বেঁধে ফিরে চলল। সওয়ারীবিহীন হালকা দ্বিতীয় স্কুটার নিজের স্কি-শুর ওপর নাচতে নাচতে এগোল দড়ির টান খেয়ে।
ওর জানার উপায় নেই ওই সময়ই হরমুজ প্রণালীতে নাক ঢুকিয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় এক জাহাজ। অপারেশন যেনেক টীমের মাদারশিপ ওটা। কমান্ডশিপ। দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে মুসানডেম পেনিনসুলার দক্ষিণ ফিওর্ডের দিকে বারো সদস্যের আরেক স্ট্যান্ডবাই কমান্ডো টীম আছে ওটায়।
.
বাংলার গৌরব। ক্রুজ মেস।
এককোণে গাদাগাদি করে বসে আছে সমস্ত স্টাফ। ক্যাপ্টেন ইউমেন্ডিসও আছে ওদের মধ্যে। সবার চেহারায় আতঙ্ক। কি
রূমের আরেক মাথায় পড়ে আছে ত্রিপলঢাকা একটা নিথর দেহ-মাসুদ রানার, হার্পন গানের শিকার। নিচে থেকে ছোঁড়া ডার্ট কোনাকুনি চোখ ভেদ করে মস্তিষ্কে ঢুকে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে লোকটা।
ওটার একটু দুরে বাল্কহেডে হেলান দিয়ে বসা রিক ক্লে। পরনে শুধু একটা স্পোর্টস শর্টস। বা পাজরে ব্যান্ডেজ বাধা। চেহারা ফ্যাকাসে। ভেতরে ওষুধের। কড়া গন্ধ ভাসছে। ইয়েহোনাথান নেতানিয়াহু হাঁটু গেড়ে বসে আছে তার সামনে। নির্বিকার চেহারা। চাউনি ক্লের মুখের ওপর স্থির।
আরেকবার বলো, মৃদু কণ্ঠে বলল সে।
বিরক্তিতে চেহারা কুঁচকে উঠল ডাইভারের। আর কতবার বলব এক কথা? ঝাঁঝিয়ে উঠল।
যতক্ষণ না আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি, বন্ধু, ততবার, ক্রুর হাসি ফুটল তার চৌকো মুখে। এবং নতুন কিছু বলো। ওমান আর আমিরাতের হয়ে সাগরে। তেলের খনি খুঁজে বেড়াচ্ছ ভাল কথা, কিন্তু রাতে কেন?
শিডিউলড টাইম ফুরিয়ে আসছে, তাই। এখন দিন-রাত দেখার সময় নেই, চব্বিশ ঘণ্টাই কাজ করছি আমরা।
হুম! তোমার সঙ্গীর নাম কি যেন বললে?
টোকিও। টোকিও জো।
তোমার পার্টনার? ঝুঁকে এল নেতানিয়াহু।
হ্যাঁ।
পালিয়ে গেল কেন সে? যদি..
হাসতে গিয়ে চেহারা বিকৃত করে ফেলল সে পাঁজরে ব্যথার তীক্ষ্ণ খোঁচা খেয়ে। ভাল প্রশ্ন করেছ। ডাকাত পড়ল তাতে দোষ হলো না, দোষ হলো ওর পালিয়ে যাওয়ায় একটু থেমে থেকে বলল, তোমরা কারা জানতে পারি? এখানে কি হচ্ছে এসব? এই জাহাজ থেমে গেল লোকটাকে হাসতে দেখে।
তা তোমার না জানলেও চলবে। তুমি তাহলে ওমানী সিটিজেন?
বিশ্বাস না হলে মিনা কাবুজে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারো। নাম বললে মাসকাটের সবাই চিনবে আমাকে।
চিন্তিত চেহারায় লাশটার দিকে তাকাল কর্নেল ইয়োন্নি। ক্লের কথা ভুলেও বিশ্বাস করার কথা ভাবছে না সে। ভাবছে অন্য কিছু। শঙ্কা জাগছে মনে। কদিন আগে যাহাল যে সতর্কবাণী পাঠিয়েছে, সেটার কথা ভাবছে। জেরুজালেমের আশঙ্কাই কি সত্যি হতে যাচ্ছে?
কি করবে এখন সে সমস্যা নিয়ে যে কারও সাথে কথা বলবে, সে পথ নেই। ওয়ানওয়ে কমিউনিকেশন সিস্টেম মেনে চলতে হচ্ছে তাকে কঠোরভাবে। কথা বলা যাবে না, টোটাল রেডিও সাইলেন্স, মাদারশিপের সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় থাকলেও নির্দেশ নেই। তিল পরিমাণ ঝুঁকিও নেয়া চলবে না। যা করার নিজেকে করতে হবে তাকে। ওদিকে পৌঁছতেও যথেষ্ট সময় নিয়েছে মাদারশিপ। প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা দেরি করে ফেলেছে।
নইলে এতক্ষণে সব অস্ত্র ওটায় তুলে ওরা সটকে পড়ত, কোন সমস্যা। টিকিও ছুঁতে পারত না যেনেক টীমের অবশ্য সেটা মাদারশিপের দোষ নয়, নিয়মিত রুটে যদি আসত বাংলার গৌরব, এর কিছুই ঘটত না। যা হোক, সব ভাল যার শেষ ভাল।
অবশেষে পৌঁছেছে মাদারশিপ ইরগুন লিউমি। রাডারে ওটার অবস্থান পরিষ্কার। আর মাত্র দুশো মাইল। ইয়োনি আশা করছে আগামীকাল রাতে এখানে পৌঁছবে ওটা। তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যাবে। কিন্তু এই লোকটার। কথা যদি সত্যিই হয়, যদি ওর বন্ধু টোকিও ফিরে গিয়ে ঘটনার কথা কর্তৃপক্ষকে জানায়, তাহলে নতুন ফ্যাকড়া বাধতে পারে। যদি নতুন কোন সমস্যা… রিক ক্লে ওরফে চায়না ক্লের দিকে মন দিল সে। সত্যি কথাটা বের করতে হবে এর মুখ থেকে। অনেক খোশগল্প হলো, এবার অন্যভাবে চেষ্টা করতে হবে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে।
পুব আকাশে সবে আলোর আভাস ফুটতে শুরু করেছে তখন। মিস্টার ক্লে, তুমি ব্রিটিশ আর্মিতে ছিলে। নিশ্চয়ই জানো কথা আদায় করার অনেক রকম টেকনিক আছে? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তুমি কি নিজের থেকে মুখ খুলবে, সত্যি কথাটা বলবে, নাকি আমাকে বের করে নিতে হবে?
গলা শুকিয়ে উঠল ডাইভারের, কিন্তু সাহস ধরে রাখল জোর করে। তোমার যদি অকাজে নষ্ট করার মত সময় হাতে থাকে, তাহলে চেষ্টা করে। দেখতে পারো। কিন্তু আমার নতুন কিছু বলার নেই।
.
নিজের কিংসের মুখোশের মধ্যে ঢুকে বসে আছে সার্জেন্ট দারভিশ হামাম। দুচোখ মাসুদ রানার মুখের ওপর স্থির। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে একনাগাড়ে। বলে যাচ্ছে ও। টোকিও, আতাসী ও জামাল শামলু, সবার নজর আঠার মত সেটে আছে তার ওপর। মানুষটার অদ্ভুত, অপূর্ব সমর কৌশল শুনে তাক লেগে গেছে প্রত্যেকের।
দারভিশ এখন বুঝতে পারছে কি আছে মেজরের মধ্যে, কেন মাসুদ রানা। বলতে লেফটেন্যান্ট আতাসী অজ্ঞান। পরিকল্পনার সবই আগে থেকে মাথায় ছিল মেজরের, কাউকে কিছু বলেনি। এখন দেখা যাচ্ছে প্রয়োজনীয় সবকিছুই। হাতের কাছে মজুত, কিছুই কিনতে বাদ রাখেনি সে।
রানার পায়ের কাছের বড় পেইন্টের টিন দুটো দেখল দারভিশ, তারপর জামাল শামলুকে। ছেলেটাকে চেনাই যায় না এখন। একেই এতদিন সে ট্রেনিং দিয়েছে বিশ্বাস হতে চায় না। এ সেই মেয়েলী চেহারার যুবক, মনেই হয় না। আস্ত একটা খুনীর মত দেখাচ্ছে ওকে। ভেতরের ধিকি ধিকি আগুন। চোখ দিয়ে ফুটে বের হচ্ছে যেন।
বুঝতে পেরেছ সবাই? বলা শেষ হতে প্রশ্ন করল রানা তীক্ষ্ণ, ব্যাটল ফিল্ড কমান্ডের সুরে।
ইয়েস, স্যার, বসু! আতাসী বলল। গম্ভীর।
সার্জেন্ট?
খাড়া হয়ে গেল সে। ক্র্যাকারের মত বিস্ফোরিত হলো। ইয়েসস্যার।
ঝট করে যুবকের দিকে ফিরল রানা। জামাল?
বুঝেছি, মেজর! স্যার!
কারও কোন প্রশ্ন আছে?
একটা প্রশ্ন, বস, আতাসী বলল। কাজ সেরে ওপরেই বসে থাকব আমরা, না নেমে আসব?
একজন থাকবে। সবার সেদ্ধ হওয়ার কোন দরকার নেই। কে থাকবে লেফটেন্যান্ট ঠিক করবে। যেই থাকবে, ছায়া খুঁজে নিয়ো। নইলে ভিশনের। রিফ্লেকশন ওদের চোখে পড়ে যেতে পারে। মাস্ট বি ভেরি ভেরি কেয়ারফুল।
শিওর।
নাউ মুভ।
বাইরে আলোর আভাস সবে ফুটতে শুরু করেছে। গালফ পার্লের স্টারবোর্ড ডেভিট থেকে ধীরে ধীরে পানিতে নামানো হলো খুদে সাবমেরিন পিসি ১২০২। রিক ক্লে ওটার নাম রেখেছে মবি। আবছা আলোতেও চকচক করে উঠল ওটার উজ্জ্বল হলুদ খোল। জিনিসটার নাক ভোতা। নাকই মবির ফরওয়ার্ড অবজার্ভেশন উইন্ডো। তার একটু পিছনে, সাবমেরিনের মত কনিং টাওয়ার।
যা যা প্রয়োজন সব তুলে ফেলা হলো ঝটপট। তারপর হ্যাঁচু দিয়ে প্রথমে ঢুকল জামাল ও দারভিশ। ফিউযিলাজের পিছনের ডিএলও বা ডাইভারস লুক। আউট সীটে বসল ওরা, হাঁটু প্রায় বুকের সাথে ঠেকিয়ে। স্টীলের সিলিং নিচু বলে সীটও নিচু, তাই এরচেয়ে আরাম করে বসার উপায় নেই। ওদের দুদিকে দুটো অ্যাক্রিলিক প্লাস্টিকের ভিউপোর্ট, বাইরের সবই স্পষ্ট দেখা যায় ওখান দিয়ে।
আতাসী উঠল এবার। গোল কনিং টাওয়ার বরাবর নিচে, আরেক ভিউপোর্টের পিছনে বসল ট্যাঙ্ক কমান্ডারের মত। ফিউজিলাজের নিচে, বাইরে, স্টেইনলেস স্টীলের ব্র্যাকেটে ঝুলছে সমান্তরাল দুই ব্যাটারি পড। ও দুটোর জন্যে আজর কোন পোকার মত দেখাচ্ছে মবিকে।
করাচীতে এ জিনিস ড্রাইভ করার সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং নেয়া ছিল আতাসীর, তাই রেডিও. মডেল কন্ট্রোল সেটের মত খুদে কনসোল চেক করে নিতে বিশেষ সমস্যা হলো না। ডান হাঁটুর কাছের ভাটিকাল ও হরাইজন্টাল থ্রাস্টার। চেক করল সে, রানাকে সঙ্কেত দিল উঠে দাঁড়িয়ে। বাধন খুলে দাও, বস।
লাইন খুলে ফেলল ও। আবার বসে পড়ল লেফটেন্যান্ট। চেহারায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। সাগরকে এখন আর ভয় পাচ্ছে না বেদুইন। হাত তুলে ওপরের হ্যাঁচ বন্ধ করে কনসোলের পাওয়ার সুইচে চাপ দিল। অদ্ভুত চেহারার হলুদ সাবমেরিন গুঞ্জন তুলে স্টার্ট নিল, কাঁপছে অল্প অল্প।
রিভার্স দিয়ে বোট থেকে সরে এল আতাসী, ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক খুলে দিল। তলিয়ে যেতে শুরু করল মবি। ডুবে যাওয়ার আগমুহর্তে গানওয়েলে দাঁড়ানো উদ্বিগ্ন রানাকে পলকের দশ ভাগের একভাগ সময়ের জন্যে দেখতে পেল লেফটেন্যান্ট, পরক্ষণে উপসাগরের পানি ঢেকে দিল তার ভিউপোর্ট। তলিয়ে যেতে থাকল মবি।
ওটা অদৃশ্য হয়ে যেতে ঘুরল মাসুদ রানা, মাথা ঝাঁকাল টোকিওর উদ্দেশে। লেটস গো।
সগর্জনে স্টার্ট নিল গালফ পার্ল, অনেকটা জায়গা জুড়ে বাক নিয়ে উল্টোদিকে, রাস সারকানের দিকে ছুটল। বাঁক ঘোরা শেষ হওয়ার আগে কাঁধের ওপর দিয়ে দূরের ইনলেটের দিকে তাকাল রানা। শক্ত হয়ে উঠল চোয়াল। চারদিক মোটামুটি ফরসা হয়ে উঠেছে তখন। হুইলহাউসে ঢুকে টোকিওকে ফুল স্পীড অ্যাহেড নির্দেশ দিল ও। পানিতে তুমুল আলোড়ন তুলে সর্বোচ্চ বিশ নট গতিতে ছুটল গালফ পার্ল।
এদিকে ত্রিশ ফ্যাদম নেমে থামল আতাসী, ব্যালাস্ট সেট করে ফরওয়ার্ড থ্রাস্ট স্টিক কাছে টানল। আওয়াজ পাল্টে গেল মবির, এ ছাড়া অন্য কোন পরিবর্তন চোখে পড়ল না তখনই। পড়ল একটু পর, ভিউ পোর্টের ওপাশে। প্ল্যাঙ্কটনের উল্টোমুখী স্রোত দেখে বোঝা গেল এগোচ্ছে সাবমেরিন।
কোন সমস্যা, সার্জেন্ট? প্রশ্ন করল আতাসী।
না, স্যার। পাশে তাকিয়ে জামালকে ঘামতে দেখল দারভিশ। কি ব্যাপার, কি হয়েছে?
আমি–আমি সাঁতার জানি না, ফ্যাসফেঁসে গলায় বলল সে। খুব ভয়। করছে আমার।
কাম অন, বয়। ছেলেমানুষের মত কথা বোলো না, ধমকে উঠল। দারভিশ। সাঁতার কাটতে যাচ্ছ না তুমি, যাচ্ছ লড়াই করতে।
আতাসী শব্দ করে হাসল। সার্জেন্ট, আমিও কিন্তু সাঁতার জানি না, এবং ভয় আমারও করছে খুব। বোধহয় ওরচেয়ে বেশি।
মৃদু হাসল দারভিশ, ভিউপোর্ট দিয়ে বাইরে তাকাল। ওদিকে আতাসীর পুরো একটা ঘণ্টা কাটল সোনার, ডেপথ গজ, এয়ার, মিক্স ইত্যাদির ওপর কড়া। নজর রেখে। এমন সমস্ত জিনিস, একটাও সামান্য এদিক-ওদিক করলে পরিণাম হবে ভয়ঙ্কর। মৃদু টিক টিক আওয়াজটা শুরু হতে মনে হলো জীবন বুঝি ধন্য হলো। ওয়েসমার সোনার লোকেটর ওটা, সামনে কঠিন বাধা টের পেয়ে সঙ্কেত দিতে শুরু করেছে।
আওয়াজটা বাড়ছে ক্রমে। টিক টিক দ্রুততর হচ্ছে। রাডার স্ক্যানে বিশাল একটা ছায়া ফুটছে-ইনলেট ঘিরে থাকা পাথুরে জেবেল ওটা। চকিতে কবজিতে বাধা কম্পাসে চোখ বুলিয়ে নিল আতাসী, ঠিকই আছে। রানা সেট করে দিয়েছে, কাজেই দিক ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ছায়া আরও বড় হলো, পুরো স্ক্যানার ঢেকে ফেলল। থ্রাস্ট সামনে ঠেলে গতি একদম কমিয়ে দিল। আতাসী, ব্যালাস্ট থেকে অনেকটা পানি রিলিজ করে পনেরো ফুটে উঠে এল, তারপর পাঁচ ফুটে।
ভিউপোর্ট দিয়ে বেশ আলো ঢুকছে ভেতরে, তার মানে সূর্য উঠেছে। পিঁপড়ের গতিতে এগোল পিসি, আতাসীর নজর সেঁটে আছে ভিউপোর্টের ওপাশে। ধাক্কা লাগার আগে দেয়ালের দেখা পেতে চায়। দশ মিনিট পর দেখা মিলল, সঙ্গে সঙ্গে গ্রাস্ট স্টিক পুরো সামনে ঠেলে দিল সে, প্রায় জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল ওটা।
এবার তোমার ওস্তাদীর পালা, সার্জেন্ট। অঘাটে ভিড়িয়ে থাকলে ঘাটে টেনে নিয়ে চলো আমাদের।
নীরবে কাজে লেগে পড়ল দারভিশ। অল্প জায়গায় যথেষ্ট কসরত করে। এয়ারসাপ্লাই ট্যাঙ্ক-পাইপসহ হার্নেস পরল। কোমরে ওয়েটবেল্ট। এরপর পরল মাস্ক, মাউথপীস লাগিয়ে এয়ারসাপ্লাই ঠিক আছে কি না দেখে নিল। বেল্টের খাপে ঢোকাল গার্বার। একটা ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ বা বগলের নিচে ঝোলাল। ফিতে ঘুরিয়ে ওপাশের কাঁধে রেখে, তারপর নাইলনের দড়ির ছোটখাট একটা কয়েল তুলে নিল। চললাম।
জবাবের আশায় না থেকে ডিএলও কম্পার্টমেন্টে চলে এল সে। পিছনে কানেকটিং হ্যাঁচ লাগিয়ে দিল আতাসী, অ্যাফট সেকশন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল অন্য অংশ থেকে। ঝুঁকে লোয়ার হ্যাঁচ খোলার জন্যে তৈরি হলো সার্জেন্ট, ওদিকে আতাসী এয়ার প্রেশারের সুইচ টিপে দিল। এয়ার পকেট কম্পার্টমেন্টে বাতাসের অসহ্য হিশশ শব্দে কানে হাত চাপা দিতে বাধ্য হলো দারভিশ। প্রেশার গজ থেকে চোখ তুলে ওকে সঙ্কেত দিল লেফটেন্যান্ট, পা দিয়ে জোরে হ্যাঁচে চাপ দিল দারভিশ, নিচের পানির বাধা অগ্রাহ্য করে খুলে গেল ওটা, কিন্তু এয়ার প্রেশারের জন্যে এক ফোঁটা পানিও ঢোকার সুযোগ পেল না। একটা বুদ্বুদও উঠল না।
যেন কুয়োয় নামছে, এমনভাবে নেমে গেল দারভিশ। হ্যাঁচ ওপরে ঠেলে দিল, লেগে গেল ওটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে। বেরিয়ে এসে রশির একমাথা দিয়ে পিসির হুক মজবুত করে বাঁধল সার্জেন্ট, তারপর দড়ি ছাড়তে ছাড়তে তীরের দিকে এগোল। বিশ গজমত যেতে পায়ে শক্ত পাথরের ছোঁয়া পেতে দাঁড়িয়ে একটু দম নিল। আবার এগোল।
খাড়া উঠছে তীর, সে-ও উঠছে। আরও বিশ-পঁচিশ গজ এগোতে টের পেল সারফেস প্রায় মাথায় ঠেকেছে। ধীরে ধীরে পানির ওপর মাথা তুলল। সার্জেন্ট। সামনেই জেবেলের আকাশছোঁয়া গা, কম করেও তিনশো ফুট উঁচু হবে গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়ানো অসংখ্য ক্লিফ। ইনলেটের বাইরের দিক এটা। খুঁজে পেতে পছন্দসই একটা জায়গা বের করল সে। পাথরের বেশ বড় একটা অংশ শেলফের মত বেরিয়ে আছে সাগরের দিকে।
ঢুকে পড়ল ওটার তলায়। অনেক জায়গা, অনায়াসে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারবে পিসি। পানির গভীরতা আর সিলিঙের উচ্চতা অনুমান করে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলো দারভিশ, শক্ত পাথরে পা বাধিয়ে দড়ি টানতে শুরু করল। দশ মিনিট পর ওখানটায় মাথা তুলল খুদে সাবমেরিন। একদম শান্ত, নিরিবিলি জায়গা। ওপর থেকে তো নয়ই, সাগর থেকেও দেখে ফেলার কোন সম্ভাবনা। নেই। এ সূর্য এরমধ্যে বেশ খানিকটা উঠে পড়েছে, অসহ্য হয়ে উঠেছে গরম। খোলা জায়গার কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না, সব কাঁপছে। ব্যস্ত হয়ে পরের কাজের জন্যে তৈরি হলো ওরা। পেইন্টের টিন দুটো বিশেষ স্ট্র্যাপের সাহায্যে পিঠে ঝুলিয়ে নিল আতাসী ও দারভিশ। সবার পেটের কাছে বড় একটা থলে ঝুলছে। এতে আছে যার যার বুটাইল নাইলনের ম্যানহক অ্যাবসেইল হার্নেস। কমপ্লিট বিল্ট-ইন অ্যামুনিশন পাউচ ও ডিসেন্ট লিভার আছে তার সাথে। প্রয়োজনে এক হাতের সাহায্যে নামা যাবে অন্য হাত গুলি করার জন্যে প্রস্তুত রেখে।
জামাল শামলুর কাঁধে অস্ত্র ছাড়া বাড়তি একটা জিনিস থাকল। বাষট্টি মিটার দীর্ঘ অ্যাবসেইল দড়ির একটা কুয়েল।
শুরু করা যাক এবার, বলল আতাসী। কোনমতে চেপে লাগিয়ে রাখা রঙের টিনের ঢাকনা খুলল। ব্রাশ দিয়ে খানিকটা রঙ নিয়ে জেবেলের গায়ে লম্বা করে একটা পোচ দিল। রঙটা হালকা নীল, ইলিউমিনেটেড। রাত হলে। রেডিয়ামের মত জ্বলজ্বল করবে অন্ধকারে।
চড়তে শুরু করল ওরা তিনজন। সতর্ক। ঘন ঘন মুখ তুলে দেখে নিচ্ছে। ওপরে গার্ড আছে কি না। জেবেলের এবড়োখেবড়ো ঢালু গায়ের ফাটল, গর্ত ইত্যাদির কিনারা ধরে সন্তর্পণে কয়েক ফুট উঠছে আসী ও দারভিশ, থেমে রঙ দিয়ে লাইন আঁকছে, ফের উঠছে। জামাল অনুসরণ করছে ওদের। দ্রুত, অনায়াস দক্ষতার সাথে উঠে যাচ্ছে দলটা তরতর করে।
থেমে থেমে উঠতে হচ্ছে বলে রিজে পৌঁছতে একটু বেশি সময় লাগল। মোট সত্তর মিনিট। ওপরে উঠে বহুগুণ সতর্ক হয়ে উঠল ওরা, একটা ছায়া। জায়গা বের করে গাড়ি বোচকা নামিয়ে বসল। একটু জিরিয়ে নিয়ে সাবধানে উঁকি দিল ভেতরদিকে। প্রথমে চোখে পড়ল না কিছুই। তারপর, হঠাৎ করেই দেখা দিল বাংলার গৌরব। দুইশো ফুট নিচে।
ওদের পঞ্চাশ-ষাট গজ বয়ে। ক্যামোফ্লেজ ড্রেপস দিয়ে এমনভাবে ঢাকা। যে সনাক্ত করা কঠিন। কয়েকটা জায়গায় আচ্ছাদন নেই। আফটার। সুপারস্ট্রাকচার, বো এবং অ্যামিডশিপ, এই তিন জায়গা খোলা। তিন হেভি মেশিনগানের সেন্ট্রি পয়েন্ট ওগুলো। একজন করে কমান্ডো বসে আছে তিন পয়েন্টে, গান ব্যারেল ইনলেটের মুখের দিকে তাক করা। নাহ্, রানার আশঙ্কা। মিথ্যে। ওপরে কোন গার্ড নেই।
বাইরের মত ভেতরেও একটা পাথরের শেলফ আছে। ওটার কিনারায় পৌঁছতে পারলে সহজেই লাফ দিয়ে পড়া যাবে জাহাজের ডেকে। পিছিয়ে এল। ওরা, ছায়ায় বসে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসল। এমন সময় ওপর দিয়ে বিকট শব্দে উড়ে গেল একটা ফাইটার।
.
ওরা চারজন দফার উপজাতির। ওমানী নৌ কমান্ডো বাহিনীর সদস্য। ট্রাইব চীফ শেখ আজিজ বিন সাউদ বিন নাসির আল জাফরের বিশেষ নির্দেশে দুটি নিয়েছে সাতদিনের।
দুধর্ষ ডাকাতের মত চেহারা প্রত্যেকের। ষাড়ের মত স্বাস্থ্য। ইনলেট আর রাস সারকানের মাঝখানের আরেক দ্বীপ নিজওয়ায় অপেক্ষায় ছিল। জেবেল আখদার রেঞ্জের দ্বীপ ওটা। মেইনল্যান্ডের সাথে এ অঞ্চলে একমাত্র এই দ্বীপেরই সড়ক যোগাযোগ আছে। মাঝে ছোট একটা ফেরি আছে অবশ্য।
জেটির দিকে এগোতে থাকা গালফ পালকে ওদের একজন দেখল প্রথমে। সে দেখাল অন্যদের। একটু পর লম্বা এক কাঠের জেটিতে ভিড়ল ওটা। ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে নিয়েছে চার কমান্ডো। সাহায্য দরকার হলেই ওটার ফিরে আসার কথা ছিল। উঠে পড়ল লোকগুলো, যা জানার, পাঁচ মিনিটের মধ্যে জেনে নিল।
মাসিরাহ। ওমান মেইনল্যান্ডের সামান্য দূরে গালফ অভ মাসিরাহ্র ছোট এক দ্বীপ। ওমানী এয়ারফোর্সের ৮ম স্কোয়াড্রনের বেজ এখানে।
সকাল নটায় রিপোর্টিং সেরে বেজের খোলা টারমাকে বেরিয়ে এল। ফাইটার পাইলট নাফিজ মুলতানী। পাকিস্তানী সে। একটু পর নিজের মেটে ও বাদামী ডেজাট ক্যামোফ্লেজড় রঙের জাগুয়ার অ্যাটাক জেট নিয়ে আকাশে উঠল। নিয়মিত মহড়ায়। সুইপিঙ কোর্স ধরে উত্তর-পশ্চিমদিকে ছুটল রোদের অসহ্য। তাপে ভাজা হতে থাকা মরুভূমির ওপর দিয়ে। এলাকাটা সম্পূর্ণ জনবসতিহীন।
অনেক ওপর দিয়ে নিজওয়া-সালালাহর নিঃসঙ্গ, ফিতের মত উপকূলীয় হাইওয়ে পেরিয়ে গেল নাফিজ। দেশের উত্তর ও দক্ষিণের একমাত্র সংযোগ সড়ক ওটা। প্রতিবেশী আরব আমিরাতের ক্লিয়ারেন্স চাইল সে, পেয়েও গেল। সঙ্গে সঙ্গে। এটাও নিয়মিত ব্যাপার। ওদের আকাশসীমায় ঢুকে মুসানডেম পেনিনসুলার দিকে নাক ঘুরিয়ে লাগাল লম্বা দৌড়।
খানিকটা গিয়ে হাইট কমাল পাইলট, জেবেল রেঞ্জ চোখে পড়তে আরেকটু নামল। বিদ্যুৎগতিতে ধেয়ে চলল যে ইনলেটে বাংলার গৌরব আছে, সেদিকে। আরও নামল নাফিজ, নামতেই থাকল। খুব নিচু দিয়ে ইনলেট পেরিয়ে গেল জাগুয়ার, এত নিচু দিয়ে যে জেবেলের উঁচুনিচু চুড়ার ধুলো উড়তে শুরু করল প্লেনের আফটার বার্নারের গরম বাতাসে।
পরপর চারটে চক্কর দিল সে একই জায়গার ওপর দিয়ে, কিন্তু চোখে পড়ল না কিছু। ঠিক হ্যাঁয়, ভাবল পাকিস্তানী, আব যারা দরিয়ামে (এবার সমুদ্রে)।
খোলা সাগরে এসে পড়ল সে। মাসুদ রানা বলেছিল জেবেল রেঞ্জেই আছে ওদের জাহাজ। যদি ওটার দেখা পাওয়া না যায়, তাহলে যেন সাগরে কয়েকটা চক্কর দেয় সে। কিছু না, অস্বাভাবিক কোন তৎপরতা চোখে পড়ে কি না খেয়াল রাখতে। রানাও আশেপাশেই থাকবে, প্রয়োজন দেখলে নাফিজের সাহায্য চাইবে। কিন্তু না, কোনটাই চোখে পড়ল না। না জাহাজ, না অস্বাভাবিক কোন তৎপরতা।
লম্বা কয়েক চক্কর দিল সে সাগরে। কিন্তু মাছ ধরা ডাউ আর একটা ছোট বোট ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়ল না। সব স্বাভাবিক, ওগুলো…ভাবনা হোঁচট খেল পাইলটের। জাস্ট আ মিনিট। ঘাড় ঘুরিয়ে ক্যানোপির বাইরে, পিছনে তাকাল। আনমনা। ওই বোটটা…বেশ জোরে ছুটছে না? প্রশ্ন করল সে নিজেকে। ওটার বো ওয়াশ দেখে তো মনে হলো যেন তুফান বেগে ছুটছে। কেন? একবার দেখতে হয়। টুইন, অ্যাডর এঞ্জিনের আওয়াজ পাল্টে গেল জাগুয়ার অ্যাটাক জেট আচমকা বাক নিতে। বড় এক বৃত্ত তৈরি করে ফিরে চলল ওটা, সেকেন্ডে সেকেন্ডে নামছে। পরস্পরের দিকে ধেয়ে চলেছে বোট আর ফাইটার। বোটের। প্রায় মাস্ট ছুঁয়ে সা করে ছুটে গেল নাফিজ। এতই নিচু দিয়ে যে আচমকা। আসমানী বালা ছুটে আসতে দেখে ফোরডেকে দাঁড়ানো লোকটাকে ভাবাচ্যাকা খেয়ে যেতে দেখল সে। এবং দেখেই বুঝল ও ব্যাটা জাপানী।
ঘুরে এসে একইভাবে আরেক রাউন্ড দিল পাইলট। এবার রানাকে দেখল, হাত নাড়ছে তার উদ্দেশে। পাল্টা হাত নাড়ল নাফিজ, মুহূর্তে হাওয়া হয়ে গেল গালফ পার্লের ওপর দিয়ে।
.
জেরুজালেম।
যেনেক প্ল্যানিং কমিটির বৈঠক চলছে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে। যাহাল প্রধান মেজর জেনারেল ইয়াদ এলিয়াহুদের চেহারা বেশ শুকনো দেখাচ্ছে আজ। চোখ লাল। বেন মেইর গম্ভীর, গভীর চিন্তায় ডুবে আছে।
আগেই বলেছি ব্যাপারটা আমার ভাল ঠেকছে না, বিড় বিড় করে বলল মোসাদ প্রধান। জাহাজটা ওখানে বসিয়ে রাখার ঝুঁকি নেয়া উচিত হয়নি।
এলিয়াহুদ বুঝল পরোক্ষে অভিযোগ করছে মানুষটা। কিছু একটা কড়া। জবার এসে পড়েছিল জিভের ডগায়, কিন্তু বলল না শেষ পর্যন্ত। অনর্থক কথা। বাড়িয়ে লাভ কি? ওদিকে প্রধানমন্ত্রী দুই সংস্থা প্রধানের মর্যাদার লড়াই বেধে যেতে পারে ভেবে সামাল দেয়ার চেষ্টা করল তাড়াতাড়ি। এখন অতীত বাদ দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা উচিত, মৃদু গলায় বলল সে।
দুজনের একজনও কোন মন্তব্য করল না দেখে মুখ খুলল আবার। এলিয়াহুদকে প্রশ্ন করল, ওখানকার সর্বশেষ পরিস্থিতি কি?
অস্বস্তির সাথে নড়েচড়ে বসল মেজর জেনারেল। গতরাতে কিছু একটা ঘটেছে ওখানে, মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার। ওদের কথা বলা নিষেধ, তাই বুঝতে পারছি না। তবে কমিউনিকেশন সিস্টেম অন আছে বলে যে এক-আধটু আভাস পাচ্ছি, তাতে মনে হয় জাহাজ স্পট করেছে কারা যেন। একজন ধরা পড়েছে। ওদের, আরেকজন পালিয়েছে। আর…
আর কি?
আমাদের এক কমান্ডো মারা গেছে। ঘরের পরিবেশ টানটান হয়ে উঠেছে টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলল, তবে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে এখনও। মাদারশিপ বলছে, রেডিওতে মাঝে মাঝে ইয়োন্নির গলা শোনা যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ না থাকলে নিশ্চই তা হত না।
হেলান দিল প্রধানমন্ত্রী। মাদারশিপের পজিশন?
আজ ভোররাতে জায়গামত পৌঁছবে ওটা, মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার।
চেহারার মেঘ কিছুটা কাঁটল তার। শিওর?
শিওর! পেনিনসুলায় ঢুকেছে ইরগুন লিউমি।
গুড। ভাল একটা খবর শোনালেন।
আমার তা মনে হয় না, মাথা দোলাল ইয়েহুদা বেন মেইর। কারা। বাংলার গৌরবকে স্পট করেছে আমরা জানি না, তবে তারা যে প্রফেশনাল, কোন সন্দেহ নেই তাঁতে। মাদারশিপ পৌঁছার আগে যদি ওরা সরাসরি। আক্রমণই করে বসে বাংলার গৌরবকে, আমার মনে হয় না কর্নেল ইয়োনি ঠেকাতে পারবে। কারণ সে ক্ষেত্রে পুরো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই আসবে। আক্রমণকারীরা।
ওদের সুলতান আরাফাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আপনি জানেন। হয়তো দেখা যাবে ওমানের সরকারী ফোর্সই আনঅফিশিয়ালী অ্যাসল্ট চালিয়ে বসেছে। সে $ ক্ষেত্রে আমাদের কোন চান্স নেই। সব প্ল্যান শেষ পর্যন্ত মাঠে মারা যাবে। মাসুদ রানা ওদেশে আছে কি না জানা যায়নি। হয়তো আছে, ছদ্মবেশে ঢুকেছে। আগে দারভিশ আর তার সঙ্গীকে পাঠিয়েছে ডিকয় হিসেবে। তবে আমার অনুমান, ও আছে ওমানে। এসব ওরই কীর্তি।
বুঝলাম, মাথা দোলাল প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আপনার মেজর রোমানের ব্যাপার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না আমার। তার সাড়া নেই কেন? অভিজ্ঞ অফিসার সে। এসব কিছুই টের পাচ্ছে না, তা কি করে হয়? আমরা সতর্ক করে দেয়ার পরও সে অ্যালার্ট হচ্ছে না কেন?
হ্যাঁ, তাই তো! নিজের ভুল চাপা দেয়ার দারুণ এক সুযোগ পেয়ে চেপে ধরল এলিয়াহুদ। সে তো আপনার লোক। তার ভরসাতেই না কাজটা আমরা ওই অঞ্চলে করব বলে ঠিক করেছিলাম। প্রচুর টাকাও তো দেয়া হয়েছে। লোকটাকে। এমন জরুরী সময়ে হঠাৎ পিঠটান দিল কেন সে?
উত্তর জোগাল না মোসাদ প্রধানের মুখে, অসহায় বোধ করল সে।
.
১১.
রাত গম্ভীর হচ্ছে মুসানডেম পেনিনসুলায়। হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণ ফিওড় ধরে। দ্রুত উত্তরদিকে এগিয়ে চলেছে বড়সড় এক জাহাজ। বো থেকে স্টান পর্যন্ত অন্ধকারে ডুবে আছে ওটার। আলো বের হওয়ার সমস্ত পথ পুরু কালো কাগজ সেটে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। দৈত্যাকার এক প্রাগৈতিহাসিক জলদানবের মত গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছে যেন এটা। ভারী ভিজেল এঞ্জনের আওয়াজ ছাড়া প্রাণের আর কোন সাড়া নেই কোথাও।
ইরগুন লিউমি ওটার নাম। দশ হাজার টনী ফেইটার! স্টার সাইড বিজ উইঙে বড় ধরনের কি যেন একটা আছে, ত্রিপল দিয়ে ঢাকা বল দেখা যায় না। গন্তব্যের বেশ কাছে এসে পড়েছে, তাই কাগজ দিয়ে ঢাকা ভেতরের আলোকিত ঐ জ মেসে জরুরী আলোচনায় ব্যস্ত একদল লোক। বারোজন ওর, যেনেক টীমের সাহায্যকারী ইউনিট।
ওদিকে ইনলেটের চার মাইল দূরে ভোলা সাগরে দাঁড়িয়ে আছে গালফ পার্ল। ওটাও অন্ধকার। ফোরডেকে দাঁড়িয়ে চার দফারের সাথে শেষ মুহূর্তের আলোচনা সেরে নিচ্ছে মাসুদ রানা। নাইটভিশন দিয়ে তাকালে জেবেলের গায়ে আঁকা ইলিউমিনেটেড পেইন্টের কাটা কাটা দাগ স্পষ্ট দেখা যায়। এগারোটার দিকে বীফিং শেষ হতে লোকগুলোকে তৈরি হয়ে নিতে বলল রানা। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো কাপড়ে মোড়া ওরা পাঁচজন যখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত, ঘড়ির কাটা তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে।
দুই ওয়াটার স্কুটার জেট রেইডার নামানো হলো পানিতে। অ্যাভনও। বক্স থেকে বের হলো পর্যাপ্ত গুলিসহ আধ ডজন স্টার্লিং, একটা জিপিএমজি, অ্যামিউনিশন, বেল্ট. 1; একটা কার্বন ফাঁইবার গ্র্যাপনেলের কমপ্রেসড এয়ার। লঞ্চলর। দুটো স্টার্লিং, জিপিএমজি ও লঞ্চার নিয়ে অভিনে উঠল দুই দফার। রানাসহ অন্য দুজন স্কুটারে। একজনকে নিজের পিছনে বসাল রানা।
জিনিসপত্র সব উঠেছে কি না দ্রুত চেক করে দেখল টোকিও, তারপর সঙ্কেত দিল। রওনা হয়ে গেল দল। একটু পর আবছা হতে হতে মিলিয়ে গেল ওরা, মোটরের আওয়াজ আর শুনতে পেল না টোকিও। দশ মিনিট পর দাগ বরাবর নিচে জেবেলের পাথরের মেঝেতে মৃদু ঘষা খেয়ে থেমে দাঁড়াল দুই জেট রেইডার। প্রায় একই মুহর্তে পৌঁছল অ্যাভন। হাটে।
ঘড়ি দেখল মাসুদ রানা, মাথা ঝাঁকাল সন্তুষ্ট হয়ে। কাঁটায় কাটায় একটা। আতাসী আর জামাল শামলু এগিয়ে এল অন্ধকারের ভেতর থেকে। অ্যাকশনের গন্ধে, উত্তেজনায় চকচক করছে যুবকের দুচোখ। দারভিশ ওপরে। আতাসীর সাথে মিনিট দুয়েক কথা বলে যা জানার জেনে নিল রানা, কথা বলল সঙ্গী দুই দফারের সাথে। তারপর অ্যাভনের দুজনের সাথে। আলাপ সেরে তাদের লীডারের সাথে ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিল। জামাল এরমধ্যে স্কুটার দুটো বেঁধে রেখে এল, পিসির সাথে।
রেডি!
ভেঙে পড়া ঢেউয়ের গুড়ো পানির কণায় চোখমুখ ভিজে গেছে রানার, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না। বাতাস বইছে, বেশ ঠাণ্ডা চাঁদ উঠেছে, অল্প হলেও, রূপালী আলোয় চারদিক মোটামুটি দেখা যায়। জেবেলের চূড়াও।
রানার ব্যস্ততা নেই। ধীরেসুস্থে কাজ সারছে। রাত যত গম্ভীর হবে, ভেতরের ওদের টেনশন তত কমবে, পাহারায় ততই ছিল দেয়া শুরু হবে। ওই সময়টা বেছে নিয়েছে রানা কাজ সারা সহজ হবে বলে। লোকগুলো ভুল করেছে, মনে মনে বলল ও মারাত্মক ভুল করেছে। ওপরে অন্তত একজন ওয়াচার রাখা উচিত ছিল ওদের। প্রফেশনালদের এ ভুল মানায় না।
আগে না হয় রাখেনি, কিন্তু পরপর দুটো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তো ওদের লীডারের এ নিয়ে সিরিয়াসলি চিন্তা করা উচিত ছিল। ভয় ছিল রানার, তাই আগেভাগে আতাসীকে নিশ্চিত হতে পাঠিয়েছিল। ভয়টা অমূলক ছিল ও পক্ষের লীডার মানুষটা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী, শুধু সামনেই দেখে পিছনে, দেখে না।
হিট আওয়ার মাইনাস ওয়ান।
আর ঠিক এক ঘণ্টা পর ইনলেটের মুখে দেখা দেবে অ্যাভনওটার দুই কমান্ডোর উদ্দেশে নীরবে হাত নাড়ল রানা, ঘুরে দাঁড়াল। ইলিউমিনেটেড। লাইন বরাবর উঠতে শুরু করল তুরতর করে। অন্যরা নিশ্চিন্ত মনে অনুসরণ করল। ওদের সুবিধের জন্যে এপাশে লাইন ঝুলিয়ে রেখেছিল আতাসী। কিন্তু প্রয়োজন পড়ল না ওটার। খালি হাতেই উঠে এল সবাই।
ঠিক পঁচিশ মিনিটের মাথায় ওরা পাঁচজন এসে যোগ দিল সার্জেন্ট হামামের সাথে। পাঁচটা নতুন অ্যাবসেহল রোপকয়েলের এক মাখা বাধা হলো, কয়েল ওপরেই থাকল, সময়মত ফেলা হবে। বুটাইল নাইলনের ম্যানহক হানেস পরে তৈরি হলো সবাই। উত্তেজিত। কাঁপছে একটু একটু। দরদর করে ঘামছে। উৎকণ্ঠা বাড়ছে। অ্যাড্রেনাইল পাম্পিং দ্রুততর হচ্ছে।
চাঁদের আলো আরও বেড়েছে। উপুড় হয়ে শুয়ে ইমেজ ইনটেলিফাইয়ার চোখে লাগিয়ে দুশো ফুট নিচে তাকাল মাসুদ রানা। তিন সেন্ট্রি পোস্টের ওপর নজর বোলাল। অ্যাফট সুপারস্ট্রাকচারের সেন্ট্রি ঢুলছে। অন্য দুজন সজাগ। বসে আছে হেভি মেশিনগানের পিছনে।
হিট আওয়ার পনেরো মিনিট।
পাশ থেকে একনাগাড়ে ফোঁস ফোঁস আওয়াজ করছে জামাল, দম নিচ্ছে। ঘামে সারা মুখ চক চক করছে ওর। নজর সেটে আছে বাংলার গৌরবের ওপর।
হিট আওয়ার দশ মিনিট।
আর কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা দেবে ওটা।
ইনলেটের চওড়া মুখ দিয়ে ভোলা সাগরের দিকে তাকাল রানা। দেখা নেই এখনও। ডানে-বাঁয়ে যতদূর সম্ভব চোখ বুলিয়ে নিল আরেকবার। নেই।
হিট আওয়ার পাঁচ মিনিট।
লাইন ফেলো! চাপা গলায় নির্দেশ দিল ও।
ব্যস্ত হয়ে উঠল অন্য সবাই। বেশি উঁচু হলে বা ঝুঁকলে আকাশের পটভূমিতে কমান্ডোদের চোখে পড়ে যেতে পারে, সেদিকে সতর্ক নজর রেখে অ্যাবসেইল রোপ ছাড়তে শুরু করল। পাশাপাশি সাপের মত মোচড় খেতে খেতে নেমে গেল পাঁচটা লাইন, প্রথমটা নামল সবশেষে।
হিট আওয়ার চার মিনিট।
লাইনে হার্নেস জুড়ে তৈরি ওরা। রানা পলকহীন চোখে সামনে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে দেখা দিল অ্যাভন। অনেকটা পথ ঘুরে এলেও সময় এদিক ওদিক হয়নি লীডারের, ঠিকই আছে। ঠিক সময়ই পৌঁছবে জায়গামত। পানিতে প্রায় চ্যাপ্টা মনে হচ্ছে ওটাকে ওপর থেকে, চাঁদের আলোয় চক-চক করছে কালো দেহ। মোটরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না, তার মানে ধীরগতিতে আসছে। হুঙ্কার ছেড়ে ছুটতে শুরু করবে এখনই।
চেক! নির্দেশ দিল রানা রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠে।
হিট আওয়ার তিন মিনিট।
দ্রুত যে যার হার্নের্স, ডিসেন্ট লিভার, সেফটি লিভার, কক হ্যাঁন্ডেল চেক করে নিল প্রত্যেকে।
হিট আওয়ার দুই মিনিট।
নিচে তাকাল রানা। এতক্ষণে সেন্ট্রিদের নজর যাওয়া উচিত ছিল ওদিকে। অন্ধ নাকি ওরা? না ঘুমিয়ে আছে?
হিট আওয়ার এক মিনিট।
জাম্প!
জেবেলের ভেতরের খাড়া গা ঘেঁষে শূন্যে ঝুলে পড়ল ছয়টা ছায়া, একই মুহর্তে ইনলেটের বাইরে হুঙ্কার ছাড়ল অ্যাভন। নাক উঁচু করে ছুটে আসতে শুরু করল। ওদিকে ছায়াগুলো তরতর করে নেমে আসছে, সবার এক হাত হার্নেসের সেফটি লিভারে, আরেক হাতে কারবাইন। একশো ফুট নেমে এসেছে ওরা, তখনই ঘটল ব্যাপারটা। এ মিডশিপ অবজার্ভেশন পোস্টের সেন্ট্রি চেঁচিয়ে উঠল তীক্ষ্ণ গলায়, মুহূর্তে হুলস্থুল শুরু হয়ে গেল।
কলজে এক লাফে জিভের ডগায় পৌঁছে গেল রানার, কিন্তু না; অ্যাবসেইল টীম নয়, ওদের লক্ষ্য অ্যাভন। হুঙ্কার ছেড়ে উঠল বো-র হেভি মেশিনগান, কেঁপে উঠল মুসানডেম পেনিনসুলা। দীর্ঘ এক সারি ট্রেসার বুলেট রঙধনুর মত বাঁক খেয়ে ছুটে গেল অগ্রসরমান বোটটার দিকে। সৎ করে লাইন। অভ ফায়ার থেকে সরে গেল অ্যাভন, জবাব দিতে শুরু করল জিপিএমজির সাহায্যে।
এদিকে রানার পাশে ফেইল-সেফের লিভার টেনে নিজেকে থামাল দারভিশ হামাম, দুহাতে সাব-মেশিনগান ধরে যত্নের সাথে করল প্রথম ব্রাশ। ফায়ার। আঁতকে উঠে মুখ তুলল সেন্ট্রি, পরমুহূর্তে মাঝ বরাবর জায়গা থেকে নিখুঁতভাবে কাটা পড়ল দ্বিতীয় ব্রাশে। আরেকজন ছুটে এসে দাঁড়াল ওখানটায়, কোনরকম ডিফেন্স নেয়ার কথা ভুলে আহাম্মকের মত ওপরে তাকাল। জামালের স্টার্লিং ব্যবস্থা করল তার। টানা ব্রাশ ফায়ারে ডেক প্লেটের সাথে। গেঁথে ফেলল সে তাকে। ভাঙাচোরা পুতুলের মত পড়ে থাকল লোকটা।
এঁকেবেঁকে ইনলেট মাউথের কাছে পৌঁছে গেছে অ্যাভন, জিপিএমজির অ্যামিউনিশন বেল্ট ঝাঁকি খাচ্ছে অনবরত, ব্রিচ হয়ে মাযুল দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বুলেট আগুন ছিটিয়ে। যেন ঝাঁঝরা করে দেবে বাংলার গৌরবের হাল।
হঠাৎ রাতকে দিন করে জ্বলে উঠল একটা সার্চলাইট, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চুরমার হয়ে গেল অ্যাভনের গুলির আঘাতে। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। একই মুহূর্তে বো-র সাথে ফিট করা বিশেষ বোস দিয়ে মনোফিলামেন্ট নেট কেটে ভেতরে ঢুকে পড়ল ওটা।
ফ্রেইটারের ডেকে এলোপাতাড়ি দৌড় ঝাঁপ করছে কমান্ডোরা। ওপরের খেলা যারা দেখেছে, তারা মরার আগে যমদূত কোনদিক থেকে এসেছে, সে খবরটা দিয়ে যেতে পারেনি, তাই ওপরেরদিকে খেয়াল নেই ওদের, ব্যস্ত হয়ে নিচে উঁকিঝুঁকি মারছে। কিন্তু ওরা ঠিকমত বুঝে ওঠার আগেই ফ্রেইটারের গায়ে ভিড়ে গেছে অ্যাভন, কমপ্রেসড়-এয়ার লঞ্চারের আওয়াজ ওপর থেকে পরিষ্কার শুনতে পেল রানা। গ্যাস রিলিজ হওয়ার মত তীব্র হিসস শব্দে শূন্যে উঠে পড়ল কার্বন ফাঁইবার গ্র্যাপনেল, ঠং-ঠং শব্দে আছড়ে পড়ল ডেক প্লেটে। দড়ি টেনে রেলিঙে হুক বাধিয়ে নিল দফার লীডার। অন্যজন সমানে গুলি ছুঁড়ছে আপারডেক সই করে।
আচমকা একটা ফ্লেয়ার ছুটে গেল ওপরে, নীলচে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল চারদিক।
রানার দুপা পাথরের শেলফ স্পর্শ করল এই সময়, ফ্রেইটারের সুপারস্ট্রাকচারের ওপাশের দৃশ্য আড়াল হয়ে গেল। পায়ের নিচে শক্ত পাথরের ছোঁয়া পেতেই এক ঝটকায় নিজেকে হার্নেসের বাধনমুক্ত করে ছুটল ও স্টার্লিং বাগিয়ে। অন্যরা এক সারিতে অনুসরণ করছে ওকে। এই সময় আফটার ডেকে উদয় হলো এক কমান্ডো, আলোয় দেখে ফেলল ওদের।
চিৎকার করে উঠল লোকটা, যতটা না সঙ্গীদের সতর্ক করার জন্যে, তারচেয়ে বেশি আতঙ্কে। পরক্ষণে অস্ত্র তুলে এক পশলা গুলি ছুঁড়ল, রানার পায়ের কাছে কয়েক টুকরো চলটা উঠে গেল পাথরের। দৌড়ের ওপরই গুলি করল ও স্টার্লিঙের বাট কোমরের পাশে ঠেকিয়ে। একটা পাক্ খেয়ে দড়াম করে রেলিঙের ওপর আছড়ে পড়ল কমান্ডো, হাত থেকে অস্ত্র ছুটে পড়েছে ইনলেটে। এক ডিগবাজি খেয়ে সে-ও অনুসরণ করল ওটাকে।
শেলফের কিনারায় পৌঁছে লাফ দিল রানা, মুহূর্তে পড়ল এসে ডেকে। প্রায় একই সঙ্গে ডেকে পা রাখল লীড়ার দফার। মুহুর্মুহু গোলাগুলির আওয়াজে কাঁপতে শুরু করল ইনলেট, কারডাইটের নীলচে ধোয়ার মেঘে চারদিক ঢাকা পড়ে গেল। রানা থামল না, নিচের ভার আতাসীর ওপর ছেড়ে দিয়ে জামালকে সঙ্গে নিয়ে খাড়া স্টেয়ারওয়েলের দিকে ছুটে গেল। থেকে থেকে সংক্ষিপ্ত ব্রাশ ফায়ার করছে পথের সম্ভাব্য বাধা দূর করার জন্যে।
সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে রানাকে কাভার দিল জামাল শামলু। হুইলহাউসের কাছে পৌঁছে থামল ও, লম্বা করে দম নিল কয়েকবার। পাশে তাকিয়ে যুবকের গ্রীজ মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল। হেভি বুট পরা এক পা হ্যাঁচের গায়ে ঠেকাল সে, ওর চাপা না! শুনে ঠ্যালা দিল। হা হয়ে গেল হ্যাঁচওয়ে।
ছোট এক প্যাসেজের ওপাশে হুইলহাউস, একজনই আছে ওখানে। থুতনির কাছে রেডিও ট্রান্সিভার ধরে মহাব্যস্ত কণ্ঠে কথা বলছে আরেকদিকে ফিরে। কাঁধে ঝুলছে মিনি উজি। মানুষটা খাটো, তবে বেশ চওড়া। হঠাৎ বিপদ টের পেয়ে ঘুরল সে। নীল চোখে অবিশ্বাস ফুটল তার। চৌকো চোয়াল দৃঢ় হলো, কিন্তু ভয়ের লেশমাত্র দেখল না ওরা লোকটার চেহারায়। বরং রেগে উঠতে দেখল। মুহূর্ত পর বিদেয় নিল রাগ, চওড়া দুই কাঁধ ঝুলে পড়ল। হার হয়েছে বুঝতে পেরেছে।
মেজর, স্যার! পিছন থেকে বলল জামাল শামলু। গলা কাঁপছে। কাজটা আমাকে করতে দিন।
এক সেকেন্ড ইতস্তত করে সরে দাঁড়াল ও। শিওর!
দুপা এগোল যুবক, লোকটার পেট সই করে গুলি করল। খসে পড়ল তার হাতের ট্রান্সিভার, বাংলার গৌরবের চকচকে ক্রোমিয়াম কন্ট্রোল প্যানেল রক্তে লাল হয়ে উঠল। আছড়ে পড়ে কয়েকবার মোচড় খেল দেহটা, তারপর হঠাৎ করে স্থির হয়ে গেল। তারের মাথায় দুলছে ট্রান্সিভার। একটা ক্যানকেনে। গলাচিৎকার করছে ওটায়।
রানার পার্সোনাল রেডিওতে আতাসীর রিপোর্ট ভেসে এল। শুক্রর সব। পজিশন দখল করা হয়েছে, ছয় কমান্ডো নিহত, এদিকে অ্যাভনের দফার লীডার পায়ে গুলি খেয়েছে। আঘাত মারাত্মক নয়। সে আর দারভিশ সামান্য আহত, মাইনর ইনজুরি।
হুইলহাউস থেকে বেরিয়ে বুক ভরে পাহাড়ী বাতাস টেনে নিল মাসুদ রানা। এবার রিক ক্লের খোঁজে যেতে হয়। বেঁচে আছে তো সে? নাকি নিচে অচেনা কয়েকটা গলা শুনে নেমে এল। ক্রুজ মেস থেকে বের করা হয়েছে ক্রুদের, ভয়ে তাদের কয়েকজনের অবস্থা খারাপ। আবোল-তাবোল বকছে। জটলার মধ্যে থেকে বিশালদেহী এক দাড়িওয়ালা এগিয়ে এল রানাকে দেখে।
কারা আপনারা? ওমানী সোলজার?
আপনি কে? পাল্টা প্রশ্ন করল ও।
পাপাগাইকোস ইউমেন্ডিস। ক্যাপ্টেন।
নো মোর, নীল ডাউন!
হোয়াট! চোখ কোঁচকাল গ্রীক।
নীল ডাউন!
কেন, আমার কি দোষ? আমি… দারভিশ পিছন থেকে লাথি মারল তার হাটুর ভাজে, হুড়মুড় করে পড়ে গেল লোকটা।
সেদিকে তাকাল না রানা, আতাসীর দিকে ফিরল। ফ্লেয়ার ছেড়ো! টোকিওকে সিগন্যাল দাও।
রাইট, বস।
কাল রাতে যাকে বন্দী করা হয়েছে, তাকে কোথায় রেখেছে এরা?বাকি ক্রুদের জিজ্ঞেস করল রানা।
চেইন লকারে রাখা হয়েছে, ফিলিপিনো কুক জবাব দিল।
একটা ফ্লেয়ার উড়ে গেল আকাশে। ঘুরে দাঁড়াল রানা। দশ মিনিট পর ক্লেকে নিয়ে ফিরল। বহাল তবিয়তেই ছিল সে, ইন্টারোগেশন শেষ পর্যন্ত করেনি কর্নেল ইয়োন্নি। মাদারশিপ প্রায় এসে পড়েছে, তাই খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি ব্যাপারটাকে।
ওদিকে ফ্লেয়ার ছোঁড়ার এক ঘণ্টা পর ইনলেটে ঢুকল গালফ পার্ল। মবি ও দুই জেট রেইডারকে বেঁধে নিয়ে এসেছে টোকিও।
আরেকদিকে যেনেক টীমের মাদারশিপ ইরগুন লিউমির কমিউনিকেশন অফিসার স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। কর্নেল ইয়োন্নির হঠাৎ থেমে যাওয়া এবং তারপরই ব্রাশ ফায়ারের শব্দে যা বোঝার বুঝে গেছে সে।
বাইরে শেষ চেষ্টার প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। স্ট্যান্ডবাই টীম ইনফ্লেটেবল জেমিনি নিয়ে পানিতে নামবে কিছুক্ষণের মধ্যে।
.
১২.
অনেকদিন পর স্টাট নিয়েছে বাংলার গৌরব। মনের আনন্দে গান ধরেছে। তার সতেরো হাজার হর্স পাওয়ারের বারমেস্টার অ্যান্ড ওয়েন ডিজেল এঞ্জিন।
প্রাণ ফিরে পাওয়ায় কাঁপছে ডেক প্লেট। অফিসার-ত্রুরা হৈ-হৈ করে অভিনন্দন জানাল তার প্রাণের স্পন্দনকে। ড্রেপস সরিয়ে ফেলা হয়েছে আগেই, এবার সমস্ত লাইন খুলে ফেলা হলো। নতুন ক্যাপ্টেন-মাসুদ রানা ধীরগতিতে ইনলেট থেকে বের করে আনল ওটাকে। ফার্স্ট মেট রফিক সাহায্য করছে। ওকে। গালফ পার্ল গজ পঞ্চাশেক সামনে পাইলট করছে।
সবে ভোরের আলো ফুটেছে, এরমধ্যেই পরিবেশ গরম হয়ে উঠতে শুরু করেছে। পোর্ট সাইড ব্রিজ উইঙে দাঁড়িয়ে আছে দারভিশ ও জামাল। চেহারা। হাসছে ওদের। আতসী রানার পাশে দাঁড়িয়ে ফিলিপিনো কুককে সকালের নাস্তা কি কি হবে তার ফিরিস্তি দিয়ে চলেছে।
এমন সময় হাসি শুকিয়ে গেল দারভিশের। অনেক দূরে কালোমত কি যেন দেখতে পেয়েছে ও মুহূর্তের জন্যে। দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেছে। চোখ কুঁচকে উঠল তার। না, আর দেখা যাচ্ছে না। ভুল দেখেছে কি না ভাবছে, তখনই আবার দেখা গেল। গুবরে পোকা সাইজের কি যেন-তিনটা। কয়েক সেকেন্ড বুঝে উঠতে পারল না ব্যাপারটা কি! ওগুলো কি জিনিস!
তারপর, একেবারে আচমকা বুঝে ফেলল সার্জেন্ট। কলজের মধ্যে ছাৎ করে উঠল তার। ওগুলো ইনফ্লেটেবল, জেমিনি-ঢেউয়ের মাথায় চড়লে পলকের জন্যে দেখা যায়, তারপরই নেই হয়ে যায় আবার। কারা ওরা?
ভাবল দারভিশ হামাম, কিন্তু সময় নষ্ট করল না এক মুহূর্তও চেঁচিয়ে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করল সবার।
নেভার মাইন্ড!বলে কুককে এক ধাক্কায় পথ থেকে সরিয়ে দিল। আতাসী, দুই লাফে বেরিয়ে গেল। কোথায়? দেখাতে হলো না, নিজেই দেখল সে। খুব বেশি হলে তিন মাইল দূরে আছে ওগুলো। ফার্স্ট মেটের হাতে হুইলের দায়িত্ব দিয়ে রানাও বেরিয়ে এসেছে ততক্ষণে। পিছনে ওদের ব্যস্ত ছোটাছুটি দেখে ওদিকে টোকিওর সন্দেহ হলো কিছু, বোট অটো হেলমের। হাতে ছেড়ে সে-ও বেরিয়ে এল ডেকে। তার চিৎকারে এক মুহূর্ত পরই রিক ক্লে উঠে এল ফোক্যাসল থেকে। দুই ডাইভার আহাম্মকের মত তাকিয়ে। থাকল সামনে।
ঢেউয়ের মাথায় চড়ে নাচতে নাচতে আসছে তিন জেমিনি, আধ মাইল পেরিয়ে এসেছে এরমধ্যে। কম করেও ত্রিশ নট গতিতে আসছে, রাবারের ভোতা বো বেশ খানিকটা উঁচু হয়ে আছে গতির তোড়ে। ওরা আর যে-ই হোক, বন্ধু যে নয়, তাতে কোন সন্দেহই রইল না রানার। ওদেরই মত কালো ড্রেস পরে আছে ব্যাটারা-বারোজন। তিনটেরই বো-র কাছে ট্রাইপডে বসানো আছে হেভি মেশিন গান।
ছুটে গিয়ে, হুইলহাউস থেকে লাউড হেইলার নিয়ে এল ও। ওদের সবাইকে লড়াইয়ের জন্যে তৈরি হতে বলে চাচাতে লাগল খুদে স্যালভেজ বোটের উদ্দেশে, গালফ পার্ল, ক্লীপ ক্লীয়ার! গালফ পার্ল, ক্লীপ ক্লীয়ার!! আমরা সামাল দিচ্ছি ওদের, সরে পড়ো।
এরমধ্যে দৌড়ে নেমে গেছে আতাসী, দারভিশ ও জামাল, দফার কমান্ডোদের নিয়ে পজিশনে বসে গেছে সাইডের নিরেট, পুরু লোহার শেলের আড়ালে। মাথা না তুললে গুলি লাগার কোন সম্ভাবনা নেই ওখানে। রানা ওপরে তৈরি হলো একটা জিপিএমজি নিয়ে, উত্তেজনায় ঘাম ছুটে গেছে ওর। অ্যামিউনিশন বেল্ট চেম্বারে ফীড করল, সেফটি ক্যাচ অফ করে তৈরি হলো।
বাঁ দিকের জেমিনি থেকে ছোঁড়া হলো প্রথম গুলি। তখনও যথেষ্ট দূরে ওটা, পুরো আওয়াজ কানে পৌঁছল না। গুলি পৌঁছল ঠিকই, তবে পোর্ট সাইডে পানিতে পড়ল সব। বড়জোর দুটো কি তিনটে লাগল ফ্রেইটারের হালে। আরেকটু এগিয়ে মাঝেরটা এক পশলা চুড়ল, রানার কানের পাশ দিয়ে বোলতার গুঞ্জন তুলে ছুটে গেল কয়েকটা আধ ইঞ্চি তপ্ত মৃত্যু, ঝন ঝন শব্দে ভেঙে পড়ল ব্রিজের কাঁচ। রফিক বসে পড়ল ঝপ করে।
ওপরে থাকার পুরো অ্যাডভান্টেজ নিতে চাইল রানা, নিচের ওদের স্টার্লিঙের আওয়াজ ছাপিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে উঠল ওর জেনারেল পারপাস মেশিন। গান। কিন্তু কাজ হলো না, ঠিক সময়মত অবিশ্বাস্য দ্রুততার সাথে ডানে-বাঁয়ে। সরে গিয়ে ফাঁকি দিল ওগুলো। বেশ বড় বৃত্ত তৈরি করে দুটো জেমিনি চলে গেল ওপাশে, স্টার সাইডে। অন্যটা দূরে সরে গেল, ঘুরে পোর্ট সাইড দিয়ে এগোবার পায়তারা করছে। গালফ পার্লকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
আতাসীর উদ্দেশে হাঁক ছাড়ল রানা, দুতিনজনকে নিয়ে উল্টোদিকে গিয়ে পজিশন নিতে বলল। এবার একযোগে দুদিক থেকে এল ওরা, নিজেরা পাইকারী গুলি খরচ করল বাংলার গৌরবের যত্রতত্র, তারপর ফের দূরে সরে গেল। এদিকে নিজেদের হালকা অস্ত্রের গুলি ওগুলোর কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বুঝতে পেরে প্রমাদ গুণল রানা। গুলির স্টক ফুরিয়ে আসবে ওদের যে কোন সময়, তখন কেমন হবে? আরও দুবার একই কায়দা করে ওদের গুলি খরচ করাল ওরা। এভাবে ঠেকানো যাবে না ওদের।
উন্মাদের মত খেপাটে চোখে এদিক-ওদিক তাকাল রানা, কি দিয়ে ওদের ঠেকমবে বুঝে উঠতে পারছে না। এ মুহূর্তে একমাত্র ভরসা জিপিএমজি, কিন্তু গুলি বেশি নেই ওটার। তাড়াতাড়ি কিছু একটা করা না গেলে সর্বনাশ। নিচে আতাসী, দারভিশ ও অন্যরা সবাই বোকার মত ওদের চক্কর দেখছে। গালফ পার্ল ছুটছে ফ্রেইটারের আগে আগে। এর মধ্যে তিনগুণ ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে দুটোর মাঝখানে, প্রায় দেড়শো গজ দূরে রয়েছে এখন ওটা। পিছনে নাচতে নাচতে যাচ্ছে পিসি ও জেট রেইডার দুটো। ইনলেটে ওগুলো জায়গামত তুলে রাখার কথা ভাবলেও বিশেষ পরজ দেখায়নি কেউ, পরে করলে চলবে ভেবে রেখে দেয়া হয়েছে। নজর ঘোরাতে গিয়েও কি ভেবে ঝট করে ফের সেদিকে তাকাল ও। জেড রেইডার! ওগুলো হাতে পেলে হয়তোধড়মড় করে উঠে, বসল, হেইলার মুখে ধরে চাচাতে লাগল, গালফ পার্ল! গালফ পার্ল!! আমাদের পোর্ট সাইডে সরে যাও; জেট রেইডারের টো লাইন খুলে দাও। গালফ পার্ল, আমাদের…!
হাঁক শুনে আফট ডেকে এসে দাঁড়াল ক্লে ও টোকিও। ক্লের হাতে ম্যাগাফোন। বাংলার গৌরব! রিপিট করো, রিপিট করো!
করল রানা। হতভম্ব হয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল দুই ডাইভার। কেন? ওগুলো দিয়ে…
যা বলছি করো! ধমক মেরে ক্লেকে থামিয়ে দিল ও। হারি আপ, সময় নেই।
ওকে! অদশ্য হয়ে গেল ওরা।
এদিকে রানার-সঙ্গীরা নির্দেশটা বুঝল ঠিকই, কিন্তু তাৎপর্য বুঝল না। এ সময়ে ওগুলো কি কাজে আসবে ভেবে না পেয়ে মুখ তুলে ব্রিজের দিকে তাকাতে লাগল ঘন ঘন। তাদের নতুন নির্দেশ দিল ও, এখন কেউ গুলি ছুঁড়বেন না। জাস্ট ওয়াচ। আতাসী-দারভিশ, ওপরে রিপোর্ট করো।
ওদিকে ফেইটারের পোর্ট সাইডে সরে যেতে আরম্ভ করেছে গালফ পার্ল, অন্যদিকে তিন জেমিনি নতুন উদ্যমে তেড়ে আসতে শুরু করেছে। এবারও যথারীতি প্রচুর গুলি খরচ করে ফিরে গেল ওরা। পাল্টা হামলা হলো না দেখে মনে হলো বিস্মিত হয়েছে ব্যাটারা। অনেকেই ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে।
আতাসী আর দারভিশ পৌঁছল হুড়মুড় করে। দুমিনিট ব্যস্ত গলায় কিছু বলে গেল রানা। সন্দেহ ছিল আতাসী ঘাবড়ে যেতে পারে ওর পরিকল্পনা শুনে। কিন্তু ঘটল উল্টো। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। নিশ্চয়ই, বস। স্ট্যাব জ্যাকেট পরে নেব।
হ্যাঁ, এক্সট্রা ম্যাগাজিন নাও। আর এটার অবশিষ্ট বেল্টটা, হাতের জিপিএমজি দেখাল রানা। দুই মিনিট সময়।
সার্জেন্ট ফিরে যাওয়ার জন্যে পা তুলল। চোখ স্যালভেজ বোটের দিকে। ছেড়ে দিয়েছে। আমি যাচ্ছি, স্যার।
সামনে তাকাল মাসুদ রানা।.টোকিও ছেড়ে দিয়েছে দুই ওয়াটার স্কুটার, ঢেউয়ের মাথায় উথাল পাতাল করতে করতে পিছিয়ে পড়ছে ওগুলো, ফ্রেইটার প্রতি মুহূর্তে সেদিকে এগোচ্ছে। ফার্স্ট মেটের দিকে ফিরে গতি কমানোর নির্দেশ দিল ও, সঙ্গে সঙ্গে গতি পড়ে এল ফ্রেইটারের। ব্রিজ উইঙে পেট ঠেকিয়ে নিচে তাকাল ও, স্থির চাউনি, বাংলার গৌরব আর দুই স্কুটারের ব্যবধান হিসেব করছে মনে মনে। বাঁদিকে, একশো গজমত সামনে রয়েছে ও দুটো, দড়ি ছেঁড়া কাণ্ডারীবিহীন ডিঙির মত এলোপাতাড়ি দুলছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাবে ফ্রেইটারের জ্যাকব ল্যাডারের কাছে।
হাত নেড়ে রফিককে গতি আরও কমাতে বলল ও, জাহাজ এগিয়ে নিয়ে। যেতে সঙ্কেত দিতে থাকল খুব হিসেব করে। কাজের ফাঁকে সঙ্গীদের নতুন নির্দেশ দিল রানা। লেফটেন্যান্ট ও সার্জেন্টকে কভার দিতে বলল দুই দফারকে, অন্যরা নজর রাখবে পোর্ট সাইডে। এবার ওরা এলে গুলি ছুঁড়তে হবে, যে ভাবে তোক ফ্রেইটার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।
ওদিকে দূর থেকে পুরোটা ব্যাপার লক্ষ করছিল জেমিনিগুলো, বাধন খুলে দেয়া দুই স্কুটার, ও জ্যাকব ল্যাডারে দুটো কাঠামোর ব্যস্ততা দেখে কিছু একটা। সন্দেহ করে বসল, তেড়ে এল একযোগে। কিন্তু তেমন সুবিধে করতে পারল না। লাইট হলেও কয়েকটা মেশিনগানের টানা গুলিবৃষ্টির মুখে বাধ্য হলো পিছিয়ে যেতে। ওদের হেভি মেশিনগানের বিরামহীন গুলির আঘাতে পোর্ট সাইড হাল চালুনি হয়ে গেল।
জ্যাকব ল্যাডারের গোড়ায় নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে আছে আতাসী ও দারভিশ। জানে, শত্রু যত গুলিই করুক, এত নিচে পৌঁছবে না একটাও। একাগ্রচিত্তে সামনে তাকিয়ে আছে সার্জেন্ট। আতাসী কয়েক ধাপ ওপরে, হাতে স্টার্লিং প্রস্তুত। আচমকা কোন বিপদ দেখা দিলে মোকাবিলা করবে।
এগিয়ে আসছে জেট রেইডার। আর পঞ্চাশ গজ। আবার হামলা করল জেমিনি। বিপজ্জনক কাছে এসে পড়ল একটা, ব্রাশ ফায়ারের তোড়ে ওপরের সবাইকে মাথা নিচু করে শেল্টার নিতে বাধ্য করল। ওপর থেকে রানার জিপিএমজির তাড়া খেয়ে অবশ্য পালাল ওটা শেষ পর্যন্ত। কিন্তু রানা শঙ্কিত হয়ে উঠল, খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ব্যাপারটা। একদম খোলা জায়গায়। আছে দারভিশ, আতাসী, হয়তো পরেরবারই মারাত্মক বিপদ ঘটে যাবে।
হঠাৎ জমে গেল ও। একটা জাহাজ! এদিকেই আসছে।
বোকার মত তাকিয়ে থাকল। কোত্থেকে এল? কিসের ওটা? কাদের? বাজে একটা শঙ্কা মনে উঁকি দিল, তাহলে কি ওটা এদের মাদারশিপ? এখনও মাইল কয়েক দূরে আছে যদিও, কিন্তু বুঝতে অসুবিধে হয় না বেশ বড় জাহাজ ওটা।
নিচে ফেইটারের কালো হাল একটু একটু করে দুই স্কুটারের দিকে এগোচ্ছে। হয়তো মন বিক্ষিপ্ত বলে সময়মত সঠিক সঙ্কেত দিতে ভুল হয়েছিল রানার, একটু বেশি ঘুরে গেল বাংলার গৌরব, দড়াম করে বাড়ি খেল একটা স্কুটার। ছিটকে চলে গেল নাগালের বাইরে। মনে মনে হায় হায় করে উঠল দারভিশ, অন্যটা ধরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। ল্যাডারের রেইল ধরে যতদূর সম্ভব ঝুঁকে ডান হাত বাড়াল। এমন সময় কেঁপে উঠল ফ্রেইটার, পিছন দিকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের আওয়াজ উঠল, একই সাথে স্টীল প্লেটিঙ ছেঁড়াখোঁড়ার বিকট শব্দ।
শেলিং করছে ওরা! চেঁচিয়ে বলল জামাল শামলু। শোল্ডার-বোর্ন মর্টার, মেজর!
প্রমাদ গুণল রানা। যা আশঙ্কা করছিল, ঠিক তাই করছে ওরা। ফ্রেইটারের পিছনে শেলিং করছে, প্রপেলার বরবাদ করে দিতে চাইছে। যদি তা করতে পারে, তাহলে ওপরে উঠে আসা কয়েক মিনিটের ব্যাপার। ব্যস্ত হয়ে উঠল। ও। ওদিকে ফ্রেইটার দুলে উঠতে বেসামাল হয়ে পড়েছিল দারভিশ, পড়েই যাচ্ছিল আরেকটু হলে, থাবা দিয়ে ধরল আতাসী। একই মুহূর্তে সে-ও চট করে ধরে ফেলল দ্বিতীয় স্কুটারের হ্যাঁন্ডেলবার। দেখতে পেয়ে বাঁদরের মত কয়েক লাফে কম্প্যানিয়নওয়ে পেরিয়ে এল রানা, জিপিএমজি ঘাড়ে নিয়ে ছুটল জ্যাকব ল্যাডারের দিকে।
আধ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্রেইটারের গা থেকে আলাদা হয়ে ছুটতে শুরু করল জেট রেইডার। রানা চালাচ্ছে, পিছনে বসে আছে আতাসী। ওর স্ট্যাব জ্যাকেট বাতাসে ঢোলের মত ফুলে আছে। ওদের আচমকা খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসতে দেখে অবাক হলো কমান্ডোরা। তাকিয়ে থাকল দূর থেকে। ওদিকে পুব আকাশ রাঙিয়ে দিয়ে সূর্য উঠতে শুরু করেছে।
একরাশ ফেনা তুলে তীক্ষ্ণ বাঁক নিল জেট রেইডার, থেমে পড়ল। তখনই ফ্রেইটারের পিছন থেকে দুনম্বর শেল ছোঁড়া হলো, দুলে উঠল বাংলার গৌরব। স্টার্নের প্লেটিং ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ওটা আরেকটু নিচে। লাগলে…ভাবনার সময় নেই।
রেডি? কর্কশ গলায় বলল ও।
স্টার্লিঙের স্ট্র্যাপ ঘাড়ের আরেক পাশে বাধিয়ে জিপিএমজি নিয়ে তৈরি হলো বেদুইন। ইয়েস, বস।
দূরের জাহাজটার দিকে এক পলক তাকাল রানা। এখনও যথেষ্ট দূরে আছে। ওটার চিন্তা পরে করলেও হবে। ওদিকে তিন জেমিনি রানার মতলব কি বুঝতে না পেরে আলাদা হয়ে গেল পরম্পর থেকে। একটা তেড়ে এল, দেখতে দেখতে সর্বোচ্চ চল্লিশ নটে উঠে গেল ওটার, গতি। নাক উঁচু করে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে।
চললাম, বলল রানা, একচোটে অর্ধেকেরও বেশি ওপেন করে দিল থ্রটল। ঘোড়ার মত লাফ দিল জেট রেইডার, তেড়ে আসতে থাকা জেমিনির দিকে দৌড় শুরু করল। অন্য দুই জেমিনিও তৈরি হলো, যে কোন মুহূর্তে ছুটে আসবে। তুফান বেগে পরস্পরের দিকে ছুটছে প্রথম জেমিনি ও জেট রেইডার। জেট রেইডারের গতি জেমিনির তুলনায় বেশ কম, কিন্তু ওটার মত যখন-তখন তীক্ষ্ণ বাঁক নেয়ার বা বাউলি কাটার ক্ষমতা নেই জেমিনির।
সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগাল মাসুদ রানা, ঘন ঘন এঁকেবেঁকে ছুটছে। দুশো গজ দূরে থাকতে গর্জে উঠল ওদের হেভি মেশিনগান। মাথার ওপর দিকে ঝক ঝাঁক তপ্ত সীসা উড়ে গেল। দ্বিতীয় সুযোগটা তখনই চোখে পড়ল রানার, সেটা হলো ওদের বিরুদ্ধে শত্রুর হেভি মেশিনগান বেকার। এমনিতেই সারফেসে অনেক নিচু টার্গেট জেট রেইডার, ওদের মেশিনগান ট্রাইপডের ওপর বসানো বলে ঠিকমত অ্যাঙ্গেল পাচ্ছে না ব্যাটারা, তারওপর জেট রেইডার যত কাছে আসছে, ওদের গুলিও ততই ওপরমুখো হচ্ছে।
আতাসীর সুবিধের জন্যে ঝুঁকে, হ্যাঁন্ডেলবারের ওপর প্রায় শুয়ে চালাচ্ছে। রানা। চোখ কুঁচকে সামনে তাকিয়ে আছে অগ্রসরমান জেমিনির ফ্ল্যাট বোর দিকে, ঢেউয়ের মাথায় দড়াম দড়াম আছাড় খেতে খেতে ছুটে আসছে ওটা। বাকি দুই জেমিনি সঙ্গীদের কথা ভেবে গুলি করতে সাহস পাচ্ছে না, তফাতে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে।
এসে পড়েছে শত্রু, চারটে ফরসা, ঘামে ভেজা মুখ দেখতে পাচ্ছে রানা, প্রতি মুহূর্তে আরও কাছে চলে আসছে। হঠাৎ চেহারাগুলো ঝাপসা হয়ে গেল। পাশ কাটাবার সময়। পিছন থেকে এক পশলা গুলি বৃষ্টি করল আতাসী, পরমুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল জেমিনি। কম করেও সত্তর মাইল বেগে। পরস্পরকে পাশ কাটাল নৌযান দুটো।
গতি কমিয়ে বাঁক নিল রানা, খুশিতে দাঁত বেরিয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। ওদের টার্গেটের এঞ্জিন কম্পার্টমেন্ট থেকে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। থেমে পড়ছে ওটা। দুই আহত সঙ্গীকে নিয়ে অন্যরা ব্যস্ত। সমস্যা টের পেয়ে অন্য দুটোর একটা এগিয়ে আসতে শুরু করেছে প্রথম জেমিনির সাহায্যে। বাকিটা দূরে, প্রায় অনড়।
রেডি! হুঙ্কার ছাড়ল রানা।
বুড়ো আঙুল তুলল আতাসী, পরমুহূর্তে পিছনদিকে জোর ঝাঁকি খেল স্কুটার লাফিয়ে উঠতে। দ্বিতীয় জেমিনির দিকে ছুটল রানা, প্রায় একই মূহর্তে একসাথে গর্জে তিনটের তিন হেভি মেশিনগান। স্কুটার ঘুরিয়ে চট করে বড় দুই ঢেউয়ের মাঝখানের গর্তে সেধিয়ে গেল রানা। আড়ালে আড়ালে খানিকদূর। এগোল, তারপর আরেক চকিত লাফে পরের গর্তে গিয়ে পড়ল। ওদের দেখে চেঁচিয়ে উঠল দ্বিতীয় জেমিনির এক কমান্ডো, কিন্তু পানার ট্রিগার টানার সুযোগ পাওয়ার আগেই হারিয়ে গেল স্কুটার।
দ্বিতীয় গর্তে পড়েই ওটাকে বিপরীতমুখী ঢেউয়ের দিকে ঘুরিয়ে দিল রানা। আতাসী, এইবার!
পিছন থেকে এল ঢেউটা, তাই জেট রেইডারের পিছনদিক জাগল প্রথমে। সঙ্গে সঙ্গে ওর কানের পাশে হুঙ্কার ছেড়ে উঠল আতাসীর জিপিএমজি, দ্বিতীয় জেমিনির রাবারের দেহ আর কমান্ডোদের হাড় মাংস ছিঁড়ে খুঁড়ে বেরিয়ে গেল এক ঝাঁক তপ্ত মৃত্যুবান। আহতদের যন্ত্রণাকাতর চিৎকারে চাপা পড়ে গেল সব।
বস, জিপিএমজির গুলি শেষ! ভয়ে ভয়ে তৃতীয় জেমিনির দিকে তাকিয়ে বলল আতাসী। ওটা ফেলে স্টার্লিং তুলে নিল।
কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল রানা, ঘুরে দেখল তিন নম্বর জেমিনি ছুটে আসতে শুরু করেছে। ওটার হেভি মেশিনগানের গর্জনে আকাশ-বাতাস কাঁপছে। তবে সঙ্গীদের দুর্দশা দেখে সতর্ক হয়ে গেছে ওটার বোসান, কাছে আসছে না। বিপদ! কাছে না এলে স্টার্লিঙের পাল্লায় পাওয়া যাবে না ওটাকে, তারওপর আছে উল্টো গুলি খাওয়ার আশঙ্কা। দ্রুত উপায় ভাবতে লাগল রানা।
বস্, ডেকে উঠল বেদুইন। কিছুক্ষণ শেয়াল দৌড় দৌড়ালে ভাল হত মনে হয়।
মানে?
এলোপাতাড়ি দৌড়ঝাঁপ করার ফাঁকে সুযোগ বুঝে স্পীড কমিয়ে ওটাকে কাছে টেনে আনতে হবে। নইলে উপায় নেই আমাদের।
বুদ্ধিটা মন্দ নয়, ভাবল রানা, তবে প্রচুর ঝুঁকি আছে। অবশ্য ঝুঁকি এখন এমনিতেও আছে, অমনিতেও আছে। অতএব আতাসীর পরামর্শ কাজে লাগিয়ে। দেখবে ভাবল ও। দুরে হুঙ্কার ছাড়ল জেমিনির এঞ্জিন। না, রওনা হয়ে পড়েনি, হওয়ার আগে কেশে নিচ্ছে ভাল করে। কালো ধোয়া বের হলো পিছন থেকে। ওদিকে অজ্ঞাত জাহাজটা এসে পড়েছে, আর বড়জোর মাইলখানেক দূরে। আছে। ফ্ল্যাগ নেই।
দেরিতে হলেও বুঝে ফেলল রানা ওটা কাদের। ইসরাইলীদের। কমান্ডোরা ওটায় চড়েই লম্বা পাড়ি দিয়েছে সাগরে। জেমিনিতে চড়ে দুনিয়া ঘুরে এতদূর আসা অসম্ভব। ওটা নিশ্চয়ই এদের মাদারশিপ বা কমান্ডশিপ।
এইচএমজির টানা হুঙ্কারে চিন্তাভাবনা তলিয়ে গেল, পানিতে বাকা এক লাইন ধরে বুলেট এগিয়ে আসছে দেখে থ্রটল ওপেন করল রানা। বোলতার মত গুঞ্জন করে উঠল জেট রেইডারের পঁয়ত্রিশ হর্স পাওয়ারের সেলভা এঞ্জিন। এঁকেবেঁকে ছুটল। পিছনে লাইন ধরে এগিয়ে আসছে বুলেট, রেইডারের লেজের সাথে ব্যবধান কমে আসছে দ্রুত। এই অবস্থায় ওটার কাছে ঘেষার। কথা চিন্তা করাও বোকামি।
কাজেই ছুটতেই থাকল ও। মরিয়া হয়ে উপায় খুঁজছে। বুঝতে পারছে বড়জোর আটাশ নট গতিতে ছুটছে ওরা, ওদিকে জেমিনি আসছে কম করেও পঁয়ত্রিশ নট গতিতে। প্রতি সেকেন্ডে ব্যবধান কমছে। ওটাকে স্টার্লিঙের বাগে। পেতে হলে রানাকে গতি কমাতে হবে, কিন্তু তা অসম্ভব। বিপজ্জনকভাবে। কাছিয়ে আসছে বুলেট, এ মুহূর্তে যত জোরে সম্ভব পালানোর চেষ্টাই হবে। বুদ্ধিমানের কাজ।
কি দেখে চোখ কুঁচকে উঠল রানার। সামনে এক জায়গায় পানিতে মৃদু আলোড়ন উঠছে, ছোট ছোট ঢেউ ভেঙে পড়ছে। কিন্তু ওটা ঠিকমত চিনে ওঠার বা কিছু করার কথা ভাবার আগেই সময় পেরিয়ে গেল, বিদ্যুৎবেগে এসে পড়ল জিনিসটা। একেবারে অন্তিম মুহূর্তে রানা বুঝল ওটা কি। কোরাল রীফ।
চেঁচিয়ে উঠল আতাসী। ইয়াল্লা! মেজর, সাবধান! বলেই একহাতে ওর কোমর জাপটে ধরল।
হোল্ড অন! ওর সতর্কবাণী পুরো হওয়ার আগেই স্কুটারের নিচের স্কি শু দড়াম করে কিছু একটার সাথে বাড়ি খেল, হাতের মুঠোয় হ্যাঁন্ডেলবার ভীষণ ঝাঁকি খেল, পরক্ষণে শূন্যে উঠে গেল জেট রেইডার। খানিকটা উড়ে গিয়ে হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ল একরাশ পানি ছিটিয়ে সৌভাগ্য যে উল্টে পড়েনি। বড় এক লুপ তৈরি করে দূরে সরে যাওয়ার ফাঁকে কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল ওরা।
জেমিনির বোসানের চেহারা বিকৃত হয়ে উঠতে দেখা গেল, বুঝতে পেরেছে সে বিপদটা কি ধরনের। হেলম ঘোরাবার চেষ্টা করল লোকটা, কিন্তু পঁয়ত্রিশ নট গতিতে ছুটন্ত ইনফ্লেটেবেল গ্রাহ্য করল না। শেষ পর্যন্ত বো। পোর্টের দিকে সামান্য ঘুরল বটে, তবে ওই পর্যন্তই, কোনাকুনি সড়াৎ করে সোজা রীফের ওপর চড়ে বসল জেমিনি। পুরু রাবার ছেঁড়ার আওয়াজ দূর থেকেও পরিষ্কার শুনতে পেল রানা-আতাসী। ভয়ঙ্কর এক ঝকির সাথে শূন্যে উঠে গেল বোসান আর চার কমান্ডো। বড়শির টান খেয়ে উঠে পড়া মাছের মত হাঁচড়পাঁচড় করতে করতে কোরালের অসংখ্য ধারাল দাঁতের ওপর আছড়ে পড়ল।
আগুন ধরে গেল জেমিনির পেট্রল ট্যাঙ্কে, দ্বিতীয় সূর্যের মত বিস্ফোরিত হলো ওটা। নিচে পড়েই বিস্ফোরণের ধাক্কায় ফের শূন্যে উঠে গেল একটা দেহ, ইংরেজি X-এর মত হাত-পা ছড়িয়ে কয়েকটা পাক খেয়ে আবার পড়ল। বোটের জ্বলন্ত অজস্র ছোট-বড় টুকরো পানিতে পড়ে জ্বলতে থাকল। উল্টেপাল্টে পড়ে থাকা দেহগুলোর কোনটায় প্রাণের স্পন্দন দেখা গেল না।
.
ওটা আমাদের ইন্টারসেপ্ট করতে আসছে, নিচু গলায় বলল দারভিশ।
মাথা ঝাঁকাল চিন্তিত রানা। তাই তো মনে হচ্ছে। কিন্তু ওটা কি, মানে, কোন দেশী জাহাজ? আবার চোখে বিনকিউলার লাগাল।
একেবারে ঝরঝরে চেহারার জাহাজ ওটা। কত যুগ পেইন্টের ছোঁয়া। পায়নি বলা মুশকিল। এমন চেহারা, দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে না। তবে ওটার এঞ্জিন যে অস্বাভাবিক শক্তিশালী, চলা দেখলেই বোঝা যায়। এ মুহূর্তে অবশ্য গতি কম, আস্তে ধীরে এগোচ্ছে। বাংলার গৌরবের আধ। মাইল দূরে আছে এখনও। ব্রিজ থেকে রেডিও অফিসার জয়ন্তর ডাক শোনা। গেল হঠাৎ। মেজর, ওটী ভাকছে আপনাকে।
তাড়াতাড়ি এসে রেডিওর সামনে বসল রানা। তখনই কড়া হিব্রু অ্যাকসেন্টের ইংরেজিতে বলে উঠল একটা কণ্ঠ, ইরগুন লিউমি কলিং বাংলার। গৌরব। ডু ইউ রীড মিঃ ওভার।
সন্দেহ সত্যি হওয়ায় আশ্বস্ত হলো ও। আই রীড ইউ, ইরগুন লিউমি।
জাহাজ থামান, প্লীজ। আমরা পাশে ভিড়তে চাই।
নেগেটিভ। আপনাদের মতলব যাই থাকুক, পূরণ হবে না। সময় থাকতে সরে পড়ন।
হেসে উঠল কলার। দান দান তিনদান বলে একটা কথা আছে, বাংলার। গৌরব। দুদান আপনি জিতেছেন, স্বীকার করছি। কিন্তু এই দানটা আমার। জাহাজ থামান! হঠাৎ কঠোর হয়ে উঠল তার গলা। সময় থাকতে গালফ পার্লে উঠে পড়ুন আপনারা, প্রাণ বাঁচান।
পরামর্শের জন্যে ধন্যবাদ, বলল রানা। কিন্তু গ্রহণ করতে পারছি না, দুঃখিত। কীপ ক্লীয়ার।
অল রাইট। আমি আপনাকে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে সাহায্য করছি। একটু অপেক্ষা করুন প্লীজ।
আই কনফার্ম। খোলা ব্রিজ উইং দিয়ে বাইরে তাকাল রানা। কি করতে যাচ্ছে ব্যাটা? চিন্তায় কুঁচকে আছে কপাল। অন্যরাও লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে। একটুপর দ্বিতীয় ধারণাও সত্যি হলো ওর, দেখতে যা-ই হোক, কাজের বেলায় ওটা কোন সাধারণ শিপ নয়। স্টার-সাইড ব্রিজের বড়সড় জিনিসটার ওপর থেকে ত্রিপল, সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বেলজিয়ান বোফোর্স গান, ওটা।
সেরেছে! নিচু গলায় বলল আতাসী। ওরা দেখছি…
হ্যালো, বাংলার গৌরব! বলে উঠল সেই কণ্ঠ। আমি কি ধরে নেব আপনি এখনও আগের সিদ্ধান্তে অটল?
ঠিক ধরেছেন, সেইলর।
তাহলে এবার আরেকটু লক্ষ করুন।
সবার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে বোফোর্স গানের প্রকাণ্ড ব্যারেল ঘুরতে শুরু করল বাংলার গৌরবের দিকে। সম্মোহিত চোখে দেখছে রানা, ফ্রেইটারের। কাগো হোল্ড বরাবর তাক করা হয়েছে ব্যারেল। আতকে উঠল ও মনে মনে। যদি বাই চান্স একটা গোলা হিট করে ওখানে, সর্বনাশ হয়ে যাবে। ভেতরের। গোলা বারুদ তো সব যাবেই, জাহাজটাও যাবে।
এবার কি, বাংলার গৌরব?
আমার আঙুল মে-ডে বাটনে, ইরগুন লিউমি, গম্ভীর গলায় বলল রানা। আপনি নিশ্চই চান না ওমানী বা আমিরাত প্যাট্রল ছুটে আসুক। ওরা সমস্ত ট্রাফিক মনিটর করে জানেন হয়তো।
জানি, দৃঢ় আস্থার সাথে বলল কলার। কিন্তু ওরা এলেও আপনার কোন লাভ হবে না, কারণ ততক্ষণে সী বেডে থাকবেন আপনারা ফ্রেইটারসহ।
আমি আকাশ প্যাট্রলের কথাও বোঝাতে চেয়েছি। অসহায় পরিস্থিতি টের পেয়ে নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠল রানা। তীরে এসে তরী, ডোবার আশঙ্কায় অস্থির। এখন আর কোন উপায় দেখতে পাচ্ছে না।
হেসে উঠল কলার। সে চিন্তা আগেই করে রেখেছি আমরা, বাংলার গৌরব। সে ক্ষেত্রেও শেষ পরিণতির কোন হেরফের হবে না। আমাদেরকেও যদি মরতে হয়, ক্ষতি নেই। কিন্তু আপনার ফ্রেইটারকে যেতে দিচ্ছি না। বি শিওর অভ দ্যাট। আপনি কোন ট্রিক খাটাতে চাইলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন নেব।
এবার? বলল আতাসী। চেহারা কালো হয়ে গেছে। এত কিছু সব মাঠে মারা যাবে?
জবাব না দিয়ে রেডিওর ওপর ঝুঁকল মাসুদ রানা। ঠিক আছে, ইরগুন লিউমি। এক ঘণ্টা সময় দিতে হবে। নিজেদের মধ্যে একটু আলোচনা করতে হবে আমাদের।
কিসের আলোচনা? আলোচনার কি আছে?
আমার সাথে কয়েকজন প্যালেস্টাইনী অফিশিয়াল আছে, ইউ নো! বিস্মিত আতাসীর দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসল রানা। এতদূর এসে সারেন্ডার করতে বাধ্য হওয়া ওদের জন্যে খুবই কষ্টকর, বুঝতেই পারছেন। ইমোশনাল হয়ে পড়েছে সবাই। একটু সান্ত্বনা দেয়া দরকার।
ওর বোলচালে হাঁ হয়ে গেল প্রত্যেকে। চোখ কপালে তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এসব কি বলছ তুমি, বস? ফ্যাসফেসে গলায় আতাসী বলল। সারেন্ডার করবে?
শাট আপ! ধমক লাগাল ও রেডিওর সুইচ ইচ্ছে করে অন রেখে। যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বোলো না। সারেন্ডার না করে উপায় কি, দেখাও আমাকে। তোমাদের জন্যে আমি আমাদের জাহাজ হারাতে পারব না।
হ্যালো, বাংলার গৌরব! আপনার পরিচয় জানতে পারি?
আমি ফেইটারের স্টাফ। সেকেন্ড অফিসার।
একটু বিরতি। আই সী! ঠিক আছে, সময় দেয়া হলো। তবে আধ ঘণ্টা। এর মধ্যে কাজ সারুন। ওদের বোঝান, সারেন্ডার করা ছাড়া সত্যিই কোন উপায় নেই। খুট শব্দে অফ হয়ে গেল রেডিও।
এটা কি করলে তুমি, মেজর? হতাশ কণ্ঠে আতাসী বলল। তুমি শেষ। পর্যন্ত…
পাত্তা দিল না ও। সার্জেন্ট দারভিশ। কাম হিয়ার।
রানার ডাকের মধ্যে জরুরী ভাব আছে বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি এগিয়ে। এল সে। মেজর!
বাহু ধরে তাকে এককোণে টেনে নিয়ে গেল ও। নিচু গলায় দ্রুত কিছু বলল। দুচোখ জ্বলে উঠল তার, ঘন ঘন কয়েকবার মাথা দোলাল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে গেল ব্রিজ ছেড়ে।
কি হলো? চোখ কুঁচকে তাকে দেখল আত্রাসী। কোথায় যাচ্ছ তুমি?
সার্জেন্ট শুনতে পেয়েছে কিনা বোঝা গেল না, বেরিয়ে গেল কিছু না। বলে। রেগেমেগে তাকে অনুসরণ করতে যাচ্ছিল আতাসী, হাত ধরে টেনে থামাল রানা। যেতে দাও ওকে।
কোথায় যাচ্ছে লোকটা? অনিশ্চিত দৃষ্টিতে রানাকে দেখল বেদুইন। চাউনিতে দ্বিধা, অবিশ্বাস।
তুমি আজও দুম্বাই আছ, একথা আমি বিশ্বাস করি না, লেফটেন্যান্ট, বলল রানা। দারভিশ জরুরী কাজে গেছে। চলে আসবে। ঘড়ি দেখল, মহামূল্যবান পাঁচটা মিনিট পেরিয়ে গেছে এরইমধ্যে।
আটটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি, আটটা বিশে শেষ হয়ে যাবে ডেডলাইন।
.
জেরুজালেম। প্রধানমন্ত্রীর অফিস।
যেনেক প্ল্যানিং কমিটির সবাই বসে আছে নীরবে। কারও মুখে কথা। নেই। চোখ লাল সবার, রাতে ঘুম হয়নি একজনেরও। সবচেয়ে করুণ অবস্থা যাহাল চীফ মেজর জেনারেল ইয়াদ এলিয়াহুদের। ইরগুন লিউমির কোডেড মেসেজ পাওয়ার পর থেকে মনের দুঃখে, লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে তার। কর্নেল ইয়েহোনাথানের মত বিশ্বের সেরা কমান্ডো তার মিশনে ব্যর্থ হয়েছে, মরে গেছে, এখনও মেনে নিতে পারছে না।
মোসাদ চীফ ইয়েহুদা বেন মেইর আজ বেশ ক্ষুব্ধ। এলিয়াহুদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই যে ডুবিয়েছে, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তার সংস্থার স্পাইরা অনেক পরিশ্রম করে এ ধরনের একেকটা টপ সিক্রেট খবর জোগাড় করে আনে, আর এইসব উচ্চাভিলাষী অকম্মার ধাড়ী অফিসাররা…
ওগুলো তাহলে গেছে? যাহাল চীফকে প্রশ্ন করল প্রধানমন্ত্রী। নির্বিকার গলা, একটু যেন অসন্তুষ্ট। ওরা সবাই মারা গেছে?
হ্যাঁ, মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, দূরাগত, অনিশ্চিত গলায় বলল, মিকিমাউস। মারা গেছে।
আটজনই?
হ্যাঁ।
স্ট্যান্ডবাই টীম কি করছে?
ওরা ধরার চেষ্টা করছে বাংলার গৌরবকে, একটু যেন উৎসাহিত দেখাল। তাকে। ওরা বারোজন হয়তো একটা..।
কিছুই করতে পারবে না ওরা, বাধা দিয়ে বেন মেইর বলল বিরক্ত গলায়। আপনি জানেন, ইনলেট থেকে জাহাজ বের করে নিয়ে গেছে ওরা। খোলা সাগরে ওটাকে ফের. আটক করা অসম্ভব একটা কাজ। আমিরাত বা ওমানী নেভির চোখে পড়ে গেলে উল্টে বারোটা বাজবে আমাদের।
কিন্তু ইরগুন লিউমি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মুসানডেম পেনিনসুলাতেই ছিল, ওদের কারও চোখে পড়ার কোন খবর পাইনি।
খবর পেলে কি করবেন? যদি খারাপ খবর.হয়?
রাগে ভেতরে ভেতরে ফুলতে লাগল এলিয়াহুদ, তবু গলা যথাসম্ভব শান্ত। রেখে বলল, সব সময় নেগেটিভ চিন্তা করা ঠিক নয়। কার;
আপনি তো পজিটিভ চিন্তাই করেছিলেন, ফল কি হলো?
ফল হয়তো হত, যদি আপনার মেজর রোমান শেষ সময়ে পিছিয়ে না যেত।
তার জন্যেই আপনার মিশন বানচাল হয়েছে, তেমন কোন খবর কিন্তু এখনও আসেনি।
প্রধানমন্ত্রী মুখ খুলল। অনর্থক তর্ক করে লাভ নেই। তারচেয়ে আসুন, আজ সাবাথ ডে। আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি স্ট্যান্ডবাই টীম যেন অন্তত সফল হয়।
.
মাসিরাহ। ওমানী এয়ারফোর্সের ৮ম স্কোয়াড্রনের বেজ।
সকাল সোয়া আটটায় নিজের জাগুয়ার অ্যাটাক জেট নিয়ে আকাশে উঠল নাফিজ মুলতানী। দ্বীপের ওপর দুটো চক্কর দিয়ে আগের দিনের মত উত্তর পশ্চিমে ছুটল বিদ্যুৎগতিতে। দেখতে দেখতে ওমানের উপকূল তার পিছনে অদৃশ্য হয়ে গেল।
*
বাংলার গৌরব। সোয়া আটটা।
আর পাঁচ মিনিট বাকি ডেডলাইন পার হতে। ইরগুন লিউমির উল্টোদিকের জ্যাকব ল্যাডার বেয়ে পুরোদস্তুর ডাইভিং ইকুইপমেন্ট পরা সার্জেন্ট দারভিশকে উঠে আসতে দেখে সবার চোখ কপালে উঠল। কেউ সাগরে নামতে দেখেনি তাকে। মাস্ক আর পিঠের বোঝা খুলে সোজা ব্রিজে উঠে এল সে। মৃদু, স্বাভাবিক গলায় রানাকে বলল, কাজ শেষ, স্যার।
গুড! তার পিঠ চাপড়ে দিল ও। ফার্স্ট মেটের দিকে তাকাল। রফিক! স্লো অ্যাহেড!
স্যার? বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকল যুবক। অন্যরাও অবাক হলো, পালা করে রানা-দারভিশ-রফিকের দিকে তাকাতে লাগল।
স্লো অ্যাহেড, রফিক।
আতাসী দুপা এগোল। কি বলছ তুমি, বস? ওরা গুলি ছুড়বে তো!
একটু পর এমনিতেই চুড়বে। আগে থেকে তাই সরে যেতে চাই বোফোর্স কামানের সামনে থেকে।
চেহারা আরও হতভম্ব হয়ে উঠল তার। মানে?
অপেক্ষা করো। এখনই বুঝতে পারবে।
এতক্ষণ যা একটু দ্বিধা ছিল ফার্স্ট মেটের, রানার শেষ মন্তব্যে দূর হয়ে গেল। বিনাকলের চকচকে পিতলের হাতল ধরে টান দিল সে, এঞ্জিনরূমে। ক্রিং ক্রিং বেল বেজে উঠতে শোনা গেল। পানির আলোড়ন উঠতে শুরু করল। স্টার্নে।
এমন সময় রেডিও খড়মড় করে উঠল। বাংলার গৌরব, কি হচ্ছে?
সময় শেষ হয়ে এসেছে, জবাব দিল রানা। আপনাদের সাইডে ভিড়তে আসছি।
ততক্ষণে স্টার্ন ঘুরতে শুরু করেছে ফ্রেইটারের। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বে কেটে গেল, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে ফেলল ইরগুন লিউমি। মহামূল্যবান সময়টুকু পুরো কাজে লাগাল রানা, বোফোর্সের ভীতিকর ব্যারেলের সামনে থেকে সরিয়ে আনল বাংলার গৌরবকে। বেশ খানিকটা সরে এসে থেমে পড়ল। এখন চেষ্টা করলেও এদিকে ব্যারেল ঘোরাতে পারবে না ইরগুন লিউমি।
কি হলো, বাংলার গৌরব? কলার বলল কড়া গলায়। থেমে পড়লেন কেন? হারি আপ!
মৃদু হাসির রেখা ফুটল রানার মুখে। দারভিশের দিকে তাকাল। দুঃখিত, ভায়া! প্রপেলারে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
একটু বিরতি। অল রাইট আমরা আসছি।
আমি কিন্তু আমার প্রপেলারের সমস্যার কথা বলিনি, বলেছি আপনার প্রপেলারের কথা।
হোয়াট! বিস্ফোরিত হলো কলার। মানে?
মানে আমার বন্ধুরা কিছুতেই জাহাজ সারেন্ডার করতে রাজি হলো না, তাই বাধ্য হয়ে…
চালাকির চেষ্টা করবেন না। তাহলে ভয়ঙ্কর পরিণতি হবে।
না, গম্ভীর হয়ে গেল ও। সেরকম কিছু করছি না। আমি শুধু আপনাদের এবং আপনাদের যারা এ কাজে পাঠিয়েছে, তাদের আক্কেলের গোড়ায় খানিকটা পানি টেলে বুদ্ধির উর্বরতা বাড়াবার চেষ্টা করছি।
কি বলতে চান আপনি?
আমাদের সাথে কয়েকজন প্যালেস্টাইনী অফিশিয়াল আছেবলেছিলাম না? তার মধ্যে একজন হচ্ছেন সার্জেন্ট নামটা গোপনই থাক, প্যালেস্টাইন সুইমার কমব্যাট ইউনিটের লোক। একটু আগে লম্বা ডুব সাঁতার দিয়ে ফিরেছেন তিনি, আপনারা দেখেননি।
এইবার কেঁপে গেল…কলারের স্বর। বুঝলাম না, ডুব সাঁতার মানে কোত্থেকে ফিরেছে?
ইরগুন লিউমির স্টার্ন থেকে।
ফ্রেইটারের হুইলহাউসের সব কটা মুখ ঘুরে গেল সার্জেন্টের দিকে। অবাক বিস্ময় সবার চাউনিতে, কিন্তু সে নির্বিকার। স্ফিংস বনে গেছে আবার।
অ্যাঁ! কলারের আঁতকে ওঠা টের পেল রানা পরিষ্কার।
হ্যাঁ। কেন, জিজ্ঞেস করলেন না?
কেন? শব্দটা আপনাআপনি বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে।
আপনার স্লো মুভিং প্রপেলারে দড়ি প্যাচাতে। ছয়শো বিশ মিটার অ্যাবসেইল রোপ কয়েলের আস্ত একটা খরচ করে এসেছেন সার্জেন্ট। কাজেই এ অবস্থায় মুভ করার কথা ভাবাও উচিত হবে না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল ও। রেডিওতে কলারের চাপা গলার নির্দেশ শুনতে পেল, কাউকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছে।
দেখুন চেষ্টা করে ফাঁদ থেকে বের হতে পারেন কিনা। আমরা চলি, তাড়া আছে। সো লঙ, জেন্টলমেন! আর হ্যাঁ, আপনাদের ব্যবস্থা করতে ওমানী প্লেন আসছে। বাঁচতে হলে পানিতে ঝাঁপ দিন এখনই। আমাদের সাথে স্যালভিজ শিপ আছে, তুলে নেবে আপনাদের।
তৃপ্তির সাথে ইরগুন লিউমির ডেকের হুড়োহুড়ি দেখল ও কিছুক্ষণ। সামনে-পিছনে সন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে মানুষগুলো, দিশে করে উঠতে পারছে না কি করবে, কোনদিকে পালাবে।
রফিকের দিকে ফিরল রানা। স্লো অ্যাহেড, মেট, লেফট রাডার।
টেলিগ্রাফিক বেলের আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই গুম গুম করে উঠল সতেরো হাজার হর্স পাওয়ারের বারমেস্টার অ্যান্ড ওয়েন। ধীরগতিতে এগোতে শুরু করল বাংলার গৌরব, সেই সাথে বায়ে সরছে একটু একটু করে।
গালফ পার্লের সাথে যোগাযোগ করে তাকে দূরে সরে অপেক্ষা করতে বলল রানা। কেন? প্রশ্ন করল রিক ওরফে চায়না ক্লে।
তেড়ে উঠল ও। ফের প্রশ্ন করে!
হাসি শোনা গেল লোকটার, ঘুরতে শুরু করল গালফ পার্ল। ঠিক তখনই বিকট শব্দে মুখ তুলে তাকাল সবাই। মেটে আর বাদামী রঙের একটা ফাইটার, বেশ নিচু দিয়ে এদিকেই আসছে। চারগুণ হুড়োহুড়ি পড়ে গেল ইরগুন লিউমির ডেকে। কানে তালা লাগিয়ে বড় দুই জাহাজের মধ্যে দিয়ে। ছুটে গেল ওটা চকিত এক ঝলকের মত। কাৎ হয়ে চক্কর শুরু করল, ঘুরে এখনই এসে হাজির হবে আবার।
বেজ যাতে শুনতে না পায়, সে জন্যে নিজের রেডিওর নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি খুব অল্প সময়ের জন্যে বদলে কদিন আগে রানার বেঁধে দেয়া ফ্রিকোয়েন্সিতে সেট করল নাফিজ মুলতানী। একটাই প্রশ্ন করল, শত্রু, রানা?
এক শব্দে জবাব দিল ও। ইয়েস!
সঙ্গে সঙ্গে নিজের ফ্রিকোয়েন্সিতে ফিরে গেল পাইলট। বেজকে জানাল, সাগরে একটা সন্দেহজনক ডাউ দেখতে পেয়েছে। মনে হচ্ছে স্মাগলিং ডাউ। সে যা আশা করছিল, সেই নির্দেশই এল তৎক্ষণাৎ-ডুবিয়ে দাও। নিচু হলো নাফিজ মুলতানী, গতি বাড়িয়ে হুট ছুট লাগাল ইরগুন লিউমিকে লক্ষ্য করে। সময়মত বাটন টিপে দিল।
দুটো ত্রিশ এমএম এডেন মিসাইল ছুটে গেল জাগুয়ারের ডানার নিচ থেকে, বিকট বিস্ফোরণের সাথে ওটার প্রায় পুরো সুপারস্ট্রাকচার টান মেরে ছিঁড়ে নিয়ে গেল, ছেঁড়া কাগজের মত উড়িয়ে দিল বাতাসে। কাৎ হয়ে উঠে যেতে শুরু করল এবার পাইলট। মামলা খতম।
বাংলার গৌরবের ব্রিজ উইঙে দাঁড়িয়ে সবাই দেখল সংক্ষিপ্ত, একতরফা হামলার ঘটনাটা। আতাসী, দারভিশ ও জামালের মুখে অনাবিল হাসি। চার দফারও হাসছে।
রানার কাছে সরে এল আতাসী। নিচু গলায় বলল, ভুল বুঝেছিলাম, বস্। মাফ করে দাও।
তার কাঁধ চাপড়ে হাসল ও। ইরগুন লিউমির দিকে তাকাল। স্থির হয়ে আছে ওটা, দাউদাউ করে জ্বলছে। তেলতেলে কালো ধোয়া ওপরে উঠে যাচ্ছে। রূপকথার ড্রাগনের মত মোচড় খেয়ে, প্রকাণ্ড এক ছাতা তৈরি করেছে আকাশে। যেদিকে রকেট আঘাত করেছে, সেদিকে একটু একটু করে কাৎ হয়ে পড়ছে জাহাজটা।
ডুবে যাচ্ছে অপারেশন যেনেক কমান্ডো বাহিনীর মাদার শিপ ইরগুন লিউমি।
.
নতুন ক্যাপ্টেন মাসুদ রানার পরিচালনায় নিজওয়ার দিকে ছুটে চলছে বাংলার গৌরব। সংস্কৃতি মন্ত্রী, দফার উপজাতির নেতা, শেখ আজিজ বিন সাউদ বিন নাসির, আল জাফরের নিজস্ব জায়গা ওটা। পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত জাহাজের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র ওখানে থাকবে, কথা হয়েছে রানার সঙ্গে। বাংলার গৌরবে কোন অস্ত্র নেই, একথা প্রমাণ করার স্বার্থে কাজটা না করলেই নয়। নইলে নতুন সমস্যা বাধিয়ে বসতে পারে জেরুজালেম।
তারপর, ওদের গায়ের জ্বালা একটু কমলে, পরিস্থিতি শান্ত হলে, অন্য পথে জায়গা মত পৌঁছে যাবে ওসব। সে অন্য কাহিনী।
আমাদের বর্তমান কাহিনীর এখানেই সমাপ্তি। খোদা হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
<