১৬.

ফ্যানটাসটিক আইডিয়া! সকালে নাস্তা খেতে খেতে হাঙ্গারকে বললো কিশোর। হ্রদের ধারে গাছের ওপর হোটেল বানানো!

একমত হলো পথপ্রদর্শক। হ্যাঁ, এর জন্যে কল্পনাশক্তি দরকার। বেরিয়েছিলো এক ভদ্রমহিলার মাথা থেকে। তাঁর নাম লেডি বেটি ওয়াকার। অনেক দিন আগে ন্যাশনাল পার্কে বেড়াতে এসেছিলেন। বিখ্যাত ক্লাসিক সুইস। ফ্যামিলি রবিনসনের খুব ভক্ত ছিলেন তিনি। সেই বই পড়া থাকায়ই গাছের ওপর বাড়ি বানানোর আইডিয়া ঢোকে তাঁর মাথায়। বেড়াতে এসে বন্ধুদের বলেছিলেন সেকথা। শুনে তো হেসেই খুন ওরা। কিন্তু লেডি ওয়াকার দমলেন না। বানিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

 একটা কাজের কাজই করেছেন তিনি, রবিন বললো। তার সৌজন্যেই কাল রাতে ওই চমৎকার দৃশ্য দেখার সুযোগ পেলাম।

তা তো পেলাম, শূন্য প্লেটটা ঠেলে সরালো মুসা। আমি ভাবছি আজকের কথা। সামনে খুব কঠিন কাজ পড়ে আছে।

প্লেনে ফিরে দেখা গেল, খাঁচার মধ্যে আরামে পাতার নাস্তা চিবুচ্ছে মিস্টার ওকাপি। হাজারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিমানে চড়লো তিন গোয়েন্দা।

সিংহের জন্যে বিখ্যাত সেরেঙ্গেটি প্লেইন-এর ওপর দিয়ে মুয়ানজার দিকে, উড়ে চলেছে বিমান। দুই ঘন্টা পর নামলো ভিক্টোরিয়া হ্রদের দক্ষিণ পারে।

বন্দরে এসে ভালো কোনো বোট পেলো না তিন গোয়েন্দা। অনেক চেষ্টার পর একটা নৌকা মিললো, নড়বড়ে ভেলাই বলা চলে ওটাকে। এককালে নদীতে ফেরী পারাপার করতো। একটিমাত্র আউটবোর্ড মোটর, বহু পুরনো, প্রচণ্ড আওয়াজ। অগত্যা ওটা নিয়েই রুবনডো আইল্যাণ্ডে চললো ওরা। ওয়ারডেন টমসন বলে দিয়েছেন, যেতে পনেরো ঘন্টা লাগবে, আর ওই সময়ে ঝড় আসবে অন্তত পাঁচবার। ভুল করেছেন তিনি। একটা ঝড়ই এলো, কিন্তু টিকে রইলো পনেরো ঘন্টারও বেশি।

বিশাল হ্রদ। উত্তর তীর থেকে দক্ষিণ তীরের দূরত্ব আড়াইশো মাইল। ঝড় এলো উত্তর থেকে, পুরো হ্রদটা পাড়ি দিয়ে বয়ে চললো দক্ষিণে। বড় বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ভেলার ওপর। ভিজিয়ে চুপচুপে করে দিচ্ছে যাত্রীদের।

বিমান-যাত্রা নির্বিবাদে সহ্য করেছে মিস্টার ওকাপি, নৌ-যাত্রা মোটেই পছন্দ করতে পারলো না। নানারকম বিচিত্র শব্দ করে প্রতিবাদ জানিয়েই চলেছে। অভ্যাস নেই, ভেলার দুলুনি সইতে পারলো না বেশিক্ষণ, বমি শুরু করলো। পেট থেকে বেরিয়ে এলো সমস্ত পাতা। ভেলার পাটাতনের কাঠামোতে শক্ত করে বাঁধা রয়েছে খাঁচাটা, এতো মচমচ করছে, গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছে খুলে, ভেঙে না। চলে যায়।

আর শুধু ঝড়ই নয়, ভিক্টোরিয়ার আরও দুর্নাম আছে। না না, মহারানী ভিক্টোরিয়া নন-যার নামে নাম রাখা হয়েছে এই অগাধ জলরাশির, ভিক্টোরিয়া। হ্রদের কথা হচ্ছে। মাঝে মাঝেই এর নিচে রয়েছে বালির চরা, পানির সমতলের ঠিক নিচে। ওগুলোতে আটকে যাচ্ছে ভেলা। ঢেউ তখন উপকারই করছে। আটকে থাকতে দিচ্ছে না। তবে সব সময় সেটা পারছে না। তখন ব্যাক গীয়ার দিয়ে পিছিয়ে আনতে হচ্ছে ভেলা। কখনও কখনও শুধু এঞ্জিনের জোরে কুলাচ্ছে না, চরায় নেমে ঠেলা লাগাতে হচ্ছে তিন গোয়েন্দাকে। একবার তো ওরকম ঠেলা লাগাতে গিয়ে রবিন পড়লো বিপদে, আরেকটু হলেই ভেসে গিয়েছিলো গভীর পানিতে, তাহলে আর বাঁচতো না। সবে চরায় নেমেছে ওরা, ছয় ফুট উঁচু এক ঢেউ এসে ধাক্কা দিয়ে চিত করে ফেলে দিলো ওকে। ভাগ্যিস মুসার হাত ধরে রেখেছিলো। সে আর কিশোর মিলে টেনে-হিঁচড়ে সোজা করলো রবিনকে।

বিপদ আরও আছে। কুমির আর জলহস্তী। অগুনতি। কিলবিল করছে যেন হ্রদের পানিতে, বিশেষ করে ইয়া বড় বড় কুমির। মাঝে মাঝে ঘ্যাঁশশ করে ঘষা লাগায় ভেলার নিচে, যেন গাছের গুঁড়ি একেকটা। উল্টে দেয়ার চেষ্টা করে। না পারলে পাশে ভেসে ওঠে। অসতর্ক আরোহী পেলে লেজের বাড়ি মেরে ফেলে দিতে পানিতে, তারপর, গাঁপ!

জলহস্তীর ভয় আপাতত তেমন নেই। ঝড়ের দাপটে পানিতে থাকতে পারছে না ওরা, গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে হ্রদের মাঝে মাঝে জেগে ওঠা দ্বীপে। ওরকম একটা দ্বীপের কিনার দিয়ে চলার সময় ধুড়ুম করে হঠাৎ কিসের সঙ্গে যেন বাড়ি লাগলো। ভেলার। মুহূর্ত পরেই দেখা গেল, এক পাশ ঠেলে উঠছে ওপর দিকে। নিচে থেকে কিসে যেন ঠেলে কাত করে যাত্রীদের ফেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। সুবিধে করতে না পেরে বেরিয়ে এলো ওটা। বিরাট এক মদ্দা হিপো, মানে জলহস্তী। বিরাট হাঁ করে মোটা মোটা দাঁত দেখিয়ে ভেঙচি কাটলো, তারপর বন্ধ করলো। এমন বিকট শব্দ হলো, মনে হলো সিন্দুকের ডালা পড়েছে। একটা বলে সুবিধে করতে পারেনি, ওটার একটা সহকারী থাকলেই দিয়েছিলো ভেলীর সর্বনাশ করে।

 দিনটা কাটলো কোনোমতে, এলো অন্ধকার রাত। বুনো হ্রদে উত্তাল ঝড়ের মাঝে শুরু হলো যেন ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়েছে তিন গোয়েন্দা, এই সময়, বহু যুগ পরে যেন চোখে পড়লো দূরে ক্ষীণ আলো, সেই সঙ্গে জাগলো। আশার আলো। রুবনডো আইল্যাণ্ড! ক্ষণিকের জন্যে দেখা গেল আলোটা, তারপরেই মুষলধারে বৃষ্টি আর কুয়াশার মাঝে হারিয়ে গেল। শুধু আন্দাজের ওপর ভেলা চালাচ্ছে চালক। এই হ্রদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ট পরিচয় না থাকলে অনেক আগেই হাল ছেড়ে দিতো।

কিছুক্ষণ পর আবার দেখা গেল আলো।ঠিক সময়মতো। আরেকটু হলেই পাশ দিয়ে সরে চলে গিয়েছিলো ভেলা। এমনিতেই অনেকখানি বিপথে সরে গেছে।

যা-ই হোক, দুর্গম নৌ-যাত্রার অবসান ঘটলো অবশেষে। দ্বীপের কিনারে ছোট একটা খাড়িতে ঢুকলো ভেলা। বাতাস তেমন ঢুকতে পারে না এখানে, ফলে ঢেউও খোলা হ্রদের তুলনায় অনেক কম। চেঁচিয়ে ডাকলো চালক।

সাড়া এলো তীর থেকে।

কাছে এসে দাঁড়ালেন এখানকার ওয়ারডেন। নাম জানালেন, অরিফিয়ানো ডেল মারটিগা হিসটো। হেসে বললেন, খুব লম্বা নাম, না? তোমাদের এতো কষ্ট। করতে হবে না। শুধু অরিফ বললেই চলবে, খাঁচাটা নামাতে সাহায্য করলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলেন, কি নিয়ে এসেছো?

একটা ওকাপি।

সেটা বুঝতেই পারছি। মিস্টার, না মিসেস?

প্রশ্নটা অদ্ভুত মনে হলো তিন গোয়েন্দার কাছে। পুরুষ না মাদী, তাতে কি এসে যায়?

মিস্টার,জবাব দিলো কিশোর।

গুড। এই দ্বীপে আর একটা মাত্র ওকাপি আছে, মিসেস। বংশবৃদ্ধির চান্স হলো। খুব দুর্লভ জানোয়ার, ওকাপির কথা বলছি। দাঁড়াও, আসছি।

দৌড়ে ছোট কেবিনে গিয়ে ঢুকলেন ওয়ারডেন। ফিরে এলেন একটা বড় তোয়ালে নিয়ে। ভিজে একেবারে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে গোয়েন্দাদের, ওরা ভাবলো ওদের জন্যে এনেছেন। তা নয়। খাঁচার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন তিনি। মোলায়েম হাতে ওকাপিটার গা মুছতে শুরু করলেন।

একেবারে জামাই আদর। ওকাপির গায়ের প্রতিটি ইঞ্চি যত্ন করে মুছলেন মিস্টার হিসটো, ওটার ঠাণ্ডা শরীর গরম করলেন। ব্যস, হয়েছে, আর ঠাণ্ডা লাগার ভয় নেই।

খাওয়ার কি ব্যবস্থা? মুসা জিজ্ঞেস করলো।

আছে। বনের মধ্যে ঢুকলেই পেয়ে যাবে। যেদিকে ফিরবে সেদিকেই খাবার। পানির তো অভাবই নেই…।

তাহলে কি এখন শুধু ছেড়ে দিলেই হবে? বাধা দিয়ে বললো রবিন।

সেটাই উচিত। নিজের দায়িত্ব নিজেই নেয়া ভালো। এই দ্বীপে ওর কোনো শত্রু নেই। সিংহ, চিতাবাঘ, পোচার, কিচ্ছু না।

বড় জানোয়ার নেই? কিশোর জানতে চাইলো।

আছে। নিরাপদে রাখার জন্যে গণ্ডারের মতো বড় জানোয়ারও তুলে আনা হয়েছে। তবে মাংসাশী কাউকেই আনা হয়নি। ফলে তৃণভোজীদের বেহেশত হয়ে দাঁড়িয়েছে রুবনড়ডা দ্বীপ।

গা গরম হয়েছে। খাঁচার দরজা খোলা। দীর্ঘ দিন বন্দি থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছে, তাই সুযোগ পেয়ে আর দেরি করলো না মিস্টার ওকাপি। খাঁচা থেকে বেরিয়ে রওনা হয়ে গেল তার সবুজ বেহেশতের দিকে।

আমি কিন্তু ওটার খাবারের কথা বলিনি, আবার বললো মুসা। আমার পেটে এখন ছুঁচোর বেহেশত। সেই যে কবে কোন কালে খেয়েছি মনেই নেই। নাড়িভুড়ি সব হজম। পেটের চামড়াটাই আছে যা শুধু এখন….।

হো হো করে হেসে উঠলেন মিস্টার অরিফিয়ানো ডেল মারটিগা হিসটো। আরে তাই তো! ওকাপিটাকে পেয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম..চলো, চলো!

.

১৭.

গা মুছে, আগুনে হাত-পা সেঁকে গরম হয়ে খাবার খেতে খেতে মাঝরাত পেরোলো।

শোয়ার পর মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো মুসা। রবিন দুই মিনিট। কিন্তু কিশোর জেগে রইলো আরও কিছুক্ষণ। ফেরার কথা ভাবছে। সাংঘাতিক ওই হ্রদের পানিতে আবার পনেরো ঘন্টা কাটানোর কথা ভাবতেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যেতে চাইছে তার। তারপর রয়েছে দুই ঘন্টার বিমানযাত্রা। কাল রাতের আগে কিছুতেই টিসাভোয় ফিরতে পারবে না। আর অন্ধকারে সরু ওই ল্যাণ্ডিং স্ট্রিপে প্লেন নামাতে পারবে মুসা?

কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো কিশোর, বলতে পারবে না। ঘুম ভাঙলো ডিম আর মাংস ভাজার চমৎকার সুগন্ধে।

নাস্তার টেবিলে সুখবর দিলেন ওয়ারডেন। বললেন, আমাদের লঞ্চে মুয়ানজায় যেতে পারবে। তাতে মাত্র সাত ঘন্টা লাগবে, অর্ধেকের বেশি সময় বাঁচবে তোমাদের। তবে একটা শর্ত আছে।

কী? আগ্রহে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে কিশোর। ভাবতেই পারেনি, এরকম একটা সুবিধে পাবে। ওই ভেলায় আর পা রাখতে চায় না সে, লঞ্চে করে যাওয়ার জন্যে যে-কোন শর্তে রাজি।

তোমাদের প্লেনে করে টিসাভোয় লিফট দিতে হবে আমাকে, ওয়ারডেন বললেন। টমসনের সঙ্গে কিছু জরুরী আলোচনা আছে। রুবনড়ডায় চারটে গণ্ডার চালান দেয়ার ব্যাপারে।

ফেরার পথেও ঝড় এলো কয়েকবার। তবু, ভেলার তুলনায় লঞ্চে করে যাওয়াটাকে মনে হলো আনন্দভ্রমণ। দুপুরের পর বিমানে চড়লো ওরা। উড়ে চললো রহস্যময় সেরেঙ্গেটি প্লেইন-এর ওপর দিয়ে।

একটা জিনিস দেখাবো তোমাদেরকে, হিসটো বললেন। ওই যে কাটা দাগটা দেখছো, ওর ওপর দিয়ে যাও।

লম্বা গভীর একটা খাত, অনেকটা গিরিখাতের মতো দেখতে। ওটার ওপর দিয়ে উড়ে চললো মুসা।

কি যেন মনে করার চেষ্টা করছে রবিন। বললো, ওলডুভাই গর্জ না ওটা?

অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন ওয়ারডেন। ডক্টর লীকি-র নাম তাহলে শুনেছো?

শুনেছে কিশোরও।

 এঁকেবেঁকে গেছে গর্জ, ঠিক ওটার ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে বিমান চালালো মুসা। হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ বাঁক ঘুরে অন্যপাশে আসতেই লোকগুলোকে দেখা গেল, ফাটলের তলায় খুঁড়ছে। এঞ্জিনের শব্দে মুখ তুলে তাকালো। হাত নাড়লো, ওয়ারডেনও হাত নেড়ে জবাব দিলেন। দেখতে দেখতে ওদেরকে পেছনে ফেলে এলো বিমান।

মুসা এই গর্জের নাম শোনেনি। জিজ্ঞেস করলো, কি দেখাবেন বলেছিলেন?

দেখলে না? ওয়ারডেন বললেন। মাটি খুঁড়ছে।

সেটা এমন কি স্পেশাল ব্যাপার হলো?

ও, ওলডুভাইয়ের নাম তাহলে শোনননি তুমি? অনেক বছর আগে ডক্টর লীকি বিশ লক্ষ বছরের পুরনো আদিম মানুষের হাড় খুঁজে পেয়েছিলেন ওখানে। সারা পৃথিবীতে সাড়া পড়ে গিয়েছিলো তখন। তার পর থেকেই লেগে আছে বিজ্ঞানীরা। আরও পুরনো ফসিল পাওয়া যায় কিনা খুঁজছে।

অ, আদিম মানুষের ব্যাপারে আগ্রহ নেই মুসার। প্লেন ঘোরানো?

ঘোরাও।

পৃথিবীর বৃহত্তম জ্বালামুখ দেখালেন ছেলেদেরকে ওয়ারডেন। অদ্ভুত নাম মুখটার, নৃগোবরাংগোররা। বহু দিন আগেই মরে গেছে আগ্নেয়গিরিটা। জ্বালামুখে চারপাশের দেয়াল আড়াই হাজার ফুট উঁচু। দেয়ালের গোড়া থেকে শুরু হয়েছে ঘন সবুজের রাজত্ব, ছড়িয়ে গেছে দেড়শো বর্গমাইল। ঘন বনের মাঝে মাঝে বিস্তীর্ণ। তৃণভূমি, কোথাও বা নীল হ্রদ। জন্তুজানোয়ারে বোঝাই এই এলাকা।

অনেক জানোয়ার দেখা যাচ্ছে, কিশোর বললো।

কি কি জানোয়ার? জিজ্ঞেস করলো মুসা।

চলো, নিজের চোখেই দেখবে, ওয়ারডেন বললেন। নিচে দিয়ে ওড়ো।

সিংহ, হাতি, গণ্ডার অনেক দেখা গেল। তৃণভূমিতে চরছে হাজার হাজার গরু-ছাগল-মোষ। পোষা। মাঝে মাঝে লাঠি হাতে লম্বা মাসাই রাখালদের দেখেই সেটা বোঝা যায়।

জ্বালামুখ পেছনে ফেলে এলো ওরা। সামনে দেখা গেল বিশাল এক হ্রদ, ওটার নাম লেক মনিয়ারা, জানালেন ওয়ারডেন। হ্রদের পানি নীল নয়, কালোও নয়, আশ্চর্য লাল! কাছে আসার পর বোঝা গেল কারণটা। কোটি কোটি ফ্ল্যামিংগো ভাসছে, সাঁতার কাটছে হ্রদের পানিতে এত ঘন হয়ে, দূর থেকে আলাদা করে চেনা যায় না, মনে হয় হ্রদের পানিই বুঝি লাল।

এতো পাখি থাকে কি করে একখানে! বিশ্বাস করতে পারছে না মুসা।

থাকে যেমন, মরেও, ওয়ারডেন বললেন। আগে এতো মরতো না, ইদানীং শুরু হয়েছে। কেন যেন হ্রদের পানি অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে লবণ, পাখিগুলোর পায়ে দানা জমে যায়। জমে জমে তিন-চার ইঞ্চি পুরু হয়ে গেলে পা বেজায় ভারি হয়ে যায়, তখন আর উড়তে পারে না ফ্ল্যামিংগো। এই হ্রদে এখন আর ওদের খাবার নেই। অন্য জায়গা থেকে খেয়ে আসতে হয়। উড়তে না পারলে যেতেও পারে না, না খেয়ে মরে।

ফিরে আসে কেন?

হয়তো বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে যেতে মন চায় না, রসিকতা করলো রবিন।

আসলেও কিন্তু তাই, ওয়ারডেন বললেন। আদিম কোনো প্রবৃত্তি কাজ করছে পাখিগুলোর রক্তে তাই লেক মনিয়ারায় ফিরে ফিরে আসে।

ওদের বাঁচানোর কোনো উপায় নেই? জানতে চাইলো কিশোর।

বাঁচাতে হলে হ্রদের পানির লবণ কমাতে হবে, সেটা সম্ভব নয়। ওই যে, ছেলেগুলোকে দেখছো, ওরা বাঁচানোর চেষ্টা করছে। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পা থেকে লবণ ভেঙে দিচ্ছে, যাতে উড়ে যেতে পারে।

যাক, আফ্রিকান ছেলেরা তাহলে সচেতন হয়েছে, খুশি হলো মুসা। বুড়োগুলোর মাথা থেকে শয়তান নামলেই এখন বেঁচে যেতো অনেক জানোয়ার।

 মাউন্ট কিলিমানজারোর ওপর দিয়ে আসার সময় এক ঝলক বরফ-শীতল বাতাস এসে লাগলো গায়ে। সরে আসতেই আবার গরম বাতাস। চোখে পড়লো টিসাভো ন্যাশনাল পার্ক।

অফিসেই আছেন ওয়ারডেন টমসন। হিসটোকে দেখে লাফিয়ে উঠলেন। আন্তরিক শুভেচ্ছা জানালেন একে অন্যকে।

নিরাপদে ওকাপি আর বানরটাকে রেখে এসেছে, টমসনকে শুধু একথা জানিয়ে ব্যান্ডায় রওনা হলো তিন গোয়েন্দা। গোসল সেরে এসে পরে সব কথা। খুলে বলবে।

দরজার নিচে ফেলে রাখা কাগজটা আগে রবিনের চোখে পড়লো। নিচু হয়ে। তুলে নিলো। ভঁজ খুলে পড়লো। গম্ভীর হয়ে গেল চেহারা। কিশোরের হাতে তুলে দিতে দিতে বললো, হুমকি দিয়েছে।

জোরে জোরে পড়লো কিশোরঃ : বাড়ি যাও, বিচ্ছুরা। দ্বিতীয়বার আর সাবধান করবো না। নইলে মরবে, জানোয়ারগুলোর মতো। মনে রেখো, দুনিয়ায় এখনো এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে মানুষের ট্রফি সাজিয়ে রাখা হয়।
–এল জে এস।

এল জে এস মানে কি? মুসা বললো। লঙ জন সিলভার?

তাছাড়া আর কে? চিন্তিত দেখাচ্ছে গোয়েন্দাপ্রধানকে।

 ফালতু হুমকি না তো?

মনে হয় না। সে সিরিয়াস লোক। যা বলেছে করবে। আর শুধু সে কেন? কোটি কোটি ডলার কামানোর জন্যে দুনিয়ার অনেক লোকই মানুষ খুন করতে দ্বিধা করবে না।

তাহলে? বাড়ি ফিরে যাচ্ছি?

মাথা খারাপ। একটা শয়তানের শাসানিতে ভয়ে পালাবো? অসম্ভব। সিলভারকে ব্রোঞ্জ বানিয়ে ছাড়বো আমি, দাঁতে দাঁত চাপলো কিশোর।

আমিও, দৃঢ় কণ্ঠে বললো মুসা। টিসাভো থেকে পোচার উচ্ছেদ না করে যাচ্ছি না আমি।

কিন্তু ব্যাটাকে ধরি কিভাবে? প্রশ্ন রাখলো রবিন।

দেখা যাক, কিশোর বললো। বুদ্ধি একটা বের করতে হবে। পাঁচ মাইল লম্বা যে ট্র্যাপ-লাইনটা দেখেছিলাম, কাল সকালে যাবো ওখানে। এবার আর পোচার নয়, সিলভারকে ধরার দিকে নজর দেবো।

.

১৮.

সেরাতে গাড়ির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল কিশোরের। বিশেষ গুরুত্ব দিলো না। ভোর রাতে আবার ঘুম ভাঙলো, শুনলো, চলে যাচ্ছে গাড়িটা।

সকালে নাস্তার পর ট্র্যাপ-লাইনে যাবার জন্যে তৈরি হলো গোয়েন্দারা। সঙ্গে যাবে ওয়ারডেনের কয়েকজন রেঞ্জার আর তিরিশজন মাসাই। হিসটোর সঙ্গে জরুরী কাজ আছে টমসনের, তিনি যেতে পারছেন না। তবে অসুবিধে নেই, রেঞ্জারদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে দিলেন তিনি, কিশোরের কথা যেন মেনে চলে।

ট্র্যাপ-লাইনের মাইল খানেকের মধ্যে থামলো গাড়ির মিছিল।

সাপ্লাই ভ্যানে টিয়ার গ্যাসের ক্যানূ আছে, মাসাইদের বললো কিশোর। সবাই একটা করে নিয়ে এসো, কিভাবে কি করতে হবে বুঝিয়ে দিলো সে।

আবার এগোলো গাড়ির মিছিল।ট্রাপ-লাইনের কয়েক শো গজ দূরে এসে থামলো, আগের বার এক মাইল লম্বা লাইনটার সামনে যেভাবে দাঁড়িয়েছিলো, সেভাবে। পোচারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে জোরে জোরে হর্ন বাজাতে লাগলো। লাইনের ফাঁকে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করলো কালো কালো মুখ। বারোজন মাসাইকে নিয়ে, ঘুরে, পোচারদের ক্যাম্পের পেছনের বনে গিয়ে ঢুকলো কিশোর। রবিন আর মুসাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে এসেছে।

আগের বারের কৌশল এবারেও করতে পারে সিলভার। দলের পেছনে নিরাপদ জায়গায় থাকতে পারে। যদি দেখে পোচাররা হেরে যাচ্ছে, চুরি করে পালানোর চেষ্টা করবে আগের বারের মতোই। বনের ভেতর দিয়ে ছাড়া অলক্ষ্যে। যাওয়ার জায়গা নেই, তাই এখানে চলে এসেছে কিশোর।

মাসাইদের নিরস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাহস পেয়ে গেল পোচাররা। তীর ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে গেল। বাধা আসছে না দেখে সাহস আরও বাড়লো। মাসাইদের টিটকারি মারতে মারতে এগুলো বল্লম হাতে।

ইঙ্গিতের জন্যে বার বার মুসার দিকে তাকাচ্ছে মাসাইরা।

পোচাররা পঞ্চাশ ফুটের মধ্যে চলে এলে প্রথম ক্যানূটা ছুঁড়ে মারলো মুসা। মারো! বলে রবিনও তার হাতেরটা ছুঁড়লো।

উড়ে গেল এক ঝক ক্যান। জন্তু-খুনীদের সামনের শক্ত মাটিতে পড়ে ফাটলো একের পর এক। চোখের পলকে ওদেরকে ছেয়ে ফেললো হলদে-সাদা ধোয়া। কাশতে শুরু করলো পোচাররা। দম বন্ধ হয়ে আসছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আতঙ্কে গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে শুরু করলো কেউ কেউ, লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। লম্বা ঘাসে নাক গুঁজে ধোয়া থেকে বাঁচতে চাইলো। কয়েকজন টলতে টলতে ছুট দিলো কুঁড়ের দিকে।

ঠিক এই সময় বন থেকে বেরিয়ে উল্টো দিক থেকে ছুটে এলো কিশোর। সিলভারকে খুঁজতে লাগলো। কোথাও দেখা গেল না তাকে। মাটিতে বুটের ছাপও নেই। আধ ঘন্টা ধরে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না।

ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে কিছু পোচার, কিন্তু চোখে ভীষণ জ্বালা। পানি গড়াচ্ছে। দেখতে পারছে না ঠিকমতো। লড়াইয়ের উদ্যম একেবারেই তিরোহিত হয়েছে। ঘিরে ফেলা হলো ওদের।

মোমবাসায় জেলে গিয়ে কটা দিন সুখে কাটিয়ে আসার ইচ্ছে যাদের ছিলো, হতাশ হতে হলো তাদেরকে।

গাঁয়ে ফিরে যেতে বলুন ওদের, মুগামবিকে বললো কিশোর। হুঁশিয়ার করে দিন, আবার জানোয়ার মারতে এসে ধরা পড়লে কপালে অনেক দুঃখ আছে।

পোচাররা চলে গেল।

ফাঁদে আটকা পড়া জানোয়ারগুলোর মাঝে যেগুলো তখনও বেঁচে রয়েছে, ছেড়ে দেয়া হলো। বেশি জখমীগুলোকে গাড়িতে তুলে নেয়া হলো চিকিৎসার জন্যে। আর যেগুলো মরে গেছে তো গেছেই। সমস্ত ফাঁস, ফাঁদ তুলে নেয়া হলো।

সব কটা কুঁড়ে আর পাঁচ মাইল লম্বা, ঘাসের বেড়া পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া। হলো।

লজে ফিরে এলো গাড়ির মিছিল। সব কথা টমসনকে জানালো তিন গোয়েন্দা। সিলভারকে পায়নি বলে দুঃখ করলো অনেক।

মন খারাপ করো না, সান্তনা দিলেন ওয়ারডেন। ব্যাটাদের অনেক ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে। ভয় পাইয়ে দিয়েছে। কম করোনি। যাবে কোথায় সিলভার? আজ হোক কাল হোক, ধরা তাকে পড়তেই হবে। ও, ভালো কথা, জজ নির্মল পাণ্ডা তোমাদের গুড লাক জানিয়েছেন।

কোথায় উনি? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

তখন বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। কাল রাতে এসেছিলো, ভোরে চলে গেছে তাড়াহুড়ো করে। জরুরী কাজ নাকি আছে।

আমরা যে আজ পোচার ঠেঙাতে যাবো, সেকথা বলেছিলেন ওকে?

নিশ্চয়। পোচারদের ব্যাপারে সব সময় তার আগ্রহ।

দ্বিধা করে শেষে বলেই ফেললো কিশোর, স্যার, জজ সাহেব আপনার ঘনিষ্ঠ। বন্ধু। কথাটা কিভাবে নেবেন জানি না। একটা প্রশ্ন জাগছে আমার মনে, উনি কি সত্যি আমাদের পক্ষে না বিপক্ষে?

খুব অবাক হলেন ওয়ারডেন। ভুরু কুঁচকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন কিশোরের দিকে। দেখোএমন একজন লোককে সন্দেহ করছো, যাকে কোনো মতেই অবিশ্বাস করা উচিত না। এদেশে পোচিঙের বিরুদ্ধে যারা সব চেয়ে বেশি শোরগোল তুলেছেন, জজ সাহেব তাঁদের একজন। জন্তুজানোয়ারের জন্যে নিবেদিত প্রাণ। আমাদের বিপক্ষে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। এই সেদিনও তোমাদের সামনেই আমার প্রাণ বাঁচালো।

শুধু মুখে মুখেই জানোয়ারকে ভালোবাসার কথা বলে? না করেও কিছু?

অবশ্যই করে।

ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটা চেক বের করলেন টমসন। টেবিলের ওপর রেখে কিশোরের দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, এই দেখো, কাল রাতে দিয়েছে। ওর সময়। নেই। আমাকে ওয়াইল্ডলাইফ সোসাইটিতে পাঠিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছে।

দুহাজার পাউণ্ডের চেক।

এবার বুঝলে তো? কিশোরকে নীরব দেখে আবার বললেন ওয়ারডেন। শুধু কথা নয়, কাজেও করে দেখায়। এদেশে একজন জজের বেতন আর কতো বলো? তার থেকে জমিয়ে দুহাজার পাউণ্ড জন্তুজানোয়ারের উপকারের জন্যে দান। করা…না,কিশোর, নির্মল সত্যি মহৎ।

কি জানি, স্যার, সন্দেহ গেল না কিশোরের। হয়তো আমিই লোক চিনতে ভুল করেছি। সাধারণত এমন ভুল হয় না আমার।

ভুল মানুষেরই হয়, কথাটা সামান্য রুক্ষই শোনালো।

ব্যানডায় ফিরে এলো কিশোর। মুসা আর রবিনকে জানালো যা যা কথা হয়েছে।

কি জানি, হয়তো সত্যি ভুল করেছো, মুসা বললো। লোকটাকে দেখে কিন্তু খারাপ মনে হয় না।

না, ভুল আমি করিনি, জোর দিয়ে বললো কিশোর। অসম্ভব ধড়িবাজ লোক ওই জজ।

তাহলে টাকা যে দিলো? রবিন বললো।

সেটা তো খুব সহজ একটা ব্যাপার। ওই ধ্যাটা কি আর জজের বেতন দিয়ে চলে? কোটিপতির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। টাকার অভাব আছে নাকি? ওর কাছে দুহাজার পাউও কিচ্ছু না। কিন্তু দান করে ওয়ারডেনের চোখে ভেলকি লাগিয়ে দিয়েছে। আমি শিওর, সিলভারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে ওর।

সেটা নাহয় আমরা বিশ্বাস করলাম, ওয়ারডেনকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারবে না। করাতে হলে জোরালো প্রমাণ দরকার।

সেটাই জোগাড় করতে হবে আমাদের, যেভাবে হোক।

 কিন্তু কিভাবে? মুসা প্রশ্ন করলো।

জানি না এখনও, নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো একবার গোয়েন্দাপ্রধান। আজকে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে? সিলভারকে পোচারদের কুঁড়েতে পাওয়া যায়নি। কেন? কারণ, আগেই তাকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। আমরা আজ পোচার ধরতে যাবো, একথা কাল রাতে জজকে বলেছেন টমসন। খুব ভোরে উঠে চলে গেল সে। কোথায়? নিশ্চয় পোচারদের ক্যাম্পে, সিলভারকে বলার জন্যে, হাতের উল্টো পিঠ কপালে ঘষলো কিশোর। তবে সবই আমার অনুমান। আদালতে টেকে, এমন প্রমাণ জোগাড় করতে হবে?

তাহলে সেই চেষ্টাই করা যাক, মুসা বললো। এখানে বসে থেকে সেটা হবে। না নিশ্চয়!

.

১৯.

পোচারদের আরেকটা ক্যাম্প আবিষ্কার করেছে তিন গোয়েন্দা।

পাহাড় আর উপত্যকার ওপর দিয়ে চক্কর মারছে মুসা। বিনকিউলার চোখে লাগিয়ে তন্নতন্ন করে নিচের এলাকা খুঁজছে কিশোর, মাঝে মাঝে যন্ত্রটা তুলে দিচ্ছে রবিনের হাতে। আরেকটা ট্র্যাপ-লাইন খুঁজছে ওরা। লাইন থাকলে পোচার থাকরে, পোচার থাকলে সিলভারকে পাওয়ার সম্ভাবনা।

লাইন দেখা গেল না। শুধু কয়েকটা ঘাসের কুঁড়ে। মানুষ চোখে পড়লো না। আশেপাশে মাইলের পর মাইল জুড়ে একই অবস্থা, নির্জন।

ভয় পেয়ে চলে গেছে হয়তো, রবিন বললো।

আমার মনে হয় না, মাথা নাড়লো কিশোর। বনে গিয়ে লুকিয়েছে বড় জোর। মুসা, ওই ডোবাটার কাছে যাও তো।

জানোয়ার গিজগিজ করছে ডোবার পাড়ে; হাতি, গণ্ডার, জেব্রা, হরিণ; দিবাচর আফ্রিকান যতো প্রাণী আছে, প্রায় সব। শুধু পোচার বাদে।

হঠাৎ, ফোয়ারার মতো ছিটকে উঠলো ডোবার পানি, তারপর কাদা, সব শেষে ধোয়া। কানে এলো বিস্ফোরণের শব্দ। বাতাস অস্থির হয়ে যাওয়ায় সাঙ্ঘাতিক দুলে উঠলো বিমান। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল ছোট ছোট জানোয়ার, বড়গুলো সুতো-ছেঁড়া গ্যাস-বেলুনের মতো লাফিয়ে উঠলো শূন্যে। মুহূর্ত আগে যে জায়গাটা স্বর্গ ছিলো ওদের জন্যে, সেটা হয়ে গেল নরক। শত শত জীবের গোরস্থান।

খাইছে! চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। ডিনামাইট!

কিছুই বললো না কিশোর। নীরবে মাথা দোলালো শুধু।

বন থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসতে লাগলো পোচারের দল। জখমী বড়। জানোয়ারগুলোকে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে মারতে শুরু করলো। ছোট ছোট জানোয়ারের মাথা, লেজ, আর দরকারী অঙ্গ কেটে নিতে লাগলো জীবন্ত অবস্থায়ই। রোমহর্ষক দৃশ্য!

উত্তেজনায় প্রথমে প্লেনটা দেখতে পায়নি পোচাররা, খেয়াল করতেই লুকিয়ে পড়ার জন্যে দৌড় দিলো বনের দিকে। তাড়াতাড়ি লজে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলো মুসাকে কিশোর।

ওয়ারডেনকে পাওয়া গেল না, জরুরী কাজে বেরিয়েছেন হিসটোকে নিয়ে। দেরি করলো না কিশোর। যতো দ্রুত পারলো, মাসাইদের নিয়ে ফিরে এলো সেই ডোবাটার ধারে।

কিন্তু, এতো তাড়াতাড়ি করেও কিছু করতে পারলো না। অনেক সময় গেছে। ইতিমধ্যে যা যা নেয়ার, নিয়ে কেটে পড়েছে পোচাররা। ডোবার ধারে জন্তুজানোয়ারের খণ্ডিত, ক্ষত-বিক্ষত লাশ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেল না। পানিতেও অসংখ্য মৃতদেহ। তুলে না ফেললে পচে নষ্ট হবে ডোবার পানি। ওই পানি খেয়ে মড়ক লাগবে জানোয়ারের, পালে পালে মরবে।

কাজে লেগে পড়লো রেঞ্জার আর মাসাইরা। অমানুষিক পরিশ্রম করে সমস্ত মৃতদেহ তুলে আনলো পানি থেকে। ডাঙায় ফেলে রাখলে অসুবিধে নেই। খেয়ে সাফ করে ফেলবে শবভোজী প্রাণীরা। পরদিন সকালে এলে হাড় ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না।

সন্ধ্যার পর লজে ফিরলো দলটা। ভীষণ ক্লান্ত। পেটে খিদে। মেজাজ খারাপ।

.

পরদিন সকালে আবার বিমান নিয়ে বেরোলো গোয়েন্দারা। সরে এলো উত্তরে, চল্লিশ মাইল দূরে…পঞ্চাশ …ষাট…ডানে খানিকটা মোড় নিয়ে পেরিয়ে এলো। আরো দশ মাইল। চোখে পড়লো ধোঁয়া।

কাছে গিয়ে যা দেখলো, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না। বেশ কিছুটা জায়গা ঘিরে শুকনো ঘাসে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। জ্বলছে দাউ দাউ করে। আগুনের বৃত্তের মাঝে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে অনেকগুলো হাতি। বেরোনোর পথ পাচ্ছে না।

পোচাররা রয়েছে নিরাপদ দূরত্বে।

বারো ফুট লম্বা হাতিঘাসের জঙ্গলে নিশ্চিন্তে চরছিলো হাতিগুলো। ভাবতেই পারেনি ওদের ওপর নেমে আসবে নির্মম মৃত্যুর করাল থাবা, জীবন্ত পুড়ে কাবাব হবে। বড় বড় কয়েকটা জানোয়ার মরিয়া হয়ে ছুটলো আগুনের ভেতর দিয়েই। ফলে মৃত্যু হলো আরও নির্মম, আরও যন্ত্রণাদায়ক। আগুনের বাইরে বেরিয়ে অদ্ভুত ভাবে নাচতে শুরু করলো, উন্মাদ হয়ে গেছে যেন। আসলে, পায়ের পাতা পুড়ে গেছে ওগুলোর। মাটিতে পা রাখতে পারছে না। সেই সাথে রয়েছে শরীরের অন্য জায়গা পুড়ে যাওয়ার জ্বালা। মরবে ওগুলো, জানা কথা। বৃত্তের ভেতরে থাকলেই বরং ভালো ছিলো, তাড়াতাড়ি মরতো। পোড়া পায়ের পাতা নিয়ে হাঁটতে পারবে না। খাবার, বিশেষ করে পানির অভাবে কাহিল হবে। অসহায় শিকারে পরিণত হবে হায়েনা, কিংবা হিংস্র পোচারের।

নগ্ন কালো পিশাচগুলোর মাঝে আরেকটা দাড়িওয়ালা পিশাচকে দেখা গেল, গায়ে বুশ জ্যাকেট, পরনে সাফারি ট্রাউজার।

সিলভার! হাত তুলে দেখালো রবিন।

শাঁ করে আরও কাছে বিমান নিয়ে গেল মুসা, নিচে নামলো। শব্দ শুনে ওপর দিকে চেয়ে হাসলো সিলভার, হাত নাড়লো।

শয়তান! দাঁতে দাঁত পিষলো মুসা। ব্যাটা জানে, এখন আমরা কিছু করতে পারবো না। লজে গিয়ে দলবল নিয়ে আসতে আসতে চলে যাবে।

চলো, জলদি ফিরে চললা, কুইক! তাড়া দিলো কিশোর। দেখিই না এসে, কিছু করা যায় কিনা?

কিছুই করা গেল না। চলে গেছে পোচাররা। তাড়াহুড়োয় যা যা নিতে পেরেছে; নিয়ে গেছে। লেজ, পায়ের পাতা, চোখের পাপড়ি, কান। তবে সব চেয়ে দামী জিনিসটাই ফেলে যেতে হয়েছে। দাঁত।

হাতির দাঁত খুলে নেয়া খুবই কঠিন কাজ। হাড় আর মাংসে শক্ত হয়ে লেগে থাকে, যেন সিমেন্টে গাঁথা। কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে কেটে বের করতেও কষ্ট হয়। সহজ উপায় হলো, লাশটা ফেলে রাখা। পচে গলে মাংস খসে গেলে তখন। নেড়েচেড়ে গোড়া থেকে খুলে নেয়া যায় দাঁত। কিন্তু তার জন্যে অনেক সময় দরকার।

.

এরপর থেকে যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল সিলভার আর তার খুনীর দল। পাহাড়, জঙ্গল, তৃণভূমির ওপর চক্কর দিয়ে দিয়ে ফিরলো গোয়েন্দারা। কিন্তু কিছুই দেখলো না আর। ঘাসের কুঁড়ে নেই, ট্র্যাপ-লাইন নেই, ডিনামাইট ফাটলো না, আগুন লাগলো না।

পোচিং ছেড়ে দিলো নাকি ব্যাটারা? অবাকই হয়েছে রবিন। ভয় পেলো শেষমেষ!

ইবলিস কি আর শয়তানী ছাড়ে? প্লেন চালাতে চালাতে মন্তব্য করলো মুসা। লুকিয়েছে আরকি। হয়তো কিছুদিনের জন্যে গিয়ে গর্তে ঢুকেছে।

গভীর ভাবনায় ডুবে ছিলো কিশোর। ঝট করে মাথা ফেরালো। কি বললে? গর্ত? তুড়ি বাজালো। ঠিক বলেছো! নিশ্চয় গর্তেই লুকিয়েছে। কোথায় যেন পড়েছি, হাতি ধরার জন্যে গর্ত খুঁড়ে রাখে, পিগমিরা। ওপরটা ঢেকে রাখে ডালপাতা দিয়ে। না দেখে হাতি গিয়ে পড়ে সেই গর্তে। ওপর থেকে তখন বড় বড় পাথর ছুঁড়ে আর বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে সেটাকে মেরে খেয়ে ফেলে।

একেবারে আদিম পদ্ধতি, বিড়বিড় করলো রবিন। প্রাগৈতিহাসিক মানুষও ওভাবে ম্যামথ শিকার করতো।

আরও একটা কাজ করে পিগমিরা, রবিনের কথা যেন শুনতেই পায়নি গোয়েন্দাপ্রধান। জরুরী মুহূর্তে ওই গর্তকে বাংকার হিসেবেও ব্যবহার করে।

তারমানে, মুসা বললো। তুমি বলতে চাইছো, পোচাররাও হাতি ধরার গর্তকে বাংকার হিসেবে ব্যবহার করছে?

হ্যাঁ! আজ আর বেলা নেই। কাল সকালে এসে খুঁজবো।

লজে ফিরে দেখলো ওরা, জজ নির্মল পাণ্ডা হাজির।

এই যেছেলেরা, দেখেই হাসিমুখে বলে উঠলেন তিনি। খুঁজে পেয়েছো?

এখনও পাইনি। তবে পাবো, গম্ভীর হয়ে জবাব দিলো কিশোর।

যাবে কোথায় শুয়োরের বাচ্চা? ইচ্ছে করেই গালিটা দিলো মুসা। আড়চোখে তাকালো জজের দিকে।

আমি হলে হাল ছেড়ে দিতাম, হাসি বিন্দুমাত্র মলিন হলো না জজের। তোমরাও ছাড়বে। এখনও বুঝতে পারছে না তো। আমরা কি আর কম চেষ্টা করেছি, কম খুঁজেছি? পাইনি। দেখো, চেষ্টা করে দেখো। পেলে তো ভালোই।

কিশোরের মনে হলো, জজের কথাবার্তা আর হাসির পেছনে কি যেন একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। রাগে মুসার মতোই গাল দিয়ে উঠতে যাচ্ছিলো, অনেক কষ্টে সামলালো নিজেকে। শান্তকণ্ঠে বললো, আপনার মহানুভবতার কথা বলেছেন আমাকে মিস্টার টমসন। ওয়াইল্ডলাইফ সোসাইটিকে নাকি অনেক টাকা দান করেছেন।

বিগলিত হলো জজের হাসি, হাত নাড়লো বিনীত ভঙ্গিতে। ও কিছু না.। নেই তো, দেবো কোত্থেকে? ইচ্ছে করে দুনিয়ার সমস্ত ধন এনে লাগাই অসহায় অবলা জানোয়ারগুলোর উপকারে। কিন্তু কয় পয়সা আর বেতন পাই বলো? তা থেকেই কষ্টেসৃষ্টে জমিয়ে যা পেরেছি দিয়েছি।

খুব ভালো, খুব ভালো, আপনার অনেক দয়া। তবে ইচ্ছে করলে অনেক বেশি টাকা কামাতে পারেন। এদেশের অনেক জজ সাহেবই সেটা করছেন।

মানে? কালো হয়ে গেল জজের মুখ। হাসি উধাও।

ধরুন–মানে, আমি কল্পনা করতে বলছি আরকি আপনাকে আপনি মোটেই সৎ লোক নন। ভদ্রলোক নন, নিতান্তই ছোটলোক। পোচারদের সঙ্গে আপনার যোগসাজশ আছে। পোচারদের ধরে আপনার কোর্টে পাঠালে নানারকম অজুহাত দেখিয়ে বেশির ভাগকেই ছেড়ে দেন, অল্প কয়েকজনকে লোক দেখানো শাস্তি দেন, এই দুচার দিনের জন্যে। শহরে যতো বড় বড় অন্যায় ঘটে, সব দেখেও না, দেখার ভান করেন। কেন করেন? দুহাত ভরে টাকা দেয়া হয় আপনাকে, বিনিময়ে। কালো টাকার পাহাড় জমিয়ে ফেলছেন। অথচ এমন ভাব করে থাকেন, যেন আপনার মতো সৎ লোক আর হয় না, সবার জন্যে দরদ উথলে পড়ে। মাঝে মাঝেই টাকা দান করেন ওয়াইল্ডলাইফ সোসাইটিতে, যাতে আপনার ওপর সন্দেহ না পড়ে কারও।

রাগে লাল হয়ে গেছে জজের মুখ। মোলায়েম দৃষ্টি আর মোলায়েম নেই, যেন ইস্পাতের তলোয়ারের ধারালো ফলার চোখা মাথা। কিশোরের হৃৎপিণ্ডে বেঁধার চেষ্টা করছে। জোর করে শুকনো হাসি ফোঁটালেন মুখে। খুব কল্পনাপ্রবণ ছেলে তুমি। আমার মতো নিরীহ, জানোয়ার, দরজার দিকে চোখ পড়তে থেমে গেলেন।

 খোলা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সিমবা। মুসাকে খুঁজতেই এসেছিলো বোধহয়, জজ সাহেবকে দেখে রেগে গেছে। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে। চাপা ঘড়ঘড় করতে করতে ঘরে ঢুকলো।

কি ভেবে জ্বলে উঠলো কিশোরের চোখ। দুই সহকারীকে বললো, চলো, যাই।

অবাক হলো রবিন আর মুসা, কিন্তু কিছু বললো না। কিশোরের এই অদ্ভুত

ব্যবহারের নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। পিছু পিছু বেরিয়ে এলো ওরা।

ঠোঁটে আঙুল রেখে ওদেরকে চুপ থাকতে বলে জানালার কাছে গিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিলো কিশোর।

বাঘের দৃষ্টিতে কুকুরটার দিকে তাকিয়ে আছেন জজ। দরজার মুখে বসে, আছে ওটা। জোরে জোরে হাত নেড়ে ওটাকে ভাগার নির্দেশ দিলেন। নড়লো না সিমরা। গোঁ গোঁ করে উঠলো। দাঁত খিচালো আরেকবার! টেবিলে জোরে কিল মারলেন জজ। তারপর ছুটে গিয়ে ধা করে এক লাথি মারলেন কুকুরটার গলায়। আর যায় কোথায়। গাউক করে এসে তার বুকে দুপা তুলে দিলো সিমবা। টুটি কামড়ে ধরতে গেল। চোখের পলকে ছুরি বেরিয়ে এলো নিরীহ জজের হাতে। শিকারী কুকুরের বংশধর সিমবা, অসাধারণ ক্ষিপ্র। পেটে ছুরি বেঁধার আগেই লাফ দিয়ে সরে গেল। পরমুহূর্তে কামড়ে ধরলো জজের ছুরি ধরা হাত। ছুরিটা ফেলার পর তবে ছাড়লো।

হেরে গিয়ে ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন জজ। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পুরো এক মিনিট চাপা গলায় গর্জালো বুনো-কুকুরের বাচ্চা, তারপর বেরিয়ে গেল।

জানালার কাছ থেকে সরে এলো তিন গোয়েন্দা। মুসাকে দেখে আবার তার কাছে চলে এলো সিমবা।

ব্যানডায় ফিরে বললো কিশোর, এই তাহলে নিরীহ জন্তু-প্রেমিক!

এতো সুন্দর একটা কুকুরের সঙ্গে এরকম ব্যবহার করে, মুসা বললো। ব্যাটা মানুষ নাকি?

তোমার কথাই ঠিক, কিশোর, রবিন বললো। জজ নির্মল পাণ্ডা লোক ভালো নয়।

কিন্তু কে বিশ্বাস করবে আমাদের কথা? ভুরু নাচালো গোয়েন্দাপ্রধান। প্রমাণ লাগবে। প্রমাণ!

.

২০.

আমার মনে হয় এখানেই আছে গর্তগুলো।

নিচের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মুসা, কন্ট্রোলে হাত। গর্ত চোখে পড়ছে না। তবে অনেক জায়গার ঝোপঝাড় কাটা, নিচে মাটি দেখা যায় না, ডালপাতা আর ঘাস বিছিয়ে আছে। কাছাকাছি রয়েছে বাওবাব গাছের ছোট জঙ্গল। অনেক ওপর থেকে মনে হয়, পেট ফেটে নাড়ীভুড়ি বেরিয়ে থাকা মরা জলহস্তী। মোটা, পেট ফোলা, বাকলও জলহস্তীর চামড়ার মতো দেখতে।

আশেপাশে কোথাও পোচারদের একটা কুঁড়ে চোখে পড়লো না। জনমানবের ছায়াও নেই। গর্ত থাকলে ঝোপঝাড়গুলোর মাঝেই আছে, নিচে লুকিয়ে রয়েছে পোচাররা।

নিচে না নামলে বোঝা যাবে না, কিশোর বললো। লজে ফিরে চলো। লোক নিয়ে আসবো।

আরও মিনিট দশেক ঠিকমতোই চললো বিমান। তারপর শুরু করলো গোলমাল। নাচছে, দুলছে, কাত হয়ে যাচ্ছে থেকে থেকে। পাড় মাতাল হয়ে গেছে। যেন।

ব্যাপার কি? বুঝতে পারছে না রবিন। পকেট?

নাহ, উঁকি দিয়ে বিমানের শরীরের বাইরের অংশ দেখার চেষ্টা করছে কিশোর। এয়ার পকেট নয়। তাছাড়া এখানে থাকার কোনো কারণ দেখছি না। অন্য কিছু হয়েছে।

সেটা কী? মুসা, কন্ট্রোলে কোনো গণ্ডগোল?

কি জানি। আমি কোথাও নড়চড় করিনি।

কিন্তু কিছু একটা তো হয়েছে!

ভীত ঘোড়ার মতো নাচতে শুরু করেছে এখন প্লেন।

ওই দেখো, চেঁচিয়ে বললো কিশোর। ডানের ডানাটা কেমন ঝুলে যাচ্ছে!

থরথর করে কাঁপছে ডানাটা, ঝরা পাতার মতো খসে উড়েই যাবে বুঝি যে কোনো মুহূর্তে।

বিমানের নাক সোজা রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে মুসা, সম্ভব হচ্ছে না। কথাই শুনতে চাইছে না যেন ওটা। উঁচু একটা ক্যাােেক গাছের ওপর দিয়ে শা করে বেরিয়ে এলো, আর সামান্য নিচে নামলেই বাড়ি লেগে ছাতু হয়ে যেতো। বেড়ে গেছে দুলুনি।

কিছুতেই সামলাতে পারছি না, মুসার গলা কাঁপছে। ক্র্যাশ করবেই। তৈরি থাকো তোমরা। দরকার হলে লাফিয়ে পড়তে হবে।

 বিমানের নাক নিচের দিকে। ধাক্কা লাগানোর জন্যে দ্রুত ধেয়ে আসছে যেন। মাটি। ইগনিশন অফ করে দিলো মুসা। এঞ্জিন বন্ধ, নিজের ইচ্ছেয় ছুটছে বিমান। চাকা লাগলো মাটিতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি…তীক্ষ্ণ একটা শব্দ, ছিঁড়ে পড়ে গেল ডান ডানা…বড় একটা উইয়ের ঢিবিতে তো লাগিয়ে স্থির হয়ে গেল প্লেন।

যাক, বাঁচলাম! ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো মুসা।

বাঁচার কি হলো? চেঁচিয়ে বললো রবিন।

আগুন লাগেনি। মরিনি আমরা। বাঁচলাম না?

বাঁচলাম বলা যাবে না এখনও। বেঁচে নামলাম। লজে ফিরে যেতে না পারলে..এই কিশোর, কি ভাবছো? কিছু বলছো না কেন?

উ! ফিরে তাকালো কিশোর। কি বলবো? ডানা ছেঁড়ার ব্যাপারটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। কেন ছিড়বে?..চলো, নেমে দেখি।

পঞ্চাশ ফুটু পেছনে পড়ে আছে ডানাটা। কাছে গিয়ে দাঁড়ালো তিন গোয়েন্দা। ভালোমতো পরীক্ষা করে দেখলো কিশোর। বিড়বিড় করলো আনমনে, আপনা-আপনি ছেঁড়েনি। ছেঁড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মানে! অবাক হয়ে গোয়েন্দাপ্রধানের দিকে তাকালো দুই সহকারী।

বুঝতে পারছো না? এই দাগটা দেখো। স্বাভাবিক ভাবে ছিড়লে এটা অন্য রকম হতো, এতো নিখুঁত, সোজা নয়। করাত দিয়ে কেটে দুর্বল করে রাখা। হয়েছিলো ডানার গোড়া, যাতে কিছুক্ষণ ওড়ার পরই ভেঙে পড়ে। সম্মানিত বোধ করছি, তিক্ত কণ্ঠ, বিরক্তিতে কুঁচকে গেছে মুখ। কেউ একজন আমাদের ইমপরট্যান্ট লোক ভাবতে আরম্ভ করেছে। তার পাকা ধানে যাতে মই দিতে না পারি সে-জন্যে খুন করতে চেয়েছে।

ছড়ে যাওয়া কনুই ডলছে রবিন। বাঁ হাঁটুতে হাত বোলাছে মুসা। টিপ দিয়েই উহ করে উঠলো।

কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

না, কিছু না। নামার সময় বাড়ি লেগেছে হয়তো। ফুলে গেছে। তো, এখন কি করা? প্লেনে তো রেডিও নেই। আগুন জ্বেলে সংকেত দেবো?

লাভ হবে না। লজ এখান থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে। এতো দূর থেকে কেউ দেখবে না। বরং যারা দেখবে, তারা পোচার। ছুটে আসবে। মরিনি দেখে খুশিই হবে। ওদেরকে জ্বালানোর শোধ তুলবে আমাদের ওপর।

তাহলে কি করবো? রবিন বললো। এখানেই বসে থাকবো? আমাদেরকে ফিরতে না দেখে খুজতে আসবে ওয়ারডেনের লোক।

আসবে বলতে পারি না, তবে খুঁজতে বেরোবে। একশো মাইল বুনো এলাকায় আমাদের খুঁজে বের করতে ওদের কহপ্তা লাগবে কে জানে! যখন পাবে, কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। একটাই উপায় আছে এখন। হেঁটে লজে চলে যাওয়া।

ব্যাগ-ট্যাগগুলো নেয়ার জন্যে প্লেনে ফিরে চললো ওরা। কিশোর লক্ষ্য করলো, সাংঘাতিক খোঁড়াচ্ছে মুসা। আরি, তোমার পায়ের অবস্থা তো খুব খারাপ। ভাঙেনি তো?

না।

কিন্তু পঞ্চাশ মাইল হাঁটতে তুমি পারবে না।

পারবো, পারবো। চলোই না।

কি করে পারবে? পঞ্চাশ ফুটই তো. পারছে না। বেশি চাপাচাপি করলে আরও ফুলবে। বয়ে নিতে হবে শেষে। তোমাকে বয়ে নেয়া আমার আর রবিনের কম্মো নয়।

তাহলে?

তুমি আর রবিন প্লেনেই থেকে যাও। আমি একাই যেতে পারবো।

আরে দূর, কি যে বলো। রবিনকে তুমি নিয়ে যাও। আমি একলা থাকতে পারবো। প্লেনে বসে বসে জাস্ট ঘুমাবো, হাসলো মুসা, তাতে যন্ত্রণার ছাপ।

 না, আমি একা যাবো। প্লেনটাকে দেখার জন্যেও এখানে কাউকে থাকা দরকার। জখমী পা নিয়ে তুমি কিছু করতে পারবে না। রবিনকে থাকতেই হচ্ছে।

প্লেনটাকে দেখার আর কি আছে? আফ্রিকান জানোয়ারে প্লেন খায় না।

খায়। পোচাররা এসে দামী যন্ত্রপাতি নষ্ট করতে পারে। হাতি আর গণ্ডারও কৌতূহলী হতে পারে। কিছুদিন আগে মারকিনস-এ একটা বিমান পড়েছিলো, মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলো ওটাকে গণ্ডারে। হায়েনারা আরও এক কাটি বাড়া। রবার ওদের খুব প্রিয়, টায়ার খেয়ে ফেলে। আহত না হলেও বিমানটাকে বাঁচানোর জন্যে কাউকে এখানে থাকতে হতো।

ঠিক আছে, বললো অনিচ্ছুক মুসা। থাকবো। হারামি পা-টা ব্যথা পাওয়ার আর সময় পেলো না।

বেশিক্ষণ থাকতে হবে না তোমাদের, কম্পাস, ম্যাপ আর ওয়াটার বটল গুছিয়ে নিতে নিতে হাসলো কিশোর। মাত্র তো পঞ্চাশ মাইল। সকাল-বিকাল তোমার সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে আজকাল ভালোই হাঁটতে পারি আমি, জানো। বারো-চোদ্দ ঘন্টার বেশি লাগবে না। তারপর ট্রাক নিয়ে ফিরে আসতে, ধরো, আরও দুই ঘন্টা। আমার বিশ্বাস, ওই মোল ঘন্টা বেঁচে থাকতে পারবে তোমরা।

কিন্তু, বিকেল হয়ে গেল, রবিন বললো। রাতে হাটবে? কাল সকালে গেলে হতো না?

রাতে হাঁটাই সুবিধে, আবহাওয়া ঠাণ্ডা। চাঁদও থাকবে। ভেবো না, আমি ঠিকই চলে যাবো। হুঁশিয়ার থেকো। সকালে ফিরে আসছি আমি।

কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ঘুরলো কিশোর। পেছন থেকে ডেকে বললো মুসা, এই শোনো, ভালো দেখে কয়েকটা স্যাণ্ডউইচ নিয়ে এসো। সারারাত হায়েনা তাড়িয়ে সকালে আমি নিজেও হায়েনা হয়ে যাবো।

 হেসে উঠলো তিনজনেই।

.

বেলা ডুবতেই ঠাণ্ডা হয়ে এলো গরম বাতাস। বন থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো। নিশাচর জানোয়ারেরা। প্রায় সবাই আগ্রহ দেখালো প্লেনটার প্রতি। পায়ে পায়ে এসে জমা হতে লাগলো–কেউ বসলো, কেউ দাঁড়িয়ে রইলো, চারপাশ ঘিরে। ভীতু যারা, দূরে রইলো। সাহসীরা এগিয়ে এলো। বেশি সাহসী কেউ কেউ এসে বিমানে উঠে সঙ্গী হতে চাইলো দুই গোয়েন্দার। ডানায় চড়ে বসলো বেবুনের দল। জানালায় নাক ঠেকিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ভেতরে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগলো ভারভেট মাংকি।

চারটে গণ্ডার এসে হাজির হলো প্লেনের কাছে। বার কয়েক নাক টানলো, ঘোৎ ঘোঁৎ করলো। তেড়ে এলো একটা। কিন্তু আজব জানোয়ারটাকে নীরব। দেখে মাঝপথে থেমে আবার ফিরে গেল সঙ্গীদের কাছে। ব্যাটাকে নিয়ে কি করা। যায়, সেই আলোচনা চালালো যেন।

গণ্ডারগুলো যেন বোঝাতে চাইছে, তাদের এলাকায় থাকার কোনো অধিকার নেই এই আজব জন্তুটার। মাথা নুইয়ে শিং বাগিয়ে তেড়ে এলো একসঙ্গে। স্টর্কটাকে ধ্বংস করার জন্যে একটা গণ্ডারই যথেষ্ট। সেই জায়গায় চারটে মিলে কি করতে পারবে, ভাবতেই গলা শুকিয়ে গেল দুই গোয়েন্দার। আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে রইলো ওরা। প্লেন থেকে লাফিয়ে নেমে দৌড় দেয়ার ইচ্ছেটা দমন করলো অনেক কষ্টে।

গণ্ডারগুলো কাছে এসে গেছে, এই সময় সংবিৎ ফিরলো যেন মুসার। উঠে দাঁড়িয়ে হাত তালি দিয়ে জোরে জোরে চেঁচাতে শুরু করলো। রবিনও যোগ দিলো তার সঙ্গে।

 থমকে গেল চার-দানব। ওরা বোধহয় মনে করলো, আজব জীবটাই বিচিত্র চিৎকার করছে। দ্বিধায় পড়ে গেল। একে আক্রমণ করা উচিত হবে কিনা ঠিক করতে পারছে না। ঘেৎ ঘোৎ করে ফিরে গেল আগের জায়গায়, আবার আলোচনা শুরু করলো।

গণ্ডারের মতো বদমেজাজী জানোয়ার আলোচনা করে একবার যে একমত হয়েছিলো, সে-ই বেশি। দ্বিতীয়বার আর পারলো না। তর্কাতর্কি করে নিজেরাই পোচার। লেগে গেল শেষে। প্রচণ্ড মারপিটের পর একেকটা চলে গেল একেক দিকে। হাঁপ ছাড়লো রবিন আর মুসা।

 তীক্ষ্ণ নজর রেখে বিমানটার চারপাশে ঘুরছে গ্যাজেল হরিণ আর জিরাফ। ইমপালা হরিণেরা পেয়ে গেছে আরেক মজা। লাফিয়ে প্লেনের কে কতো ওপর দিয়ে যেতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় মেতেছে যেন। আড়াল থেকে বিদ্যুতের মতো বেরিয়ে এসে একটা হরিণের ওপর পড়লো চিতাবাঘ, মট করে ঘাড় ভেঙে ফেললো বেচারা প্রাণীটার।

সাঁঝের বাতাস চিরে দিলো একটা তীক্ষ্ণ চিত্তার। মুসা ভাবলো, মদ্দা হাতি। কিন্তু রবিনের জানা আছে ওটা কিসের ডাক, চিড়িয়াখানায় শুনেছে। ওরকম চিৎকার করতে পারে কোন প্রাণী, সেটা বইয়েও পড়েছে। গেছো হাইর্যাক্স। মাত্র ফুটখানেক লম্বা একটা নিশাচর জীব।

টুপ করে ঝরে গেল যেন গোধূলির শেষ আলোটুকুও। চাঁদ উঠতে সময় লাগবে। ঘন ছায়া নেমেছে বন, পাহাড় আর তৃণভূমি জুড়ে। কিলিমানজারোর তুষারে ছাওয়া চূড়াটাও ঢাকা পড়েছে অন্ধকারে। নীলচে-কালো আকাশের পটভূমিকায় এখন মস্ত এক ম্লান-ধূসর ছায়ামাত্র ওটা।

.

২১.

ঘুমানোর চেষ্টা করলো মুসা।

দূর! বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিলো। এরকম একটা সীটে ঘুমানো যায় নাকি? পা বাকা করে রাখতে হচ্ছে, তাতে ব্যথা আরও বেশি করছে। জানোয়ারের ভয় ইতিমধ্যে অনেকখানি কেটে গেছে। প্লেনের ডানার নিচে নরম ঘাসের বিছানা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারলো না গোয়েন্দা-সহকারী। ঝুঁকি নিয়েও নামলো নিচে।

ডানার নিচে ছায়া ছায়া অন্ধকার, উজ্জ্বল জ্যোৎস্নার মাঝে বেশ প্রকট। ওখানেই গিয়ে শুয়ে পড়লো সে। আশা করলো, এখানে চোখ পড়বে না হাতি, গণ্ডার কিংবা মোষের।

তবে আরেকটা মহা-বিপজ্জনক প্রাণীর কথা বেমালুম ভুলে গেল সে। সর্বনেশে পিঁপড়ে।

খবর পৌঁছে গেল পিপিলিকার রাজত্বে। দল বেঁধে পিলপিল করে এসে হাজির। হলো ওরা। আরামেই ঘুমিয়ে ছিলো মুসা, কুট করে কামড় লাগলো আহত পায়ে। পাত্তা দিলো না। ভাবলো, যন্ত্রণার পরিবর্তন ঘটছে। হাতে-পায়ে-গলায়-মুখে। একসাথে আরও কয়েকটা কামড় লাগতেই চোখ মেললো। দেরি করে ফেলেছে বেশ।

বুকের ওপর ঢলে পড়েছিলো রবিনের মাথা। চিৎকার শুনে ঝট করে সোজা হলো। দেখলো, উন্মাদ-নৃত্য জুড়েছে মুসা আমান। শরীরের যেখানে-সেখানে। চাপড় মারছে, টেনে ছিঁড়ে খুলে ফেলার চেষ্টা করছে গায়ের কাপড়। গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে।

 আমাজানের জঙ্গলের কথা মনে পড়ে গেল রবিনের। কিছু কিছু মানুষ আছে, যাদের গায়ের গন্ধ আকৃষ্ট করে পোকামাকড়কে, এসে চড়াও হয়। ওখানেও মুসার ওপর চড়াও হয়েছিলো পিঁপড়েরা, এমনকি রক্তচোষা বাদুড় এসেও আগে ধরেছিলো মুসাকেই।

কিভাবে বন্ধুকে সাহায্য করবে, সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই মুসার সাহায্যে এগিয়ে। এলো একটা বিচিত্র প্রাণী। পরোক্ষে মুসাকে সাহায্য করলেও, প্রত্যক্ষভাবে আসলে নিজেকেই সাহায্য করতে এসেছে। অনেক নাম ওটারঃ কেউ বলে অ্যান্ট-ঈটার, কেউ অ্যান্ট-বীয়ার, কেউ বা ডাকে আর ডু ভার ক, অর্থাৎ গর্তের শুয়োর বলে। তবে অ্যান্ট-ঈটার বা পিঁপড়েখেকো নামটাই বেশি মানানসই, কারণ, পিঁপড়ে খাওয়ার সুযোগ মিললে আর ছেড়ে কথা কয় না। সারা দিন গর্তে পড়ে ঘুমায়, রাতে বেরোয় খাবারের সন্ধানে। মুসার ভাগ্য ভালো, কাছাকাছিই ছিলো ওটা।

এগিয়ে এলো চার ফুট লম্বা জীবটা। ওজন একশো চল্লিশ পাউণ্ড মতো হবে। ভালুকের মতো থাবা, তাতে বড় বড় বাকা নখ–উইয়ের ঢিবি চেরার জন্যে, ক্যাঙারুর মতো লেজ, গাধার কান আর শুয়োরের মুখ নিয়ে ওকাপির চেয়ে কম। বিচিত্র নয় জনাব আবু ডু ভার।

 কাছে এসেই কাজে লেগে গেল পিঁপড়েখেকো। আঠারো ইঞ্চি লম্বা জিভ বের। করে প্রায় ছেকে নিতে শুরু করলো, যেন পিঁপড়ের দলকে। আমাজানের জঙ্গলে এরকম জীবকে রীতিমতো লড়াই করে পরাজিত করেছে মুসা, এদের সম্পর্কে ভয় নেই তার। সোজা গিয়ে দাঁড়ালো ওটার জিভের কাছে। মাটি থেকে তোলার চেয়ে চামড়া থেকে নেয়া সহজ, কাজেই, সহজ কাজটাই আগে করলো ওটা। জামাকাপড় সব খুলে একেবারে দিগম্বর হয়ে গেছে সহকারী গোয়েন্দা, রবিনকে আরেক দিকে তাকিয়ে থাকার অনুরোধ করছে বার বার।

 কিন্তু চাঁদের আলো নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে আছে মুসার কালো নগ্ন দেহের দিকে, মুহূর্তের জন্যে মুখ ফেরানোর নাম নেই। নিজের দিকে চেয়ে নিজেরই হাসি পেলো মুসার। পিঁপড়ে নেই আর শরীরে। হেসে উঠলো জোরে। প্লেনে বসা রবিনও হেসে ফেললো। এতোক্ষণ উত্তেজনায় খেয়ালই করেনি পিঁপড়েখেকো, মানুষের শরীর চাটছে। হাসির শব্দে যেন হুশ হলো। বড় বড় কয়েক লাফ দিয়ে। সরে গেল দূরে, সন্দিগ্ধ চোখে মুসার দিকে আরেকবার তাকিয়ে আবার পিঁপড়ে খাওয়ায় মন দিলো।

কাপড়চোপড় পরে ফেলল এবার, আরেক দিকে চেয়েই বললো রবিন। পরে জলদি উঠে এসো। যতদূর জানি, অ্যান্ট-বীয়ার সিংহের খুব প্রিয় খাবার।

মুহূর্ত দেরি করলো না মুসা। প্যান্টটা পায়ে গলিয়ে কোমরে বোতাম আঁটলো। বাকি কাপড়গুলো হাতে নিয়ে উঠে এলো ওপরে। আহত পা নিয়ে কষ্ট হলো, তাকে সাহায্য করলো রবিন।

ঠিকই, পিঁপড়েখেকোর গন্ধ পেয়ে কোথা থেকে এসে হাজির হয়েছে একটা সিংহ। চাঁদের আলোয় বিশাল ছায়া পড়েছে ওটার। লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো। তারপর ছায়ার মতোই নীরবে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো, থেমে গেল। প্লেনের ডানার নিচে, ছায়ায়। ধক ধক করে জ্বলছে চোখ, দৃষ্টি পিঁপড়েখেকোটার ওপর নিবদ্ধ।

সিংহ তার খাবার ধরবে, এটাই স্বাভাবিক। অন্য সময় হলে হয়তো কিছু বলতো না মুসা, কিন্তু এখন পিঁপড়েখেকোটা ঋণী করে ফেলেছে তাকে। ঋণ শোধ করার জন্যে নিজের বিপদ উপেক্ষা করলো সে, হাত তালি দিয়ে জোরে চেঁচিয়ে সাবধান করে দিলো জীবটাকে।

রাগে গর্জে উঠলো সিংহটা। ছুটে গেল শিকারের দিকে।

ততোক্ষণে হুশিয়ার হয়ে গেছে পিঁপড়েখেকো। অবিশ্বাস্য একটা কাণ্ড করলো। ছুটে পালানোর চেষ্টাও করলো না, করলেও সিংহের সঙ্গে দৌড়ে পারতো না। দুই থাবা দিয়ে নরম মাটি খুঁড়তে শুরু করলো। এতো দ্রুত, যেন আশ্চর্য ক্ষমতাশালী একটা খোঁড়ার-যন্ত্র। সিংহটা ওটার কাছে গিয়ে পৌঁছার আগেই খোঁড়া হয়ে গেল গর্ত, ভেতরে ঢুকে পড়লো জানোয়ারটা। মুসা আর রবিন দেখতে পাচ্ছে না এখন, অনুমান করলো নিশ্চয় খোঁড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ওটা। লম্বা সুড়ঙ্গ বানিয়ে চলে যাবে সিংহের নাগালের বাইরে।

ওদের অনুমান ঠিক। গর্তের মুখে নাক নামিয়ে শুকলো সিংহ। আরেকবার গর্জন করলো। নিরাশ হয়ে সরে এলো গর্তের কাছ থেকে। মুখ তুলে তাকালো। প্লেনের দিকে।

দুরুদুরু করে উঠলো দুই গোয়েন্দার বুক। এবার? কি ভাবছে ব্যাটা?

.

ভালো ঘুম কি আর হয়? দুবার হায়েনার ডাকে চমকে জেগে উঠলো দুজনে।, প্লেনের নিচে এসে, হুটোপুটি লাগিয়েছে ওগুলো। টায়ার কামড়াতে শুরু করেছে। চেঁচিয়ে, বিমানের গায়ে বাড়ি দিয়ে ওগুলোকে তাড়ালো ওরা। আবার তন্দ্রায় ঢলে পড়লো।

ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখলো মুসা। ভয়ানক এক গণ্ডার আক্রমণ করেছে তাকে। মাটিতে পেড়ে ফেলে শিং দিয়ে তোচ্ছে বুকে। চিৎকার করে জেগে উঠলো সে। দেখলো, সকাল হয়ে গেছে। বুকে হাত রেখে ঠেলছে কিশোর। ষোল ঘন্টার আগেই ফিরে এসেছে।

আরে, এই মিয়া, ওঠো, হেসে বললো কিশোর। কতো ঘুমাবে? এই নাও তোমার স্যাণ্ডউইচ।

রবিন আগেই জেগেছে।

মুসা দেখলো, প্লেনের পেছনে গাড়ির মিছিল। ওয়ারডন টমসন এসেছেন, সঙ্গে এসেছে তার তিনজন রেঞ্জার আর তিরিশজন মাসাই।

খেয়ে নাও জলদি, দুই বন্ধুকে তাড়া দিলো কিশোর। পোচার ব্যাটাদের ধরতে যেতে হবে।

প্লেনটা? স্যাণ্ডউইচ চিবাতে চিবাতে জিজ্ঞেস করলো মুসা। কিভাবে নেয়া হবে?

নাইরোবিতে মেকানিকের জন্যে তার পাঠিয়ে দিয়েছেন ওয়ারডেন। প্লেনের ভাবনা এখন আর আমাদের নয়। গিয়ে গর্তগুলো খুঁজে বের করতে হবে।

বিশ মাইল দূরে সেই বাওবাব ওরফে জলহস্তী গাছের জঙ্গল। আগের দিনের মতোই নির্জন। হঠাৎ, চাপা একটা শব্দ শোনা গেল। মানুষের কণ্ঠস্বর। মনে হলো, মাটির নিচ থেকে আসছে।

ঝোপঝাড়ের মাঝে ফাঁকা জায়গাগুলো দেখে মাসাইরা জানালো, হাতি ধরার ফাঁদই তৈরি করা হয়েছে ওসব জায়গায়। ওপরের ডালপাতা সরানো বিপজ্জনক। পোচাররা নিচে থেকে থাকলে, সরানোমাত্র তীর ছুঁড়তে পারে।

উবু হয়ে শুয়ে সাবধানে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল কয়েকজন মাসাই। একটা গর্তের কিনারে পৌঁছে আলগা ডালপাতা ধরে টেনে সরালো, ফাঁক করে উঁকি দিলো নিচে। কোনো তীর কিংবা বল্লম ছুটে এলো না ওদের দিকে। সামনে মুখ বাড়িয়ে আরও ভালোমতো দেখলো। কেউ নেই।

এক এক করে সবগুলো গর্ত দেখা হলো। কোনোটাতেই মানুষ নেই। কিন্তু মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে।

ভয় পেয়ে গেল মুসা। খাইছে! ভূত নাকিরে বাবা! নির্ভীক বৈমানিকের এহেন উক্তি শুনে না হেসে পারলেন না ওয়ারডেন।

কিশোর নীরব। কান পেতে শুনছে। কোনো সন্দেহ নেই, মানুষেরই কণ্ঠস্বর। গর্তে নেই, ঝোপের ভেতরে নেই আসছে কোথা থেকে তাহলে? চিন্তিত ভঙ্গিতে বাওবার গাছগুলোর দিকে তাকালো সে। ওগুলোতেও ঘন ডালপাতা নেই, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে মানুষ। তাহলে?

পায়ে পায়ে একটা গাছের কাছে চলে এলো গোয়েন্দাপ্রধান। থেমে গেল কথা বলা, আর কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। মাসাইরাও নীরব। একটা মোটা গাছের চারপাশে ঘুরে এলো সে, নেই কেউ।

হতাশ হয়ে প্রায় হাল ছেড়ে দিতে যাচ্ছিলো কিশোর, হঠাৎ পেছনে ফিসফিস করে বলে উঠলো রবিন, কিশোর, এক মিনিট। আমার মনে হয় ব্যাটারা এখানেই আছে।

আছে? কোথায়?

কোনো রহস্যের সমাধান করে ফেলতে পারলে, সেটা রবিন। আর মুসা না। বুঝলে তাদের দিকে যেভাবে চেয়ে মিটিমিটি হাসে কিশোর, এখন ঠিক তা-ই করলো রবিন। নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো, অনুমান করো।

তার চেয়ে কেউ বেশি জানুক, এটা সইতে পারে না কিশোর। ভোঁতা কণ্ঠে বললো, জানি না…না না, দাঁড়াও! তুড়ি বাজালো। বুঝেছি!

কোথায়? মুসাও এসে দাঁড়িয়েছে পাশে।

এই গাছগুলোর কাণ্ড কতো মোটা দেখেছো? মুসাকে বললো রবিন। পাশ ফুটের বেশি উঁচু হয় না বাওবাব, কিন্তু পাশে বাড়ে। বেঁটে, অসম্ভব মোটা মানুষের মতো কুৎসিত হয়ে যায়। পেটের বেড় হয়ে যায়, ষাট ফুটের ওপর।. এই যে, এগুলোর বেড় আরও বেশি মনে হচ্ছে। নিশ্চয় অনেক পুরনো, পাঁচশো থেকে হাজার বছরের, সেজন্যেই এতো মোটা। মজা হলো, পাশে যতো বাড়তে থাকে, পুরনো বাওবাবের ভেতরটা ততো ফোপরা হয়ে যায়। একেবারে খালি কোঠা। বিশজন মানুষ অনায়াসে থাকতে পারে।

কিন্তু ঢুকলো কোন দিক দিয়ে? গাছগুলোর ওপরে-নিচে আবার তাকালো। মুসা। ফোকর-টোকর তো দেখছি না।

ডাল যেখান থেকে ছড়িয়েছে।

ঢোকার মুখ ওখানে? হাত তুলে একটা গাছ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো মুসা। গাছটার ডালগুলো ছড়িয়েছে মাটির বারো ফুট ওপর থেকে। রবিন জবাব দেয়ার আগেই হাত নেড়ে মুগামবিকে ডাকলো সে।

কাছে এসে দাঁড়ালো বিশালদেহী মাসাই। তার কাঁধে চড়ে একটা ডাল ধরে ফেললো মুসা। পায়ের ব্যথা অনেক কম, নাড়াচাড়া করলেও আর তেমন লাগে না। এখন। ডালে উঠে লম্বা হয়ে শুয়ে ক্রল করে নিচের দিকে এগোলো। সবগুলো ডাল যেখানে মিলিত হয়েছে, ঠিক তার মাঝখানে বড় একটা কালো ফোকর। ওটার কাছে এসে সাবধানে মুখ বাড়ালো সে, নিচে উঁকি দিলো।

আশা করেছিলো, তীর ছুটে আসবে একঝাঁক।

কিছুই এলো না। ভেতরের বিষণ ছায়ায় দেখা গেল অনেকগুলো কালো মুখ। ওপর দিকে চেয়ে আছে। দুষ্টুমি করতে গিয়ে ধরা পড়লে বাচ্চা ছেলে যেরকম করে, অনেকটা সেরকম ভাবসাব।

সরে এসে আবার মুগামবির কাঁধে নামলো মুসা। সেখান থেকে মাটিতে।

 গাছের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো পোচাররা। টপাটপ লাফিয়ে। পড়লো মাটিতে। খালি হাতে বেরিয়েছে, অস্ত্রশস্ত্র সব রেখে এসেছে। গাছের ভেতরে। আক্রমণের ইচ্ছে নেই, পালানোরও নয়। সম্পূর্ণ পরাজিত, আত্মসমর্পণ করতে বেরিয়েছে।

এগিয়ে এলেন ওয়ারডেন। বললেন, মুগামবি, জিজ্ঞেস কর তো, এতো ভালো হয়ে গেল কেন হঠাৎ?

সোয়াহিলি ভাষায় জিজ্ঞেস করলো মুগামবি। জবাব দিলো নেতা গোছের একজন পোচার। ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনালো সেটা মাসাইদের সর্দার, ওরা আর লড়াই করতে চায় না। একাজ ছেড়ে দিতে চায়।

কেন?

অনেক কষ্ট করে ফাঁদ পাতে ওরা, কুঁড়ে বানায়। বার বার আমরা গিয়ে নষ্ট করে দিই। গত কিছু দিন ধরে একটা ফাঁদ থেকেও কিছু আয় করতে পারেনি। ওরা। খালি সিলভারের ধমক-ধামক শুনেছে। ওদের সঙ্গে তার চুক্তি, মাল দেবে, টাকা নেবে। দিতেও পারেনি, নিতেও পারেনি। অহেতুক গাধার খাটনি খাটতে আর রাজি নয় ওরা।

নেতা গোছের লোকটা অন্যান্য গাছের দিকে চেয়ে জোরে জোরে কি বললো।

আরও কয়েকটা গাছ থেকে বেরিয়ে এলো অনেক পোচার। একটা গাছ থেকে কয়েকজন পোচারের সঙ্গে বেরোলো স্বয়ং লঙ জুন সিলভার, কিন্তু সে আত্মসমর্পণ করবে না। দুই হাতে দুই রিভলভার, দাড়িতে ময়লা, রাগে দুদিকে সরে গেছে। ঠোঁটের দুই কোণ। চেঁচিয়ে লড়াই করার আদেশ দিলো. পোচারদের। ওরা, কথা। শুনছে না, দেখে লাফাতে শুরু করলো। রিভলভার তুলে গুলি ছুড়লো আকাশে। তারপরও শুনছে না দেখে কেউ বাধা দেয়ার আগেই গুলি করে মেরে ফেললো একটা লোককে। বব্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে যেন।

 এবার নড়লো পোচাররা। তবে মাসাইদের বিরুদ্ধে নয়। চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললো তাদের নিজের নেতাকেই। গুলিতে আহত হলো আরও কয়েকজন। পরোয়া করলো না। সিলভারের হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নিয়ে কিল-ঘুসি মারতে মারতে মাটিতে শুইয়ে ফেললো তাকে। টমসন আর মাসাইরা বাধা না দিলে মেরেই ফেলতো লোকটাকে।

ওঠো, আদেশ দিলেন ওয়ারডেন।

কম্পিত পায়ে উঠে দাঁড়ালো সিলভার। বিড়বিড় করে গাল দিচ্ছে। চোখ লাল। তিন গোয়েন্দার দিকে চোখ পড়তে আর সামলাতে পারলো না নিজেকে। ঘুসি পাকিয়ে ছুটে এলো ওদের দিকে।

খানিক দূরে বসে উৎসুক চোখে গণ্ডগোল দেখছিলো সিমবা। নিজে কিছু, করার সুযোগ পাচ্ছিলো না। এইবার পেলো। বাপ-দাদার অনুকরণে হিংস্র গর্জন ছেড়ে ধেয়ে এলো তীব্র গতিতে। সিলভারের বুকে দুপা তুলে দিয়ে গলায় কামড় বসাতে গেল।

কিছুই বললো না মুগামবি। কিন্তু বাধা দিতে ছুটে গেল মুসা। না না, সিমবা! সি-ম-বাআ! ওটার কলার চেপে ধরে টান দিলো।

ভীষণ রেগেছে আজ বুনো কুকুরের বংশধর। ঝাড়া দিয়ে মুসার হাত থেকে বেল্ট ছাড়িয়ে নিয়ে আবার কামড় বসাতে গেল। ধস্তাধস্তি করতে করতে মাটিতে চিত হয়ে পড়লো সিলভার। লম্বা হয়ে তার গায়ের ওপর সেটে এলো সিমবা, শিকারকে পাকড়াও করে খুন করার আগে যেভাবে চেপে ধরে বুনো কুকুর, তেমনিভাবে।

এই বার এসে হাত লাগালো মুগামবি। অনেক কসরত করে টেনে সরালো কুকুরটাকে। এখন আদরে কাজ হবে না, জানা আছে তার, ঠাস ঠাস করে কষে দুই থাপ্পড় লাগালো সিমবার মাথার দুই পাশে। শান্ত হলো কুকুরটা।

কোনোমতে উঠে বসলো সিলভার। টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো। ডলছে আহত জায়গাগুলো।

তোমার খেল খতম, সিলভার, ওয়ারডেন বললেন। অনেক জ্বালান। জ্বালিয়েছো..ভাগ্যিস তিন গোয়েন্দাকে পেয়েছিলাম…

আমার কচুটাও করতে পারবে না তুমি, বুড়ো আঙুল দেখালো সিলভার, তেজ কমেনি। অনেক টাকা আছে আমার। টাকার জোরে পার পেয়ে যাবো।

আদালতে গিয়ে জজ নির্মল পাণ্ডাকে বলো সেকথা। তোমার ছাল ছাড়িয়ে নেবে। জানোয়ার তো মেরেছোই, সেই সঙ্গে মানুষ খুনও করেছো। তোমাকে ফাঁসিতে ঝোলাবে নির্মল। দুনিয়ার সব টাকা দিলেও তার হাত থেকে নিস্তার পাবে না।

জোরে হেসে উঠলো সিলভার।

তার হাসি শুনে আবার রেগে গেল সিমবা। ঝাড়া দিয়ে বেল্ট ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে যেতে চাইলো। কিন্তু মুগামবির সঙ্গে পারলো না।

এখনও পাণ্ডা পাণ্ডা করছেন, স্যার? গম্ভীর হয়ে ওয়ারডেকে বললো। কিশোর। কথা শুনেও কিছু বুঝতে পারছেন না? অনেকখানি বদলে ফেলেছে বটে চেহারা, কণ্ঠস্বর কিন্তু পুরোপুরি ঢাকতে পারেনি। এতোদিনের বন্ধু আপনার, এতো ঘনিষ্ঠতা, তা-ও চিনতে পারছেন না?

 অবাক হয়ে কিশোরের দিকে তাকালেন টমসন। কি বলছো?

ঠিকই বলছি, সিলভার কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাত বাড়িয়ে তার দাড়ি ধরে হ্যাঁচকা টান মারলো কিশোর। খুলে এলো নকল দাড়ি বেরিয়ে পড়লো জজ নির্মল পাণ্ডার মুখ।

স্তব্ধ হয়ে গেলেন ওয়ারডেন। কথা সরছে না মুখে।

হা হা করে হাসলো জজ। কেন ঘাবড়াইনি বুঝতে পারছো তো? আমি জজ, আদালতে আমার বিচার আমিই করবো। তুমি একটা আস্ত গাধা, ওয়ারডেন। হাহ হাহ হা!

হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নাইরোবি পুলিশের হাতে পড়ার পরই শুধু নরম হলো জজ নির্মল পাণ্ডা, যখন দেখলো ঘুষ খায় না, এমন লোকও আছে। কোটি কোটি টাকার লোভ দেখিয়েও যাকে দিয়ে অন্যায় করানো যায় না। ওখানকার জজকে কিনতে পারলো না সে। যাবজ্জীবন জেল হয়ে গেল। অন্যায়ভাবে অর্জিত তার সমস্ত টাকা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দান করে দেয়া হলো আফ্রিকান ওয়াইল্ডলাইফ সোসাইটিকে।

নিজের মুখে সব কুকর্মের কথা স্বীকার করেছে নির্মল পাণ্ডা, তবু যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না ওয়ারডেন টমসন। ওরকম নিরীহ চেহারার হাসিখুশি একজন ভদ্রলোক এতো খারাপ হতে পারে, কল্পনাই করেননি তিনি কোনোদিন। সব। চেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছেন, একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে হারিয়েছেন বলে, অন্তত তিনি নিজে জজ নির্মল পাণ্ডাকে বন্ধু হিসেবেই নিয়েছিলেন।

.

ফেরার দিন এলো তিন গোয়েন্দার। স্টর্ক বিমানটা ঠিক হয়ে গেছে। তাতে চড়েই, নাইরোবি যাবে ওরা। সেখান থেকে জেট লাইনারে চড়ে আমেরিকায়।

 ওয়ারডেন টমসন যেতে পারবেন না ওদের সঙ্গে। জরুরী কাজ আছে। তাছাড়া জায়গাও নাকি হবে না বিমানটায়। কেন হবে না, বুঝতে পারলো না তিন গোয়েন্দা। প্রশ্ন করেও কোনো জবাব মিললো না, শুধু রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন তিনি।

নির্দিষ্ট দিনে বিমানটায় উঠলো তিন গোয়েন্দা, পাইলটের সীটে অবশ্যই মুসা আমান। উঠেই অবাক হয়ে গেল। তার পেছনের সীটের পায়ের কাছে আরাম করে শুয়ে ছিলো বুনো কুকুরের বংশধর, সাড়া পেয়ে লাফিয়ে উঠে বসলো সীটে। মৃদু গাউ করে উঠলো। স, আরি, তুই! চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। তুই এখানে কি করছিস? যা যা, নাম। আমরা চলে যাচ্ছি।

না, ও-ও যাচ্ছে তোমাদের সঙ্গে, নিচে থেকে হাসিমুখে বললেন ওয়ারডেন। পাশে দাঁড়ানো মুগামবির দিকে একবার চেয়ে আবার ফিরলেন কিশোর বৈমানিকের দিকে। আমার তরফ থেকে, মুগামবির তরফ থেকে, আফ্রিকান ওয়াইল্ডলাইফ সোসাইটির তরফ থেকে তিন গোয়েন্দাকে উপহার। অনেক করেছো তোমরা। উপহার দিয়ে সেই ঋণ শোধ করা যাবে না। এই সামান্য উপহারটুকু নিলে আমরা সবাই খুশি হবো।

কিন্তু মুগামবির প্রিয়…, বলতে গিয়ে বাধা পেলো মুসা।

ও-ই তো প্রস্তাবটা দিয়েছিলো আমাকে, বললেন টমসন। তুমি যে সিমবাকে ভালোবেসে ফেলেছো, তোমাকেও কুকুরটা ভালোবেসেছে, এটা ওর নজর এড়ায়নি…

কিন্তু, তবু…

তুমি ওটা নাও, মুসা, এবার বাধা দিলো মুগামবি। না নিলেই বরং আমি। দুঃখ পাবো। বুনো কুকুর অনেক আছে এখানে, দরকার হলে সহজেই আরেকটা বাচ্চা আমি জোগাড় করে নিতে পারবো। জন্তুজানোয়ারের প্রতি তোমার। ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ। তোমার মতো ছেলেরা যখন জন্মাচ্ছে, বুঝতে পারছি, সুদিন আসছে আফ্রিকার, চোখ মুছলো মাসাই-সর্দার। কিশোর, রবিন, তোমরাও জন্মভূমির গর্ব। শুধু যার যার দেশেরই নও, সারা দুনিয়ার গর্ব তোমরা। দোয়া করি, বখে যাওয়া কিশোররা তোমাদের দেখে শিখুক, ভালো হোক, মানুষ হোক…

তাজ্জব হয়ে গেল তিন গোয়েন্দা, অশিক্ষিত এক মাসাইয়ের দেশপ্রেম দেখে, নীতিবাক্য শুনে, অনেক বড় বড় শিক্ষিত মানুষও এভাবে গুছিয়ে বলতে পারবে না।

নরম কথা শুনলে মুসার চোখে পানি এসে যায়। এখনও তার ব্যতিক্রম হলো। না। আপনার জন্যেও গর্ববোধ করছি আমি, মিস্টার মুগামবি। থ্যাঙ্ক ইউ।

হাসি ফুটলো মাসাইয়ের কালো চোখের তারায়। সিমবার দিকে তাকালো, যা বাবা, ভালো থাকিস। বন্ধুর কথা শুনবি সব সময়, গোলমাল করবি না।

রবিন, কিশোরও মুগামবি আর টমসনকে ধন্যবাদ দিলো।

এই চিঠিটা নিয়ে যাও, কিশোরের হাতে একটা খাম দিলেন ওয়ারডেন। এয়ারপোর্ট ম্যানেজারকে দিও। স্টর্কটীকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা তিনি। করবেন..আর হ্যাঁ, আমার ব্যানড়া সব সময় তোমাদের জন্যে খোলা রইলো। সুযোগ পেলেই বেড়াতে চলে এসো। যাও, উইশ ইউ গুড লাক।

সিমবাও যেন ভাবলো, গুড লাক জানানো দরকার নতুন মনিবকে। পেছন থেকে মুসার গাল, কান চেটে দিলো। হেসে উঠলো সবাই। তরল হয়ে গেল পরিবেশ। হাসিমুখে স্টর্কের এঞ্জিন স্টার্ট দিলো মুসা আমান।

<

Super User