০৮.
চেনো নাকি তাকে? রবিন জিজ্ঞেস করল। ডন হারভেই তো নাম?
মিডলটনের সবাই চেনে ওকে, জবাব দিল রবি। এ গাঁয়ের সে কুলাংগার, বড়রা তাই বলে। দেখো বাড়ি গিয়ে, পাবে বলে মনে হয় না। বেশির ভাগ সময়ই বাইরে বাইরে থাকে। কি করে আল্লাই জানে! ভাল কিছু করে বলে তো মনে হয় না। বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকে। ওই লোকটা ভাল। ডনের এ সব কাণ্ডকারখানায় সাংঘাতিক বিরক্ত।
ডনকে তাহলে কোথায় পাওয়া যাবে? জানতে চাইল কিশোর।
কে জানে! রবি বলল। মোটর সাইকেল নিয়েই ঘোরে সারাক্ষণ। তা নাহলে হাই স্ট্রীটের গ্র্যান্ড কাফেতে বসে থাকে। থাকার কোন ঠিকঠিকানা নেই তার।
নামেই গ্র্যান্ড, টেড বলল। আর কিছু নেই। আহামরি কিছু নয়। মিডলটনের সমস্ত শয়তান লোকগুলো গিয়ে বসে ওখানে, আড্ডা মারে। ডন প্রায়ই বলে, তার একটা কাজ দরকার। সেজন্যেই নাকি গ্র্যান্ড কাফেতে যায়, কাজ জোগাড়ের জন্যে। নানা ধরনের লোক আসে ওখানে, কে যে কখন কাজ দিয়ে ফেলবে বলা যায় না। কাজ অবশ্য একটা না একটা পেয়েই যায় সে। তবে ধরে রাখতে পারে না। অল্পদিনও টেকে না। কাজটা ভাল না বলে ছেড়ে দিয়ে চলে আসে। আব্বা বলে অন্য কথা। কাজের লোকই নাকি নয় ও।
চিনব কি করে তাকে? গ্র্যান্ড কাফেতে যদি পাই? জিজ্ঞেস করল জিনা। মোটর সাইকেলের পোশাকে দেখেছি তাকে। হেলমেট পরা। চেহারা দেখিনি।
পাতলা, লম্বাটে মুখ, যেন একটা ইঁদুর। কথা বলে ক্যাচক্যাচ করে, দরজার কজায় তেল না থাকলে যে রকম শব্দ হয়।
টেডের মুখে লোকটার চেহারার বর্ণনা শুনে না হেসে পারল না গোয়েন্দারা। তারপর দুই ভাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এল। আবার বেরোল পথে।
চলো, এ্যান্ড কাফেটা ঘুরেই আসি একবার, কিশোর বলল। হয়তো পেয়েও যেতে পারি আমাদের চিড়িয়াকে।
যা শুনলাম, মুসা বলল। আজব চিড়িয়াই মনে হলো। একের পর এক কাজ বদলায়। মোটর সাইকেল নিয়ে ঘোরে। বাকি সময় কাফেতে বসে থাকে। চুরিদারিগুলোতে সে জড়িত থাকলে মোটেও অবাক হব না।
মিডলটন জায়গাটা বড় না। মাত্র দুটো কাফে আছে। তার মধ্যে একটা হলো গ্র্যান্ড কাফে। নোংরা, মলিন একটা বাড়ি। ভেতরে কান ঝালাপালা করে দিয়ে ভীষণ জোরে মিউজিক বাজছে। ডনের মোটর সাইকেলটা দেখা গেল কাফের বাইরে। থমকে গেল গোয়েন্দারা। কি করবে ঠিক করতে পারছে না।
জানালা দিয়ে উঁকি দেয়া উচিত হবে না, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। আমাদের ওপর ডনের চোখ পড়লে সব শেষ। আর এগোতে দেবে না। হুঁশিয়ার হয়ে যাবে। কিছু খুঁজে বের করতে পারব না তখন।
রাস্তার অন্য পাশে কয়েকটা গাড়ি দেখিয়ে মুসা বলল, ওগুলোর পাশে লুকালে কেমন হয়? ও কোথায় আছে, জানি। এক সময় না এক সময় বেরোবেই সে। সাথে কেউ থাকলে…
শশশ! ঠোঁটে আঙুল রেখে হুঁশিয়ার করল রবিন। ওই, আসছে!
কাফে থেকে বেরিয়ে আসছে লোকটা। দেখেই তাকে চিনতে পারল। এই সেই লোক, কোন সন্দেহ নেই। উঁচু বুট পায়ে। নকশা যখন নিতে এসেছিল তখন হেলমেটটা মাথায় ছিল, এখন খুলে হাতে নিয়েছে। টেড আর রবির দেয়া বর্ণনার সাথে মিলে যাচ্ছে তার চেহারা। ইঁদুরমুখো। সঙ্গে আরেকজন লোক রয়েছে। বেঁটে, গাট্টাগোট্টা, বয়েস চল্লিশ মত হবে। রাস্তায় নেমে এল দুজনে।
দ্বিতীয় লোকটাকেও চিনল মুসা। ফিসফিসিয়ে বলল, এই সেই লোক, গোবেল বীচ স্টোরে কালো চশমা পরা ছিল। সাংবাদিক বলে পরিচয় দিয়েছিল নিজেকে।
কিশোর, রবিন আর জিনাও চিনল তাকে।
দুজনে জোট বেঁধেছে, কিশোর বলল একই সঙ্গে কাজ করে মনে হয়।
কি বলছে শুনতে পারলে হত, আফসোস করে বলল রবিন।
একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়! ফিসফিস করে বলল কিশোর। লোকগুলোকে বেরোতে দেখে গাড়ির আড়ালে এসে লুকিয়েছে সবাই ওরা। ওই দেখো, মোটর সাইকেলটার কাছে দাঁড়িয়েছে। ওখানে যতক্ষণ থাকবে, ওদের কথা শুনতে পাব আমরা।
কি ভাবে? জিনার প্রশ্ন।
এসো আমার সঙ্গে।
মাথা নিচু করে রেখে এগোল কিশোর। গাড়ির জন্যে মোটর সাইকেলের কাছ থেকে ওকে দেখতে পাবে না লোকগুলো। চত্বরের একধারে রাস্তার কাছে চলে। এল সে। রাস্তা পেরোতে হবে এখন খুব সাবধান! দেখে না ফেলে!
কিশোরের কথামতই কাজ করল রবিন, জিনা আর মুসা। তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারছে না। কি করতে চাইছে? প্রশ্ন করার সময় নেই। অনেক ঘুরে রাস্তা। পেরোল ওরা।
কোন বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন লোকগুলো। কোন দিকেই তাকাচ্ছে না।
এবার ওই কোণায় যেতে হবে, দেখাল কিশোর। তারপর ওই গলিটা ধরে চলে যাব কাফের কাছে। গলি আর হাই স্ট্রীটের মোড়ে রয়েছে কাফেটা তখনি দেখেছি সেজন্যেই যেতে চাইছি ওখানে।
কোণের কাছে চলে এল ওরা। বাড়িটার কোণ ঘুরলেই এখন ডন আর অন্য লোকটাকে দেখা যাবে। তবে দেখার প্রয়োজন নেই, ওদের কথা শুনতে পেলেই হয়। শোনা যাচ্ছে।
ঠিক আছে বলছ? ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে বলল বেঁটে লোকটা রেগে গেছে মনে হয়। শুরুতেই সব গোলমাল করে না ফেললে…
আমার দোষ নয়, মারভিন। তীক্ষ্ণ শোনাল ডনের গলা। ঠিকই বলেছে টেড, ইঁদুরের মত চিচিই করে।
আস্তে! শুনে ফেলবে! এদিকে এসো। বেঁটে লোকটা বলল।
দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফেলল গোয়েন্দারা। নিরাশ হয়েছে। এত কষ্ট করে এখানে এসেও লাভ হলো না। সরে যাচ্ছে লোকগুলো।
চলো, পিছু নিই, মুসা বলল। কি বলে শুনতে হবে।
ভাগ্য আরেকবার গোয়েন্দাদের পক্ষ নিল। এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল লোক দুজন, ওদের কথা শুনতে পেল ওরা। তবে আগের জায়গা থেকে সরে যেতে হলো অবশ্যই। নির্জন এক টুকরো পতিত জায়গা। একপাশে বেড়া।
আরেক পাশে বাড়ি। কাজেই লুকাতে অসুবিধে হলো না ওদের। ডন সিগারেট ধরাল। তার সঙ্গী ধরাল পাইপ। আবার কথা বলতে শুরু করল।
বেড়ার আড়ালে ঘাপটি মেরে শুনতে লাগল গোয়েন্দারা। আগের জায়গা থেকে লোকগুলো সরে আসায় বরং ভালই হয়েছে। এখন ওদের কথা আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। …এ সব বলেছি আমি, মারভিন, ডন বলছে। সুবিধে করতে পারিনি। আর তাতে আমার দোষটা কোথায়? কি করে জানব জিনিসগুলো আসতে এত দেরি হবে? ওগুলো আসার আগেই আমার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল ওখানে।
বেশ, ধরলাম সেটা ব্যাড লাক। তোমার কাজ শেষ হওয়ার আর সময় পেল না …যে কাজটা পানির মত সহজে সেরে ফেলা যেত, তার জন্যে ঝুঁকি নিতে হলো, তালা ভেঙে ঢুকতে হলো-সবই বুঝলাম, তারপরও…
যা-ই করে থাকি, কাজটা তো হলো। এটাই আসল কথা। নকশাটা দরকার। ছিল আপনার, পেয়েছেন। মালও পেয়ে যাব শীঘি, যদি নকশার নির্দেশমত এগোতে পারি। তারপর আমাদের কাজ হবে ওগুলো দেশ থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়া। ভাল লাভ হবে।
হোরেসের ভাগ দিতে হবে, ভুলো না। জেল থেকে বেরোবেই। তখন তার পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে আমাদের।
ফন্দিটা ভালই করেছিল। নকশাটা ইসের মধ্যে ভরে…
ইসেটা যে কিসে তা আর শোনা গেল না। বাকি কথাগুলো উড়িয়ে নিয়ে গেল বাতাসে। কান খাড়া করে অনেক চেষ্টায় আরও কয়েকটা শব্দ শুনতে পেল গোয়েন্দারা। মারভিন বলছে, কাল রাত নটায়, পিংক হাউসে…
হাঁটতে শুরু করল দুজনে। আর ওদের কথা শোনা গেল না। শুনতে হলে আবার পিছু নিতে হবে। আর ঝুঁকি নিল না গোয়েন্দারা।
অন্ধকারও হতে শুরু করেছে। গোবেল বীচে ফিরে যাওয়া উচিত। ঘরে আরাম করে বসে বিকেলের এই অভিযান নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
গোবেল ভিলায় ফিরে এল ওরা। ছেলেদের ঘরে এসে বসল সবাই।
আলোচনা শুরু করল কিশোর, তাহলে কি জানলাম আমরা? ডন হারভে চোরের দলের একজন। কথা শুনে মনে হলো অন্য লোকটা, অর্থাৎ মারভিন হলো তার বস।
কিংবা আরেকটা লোকের কথা যে বলল, সে-ও হতে পারে, জিনা মনে করিয়ে দিল। যার নাম হোরেস।
যে লোকটা জেলে রয়েছে, রবিন বলল।
সূত্র তো ভালই পেলাম, বলল মুসা। এখন এগুলো জোড়া দিয়ে খাপে খাপে মেলাতে পারলেই হয়। অনেক প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাব। মারভিন বেশ রেগে গেছে মনে হলো। কোন একটা ভুল নিশ্চয় করে চলেছিল ডন। সে বলল, তার কিছু করার ছিল না। কারণ মাল আসতে আসতে দেরি হয়ে গেছে। ততদিনে তার কাজের মেয়াদ শেষ। এখন প্রশ্ন হলো, কি কাজ? কোথায়? আর কি জিনিসের ডেলিভারি, যা আসতে দেরি হলো?
ভাবছে কিশোর। নাক কুঁচকে রেখেছে সামান্য। মনে হয় বুঝতে পারছি, বলল সে। ঝুঁকি নিতে হলো বলল মারভিন। তারপর বলল তালা ভেঙে ঢোকার কথা। আমার বিশ্বাস, পলির ক্রিসমাস ট্রি, আর গোবেল বীচ স্টোরে চুরি করার কথা বলেছে ও।
আর জিনিস নিশ্চয় সেই খেলনা ভালুকগুলো, উত্তেজিত হয়ে উঠেছে রবিন। ওগুলো আসতেই দেরি হয়েছে, জানি আমরা, ডিক বলেছিল। আর চুরিও হয়েছে শুধু ওগুলোই।
হ্যাঁ, জিনা বলল। বেশ মিলে যাচ্ছে। কিশোর, ডন মনে হয় গোবেল বীচ স্টোরে একটা টেমপোরারি কাজ নিয়েছিল। বড়দিনের সময় কাজ বেশি, বাড়তি লোকের দরকার হয় ওদের। ওই সময়ই তাকে গোপন খবর পাঠানো হয়েছিল, যে কোন একটা খেলনা ভালুকের ভেতরে থাকবে নকশাটা। এল খেলনাগুলো। কিন্তু দেরি করে। তখন তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। খেলনাগুলোর ভেতরটা দেখার আর কোন উপায় না পেয়ে শেষে চুরিই করে বসল সে। সময় পেলে অবশ্য দেখেটেখে যে ভালুকটার ভেতরে রয়েছে, সেটাই খুলত। তারপর আবার সেলাই করে রাখলেই কেউ ধরতে পারত না।
ঠিক! কথাগুলো যুক্তিসঙ্গত মনে হলো কিশোরের। আর এমনই কপাল ওদের, চুরি করে নিয়েও লাভ হলো না। রবিন যে একটা ভালুক কিনল, কাকতালীয় ভাবে তার মধ্যেই থেকে গেল নকশাটা। যা-ই হোক, চুরি রহস্যের সমাধান হয়েছে। এখন আমাদের জানতে হবে, নকশা দেখে কি জিনিস বের করতে চাইছে ওরা। কি হতে পারে, বলো তো?
বুঝতে পারছি না, মাথা নাড়ল মুসা। তবে দামী কোন কিছু। বলল না, দেশ থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করলে ভাল টাকা পাবে। দামী জিনিসই।
তিন ভাগ করবে সেই টাকা, জিনা বলল। একটা ভাগ দেবে জেলের লোকটাকে। হোরেস।
আমার মনে হয় ও-ই নেতা। যদিও এখন জেলে রয়েছে। প্ল্যানট্যান সব সে-ই করেছে, শুনে সে-রকমই মনে হলো। নকশাটা সে এঁকেছে। আর সেটা পাচারের ব্যবস্থা করেছে …
খেলনা ভালুকের ভেতরে ভরে! বুঝে ফেলল রবিন।
হ্যাঁ। একটা ব্যাপার অবশ্য এখনও পরিষ্কার হয়নি। জেলে ওরকম একটা খেলনা কি ভাবে পেল হোরেস? সেটা আবার বাক্সে ভরে অন্য খেলনাগুলোর সঙ্গেই বা পাঠাল কিভাবে?
আমি জানি! বলে উঠল মুসা। কপালে টোকা দিয়ে বলল, এটা আজ ভালই খেলছে মনে হয়!
হাসল কিশোর। বলে ফেলো।
জেলে কাজ করতে হয় কয়েদীদের। অনেক রকম কাজ। শ্রমিকের কাজই বেশি। কাপড় সেলাই থেকে শুরু করে মেইল ব্যাগ বানানো পর্যন্ত সব করে। খেলনাও বানায়। শুনেছি, খেলনা বিক্রি করেও জেলখানার ভাল আয় হয়। জেলে হোরেসের কাজ খেলনা বানানো। কিংবা ইচ্ছে করেই কাজটা নিয়েছে সে, নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে। যাতে নকশা এঁকে সেটা একটা খেলনা ভালুকের ভেতর ভরে দিতে পারে সহজেই। কোন ভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছে, কোন দোকানে। জিনিসগুলো চালান যাবে। সেটা জেনে নেয়াটা কঠিন কাজ নয়। জেনে, খবর দিয়েছে তার বন্ধুদের, কোত্থেকে কিভাবে জোগাড় করতে হবে নকশাটা।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছ! তুড়ি বাজাল কিশোর। এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা। কি ভারে পাঠিয়েছে জানার জন্যে মনটা খুঁতখুঁত করছিল। যদিও সেটা এখন জেনে আর লাভ নেই, দরকারও নেই আমাদের। এখন যে কাজটা করতে হবে, তা হলো। নকশার মানে বের করে জিনিসগুলো খুঁজে বের করা! লোকগুলোকে ঠেকানো। মারভিন আর ডন কাল রাতে পিংক হাউসে দেখা করবে বলেছে। হয়তো ওখানেই রয়েছে জিনিসগুলো। পিংক হাউসটা কোথায়, খুঁজে বের করতে হবে আগে।
কোথায় যে জায়গাটা, কিছুই বলতে পারব না, জিনা বলল। নামই শুনিনি। এই এলাকায় না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে হলে ভাল হত, সুবিধে হত আমাদের জন্যে। সময়টা ভাল বেছেছে, তাই না? কাল নিউ ইয়ারস ইভ। রাত নটায় বাইরে বেশি লোক বেরোবে না। লোকে হয় বাড়িতে থাকবে, নয়তো পার্টিতে, নিউ ইয়ারের অপেক্ষায়।
আমরা বাদে! ঘোষণা করে দিল কিশোর। রাতের খাওয়া হয়ে গেলে, কেরিআন্টিকে বলব, আমরা স্টোররূমে খেলতে যাচ্ছি। ঘুমাতে দেরি হবে।
না বললেও কিছু এসে যায় না, জিনা বলল। আব্বা তো খেয়ে গিয়ে ঢুকবে স্টাডিতে। আম্মা টিভি দেখবে। আমরা সেই সুযোগে বেরিয়ে যাব। বলা যায় না, দাওয়াতও পেয়ে যেতে পারে, পার্টির। তাহলে তো কাজের কাজই হবে নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়ব আমরা…
পিংক হাউস শিকারে, হেসে জিনার কথাটা শেষ করে দিল রবিন।
তা তো বেরোব, মুসা বলল। কিন্তু জানিই তো না ওটা কোথায়
তা জানা যাবে, বলল কিশোর। সময় আছে কালকের সারাটা দিনই পড়ে আছে। যেতে যেতে তো সেই রাত নটা!
কপাল আমাদের ভালই বলতে হবে, জিনা বলল সব কিছুই কেবল পক্ষে যাচ্ছে। যেন আমাদের ইচ্ছেমতই ঘটছে সব আশা করি পিংক হাউসটাও পেয়ে যাব। কি বলিস, রাফি?
গররর! বিজ্ঞের ভঙ্গিতে জবাব দিল রাফি
.
০৯.
পরদিন সকালে আবার মিডলটনে এল গোয়েন্দারা। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। সাইকেল চালানোটা মোটেও আরামদায়ক হলো না। গায়ে পৌঁছে খেয়াল হলো, তদন্তটা কি করে চালাবে, আলোচনা করে ঠিক করে আসেনি। খোঁজ করতে গেলে যদি কোনভাবে টের পেয়ে যায় ডন? তাহলে এত দিনকার সব পরিশ্রম শেষ।
তবে বুদ্ধি একটা বের করে ফেলল কিশোর। চলো, ওই কাফেটায় ঢুকি। গ্র্যান্ড কাফে বাদে আরেকটা যেটা আছে সেটার কথা বলল সে। ওটার নাম ব্ল্যাক। ক্যাট, দেখতে পাচ্ছে। ঠাণ্ডা লাগছে। গরম গরম কোকা কিনে খেতে চাইলে কেউ সন্দেহ করবে না। তখন কায়দা করে জেনে নেয়ার চেষ্টা করব, পিংক হাউসটা কোথায়।
কাফেতে এসে ঢুকল গোয়েন্দারা। একটা টেবিল বেছে বসে পড়ল। সকালের এই সময়টায় খরিদ্দারের ভিড় নেই। সুন্দর চুলওয়ালা একটা ছেলে ওয়েইটারের কাজ করছে। হাসি হাসি মুখ। তার নাম হ্যারি। ব্ল্যাক ক্যাটের মালিক ছেলেটার বাবা।
অর্ডার নিতে এগিয়ে এল হ্যারি। আদর করে রাফির মাথা চাপড়ে দিয়ে বলল, বাহ, বেশ সুন্দর কুকুর তো।
খুশি হলো রাফি। সেই সাথে জিনা। হ্যাঁ, বলল সে। আর খুব সাহস! বুদ্ধিও আছে। ঘরে বসে থাকার বান্দাই সে নয়। ওই যে কিছু কিছু কুকুর থাকে না, খালি ড্রইং রুমে বসে থাকে।
তা যে নয়, সে তো দেখতেই পাচ্ছি, হেসে বলল ছেলেটা। কথায় কথায় হাসে। ওর চেহারাই বলে, গলায় লাল ফিতে বেঁধে কোলে বসে থাকতে রাজি নয়।
সুযোগ পেয়ে গেল কিশোর। পিংক শব্দটা বলার এইই উপযুক্ত সময়, রঙের কথা যখন উঠলই। না, সহ্যই করতে পারে না অলস হয়ে বসে থাকা, বলল সে। তবে ফিতে পছন্দ করে রাফি। একবার পিংক একটা রিবন বেঁধে দিয়েছিলাম গলায়। সেটা পরে সৈকতে তার সে-কি নাচানাচি। রবিন, তোমার মনে আছে? পিংক রিবন। পিংক, বুঝলে তো? ওই পিংক হাউসের মত।
আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছে কিশোর। লাগবেই, আশা করেনি। তবে লাগল।
ভুরু কুঁচকে হ্যারি বলল, পিংক হাউসের নামও জানো! অবাক হয়েছে। কি করে জানলে? এই এলাকায় থাকো না তোমরা, বুঝতে পারছি। আগে কখনও দেখিনি।
সত্যি কথা খানিকটা বলে দেয়া উচিত মনে করল মুসা। দেখবে কোত্থেকে? হাসল সে। এদিকে আমরা এলে তো। প্রথম এসেছি কাল। তখনই শুনেছি, একটা লোক বলছে পিংক হাউসের কথা। নামটা অদ্ভুত। সেজন্যেই কৌতূহল হচ্ছে আমাদের। ওই রঙের বাড়ি নিশ্চয় খুব একটা নেই। ওটার সম্পর্কে জানার খুব ইচ্ছে আমাদের।
বেশ বড় একটা বাড়ি, হ্যারি জানাল। পুরানো। লাল রঙের। সেজন্যেই ওরকম নাম হয়েছে। তবে বাড়িটার অনেক বদনাম। ওটার মালিক হোরেস ট্রিমেইনির গ্রেপ্তারের পর থেকেই।
উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে গোয়েন্দাদের মুখচোখ পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল ওরা। দ্রুত হয়ে গেছে হৃৎপিণ্ডের গতি। বুঝতে পারছে, তদন্তে অনেক এগিয়ে গেছে।
খাবারের অর্ডার দিল কিশোর।
ধূমায়িত কোকার মগ নিয়ে এল হ্যারি। আর বড় একটা কেকের অর্ধেকটা। সেগুলো টেবিলে নামিয়ে রেখে সাজিয়ে দিল।
আগের আলোচনাটা আবার চালিয়ে গেল কিশোর। জিজ্ঞেস করল, হোরেস ট্রিমেইনিকে গ্রেপ্তার করছে কেন?
সে এক মজার গল্প। শোনোনি? সত্যি? কেন, চোরাই ছবিগুলোর কথা শোনোনি?
পেইন্টিং?
হ্যাঁ, পেইন্টিং।
মাথা নাড়ল কিশোর। মুসা আর জিনাও নাড়ল। রবিন চুপ করে আছে। অবাক হয়েছে অন্য তিনজনের মতই।
ও। শোনো তাহলে, বলতে লাগল হ্যারি। বছরখানেক আগে লন্ডনের এক আর্ট গ্যালারি থেকে চুরি যায় ছবিগুলো। খুঁজতে খুঁজতে পুলিশ এসে ধর। হোরেসকে। চার বছরের জেল হয়ে যায়। তাকে দোষী প্রমাণ করতে পেরেছে বটে পুলিশ, তবে ছবিগুলো বের করতে পারেনি। কিছুতেই কথা বের করা যায়নি হোরেসের মুখ থেকে। তারপর থেকে ওই বাড়িটাতে আর কেউ বাস করে না।
বাড়িটা কোথায়? রবিন জিজ্ঞেস করল।
হ্যারি জানাল, বাড়িটা মিডলটন আর গোবেল বীচের মাঝে একটা সাধারণ রাস্তার ধারে। এটাই জানতে চেয়েছিল গোয়েন্দারা। কোকা শেষ করে উঠল ওরা। হ্যারিকে গুডবাই জানিয়ে বেরিয়ে এল কাফে থেকে।
দুপুরের খাওয়ার অনেক দেরি, কিশোর বলল। সময় আছে হাতে। ইচ্ছে করলে এখুনি ঘুরে দেখে যাওয়া যায়। এখন পেয়ে গেলে বিকেলে আর আসতে হবে না। মিডলটনে যত কম লোকে আমাদেরকে দেখে ততই ভাল। ডন কিংবা মারভিনের সামনে পড়তে চাই না কিছুতেই।
চলতে চলতে রবিন জিজ্ঞেস করল, কিশোর, এই হোরেস লোকটা ছবিগুলো কি তার বাড়িতেই লুকিয়ে রেখেছে? কি মনে হয় তোমার? নিশ্চয় গ্রেপ্তার যে হবে সেটা বুঝতে পেরেছিল। তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলেছে। এগুলোর কথাই বলছিল ডন আর মারভিন।
মুসাও রবিনের সঙ্গে একমত। কিশোর জবাব দেয়ার আগেই বলে উঠল, আমারও তাই মনে হয়। পুলিশ নিশ্চয় খোঁজা বাকি রাখেনি। আর সেটা ভাল করেই জানত হোরেস। কাজেই এমন জায়গায় লুকিয়েছে, যেখান থেকে খুঁজে বের করা কঠিন। কোথায় লুকিয়েছে সেটা বলে যেতে পারেনি সঙ্গীদের। তবে জেলে ঢুকে যোগাযোগ করেছে কোনভাবে। তারপর খেলনার ভেতরে নকশা ভরে সেটা পাচারের ব্যবস্থা করেছে।
আর জেল থেকে বেরিয়ে, জিনা যোগ করল। অবশ্যই তার ভাগটা চাইবে। ছবি বিক্রির টাকার। টাকা নিশ্চয় অনেক পাবে। বাকি জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে।
সেটা আর হতে দিচ্ছি না আমরা, কিশোর বলল।
যেন তার কথার সমর্থনেই বলে উঠল রাফি, ঘাউ!
হেসে উঠল মুসা। শুনলে তো রাফির কথা। ও বলতে চাইছে, হোরেস মিয়া, ওই টাকা জিন্দেগিতেও তুমি পাবে না। আর পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে পোলাও কোরমা খাওয়াও চলবে না। তোমাকে আবার জেলেই ঢুকতে হবে, শুকনো রুটি খাওয়ার জন্যে।
অতটা জোর দিও না, জিনা বলল। বলা যায় না কি হয়। যে লোকের পেট থেকে পুলিশ কথা আদায় করতে পারেনি সে নিশ্চয় সাধারণ লোক নয়। তাকে এত ছোট করে দেখা উচিত না। আরেকটা কথা হয়তো জানো, জেলে কোন কয়েদী যদি ভাল ভাবে থাকে, ভাল আচরণ করে, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মুক্তি দেয়া হয়। বলা যায় না, হোরেসকেও তেমনি ভাবে ছেড়ে দেয়া হতে পারে।
দিক না। আবার ঢোকাবে।
যদি চোরাই মাল সহ ধরতে পারে।
পারবে…
মুসা আর জিনার তর্কাতর্কিতে বাধা দিল কিশোর, ওই যে পিংক হাউস!
থেমে গেল পাঁচজনেই, রাফি পর্যন্ত। মুখ তুলে তাকিয়ে রয়েছে লাল বাড়িটার দিকে। সত্যিই লাল! দুই-আড়াইশো বছরের পুরানো। অর্ধেক কাঠ, অর্ধেক ইট সুরকি দিয়ে তৈরি। লাল রঙ করা হয়েছে। জানালার কাঠের শাটারগুলোও লাল। খড়-পাতা দিয়ে বানানো চালা। সামনের দরজায় উঠতে হয় সিঁড়ি বেয়ে। নির্জন, নিঃসঙ্গ। আশপাশে আর কোন বাড়িঘর নেই। বিশাল বাগান রয়েছে চারপাশ ঘিরে। তবে সেটাকে এখন আর বাগান বলা যাবে না। অযত্ন অবহেলায় জঙ্গল হয়ে গেছে।
চলো, ঢুকে দেখি, প্রস্তাব দিল মুসা। ধারে কাছে কেউ আছে বলে মনে হয় না। ভেতরে কি আছে দেখতে চাইলে এটাই সুযোগ। এখন দেখে রাখলে রাতে। এলে সুবিধে হবে।
কথাটা মন্দ বলেনি মুসা। কিশোরের পছন্দ হলো। গেটে ঠেলা দিল সে। কজায় এমন ভাবে জং পড়েছে, খুলতে জোর লাগল। কিচকিচ করে আর্তনাদ করে উঠল। তবে খুলল।
খুশি হয়ে উঠল কিশোর। তালা নেই। বাচলাম।
পথের পাশের খাদে সাইকেলগুলো লুকাল ওরা। তারপর সারি বেঁধে গেট দিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। খোয়া বিছানো পথ ধরে এগোল বাড়ির দিকে। আগে আগে হাটছে রাফি। নাক উঁচু করে বাতাস শুঁকছে। সন্দেহজনক কিছুর গন্ধ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেবে।
বাগানে ঢোকার গেটটার মত বাড়ির দরজা খোলা নয়। এখানে তালা দেয়া।
হলো না, নিরাশ হয়ে বলল মুসা। নিচতলার সমস্ত জানালা-দরজা ঠেলেঠুলে দেখল কোনটা খোলা আছে কিনা। মাথা নাড়ল, নাহ, আটকে রেখে গেছে! ঢোকা আর হলো না!
এক হিসেবে ভালই হলো, জিনা বলল। ঢুকতেও পারব না, ধরাও পড়ব না, তাতে কেউ বলতেও পারবে না বেআইনী ভাবে ঢুকেছি।
ওই আঙুর ফল টকের মত আর কি, ফোড়ন কাটল রবিন।
কিশোর কিছু বলছে না। নীরবে তাকিয়ে রয়েছে একেবারে মাটির কাছাকাছি। দুটো ভেনটিলেটরের গ্রিলের দিকে। লম্বা, সরু জানালার মত ফোকর, কাঁচটাচ নেই। এমন ভাবে তৈরি হয়েছে যাতে বাতাসের সাথে সাথে কিছু আলোও দিতে পারে মাটির তলার ঘরে।
আমি শিওর, ছবিগুলো থাকলে সেলারেই আছে, বলল সে। ইস, যদি কোনভাবে ঢুকতে পারতাম! নকশাটার সাহায্যে বের করতে পারতাম ছবিগুলো।
অনেক চেষ্টা করেও ঢোকা সম্ভব হলো না। আর কিছু করার নেই। বাড়ির পথ। ধরল ওরা।
তারপর সময় যেন আর কাটে না। সাংঘাতিক দীর্ঘ লাগছে। যেন সন্ধ্যা আর হবেই না সেদিন। আর যদি হয়ও, কেরিআন্টি কিংবা পারকার আংকেলের চোখ এড়িয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে কিনা তাতেও সন্দেহ আছে না পারলে, এত চেষ্টা, এত পরিশ্রম, সব বিফল।
কয়েক বাড়ি থেকে দাওয়াত এসেছে, নিউ ইয়ার ইভের পার্টিতে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু রাজি হলেন না জিনার আব্বা আম্মা। দুজন আত্মীয় বেড়াতে আসছেন সন্ধ্যায়। জিনার দূর সম্পর্কের চাচা-চাচী। তাদেরকে ফেলে দাওয়াতে যাওয়া যায় না।
সন্ধ্যা হলো। মেহমানরা এলেন। রাতের খাওয়া শেষ হলো। তার পরেও অনেক সময় বাকি। বড়রা সিটিং রূমে তাস খেলতে বসলেন।
ভালই হলো, কিশোর বলল। তাসে একবার ডুবে গেলে আর কোনদিকে খেয়াল থাকবে না। আর টেলিভিশন তো রয়েছেই। মাঝরাতের আগে আর উঠবে না কেউ। বাতাসের মত স্বাধীন আমরা। যেখানে খুশি চলে যেতে পারি, আনন্দে শিস দিতে শুরু করল সে।
এত খুশি হয়ো না, রবিন অতটা নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। যদি কোন কারণে উঠে আসেন আন্টি? হাজারটা কারণ থাকতে পারে ওঠার। আমরা ঘুমিয়েছি কিনা সেটাই যদি দেখতে আসেন?
তাহলে আর কি, লক্ষটা কৈফিয়ত দিতে হবে। তবে এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। ঝুঁকি নিতেই হবে। এতখানি এগোনোর পর শুধু কৈফিয়তের ভয়ে তো আর ঘরে আটকে থাকতে পারি না।
বেরিয়ে পড়ল ওরা। ক্যারিয়ারে অনেক বড় একটা ঝুড়ি বাধল জিনা, রাফিকে বয়ে নেয়ার জন্যে। কাদার মধ্যে দৌড়ালে অনেক কষ্ট করতে হবে বেচারাকে।
ঝুড়িতে তোলা হলো রাফিকে। এ ভাবে চলার অভ্যাস আছে তার। কাজেই গোলমাল করল না, যে ভাবে রাখা হলো, চুপ করে গুটিসুটি হয়ে রইল ঝুড়ির মধ্যে।
রওনা হলো গোয়েন্দারা। যত দ্রুত সম্ভব প্যাড়াল করতে লাগল, সময় মত ওখানে পৌঁছানোর জন্যে। আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই কিশোরের। ভয় তেমন করছে না। তবে পিংক হাউসে পৌঁছে কি দেখবে, আন্দাজও করতে পারছে না।
যে কাজে চলেছে, তাতে সফল হবে কিনা, এ ব্যাপারে সবারই সন্দেহ আছে। লুকিয়ে শোনা কয়েকটা কথার ওপর নির্ভর করে চলে এসেছে ওরা। লোকগুলো আদৌ পিংক হাউসে আসবে কিনা, তাই বা কে জানে? আগের দিন কথা বলার পর অনেক সময় পেরিয়েছে, ইতিমধ্যে অনেক সময় পেয়েছে ওরা মত বদলানোর।
আসবে কিনা কে জানে? ভাবনাটা প্রকাশই করে ফেলল রবিন।
জিনারও একই প্রশ্ন, তবে সেটা বলল না। আরেকটা ব্যাপারে সন্দেহ আছে। তার। নকশাটা সত্যিই ছবিগুলোর কাছে নিয়ে যাবে তো?
মাঝে মাঝেই পকেটে চাপড় দিচ্ছে কিশোর। নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছে, নকশাটা আছে কিনা। তার ভয়, কোন ভাবে খোয়া না যায়। পকেট থেকে পড়েও যেতে পারে। হারানোর ভয়ে কুকুরের ঘর থেকে বের করেছে ওটা বেরোনোর ঠিক আগের মুহূর্তে। নকল নকশা একে দেয়ার বুদ্ধিটা করেছিল বলে খুশি এখন সে। ঠিক কাজটাই করেছে।
পিংক হাউস থেকে একটু দূরে সাইকেল রেখে হেঁটে চলল ওরা। খুব সাবধান রইল। কোন রকম শব্দ করল না।
গেটের কাছে পৌঁছেই থমকে দাঁড়াল কিশোর। আগে আগে হাঁটছিল সে। তাহলে তার অনুমানই ঠিক! গেট খোলা। অথচ দুপুরে নিজের হাতে লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিল পাল্লাটা। লোকগুলো যে এসেছে, তার আরও প্রমাণ আছে। ম্লান আলো দেখা যাচ্ছে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে। একটা ভেনটিলেটরের ভেতর থেকে আসছে।
দেখলে তো! ফিসফিস করে বলল কিশোর, খুশি খুশি গলায়। আমার কথাই ঠিক!
.
১০.
অন্ধকারে গা ঢেকে রয়েছে গোয়েন্দারা।
ভাল করে তাকালেই শুধু চোখে পড়বে পাঁচটা ছায়ামূর্তি-চারটে মানুষের, আর একটা কুকুরের।
নিঃশব্দে ভেলটিলেটরের কাছে এসে থামল ওরা। ফাঁক দিয়ে নিচে তাকাল। গ্রিলের মাঝে যথেষ্ট ফাঁক। মুখ ঢুকিয়ে দেখতে তেমন অসুবিধে হয় না। সেলার, অর্থাৎ মাটির নিচের ঘরের বেশ অনেকখানিই চোখে পড়ে। ডনও আছে, তার সঙ্গী মারভিনও আছে। সেলারের মেঝেটা কাঁচা। পশ্চিমের কোণে মাটি খুঁড়ছে ডন, আর নকশা দেখে দেখে নির্দেশ দিচ্ছে মারভিন। নকল নকশা, যেটা এঁকে দিয়েছে কিশোর। তৃতীয় আরও একজন রয়েছে সেখানে, হাতে একটা বড় হ্যারিকেন। হোরেস ট্রিমেইনি জেলে যাওয়ার পর নিশ্চয় বাড়ির বৈদ্যুতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে, অনুমান করল কিশোর।
গলা বাড়িয়ে দিল মুসা।
দেখো দেখো! রবিন বলে উঠল। সেই মহিলা। যে ছেলের জন্যে ভালুকটা নিতে চেয়েছিল আমার কাছ থেকে।
তাই তো!
ভালমত খেয়াল করে দেখতেই বাকি তিনজনও চিনতে পারল মহিলাকে।
একটা শাবল নিয়ে কাজ করে চলেছে ডন। মেঝে থেকে উঠে আসছে তাল তাল মাটি।
ওখানেই তো থাকার কথা! ওই খানেই! মারভিন বলল। নকশার ওপর থেকে চোখই সরাচ্ছে না। ডন, চালিয়ে যাও।
কিছুক্ষণ পর মুখ মোছার জন্যে থামল ডন। দরদর করে ঘাম ঝরছে মুখ বেয়ে।
আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? রেগে গেল উন। কথাই তো বলে চলেছেন খালি। এক-আধ বার খুঁড়লে হয়টা কি? টাকা তো আর কম নেবেন না! ইস, মাটি তো না, যেন সিমেন্ট!
মনে হলো রেগে যাবে মারভিন। কিন্তু রাগল না। মহিলার দিকে ফিরে বলল, দেখি, আলোটা আরেকটু এদিকে সরাও তো, ইসাবেল।
একটাতে হবে না, বলে হ্যারিকেনটা মাটিতে রেখে দিল ইসাবেল। আরেকটা হ্যারিকেন বের করে ধরাল। ততক্ষণে শাবল নিয়ে মাটি কোপাতে শুরু করেছে মারভিন। কিছুক্ষণ কাজ করে ফিরিয়ে দিল আবার ডনকে।
পালা করে দুজনে মিলে মাটি কুপিয়ে চলল। সেলারের পুরো পশ্চিম কোণটা যেন খুড়ে তুলে ফেলবে।
ওপরে, ভেনটিলেটরের কাছে দাঁড়িয়ে দেখছে গোয়েন্দারা। এতই মগ্ন হয়ে আছে, ঠাণ্ডার কথাও ভুলে গেল। কখন যে ঠাণ্ডা বাতাস ছাড়তে শুরু করেছে টের পেল না। কিছুই না পেয়ে বিরক্ত হয়ে ডন যখন শাবলটা ছুঁড়ে ফেলল, হাসি চাপতে কষ্ট হলো ওদের।
কোন চিহ্নই তো নেই! বলল সে। আমি আর পারছি না! হোরেস নাকি ট্রাঙ্কটা লুকানোর পর চিহ্ন দিয়ে রেখেছে। কই?
আরও খুঁড়তে হবে, মারভিন বলল। নকশায় লেখা রয়েছে এক ফুট। হাতের লেখা তো। সেভেনকেও ওয়ানের মত লাগে অনেক সময় লেখার দোষে।
তারমানে সাত ফুট খুঁড়তে হবে! ঘাবড়ে গেল ডন। এত নিচে রাখতে গেল কেন? পাগলামি, স্রেফ পাগলামি!
যা-ই হোক, খুঁড়তে তো হবে, ইসাবেল বলল। তাড়াহুড়ো নেই আমাদের। আস্তে আস্তে খোড়ো।
তা তো বলবেই! ফুঁসে উঠল ডন। তোমাকে তো আর পরিশ্রম করতে হচ্ছে না!
কথাটা এড়িয়ে গেল ইসাবেল। বলল, দুটো শাবল আছে। একজন এজন করে না খুঁড়ে দুজনে মিলে একবারেই খোড়ো। সহজও হবে, তাড়াতাড়িও।
বুদ্ধি-পরামর্শ ওরকম অনেকেই দিতে পারে। যে করে সে বোঝে ঠেলা! দুজনে যে খুঁড়ব, যদি কারও মাথায় লেগে যায়? একজন একজন করেই করতে হবে।
সোজা হলো কিশোর। সঙ্গীদের ইশারা করল। যেমন এসেছিল তেমনি নিঃশব্দে আবার ভেনটিলেটরের কাছ থেকে পিছাতে শুরু করল ওরা।
এখানে থাকলে বরফ হয়ে যাব, কিশোর বলল। যা ঠাণ্ডা পড়ছে! নকল নকশা দিয়ে ছবিগুলো ওরা খুঁজে পাবে না। চলো, কোথাও গিয়ে বসে থাকি। ওরা বেরোক। চলে গেলে তারপর ঢুকব আমরা। ছবিগুলো বের করার চেষ্টা করব।
ঠিক আছে, মুসা বলল। কিন্তু বসবটা কোথায়? বাইরে থাকলে সত্যিই মরে যাব!
চোরের গাড়িতে বসব, নির্দ্বিধায় বলে দিল কিশোর। আর তো কোন জায়গা। দেখছি না। বাগানের গেটের কাছে গাছের নিচে গাড়িটা দেখেছি। দরজায় তালা না থাকলেই বাঁচি…।
তালা লাগানো নেই। প্রয়োজন বোধ করেনি চোরেরা। ওরা কি আর ভাবতে পেরেছে এই রাতের বেলা এসে কয়েকটা ছেলেমেয়ে ওগুলোতে ঠাই নেবে ঠাণ্ডার কবল থেকে বাঁচার জন্যে?
গাড়িতে উঠে বসল সবাই, রাফি সহ। ঠাণ্ডা থেকে রেহাই মিলল। চোরের ওপর বাটপাড়ি করতে পেরে খুশি লাগছে ওদের।
ঘুমাতে চাও? আরাম করে সীটে হেলান দিয়ে বলল জিনা। ঘুমিয়ে নিতে পারো। আমি পাহারায় থাকি।
রবিনের আপত্তি নেই। ঢুলতে শুরু করল। কিশোর আর মুসাও ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু মনে হলো, চোখ বোজার সঙ্গে সঙ্গেই ওদেরকে জাগিয়ে দিল জিনা। কিশোরের কাঁধ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, এই, জলদি ওঠো! ওরা আসছে!
চোখের পলকে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল ওরা। ডন তার দুই সঙ্গীকে আসতে দেখল। মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে তিনজনেরই। গরম গরম কথা বলছে।
হোরেস আমাদেরকে ফাঁকি দিয়েছে! ডন বলল।
না, তা হতে পারে না, মানতে পারল না মারভিন। কেন ফাঁকি দিতে যাবে? কাল রাতে আবার আসব। দরকার হলে পুরো সেলারটাই খুঁড়ে ফেলব।
ইস, কি শীতরে বাবা! ইসাবেল বলল।
গাড়িতে উঠে চলে গেল লোকগুলো।
যাক, গেল, কিশোর বলল। খেয়াল করেছ, শাবল-টাবলগুলো আনেনি। খালি হাতে বেরিয়ে এসেছে। তারমানে ওগুলো রয়ে গেছে সেলারে। আমাদের কাজ সহজ করে দিয়ে গেল।
সহজ? জিনা প্রশ্ন করল, ঢুকতে পারলে সহজ। ঢোকাটাই তো আসল সমস্যা।
পথ একটা ঠিকই বের করে ফেলব, হাল ছাড়তে রাজি নয় মুসা।
কিন্তু সেই একই ব্যাপার, দিনের মতই। দরজা জানালা সব বন্ধ। ঢোকার কোন পথ নেই। ভেনটিলেটর দিয়ে ঢাকা যেত, যদি শক্ত গ্রিল না থাকত। আর মাঝে যে ফাঁক রয়েছে, তা দিয়ে ঢোকা অসম্ভব।
দূর! হতাশ হয়ে গেল মুসা। হবে না! ফিরে যেতে হবে দেখছি!
ঠিক এই সময় একটা জিনিসের ওপর চোখ পড়ল রবিনের। চাঁদের আলোয় চকচক করছে। খোয়া বিছানো পথের ওপর পড়ে রয়েছে। নিচু হয়ে তুলে নিল জিনিসটা। একটা চাবি!
আরি! প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মুসা। চাবি! মনে হয় সামনের দরজার!
এটা এখানে এল কিভাবে? জিনার প্রশ্ন।
বড়ই কাকতালীয় ব্যাপার! চোরগুলো এনেছিল হয়তো, কিশোর বলল। পড়ে গেছে কোনভাবে। যাক, ভালই হলো। ঢোকাটা হয়ে গেল আমাদের।
চাবিটা নিয়ে প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল মুসা। তালার ফোকরে লাগিয়ে মোচড় দিতেই খুলে গেল। পিংক হাউসে ঢুকতে আর অসুবিধে হলো না ওদের।
ঝগড়া করার শাস্তি, রবিন বলল। ঝগড়াঝাটি না করলে, আর মাথা ঠাণ্ডা রাখলে চাবিটা যে পড়েছে টের পেয়ে যেত।
ভাল হয়েছে, কিশোর বলল। এসো, সেলারে ঢুকি।
নিচে নেমে প্রথমেই হ্যারিকেন দুটো জ্বালানো হলো। শাবল তুলে নিল মুসা। কিশোর বের করল নকশাটা। আসল নকশা। মিনিট দুই পরেই ঘরের পূর্ব দিকের। কোণায় খুঁড়তে আরম্ভ করল ওরা। মাটি ওখানটায় ঝরঝরে, শক্ত, জমাট হয়ে নেই। পালা করে খুঁড়তে লাগল কিশোর আর মুসা। মাঝে মাঝে জিনাও ওদেরকে সাহায্য করল। তবে তার গায়ে ছেলেদের চেয়ে জোর কম, তাই একটানা বেশিক্ষণ খুড়তে পারে না, হাঁপিয়ে যায়।
এক সময় বিড়বিড় করে বলল কিশোর, মাত্র এক ফুট। মুসা, চালিয়ে যাও। হয়ে এল বলে।
অবশেষে ঠং করে কিসে লাগল মুসার শাবল। উৎসাহ পেয়ে আরও তাড়াতাড়ি খুঁড়তে লাগল সে। বেরিয়ে পড়ল একটা টিনের ট্রাঙ্ক।
এরপরে ডালা তোলার পালা। বুকের কাপুনি বেড়ে গেছে ওদের। সবাই ঝুঁকে এল ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে।
কয়েকটা রঙিন ক্যানভাস রোল পাকিয়ে বেঁধে রেখে দেয়া হয়েছে। একটা তুলে সাবধানে মেলে ধরল কিশোর।
ছেলেদের মত শিস দিয়ে উঠল জিনা। চিনি ওটা! ইস্কুলের লাইব্রেরিতে একটা রেফারেন্স বইতে দেখেছি। ওটার নাম উয়োম্যান উইথ ওয়াটার লিলি। সাদা কালো ছবিও দেখেছি এটার, পত্রিকায়। চুরি হওয়ার খবর বেরিয়েছিল যখন, তখন ছেপেছিল।
খাইছে! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। এগুলোই তাহলে চোরাই পেইন্টিং। এখন শুধু গোবেল ভিলায় নিয়ে যাওয়া। তারপর পুলিশের হাতে তুলে দেবেন পারকার আংকেল।
ট্রাঙ্ক, ট্রাঙ্কটা ভীষণ ভারী, কিশোর বলল। বয়ে নিয়ে যেতে পারব না। সবচেয়ে ভাল হয়, বাগানে কোথাও লুকিয়ে রেখে গেলে। তারপর থানায় গিয়ে খবর দিতে পারব।
সেটাই ভাল হবে, হেসে বলল জিনা। এখন এসে ডন আর মারভিন দেখলে কি যে করত…
কি আর করবে? বলে উঠল একটা কণ্ঠ। তোমাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ দেবে। কারণ আমাদের কাজটা তোমরাই সেরে দিয়েছ। চাবিটার জন্যে ফিরে এসেছিলাম। পকেটে হাত দিয়ে দেখি, নেই। সেলারে আলো দেখে নামলাম। খুব ব্যস্ত ছিলে তো তোমরা, আমরা যে এসেছি, শোনোনি।
কথা বলছে মারভিন। তার পেছনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ডন। স্তব্ধ হয়ে গেছে গোয়েন্দারা। যখন ভাবছে, সফল হয়েছে, তখনই এল চরম ব্যর্থতা।
ঝট করে কথাটা মনে পড়ল জিনার। চোরগুলো যে এল, রাফি হুশিয়ার করল কেন? বুকের রক্ত ছলকে উঠল তার। দ্রুত চোখ বোলাল সেলারে। রাফি নেই!
আমার কুকুর! ককিয়ে উঠল সে। তাকে কি করেছেন আপনারা?
হেসে উঠল মারভিন। ওটা ঠিকই শুনতে পেয়েছে, আমরা যে এসেছি। কামড়ানোর চেষ্টাও করেছে। পারেনি। পিটিয়েছি।
কেঁদে ফেলবে যেন জিনা। মেরে ফেলেছেন! আমার রাফিকে মেরে ফেলেছেন! লাফ দিয়ে এগিয়ে গেল ডনের মুখে খামচি মারার জন্যে। খপ করে তার হাত চেপে ধরল লোকটা। মুসা আর কিশোর জিনাকে সাহায্য করতে এগোল। কিন্তু এক কথাতেই ওদের থামিয়ে দিল মারভিন, খবরদার! এক পা এগোলে মেয়েটার পেটে ছুরি মেরে দিতে বলব ডনকে!
তারপর দ্রুত ঘটতে থাকল ঘটনা। কিছু দড়ি পড়ে রয়েছে সেলারে। তুলে এনে ডন আর মারভিন মিলে বেঁধে ফেলল গোয়েন্দাদেরকে।
যাক, হলো, হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলল মারভিন, গোয়েন্দাগিরির শখ খানিকটা মিটবে। চালাকিটা ভালই করেছিলে, আমাদের নকল নকশাটা দিয়ে। তবে শেষ দিকে সন্দেহ হতে আরম্ভ করেছিল আমার। যাই হোক, সব ভালয় ভালয়ই শেষ হলো। তোমাদেরকে হ্যাপি নিউ ইয়ার জানাতে অসুবিধে নেই। হাহ হাহ হাহ! তোমাদেরকে যখন পাবে তোমাদের আত্মীয়-স্বজনরা, তখন সত্যি নতুন বছর এসে যাবে, আর আমরা অনেক দূরে চলে যাব। হয়তো আরও কিছুদিন থাকতাম এখানে, তোমরা যেতে বাধ্য করলে। যাব, কি আর করা। আসল জিনিসটা তো পেয়ে গেলাম। ডন, এসো। হ্যারিকেনগুলো নিয়ে নাও।
দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল সেলারের দরজা। বেরিয়ে গেছে চোরেরা। সাথে করে নিয়ে গেছে দামী ছবিগুলো।
.
১১.
প্রচণ্ড রেগে গেছে কিশোর। ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে রাফির জন্যে। লোকগুলো তাকে এ ভাবে বোকা বানিয়ে গেল, এটা সহ্য করতে পারছে না। গালমন্দ করছে নিজেকে মনে মনে। বেরোতে হবে! চিৎকার করে উঠল সে। বেরোতেই হবে, যে ভাবে হোক!
মুখ আটকে রেখে যায়নি আমাদের, জিনা বলল। তার মানে দরকার মনে করেনি। যদি আমরা গলা ফাটিয়ে চেঁচাইও, আমাদের চিৎকার কারও কানে যাবে না। রাস্তা থেকে অনেক দূরে রয়েছি। আর এত রাতে আসবেও না কেউ। নিউ ইয়ারের পার্টি নিয়ে সবাই ব্যস্ত।
হ্যারিকেনও নিয়ে গেছে! রবিন বলল ভীত কণ্ঠে। কিছু দেখারও উপায় নেই। চাঁদের আলো যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তাতে যদি কিছু করা যায়!
দেয়ালে ঘষে দড়ি যদি ছিঁড়তে পারি! মুসা বলল। দেখি সেই চেষ্টাই করে। এ ভাবে বাধা থাকতে একটুও ভাল্লাগছে না আমার!
কিন্তু যত ভাবেই ঘষুক, কিছুই করতে পারল না সে।
হঠাৎ কান খাড়া করে ফেলল জিনা। একটা গোঙানি শুনেছে মনে হলো। সেলারে নামার সিঁড়ি থেকে এসেছে শব্দটা।
রাফি! চেঁচিয়ে উঠল সে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মরেনি! আল্লাহ, রাফি মরেনি! বেঁচে আছে! আমার রাফি বেঁচে আছে!
তারপর শোনা পেল আরেকটা শব্দ। মরচে পড়া কজার ক্যাচকোচ। খুলে যাচ্ছে সেলারের দরজা।
লাগেনি! এবার চেঁচিয়ে উঠল মুসা। এত জোরে টান দিয়েছিল পাল্লাটা, লাগেইনি! আটকায়নি! ফাঁক হয়ে ছিল!
রাফি! রাফি! চেঁচাতে লাগল জিনা।
দরজা ঠেলে ফাঁক করে ঢুকে পড়ল রাফি। তিন লাফে কাছে চলে এল। জিনার গাল চেটে দিল। নাক ঘষতে লাগল মুখে।
আরে ছাড় ছাড়! জিনা বলল। ওসব পরেও করতে পারবি। আগে খোল তো। দড়িটা খোল পারলে।
রাফির বুদ্ধি আছে, ঠিক, কিন্তু হাত নেই। অত সহজে খুলতে সে পারে না। তবু চেষ্টার ত্রুটি করল না। প্রথমে কাপড় কামড়ে ধরে টেনে হিঁচড়ে জিনাকে বের করার চেষ্টা করল। পারল না। পারার কথাও নয়। এত ভারী একটা শরীর নেয় কি করে। ওসব বাদ দিয়ে দড়ি খুলতে পারে কিনা, সেই চেষ্টা করতে বলল তাকে জিনা। শেষে হাতের দড়ি কামড়াতে শুরু করল রাফি। এই কাজটাও সহজ নয়। মাঝে মাঝেই হাল ছেড়ে দেয়। আবার বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকে চিবাতে রাজি করাতে হয়। এমনি ভাবে চলল। শেষে জিনা যখন হতাশ হয়ে পড়ল, ভাবল আর হবে না, তখনই কেটে গেল দড়ি।
উল্লাসে চিৎকার করে উঠল সে। খুলে গেছে! খুলে গেছে! ইস, অবশই হয়ে গেছে! নড়াতেও পারছি না! জোরে জোরে বাঁধনের জায়গাগুলো ডলতে লাগল সে। রাফি! লক্ষ্মী ছেলে! কাজের কাজই করেছিস!
হাতের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়ে এল। পায়ের বাধন খোলার জন্যে দেরি করল না সে। গড়িয়ে চলে এল অন্যদের কাছে। কিশোর মনে করিয়ে দিল ছুরিটার কথা। দড়ি কেটে ফেললে খোলার চেয়ে সহজ হবে। ওর পকেটেই রয়েছে উপহার পাওয়া বহু ফলার ছুরিটা।
ছুরি বের করে তিন গোয়েন্দার দড়ি কেটে ওদের মুক্ত করতে বেশি সময় লাগল না জিনার।
তাগাদা দিল কিশোর। জলদি চলো। চোরগুলোকে ধরে ওদের কাছ থেকে ছবিগুলো আদায় করে নিতে হবে।
সেলার থেকে বেরিয়ে এল ওরা। সদর দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়ে গেছে। চোরেরা। তবে ঢুকতে অসুবিধে হলেও বেরোতে অসুবিধে নেই। জানালার ছিটকানি খুলে বেরিয়ে এল গোয়েন্দারা।
থানায় যাব? জিজ্ঞেস করল মুসা।
মিডলটনের থানা চিনি না, জিনা বলল। গোবেল বীচ বেশি দুরে না। ওই থানায়ই যেতে পারি। ওখানকার পুলিশও আমাদের চেনে। মিডলটন থেকে অর্ধেক দূরে তো চলেই এসেছি, আর অর্ধেক গেলেই হলো।
হ্যাঁ, একমত হলো কিশোর। তাতে সময়ও বাঁচবে। মিডলটনে গিয়ে থানা খুঁজে বের করতেও তো সময় লাগবে। চলো।
তবে বলা যত সহজ করা ততটা হলো না। ভীষণ ঠাণ্ডা রাত। ঘন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে চাঁদ। ফলে আলোও নেই। সাইকেল চালাতেও অসুবিধে। চলছে ওরা, চলছেই, তার পরেও পথ ফুরায় না। আস্তে আস্তে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল সবাই। রবিন বলেই ফেলল, অবাক কাণ্ড! এতক্ষণে তো গোবেল বীচে ঢুকে পড়ার কথা!
পথ হারাইনি তো? দুশ্চিন্তাটা প্রকাশ করে ফেলল মুসা। দাঁ
দাঁড়াও তো, কিশোর বলল। একটা সাইনবোর্ড মনে হচ্ছে।
সাইকেল থেকে নামল সবাই। সাইনবোর্ডই। তবে লেখা পড়া গেল না।
চৌরাস্তায় ভুল করেছি, চিন্তিত হয়ে বলল জিনা। আরেক পথে চলে এসেছি ভুল করে। ফিরে গিয়ে খুঁজে বের করা ছাড়া উপায় নেই।
ইস, একটা আলোটালো যদি পেতাম! বলেও সারতে পারল না রবিন, সামনে দেখা গেল হেডলাইট। দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল আলো দুটো। কাছে এসে ব্রেক কষল, টায়ারের আর্তনাদ তুলে থেমে গেল গাড়ি।
পুলিশের পেট্রোল কার। ভেতরে দুজন অফিসার। একজন ইন্সপেক্টর। আরেকজন সার্জেন্ট। টহলে বেরিয়েছে। লোকে পার্টিতে ব্যস্ত। অপরাধগুলো এ সময়ই বেশি হয় রাস্তায়, কারণ নির্জন থাকে পথঘাট। কড়া নজর রেখেছে দুই পুলিশ অফিসার। এত রাতে চোর-ডাকাত আশা করছে তারা, চারটে কিশোর-কিশোরী আর একটা কুকুরকে অবশ্যই নয়। ওদেরকে খুঁজতে যে পুলিশ আসেনি, নিশ্চিত কিশোর। কারণ বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ওরা বেশিক্ষণ হয়নি। এত তাড়াতাড়ি খোঁজ পড়ার কথা নয়।
পথ হারানোতে বিশেষ চিন্তিত ছিল না কিশোর। খুঁজে বের করতে সময় হয়তো লাগত, কিন্তু অসম্ভব ছিল না। তবু পুলিশ দেখে হাঁপ ছাড়ল।
ভালই হলো, ভাবল সে। গোবেল বীচে ফেরার পথ বাতলে দিতে পারবে। পুলিশ।
জিজ্ঞেস করার সময় পেল না সে। তার আগেই বেরিয়ে এল দুই পুলিশ অফিসার। কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল একজন, এই, এত রাতে কি করছ এখানে?
ইন্সপেক্টরের কণ্ঠস্বর পছন্দ হলোনা রাফির। গরগর শুরু করল সে।
সরাও ওটাকে! চুপ করাও! ধমক দিয়ে বললেন পুলিশ অফিসার। চেহারাটা তো বিটকেলে!
প্রতিবাদ জানাল জিনা। তার রাফি এত খারাপ হতেই পারে না। কিন্তু মানতে রাজি নয় ইন্সপেক্টর। মেজাজ ভাল নেই তার। রেগে আছে। এই রাতে ডিউটি দিতে ভাল লাগছে না। সবাই বসে বসে বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে নিউ ইয়ারের আনন্দ করবে, আর তাকে ডিউটি দিতে হবে, এটা মেনে নিতে পারছে না কিছুতেই।
দেখো, ভদ্রভাবে কথা বলো! আবার ধমক দিল সে। আদব-কায়দা শেখোনি নাকি? ভুরু কুঁচকে তাকাল কিশোরের দিকে। আমার প্রশ্নের জবাব কিন্তু দাওনি। এত রাতে এখানে কি করছ?
গোবেল বীচে যাচ্ছি, জবাবটা দিল জিনা।
বানিয়ে বলার আর জায়গা পাওনি! গোবেল বীচ কি উল্টোদিকে নাকি?
পথ ভুল করেছি। সেটা যখন বুঝলাম, আপনারাও চলে এলেন।
তাই? কোত্থেকে এসেছ?
গোবেল বীচ, জানাল রবিন।
দেখো, ফালতু কথা বলবে না আমার সঙ্গে! গোবেল বীচ থেকে গোবেল বীচে যায় কি ভাবে? আর এই রাতের বেলা, এত ঠাণ্ডায়, নিউ ইয়ারের পার্টি ফেলে কোন ছেলেমেয়ে বেরোয়? ব্যাপারটা সুবিধের লাগছে না আমার।
গোবেল বীচ থেকে গোবেল বীচে যাওয়া যায় না, ব্যাখ্যা করে বোঝাল কিশোর। কিন্তু গোবেল বীচ থেকে এসে তারপর তো আবার ফেরত যাওয়া যায়। মিডলটনে গিয়েছিলাম আমরা। ফিরে চলেছি গোবেল বীচে।
তার পরেও সুবিধের লাগছে না, কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজি নন ইন্সপেক্টর। নিশ্চয় বাড়ি থেকে পালিয়েছ তোমরা।
যদি ভবঘুরে কিংবা জিপসি না হয়ে থাকে, সার্জেন্ট বলল। বিদেশীই লাগছে। জিপসি হলে অবাক হব না। কাপড়-চোপড়ের অবস্থা দেখেছেন, স্যার? ছেঁড়া, ময়লা। হাতে মুখে এত মাটি লাগল কোত্থেকে!
সেলারে মাটিতে গড়াগড়ি করে এলে এর চেয়ে ভাল অবস্থা আশাও করা যায় না।
দেখুন, মুসা বলল। আপনারা ভুল করছেন।
সাইকেলগুলো কিন্তু একেবারে নতুন! সন্দিহান হয়ে উঠেছে ইন্সপেক্টর। চুরিটুরি করে আনেনি তো?
দেখুন, বাজে কথা বলবেন না! রেগে গেল জিনা। দেখে কি চোর মনে হয় আমাদের? গোবেল বীচে কোথায় যাচ্ছি, জানেন? থানায়। একটা খবর দিতে।
বেশ, বেশ, বেশ! ব্যঙ্গ করার ভঙ্গিতে বলল সার্জেন্ট।- তা জানতে পারি কি, খবরটা কী?
অফিসারদের এহেন আচরণে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে কিশোরের। মাথা সোজা করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল সে, খবরটা হলো, এক বছর আগে হোরেস ট্রিমেইনি যে ছবিগুলো চুরি করেছিল, সেগুলো খুঁজে পেয়েছি আমরা। মাল সহ চোরগুলোকে আটক করতে হলে এটাই সুযোগ!
তাই নাকি? টেনে টেনে বলল সার্জেন্ট। তারপর হো হো করে হেসে উঠল। গালগল্প তো বেশ ভালই বলতে পারো। বই লেখার চেষ্টা করো না কেন? ভাল পারবে। এ সব কাহিনী পুলিশকে বিশ্বাস করাতে পারবে ভেবেছ?
করা না করা সেটা পুলিশের ইচ্ছে!
কিন্তু সত্যি বলছি আমরা! প্রায় চিৎকার করে উঠল রবি।
বেশি ঠাণ্ডা, ইন্সপেক্টর বলল। এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলাই মুশকিল। সাইকেলগুলো রেখে গাড়িতে এসে ওঠো। ওগুলো পরে তুলে নিয়ে যেতে পারব। পেনড়ল সেইন্ট জনে নিয়ে যাব তোমাদের। সেখানে তোমাদের আইডেনটিটি চেক করব। তোমাদের কথা কতটা সত্যি থানায় বসেই খোঁজ নিতে পারব। নেয়া সহজও হবে। সময় অবশ্য লাগবে। তবে নিয়মের বাইরে তো আর যেতে পারি না।
মরিয়া হয়ে চেঁচিয়ে উঠল মুসা, কিন্তু তাইলে যে বেশি দেরি হয়ে যাবে। অনেক দূরে চলে যাবে চোরেরা। আর তখন ধরা যাবে না ওদের। ছবিগুলোও যাবে।
আমাদেরকে এ ভাবে আটকানোর কোন অধিকার আপনার নেই, কিশোরও রেগে গেল। আমরা কোন অন্যায় করিনি। বরং পুলিশকে সাহায্যই করতে চাইছি।
শোনো শোনো, কথা শোনো, হাসতে লাগল ইন্সপেক্টর। কি ভাবো নিজেকে? শার্লক হোমস?
না, তা ভাবি না! আমার নাম কিশোর পাশা। বেড়াতে এসেছি গোবেল বীচের বিখ্যাত বিজ্ঞানী…
কঠোর কণ্ঠে নির্দেশ দিল সার্জেন্ট, যাও, গাড়িতে ওঠো!
প্রতিবাদ জানাল ছেলেমেয়েরা। আরও তর্ক করল। কোন কথাই শুনল না পুলিশ। কিছুতেই বোঝানো গেল না ওদের।
অনেক বকবকানি হয়েছে, ইন্সপেক্টর বলল। আর কিছু শুনতে চাই না আমি। ভাল চাইলে গাড়িতে ওঠো।
মুখ কালো করে গিয়ে গাড়িতে উঠল গোয়েন্দারা। তবে চুপ করে বসে থাকল না কিশোর। গাড়ি যখন চলছে, পকেট থেকে তার রুমালটা বের করে, কলম দিয়ে তাতে একটা চিঠি লিখল সে, অন্ধকারে কাপড়ের মধ্যে যতটা পারল। সেটা বাধল রাফির কলারে। সামনের সীটে বসে এ সবের কিছুই জানল না সার্জেন্ট কিংবা ইন্সপেক্টর।
পেনডল সেইন্ট জন থানার সামনে গাড়ি থামল। পেছনের দরজা খুলে অন্যদেরকে নামতে বলল কিশোর। রাফির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, বাড়ি চলে যাবি! সোজা বাড়ি! জিনাদের বাড়ি! বলেই ঠেলে বাইরে বের করে দিল কুকুরটাকে। পেছনে আলতো চাপড় দিয়ে আবার বলল, যা! বাড়ি!
এই কয়েকটা কথাই রাফির জন্যে যথেষ্ট। একবার ফিরে তাকাল কিশোরের মুখের দিকে। বোঝার চেষ্টা করল, সত্যিই যেতে বলছে কিনা। তারপর লেজ নাড়তে নাড়তে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। এত দ্রুত ঘটে গেল ঘটনাটা, দুই পুলিশ অফিসার থানায় ঢোকার আগে লক্ষই করল না যে কুকুরটা নেই।
আরে, সার্জেন্ট বললেন। কুকুরটা গেল কোথায়?
হাত নেড়ে ইন্সপেক্টর বললেন, যেখানে খুশি যাক। ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে এসো।
.
১২.
পেনডল সেইন্ট জন থানায় মাত্র দুজন পুলিশ পাহারায় রয়েছে, একজন কনস্টেবল, আরেকজন সার্জেন্ট। ছেলে-মেয়েদেরকে তাদের হাতে সোপর্দ করল ইন্সপেক্টর। মনে হয় বাড়ি থেকে পালিয়েছে, বলল সে। রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছিল। ওরা বলেছে গোবেল বীচ যাচ্ছে, কিন্তু সেটা উল্টো দিক। আরও কিছু গল্প বলল, বিশ্বাস করতে পারলাম না।
মুখ কালো করে জিনা বলল, বার বার একই কথা! কত বার বলব, বাড়ি থেকে পালাইনি! আর দল বেঁধে পালাতে যাবই বা কেন?
তোমাদের বাবা-মায়ের সাথে আগে কথা বলি, জানা যাবে। ততক্ষণ এখানেই থাকতে হবে তোমাদের। গোলমাল করবে না। রিপোর্ট লিখতে বসব এখন।
চারজন লোক বসে চারটে ফর্ম পূরণ করতে লাগল। চুপ করে বেঞ্চে বসে। একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল ছেলেমেয়েরা।
রাফি কোথায়? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল রবিন।
বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি! জবাব দিল কিশোর। পথে গলা থেকে রুমালটা খুলে পড়ে না গেলেই হয়। মেসেজ লিখে দিয়েছি পারকার আংকেলের কাছে, চুলে হাত বোলাল সে। অনেক দেরি হয়ে গেল!
হ্যাঁ, মাঝরাত, ঘড়ি দেখল মুসা। আংকেল কি ভাববেন কে জানে! তবে মেসেজ পাঠিয়ে ঠিক কাজই করেছ। আর কিছু করার ছিল না। এ রকম জরুরী একটা ব্যাপার…
কাছে এসে ওদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল পুলিশ। গোবেল ভিলায় ফোন করার পরামর্শটা জিনাই দিল। কিন্তু করা হলে দেখা গেল, লাইন ডেড। কি করে যে হলো, কিছুই বোঝা গেল না। অনেক সময় হয় এ রকম। সবচেয়ে কাজের জিনিসটা বিকল হয়ে যায় প্রয়োজনের সময়ে। নিউ ইয়ারের ছুটি শেষ না হলে আর মেরামত হবে না।
উত্তেজনা অসহ্য হয়ে উঠছে ওদের কাছে। প্রতিটি মিনিট যাচ্ছে, আর অস্বস্তি বাড়ছে ওদের। কারণ যতই সময় যাচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে চোরেরা। কমে যাচ্ছে ধরা পড়ার সম্ভাবনা।
দূরে গির্জায় ঘন্টা বাজিয়ে সময় ঘোষণা করা হলো। এই সময় বাইরে একটা গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ হলো। তারপর শোনা গেল দৃঢ় গমগমে কণ্ঠ।
আব্বা এসে গেছে! বলে উঠল জিনা।
ঘরে ঢুকলেন পারকার আংকেল। সাথে রাফি। নিজের পরিচয় দিলেন পুলিশের কাছে। তারপর ফিরলেন ছেলে-মেয়েদের দিকে।
মুখ লাল হয়ে গেছে ইন্সপেক্টরের, লজ্জায়, যখন বুঝল সত্যি কথাই বলেছে ছেলেমেয়েগুলো।
কড়া চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আংকেল, ব্যাপারটা কি, অ্যাঁ? স্টোররূম থেকে বেরোলে কখন? আমরা ভাবছি তোমরা খেলছ, আর এদিকে…রাফি ঠিকমত না গেলে তো…কিশোর, ব্যাপারটা কি, বলো তো?
বলার সুযোগ পেয়েছে, আর কি ছাড়ে সে। পরে আংকেল বাড়ি নিয়ে গিয়ে বকাবকি করুন আর যাই করুন, তখন চুপ করে থাকা যাবে না হয়। বলল, আংকেল, আরেকটা রহস্য সমাধানের চেষ্টা করছিলাম আমরা। দোকানের খেলনা চুরি আর পলিদের নীল ভালুক চুরির রহস্য…
শুরু থেকে গল্পটা বলে যেতে লাগল কিশোর। মাঝে মাঝে কথা জোগান দিল রবিন, জিনা আর মুসা। শুনে তো থ হয়ে গেল পুলিশেরা।
অসম্ভব! এক সময় আর থাকতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠল ইন্সপেক্টর। সব বানিয়ে বলছে ওরা!
আমার তা মনে হয় না, গম্ভীর মুখে বললেন পারকার আংকেল। ওরা মিথ্যুক নয়। মাঝেসাঝে এ রকম রহস্যে জড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছু রহস্যের সমাধানও করেছে। ওদের কথা বিশ্বাস করা উচিত। যা বলছে করা উচিত। অবিশ্বাস করে চুপ। করে থাকতে পারেন অবশ্য, পরে পস্তাবেন।
এই শেষ কথাটা ম্যাজিকের মত কাজ করল। হঠাৎ যেন সাড়া পড়ে গেল। পুলিশদের মাঝে। ফোন তুলে নিল একজন সার্জেন্ট। রেডিওতে পেট্রোল কারগুলোকে হুঁশিয়ার করতে ছুটল ইন্সপেক্টর আর আরেকজন সার্জেন্ট। মিনিট কয়েক পরেই ফিরে এল ইষ্ণপক্টর।
সাহায্য আসছে, জানাল সে। ফোর্স পাঠাতে বলেছি। বসে থাকলে চলবে না। বেরোতে হবে আমাদের। পারকার আংকেল আর ছেলেমেয়েদের দিকে ফিরে বলল, ডন হারভের বাড়ি চেনো কেউ? তাকে ধরতে পারলে বাকিগুলোকে ধরার ব্যবস্থা হতে পারে। কোথায় পাওয়া যাবে অন্যদেরকে হয়তো বলতে পারবে সে।
বেরিয়ে গেলেই মুশকিল, গম্ভীর হয়ে আছে সার্জেন্ট। ছেলেমেয়েদের কথা অবিশ্বাস করে সময় নষ্ট করেছে বলে এখনই অনুশোচনা আরম্ভ হয়েছে।
সেটা ভেবে বসে থাকলে তো আর চলবে না। চেষ্টা করতে হবে। আবার ছেলেমেয়েদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, চেনো?
না, বাড়িটা চিনি না, জবাব দিল কিশোর। তবে মিডলটনে থাকে, জানি। ওখানকার কাউকে জিজ্ঞেস করলেই চিনিয়ে দেবে। আমরা আসব আপনাদের সঙ্গে?
মানা করে দিল ইন্সপেক্টর।
তবে তাকে বোঝাতে পারল কিশোর, ওদেরকে সঙ্গে নিলে অনেক সুবিধে হবে। কারণ চোরগুলোকে ওরা চেনে, দেখেছে। চিনিয়ে দিতে পারবে।
আপনারা আপনাদের গাড়িতে যান, পারকার আংকেল বললেন। আমি ওদেরকে নিয়ে আসছি আমার গাড়িতে করে।
হেডকোয়ার্টারে আরেকটা মেসেজ পাঠাল ইন্সপেক্টর। মিডলটনে যাচ্ছে সে কথা জানাল। অনুরোধ করল ফোর্স যেন তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয় পেনড় সেইন্ট জনে।
রওনা হয়ে গেল দলটা। আগে আগে পুলিশের গাড়ি। পেছনে পারকার আংকেলের। তার সঙ্গে রয়েছে কিশোররা চারজন আর রাফি।
ব্ল্যাক ক্যাট কাফেতেও চলছে নিউ ইয়ারের পার্টি। বাইরে থামল দুটো গাড়ি। পুলিশের আগেই নেমে পড়ল কিশোর, ছুটে গেল সামনের গাড়িটার কাছে। ইন্সপেক্টরকে বলল, মালিকের ছেলে হ্যারিকে চিনি আমরা। যদি বলেন, আমি একাই গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসতে পারি ডনের বাড়িটা কোথায়। তাতে কেউ কিছু ভাববেও না, কারও নজরে পড়ার সম্ভাবনাও কম।
ঠিক আছে, রাজি হলো ইন্সপেক্টর। বুদ্ধিটা ভাল। ডনের পেছনে যে পুলিশ লেগেছে, এ কথা লোকে এখন না জানলেই ভাল। তাহলে সতর্ক করে দেয়া হবে তাকে।
মুসা বলল, কিশোর, আমার সঙ্গে হ্যারির খাতির বেশি। আমি যাই?
বেশ, যাও।
কাফেতে ঢুকে পড়ল মুসা। অনেক লোক। হ্যারিকে দেখা গেল ব্যস্ত হয়ে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ছোটাছুটি করছে। অনেক কষ্টে তাকে থামিয়ে কথা বলতে পারল মুসা! হ্যারি, চিনতে পারছ? আমি, মুসা। একটা কথা জানতে। এলাম। আচ্ছা, ডন হারভের বাড়িটা চেনো?
ডন হারভে? তার সঙ্গে তোমার কি সম্পর্ক? সে তো লোক ভাল নয়!
জানি। তবু তার সঙ্গে দেখা করা খুব দরকার।
অবাক হলেও সময় নেই বলে আর কোন প্রশ্ন করল না হ্যারি। বলল, হাই স্ট্রীটের গ্র্যান্ড কাফে চেনো? আচ্ছা। ওখানে গিয়ে বয়ের প্রথম গলিটায় ঢুকবে। চলে যাবে শেষ মাথায়। একেবারে শেষ বাড়িটাই। ওটা তার ভাইয়ের বাড়ি। ওখানেই থাকে ডন।
অনেক ধন্যবাদ তোমাকে, হ্যারি!
বেরিয়ে এসে পুলিশকে ঠিকানা জানাল মুসা। আবার চলল দুটো গাড়ি। বাড়িটায় পৌঁছে দেখা গেল, একটা জানালায়ও আলো নেই। দরজায় থাবা দিল। সার্জেন্ট। একটা জানালায় আলো জ্বলল। খুলে গেল দরজা।
খুলে দিয়েছে লম্বা, স্বাস্থ্যবান এক যুবক। অন্ধকারে পুলিশের পোশাক ঠিকমত দেখা যায় না। চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, কি চাই? কে আপনারা?
পুলিশ। ডন হারভে এখানে থাকে? এগোল ইন্সপেক্টর।
চমকে গেল লোকটা। আবার তাহলে বাধিয়েছে! হ্যাঁ, এখানেই থাকে…
ঘরে আছে?
নেই।
কখন গেল?
এই তো, ঘণ্টা দুই আগে এসে জিনিসপত্র ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম। বলল, বাইরে কোথায় নাকি একটা চাকরি পেয়েছে। ও এ রকম মাঝে মাঝেই আসে যায়। অবাক হইনি। তবে মনে হলো, এবার বেশ কিছুদিনের জন্যেই যাচ্ছে। জলপথেই যাবে মনে হলো। ওর কথায় বুঝলাম।
জিজ্ঞেস করেননি কোথায় যাচ্ছে?
না। এখন আর করি না। করলে সত্য জবাব দেয় না, খামোকা কি লাভ। তবে বেশ খুশি খুশি মনে হলো আজ। কি করেছে?
এখন বলা যাবে না। তবে সত্যি কথা বললেন, সেজন্যে ধন্যবাদ। বিরক্ত করলাম। গুড নাইট।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
পারকার আংকেলের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে নিল ইন্সপেক্টর আর সার্জেন্ট।
গোবেল বীচ বড় বন্দর নয়। দেশের ভেতরে বেশিদূর যাওয়ার মত ইন্টারনাল ফেরি যোগাযোগ নেই। সে-কথাই বলল ইনসপেক্টর, যেতে হলে ফিশিং বোটে করে যেতে হবে। কিংবা মোটর লঞ্চ। বলেই তো দিয়েছে, দেশের বাইরে চলে যাবে। ছেলেমেয়েরা শুনেছে সে-কথা। নিয়ে গিয়ে ছবিগুলো বিক্রি করে টাকা ভাগাভাগি করে নেবে।
হয়তো চলেই গেছে এতক্ষণে, নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে সার্জেন্টের।
না, তা বোধহয় যেতে পারেনি, কিশোর বলল। এতটা তাড়াহুড়ো তো দেখলাম না। ওরা নিশ্চয় ভাবছে আমরা এখনও সেলারেই আটকে রয়েছি। কাজেই ততটা সতর্ক হবে না।
আরও একটা ব্যাপার। এক মুহূর্ত চুপ থেকে, বলল সে, আমাদের জন্যে ওদের প্ল্যান বদলাতে হয়েছে। আজ রাতে যাওয়ার কথা ছিল না, আমরা বাদ। সাধলাম বলেই যেতে হচ্ছে। ধরা যাক, বোট আছে ওদের। তবে তাতে দুরে পাড়ি দেয়ার মত রসদ, নেই। সে-সব জোগাড় করে রওনা হতে সময় লাগবে। ট্যাংকে তেল ভরারও ব্যাপার আছে। আজ ছুটির দিন। সব কিছু বন্ধ। তেল জোগাড় করতেও অসুবিধে হবে ওদের, সময় লাগবে।
অবাক হয়ে কিশোরের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ইন্সপেক্টর। শার্লক হোমসই তুমি। তখন ওভাবে তোমাকে টিটকারি দেয়াটা উচিত হয়নি। মাথায় ঘিল আছে তোমার, সত্যি!
.
১৩.
আবার এসে গাড়িতে উঠল সবাই। পুলিশেরা পুলিশের গাড়িতে, ছেলেমেয়েরা পারকার আংকেলের গাড়িতে। দ্রুত ছুটল গোবেল বীচের উদ্দেশে। পিংক হাউসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেটা দেখিয়ে জিনা বলল তার আব্বাকে, চোরাই ছবিগুলো ওখানেই পেয়েছি। রাফি না থাকলে আর বেরোতে হত না আজকে আমাদের। এখনও ওখানেই আটকে থাকতাম।
গোবেল বীচে পৌঁছল ওরা। মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ। কোমল আলোয় ভাসিয়ে দিল পুরো বন্দর এলাকা। নানা রকম বোট রয়েছে জেটিতে। মোটর বোট, ফিশিং বোট, লঞ্চ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ভাসছে পানিতে। শান্ত পরিবেশ। সব কিছু চুপচাপ, শুধু ঢেউয়ের মৃদু ছলাৎছল ছাড়া। মাঝেসাঝে একআধটা বোট গায়ে গায়ে ঘষা লেগে ক্যাচকোচ করে উঠছে।
কোনখান থেকে শুরু করব? সার্জেন্ট জিজ্ঞেস করল।
জেটিতে দাঁড়িয়ে দুজন পুলিশ অফিসার, পারকার আংকেল আর ছেলেমেয়েরা ঘুরে ঘুরে তাকাতে লাগল। কিন্তু অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না।
তীর ধরে হেঁটে যাই, ইন্সপেক্টর বলল। কিছু চোখে পড়তে পারে।
আমরাও আসি, বললেন পারকার আঙ্কেল। ছেলেমেয়েদেরকে বললেন, শোনো, তোমরা গিয়ে গাড়িতে বসে থাকো।
আব্বা! আবদার ধরল জিনা। আমরাও আসি না! কি হবে?
না, জিনা, যা বলছি শোনো। তোমাদের আসা লাগবে না। বসে থাকো। আমরা আসছি।
পেনডল সেইন্ট জন থানায় রেডিওতে মেসেজ পাঠাল ইন্সপেক্টর। পুলিশ ফোর্স এসেছে কিনা জানতে চাইল। আসেনি শুনে বলল, এলে যেন তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয় গোবেল বীচ বন্দরে। তারপর হাঁটতে শুরু করল।
অন্ধকার ছায়ায় হারিয়ে গেল তিনটে ছায়ামূর্তি।
গাড়ির ভেতরে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকল গোয়েন্দারা। শেষে ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল জিনা, আব্বটা যে কেন আমাদের নিল না!
তাতে কি? কিশোর-বলল। আমরা তো আর কথা দিয়ে ফেলিনি যে গাড়িতেই বসে থাকব। বেরিয়ে গেলেই পারি। চলো, আমরাও খোঁজাখুজি করি, অন্য ভাবে।
না না! রবিন গুরুজনের কথা অমান্য করতে রাজি নয়। আজ রাতে এমনিতেই অনেক অন্যায় করে ফেলেছি, না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে। আর করতে চাই না।
হঠাৎ এই সময় ঘাউ ঘাউ করে উঠল রাফি। সামনের পা জানালার ওপর তুলে দিয়ে নাক বের করে দিল। তার ঘাড়ে হাত দিল কিশোর। রোম দাঁড়িয়ে গেছে কুকুরটার। ব্যাপার কি!
এই, চুপ করো তোমরা! সঙ্গীদের হুঁশিয়ার করল সে। রাফি নিশ্চয় কিছু টের পেয়েছে!
হালকা মেঘের ভেতরে ঢুকে গেছে আবার চাঁদ। জ্যোৎস্নার উজ্জ্বলতা অনেক কমে গেছে তাতে। সেই আলোয় দেখা গেল একটা আবছা মত ছায়ামূর্তি এগিয়ে। চলেছে, হাতে দুটো পেট্রোলের ক্যান।
ডনের মতই লাগছে! মুসা বলল ফিসফিসিয়ে। পারকার আংকেল আর পুলিশ। অফিসারেরা যে দিকে গেছে, তার উল্টো দিকে যাচ্ছে লোকটা।
কিছু একটা করা দরকার আমাদের! কিশোর বলল।
আবার মনে করিয়ে দিল রবিন, কিন্তু আংকেল তো এখানেই থাকতে বললেন!
তা বলেছেন। কিন্তু আমরা তো তার অবাধ্য হচ্ছি না। ধরা যাক, রাফি কিছুতেই গাড়িতে থাকতে রাজি হলো না। তাকে বের করে দিতে বাধ্য হলাম আমরা। ছাড়া পেয়েই একটা লোকের পেছনে ছুটল সে। আমাদেরকেও যেতে হলো, তাকে ফিরিয়ে আনার জন্যে।
মিথ্যে বলবে?
এখন কাজ উদ্ধার করা দরকার। সত্যি-মিথ্যে নিয়ে ভাবছি না।
দরজা খুলে দিয়ে রাফিকে নির্দেশ দিল সে। এক মুহূর্তও দেরি করল না কুকুরটা। তীরবেগে দৌড় দিল লোকটার পেছনে। সেলারের লোকগুলোর গন্ধ। ভোলেনি সে। ওদেরই একজন তাকে পিটিয়েছিল। জিনাদের বেঁধে রেখেছিল। প্রতিশোধ নেবে সে!
গাড়ি থেকে নেমে রাফির পেছনে ছুটল কিশোর।
এতই দ্রুত ঘটে গেল ঘটনাটা, কিছুই করার সুযোগ পেল না অন্য তিনজনে। বোকা হয়ে গেল যেন ওরা।
দেখতে দেখতে হারিয়ে গেল রাফি। কিশোরকে দেখা যাচ্ছে, অস্পষ্ট। দৌড়াচ্ছে। তবে শিগগিরই তাকেও আর দেখা গেল না।
দেখো, মস্ত ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে কিশোর, জিনা বলল। এটা বসে বসে দেখতে পারি না আমরা। চুপ করে থাকা উচিত হবে না।
গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ওরাও।
কি করতে চাও? মুসা জিজ্ঞেস করল।
যাব।
আমিও যাব। রবিন, তুমি বসে থাকো। আমরা না ফিরলে আংকেলকে বলবে।
বসে থাকার ইচ্ছে নেই রবিনের। ওদের সঙ্গে যেতে পারলেই বেশি খুশি হয়। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো গাড়িটা পাহারা দিতেই হবে, বিশেষ করে আংকেল যখন বলে গেছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চুপ করে গাড়িতে বসে রইল সে।
অনেক ভারী লাগছে ক্যানগুলো। হাত ধরে এসেছে। জিরিয়ে নেয়ার জন্যে ও দুটো নামিয়ে রাখল ডন।
এখনও বহুদূর! মরার বোটটা আরেকটু কাছে হলে কি হত! বিড়বিড় করে গাল দিল সে। আর ওই ব্যাটা মারভিন, নিজে কিছু করবে না! খালি আমাকে হুকুম দেয়! বসে বসে থাকে!
বেজায় ঠাণ্ডা পড়েছে। তার ওপর বোঝা বইতে গিয়ে যেন অবশ হয়ে গেছে আঙুলগুলো। মুখের কাছে এনে ফুঁ দিয়ে গরম করতে লাগল সে। জিরাতে পারল না বেশিক্ষণ। পিঠে এসে লাগল প্রচণ্ড আঘাত। সামলাতে না পেরে উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে।
উঠে দাঁড়ানোর আগেই ডান কাঁধে কামড় লাগল। চেঁচাতে শুরু করল ডন।
ছাড়বি না, রাফি, ধরে রাখ! চিৎকার করে বলল কিশোর– আমি আসছি!
মুহূর্ত পরেই পৌঁছে গেল সে। কামড় ছাড়ানোর জন্যে ধস্তাধস্তি করছে ডন। গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। তার বিপদের কথা জানিয়ে দিতে চায় যেন জেটির সবাইকে।
গড়াগড়ি করছে কুকুর আর মানুষ। কিশোর কি করবে ঠিক করতে পারছে না। এই সময় সেখানে পৌঁছে গেল মুসা আর জিনা।
এসেছ! ওদেরকে দেখে খুশি হলো কিশোর। ধরো ব্যাটাকে! আমি একলা পারতাম না। রাফি, ছেড়ে দে!
কামড় ছেড়ে সরে এল রাফি। উঠে বসল ডন। করুণ অবস্থা হয়েছে তার। আতঙ্কিত করে দিয়েছে তাকে অ্যালসেশিয়ানের বাচ্চা। ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে। কুকুরটার দিকে। তাকে যখন চেপে ধরল জিনা, মুসা আর কিশোর, বাধা দিল না সে।
চলো, গাড়ির কাছে নিয়ে যাই, কিশোর বলল। কিছু করতে চাইলে রাফি তো আছেই। এবার অ্যায়সা কামড় দিতে বলব, কথা শেষ করল না সে, ইঙ্গিতেই বুঝিয়ে দিল। পুলিশও আছে। ধরে প্যাঁদানি দিলেই সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসবে পেটের কথা।
উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে জিনা। অনেক বেশি শব্দ করে ফেলেছে। মারভিন আর ইসাবেল এখন বেরিয়ে না এলেই বাঁচি।
ঠিকই বলেছ! একমত হলো কিশোর। জলদি করা দরকার! হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল সে।
কিন্তু পারকার আংকেলরা কোথায় আছেন, কে জানে! অন্ধকারে তাদেরকে খুঁজে বের করব কি ভাবে?
তবে যতই সমস্যা আসুক, একটা না একটা সমাধান করেই ফেলবে কিশোর। উপায়ের অভাব নেই তার বুদ্ধির ভাণ্ডারে। বলল, চলো তো আগে গাড়ির কাছে যাই।
নিরাপদেই গাড়ির কাছে পৌঁছল ওরা। মারভিন বা ইসাবেল কোন বিপদ ঘটাল না। গাড়ির কাছে এসেই হর্ন টিপে ধরল কিশোর। তিনবার লম্বা, তিনবার খাটো, আবার লম্বা, আবার খাটো, এ ভাবে বাজাতে লাগল। এক ধরনের মেসেজ এটা। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার একই ভাবে বাজাল।
বাহ, সত্যি, কিশোর, তোমার তুলনা নেই! উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল মুসা। তিনটে লম্বা, তিনটে খাটো…এ তো এস ও এস। পুলিশ অফিসারেরা শুনলেই বুঝে যাবে কিছু একটা গড়বড় হয়েছে।
উৎকণ্ঠিত হয়ে আছে গোয়েন্দারা। দুশ্চিন্তা যাচ্ছে না কিছুতেই। হয়তো কানে যাবে পুলিশের, ছুটেও আসবে হয়তো, কিন্তু সময় মত আসবে তো? মারভিন আর আইরিনকে ধরতে পারবে? ওরা ঘুণাক্ষরেও যদি বুঝতে পারে, ডন ধরা পড়েছে, আসবে না আর। সোজা পালানোর চেষ্টা করবে। ডনের জন্যে নিজেদেরকে বিপদে ফেলতে রাজি হবে না কিছুতেই।
আরেকটা উপায় বের করা দরকার।
বুদ্ধিটা বের করল এবার জিনা।
.
১৪.
ডন, শোনো, জিনা বলল, একটা কাজ করলে বেঁচে যেতে পারো। অন্তত শাস্তি কম করাতে পারো। আমাদেরকে সাহায্য করতে হবে। বলে দাও, তোমার সঙ্গীরা কোথায় আছে, ছবিগুলো কোথায় আছে। পুলিশের কাছে তোমার পক্ষে সুপারিশ করব আমরা। আমার বিশ্বাস, সরকারী উকিলও তাই করবেন।
আর না বললে, কিশোর বলল, আবার কুত্তা লেলিয়ে দেব। রাফিকে যে পিটিয়েছেন সেই জেদ এখনও যায়নি…
এমনিতে যত বাহাদুরিই দেখাক, ডন খুব ভীতু! কুকুরের কামড় খাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইল না। তা ছাড়া ধরা যখন পড়েই গেছে, বললে যদি কিছু সুবিধে হয়, সেটা নেয়াই উচিত। আর দ্বিধা করল না সে। বলল, মারভিনের বৌ ইসাবেল। মোটর বোটে রয়েছে দুজনে। আমার জন্যে বসে আছে। জেটির শেষ মাথায় ছোট একটা খাড়িতে আছে বোটটা। আমি যখন বেরোচ্ছি, তখন ক্যানভাসে মোড়াচ্ছিল ছবিগুলো। ফুয়েল ট্যাংক একেবারে খালি। তাই আমাকে পাঠিয়েছে তেল নিয়ে যেতে।
গুড। খুশি হলো কিশোর। তারমানে আটকা পড়েছে ওরা!
মোটর বোট! অবাক লাগল মুসার। তারমানে বেশি দূরে যেতেন না আপনারা?
না। কাছেই একটা বড় বন্দর আছে। সেখানে যাবে ঠিক করেছিল মারভিন। ওখানকার অনেককে চেনে সে। বড় একটা বোটের মালিক আছে, যে তার বন্ধু। তার বোটে করে দূরে কোথাও চলে যেতাম…
ওই যে, আংকেল এসে গেছেন! আনন্দে চিৎকার করে উঠল রবিন।
পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে ছুটে আসছেন তিনি। কি, হচ্ছেটা কি? কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ও, তাহলে আমার কথা শোনোনি! গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিলে! ডনের ওপর চোখ পড়তে জিজ্ঞেস করলেন, এই লোক কে?
ওর নাম ডন হারভে, আব্বা, জিনা জানাল। রাফি ধরেছে।
একটা মুহূর্ত দেরি করল না দুই পুলিশ অফিসার। লোকটাকে প্রশ্ন শুরু করল। করে গেল একনাগাড়ে। জবাব দিতে দিতে হাঁপিয়ে গেল ডন। ছেলেমেয়েদের যা বলেছিল, সেই একই কথা বলতে হলো আরেকবার। জানাল, কোথায় মোটরবোট নিয়ে অপেক্ষা করছে মারভিন আর তার স্ত্রী। এই উত্তেজনার মুহূর্তে ছেলেমেয়েদেরকে বকতে ভুলে গেলেন পারকার আংকেল। ওদের সঙ্গে আসার কথা বারণ করতেও মনে রইল না। কাজেই ওরাও চলল পুলিশের সাথে।
এই সময় পৌঁছে গেল বাড়তি ফোর্স। বড় কালো একটা গাড়ি এসে থামল। নামল ছয়জন পুলিশম্যান। তারাও চলল সঙ্গে।
নীরবে চলল দলটা। কিছুদূর এগোনোর পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল ডন। হাত তুলে দেখাল একদিকে। ওই যে, ওখানে। …ওই তো, বোটটা, সাদা।
ম্লান জ্যোৎস্না। তার ওপর বোটটা সাদা হওয়ায় ভালমতই দেখা যাচ্ছে ওটা। সাগরের পানির রঙ এখন কালচে।
ঠিক এই সময় চালু হয়ে গেল বোটের ইঞ্জিন। বেড়ে গেল গর্জন। খোলা সাগরের দিকে রওনা হয়ে গেল বোট। নিশ্চয় পুলিশকে দেখে ফেলেছে মারভিন আর ইসাবেল। পালাতে চাইছে। উন ধরা পড়েছে কিনা জানার কথা নয় ওদের। ওর জন্যে নিশ্চয় একটুও ভাবেনি, তাহলে এ ভাবে রওনা দিত না। আরও একটা ব্যাপার, জানে, ট্যাংকে তেল খুব কম। সাগরে গিয়ে যে কোন মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে ইঞ্জিন। সেই পরোয়াও করেনি। তবে তাদের এই আচরণে অবাক হয়নি কেউ ও রকম চোরের কাছে এর চেয়ে বেশি আর কি আশা করা যায়?
কোস্টগার্ডকে সতর্ক করে দেয়া দরকার! বলল সার্জেন্ট।
কিন্তু তাতে সময় লাগবে, ইন্সপেক্টর বলল ওরা কিছু করার আগেই পালিয়ে যাবে চোরগুলো। কি একখান জোড়া, আহা! স্বামীও চোর, বৌটাও চোর! মিলেছে!
আরেকটা বুদ্ধি এসে গেল কিশোরের মাথায়। এ রকম জরুরী অবস্থায় একের পর এক আইডিয়া খেলে যায় তার মাথায়। ওই যে দেখুন, আরেকটা বোট! তেরপল নেই। ওটাতে উঠে যেতে পারব। ইঞ্জিনটা কোনমতে স্টার্ট নেয়াতে পারলেই পিছু নিতে পারব ব্যাটাদের!
কথাটা পছন্দ হলো ইন্সপেক্টরের। দেরি করল না। গিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়ল বোটে। তার পর পরই উঠল সার্জেন্ট আর পারকার আংকেল। গোয়েন্দারাও দাঁড়িয়ে রইল না, কিংবা কারও অনুমতির অপেক্ষায় রইল না। সোজা গিয়ে উঠে পড়ল।
তীরে দাঁড়ানো পুলিশম্যানদের ডেকে বলল সার্জেন্ট, তোমরা যাও! কোস্টগার্ড স্টেশনে গিয়ে জানাও ওদের। জলদি!
ইগনিশন কী নেই। চাবি ছাড়াই ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়ার কায়দা জানে সার্জেন্ট। হুইল ধরল ইন্সপেক্টর। রাতের ঠাণ্ডা বাতাস এসে লাগছে মুখে। কান খাড়া করে ফেলল রাফি ঢেউয়ের ছিটে এসে লাগছে, যেখানটায় লাগছে লবণ লেগে গিয়ে মোনতা হয়ে যাচ্ছে। চড়চড় করে চামড়া! কেয়ারও করল না গোয়েন্দারা। তাকিয়ে রয়েছে সাদা বোটটার দিকে। একটাই ভাবনা, কিছুতেই চোরগুলোকে পালাতে দেয়া চলবে না।
কিন্তু দুটো বোটের মাঝের দূরত্ব বাড়ছেই। ধরা কি যাবে না? পালিয়ে যাবে মারভিন আর ইসাবেল?
ভাবনাটাই গায়ে জ্বালা ধরায়। ইসি, রাফিরে! মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে কিশোরের। এত কষ্ট খামোকাই করলাম রে!
ভাবছ কেন? মনে করিয়ে দিল রবিন, ভুলে গেছ, ওদের পেট্রোল কম?
তাই তো! বলে উঠল মুসা। এ কথাটা তো মনে ছিল না!
এই দেখো, দেখো! চিৎকার করে বলল জিনা।
দেখার জন্যে চোখ বড় বড় করে ফেলল গোয়েন্দারা! সত্যিই তো! সাদা জিনিসটা বড় হচ্ছে!
ধরা যাবে! ধরা যাবে! চেঁচিয়ে উঠল রবিন, বলেছিলাম না, ধরা যাবে…
গেছে! কিশোর বলল, ব্যাটাদের পেট্রোল ফুরিয়ে গেছে! আর নড়তে পারবে না!
ঘটেছেও তা-ই। মোটর বোটের ট্যাংকে তেল শেষ। কিছুই করার নেই আর মারভিন এবং ইসাবেলের। চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থেকে পুলিশের হাতে ধরা দেয়া ছাড়া। আরেক কাজ করতে পারে। সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাতরে পালানোর। চেষ্টা করতে পারে। তবে এই ঠাণ্ডার মধ্যে সেটা হবে আত্মহত্যার সামিল। মরার চেয়ে জেলে গিয়ে বেচে থাকাও ভাল, কাজেই সেটা করতে গেল না ওরা।
গুলি না চালিয়ে বসে! ছেলেমেয়েদের জন্যে শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন পারকার আংকেল। ওদেরকে ছোট কেবিনটায় ঢুকে পড়তে বললেন তিনি। গোলাগুলি চললে ভেতরে কিছুটা অন্তত নিরাপদ।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও আদেশ পালন করল ওরা।
সাদা বোটের কাছাকাছি চলে এল পুলিশের বোট। মুখে হাত জড়ো করে চেঁচিয়ে বলল ইন্সপেক্টর, অ্যাই, সারেন্ডার করো! তোমাদেরকে গ্রেপ্তার করা হলো। কোন গোলমাল করবে না! হাত তুলে উঠে এসো!
গুলি হওয়ার আশঙ্কায় রইল ইন্সপেক্টর আর সার্জেন্ট। তৈরি হয়ে আছে দুজগেই। তবে তেমন কিছু ঘটল না। বোট দুটো গায়ে গায়ে লাগতেই নীরবে পুলিশের বোটে উঠে এল মারভিন। তারপর ইসাবেল। সঙ্গে সঙ্গে হাতকড়া পরিয়ে দিল সার্জেন্ট।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন পারকার আংকেল।
কেবিন থেকে সবই দেখল গোয়েন্দারা। হুড়াহুড়ি করে আবার ডেকে বেরিয়ে এল। হাসি ফুটেছে মুখে। ধরা পড়েছে চোরগুলো, আর পালাতে পারবে না।
ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করল মারভিনকে, ছবিগুলো কোথায়?
নিরীহ কণ্ঠে জবাব দিল মারভিন, ছবি! কিসের ছবি? যেন কিছুই জানে না। কি বলছেন বুঝতে পারছি না। আমরা তো সাগরে হাওয়া খেতে বেরিয়েছি। নিউ ইয়ারস…
ধানাই-পানাই রাখো! ধমক দিয়ে বলল ইন্সপেক্টর। ভেবেছ কিছু দেখিনি? পানিতে তখন ওটা কি ছুঁড়ে ফেললে?
ও, ওটা? একটা পোটলা। পুরানো কাপড়ের। বাতিল জিনিস। বোঝ না বাড়িয়ে ফেলে দিলাম।
চট করে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিল দুই পুলিশ অফিসার। তবে কি এত দামী জিনিসগুলো পানিতে ফেলে নষ্টই করে ফেলল মারভিন। তার পুরানো কাপড়ের। গল্প এক বর্ণ বিশ্বাস করেনি তারা। ফেলে দেয়ার আরেকটা খারাপ দিক হবে, ওদেরকে আর আটকাতে পারবে না। কারণ কোন অপরাধ প্রমাণ করা যাবে না। বোট নিয়ে রাতের বেলা খোলা সাগরে হাওয়া খেতে বেরোনো কোন অপরাধ নয়।
যেন সেটা বুঝেই জোর দিয়ে বলল মারভিন, ইচ্ছে হলে বোটে খুঁজে দেখতে পারেন।
খুঁজে দেখা হলো। জানে পাবে না, তবু না পেয়ে হতাশই হলো দুই অফিসার। ছবিগুলো বোটে নেই।
রাগে, ক্ষোভে পারলে কেঁদে ফেলে কিশোর। এত কষ্ট করে এসে শেষে এ ভাবে বিফল হবে! কিছুতেই মেনে নিতে পারল না সে। বলল, আমরা একবার খুঁজে দেখি!
খুব বেশি আত্মবিশ্বাস, তাই না? ইন্সপেক্টর বলল ওদেরকে। তবে রাজি হলো, বেশ, দেখো।
মারভিনের বোটে উঠে গেল গোয়েন্দারা। আতিপাতি করে খুঁজেও কিছু পেল না। কোন চিহ্নই নেই ছবিগুলোর।
ভাবছে কিশোর। এ হতে পারে না। কিছুতেই না! জীবন থাকতে এত দামী জিনিস হাতছাড়া করতে পারবে না মারভিনের মত চোর! তাহলে? নিশ্চয় বোটেই লুকিয়ে রেখেছে কোথাও কোথায়?
নিরাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে একটা সীটের ওপর বসে পড়ল মুসা। প্ল্যাস্টিকে মোড়া গদি। ওটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর, এই মুসা, সরো তো!
কী?
সরো!
উঠে দাঁড়াল মুসা।
প্রায় হুমড়ি খেয়ে এসে সীটের ওপর পড়ল কিশোর। হাত বোলাল প্ল্যাস্টিকের কভারে। যে রকম মসৃণ আর সমান হওয়ার কথা তেমন নয়। কিছু যেন রয়েছে। ভেতরে।
ঝুঁকে নিচে দিয়ে তাকাল সে। অ, এই ব্যাপার! কভারটা চিরে ফেলা হয়েছে। তারপর সেলাই করে দিয়েছে। আঙুল ঢুকিয়ে হ্যাঁচকা টানে সেলাইয়ের জায়গাটা ছিঁড়ে খুলে ফেলল সে। হাত ঢুকিয়ে দিল ভেতরে।
হ্যাঁ, আছে! বেশ কায়দা করে লুকিয়ে রাখা হয়েছে ছবিগুলো! সহজে বোঝার উপায় নেই যে ওখানে রেখেছে।
ছবিগুলো নিয়ে হাসিমুখে কেবিন থেকে বেরোল কিশোর। পেছনে তার দলবল।
হাঁ হয়ে গেল দুই পুলিশ অফিসার। ছেলেমেয়েগুলোর তারিফ করল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে। হাত মেলাল ওদের সঙ্গে। দুর্ব্যবহার করে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করল।
হুঁ, সবশেষে বলল, বুঝেছি। জিনিস ঠিকই ফেলেছে পানিতে। সাধারণ ক্যানভাস গুটিয়ে নিয়ে আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে ফেলে বোঝাতে চেয়েছে ছবিগুলোই ফেলেছে, ধোঁকা দেয়ার জন্যে। পড়েও গিয়েছিলাম ধোকাতে। কিশোরের কাঁধে হাত রাখল সে। আমাদের ইয়াং শার্লক হোমস না থাকলে পার পেয়ে গেছিল চোরগুলো আরেকটু হলেই।
.
খুব ধুমধাম করে নিউ ইয়ারস ডে পালন করা হলো সেবার গোবেল বীচ গাঁয়ে। আবার দাওয়াত এল পলিদের বাড়ি থেকে। পার্টির আয়োজন পলিই করেছে। ক্রিসমাস ডে-র পার্টিতে যারা যারা উপস্থিত ছিল, তাদের সবাইকে দাওয়াত করেছে। সে। আসল উদ্দেশ্য, গোয়েন্দাদের মুখ থেকে চোর ধরার রোমাঞ্চকর গল্প শোনা। খবরটা সকাল বেলায়ই মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে গোবেল বীচ আর আশপাশের গাঁয়ে।
দুপুর বারোটায় রেডিওর স্থানীয় খবরেও প্রচার করা হলো সংবাদটা। জানানো হলো, হোরেস ট্রিমেইনির দল ধরা পড়েছে, ছবিগুলোও উদ্ধার করা হয়েছে। কিশোরদের নাম বলা হলো। এমনকি রাফিও বাদ পড়ল না।
বাহ, চমৎকার! হেসে বলল পলির বাবা ডক্টর মরিস। পেপারেও বেরোবে সংবাদটা। ছবি সহ। কেমন লাগছে তোমাদের?
ভালই, জবাব দিল জিনা। তবে তারচেয়ে ভাল লাগছে চোরগুলোকে ধরতে পেরে, আর ছবিগুলো উদ্ধার করতে পেরে।
আর দারুণ একটা অ্যাডভেঞ্চারও করতে পারলাম, মুসা বলল। সেটাও মস্ত বড় পাওয়া।
ঠিক, একমত হলো কিশোর। মাঝে মাঝে এ রকম অ্যাডভেঞ্চার ভালই লাগে। ছুটি শেষ হতে হতে আরেকটা যদি পেয়ে যেতাম!
যেতেও পারি, হেসে বলল রবিন। ঠিক আছে নাকি কিছু! আমরা তো যেখানেই যাই, রহস্য নিজে নিজে এসে হাজির হয়!
কোইনসিডেন্স, পলি বলল। কাকতালীয় ঘটনা।
মাথা নেড়ে কিশোর বলল, আমি সেটা মনে করি না। আর রহস্য নিজে নিজে এসে হাজির হয়, এ কথাটাও ঠিক না। ঘটনা তার স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে। কারও চোখে ধরা পড়ে, কারও পড়ে না। গোয়েন্দার চোখে পড়ে যায়। আর এই জন্যেই। মনে হয়, গোয়েন্দারা যখন যেখানে থাকে, ঘটনাগুলো ঘটে।
ইনটেলিজেন্ট বয়! কিশোরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন ডক্টর মরিস। আমিও তোমার সঙ্গে একমত।
<