রক্তমাখা ছোরা – তিন গোয়েন্দা (ভলিউম-৫১)
প্রথম প্রকাশ: ২০০২

০১.

কাঁসার ঘণ্টার মত বেজে উঠল জোরাল কণ্ঠস্বর টুউউউ বিইইই…

কে? চমকে উঠল কিশোর।

শোনার জন্যে রবিন আর মুসাও কান পাতল।

…অর নট টুউউউ বিইইই…

রবিন বলল, কে জানি পদ্য বমি করছে!

জুনের চমৎকার রোদেলা দিন। হাতে কাজকর্ম নেই। বনের ভেতরে বেড়াতে এসেছে তিন গোয়েন্দা। সাথে করে খাবার নিয়ে এসেছে, লাঞ্চটা এখানেই সারবে। খাবার খুলে সবে খেতে বসেছে, এ সময় এই কাণ্ড!

দ্যাট ইজ দা কোয়েশ্চেন… বলে চলেছে কণ্ঠটা।

না না, পদ্য নয়, ভুরু কুঁচকে বলল কিশোর। হ্যামলেটের ডায়ালগ। তৃতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্য, আত্মহত্যা করতে চলেছে হ্যামলেট।

মনে হয় কোন হতাশ অভিনেতার কাজ।

অভিনেতা না ছাই, মুসা বলল। আমার তো মনে হচ্ছে পাগল।

 গমগম করে উঠল কণ্ঠটা, টু ডাই, টু স্লীইইপ-নো মোর!…

অবাক কাণ্ড! রবিন বলল। কিন্তু…

চলো তো দেখি। উঠে পড়ল কিশোর। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল নদীর দিকে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে অনুসরণ করল রবিন।

কণ্ঠটা বলছে, ফর ইন দ্যাট স্লীপ অভ ডেথ হোয়াট ড্রীমস মে কাম…

এবার সত্যি সত্যি গায়ে কাঁটা দিচ্ছে আমার! মুসার কণ্ঠে অস্বস্তি।

নদীর একটা বাঁকের কাছে পৌঁছে গেছে ওরা। সামনে একটা কাঠের সেতু। ঝুলে রয়েছে যেন নদীর ওপর, যে কোন মুহূর্তে ঝুপ করে খসে যেতে পারে। খুঁটিগুলোর অবস্থা করুণ। সেতুর মাঝের অনেক কাঠ নেই, কিছু কিছু জায়গা থেকে সরে গিয়ে ঝুলছে, নাড়া লাগলেই খুলে পড়ে যেতে পারে। দুপাশে দড়ির রেলিঙ।

নদীতে তীব্র স্রোত। মাথা খারাপ না হলে ওই সেতু দিয়ে এখন নদী পারাপারের চেষ্টা করবে না কোন মানুষ।

কিন্তু লোকটার বোধহয় মাথাই খারাপ। সব চুল সাদা। কালো পোশাক পরনে। দাঁড়িয়ে রয়েছে সেতুর মাঝখানে। চোখ আরেক দিকে।

বলল, ফর হুউউ উড বিয়ার দা হুইপস অ্যান্ড স্করনননস অভ টাইম…

বদ্ধ উন্মাদ! ফিসফিসিয়ে বলল রবিন। বলে কি শুনছ!

দুহাত ওপরে তুলে ফেলেছে লোকটা। চলার গতি বাড়াল কিশোর। বলল, শুনছি। হ্যামলেট এ-সময় জীবন শেষ করে দেয়ার কথা ভাবে…

হোয়েন হি হিমসে মাইট হিজ কোয়ায়েটাস মেইক উইথ…

কি করার ইচ্ছে ওর? বুঝতে পারছে না রবিন।

 জানি না…

 আ বেয়ার বড়কিন!

 বেয়ার বডকিনটা আবার কি জিনিসরে বাবা! মুসার প্রশ্ন।

সেতুর দিকে দৌড়াতে শুরু করেছে কিশোর। একটা ড্যাগার! ছুরি! লোকটা সত্যিই কিছু করবে!

চেঁচিয়ে উঠল মুসা, না, কিছু করবেন না, স্যার! সব ঠিক হয়ে যাবে!

চমকে ফিরে তাকাল লোকটা। তিন গোয়েন্দাকে দৌড়ে আসতে দেখল। মুখে অসংখ্য ভাঁজ। বয়েসের। চেহারা বিধ্বস্ত, কিন্তু মাথার চুল সব ঠিক আছে, এলোমেলো নয়। একঘেয়ে গলায় বলল, আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। নিজের হাতেই জীবন দিয়ে দেব আমি।

ঝট করে একটা ছুরি বের করল। তুলে আনল বুকের ওপর।

কিশোর বুঝল, সেতুতে চড়ার সময় নেই। নদীর কাদাটে ঢাল পাড়ে ধপ করে বসে পিছলে নেমে গেল একটা খুঁটির কাছে।

ইনটু দা গ্রেট এভারলাসটিং আই কমেন্ড মাই স্পিরিট! ভারী গলায় চিৎকার করে উঠে ছুরিটা বুকে বসাতে তৈরি হলো লোকটা।

নাআআআ! গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল রবিন।

নড়বড়ে খুঁটিটা দুহাতে চেপে ধরল কিশোর। গায়ের জোরে ঝাঁকাতে শুরু করল। কাঁচম্যাচ করে দুলে উঠল পুরানো সেতু। তাল সামলাতে না পেরে তাড়াতাড়ি একদিকের দড়ির রেলিঙ আঁকড়ে ধরল লোকটা। ঝুলে থাকা কয়েকটা তক্তা খসে পড়ল পানিতে।

ঝাঁকিয়েই চলেছে কিশোর। মড়াৎ করে ভাঙল সেতুর একটা বীম, পুরানো আরেকটা বীম ভার রাখতে পারল না, ভেঙে গেল ওটাও। বিকট শব্দ করে ঝটকা দিয়ে পড়ে গেল সেতুর একপ্রান্ত। দড়িটড়ি কোন কিছু ধরেই আর কাজ হলো না। সামলাতে পারল না লোকটা। ঝপাং করে পড়ল পানিতে। ছুরিটা তখনও ধরে রেখেছে শক্ত করে।

ডুবে যাওয়ার আগে লোকটার রক্ত পানি করা চিৎকার প্রতিধ্বনি তুলল নদীর দুই তীর আর পাহাড়ে। মাঝপথে থেমে গেল চিৎকারটা, যেন গলা টিপে থামিয়ে দেয়া হলো। আতঙ্কিত চোখে মুসা দেখল, তীব্র স্রোত লোকটাকে ভাসিয়ে নিয়ে আসছে তার দিকে।

চলে যাবে! মরবে! পাথরে গিয়ে বাড়ি খাবে!

মুসার চিৎকার কানে পৌঁছল কিনা বোঝা গেল না, তবে কোনমতে মা তুলল লোকটা। বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও! সাঁতার জানি না…! নাকে মুখে পানি ঢুকে গেল বোধহয় ওর।

প্রায় একই সঙ্গে পানিতে ডাইভ দিল তিন গোয়েন্দা। মাথা তুলল লোকটা, আবার ডুবে গেল। এরই মাঝে পলকের জন্যে নজরে পড়ল তার আতঙ্কিত দৃষ্টি। তীব্র স্রোত ঠেলে তার কাছে পৌঁছল ওরা। হাত বাড়িয়ে কাধ ধরতে গিয়েও ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল মুসা। মুখ সরাল। আরেকটু হলেই তার গাল চিরে দিয়েছিল চুরির তীক্ষ্ণ ফলা।

কাছেই তো যেতে পারছি না! বলল সে।

শান্ত হোন, স্যার! অনুরোধ করল কিশোর! হাত নাড়বেন না। চুপচাপ ভেসে থাকার চেষ্টা করুন।

আমি…আমি…সাঁতার… আবার পানির নিচে ডুবে গেল লোকটার মাথা।

লোকটা সহযোগিতা করতে পারবে না, চিন্তা করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে, বুঝল মুসা। হঠাৎ চার হাত পায়ে জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে আগে বাড়ল, লোকটার বুক জড়িয়ে ধরল। লাথি মেরে, ঝাড়া দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল যেন লোকটা, ছুরি নাচাল অনিশ্চিত ভঙ্গিতে।

সাবধান! চেঁচিয়ে মুসাকে সাবধান করল কিশোর।

ডান হাতে লোকটাকে জড়িয়ে ধরে রেখে অন্য হাতে লোকটার ডান কব্জি চেপে ধরল মুসা। একটা বিশেষ দুর্বল জায়গায় বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিতেই নিমেষে খুলে গেল ছুরি ধরা আঙুলগুলো পানিতে পড়ে গেল ছুরিটা।

ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে এসেছে লোকটা। নড়াচড়া আর তেমন করছে না। তাকে নিয়ে সঁতরে তীরে ওঠার চেষ্টা চালাল মুসা। মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে রয়েছে চোখা পাথরের দেয়াল, দুপাশ থেকে চেপে এসেছে, মাঝের সরু ফাঁক দিয়ে বয়ে চলেছে পানি। লোকটাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মুসা দেখল না সেটা, কিন্তু রবিনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

ছেড়ে দাও, মুসা, ছেড়ে দাও! তুমিও মরবে!

 জলদি এসে ধরো! আমি একলা পারছি না!

কিছুতেই ছাড়বে না মুসা, বুঝতে পেরে প্রাণপণে সাঁতরে এগোল অন্য দুজনে। কোনমতে কাছে এসে চেপে ধরল লোকটার হাত।

তিনজনে মিলে টেনেটুনে তীরের কাছে নিয়ে এল লোকটাকে। অল্পের জন্যে বেঁচে গেল লোকটা। চোখা পাথরের দেয়াল থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে তীরে এসে উঠল ওরা।

ভেজা মাটিতে চিত করে শুইয়ে দেয়া হলো লোকটাকে। চোখ মুদে রয়েছে সে। বেহুশ হয়ে গেছে বোধহয়। তাড়াতাড়ি ওর মুখে মুখ লাগিয়ে কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাসের চেষ্টা চালাল কিশোর।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কেশে উঠল লোকটা। আ-আমি…কো-কোথায়…

চোখ মেলল লোকটা। ঘোলাটে দৃষ্টি। শূন্য চাহনি। ঠিক হয়ে এল ধীরে ধীরে। আমি বেঁচে আছি, তাই না?

আছেন। অল্পের জন্যে বেঁচেছেন, জবাব দিল কিশোর। সময় খারাপ যাচ্ছে নাকি আপনার?

খারাপ? বিড়বিড় করল লোকটা। দুর্বল কণ্ঠ, কিন্তু রাগ চাপা পড়ল না, বলল, শুধু খারাপ বললে কম বলা হবে। কোনমতে জীবনটাকে টিকিয়ে রেখেছি আমি!

আস্তে। আস্তে। হাত নাড়ল কিশোর, সহজভাবে কথা বলুন। আপনি কে? এখানে কি করতে এসেছেন?

আমি একজন বিপদে পড়া মানুষ, স্যার, নাটক করতে করতে যেন নাটকীয় ভঙ্গিতে কথা বলা অভাস হয়ে গেছে লোকটার। মাথা ঝাড়ল, যখন তাকে তুলে বসানোর চেষ্টা করল রবিন। নাম আমার নিভার ব্রাউন। চোখ নামিয়ে মাথা নাড়ল বিষণ্ণ ভঙ্গিতে। হ্যাঁ, থিয়েটার আর সিনেমার সেই নিভার ব্রাউন। চমকে গেলে তো?

কারও কাছ থেকে জবাব না পেয়ে মুখ তুলে দেখল ওদের শূন্য দৃষ্টি। আর্ট ফিল্ম বোধহয় দেখো না তোমরা!

মাথা নাড়ল তিনজনেই।

তাহলে আর চিনবে কিভাবে? পচা নাটক আর সিনেমা দেখলে আমার নাম জানার কথা নয়। যাকগে! এখন আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও তো। কেন বাধা দিলে আমাকে?

আত্মহত্যা একটা অপরাধ, মিস্টার ব্রাউন, কোমল গলায় বলল রবিন। আপনার পরিবারের কথা ভাবুন…

কঠিন হয়ে গেল লোকটার ধূসর চোখজোড়া, দৃষ্টি যেন ধারাল ছুরির ফলার মত ভেদ করে ঢুকে গেল রবিনের অন্তরে। পরিবার? সেই চরিত্রহীন মেয়ে মানুষটার কথা বলছ, যে আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে হলিউডের এক ফিল্ম এডিটরের সঙ্গে!

স-সরি, মিস্টার ব্রাউন, আমি সত্যি দুঃখিত।

আরে শোনোই না, আমার দুঃখের ইতিহাস শুরুই তো করিনি এখনও। আর্ট ফিল্ম আর খুব একটা হয় না আজকাল, ফলে কাজ পাওয়া যায় না। একজন নিয়মিত একটা বেতন দিয়ে যাচ্ছিলেন, এখন সেটাও গেছে। তা ছাড়া মনের খোরাকই যদি গেল একজন মানুষের, বেঁচে থাকার আর কি অর্থ বলো? জীবনের সব কিছু হারিয়ে আমার বয়েসী একজন মানুষ বেঁচে থেকে কি করবে? আঁ! কি করবে? আশপাশে মাটিতে চোখ বোলাল সে। আমার ছুরি কই?

পানির তলায়, কিশোর জানাল। নদীতে। শুনুন, ওসব পাগলামি চিন্তা বাদ দিয়ে আমাদের সঙ্গে আসুন। গাড়ি আছে। বাড়ি পৌঁছে দেব। বিশ্রাম নিলেই মাথা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে আছেন এখন আপনি।

হবে না, হবে না! ওই ছুরিটা হারিয়ে তো মন আরও খারাপ হয়ে গেল! ওই ছুরিটা আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি। আমার বাবার বাবা, তার বাবা, তার বাবার কাছ থেকে এসেছে! করলে কি তোমরা! আমাকে মরে তোত বাঁচতে দিলেই না, মাঝখান থেকে ওরকম একটা সম্পদ খোয়ালাম…।

দুই সহকারীর দিকে তাকাল কিশোর। তারপর জোর করে ধরে তুলল ব্রাউনকে। কিছুতেই যাবে না লোকটা। শেষে অনেকটা হাল ছেড়ে দেয়ার ভান করে ঘুরে দাঁড়াল তিনজনে। পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল।

একবার দ্বিধা করে পিছু নিল ব্রাউন। অভিযোগের পর অভিযোগ করে চলল। সমস্ত দুনিয়ার ওপর তার ঘৃণা জন্মেছে। তবে থামল না আর। বন পেরিয়ে এসে দাঁড়াল মুসার ভটভটানি জেলপি গাড়িটার কাছে।

ট্রাংক থেকে উলের একটা শাল বের করল মুসা। ব্রাউনের দিকে বাড়িয়ে দিল। ভেজা শরীর জড়িয়ে নিতে ইশারা করল লোকটাকে।

মুসা যখন ইঞ্জিন স্টার্ট দিল; শাল জড়ানো, এমনকি পেছনের সীটে রবিনের পাশে উঠে বসার কাজটাও সমাপ্ত হয়েছে লোকটার, ফোঁপাতে আরম্ভ করল। যেন কত কষ্ট।

প্লীজ, মিস্টার ব্রাউন, মুসা বলল, এত ভেঙে পড়ার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। কোথায় থাকেন, বলবেন?

নাইনটি ফোর লেকভিউ এভিন্য! হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছল বেচারা ব্রাউন। আমার জীবন যদি রক্ষাই করলে, আরেকটু উপকার করো, দয়া করে একটা টিস্যু পেপার দাও।

একটা টিস্যু পেপার বের করে দিল কিশোর।

গাড়ি চালিয়ে রকি বীচের একটা পুরানো অঞ্চলে ঢুকল মুসা। শহরতলি দিয়ে চলেছে। সারা দুনিয়ার প্রতি এক নাগাড়ে অনর্গল অভিযোগ করে চলেছে ব্রাউন।

মিস্টার ব্রাউন! আর সইতে না পেরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল মুসা, দয়া করে একটু থামবেন? গাড়ি চালাতে পারছি না…

মাছ ধরার সরঞ্জামের একটা দোকানের পরেই তীক্ষ্ণ মোড়। উইন্ডশীল্ডের ওপাশে চোখ পড়তেই মুখ থেকে রক্ত সরে গেল ব্রাউনের।

সাবধান! চিৎকার করে উঠল কিশোর।

ভুল সাইড দিয়ে ধেয়ে আসছে আরেকটা লাল স্পোর্টস কার। নাক বরাবর ছুটে আসছে যেন ওদেরকে তো মারার জন্যেই!

.

০২.

শাই করে ডানে স্টিয়ারিং কাটল মুসা। নাকের একপাশ দিয়ে একটা গার্ড রেইলে গুঁতো মারল গাড়িটা। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেলো। টায়ারের কর্কশ আর্তনাদ তুলে পাশ দিয়ে প্রায় গা ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল লাল ল্যামবোরগিনি গাড়িটা।

বিচ্ছিরি একটা ধাতব আওয়াজ ভরে দিল যেন বাতাসকে। পথের পাশে গাড়ি থামিয়ে দিল মুসা। ফিরে তাকিয়ে দেখল একটা টেলিফোন পোস্টে ধাক্কা লাগিয়েছে লাল গাড়িটা।

ঠিক আছে তো? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

আছি। উফ, বড় বাঁচা বেঁচেছি! মুসা বলে উঠল।

দরজা খুলে লাফিয়ে নেমে লাল গাড়িটার দিকে দৌড় দিল তিন গোয়েন্দা। ক্ষতি তেমন হয়নি, শুধু সামনের দিকে খানিকটা জায়গার ছাল উঠে গেছে।

আমিও ভাল আছি, বুঝলে! জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে চেঁচিয়ে বলল পেছনের সীটে বসা ব্রাউন। কিছুই জিজ্ঞেস করলে না আমাকে। আমার জীবনের কি কোন দাম নেই?

কানেও তুলল না তিন গোয়েন্দা। ওরা গাড়ির কাছে পৌঁছে গেছে, এই সময় ঝটকা দিয়ে খুলে গেল বাঁ পাশের দরজা। শোনা গেল তীক্ষ্ণ মেয়েলী চিৎকার, এই, দেখেশুনে গাড়ি চালাতে পারো না?

গাড়ি থেকে নেমে এল এক তরুণী। বয়েসে ওদের একআধ বছরের বড় হতে পারে। লাল চুল। গলার তিনটে সোনার হারকে ঠিক করল। হাত দিয়ে ডলে সমান করে দিল আঁটো জাম্পসুটের ভাঁজ। নাকে সানগ্লাস বসানোর আগে একবার বিষদৃষ্টি হানল কিশোর, রবিন আর মুসার ওপর। তারপর গটমট করে এগিয়ে এল। মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগল কিশোরের।

দেখো, আমার গাড়ির কি করেছ! ধমক দিয়ে বলল মেয়েটা। একেবারে শেষ!

না, খুব একটা ক্ষতি হয়নি, মুসা বলল। তবে দোষটা তো আপনার…

তোমার দোষ!

দোষ যারই হোক, মেয়েটাকে শান্ত করার চেষ্টা চালাল কিশোর, এখন আর বলে লাভ নেই। আর গাড়ির যা ক্ষতি হয়েছে, তার জন্যেও চিন্তা নাই। বীমা কোম্পানিই যা করার করে দেবে। আসল জিজ্ঞাসাটা হলো, আপনি জখম-টখম হয়েছেন কিনা। ভাল আছেন?

দাঁত খিঁচিয়ে বলল মেয়েটা, তোমাদের চাঁদমুখ দেখার আগে তো ছিলামই! কি যে বিপদে ফেলে দিলে! এখন গ্যারেজে খবর দিতে হবে। ট্যাক্সি নিয়ে যেতে হবে আমাকে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। ভাল ঝামেলা বাধিয়েছ।!

আবার ড্রাইভিং সীটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। ভেতর থেকে বের করল একটা মোবাইল টেলিফোন। কিশোর মনে করার চেষ্টা করছে, মেয়েটাকে কোথায় দেখেছে।

হাল্লো, মারলিন? ফোনে বলল মেয়েটা হাল্লো, আরে জোরে বলো না! হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি….ডায়না, ডায়না!…কী? হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে টেলিফোনটা প্রায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। যাই কি করে এখন? হাঁটব!

দৌড়ে যাও! মুখে এসে গিয়েছিল কথাটা মুসার। কিন্তু বলল না। তার বদলে বলল, আমার গাড়িতে করে যাবেন?

তুমি চালাবে? তিক্তকণ্ঠে বলল মেয়েটা।

হ্যাঁ।

 যেতে পারি, যদি ও চালায়, বুড়ো আঙুল দিয়ে কিশোরকে দেখাল ডায়না। কারণ আমার মনে হচ্ছে ও ভাল চালাবে। তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না আমি। আবার গুঁতো লাগাবে কারও গাড়ির সঙ্গে।

কিশোরের দিকে একটা অদ্ভুত চাহনি দিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল মুসা। ফিরে চলল গাড়ির কাছে।

মুচকি হাসল রবিন।

মেয়েটার ব্যাপারে কৌতূহল বাড়ছে কিশোরের। কোথাও দেখেছে। ডাকল, আসুন।

ঝাঁকুনি দিয়ে মুখের ওপরে এসে পড়া সিল্কের মত নরম লাল চুলগুলো সরিয়ে দিল ডায়না। এগোল মুসার গাড়ির দিকে।

আপনাকে চিনে ফেলেছি আমি, বলে উঠল কিশোর। আপনি ডায়না মরগান। পত্রিকায় পড়েছি…

…পারসোনালিটি ম্যাগাজিনে, কিশোরের বাক্যটা শেষ করে দিল ডায়না। হ্যাঁ, আমিই সেই মেয়ে। উদ্ভট আর্টিকেল, তাই না? হেডিংটা কি দিয়েছে। পড়লেই গা জ্বলে! ওটা একটা লেখা হয়েছে। গরু ছাগল কতগুলোকে নিয়ে ভরেছে পত্রিকা অফিসে। আহারে, আমার জন্যে কি দুঃখ ওদের, আমার বাবা মায়ের অকাল মৃত্যুতে কেঁদেকেটে অস্থির। মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশি। যত্তোসব!

 কাছেই একটা ফোন বুঁদ দেখে এগিয়ে গেল ডায়না। ফোন সেরে ফিরে এসে উঠল গাড়িতে, সামনের প্যাসেঞ্জার সীটে। এমন ভঙ্গি করল, যেন মিউনিসিপ্যালিটির ময়লার গাড়িতে উঠেছে। নাক কুঁচকে নির্দেশ দিল কিশোরকে, রকি বীচ মিউজিয়ামে যাও। জলদি।

পেছনের সীটে তখন একেবারে গুটিয়ে গেছে ব্রাউন। মুসার দেয়া শাল দিয়ে ঢেকে ফেলেছে আপাদমস্তক। মুখও দেখা যায় না।

সানগ্লাসের ভেতর দিয়ে তার দিকে তাকাল ডায়না। ব্যাপার কি? রোগী নাকি! এই, কি রোগ? এইডস

ব্রাউনের প্রতিক্রিয়া খুব একটা হলো না, সামান্য নড়েচড়ে বসল শুধু শালের তলায়। তার পাশে গাদাগাদি করে বসল মুসা ও রবিন।

না, রোগী না, জবাবটা দিল কিশোর। খুব দুর্বল। তা মিউজিয়ামে কেন? মরগানদের কালেকশন চেক করা হচ্ছে?

মুখ দিয়ে বিচিত্র একটা শব্দ করল ডায়না। চেক-ফেক না। যেখানকার জিনিস সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তাই নাকি? আগ্রহ দেখাল কিশোর। পারসোনালিটি তো বলছে, মিউজিয়ামের অর্ধেক জিনিসই নাকি আপনাদের। নিয়ে গেলে খালি হয়ে যাবে তো।

তা যাবে। পত্রিকা ভুল তথ্য দিয়েছে। অর্ধেক নয়, ষাট ভাগই আমাদের। এখন ওগুলো সব আমার সম্পত্তি। মিউজিয়ামে ফেলে রাখার পক্ষপাতি নই আমি। বাড়ি সাজাব। নিজের বাড়ির দেয়ালে ঝোলাব পেইন্টিংগুলো। ওদেরকে দিয়ে রাখব কেন শুধু শুধু?

অর্ধেকের বেশি জিনিস মিউজিয়াম থেকে চলে যাচ্ছে দেখে কিউরেটরের মুখটা কেমন হবে, আন্দাজ করতে চাইল কিশোর।

নিজের চোখেই দেখতে পেল খানিক পরে। মিউজিয়ামের কাছে চলে এসেছে গাড়ি। দেখা গেল, বাড়িটার পাশে একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ওটার পেছনে জড়ো হয়েছে পাঁচজন লোক। চারজনের পরনে ধূসর রঙের ইউনিফর্ম। বড় একটা বাক্স ট্রাকে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। পঞ্চমজনের গাট্টাগোট্টা শরীর, নীল সুট পরেছে, চোখে সরু তারের চশমা। চারজনে ধরাধরি করে বাক্সটা ট্রাকের পেছনে নিয়ে গেছে। চেঁচিয়ে চলেছে নীল সুট। বার বার হাত নেড়ে কি বোঝাতে চাইছে, রাগে লাল হয়ে উঠেছে চোখমুখ। পাতলা হয়ে আসা সোনালি চুলের কয়েকটা গোছা এসে লেপটে রয়েছে ঘামে ভেজা কপালের ওপর। লোকগুলোকে কাজ থেকে, অর্থাৎ ট্রাকে বাক্স ভোলা থেকে বিরত রাখতে চাইছে।

এটাই বোধহয় শেষ বাক্স, আনমনে বিড়বিড় করল ডায়না। হুকুমের সুরে কিশোরকে বলল, আহ, তাড়াতাড়ি চালাও না। মোটোর সঙ্গে কথা বলা দরকার।

ধনুকের মত বাঁকা ড্রাইভওয়ে ধরে বাড়িটার পাশে এনে গাড়ি রাখল কিশোর। একটানে দরজা খুলে লাফিয়ে নামল ডায়না। কি হলো জুভেনার, ওদের ধমকাচ্ছেন কেন?

রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল লোকটা। সরে যাওয়া চশমাটা আবার ঠেলে দিল নাকের ওপর। সি মরগান, আপনার নিশ্চয় মনে আছে এই জিনিসগুলো মিউজিয়ামকে দান করে দেয়া হয়েছে। তিরিশ বছর আগে দলিল সই করে দিয়েছেন আপনার দাদা। কিউরেটর হয়ে কি করে আমি এগুলো নিয়ে যেতে দিই

অসহিষ্ণুতা চলে গেছে ডায়নার। শান্তকণ্ঠে বলল, জুভেনার, আপনিই বলেছেন, ওই দলিলটা পাওয়া যাচ্ছে না। ছিল যে তার ঠিক কি?

ছিল, নিশ্চয় ছিল! খুঁজে বের করার জন্যে সময় তো দেবেন? গত বছর আগুন লেগেছিল, জানেন। তখন সমস্ত পুরানো ফাইল সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।

ওসব কথা অনেক শুনেছি, বাধা দিয়ে বলল ডায়না। আমার বাবার উইলের কপি আপনি দেখেছেন। জিনিসগুলো এখন আমার সম্পত্তি। এবং আমি ওগুলো ফেরত চাই। অনেক দিন তো রাখলেন, আর কত? নতুন করে সাজিয়ে নিন আবার।

নতুন করে! মাই ডিয়ার লেডি, এটা মিউজিয়াম, বেডরূম নয় যে বললেই সাজানো হয়ে যাবে। এত দামী দামী ছবি, শিল্পকর্ম, চাইলেই কি পাওয়া যায়? আর ওসব জিনিস ছাড়া মিউজিয়াম বাতিল।

মোলায়েম হেসে পরিবেশ হালকা করে ফেলতে চাইল ডায়না। কিশোর যতটা মাথামোটা ভেবেছিল মেয়েটাকে, এখন দেখল ততটা নয়। বরং বয়েসের তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমতী।

আহহা, এত মন খারাপ করছেন কেন? ডায়না বলল। অন্য ভাবেও তো ভেবে দেখতে পারেন। তিরিশটা বছর অন্যের জিনিস দিয়ে মিউজিয়ামের মান বাড়িয়েছেন, নাম কামিয়েছেন, এটা কি কম পাওয়া হলো?

ওগুলো রাখতে পারলেই শুধু খুশি হব আমি। আপনি অত্যন্ত অন্যায় কাজ করছেন। আপনার বাবাও মেনে নিতেন না এটা।

লোকটাকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করল চারজনের একজন। আহহা, মিস্টার জুভেনার, কি শুরু করলেন? সরুন না! ভীষণ ভারী এটা। সরুন, জায়গা দিন। ম্যাডাম যা বলছেন, শুনুন।

না, নিতে হলে আমার লাশের ওপর দিয়ে নেবে। ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে সরিয়ে দিতে গেল জুভেনার।

আরেকজনের পায়ে পা বেধে গিয়ে উল্টে পড়ে গেল লোকটা। গেল রেগে। গাল দিয়ে লাফিয়ে উঠে ঘুসি মেরে বসল জুভেনারের চোয়ালে।

পড়ে গেল জুভেনার।

কিউরেটরকে পড়ে যেতে দেখে ছুটে এল মিউজিয়ামের তিনজন কর্মচারী। এসেই যে লোকটা জুভেনারকে মেরেছে তার পেটে ঘুসি মারল একজন। আরেক ঘুসি মেরে ফেলে দিল একটা বাক্সের ওপর।

চোয়াল ডলতে ডলতে চিৎকার করে উঠল কিউরেটর, এই কি করছ নিক, ওটা রডিনের স্ট্যাচু! ভাঙবে তো!

তার চিৎকার কানেই তুলল না কেউ। পাইকারী মারামারি শুরু হয়ে গেছে। মিস ডায়না মরগানের শ্রমিক বনাম মিউজিয়ামের কর্মচারী। টেনে-হিঁচড়ে বাক্স সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল জুভেনার।

এত দ্রুত ঘটে গেল ঘটনা, কিছুক্ষণের জন্যে যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেল কিশোর। তারপর সংবিৎ ফিরল। দেখি, থামাই! রবিন, জলদি পুলিসকে ফোন করো! মুসা, এসো আমার সঙ্গে! বলেই দৌড় দিল সে।

একজন শ্রমিকের ওপর থেকে নিককে টেনে সরিয়ে আনল মুসা। ঘুরতেই দেখল, ঘুসি পাকিয়ে তারই দিকে ছুটে আসছে আরেকজন শ্রমিক। ঝট করে মাথা নিচু করে ফেলল সে। ঘুসিটা চলে গেল তার কাঁধের ওপর দিয়ে। সোজা হয়েই জুজিৎসুর প্যাঁচ মেরে মাটিতে ফেলে দিল লোকটাকে।

আরে থামুন, থামুন আপনারা! শুরু করলেন কি! চেঁচিয়ে বলল কিশোর।

কিন্তু কে শোনে কার কথা। পেছন থেকে এসে তাকে জাপটে ধরল মিউজিয়ামের এক কর্মচারী। মাটিতে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল। পারল না। কারাতের প্যাঁচে কুপোকাৎ হলো। চোখ বড় বড় হয়ে গেছে ডায়নার, এ রকম কিছু ঘটবে আশা করেনি। ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে মুসার গাড়িটার দিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সাইরেনের শব্দ যেন মধু বর্ষণ করল কিশোরের কানে। পুলিসের সাইরেন। ড্রাইভওয়ের দিকে ফিরে তাকাল সে। দুটো গাড়ি চোখে পড়ল। পুলিসের। আগেরটাতে ড্রাইভারের পাশে অফিসার পল নিউম্যানকে বসে থাকতে দেখল।

ব্যস, ব্যস, অনেক হয়েছে! বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল টঙটঙে যান্ত্রিক কণ্ঠ, পেট্রোল কারের মেগাফোনে কথা বলছে পল। পুলিসের নির্দেশ উপেক্ষা করার সাহস হলো না কারও। লড়াই থামিয়ে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেল, যেন গোবেচারা, কিছু করেনি।

গাড়ি থেকে নেমে এল পল আর তার সহকারী। আরেক দিক থেকে এল রবিন, ফোন করতে গিয়েছিল রাস্তার মোড়ের একটা ফোন বুদে। ভ্যান থেকে নেমে লাফাতে লাফাতে ছুটে এল মু।

মিস্টার জুভেনার, জিজ্ঞেস করল পল, কি হয়েছে? মালগুলো কার, মরগানদের না?

হ্যাঁ, জবাব দিল কিউরেটর। জোর করে নিয়ে যেতে এসেছে এই লোকগুলো।

নাকি আপনি জোর করে রেখে দিতে চাইছেন? মিস মরগানের সঙ্গে আগেই কথা হয়েছে আমার। দলিল যতক্ষণ দেখাতে না পারছেন, জিনিসগুলো রাখতে পারছেন না আপনি। বাধা দেয়ার কোন অধিকার নেই।

কিন্তু…কিন্তু…

যা বলার আদালতে গিয়ে বলবেন। আমাকে বলে লাভ হবে না।

পলের সঙ্গে তর্ক করছে কিউরেটর, রবিন চলে এল কিশোরের পাশে। জোর একটা লড়াই যে হয়ে গেছে, লোকগুলোর নাকমুখের অবস্থা দেখেই আন্দাজ করতে পারল। শিস দিয়ে উঠল আপনমনে। মাথার চুলে হাত বোলাল। মনে হয় মিসই করলাম! কেমন চলল?

দারুণ, জবাব দিল মুসা। মুখে মৃদু হাসি। ছড়ে যাওয়া কনুই ডলছে। তুমি ছিলে না বলে আমারও দুঃখ হচ্ছিল। কারাত আর জুজিৎসুর কি প্যাঁচগুলোই না কষলাম। দেখলে একেবারে মুগ্ধ হয়ে যেতে…

কথা শেষ হলো না তার। তীক্ষ্ণ একটা চিৎকার শোনা গেল। ঝট করে ফিরে তাকাল সবাই ড্রাইভওয়ের শেষ মাথার দিকে।

মুসার গাড়ির গায়ে যেন সেঁটে রয়েছে ডায়না। পেছন থেকে তার গলা চেপে ধরেছে একজোড়া হাত।

দৌড় দিল দুই ভাই। পেছনে রবিন। চেঁচিয়ে উঠল, আরে ব্রাউন তো মেরে ফেলল মেয়েটাকে!

.

০৩.

ডায়নাকে সাহায্য করছে কিশোর, ইতিমধ্যে ব্রাউনের কলার ধরে টেনে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে এল মুসা।

ডায়না, লেগেছে কোথাও? উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

না, না, আ-আমি ঠিক আছি! ফুঁপিয়ে উঠল একবার ডায়না। হাত চলে গেছে গলায়, যেখানটায় চাপ লেগেছে। শুধু মাথাটা কেমন যেন করছে!

অনেক সহ্য করেছি আমি, ডায়না মরগান, চিৎকার করে বলল ব্রাউন, নাটকের সংলাপ বলছে যেন, আর নয়। তোমাকে ছাড়ব আমি ভেবেছ! সর্বনাশ করে দেব। খুন করব! দুই হাত বাড়িয়ে এগোল সে।

ভয় পেয়ে গেল ডায়না। পিছিয়ে এল এক পা। লাফ দিয়ে তার আর ব্রাউনের মাঝে চলে এল কিশোর। বাধা হয়ে দাঁড়াল মাঝখানে। পল আর তার সহকারীও পৌঁছে গেল ওখানে। ব্রাউনকে টেনে সরিয়ে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দিল তার হাতে। কিশোরের দুপাশে এসে দাঁড়াল মুসা আর রবিন।

আমাকে ছাড়ুন অফিসার, আমার কোন দোষ নেই, সংলাপ চালিয়ে গেল অভিনেতা। ও আমাকে বাধ্য করেছে এসব করতে। স্বপ্নেও যা ভাবতে পারিনি, তা-ই করিয়ে ছেড়েছে আমাকে দিয়ে।

ব্রাউনের মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে পল। চকচক করে উঠল চোখ। ও, আপনিই সেই লোক, না? হরর হাই স্কুল স্ত্রী নাটকটার বারোটা বাজিয়েছেন?

আমার কোন দোষ ছিল না, মাটির দিকে তাকিয়ে বলল ব্রাউন। পার্টটাই ছিল এরকম, বাজে।

ডায়নার দিকে নজর দিল কিশোর। সত্যি ঠিক আছেন তো আপনি?

হ্যাঁ, ভালই আছি, গলায় জোর নেই। কিশোরের চোখে চোখে তাকাল, দৃষ্টিতে স্বস্তি দেখা গেল এতক্ষণে। থ্যাংকস।

হাত ডলছে মুসা। দাঁতের দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। কামড়ে দিয়েছে ব্রাউন। জলাতঙ্কই না হয়ে যায় শেষে-ভাবল সে। পাগলই মনে হচ্ছে লোকটাকে! পাগলা কুকুরে কামড়ায়নি তো!

ধন্যবাদটা কিন্তু আমাকে দেয়া উচিত ছিল, হালকা গলায় বলল মুসা। আপনাকে ছাড়িয়ে আনার সময় কামড়টা ব্রাউন আমাকে দিয়েছে, কিশোরকে দেখাল সে। ওকে নয়।

শূন্য দৃষ্টিতে মুসার দিকে একটা মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল ডায়না। তারপর কিশোরকে বলল, লোকটা সাংঘাতিক! বদ্ধ পাগল…

এই, আমি সব শুনছি কিন্তু! গর্জে উঠল ব্রাউন। মাত্র তো কয়েকটা বছর। এর মধ্যেই আমার সম্পর্কে ধারণা পাল্টে গেল?

আপনি শান্ত হোন, মিস্টার ব্রাউন, বলে ডায়নার দিকে ফিরল কিশোর। একে চেনেন নাকি?

শীতল দৃষ্টিতে ব্রাউনের দিকে তাকাল ডায়না। চিনি না মানে। ওর নাম ব্রাউন না, এনুডা, বার্ব এনুডা। আব্বার কাছে চাকরি করত…

ওই পাপ মুখে ওঁদের নাম আর নিও না, চেঁচিয়ে উঠল এনুডা। সাহেব আর মেমসাহেব কত ভাল ছিলেন। তাদের ঘরে যে তোমার মত একটা খাণ্ডারনী কি করে জন্মাল বুঝতে পারি না! বিশটা বছর ওদের গাড়ি চালিয়েছি, অথচ একটা দিনের জন্যেও অসুখী হইনি। কত ভালবাসতেন আমাকে, যেন একেবারে আপন ভাই। প্রাসাদ ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে দিতেন না। আরে মেয়ে, এত যে বড় বড় কথা বলল, তোমাকেও কি কম আদর করেছি নাকি আমি? কোলেপিঠে করে মানুষ করিনি? তোমাদের জন্যে আমার থিয়েটারের ক্যারিয়ার নষ্ট করলাম। কড়া চোখে তাকাল ডায়নার দিকে। বিনিময়ে কি পেয়েছি? একটা আজীবন ভাতার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন তোমার বাবা, সেটাও তুমি বন্ধ করে দিয়েছ। তুমি কি মানুষ?

যারা কাজ করে না তাদেরকে বেতন দিই না আমি, ডায়না বলল। আপনারাই বলুন, বসে বসে কারও টাকা নেয়া কি উচিত? কিছু করে না। দিন রাত চব্বিশটা ঘন্টা টিভির সামনে বসে থাকে, আর পুরানো ছবির ডায়লগ নকল করে।

বেশ, আমি নাহয় কাজ করি না, কিন্তু বাড়িতে অন্য যে সব কাজের লোক ছিল? তাদেরকে তাড়িয়েছ কেন? সবাই কি অকাজের? তাড়াবেই তো। সবাই বাপের আমলের লোক যে। তোমার পাটিতে যাওয়া, আড্ডা মারা, অকাজ-কুকাজ সইতে না পেরে কিছু বলতে আসে যদি…

হয়েছে, হয়েছে, থামুন, হাত তুলল পল। মিস, ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান?

হঠাৎ ভয় দেখা দিল এনুর চেহারায়। দোহাই তোমার ডায়না, এই কাজটা অন্তত কোরো না! আমাকে রেহাই দাও। তুমি জানো, আমি লোক খারাপ নই। মাঝে মাঝে মাখাটা বিগড়ে যায়, তখন কি যে করে বসি!…সময় খুব খারাপ যাচ্ছে

মাথা নাড়ল ডায়না। না, অফিসার, ওসব নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাই না। আমি আশা করব, এরপর থেকে ভাল হয়ে যাবে এনুডা। আমার ব্যাপারে আর নাক গলাতে আসবে না।

অবাক হলো পল। বেশ, আপনি যখন বলছেন… হাতকড়া খুলে দিল এনুডার।

থ্যাংক ইউ, মৃদু স্বরে বলল এনুডা। ঝাড়া দিয়ে কাপড়ের ময়লা পরিষ্কার করল, যদিও লাভ হলো না খুব একটা, ভালমতই লেগে গেছে। চিবুক সোজা করে, কারও দিকে না তাকিয়ে হেঁটে চলে গেল।

ওকে ছাড়াটা বোধহয় ঠিক হলো না, কিশোর বলল। মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল।

মাথা ঝাঁকাল ডায়না। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মাঝে মাঝেই করে ওরকম। দেখে নেয়, কাছাকাছি লোক আছে কিনা। থাকলে করে, যাতে সময়মত ওকে থামাতে পারে ওরা। অভিনয় করতে পারেনি বলেই বোধহয় ওর এই ক্ষোভ। মাথায় ছিট আছে, তবে কারও কোন ক্ষতি করে না।

এনুডা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলে পল বলল, লোকটাকে একটুও ভাল লাগল না আমার। হশিয়ার থাকবেন। কিছু করলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন আমাদেরকে। কিশোর, মিস মরগানকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারবে? মুসার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল একবার, হাসল, তারপর সহকারীকে নিয়ে এগিয়ে গেল নিজেদের গাড়ির দিকে।

উষ্ণ, উজ্জ্বল একটা হাসি উপহার দিল কিশোরকে ডায়না। যে ভাবে সামলেছ না পাগলটাকে, খুব ভাল লেগেছে আমার। আর ওই মিউজিয়ামের শয়তানগুলোকে যে সামাল দিলে, সে তো অবিশ্বাস্য।

ও কিছু না, মুসার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি বোধ করছে কিশোর।

শোনো, কিশোরের হাত ধরে বলল ডায়না, আজ রাতে বাড়িতে একটা বিরাট পার্টি দিচ্ছি। তুমি এলে খুব খুশি হব।

অযথাই কাশল কিশোর। মুসা আর রবিনের দিকে তাকাল, চোখে অস্বস্তি। সেটা নজরে পড়ে গেল ডায়নার। তাড়াতাড়ি বলল, তোমার বন্ধুদের নিয়ে আসবে।

মুহূর্তে চোখের আগুন নিভে গেল মুসার। চওড়া হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুখে। হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এল, আমি মুসা আমান।

খুশি হলাম, ডায়না বলল। ও কে?

ওর নাম রবিন মিলফোর্ড, কিশোর বলল।

 পরিচয়ের পালা শেষ হলে ডায়নাকে বলল কিশোর, এখনও কি আমি গাড়ি চালাব? মুসা কিন্তু অনেক বেশি ভাল চালায়। তা ছাড়া গাড়িটাও ওর।

তা চালাক, নিমরাজি হলে, ডায়না। কিন্তু ও চালালে ভটভটানি কি কিছুটা কমবে?

হাসি চাপতে পারল না রবিন।

কিশোর বলল, কি জানি, কমতেও পারে। হাজার হোক, ওর গাড়ি যখন, ওর কথা শুনতেও পারে। কি বলো, মুসা?

মাথা নাড়ল মুসা, সরি। আমি চালালে আওয়াজ বরং আরও বাড়বে। কিশোর গাড়িটার কাছে পর মানুষ, ওর সঙ্গে তো রাগ-ঝাল দেখাতে পারে না। তবে আমার সঙ্গে হরহামেশাই দেখায়।

আঁতকে উঠল ডায়না। বলে কি! আরও বেশি শব্দ করবে! থাক বাবা, থাক। কিশোর, তুমিই চালাও।

হাসিমুখে গিয়ে পেছনের সীটে উঠে বসল মুসা। পাশে রবিন। ব্রাউন নেই। ঠাসাঠাসি হলো না আর। আরামেই বসতে পারল।

*

পার্টিটা নিশ্চয় দারুণ জমবে আজ! বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল মুসা।

পায়ের মোজা খুলে কার্পেটে ছুঁড়ে ফেলল কিশোর। কি জানি। তোমার মত এতটা ভাবতে পারছি না। তাক থেকে একটা পার্সোনালিটি ম্যাগাজিনের কপি নিয়ে এসে ছানায় বসল।

বলতে বিশ্বাস করবে না, বাথরূম থেকে বেরিয়ে এল মুসা। যা-ই বলল, অত বড় বাড়ি কমই দেখেছি। বনের মধ্যে এ রকম বাড়ি বানিয়ে বসে আছে কেউ, কল্পনাই করতে পারিনি!

হুমম! ছবি আছে এখানে। পত্রিকাটা নাড়ল কিশোর। সেজন্যেই বের করলাম। তা ছাড়া আরও একটা জিনিসের কথা মনে পড়ল।

কিশোরদের বাড়িতে কিশোরের বেডরূমে কথা বলছে ওরা।

কী? কৌতূহলী হয়ে ফিরে তাকাল রবিন।

মরগানদের আরেক সংহ-মারাত্মক বোরজিয়া ড্যাগার! পত্রিকাটা উল্টে দেখাল কিশোর। এই দেখো হেডলাইন। ওটাও ছিল মিউজিয়ামে। রত্ন বসানো একটা ছুরি। চারশো বছর আগে ওটার প্রথম মালিক ছিল সেই নিষ্ঠুর ইটালিয়ান পরিবার, বোরজিয়ারা, নাম শুনেছ নিশ্চয়। গোড়া ধার্মিক ছিল ওরা, সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসার ছিল, সবচেয়ে বড় কথা, ওরা ছিল ভয়াবহ খুনী। শোনা যায়, ওদের এই ড্যাগারটা নাকি অভিশপ্ত।

কি অভিশাপ।

কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে, যেন ভয়াবহতা বোঝানোর জন্যেই ফিসফিসিয়ে বলল মুসা, ছুরিটা ছোঁয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যাবে ছুরির মালিক।

*

অন্ধকারে ম্যানশনের দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে চলল তিন গোয়েন্দা।

প্রাসাদের ছাত থেকে উঠে গেছে চারটে মোচা আকৃতির মিনার, দুর্গের টাওয়ারের মত। বিশাল গাড়িবারান্দাকে ঘিরে রেখেছে আঙুরলতা আর ফুলের বেড়। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, ছড়ানো লন গিয়ে মিশেছে বনের সঙ্গে। আর কোন বাড়িঘর চোখে পড়ে না। রাতের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে জোরাল বাজনার শব্দ। দোতলার মস্ত চারটে জানালা দিয়ে উজ্জ্বল আলো এসে পড়েছে বাইরে, ভোরের রোদের মত।

ইয়ার্ডের পিকআপটা পার্ক করে রেখে ভেতরে ঢুকল তিনজনে। মুসার গাড়িটা আনার সাহস পায়নি। প্রচণ্ড শব্দে পাড়া জাগিয়ে দিতে চায়নি। বলা যায় না, পাটির লোকে খেপেও উঠতে পারে।

ঢুকেই যেন ধাক্কা খেলো মুসা, তার নীল সুট বেমানান লাগল তার নিজের কাছেই। দুই ধরনের মেহমান আছে পার্টিতে, পরনে দুই ধরনের পোশাক। একদলের পরনে অতিরিক্ত দামী টাক্সিডো আর ইভনিং গাউন, আরেক দলের পরনে সুট, তবে ওগুলোর দামও কম নয়। মুসারটা ওগুলোর কাছে কিছুই না। ফিটফাট পোশাক পরা, রগ বের হওয়া একজন লোক মেহমানদের মাঝে দাঁড়িয়ে হলদে প্যাডে কি যেন লিখছে।

খবরের কাগজের লোক হবে, ফিসফিস করে বলল মুসা। সোসাইটি কলামিস্ট।

আরি, কিশোর। এসে গেছ। এসো, এসো, জোর গুনকে ছাপিয়ে ভেসে এল ডায়নার কণ্ঠ। রবিন। মুসা। এসো তোমরা।

অকারণেই হাসছে একঝাক লোক, তাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে এল সে। চমৎকার পোশাক পরেছে ডায়না। ঘরের এই পরিবেশে পরী মনে হচ্ছে তাকে। কিশোরের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল কালচে বাদামী চুলওয়ালা এক তরুণের কাছে। ছয় ফুটের ওপরে লম্বা। সিনেমার পর্দা থেকে নেমে এসেছে যেন।

কিশোর…রবিন…মুসা, পরিচয় করিয়ে দিল ডায়না। আর এ হলো ডিন রুজভেল্ট।

হাল্লো, বলে হেসে হাত বাড়িয়ে দিল ডিন। ঝিক করে উঠল সাদা দাঁত। এত সাদা, চোখ ধাঁধিয়ে দিতে চায়।

তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ছোটখাট একজন মহিলা। সাদা চুল। বয়েস ষাটের কাছাকাছি। তিন গোয়েন্দাকে যখন পরিচয় করিয়ে দিল ডায়না, মহিলার ভারী লেন্সের চশমার পাশে ঝিলমিল করে উঠল যেন ধূসর-সবুজ চোখ।

আর ইনি হলেন, মহিলার পরিচয় দিল ডায়না, ডক্টর নরিয়েমা ডিলারয়, আমার সবচে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আপনজন। এই দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি চিনি আমি একে।

হাসার সময় কাঁধে ঝাঁকি লাগে ডক্টর ডিলারয়ের। ও আমার ব্যাপারে সব কিছুই খুব বাড়িয়ে বলে। ওয়েলকাম টু ক্লিফসাইড হাইটস। দিনের বেলা এসো একদিন। কি সুন্দর বাগান আছে ডায়নার, দেখবে।

আরেকটা পরিচয় আছে ইনার, ডায়না বলল। ইনি আমার খালা, নরিখালা। চাকরি থেকে অর্ধেক অবসর নিয়েছেন বলা যায়। ক্লিফসাইড কান্ট্রি ক্লাবে এখন পার্টটাইম কাজ করেন। বাকি সময় বাগানের যত্ন করেন। আমার বাগানেও, নিজের বাগানেও। ফুল গাছের পাগল।

সৌজন্য দেখিয়ে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। চারপাশে তাকাল। বিশাল এক পারলারে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা। দেয়ালে ঝোলানো অসংখ্য ছবি, সোনালি ফ্রেমে বাঁধাই, ঠাই নেই ঠাই নেই অবস্থা। এককোণে বুককেস আর সাইডবোর্ডের মাঝের ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে গ্রীক যোদ্ধার একটা মার্বেলে তৈরি বিশাল মূর্তি।

এই সময় দরজার ঘন্টা বাজল।

ডিন, রান্নাঘর থেকে আরও কয়েকটা কাপ নিয়ে এসো, প্লীজ, ডায়না বলল। তারপর এক্সকিউজ মি, বলে দরজা খুলতে এগোল।

কালেকশনগুলো দেখলে এসো, তিন গোয়েন্দাকে আমন্ত্রণ জানালেন নরিয়েমা। ডায়নাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, এগুলো এখানে রাখা ঠিক না, মিউজিয়ামেই ভাল। তবে এখানে যতক্ষণ আছে দেখতে অসুবিধে নেই। এসো।

ঘরের মাঝখান থেকে শুরু করে মার্বেলের মৃর্তিটার কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে একটা টেনিস কোর্টের সমান খাবার টেবিল। সেটার দিকে লোলুপ নয়নে একবার তাকিয়ে নরিয়েমার সঙ্গে পুরানো সাইডবোর্ডটার দিকে এগোল মুসা।

খোদাই করা কাঠের বেদির ওপর রাখা হয়েছে একটা কাঁচের বাক্স। ওটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে চামড়ার জ্যাকেট পরা দুজন তরুণ আর একজন তরুণী।

এক্সকিউজ মি, নেলি, মেয়েটাকে বললেন ডক্টর।

সরে দাঁড়াল তিনজনেই।

এগিয়ে গিয়ে আঙুল তুলে বাক্সের ভেতরটা দেখালেন তিনি। ভেতরে বেগুনী মখমলের গদির ওপর শুয়ে আছে চমৎকার একটা ছুরি। লম্বা ফলা, আর মূল্যবান পাথর বসানো সোনার বাট ঝকঝক করছে উজ্জ্বল আলোয়।

মরগান কালেকশনের সবচেয়ে বিখ্যাত জিনিস এটা, নরিয়েমা জানালেন। বোরজিয়া ড্যাগার। নিশ্চয় নাম শুনেছ।

ও, এটাই? সাংঘাতিক! বলে বাক্সের ডালা তুলে ছুরিটা বের করে আনল নেলি।

হঠাৎ গমগম করে উঠল আরেকটা কণ্ঠ, বলেছিলাম না, এই রকমই করবে। করছে কি দেখো না! খেলনা ভেবেছে এত দামী দুর্লভ জিনিসগুলোকে?

ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা। ছুটে আসছে জুভেনার, পেছনে ডায়না। নেলির হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে আগের জায়গায় রেখে দিল কিউরেটর।

বাধা দিয়ে তখন অন্যায় করেছি, মিস মরগান, জুভেনার বলল। ভাবলাম, যাই। গিয়ে মাপ চেয়ে, শান্ত ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি আপনাকে, যে এ সব জিনিস ঘরে রাখা ঠিক নয়। ইশারায় ছুরিটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, দাম কল্পনা করতে পারেন ওটার?

মিষ্টি হাসল ডায়না। নিশ্চয়ই। ছুরিটা বের করে হাতে নিল সে। ফলাটা ওপরের দিকে তুলে ধরে ওটা নিয়ে এগোল খাবার টেবিলের দিকে, মেহমানরা যেখানে রয়েছে। চোখের পলকে থেমে গেল গুঞ্জন। একেবারে চুপ সবাই, ফিসফিসানিটুকুও নেই।

স্তব্ধতা ভাঙতে ভয় লাগছে যেন, এমনি ভঙ্গিতে খুব নরম গলায় বলল এক তরুণ, ডায়না, অভিশাপের কথা ভুলে গেছ! ওটার মালিক…

ঝটকা দিয়ে পেছনে মাথা কাত করে ফেলল ডায়না, নেচে উঠল লাল চুল। হা-হা করে হাসল সে। জুভেনারের দিকে ফিরে ছুরিটা তার বুকে বসিয়ে দেয়ার ভান করে বলল, জুভেনার, খুব খিদে পেয়েছে মনে হয়? দেব খাইয়ে?

সাদা হয়ে গেল কিউরেটরের মুখ।

ছুরি দিয়ে এক টুকরো পনির কাটল ডায়না। সেটাকে ছুরির মাথায় গেঁথে বাড়িয়ে দিল জুভেনারের দিকে। মুখে ব্যঙ্গের হাসি।

আধ সেকেন্ড পর দপ করে নিবে গেল ঘরের সমস্ত বাতি। মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেল বাজনা। নিঃশ্বাস ফেলতে যেন ভুলে গেছে পার্টির সব লোক, যেন কোনদিনই আর ফেলতে পারবে না।

অন্ধকারে ধড়াস করে পড়ে গেল কি যেন!

তারপরেই শোনা গেল তীক্ষ্ণ চিৎকার!

ডায়নার!

.

০৪.

আবার আলো জ্বলল। দেখা গেল, মার্বেলের মূর্তিটা ভেঙে পড়ে আছে মাটিতে। সাইডবোর্ডের খানিকটা ভাঙা। মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে কাঁচের টুকরো।

সাইডবোর্ডের নিচে জবুথুবু হয়ে বসে আছে ডায়না। চেহারা সাদা। হাতে ধরে রেখেছে এখনও ছুরিটা।

তার পাশে গিয়ে বসল কিশোর, মুসা আর ডক্টর নরিয়েমা।

লেগেছে কোথাও? ডায়নাকে জিজ্ঞেস করল মুসা।

মূর্তির টুকরোগুলোর কাছে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে জুভেনার, গেল তো তেইশশো বছরের পুরানো… গলা ধরে এল তার। মূর্তির শোকে চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে।

ভয় পেয়ে গেছে ডায়না। কিশোরের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল। ফুঁপিয়ে উঠে হাত থেকে ছেড়ে দিল ছুরিটা। তারপর লাফিয়ে উঠে এসে আঁকড়ে ধরল কিশোরের হাত, আরেকটু হলেই মারা গেছিলাম আজ!

গুঞ্জন করে উঠল মেহমানরা।

গলায় সহানুভূতি ঢেলে কিশোর বলল, কিছুই হয়নি আপনার। আসুন। বসুন এখানে।

 একটা সোফায় প্রায় জোর করে ডায়নাকে বসিয়ে দিল সে। তারপর চারপাশে তাকাতে লাগল। অস্বস্তি বোধ করছে।

এই যে, কি হয়েছে? ওপর থেকে জিজ্ঞেস করল একটা কণ্ঠ।

চোখ তুলে কিশোর দেখল, ডিন কথা বলছে। দাঁত বের করা সেই ঝকঝকে হাসিটা উধাও, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখেছে।

অ্যাক্সিডেন্ট, কিশোর জবাব দিল।

কিছুই বুঝতে পারছি না, ডিন, ডায়না বলল। আলো নিবে গেল। কে যেন ফেলে দিল রোমান মৃর্তিটা…

রোমান না, গ্রীক! শুধরে দিল জুভেনার। মূর্তি ভাঙার কষ্ট সইতে না পেরে দুহাতে মাথা চেপে ধরে মেঝেতেই বসে পড়েছে।

ছুরিটা তুলে নিয়ে গিয়ে আবার কাঁচের বাক্সে ভরে রাখল রবিন।

একটা তোয়ালে ভিজিয়ে নিয়ে এলেন নরিয়েমা। ডায়নার পাশে বসে তার কপালে চেপে ধরলেন। তাদেরকে ঘিরে দাঁড়াল মেহমানেরা।

ডায়নার হাত ধরে স্নেহের হাসি হেসে কোমল গলায় ডক্টর বললেন, দেখো, ভয়ের কিছু নেই। কুসংস্কার বিশ্বাস করা উচিত না। ওসব অভিশাপ-টভিশাপ সব ফালতু। মেহমানদের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন আবার। কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করে বসে আছে দেখছি।

ঢোক গিলল ডায়না। ভুরুর ওপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। অভিশাপের কথা জানো তুমি, নরিখালা?

ওসব চিন্তার দরকার নেই এখন।

প্লীজ, খালা, আমি ভয় পাব না। তুমি বলো।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নরিয়েমা। বেশ, শুনতেই যখন চাও… সোফায় হেলান দিলেন তিনি। চুপচাপ ভাবছেন যেন কোথা থেকে শুরু করবেন। আরও কাছে ঘেঁষে এল মেহমানেরা।

কুসংস্কার বিশ্বাস করলে এই গল্প শুনে ভয়ই পাবে মানুষ, বলতে শুরু করলেন ডক্টর। ষোলোশো শতকে ইটালির অত্যন্ত ধনী আর ক্ষমতাশালী পরিবার ছিল রেজিয়ারা। তাদের কয়েকজন তো ছিল ভয়াবহ, প্রায় উন্মাদ। আস্তে মাথা নাড়লেন তিনি। ইতিহাস অবশ্য স্বীকার করে না সে কথা। তবে লোকের মুখ তো আর বন্ধ থাকে না। গুজব ছড়ায়ও বেশি এবং রঙ ছড়িয়ে। কিংবদন্তী আছে, বোরজিয়াদের যে লোকটার নাম শুনলেই কেঁপে উঠত লোকে, তার নাম অবমান্ডো বোরজিয়া। ডিউকের ভাইপো ছিল বেসমেন্টে চমৎকার একটা কালেকশন ছিল তার, স্টাফ করা মানবদেহের কালেকশন।

মুসা লক্ষ করল, কেঁপে উঠছে ডায়না।

ডায়নার কাঁধে হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দিন ডক্টর, অমন করছ কেন? এটা নিছকই গল্প, একটা হরর স্টোরি আরকি, আর কিছু নয়া। ঠিক আছে, ভয়ই যখন পাচ্ছ, আর বলব না!

না না, বলো! আমি ভয় পাব না

ডানার চেহারার ভয় ভয় ভান চোখ এড়াল না মুসার বুঝতে পারল, গল্পটা চলতে থাকলে আতঙ্কিত হয়ে পড়বে মেয়েটা।

ব্যাপারটা নিয়েও লক্ষ করলেন। বললেন, অনেক সময় ভয়ের গল্প পুরোটা এনে ফেললে ভয় কেটে যায়। বলেই ফেলি।

হ্যাঁ, বলো তুমি, ডায়না বলল। আমি ভয় পাব না।

আবার গল্প বলতে লাগলেন ডক্টর, বলা হয়, আরমান্ডো বোরজিয়া ছিল ইটালির সবচেয়ে নিষ্ঠুর জমিদার। এমন ভাবে করের বোঝা চাপিয়ে দিত গরীব প্রজাদের ওপর, সেটা শোধ করতেই হিমশিম খেয়ে যেত তারা। কোনদিনই পুরোপুরি শোধ করতে পারত না। বিয়ে করেছিল অনেকগুলো। যতক্ষণ ভাল লাগত, রাখত। অপছন্দ হলেই ঘাড় ধরে বের করে দিত রাস্তায়। এমনকি তখনকার বিখ্যাত সুন্দরী ম্যারিজল অ্যাগ্রোর বরাতেও এইই জুটেছিল…

ছুরিটার কথা বলো, খালা। এ সব শুনতে ভাল লাগে না।

হ্যাঁ, বলছি। নিজের প্রাসাদ আর বাগানের বাইরে খুব কমই বেরোত আরমাভো। একদিন বেরিয়ে ভীষণ চমকে গেল। রাস্তায় শুধু ভিখিরি আর ভিখিরি। এক সময় ভালই ছিল লোকগুলো, জমিজমা ছিল, ওদেরকে পথে নামতে বাধ্য করেছে আরমান্ডোই, এ কথা জানা ছিল না তার। জানার চেষ্টাও অবশ্য করল না। তার কাছে মনে হলো ওগুলো শুধুই জঞ্জাল, মানব-জঞ্জাল।

মেরে ফেলল? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল ডায়না।

সব কজনকে, এক এক করে। ওদেরকে প্রাসাদে দাওয়াত দিল সে। গোসল করতে দিল, পেট ভরে খাওয়াল। কৃতজ্ঞতায়, আনন্দে চোখে পানি এসে গেল ওদের। তারপর ওদেরকে মদের ভাড়ার দেখার দাওয়াত দিল আরমান্ডো। দেখতে নামল ওরা, কিন্তু একজনও উঠতে পারল না আর। শোনা যায়, প্রত্যেকটা মানুষকে আরমান্ডো খুন করেছে একটা রত্নখচিত ছোরা দিয়ে। হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়েছে ছুরি। লাশগুলো ফেলে রেখেছে মাটির নিচের ঘরে। সাতদিন পর একটামাত্র কবরে দাফন করা হয়েছিল ওগুলো।

চোখের কোণ দিয়ে কিশোর দেখল, ঝড়ের গতিতে হলুদ প্যাডে লিখে যাচ্ছে। সোসাইটি কলামিস্ট।

বাইরের কেউ কিছু জানল না, বলে গেলেন ডক্টর নরিয়েমা। তবে সবাই একদিন দেখল, রাস্তা ভিখিরি মুক্ত হয়ে গেছে। একজনও নেই।

হঠাৎ খাদে নেমে গেল ডক্টরের কণ্ঠ। শ্রোতারা ভালমত শোনার জন্যে আরও কাছে সরে এল।

একরাতে তন্দ্রা লেগেছে আরমান্ডোর। তার দরজা খুলে গেল। সে ভাবল, চাকর। ঘুমের ঘোরেই গাল দিয়ে পাশ ফিরল সে। কিন্তু চাকর নয়। মাটির নিচের ঘরে নিয়ে যাওয়া এক ভিখিরি। ছুরিটা তার হৃৎপিণ্ডে লাগেনি, ফলে মরেনি সে। একে জখম, তার ওপর না খেয়ে খেয়ে কাহিল হয়ে পড়েছে। তবু শরীরে শেষ শক্তিটুকু দিয়ে কোনমতে উঠে এসেছে ভাড়ার থেকে। রক্তমাখা ছুরিটা ফেলে এসেছিল আরমাভো, সেটা তুলে নিয়ে এসেছে ভিখিরি।

কিন্তু আরমান্ডোর বেডরূম চিনল কি করে, বালা? ডায়নার প্রশ্ন। প্রাসাদটা নিশ্চয় অনেক বড় ছিল, আর অনেক ঘর ছিল…

ছিল। অন্য কেউ হলে হয়তো চিনত না। কিন্তু ভিখিরি আসলে ভিখারিনী। ম্যারিজল। আরমান্ডোর ত্যাগ করা স্ত্রীদের একজন। রাস্তায় থেকে থেকে শেষ হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। চেহারা শরীর সবই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এমনকি আরমান্ডোও চিনতে পারেনি তাকে ছুরি মারার সময়। জানালা দিয়ে তখন চাঁদের আলো আসছে। ছুরি মারার সময় আরমাভোর নাম ধরে এত জোরে গাল দিয়েছিল ম্যারিজল, লোকে বলে, সেই শব্দে জানালার কাঁচ নাকি চুরচুর হয়ে গিয়েছিল।

পারলারে স্তব্ধ নীরবতা। থমথমে পরিবেশ। সবাই যেন শুনতে পাচ্ছে নিজেদের হৃৎপিরে ধুকপুকানি।

চাকরেরা এসে দেখল, নরিয়েমা বললেন, বিছানায় পড়ে আছে দুটো লাশ। মরার আগে নিজের নিয়তি বুঝতে পেরে আতঙ্কিত হয়েছিল আরমাভো। বড় বড় হয়ে গিয়েছিল চোখ। তার কপালে ছুরি দিয়ে কেটে একটা অক্ষর, বি লিখে দিযেছিল ম্যারিজল। বি বোরজিয়ার নামের আদ্যক্ষর। নাকি ব্যাড বোঝাতে চেয়েছিল সে-ই জানে। এরপর থেকেই গুজব রটে যায়, ওই ছুরিটার মালিক যে-ই হবে, ছোঁয়ার চার মাসের মধ্যেই অপঘাতে মৃত্যু হবে তার।

শ্রাগ করলেন ডক্টর। ফিক করে ছোট্ট একটা হাসি দিলেন। আরে, মুখ অমন করে কেন রেখেছ তোমরা? এ-তো একটা গল্প। সত্যি না-ও হতে পারে। আর অভিশাপের কথা যে ঠিক নয়, তার তো প্রমাণই রয়েছে। কত দিন ধরে মিউজিয়ামে রইল ছুরিটা, কিন্তু কই, মালিক তো মরল না। কি বলেন, জুভেনার?

টেনেটুনে টাইয়ের নট ঢিলে করল কিউরেটর। আমতা আমতা করে বলল, সত্যি কথাটাই বলি। মিউজিয়ামে থাকার সময় কেউ ওটা ছুঁতে সাহস করেনি।

*

মেহমানদের যাবার সময় হলো।

ডায়না বলল, নরিখালা, গেস্টদের এগিয়ে দিয়ে এসো, প্লীজ। আমি এখানেই থাকি। শরীরটা ভাল্লাগছে না!

নিশ্চয়ই, ডক্টর নরিয়েমা বললেন। এত ভয় কেন? কিচ্ছু হবে না, দেখো। সব ফালতু কথা।

আমরা আরও কিছুক্ষণ থাকি? অনুরোধের সুরে বলল কিশোর। সাহায্য টাহায্য লাগতে পারে।

আড়চোখে দুই সহকারীর দিকে তাকিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করল, ওদের মনোভাবটা কি। মুখ দেখেই বুঝল, সম্মতি আছে।

ডায়নাও আপত্তি করল না।

মেহমানদের মধ্যে প্রথম যে মানুষটা বেরিয়ে গেল, সে কিউরেটর জুভেনার। রাগে, ক্ষোভে গটমট করে চলে গেল সে। তারপর একে একে গেল অন্যেরা। সদর দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন ডক্টর নরিয়েমা, ডায়নার হয়ে গুডবাই জানাচ্ছেন সবাইকে।

পার্টিতে কাজ করার জন্যে ভাড়া করে তোক আনা হয়েছে। ওদেরকে সাহায্য করল তিন গোয়েন্দা। টেবিল থেকে সমস্ত বাসন-কোসন সরাতে আধ ঘণ্টার বেশি লাগল না। সোফাতেই গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ডায়না। অভিশাপের ভয়ে কাবু হয়ে গেছে। তাকে বিরক্ত করল না গোয়েন্দারা। বেরিয়ে এল বারান্দায়।

কি ভাবে থাকা যায় এখানে বলো তো? কিশোর বলল। খানসামা-টানসামা হয়ে যাব নাকি?

মুসা বলল, থাকাটা কি ঠিক হবে? ছুরির গল্পটা শুনলে না! রোম খাড়া করে দেয়।

আমার কাছে যেন কেমন কেমন লাগছে! কিশোর বলল।

জুভেনারের কথা বলছ? রবিনের প্রশ্ন। ও এখানে আসার আগে কিন্তু সব ঠিকঠাকই ছিল।

হ্যাঁ। আর ডায়না এত ভয় পাচ্ছে দেখেও গল্পটা চালিয়েই গেলেন ডক্টর নরিয়েমা। থেমে যাওয়া উচিত ছিল। না বললেও পারতেন।

একবার ভেবেছি, নিষেধ করি বলতে… থেমে গেল মুসা। তাকিয়ে রয়েছে বাড়ির পাশের দিকে।

কি হলো?

শশশ! সার্ভেন্টস কটেজ!

ঘুরে তাকাল কিশোর। কটেজের জানালা গলে কালো পোশাক পরা একটা মূর্তিকে নামতে দেখল। বাড়ির সামনের দিকে যাচ্ছে, ফিসফিসিয়ে বলল সে। চলো, চমকে দিই।

 নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে নেমে পড়ল তিনজনে। ঝোঁপঝাড়ের অভাব নেই। লুকিয়ে পড়ল একটার ভেতরে।

আমাদের দেখল নাকি? মুসার প্রশ্ন।

বোঝা যাবে এখুনি।

বোঝা গেল। হঠাৎ বরফের মত জমে গেল তিন গোয়েন্দা।

 ঠিক ওদের মাথার পেছনে ধরা একটা সিলভার-প্লেটেড রিভলভারের নল।

বেরিয়ে এসো, মোলায়েম গলায় আদেশ হলো। ছায়ার কাছ থেকে সরে গেল লোকটা, কিন্তু রিভলভার উদ্যতই রয়েছে। ট্রিগার ছুঁয়ে আছে আঙুল। বার্ব এনুডা।

.

০৫.

গুলি করার দরকার নেই, হাত তুলে ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এল মুসা।

সাহস আছে তোমাদের, বলল এনুডা। তবে একটা উপদেশ মনে রাখবে। এ কথা যেন ডায়না না শোনে…

কে ওখানে? সিঁড়ির ওপর থেকে জিজ্ঞেস করল ডায়না। বার্ব, করছ কি? ওটা নামাও!

না, নামাব না! তোমার সব কথাই মানতে হবে নাকি?

ডায়নার পাশে এসে দাঁড়াল ডিন। এনুডার হাতে রিভলভার দেখে ভয় দেখা দিল চোখে। এই, সরাও, সরাও ওটা?

খবরদার! ওভাবে কথা বলবে না আমার সঙ্গে! ডায়না….

তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি, বার্ব, কোমল কণ্ঠে বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল ডায়না। হাত বাড়িয়ে দিল। দাও। নইলে আবার পুলিসে ধরে নিয়ে যাবে। এবার কিন্তু আর বাঁচাতে পারব না। বেআইনী ভাবে ঢুকে চুরির দায়ে হাজতে ঢোকাবে।

চুরি! চমকে গেল এডা। এটা তোমার আব্বা আমাকে দিয়েছেন, তুমি জানো। এখানে ফেলে গিয়েছিলাম। আমার জিনিস আমি নিতে এসেছি, একে কি চুরি বলে? হঠাৎ নাটকীয় ভাবে নষ্টটা নিজের মাথায় ঠেসে ধরল সে। থাক, আর কাউকে মরতে হবে না, আমিই মরব। এইবার আর আমাকে বাঁচাতে পারবে না কেউ…

মরতে চাইলে কিছু গুলি কিনে আনতে হবে তোমাকে। আশ্চর্য শান্ত ডায়নার কণ্ঠ। আব্বা এটা তোমাকে দিয়েছিলেন চোর-ঘঁচোড়কে ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর জন্যে। গুলি ভরে দেননি, আমি জানি। আর দ্বিতীয় কথা হলো, এটা তোমাকে একেবারে দিয়ে দেননি আব্বা। আর আব্বার জিনিস মানেই আমার জিনিস। পুলিশের সঙ্গেও তোমার সম্পর্ক ভাল না। কাজেই বুঝতেই পারছ, হাতের তালু মেলে ধরল ডায়না। প্লীজ!

চঞ্চল হয়ে উঠল এনুডার চোখের তারা।

দিয়ে, ভাগো এখান থেকে, সিঁড়ির গোড়ায় ডায়নার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ডিন। গিয়ে ঘুমাও। বিশ্রাম দরকার তোমার।

নেহায়েত নিরুপায় হয়েই যেন অস্ত্রটা নামাল এমুডা। বেশ, গলা কাঁপছে তার, জাহান্নামেই ফিরে যাচ্ছি আমি! বাড়ি তো না, নরক! গুলি খেয়ে নাহয় নাই মরলাম। মরার আরও পথ আছে। শুয়ে শুয়ে গিয়ে সেই উপায়ই ভেবে বের করব এখন।

যেন ছবিতে অভিনয় করছে, এমন ভঙ্গিতে রিভলভারটা ডায়নার ছড়ানো তালুতে ফেলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল এনু। লম্বা লম্বা কদমে হাঁটতে শুরু করল ড্রাইভওয়ে ধরে।

সে চোখের আড়ালে চলে গেলে ডায়নাকে বলল কিশোর, একা থাকতে আপনার অসুবিধে হবে না তো? আমরা…

একা থাকছে না ও, বাধা দিয়ে বলল ডিন। আজ রাতে যাচ্ছি না। আমি থাকছি, ডক্টর নরিয়েমা থাকবেন। কাল যাতে সারাদিন ক্লাবে গিয়ে মন ভাল করতে পারে ডায়না, সেই ব্যবস্থাও করব। ওর কোন অসুবিধে হবে না।

বেশ, বলে দুই সহকারীর দিকে ফিরল কিশোর। এসো, যাই। গুড নাইট, ডায়না। দাওয়াতের জন্যে ধন্যবাদ।

এসেছ, খুশি হয়েছি। সময় পেলে আবার এসো। যে কোন সময়।

পিকআপে এসে উঠল ওরা।

কিশোর বলল, যে কোন সময় এমো কথাটা কি সত্যি সত্যি বলল? নাকি কথার কথা?

কিছু একটা ভাবছ তুমি, রবিন বলল। কি, বলো তো?

চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। বড় ধরনের কোন একটা গোলমাল ঘটছে এখানে। গোলমালটা কি ঠিক বুঝতে পারছি না।

চলতে শুরু করেছে গাড়ি। মুসা চালাচ্ছে। সামনের পথের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ঠিকই বলেছ। এডাকেই বেশি সন্দেহ হচ্ছে। তার পাগলামিটা অভিনয়ও হতে পারে।

হ্যাঁ। ফিউজ বক্সটা কোথায় আছে, তার জানার কথা। আলো নেভাতে অসুবিধে হবে না তার। আর রিভলভার নিতে এসেছে রাতের বেলা চুরি করে, এটাও খোঁড়া যুক্তি মনে হয়েছে আমার।

তবে সে একলা পারেনি, দুজনের দরকার। সে যদি আলো নিভিয়ে থাকে, মূর্তিটা ঠেলে ফেলেছে আরেকজন। আরেকজন কে, বোধহয় আন্দাজ করতে পারি…

জুভেনার! বলে উঠল রবিন।

পথে আর কথাবার্তা তেমন হলো না। মুসা নীরবে গাড়ি চালাল, আর চুপচাপ বসে বসে ভাবল কিশোর। রবিন পেছনের সীটে বসে চিলতে একটুকরো ঘুম দিয়ে নিল।

কিশোর ভাবল, শুধু ডায়নাকে ভয় দেখানোর জন্যেই ওরকম একটা দুর্লভ মূর্তি ভেঙে ফেলল জুভেনারের মত অ্যানটিক-পাগল একজন মানুষ? আর যদি এনুডার কাজই হয়ে থাকে, কাজ সেরেই পালাল না কেন সে, দেখা দেয়ার জন্যে কেন বসে থাকল?

আরও অনেক প্রশ্ন জাগল তার মনে। জবাব মিলল না কোনটারই। ভাবছে মুসাও। দুজনের ভাবনার মধ্যে একটা ব্যাপারে মিল রয়েছে সেটা হলো, বোরজিয়া ড্যাগারের অভিশপ্ততার কাহিনী কি শুধুই গল্প? না কিছুটা সত্য রয়েছে এর মধ্যে?

*

কিশোর, ওই ডক্টর মহিলাকেও কিন্তু খুব একটা সুবিধের লাগেনি আমার। এত কথা বলতে গেল কেন? রবিন বলল কিশোরকে।

ফ্রিজ থেকে খাবার বের করছে কিশোর। স্যান্ডউইচ। ফলের রস।

কথা হচ্ছে কিশোরদের বাড়িতে। পরদিন সকালে। খাবার বের করে নিয়ে রান্নাঘরের টেবিলে এসে বসল কিশোর। রবিনের প্রশ্নের জবাব দিতে যাবে, এই সময় ঘরে ঢুকল মুসা। শুরু করে দিয়েছ দেখি তোমরা। দেরি করে ফেললাম না তো? খাওয়ার আগে, না পরে?

ঠিক সময়েই এসেছ। এসো, বসে পড়ো, কিশোর বলল।

তা জরুরী তলব কেন? চেয়ারে বসতে বসতে বলল মুসা।

 যাব এক জায়গায়।

কোথায়? আবার ডায়নার ওখানে?

নাহ, ভাবছি মিউজিয়ামে যাব

সরু হয়ে এল মুসার চোখের পাতা। কি দেখতে যাবে? অ, বুঝেছি। জুভেনারের সঙ্গে কথা বলতে। দেখো কিশোর, আমার ভাল্লাগছে না। কেস আমরা অনেক পাব ভবিষ্যতে। কিন্তু অভিশপ্ত ওই ছুরির কুদৃষ্টিতে না পড়লেই কি নয়?

অভিশপ্ত বলেই তো তদন্তটা আরও বেশি করে করব। দেখব, সত্যি সত্যি অভিশাপ বলে কিছু আছে কিনা।

*

মিনিট কয়েক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা।

কিশোর আর মুসা ইয়ার্ডের একটা পিকআপে উঠল।

রবিন ওদের সঙ্গে যাবে না। সে বাড়ি যাবে। জরুরী কাজ আছে। সে গেটের দিকে এগোল।

এঞ্জিন স্টার্ট দিল মুসা। পাশে বসা কিশোরের দিকে তাকাল। আগে কোথায় যাব?

রকি বীচ মিউজিয়াম।

গাড়িটা পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হাত নেড়ে ওদের বিদায় জানাল রবিন।

*

মিউজিয়ামের কাছাকাছি এসে প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ল ওদের, তা হলো পার্কিং লট প্রায় শূন্য।

রোববারে তো খোলাই থাকে, তাই না? মুসার প্রশ্ন।

থাকে। ঘড়ি দেখল কিশোর। এগারোটা তিরিশ। এখন লোকের কাজের সময়।

ভ্যান থামাল মুসা। গাড়ি থেকে নেমে মিউজিয়ামে ঢুকল দুজনে। টিকিট কেটে এসে ঢুকল মেইন একজিবিট রূমে।

ঢুকেই বুঝতে পারল জুভেনারের এতখানি মর্মপীড়ার কারণ। দেয়ালগুলো প্রায় শূন্য। বড় বড় ছবি ঝোলানো ছিল ওসব জায়গায়, দাগ দেখেই বোঝা যায়। অসংখ্য কাঁচের বাক্স খালি পড়ে রয়েছে। এক কোণে আরামে চেয়ারে বসে দিবান্দ্রিা দিচ্ছে মিউজিয়ামের দারোয়ান।

কবরও তো এর চেয়ে ভাল! ফিসফিসিয়ে বলল মুসা।

জিনিস নেই, কে আসবে পয়সা খরচ করে? মরগানদের কালেকশনগুলোই ছিল এই মিউজিয়ামের মেরুদণ্ড।

ওদের পেছনে হলওয়েতে পদশব্দ শোনা গেল।

বাড়ি চলে যাও, নিরো, বলে উঠল একটা পরিচিত কণ্ঠ।

চমকে জেগে গেল দারোয়ান।

বসে থেকে আর কি করবে। ভাবছি, বন্ধই করে দেব… কিশোর-মুসার ওপর চোখ পড়তে থেমে গেল কিউরেটর। আরি, দর্শক আছে দেখছি! অন্তত আজকের ইলেকট্রিক বিলের পয়সাটা পাওয়া গেল। কেন এসেছ তোমরা? মিউজিয়াম দেখতে? নাকি ডায়না পাঠিয়েছে। আবার কিছু নষ্ট করেছে?

মূর্তিটার জন্যে সত্যিই খারাপ লাগছে, মিস্টার জুভেনার, সহানুভূতি দেখিয়ে বলল কিশোর। আমরা এসেছি আসলে আপনার সঙ্গে দেখা করতেই।

আমার সঙ্গে দেখা করে আর কি হবে! চুপ হয়ে গেছে জুভেনার। একবার কিশোরের দিকে, আরেকবার মুসার দিকে তাকাচ্ছে। বোঝার চেষ্টা করছে কিছু। অবশেষে হাত নাড়ল, এসো। বরং আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলি।

হল পেরিয়ে একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। চৌকাঠের ওপরে সাদা পাস্টিকের ফলকে লেখা: অথরাইজড পার্সনস ওনলি।

ভেতরে মস্ত অফিস, ছয়টা ডেস্ক। ঘরের অন্য প্রান্তে ওদেরকে নিয়ে এল জুভেনার। আরেকটা দরজা পড়ল, পুরোটাই কাঁচের। তার ওপাশে কয়েকটা আলাদা আলাদা অফিস, প্রতি রূমে একজন করে বসার ব্যবস্থা।

নিজের অফিসে ঢুকল জুভেনার। কিশোররা ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিল। জানালার পর্দা টেনে দিল।

বসো। তা তোমাদের কথাটা আগে বলো। কি জানতে চাও?

প্রথমেই আপনার মিউজিয়ামটার কথা বলুন, অনুরোধের সুরে বলল কিশোর।

ডেস্কে কনুই রেখে ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকল জুভেনার। দেখো, সোজা করেই বলি। মিউজিয়ামের এখন সময় খুবই খারাপ। টেকে কিনা সন্দেহ। জিনিসগুলো ফেরত না পেলে লোকে দেখতে আসবে না। নেইই কিছু, কি দেখতে আসবে? লোক না এলে বিগড়ে বসবে কোম্পানি আর এজেন্সিগুলো, আমাদেরকে ফান্ড দিতে চাইবে না আর। কতবড় সর্বনাশ হয়ে যাবে ভাববা! আর এর সব কিছুর

মূলে ওই ডায়না মরগান। বেআইনী ভাবে জিনিসগুলো জোর করে নিয়ে গেছে। সে।

দলিলটা খুঁজে বের করতে বলেন আমাদেরকে? কিশোর জিজ্ঞেস করল।

না, চেয়ারে হেলান দিল জুভেনার। লোক লাগিয়ে দিয়েছি আমি। পাবে কিনা জানি না। আমার ভয় হচ্ছে, একেবারেই হারিয়ে গেছে ওটা, কিংবা নষ্ট হয়ে গেছে। ফেরত পাব না। চুপ করে থাকল এক মুহূর্ত। অন্য কথা ভাবছি আমি। তোমরা তো ডায়নার বন্ধু?

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল কিশোর। তবে পরিচয়টা নতুন হয়েছে।

নতুন হলেও তোমাদেরকে বেশ গুরুত্ব দেয় ডায়না, দেখেই বুঝেছি আমি। তোমাদেরকে একটা কাজ করে দেয়ার অনুরোধ করব আমি। ডেস্কের সবচেয়ে ওপরের ড্রয়ারটা খুলল কিউরেটর। মিউজিয়ামের একটা ইমারজেন্সী ফান্ড আছে। খুব অল্পই টাকা। কয়েক বছর ধরে তিল তিল করে জমানো হয়েছে। এতদিন ওটা থেকে খরচের দরকার পড়েনি কখনও। এই টাকাটা আমি তোমাদের দিয়ে দেব। বিনিময়ে তোমরা ডায়নাকে বোঝাবে কালেকশনগুলো আবার মিউজিয়ামকে ফেরত দিতে। কি করে বোঝাবে জানি না আমি, কিন্তু বোঝাবে।

ড্রয়ার থেকে একটা খাম বের করল সে। বেশ পুরু। মুখ খুলে উপুড় করল ডেস্কের ওপর। ঝরে পড়ল অনেকগুলো কড়কড়ে একশো ডলারের নোট।

দশ হাজার ডলার আছে এখানে। আমার কাজটা করে দাও। এগুলো সব তোমাদের হবে।

.

০৬.

 দীর্ঘ একটা মুহূর্ত নোটগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল দুই গোয়েন্দা।

তারপর কথা বলল কিশোর, দশ হাজার ডলারের বিনিময়ে, আপনি বলছেন ডায়নার সঙ্গে কথা বলব আমরা। দরকার হলে তার বাড়িতে থাকব। একসঙ্গে বসে খাবার খাব। তাকে বোঝাব কালেকশনগুলো ফেরত দিতে।

হ্যাঁ, হাসল জুভেনার।

তারমানে ঘুস দিচ্ছেন।

ঘুস ভাবছ কেন? বরং ভাবো না, তোমরা একটা কাজ করে দিয়ে টাকাটা কামিয়ে নিচ্ছ।

চেয়ারে হেলান দিল দুজনেই। কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। কি বুঝলে?

 যা বোঝার বুঝলাম, কিশোর বলল।

অস্বস্তিতে পড়ে গেল জুভেনার। ওদের কথাবার্তার মানে বুঝতে পারছে না। দেখো, দশ হাজার ডলার অনেক টাকা, অনেক কিছু কিনতে পারবে তোমরা। এই বয়েসে কত কিছুই তো কিনতে ইচ্ছে করে। দুজনের মুখের দিকে তাকাল একবার করে। তোমাদের বয়েসে আমি হলে এক লাফে রাজি হয়ে যেতাম।

কিন্তু আমরা ওরকম লাফাতে রাজি নই, জবাব দিয়ে দিল কিশোর।

বুঝেছি, আরও বেশি চাও! রেগে গেল জুভেনার। থাবা মারল ডেস্কে। এত্তো লোভ! ওই মেয়েটার মতই চামার! সব এক! কি ভেবেছ এটাকে? ব্যাংক…

আপনি ভুল করছেন, আর চুপ থাকতে পারল না মুসা। দশ হাজার অনেক টাকা। কিন্তু ঘুস দিয়ে কিনতে পারবেন না আমাদের। মানুষের জন্যে কাজ আমরা করি, তবে অন্য ভাবে।

কোন্ ভাবে শুনি?

আর যে ভাবেই হোক, বেআইনী ভাবে নয়।

কোনটাকে বেআইনী বলছ? মুসার দিকে আঙুল তুলে বাতাসে খোঁচা মারল জুভেনার। ডায়না যে কাজটা করল, সেটা বেআইনী নয়?

আপনার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি আমরা, মিস্টার জুভেনার, কিশোর বলল। বুঝি, কালেকশনগুলোর কোন দরকার নেই ডায়নার। কিন্তু মিউজিয়ামের আছে। আমি সত্যিই চাই, দলিলটা আপনি পেয়ে যান। আর যদি না পান, আদালতে গিয়ে নালিশ করুন…

স্প্রিঙের মত লাফিয়ে উঠল জুভেনার। বেরোও! দরজা দেখাল সে। ভাগো! আর যেন এখানে না দেখি! আমাকে উপদেশ দিতে আসো! মাসের পর মাস ধরে শুধু আদালতে যেতে থাকি আর আসতে থাকি আমি। আর ওদিকে সব ভেঙেচুরে জিনিসগুলোর সর্বনাশ করে দিক মাথামোটা মেয়েটা। পাগল!

বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা।

পেছনে এত জোরে দরজা বন্ধ করল জুভেনার, শব্দ শুনে মনে হলো বন্দুকের গুলি ফাটল।

*

এসে কোন লাভ হলো না, তাই না? মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে বলল মুসা। একসারি নিউজপেপার ভেনডিং মেশিনের পাশ দিয়ে চলেছে। ঘুস দিতে চায় আমাদেরকে! মরিয়া হয়ে গেছে লোকটা!

কয়েকটা খুচরো পয়সা মেশিনে ঢুকিয়ে দিয়ে একটা রকি বীচ টাইমস-এর কপি বের করে নিল কিশোর। লোকটা ছ্যাচড়া!

কিন্তু খুন পর্যন্ত কি এগোবে? এত প্রিয় যে সব জিনিস, তারই একটা ভেঙে ফেলবে খুন করার জন্যে? ভাঙা মূর্তিটাকে দেখে তার মুখের কি অবস্থা হয়েছিল লক্ষ করেছ?

সেটা অভিনয়ও হতে পারে। নিজেকে সন্দেহমুক্ত রাখার জন্যে করে থাকতে পারে কাজটা। ডায়নাকে আতঙ্কিত করে দিয়ে জিনিসগুলো ফেরত নেয়ার চেষ্টা হতে পারে। আর যদি মৃর্তি গায়ে পড়ে ডায়না মরেই যেত…

…আরও সহজ হয়ে যেত কাজটা। অনেকটা আপনা থেকেই জিনিসগুলো আবার ফিরে যেত মিউজিয়ামে।

ঠিক। চল বাড়ি যাই। কম্পিউটারের ক্রাইম ডাটা বেজ দেখি জুভেনারের কথা কি বলে। বেরিয়েও যেতে পারে চমকপ্রদ কোন তথ্য।

পিকআপে উঠল দুজনে।

পার্কিং লট থেকে গাড়ি বের করে আনল মুসা।

সীটে হেলান দিয়ে খবরের কাগজটা খুলল কিশোর। হেডলাইনের দিকে তাকিয়েই উজ্জ্বল হয়ে উঠল চোখ। এই, শোনো, শোনো! লিখেছে: অভিশাপ, না কাকতালীয় ঘটনা? অভিশপ্ত বোরজিয়া ড্যাগার ছুঁয়ে অল্পের জন্যে বেঁচে গেছেন মরগানদের উত্তরাধিকারী?

রসাল গল্প লিখেছে মনে হয়। পড়ো তো শুনি।

গতরাতে ক্লিফসাইড হাইটসের মরগান ম্যানশনে এক সাংঘাতিক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। তখন রাত প্রায় এগোরোটা। আকাশে ভরা চাঁদ, ঘরের ভেতরে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে। যারা উপস্থিত ছিল ওখানে তখন, কেউ ভুলতে পারবে না…

বাহু, গরুও পেয়েছে, টিটকারির সুরে বলল মুসা, দুধও ভালই দুইয়েছে।

হ্যাঁ। ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথা লিখেছে এরপর। শেষটুকু পড়ি। কিছু মেহমান তখন বেরিয়ে গেছে। ভীষণ ভয় পেয়েছে ওরা। ওদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেছে, অভিশাপের কবল থেকে মুক্তি নেই মিস ডায়না মরগানের। মিস মরগানকেও বলতে শোনা গেছে-বাকি জীবনটা কি আমি এই অভিশাপ নিয়েই কাটাব? টাইমসকে কথা দিয়েছেন মিস মরগান, আজ ক্লিফসাইড কান্ট্রি ক্লাবে একটা সাক্ষাৎকার দেবেন…।

উচিত হবে না, আবার বাধা দিল মুসা। পত্রিকাওলাদের কাছ থেকে দূরে থাকা উহত ৩র, যেকথা বোঝাতে হবে। রিপোটাররা সারাক্ষণ লেগে থাকলে তদন্ত করতে অসুবিধে হবে আমাদের।

হ্যাঁ। বোয়জিয়া ড্যাগারেরও বিজ্ঞাপন হয়ে যাচ্ছে খুব বেশি। কে কখন আবার কোত্থেকে এর মালিকানা দাবি করতে চলে আসে কে জানে। ঝামেলা পাকাবে।

না-ও আসতে পারে। অভিশাপের ভয় আছে।

বাড়ি পৌঁছেই সোজা নিজেদের হেডকোয়ার্টারে ঢুকে গেল দুই গোয়েন্দা।

কম্পিউটার নিয়ে বসল কিশোর। পাশে বসল মুসা।

জুভেনারের বিরুদ্ধে কিছুই বলল না কম্পিউটারের ডাটা বেজ।

 মুসা বলল, বার্ব এনুডার কথা কি বলে, দেখো তো?

কিছুটা অবাক হয়েই পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল দুজনে। জোরে জোরে তথ্যগুলো পড়ল মুসা, বিশ বছর আগে এক দোকান থেকে এক টিন মাছ চুরি করেছিল…এগারো বছর আগে চেঁচিয়ে সংলাপ বলে পড়শীদের শান্তি নষ্ট করেছিল…দুই বছর আগে, নো-পার্কিং জোন থেকে একটা লিমোজিন গাড়ি সরানোর সময় একজন টো-ট্রাকের অপারেটরকে মেরে বসেছিল।

নাহ, খুনীর সারিতে পড়ে না, মাথা নাড়ল কিশোর।

বাইরে থেকে মেরিচাচীর ডাক শোনা গেল, কিশোর, কিশোর!

তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে এল কিশোর ও মুসা।

তোর ফোন, মেরিচাচী বললেন। থানা থেকে করেছে। পল নিউম্যান।

দৌড় দিল দুই গোয়েন্দা।

 রান্নাঘরে এসে ঢুকল।

রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল কিশোর। হালো?

 কে, কিশোর? পল নিউম্যান বলল। খবর শুনেছ?

কিসের খবর?

ক্লিফসাইড কান্ট্রি ক্লাবে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।

ডায়না মরগান না তো? উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

হ্যাঁ। গুলি করা হয়েছে। ভাবলাম, খবরটা তোমাকে জানানো দরকার।

.

০৭.

ঝড়ের গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল দুজনে। পিকআপে উঠল। টায়ারের ওপর অত্যাচার চালিয়ে গাড়ি ঘোরাল রবিন। ছুটল পুবমুখো।

রাস্তায় সাইনবোর্ড রয়েছে: এনটারিং ক্লিফসাইড হাইটস।

তারপর থেকে নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে এলাকার চেহারা। শহরতলির ছিমছাম সুন্দর বাড়িগুলোর পরেই শুরু হয়েছে ঘন বন। রাস্তায় তীক্ষ্ণ মোড় রয়েছে, ফলে সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে মুসাকে। তবে কিছুতেই গতি কমাল সে।

বিরক্ত কণ্ঠে বলল, আলসেদের জন্যে তৈরি করেছে এই রোড! এ ভাবে চালানো যায়?

আরও খানিকদূর এগিয়ে আরেকটা সাইনবোর্ড দেখা গেল। তাতে ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে লেখা: সি সি সি। তীর চিহ্ন এঁকে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে কোনদিকে যেতে হবে। বাঁয়ের খোয়া বিছানো পথটায় গাড়ি নামাল মুসা।

কায়দা-টায়দা তো বেশ ভালই করেছে।

 করবে না? কিশোর বলল। এত দামী ক্লাব।

 রাস্তার মাথায় বন কেটে সাফ করা হয়েছে। ঘোরানো একটা ড্রাইভওয়ে। হাসিখুশি, বাদামী ইউনিফর্ম পরা একজন লোক ওদের পথ আটকাল।

ঘ্যাচ করে ব্রেক কষল মুসা। জানালার পাশে এসে দাঁড়াল লোকটা। কার কাছে…?

ডায়না মরগান, বলেই ব্রেক ছেড়ে দিল মুসা। লাফিয়ে সরে গেল গার্ড।

ক্লাবহাউসের সামনে এসে আবার জোরে ব্রেক কষল মুসা। পাথরের তৈরি তিনতলা একটা বাড়ি। চারপাশে সুন্দর ফুলের বাগান। দুদিকের দরজা খুলে লাফ দিয়ে নামল দুজনে। পেছনে শুনতে পেল গার্ডের চিৎকার, এই শুনুন, শুনে যান!

কিন্তু কে শোনে কার কথা। সামনে কথা শোনা যাচ্ছে। বাড়ির পাশ ঘুরে এল দুজনে। বেশ বড় ছড়ানো একটা চতুর, ঘাসে ঢাকা, চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে বন। চত্বর না বলে মাঠই বলা যায় ওটাকে। মাঠের মাঝখানে অনেক মানুষ, কয়েকজন পুলিস অফিসারও আছে। ওদের কাছ থেকে দূরে একটা অস্থির ঘোড়াকে শান্ত করার চেষ্টা করছে জিনস পরা একজন লোক। আর ভিড়ের মাঝে সেই রিপোর্টারকে দেখা গেল, সোসাইটি কলামিস্ট, ঘুরে ঘুরে লোকের কাছ থেকে তথ্য জোগাড় করছে।

বার বার এক্সকিউজ মি বলতে বলতে লোকজনকে প্রায় ঠেলে সরিয়ে ভিড়ের মাঝখানে এসে ঢুকল কিশোর-মুসা। ডায়নাকে শুয়ে থাকতে দেখল ঘাসের ওপর। ফোপাচ্ছে। পাশে বসে আছেন ডক্টর নরিয়েমা। ভেজা একটা কাপড় দিয়ে তার কপালের রক্ত মুছে দিচ্ছে ডিন।

কেমন আছে ও? জিজ্ঞেস করল মুসা।

মুখও তুলল না ডিন, কথাও বলল না। তবে ডক্টর হাসলেন। অ, তোমরা! তোমরাও যে মেম্বার, জানতাম না। ঘোড়া থেকে পড়ে গেছে ডায়না। ভাগ্য ভাল, ব্যথা তেমন পায়নি।

পায়নি, পেতে পারত, থমথমে হয়ে আছে ডিনের মুখ। মরেও যেতে পারত। খুন করার চেষ্টা করেছে কেউ!

কি হয়েছে বলতে পারব না, কাঁপা গলায় বলল ডায়না। ভীষণ ভয় পেয়েছে। সাক্ষাৎকার দেয়ার পর থেকেই খারাপ লাগছিল। ভাবলাম, ঘোড়ায় চড়ে খানিকক্ষণ ঘুরলে ঠিক হয়ে যাবে। ঘুরছি, এই সময় শুনলাম গুলির শব্দ।

লেগেছে? কিশোর জিজ্ঞেস করল।

না। ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল। পড়ে গেলাম।

কে করেছে দেখেছেন? মুসার প্রশ্ন।

না, পুলিশকে বললাম…

দূরে চিৎকার করে উঠল কেউ। ঝট করে বনের দিকে ঘুরে গেল সব কটা চোখ। তিনজন পুলিশ অফিসার, দুজন লোক, আর একটা ছেলে বেরিয়ে এসেছে। একজন সিভিলিয়ানের হাতে সিলভারপ্লেটেড একটা রিভলভার। দুজন অফিসার জোর করে টেনে আনছে রবিনকে।

আরি! রবিন! মুসা অবাক।

 অবাক কিশোরও হয়েছে। বিশ্বাসই করতে পারছে না। ও কি করে এল!

হাতকড়া লাগিয়েছেন কেন? চিৎকার করছে রবিন। খুলুন, খুলুন বলছি! আমি কি করলাম?

অনেক কিছুই করেছ, একজন অফিসার বলল। বেআইনী ভাবে ঢুকেছ বনের ভেতর। এটা প্রাইভেট প্রপার্টি। হাতে রিভলভার। গুলি ছোঁড়া হয়েছে ওটা থেকে। অ্যারেস্ট করার জন্যে যথেষ্ট নয় কি?

কিশোর-মুসাকে দেখে উজ্জ্বল হলো রবিনের চোখ। কিশোর, ওদেরকে বলো না, আমি কে!

একজন অফিসার চিনে ফেলল কিশোরকে। বাহ্, গন্ধ পেয়ে গেছ! রবিনকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, ছেলেটা তোমাদের দলের নাকি?

হ্যাঁ, কিশোর বলল।

অফিসার বলল, আমাদেরকে ও অবশ্য তোমাদের কথা বলেনি। বলেছে, একটা জুনিয়র ডিটেকটিভ টীমের মেম্বার।

ঝাঁকুনি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল রবিন। এই সময় ঘটল আরেক ঘটনা। ভিড় ঠেলে ভেতরে এসে ঢুকল দুজন গার্ড, ওদের মাঝে সেই লোকটাও রয়েছে, যে কিশোরদের ভ্যান থামিয়েছিল। দুজনকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, যা, এই তো! এদের কথাই বলেছি। পুলিস অফিসারদেরকে বলল, না বলে জোর করে ঢুকে পড়েছে। ওদের আটকান।

গুঞ্জন করে উঠল লোকেরা। জোরে সবাইকে শুনিয়ে বলল অফিসার রিম্যান, আপনারা অস্থির হবেন না। এরা গোয়েন্দা। এদের একজনকে আমি ভাল করেই চিনি। মিস মরগানও ভালই আছেন।

আশ্বস্ত হয়ে এক এক করে সরে যেতে লাগল সদস্যরা।

ভিড় কমে গেলে কিশোর বলল, থ্যাংকস, মিস্টার রিম্যান। রবিনের দিকে ফিরল। তুমি ওখানে কি করছিলে?

জিজ্ঞেস করেছি সে-কথা, জবাবটা দিল রিম্যান। লুকিয়ে মিস মরগানের ওপর নজর রাখছিল। বলল, বনের ভেতর নাকি কুড়িয়ে পেয়েছে রিভলভারটা। আপাতত ছেড়ে দিচ্ছি, তবে শহর ছেড়ে যেতে পারবে না। তোমাকে আমাদের দরকার হতে পারে। রিভলভারটা নিয়ে যাচ্ছি, পরীক্ষা করতে হবে। রবিনের চোখে চোখে তাকাল অফিসার, মিথ্যে বলে থাকলে বিপদে পড়বে বলে দিচ্ছি।

নিজেদের গাড়ির দিকে এগোল পুলিসের। ডায়নার দিকে বুক কিশোর। আমাদের পরিচয় তো জানলেন। বুঝতেই পারছেন এখন, আপনাকে সত্যিই সাহায্য করতে চাইছি। কেউ লেগেছে আপনার পেছনে, খুন করতে চায়।

বাধা দিয়ে বলল ডায়না, আমি আগেই আন্দাজ করেছি, এ ধরনেরই কোন কাজ করো তোমরা। আচমকা কিশোরের হাত চেপে ধরল, আমাকে সত্যিই সাহায্য করবে।

গাল চুলকাল কিশোর। করব। আর সেলে আপনাদের বাড়িতে আমাদের থাকা দরকার। কোনও একটা ছুতোয় যদি

ছুতো করা লাগবে না। খুব সহজেই ব্যবস্থা করা যায়। আমার সিকিউরিটি অফিসার হয়ে যাও। জুনিয়র সিকিউরিটি। চাইলে বেতনও দেব। আমার নিরাপত্তা দরকার, বুঝতেই পারছ। থাকতেও পারবে, তদন্তও করতে পারবে।

এখানে এ ভাবে বসে থাকলে তো হবে না, তাড়া দিলেন নরিয়েমা। আমার অফিসে নিয়ে যাওয়া দরকার তোমাকে। কিছু ওষুধপত্র তো লাগবে।

মুসা, ডিন আর নরিয়েমা সাহায্য করলেন ডায়নাকে। ধরে ধরে তাকে নিয়ে চলল ক্লাবহাউসের দিকে। কয়েক গজ পেছনে রইল কিশোর আর রবিন। কিশোর জিজ্ঞেস করল, বনের মধ্যে কি করছিলে, বলো তো?

রবিন বলল, বাড়ি যেতেই মা বলল, কাজটা করা লাগবে না। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। ইয়ার্ডে গিয়ে দেখলাম, তোমরা চলে গেছ। মেরিচাচী বললেন, পুলিস ফোন করেছিল। ডায়না নামে কে নাকি গুলি খেয়েছে। ঠিকানা বলতে পারলেন না। টেবিলে ফেলে রাখা পেপারের দিকে চোখ পড়ল। দেখি, তাতে লেখা, আজ এই ক্লাবটাতে আসবে ডায়না, সাক্ষাৎকার দেবে। বুঝলাম, অঘটনটা এখানেই ঘটেছে। একটা ট্যাক্সি নিয়ে ছুটলাম। গার্ডের ভেতরে ঢুকতে দিল না। ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে ঢুকে পড়লাম বনের মধ্যে। ভাবলাম, চুরি করে ঢুকব।

দম নেয়ার জন্যে থামল রবিন।

তারপর? কিশোর জিজ্ঞেস করল।

বনে ঢোকাটাও সহজ হলো না। বেড়া ডিঙিয়ে বনে ঢুকলাম। ক্লাবহাউসটাকে খুঁজতে লাগলাম, এই সময় কানে এল ঘোড়র পায়ের শব্দ। এগিয়ে দেখি, ডায়না ঘোড়ায় চড়েছে। গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে ওর দিকে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ গুলির শব্দ হলো। লাফ দিয়ে পেছনের পায়ের ওপর খাড়া হয়ে গেল ঘোড়াটা। মাটিতে পড়ে গেল ডায়না। বুঝলাম, গুলি তার গায়ে লাগেনি। তাই সেদিকে না গিয়ে গেলাম যেদিক থেকে গুলির শব্দ শোনা গেছে সেদিকে। কে গুলি করেছে দেখলাম না, তবে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলাম রিভলভারটা।

এনুডারটার মতই দেখাত, আনমনে বলল কিশোর।

দ্রুত হেঁটে অন্যদের কাছে চলে এল দুজনে। হাত তুলে বাগানের একটা জায়গা দেখাচ্ছেন ডক্টর নরিয়েমা। বেশ খানিকটা জায়গার মাটি কোপানো। কাছে পড়ে আছে হোস পাইপ, নানা রকমের বোতল, বীজের প্যাকেট। কোপানো জায়গায় ঘাস ছিল, কিছু নষ্ট হয়েছে কোপানোয় বাকিগুলো ওকেমন জ্বলা জ্বলা।

আর্সেনিকের কাজ, বুঝিয়ে বললেন ডক্টর। ঘাস সহজে রে না। কুপিয়ে নষ্ট করে ফেললেও আবার ওঠে। তাই মাটি যাবে আর্সেনিক ঢেলে দিয়েছিলাম। মরেছে এখন, আর উঠবে না। ভাবছি, এ বছর ওখানে টমেটো লাগাব।

ভাল। গুভিয়ে উঠল ডায়না। বডদ খারাপ লাগছে, খালা! শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।

ক্লাবহাউসের দিকে এগিয়ে চলল ওরা। নিচতলায় উক্টরের অফিস। সুন্দর করে সাজানো গোছানো। একটা সিংক, একটা চেয়ার, একটা ডেস্ক, একটা কট, আর কয়েকটা তাক বোঝাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

কটে শুয়ে পড়ল ডায়না। গুঙিয়ে উঠল আবার। উফ, মাথার ব্যথায় মরে গেলাম!

দাঁড়াও, এখুনি সব ঠিক হয়ে যাবে, কোমল গলায় বললেন নরিয়েমা। দুটো ব্যথার বড়ি খেলেই, ব্যস…।

তাকগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। একটা শিশি পাড়লেন। চুপ করে থাকো, ডায়নার দিকে তাকালেন না তিনি, যা করার আমি করছি। ডিন, এক গেলাস পানি।

ঘরটায় চোখ বোলাচ্ছে রবিন।

বড় একটা গেলাস ভর্তি করছে ডিন।

ডায়নার মাথার নিচে বালিশ দিয়ে আরামে শোয়ার ব্যবস্থা করছে মুসা।

আর পুরো ব্যাপারটাই কেন যেন অপছন্দ হচ্ছে কিশোরের। চেহারায় যেন শ্রাবণের কালো মেঘ জমছে। তাকিয়ে আছে ডায়নার দিকে।

বড়িগুলো হাতে নিয়েছে ডায়না। মুখে তুলতে যাবে। হঠাৎ কি ভেবে তাক থেকে শিশিটা পাড়ল কিশোর। লেভেলটা পড়ল। বড় বড় হয়ে গেল চোখ, যেন ছিটকে বেরিয়ে আসবে।

শিশির গায়ে লেখা রয়েছে: আর্সেনিক!

<

Super User