তাসের খেলা — রকিব হাসান
প্রথম প্রকাশ: ২০০২

০১.

মুসা আমান। দুষ্ট রাজা।

কি করে হলো?

তাসের খেলা খেলতে গিয়ে।

খেলাটা শুরু করার সময় ওরা জানত না কতটা বিপজ্জনক এই খেলা।

কিশোর জানলেও আঁচ করতে পারেনি। এতটা বিপদে পড়ে যাবে। কারণ জিপসিদের  কাছ থেকে সে যেটা শিখে এসেছে, সেটা নিছকই খেলা। দাবা-লুডু-কেরমের মত। যাতে শুধুই মজা। মোটেও বিপজ্জনক নয়।

গোড়া থেকেই বলা যাক।

গরমের ছুটি শেষ হতে তখনও হপ্তা দুই বাকি। বিরক্ত। রীতিমত বিরক্ত লাগছে এখন মুসা ও রবিনের।

গ্রীষ্মের দীর্ঘ সব দিন কাটানোর কোন উপায় নেই।

ছুটিতে পড়ার জন্যে যত বই রেখেছিল, সব শেষ। কম্পিউটার গেমগুলো হাজার বার করে খেলেছে। পরিবারের সঙ্গে দূরে বেড়ানোও হয়ে গেছে। নিরাপদেই কাটিয়ে এসেছে এবার। বিপত্তি বলতে শুধু কয়েক ডজন মশার কামড়। সাঁতার কাটা, বেজবল খেলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া, হই-হুঁল্লোড়, বনের মধ্যে চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে অলস সময় কাটানো, সব শেষ।

এখন আর কিছুই করার নেই। সময় এখন বড়ই একঘেয়ে। এ রকম থাকত না, যদি কোনমতে একটা রহস্য জোগাড় করা যেত।

কিন্তু রহস্যেরও যেন দুর্ভিক্ষ লেগেছে। পাওয়াই যায় না।

বাড়ির এক পাশের চত্বরে ভাঙা ম্যাপল গাছটার নিচে বসে আছে মুসা। রবিন। উঠে বসেছে গাছে। চেরা কাণ্ডের একটা ফালির ওপর।

কিছুদিন আগে বাজ পড়েছিল গাছটার মাথায়। ঠিক মাঝখান থেকে চিরে। দুভাগ করে দিয়েছে। দুটো দিক দুদিকে হেলে পড়ে ধনুকের মত বাকা হয়ে। আছে। দুটো ধনুক।

গোড়া থেকে খুঁড়ে তুলে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন মুসার আম্মা মিসেস আমান। কিন্তু জিনিসটা দেখতে এতই অদ্ভুত, ফেলতে মন চায়নি মিস্টার আমানের। তাঁর কাছে জিনিসটাকে একটা চমৎকার ভাস্কর্য মনে হয়েছে। বললেন, থাক না, যতদিন ওভাবে থাকে।

শুরুতে কয়েকদিন ওগুলোতে আরাম করে পা দুলিয়ে চড়ে বসেছে মুসা।

তবে এ ধরনের আরামেরও একটা সীমা আছে। এখন আর ভাল লাগে না।

 বরং মহা বিরক্ত।

গাছের গোড়ায় মাটিতে বসে আছে সে। ঘাস ছিঁড়ছে। একঘেয়েমি কাটানোর জন্যে মুঠো করে তুলে ছুঁড়ে মারছে রবিনের দিকে। বাগানের ঘাস ছেঁড়াটা ঠিক হচ্ছে না। জানে। কিন্তু চুপচাপ থাকতে ভাল লাগছে না। হাত দুটোকে ব্যস্ত রাখছে।

ঘাড়ের পেছনে সুড়সুড়ি লাগল মুসার। হাত দিয়ে টিপে ধরে একটা বড় কালো পিঁপড়ে তুলে আনল।

গাছের ডালে পা দোলাতে দোলাতে হাসল রবিন।

পিঁপড়েটা কোথা থেকে এসেছে বুঝতে অসুবিধে হলো না মুসার। ঘাস ছোঁড়ার প্রতিশোধ নিয়েছে রবিন। ডাল থেকে তুলে নিয়ে মুসার অগোচরে তার। ঘাড়ে ফেলেছে।

বিরক্ত কোরো না তো, ঘাড় ডলতে ডলতে বলল মুসা।

বরং বলো, এ সব করে বিরক্তি কাটাও তো, রবিন বলল।

এত একঘেয়েমীতে পেয়েছে, কথাবার্তাও দুজনের বিরক্তিকর লাগছে।

বাড়ি চলে যাই, রবিন বলল।

ওর দিকে আরেক মুঠো ঘাস ছুঁড়ে দিয়ে মুসা বলল, বাড়ি গিয়ে কি করবে?

জবাব দিতে পারল না রবিন।

ইস, কিশোরটাও সেই যে গেল, আসার আর নাম নেই, আফসোস করে বলল মুসা। ও থাকলে এত একঘেয়ে লাগত না। কোন না কোন উপায় একটা বের করেই ফেলত।

হ্যাঁ, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল মবিন। ছুটি শেষ না করে বোধহয় আর আসবেই না এবার।

আমাদেরও ওর সঙ্গে মনটানায় চলে যাওয়া উচিত ছিল। রকি পর্বতটা দেখে আসা যেত আরেকবার।

ভুল যা করার করে ফেলেছি। এখন আর ভেবে লাভ নেই।

কিছু একটা করা দরকার। উঠে দাঁড়াল মুসা। ওদের ব্লকের শেষ মাথার দিকে তাকিয়েই স্থির হয়ে গেল। একটা বাড়ির কোণে লোক জড় হয়েছে।

খাইছে! পুরানো জিনিস বিক্রি করছে মনে হয়, অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে রবিনের কাঁধ থেকে একটা কুটো তুলে নিয়ে ফেলে দিল মুসা।

মিস্টার কাকু-কাকুর বাড়িতে! অবাক হলো রবিন। জিনিসপত্র সব বেচে দিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে নাকি ও?।

জানি না তো। এইমাত্র দেখলাম।

প্রতিবেশী হিসেবে অতি জঘন্য কাকু-কাকু। কারও সঙ্গেই সদ্ভাব নেই। আর ছোটরা তো ওর দুচোখের বিষ।

গত শীতে মুসা গিয়েছিল কাকু-কাকুর বাড়িতে। পুরানো বাড়ি। কি যেন এক রহস্য লুকিয়ে রাখে বাড়িটা। দেখলেই গা ছমছম করে তার। পারতপক্ষে ওদিকে ঘেঁষতে চায় না। সেবার গিয়েছিল বিশেষ একটা কাজে। ক্যান্ডি বিক্রি করতে। লাভের টাকায় শীতে কষ্ট পাওয়া মানুষকে সাহায্য করার জন্যে।

দরজায় থাবা দিতেই কুত্তা লেলিয়ে দিল কাকু-কাকু। ভয়ঙ্কর একটা জার্মান শেফার্ড কুকুর আছে তার। বিশাল।

দৌড়ের অলিম্পিক রেকর্ড ভঙ্গ করল সেদিন মুসা। নইলে কুকুরের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হওয়া লাগত।

এ হেন কাকু-কাকু কি বিক্রি করছে ভেবে অবাকই লাগল তার। কৌতূহলটা দমাতে পারল না।

চলো তো দেখে আসি, বলেই লাফাতে লাফাতে ছুটল ড্রাইভওয়ে ধরে।

পেছন থেকে ডাকল রবিন। আরে দাঁড়াও দাঁড়াও। লোকটা ভীষণ পাজি…

কি বিক্রি করছে ও দেখতেই হবে আমাকে, পেছনে তাকিয়ে বলল মুসা। নির্যাতনের অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করলেও অবাক হব না। এই যেমন পিটিয়ে চামড়া ভোলার চাবুক, হাড় কাটার করাত, মাথায় পেঁচানোর কাঁটাতার। বিকৃত রুচির খুনী তো লোকটা। হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর লোকও হতে পারে।

মুসার রসিকতায় হাসল না রবিন।

কাকু-কাকুর সামনের চত্বরের সুন্দর করে ছাঁটা লন মাড়িয়ে ছুটল দুজনে। খোলা গ্যারেজের সামনে চার-পাঁচজন প্রতিবেশী। জিনিসপত্র ঘটছে।

চাবুক, করাত বা ও রকম কোন কিছুই দেখল না। অতি সাধারণ জিনিসপত্র। প্রথম টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়াল মুসা। শিকার ও মাছ ধরার ওপর পুরানো একগাদা ম্যাগাজিন। বেশ চকচকে একজোড়া পুরানো ফ্যাশনের জুতো। একটা টোল খাওয়া দূরবীন। ঝিনুকের মত দেখতে একটা অ্যাশট্রে।

দূর, ফালতু জিনিস সব!

দাম কত এটার? সোনালী ফ্রেমে বাঁধাই একটা তৈলচিত্র তুলে দেখাল এক জিপসি মহিলা। রক্তিম সূর্যাস্তের সময় পালতোলা নৌকার ছবি।

মহিলা কাকু-কাকুর প্রতিবেশী। নাম লীলা রেডরোজ। এ এলাকায় এসেছে খুব বেশি দিন হয়নি। এ-ও আরেক বিচিত্র চরিত্র। কারও সঙ্গে মেশে না। কথা বলে না। একা একা ঘরে বসে থাকে। তাই পড়শীরাও ওকে এড়িয়ে চলে। সেটাও আবার ওর ভাল লাগে না। ভাবে, তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। ছোটদের ধারণা, বাড়ি বসে থেকে নানা রকম জড়িবুটির গবেষণা করে বুড়ি। তুকতাকের বিদ্যে শেখে! প্রেতসাধনা করে।

একশো ডলার, হাকল মিস্টার কাকু-কাকু। গ্যারেজের ভেতরে আরাম করে ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছে সে। হলদে রঙের পাতলা দুই হাতের তালুতে মাথার পেছনটা এলিয়ে দেয়া।

মাথায় ঝাঁকড়া চুল। সব সাদা। ঠিক মাঝখানে সিঁথি। সাদা মস্ত গোঁফজোড়া দেখতে অদ্ভুত। দুই পাশ থেকে বিচিত্র ভঙ্গিতে বেরিয়ে রয়েছে কোনা দুটো। মুখটা আপেলের মত টকটকে লাল। কেমন চারকোনা।

সবচেয়ে অদ্ভুত ওর চোখ দুটো। শয়তানি ভরা। নীল। সারাক্ষণই যেন রাগে জ্বলে। আনমনে বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গে কথা বলে লোকটা। ক্রমাগত ভ্রুকুটি করে।

পরনে ঢোলা খাকি রঙের পাজামা। তাতে প্রচুর দাগ। গায়ে লাল টি-শার্ট। খাটো। ফুলে ওঠা ভুড়িটা পুরোপুরি ঢাকতে পারেনি।

টেবিলে কাত করে ছবিটা নামিয়ে রাখল রেডরোজ।

ভাল করে রাখুন। ভাঙলে কিন্তু আপনাকেই নিতে হবে, কাকু-কাকু বলল। খসখসে কণ্ঠ তার। চড়া স্বর। কক্ করে হাসল। মুরগী ডাকল যেন। লাফিয়ে উঠল তার সাদা গোফ।

পুরানো একটা রূপকথার বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিল রবিন। তাড়াতাড়ি বইটা নামিয়ে রেখে কনুই দিয়ে গুতো মারল মুসাকে। ফিসফিস করে বলল, চলো, কেটে পড়ি। যেমন কাকু-কাকু, তেমনি রেডরোজ। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে আমার।

গ্যারেজের ভেতরে একটা টেবিল চোখে পড়ল মুসার। এমন করে রাখা, প্রায় দেখাই যায় না। তাতে ডজনখানেক ছোট ছোট পুতুল। রবিনের কথা অগ্রাহ্য করে গ্যারেজে ঢুকে পড়ল সে। পুরানো র‍্যাকে রাখা ততোধিক পুরানো কতগুলো কোটের পাশ দিয়ে ঘুরে এগোল টেবিলটার দিকে।

কাছে যাওয়ার পর বুঝল, ওগুলো পুতুল নয়। বাতিদান। কালো কাঠ কুঁদে তৈরি করা হয়েছে রূপকথার ড্রাগন, এলভস জাতীয় নানা রকম দৈত্য-দানবের। প্রতিকৃতি।

একটা বাতিদান হাতে তুলে নিল সে। কল্পিত জীবটার অর্ধেক শরীর মানুষের, অর্ধেক ঘোড়ার।

পাশে এসে দাঁড়াল রবিন। বিচ্ছিরি। ইঁদুরের লেজের মত লম্বা লেজওয়ালা হোঁকা একটা মূর্তির দিকে হাত বাড়াল। এটা কোন জীব?

মুসা কিছু বলার আগেই ধমকে উঠল কাকু-কাকু। অ্যাই, ছেলেরা। কি চুরি করা হচ্ছে?

উঠে দাঁড়াল সে। জ্বলন্ত নীল চোখের দৃষ্টি দুজনের ওপর স্থির। দুই হাত কোমরে রেখে রাগত ভ্রুকুটি করতে থাকল।

হাত থেকে বাতিদানটা ছেড়ে দিল রবিন। তোতলাতে শুরু করল, না না, আ-আমরা কিছু চুরি করছি না।

আমরা শুধু দেখছিলাম, মুসা বলল।

ওগুলো ছোটদের জিনিস নয়, ক্রুদ্ধ স্বরে জবাব দিল কাকু-কাকু। যাও, বাড়ি যাও। অন্যের বাড়িতে ছেকছেক কোরো না এসে।

রাগ লাগল মুসার। কান গরম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিক্রির জন্যেই তো রেখেছেন এ সব।

বিক্রির জন্যে রেখেছি, চুরির জন্যে নয়…

দেখুন, আমরা চোর নই…

যাবে? নাকি ডাক দেব কুত্তাটাকে? কাকু-কাকুর চোখের ঠাণ্ডা নীল দৃষ্টি যেন বিদ্ধ করতে লাগল ওদের।

চলো, মুসার হাত ধরে টান দিল রবিন, লোকটা…পাগল!

দুটো টেবিলের মাঝখান দিয়ে বেরোনোর পথ। রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে রেডরোজ। মুসা তার পাশ কাটানোর সময় ধাক্কা লাগল। মুসার মনে হলো, তাসের খেলা ধাক্কাটা রেডরোজই দিল। সবতে গিয়ে পা পিছলাল মহিলা। পতন ঠেকানোর জন্যে মুসার শার্ট খামচে ধরল। ধমকে উঠল, এই, দেখে চলতে পারো না!

কিন্তু আপনিই তো ধাক্কা দিলেন…

চুপ! বেয়াদব ছেলে কোথাকার!

নাহ্, এদের সঙ্গে পারা যাবে না। সবগুলো উদ্ভট। নিজেই দোষ করে নিজেই ধমকাচ্ছে। কি কাণ্ড! হাল ছেড়ে দিল মুসা।

আর কোন অঘটন যাতে না ঘটে, সে-ব্যাপারে সতর্ক থাকল। সাবধানে বাইরে বেরিয়ে এল।

সোজা হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে এসে। পেছন ফিরে তাকাল না আর।

বাড়ি পৌঁছে দেখল রান্নাঘরের দরজা বন্ধই রয়েছে। তারমানে বাবা-মা এখনও ফেরেননি বাইরে থেকে। পকেটে হাত দিল চাবির জন্যে।

হাতে লাগল জিনিসটা।

বিস্ময় ফুটল চেহারায়।

ধীরে ধীরে বের করে আনল হাতটা।

 অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।

কি জিনিস? জানতে চাইল রবিন।

 রবিনের দেখার জন্যে হাতটা বাড়িয়ে দিল মুসা।

চারকোনা, আয়তাকার একটা বাক্স।

 রবিন বলল, তাসের বাক্স মনে হচ্ছে না?

নীরবে মাথা ঝাঁকাল মুসা। দরজা খোলার জন্যে চাবি বের করল পকেট থেকে।

কিন্তু এটা তোমার পকেটে এল কি করে? চোখের পাতা সরু করে মুসার দিকে তাকাল রবিন। চুরি করলে নাকি?

.

০২.

তাসের বাক্সর ওপরের লেখাটা জোরে জোরে পড়ল মুসা, ভয়াল তাস!

অবাক হয়ে মুসার দিকে তাকিয়ে আছে রবিন। কি বললে? খাওয়ার টেবিলের সামনে সাজানো চেয়ারে বসেছে দুজনে।

মুখ তুলে ওর দিকে তাকাল মুসা। ভয়াল তাস। বাক্সের গায়ে লেখা রয়েছে। এই দেখো।

ও এমনি লিখেছে। একটা নাম দেয়া দরকার তো। বিড়বিড় করল রবিন। কিন্তু চুরি করলে কেন?

চুরি করিনি।

কাকু-কাকুর বাড়ি থেকে আনোনি?

আগে যখন ছিল না পকেটে, মনে তো হচ্ছে ওখান থেকেই এনেছি, নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল মুসা।

চুরি করোনি! অথচ বলছ, ওখান থেকেই এনেছ… আচমকা চোখ বড় বড় হয়ে যেতে লাগল তার। তুড়ি বাজাল। ঠিক! বুঝে ফেলেছি!

ভুরু কুঁচকাল মুসা। কি বুঝলে?

 লীলা রেডরোজ! ইচ্ছে করে পড়েছিল তোমার গায়ের ওপর। কেন?

 ধীরে ধীরে হাঁ হয়ে যেতে লাগল মুসার মুখ। তারমানে….তারমানে…

হ্যাঁ, মাথা ঝকাল রবিন। চুরিটা সে-ই করেছে। আর পাচার করার বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছে তোমাকে।

তাতে ওর লাভটা কি?

বুঝতে পারছি না।

একটা মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল মুসা। তারপর বাক্সটা খুলল। কাত করে টেবিলের ওপর ঢালল তাসগুলো। ঘাটতে শুরু করল।

সাধারণত বাক্সের সব তাসের পিঠে এক রকম ছবি আঁকা থাকে। এ তাসগুলোর সে-রকম নয়। একেকটার পিঠে একেক ছবি। সেগুলো বিচিত্রও বটে। কোনটাতে মুখোশ পরা নাইট, কোনটাতে শয়তান-চেহারার কল্পিত বামন-মানব, কোনটা ড্রাগন, কোনটা বা শুয়োরমুখো মানুষ। আরও নানা রকম অদ্ভুত সব ছবি আঁকা রয়েছে তাসগুলোয়। কোনটা কোন জীব, কি নাম, ওপরে লেখা রয়েছে।

ভয়ঙ্কর সব ছবি, দেখতে দেখতে বলল মুসা।

ভালমত দেখার জন্যে কাত হয়ে এল রবিন। মুসা, তাসগুলো দেখে মনে হচ্ছে অতি প্রাচীন। নিশ্চয় অ্যান্টিক ভ্যালু আছে। কাকু-কাকু দাম নিশ্চয় অনেক বেশি চাইত। সেজন্যে চুরি করেছে জিপসি বুড়ি। তোমাকে দিয়ে পাচার করিয়েছে। তোমার কাছ থেকে নিতে আসবে, আমি শিওর। চোরাই মাল রাখা উচিত না। চলো, কাকু-কাকুকে ফেরত দিয়ে আসি।

হু। যাই। আর চোর ভেবে ক্যাক করে কলার চেপে ধরুক আমাদের। পুলিশে খবর দিক। গলা কেটে ফেললেও বিশ্বাস করবে না আমরা চুরি করিনি। লীলা রেডরোজও স্বীকার করবে না তখন। সব দোষ হবে আমাদের। কে যায়। ঝামেলায়…।

আচমকা গমগমে ভারী একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল পেছন থেকে, মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হও!

অস্ফুট চিৎকার করে উঠল রবিন। চমকে গেল মুসা। হাত থেকে তাসগুলো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।

অট্টহাসি ফেটে পড়ল কানের কাছে। কি, মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত?

আরি, তুমি! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। কখন এলে?

এই তো, ঘণ্টাখানেক হলো। তোমাদের বাড়িতে ফোন করে জানলাম তুমি এখানে। মুসাকে আর ফোন না করে চলেই এলাম।…তা কেমন চমকে দিলাম? মুখ থেকে একটা বড় সামুদ্রিক শামুকের খোসা সরাল কিশোর। মিনি লাউডস্পীকার। স্যুভনির। জিপসিদের কাছ থেকে কিনেছি।

স্বস্তির হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুসার মুখে। একেবারে সময়মত এসেছ। মনে মনে তোমাকেই চাইছিলাম আমি।

রহস্য নাকি?

রহস্য ঠিক বলা যাবে না। ঘটনাটা বেশ মজার। তবে ভেজালেও পড়তে পারি, বলা যায় না।

কি হয়েছে? ভুরু জোড়া কাছাকাছি হলো কিশোরের। তাসগুলোর ওপর। চোখ পড়তে জিজ্ঞেস করল, তাস নিয়ে বসেছ কেন?

এগুলোর কথাই তো বলছি, মুসা বলল।

চুরি করে এনেছে ও, মিটিমিটি হাসছে রবিন।

ভুরু জোড়া আরও কুঁচকে গেল কিশোরের। চুরি করেছে? তাস চুরি করতে গেল কেন?

ও নিজে করেনি। করানো হয়েছে।

এতক্ষণে আগ্রহ দেখা গেল কিশোরের চোখে। কি ভাবে করাল?

হাত তুলল মুসা। বসো। সব বলছি।

একটা তাস টেনে নিল কিশোর। বিস্ময় ফুটল চোখে। এ জিনিস পেলৈ কোথায়?

চেনো মনে হচ্ছে? কিশোরের অবাক হওয়া দেখে মুসাও অবাক।

বিমূঢ় ভঙ্গিতে মাথা আঁকাল কিশোর। হ্যাঁ, এবারই তো দেখে এলাম জিপসিদের কাছে। ওদের ছেলেমেয়েরা সংগ্রহ করে। সাধারণ তাসের মত খেলাও যায় না এ দিয়ে। খেলাটা ভিন্ন রকম। তবে মজার।

আগ্রহ বাড়ছে রবিনের। জানো নাকি কি ভাবে খেলতে হয়?

মাথা কাত করল কিশোর। শিখে এসেছি। আমাদের বয়েসী একটা জিপসি ছেলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার কাছ থেকে এক প্যাকেট তাস নিয়েও আসতে চেয়েছিলাম। আসার সময় আর মনে ছিল না।

চোখ চকচক করছে মুসার। কিছুক্ষণ আগের বিরক্তির ছিটেফোঁটাও নেই আর এখন চেহারায়।

দুষ্ট রাজা, পিশাচ নাইট, মানুষখেকো ড্রাগন এ সব নিয়ে খেলতে হয় খেলাটা, কিশোর বলল আবার। প্রচুর যুদ্ধটুদ্ধ করা লাগে। জাদু আছে। ব্ল্যাক ম্যাজিক আছে। কম্পিউটার গেমের চেয়ে কোন অংশে উত্তেজনা কম না। বরং কয়েকজনে মিলে খেলা যায় বলে মজা অনেক বেশি।

হাত বাড়াল কিশোর। দেখি?

মুসার হাত থেকে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল সে।

 কি ভাবে খেলতে হয় বলো তো? জিজ্ঞেস করল মুসা।

 বলে নয়, খেলেই দেখাব। কিন্তু আগে বলো, কোথায় পেলে এ জিনিস?

.

০৩.

মুসা আর রবিনের খিদে পেয়েছে। কিশোরও বাড়ি থেকে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে চলে এসেছে। খিদে রয়েছে তার পেটেও।

খেতে খেতে কথা হলো তিনজনের। তাসগুলো কি ভাবে পেয়েছে মুসা, সব জানানো হলো কিশোরকে।

উঠে গিয়ে রেফ্রিজারেটরের ডালা খুলল কিশোর। একটা কোকের ক্যান বের করে নিয়ে এসে বসল আবার আগের জায়গায়। রবিন আর মুসাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমরা?

তুমি খেতে থাকো, মুসা বলল। দরকার হলে আমরা বের করে নেব।

ক্যানের মুখটা খুলে খাওয়া শুরু করল কিশোর। পুরোটা শেষ করার আগে থামল না। খালি ক্যানটা নামিয়ে রাখল টেবিলে। মুসা আর রবিনের খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রইল।

ওদেরও খাওয়া শেষ হলো।

এবার শুরু করা যাক। তাসগুলো টেনে নিয়ে সব এলোমেলো করে দিতে লাগল কিশোর।

মুসার মুখোমুখি জানালার দিকে পেছন করে বসেছে রবিন। জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের রোদ আসছে ঘরে। কমলা আভা এসে পড়েছে দুজনের গায়ে। জ্বলছে যেন ওরা।

মুসা, লুডুর পাশা নিয়ে এসোগে তো কয়েকটা, কিশোর বলল। আছে? অন্তত চারটে পাশা দরকার।

থাকার তো কথা, উঠে দাঁড়াল মুসা। দেখি খুঁজে। পাই নাকি।

সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে ওপরতলায় উঠে গেল সে। ড্রয়ার, বাক্স ঘাটাঘাটি করে খুঁজে চারটে পাশা বের করে নিয়ে নিচে নেমে এল।

তাসগুলোকে চারটে সমান ভাগে ভাগ করল কিশোর। উপুড় করে রাখল সবগুলো।

পাশাগুলো কিশোরের সামনে টেবিলে ফেলে দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল মুসা।

 এই দেখো, চারটে ভাগে ভাগ করলাম তাসগুলোকে। আঙুলের টোকা দিয়ে প্রতিটি ভাগকে দেখিয়ে কোনটার কি নাম বলতে লাগল কিশোর, চরিত্রতাস, শক্তিতাস, কর্মস এবং ভাগ্যতাস। কোন চরিত্রে খেলবে, চরিত্রতাস থেকে প্রথমে সেটা ঠিক করতে হবে তোমাকে।

টেবিলের ওপর দিয়ে তাসগুলো মুসার দিকে ঠেলে দিল সে। নাও, একটা তাস টেনে নাও। যেটা ইচ্ছে।

মাঝখান থেকে একটা তাস টেনে নিল মুসা। উল্টে দেখল। রাজা! দারুণ তো! আমি রাজা!

আমি আগে টানলে আমিই রাজা হতাম, রবিন বলল।

মাথা নাড়ল কিশোর। উঁহু। তুমি ওটা না-ও টানতে পারতে। দেখা যেত, রাজা না টেনে গোলাম টেনেছ।

হাসল রবিন। এমনি বললাম। রাজা হবার কোন ইচ্ছেই আমার নেই।

রাজা হলেই যে খুব সাংঘাতিক কিছু হয়ে যাবে, তা-ও না, কিশোর বলল। একেবারে দুর্বল রাজাও বনে যেতে পারে মুসা। শক্তিতাসের ওপর নির্ভর করে অনেক কিছু। মুসার দিকে তাকিয়ে হাসল সে। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে শক্তি সামর্থ্য সব হারিয়ে আমাদের গোলামে পরিণত হয়েছ।

নামটা কি হবে সে-রাজার? ভুরু নাচিয়ে হাসল রবিন। গোলাম-রাজা। বাহ, সুন্দর একটা নাম আবিষ্কার করলাম তো। গোলাম-রাজা।

সেই স্বপ্নেই বিভোর থাকো, মুসা বলল। মনে রেখো, প্রথম সুযোগটা পাওয়া মাত্রই তোমাদের দুজনের মুণ্ডু কেটে ফেলার আদেশ দেব আমি।

ভ্রূকুটি করল রবিন। সামনে ঝুঁকে এল। তারমানে তুমি দুষ্ট রাজা?

খেলা খেলাই, জানিয়ে দিল মুসা। এখানে একজন আরেকজনকে হারানোটাই মূল কথা।

তাই বলে মুণ্ডু কেটে…তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি, মুসা।

ওদের ঝগড়াটা বাড়তে দিল না কিশোর। রবিনের দিকে চরিত্রতাসের গাদাটা ঠেলে দিয়ে বলল, নাও। তোমারটা তোলো।

চোখ বন্ধ করে একটা তাস টেনে নিল রবিন। উল্টে দেখেই আঁউক করে উঠল, দূর! গথ! হওয়ার আর কিছু পেলাম না যেন? হতাশা ঢাকতে পারল না সে।

রবিনের হাত থেকে তাসটা নিয়ে দেখতে দেখতে বলল কিশোর, এটাও কম শক্তিশালী নয়। এখানে গথ হলো একজন জাদুকর। যে ইচ্ছেমত তার দেহের রূপ পরিবর্তন করতে পারে।

কিছুটা উজ্জ্বল হলো রবিনের মুখ। জাদুকর? তারমানে আমার জাদু করার ক্ষমতা আছে?

আছেই, এ কথা বলার সময় হয়নি এখনও, জবাব দিল কিশোর। তবে ক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

মুসার দিকে তাকাল রবিন। ক্ষমতা পেলে রাজাকে ব্যাঙ বানিয়ে ফেলব আমি।

ব্যাঙের মত ডেকে উঠল মুসা। এত জোরাল আর বাস্তব শোনাল ডাকটা, চমকে গেল রবিন।

হা-হা করে হেসে উঠল মুসা। আহা, কি আমার জাদুকররে। বানাও আমাকে ব্যাঙ। এমন হাঁক ছাড়ব, ভয়ে বাপ-বাপ করে আবার মানুষ বানিয়ে দিতে পথ পাবে না।

কিশোরও হাসল। হাত তুলল। আচ্ছা, থামো এখন। প্যাচাল বাদ। খেলাটাই তো শুরু করতে দিচ্ছ না। এমন করলে বাদ দিয়ে দেব কিন্তু।

না না না, আর করব না। তাড়াতাড়ি বলে উঠল মুসা। অনেক দিন পর তোমাকে পেয়েছি তো। খুশিতে বাঁচাল হয়ে গেছি। কি করতে হবে বলো এখন?

চরিত্রতাসগুলোকে আবার শাফল করে নিজেরটা টেনে নিল কিশোর। উল্টে দেখে জানাল, আমি হলাম ক্রেল।

বুড়ো আঙুল আর মধ্যমার সাহায্যে তাসটা তুলে ধরে দেখাল সে। মুসা আর রবিন দুজনেই দেখতে পেল তাসের গায়ে আঁকা ছবিটা। অদ্ভুত এক বামন-জীব। মানুষের মত দেহ। মুখটাও মানুষের মত। কিন্তু নাকটা লম্বা। সামনের দিকে ঠেলে দেয়া। সরু একটা পাইপের মত। গোলাপী কানের ওপরের দিকটা চোখা। মাথায় একটা রোমশ লাল হ্যাট। হাতে ইয়া বড় ছুরি। ফলাটা বাকানো।

এই ক্রেল জিনিসটা কি? জানতে চাইল মুসা। ভাল না মন্দ?

সেটা নির্ভর করে অনেক কিছুর ওপর, জবাব দিল কিশোর।

ক্রেলের চেয়ে কি গথেরা বেশি শক্তিশালী? রবিনের প্রশ্ন।

সেটাও নির্ভর করে।

কিসের ওপর নির্ভর করে? জানতে চাইল রবিন।

বুঝতে পারবে একটু পরেই, শান্তকণ্ঠে জবাব দিল কিশোর। চরিত্র নির্বাচন হলো। এখন আমাদের শক্তি অর্জন করতে হবে। পাশা চালতে হবে! মুসা, চারটে পাশা একই সঙ্গে চালো। দেখা যাক কি ওঠে তোমার ভাগ্যে। পাশার এক ফোঁটা সমান একশো পয়েন্ট শক্তি।

আগের বারের কথা মনে আছে। রবিনকে অভিযোগ করার সুযোগ দিল না মুসা। তুমি আগে চালো।

কেন, ভয় পাচ্ছ? পয়েন্ট কম পেয়ে গোলাম হয়ে যাওয়ার?

আর দ্বিধা করল না মুসা। চারটে পাশাই তুলে নিয়ে হাতের তালুতে ঝাঁকিয়ে টেবিলের ওপর গড়িয়ে দিল। সবগুলোতেই পাঁচ কিংবা ছক্কা। হাত ওপরে তুলে। ঝাঁকি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সে, ইয়াহু! বিরাট ক্ষমতার অধিকারী এখন আমি!

রবিন আর কিশোরও পাশা চালল। দুজনের কারোরই তিনের বেশি উঠল না।

নাহ, গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল কিশোর, রাজাটা সত্যিই শক্তিশালী হয়ে গেল। রবিনের দিকে তাকাল সে। দুজনে একজোট হয়ে রাজার সঙ্গে লাগতে হবে এখন আমাদের। নইলে পারব না।

মুচকি হাসল মুসা। রাজা রাজাই। তাকে দমন করা অত সহজ না।

দেখা যাবে, চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করল কিশোর।

রাজারও ভুলে যাওয়া উচিত না, রবিন বলল, জাদুকরের চেয়ে শক্তিশালী কিছু নেই। যা খুশি করে ফেলতে পারে জাদুকর।

কথার লড়াই বাদ দাও না তোমরা, চেয়ারে হেলান দিল কিশোর। শক্ত হয়ে বসো। খেলাটা অনেকটা পুরানো গল্পের মত। গল্পের তিনটে চরিত্র আমরা। এখন চোখ বোজো। কল্পনা করতে থাকো, প্রাচীন যুগে রয়েছি আমরা। রাজা বাদশাদের যুগে। বনের মধ্যে বাড়ি। বনের কিনারে একটা দুর্গ।

রাজার দুর্গ! আমার! মুসা বলে উঠল।

তার কথায় কান দিল না কিশোর। গম্ভীর ভঙ্গিতে প্রায় ফিসফিস করে বলল, বনটা ভয়ানক বিপজ্জনক। অদ্ভুত সব প্রাণীর বাস ওখানে। মুখোশ পরা নাইট। মিউট্যান্ট যোদ্ধা। ক্রেল। গথ! মর্ড। জেকিল। বিষাক্ত উদ্ভিদ। নিষ্ঠুর শত্রুরা সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ায় বনের মধ্যে।

ভয় পেয়ে গেল মুসা। কিশোর, এমন করে বলছ, আমার গায়ে কাঁটা। দিচ্ছে।

থামল না কিশোর। কর্মসের গাদাটা মুসার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, তাস টানো। হাতে নিয়ে ওল্টাও। এরপর যা ঘটবে সামাল দেয়ার জন্যে তৈরি করো নিজেকে।

কি ঘটবে?

কিশোরের গম্ভীর মুখভঙ্গি, আবেগঘন ভারী কণ্ঠ, কালো চোখের স্থির দৃষ্টি ঘাবড়ে দিল মুসাকে। আগের মত হালকা নেই আর পরিবেশটা। কি জানি কেন মেরুদণ্ডের ভেতরে শিরশির করে উঠল তার।

সবচেয়ে ওপরের তাসটা টেনে নিয়ে উল্টে ফেলল।

হলুদ রঙের একটা মোটা বিদ্যুতের শিখা আঁকা রয়েছে ওতে।

তাসটা টেবিলের ওপর রাখল সে।

সঙ্গে সঙ্গে গুড়গুড় করে মেঘ ডাকল।

জানালার বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল।

 বাজ পড়ল বিকট শব্দে।

 খাইছে! চিৎকার করে উঠল মুসা।

 বাইরে তো উজ্জ্বল রোদ। বজ্রপাত হয় কি করে?

ছোঁ মেরে তাসটা তুলে নিল সে।

আবার মেঘের গুড়গুড়। বিদ্যুতের চমক। বজ্রপাত।

বিদ্যুতের আলোয় চোখে পড়ল একটা কুৎসিত, বিকৃত মুখ। বিচিত্র আলোয় সবুজ, কাঁপা কাঁপা দেখাচ্ছে। জানালার কাঁচে নাক ঠেকিয়ে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।

.

০৪.

চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল মুসা। ধাক্কা লেগে চেয়ারটা উল্টে পড়ল। মেঝেতে। ঠাস করে শব্দ হলো। আরেকবার চমকে গেল সে।

জানালার বাইরে বাজ পড়ল আবার। কাছেই কোথাও। বাড়ির দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল সে-শব্দ।

থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই আলোয় মুখটাকে দেখা যাচ্ছে এখনও।

কাকু-কাকু!

 জানালার কাঁচে নাক ঠেকিয়ে রেখেছে। গোল কুতকুতে চোখের দৃষ্টি ওদের ওপর স্থির। তারপর হাত তুলে রান্নাঘরের দরজাটা খুলে দিতে ইশারা করল সে।

চিৎকারটা যেন আপনিই বেরিয়ে এল মুসার মুখ থেকে। ও এখানে কি করছে?

ভারী দম নিল। দরজাটা খুলে দিতে এগোল সে।

টান দিয়ে খুলল দরজার পাল্লা। এই সময় প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল আবার। কেঁপে উঠল বাড়িটা। পেছনের সিঁড়িতে মুষলধারে আছড়ে পড়তে দেখল বৃষ্টির ফোঁটা। পেছনের আঙিনার বুড়ো গাছগুলো দমকা বাতাসের ঝাঁপটায় গুঙিয়ে উঠে নুয়ে নুয়ে পড়ছে।

মুহূর্তে এ ভাবে বদলে গেল কি করে আবহাওয়া? অবাক লাগল তার।

বৃষ্টির মধ্যে পিঠ কুঁজো করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল কাকু-কাকু। সাদা চুলগুলো ভিজে লেপ্টে গেছে মাথার সঙ্গে।

হলুদ রঙের একটা বর্ষাতি চাপিয়ে দিয়েছে তার টি-শার্ট ও পাজামার ওপর। বর্ষাতির গায়ে চকচক করছে বৃষ্টির ফোঁটা। চোখের পাতা সরু করে মুসার দিকে তাকাল সে।

আমি জানতাম এ বাড়িতেই থাকো তুমি, খসখসে, চড়া স্বরে কথা বলল কাকু-কাকু। ভেজা গোঁফ জোড়া বিচিত্র ভঙ্গিতে দুলে উঠল ঠোঁটের ওপর।

মুসার কাঁধের ওপর দিয়ে কিশোর আর রবিনের দিকে তাকাল সে। টেবিল থেকে উঠে এসে ওর পাশে দাঁড়াল রবিন।

তোমরাই তখন গ্যারেজে ঢুকেছিলে, তাই না? সন্দিহান দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল কাকু-কাকু। একটা তাসের প্যাকেট খোয়া গেছে ওখান থেকে। কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করল সে। কুতকুতে চোখের দৃষ্টি ঘুরে বেড়াচ্ছে মুসা আর রবিনের ওপর। তোমরা নিশ্চয় কিছু জানো না। তাই না?

রবিনকে মাথা ঝাঁকাতে দেখল মুসা। বুঝতে পারল সত্যি কথাটা বলে দিতে যাচ্ছে রবিন।

আমরা চোর নই, মিস্টার কাকু-কাকু! রবিন মুখ খোলার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল মুসা। এ কথাটাই তো জিজ্ঞেস করতে এসেছেন?

মোরগের মত মাথা কাত করে একপাশ থেকে তাকাল কাকু-কাকু। সত্যি জানো না?

বললামই তো আমরা চোর নই, মুসা বলল। আমরা আপনার তাস চুরি করিনি।

মাথা ঝাঁকাল কাকু-কাকু। চোয়াল ডলল। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। তার বর্ষাতিতে বাড়ি খেয়ে রান্নাঘরের মেঝেতে এসে পড়ছে পানি।

ঘরের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দিল সে। গলা লম্বা করে তাকাল মুসা আর রবিনের দিকে। মুখের কাছে মুখ চলে এল। পুদিনার গন্ধ তার নিঃশ্বাসে।

আশা করি সত্যি কথাই বলছ, দাঁতে দাঁত চেপে বলল সে। কারণ এ তাসগুলো খেলার জিনিস নয়।

ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেল মুসা। কিন্তু ভয়টা চেহারায় প্রকাশ পেতে দিল না। কাকু-কাকুর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কি বলতে চান আপনি? তাসের খেলা

আমি বলতে চাই, ওগুলো খেলনা নয়। ভয়ানক বিপজ্জনক।

আপনি…আপনি আমাদের ভয় দেখাতে এসেছেন, ঠিক না? কোনমতে বলল মুসা।

ভয়? ভয়ের দেখেছ কি? তারপর ফিসফিস করে অদ্ভুত সম্মোহনী কণ্ঠে বলল, ঠিক আছে, ভয় যখন পেতেই চাইছ, পাও ভয়! ভীষণ ভয়!

হলুদ বর্ষাতিটা ভাল করে গায়ের ওপর টেনে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল সে। হারিয়ে গেল প্রবল ঝড়ের মধ্যে।

বরফের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল মুসা। কানে বাজছে কাকু-কাকুর কথাগুলো। পাও ভয়! ভীষণ ভয়! নড়ে উঠল হঠাৎ। তাড়াতাড়ি দরজা লাগিয়ে তালা আটকে দিল।

ফিরে তাকাল কিশোরের দিকে। তাসগুলো টেবিলে দেখতে পেল না। লুকিয়ে ফেলেছে কিশোর। হাতটা টেবিলের নিচ থেকে বের করে আনল আবার সে।

অন্য সময় হলে হেসে ফেলত মুসা। এখন হাসল না। লুকালে কেন?

নইলে চোর ভাবত আমাদের। কোনমতেই বিশ্বাস করানো যেত না।

আমিও এ জন্যেই স্বীকার করিনি। কিন্তু তুমিও কি শুধু এ কারণেই ফেরত দাওনি তাসগুলো?

না, মাথা নাড়ল কিশোর। তাসগুলো আমাকে ভীষণ কৌতূহলী করে তুলেছে। সাধারণ খেলা মনে হচ্ছে না এখন আর। এর শেষ না দেখে আমি ছাড়তে চাই না।

কিন্তু পাও ভয়। ভীষণ ভয়, বলে কি বুঝিয়ে গেল লোকটা? চেয়ারে বসল মুসা। অভিশাপ দিল নাকি?

আরে দূর! অভিশাপ না কচু! খেলো তো…

রবিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই তাসের গাদার সবচেয়ে ওপরের তাসটা তুলে উল্টে ফেলল মুসা।

তাসটার বুক কালো রঙ করা।

আস্তে করে তাসটা রাখল টেবিলে।

মুহূর্তে দপ করে নিভে গেল ঘরের সমস্ত বাতি।

.

০৫.

 বাবাগো! বলে চিৎকার দিয়ে আরেকটু হলে চেয়ার থেকেই পড়ে যাচ্ছিল মুসা।

আরি, এমন করছ কেন? অন্ধকারে শোনা গেল রবিনের কণ্ঠ। ঝড়ের সময় এমন বিদ্যুৎ যেতেই পারে।

আ-আমার…তা মনে হয় না, কথা আটকে যাচ্ছে মুসার। বিদ্যুতের শিখা আঁকা একটা তাস তুলে নিলাম। অমনি বিদ্যুৎ চমকানো শুরু করল। এখন একটা কালো রঙ করা তাস তুললাম। আলো চলে গেল। রাতের মত কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেল।

চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল মুসা। দেয়ালের সুইচবোর্ডটা হাতড়াতে শুরু করল সে। কয়েকবার করে টিপল। খটাখট শব্দ হলো। কিন্তু আলো জ্বলল না।

থামো, মুসা, রবিন বলল। অকারণে ভয় পাচ্ছ। ঝড়ের সময় ইলেকট্রিসিটি যায়ই, আবার বলল সে। তার জন্যে এ রকম মাথা গরম করে ফেলার কিছু নেই।

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, এসো, অন্ধকারেই খেলি। দেখা যাক না কি হয়।

কিন্তু রাজি হলো না মুসা।

ডাইনিং রূমে গিয়ে ঢুকল। টেবিল থেকে মোমবাতি তুলে নিয়ে ফিরে এল। অন্ধকারে দিয়াশলাই বের করতে সময় লাগল। তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই। আবার টেবিলে তাসগুলোর ওপর ঝুঁকে পড়ল ওরা। মোমের কমলা আলোয় লম্বা ছায়া পড়ল রান্নাঘরের টেবিলটাতে।

আবার খেলা শুরু করা যাক, গম্ভীর কণ্ঠে বলল কিশোর। রবিন, একটা কর্মাস তুলে নাও।

একটা তাস টেনে নিল রবিন। মোমের আলোয় তুলে ধরল কি আছে দেখার জন্যে। আড়াআড়ি দুটো তরোয়াল আঁকা। নিচে একটা হেলমেট।

গথ জাদুবলে একদল সৈন্য সৃষ্টি করল এখন, কিশোর বলল। রাজার দুর্গ হামলার মুখে। নিজের দুর্গ থেকে বেরিয়ে গিয়ে রাজাকে পাশের অন্য রাজার আরেকটা দুর্গ দখল করে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে।

কি করে করব? জানতে চাইল মুসা।

বাইরে বিকট শব্দে বাজ পড়ল। জানালার কাঁচে আঘাত হানছে প্রবল বৃষ্টির ফোঁটা। বাতাসে কাত হয়ে যাচ্ছে মোমের শিখা। প্রায় নিভু নিভু হয়ে গিয়ে লাফিয়ে সোজা হয়ে যাচ্ছে আবার।

তোমাকেও একদল সৈন্য সৃষ্টি করতে হবে, মুসার প্রশ্নের জবাব দিল কিশোর। চারটে পাশা ঠেলে দিল টেবিলের ওপর দিয়ে। প্রতি ছয় ফোঁটার জন্যে একশো করে নাইট তৈরি হবে তোমার।

পাশাগুলো তুলে নিয়ে হাতের তালুতে রেখে ঝাঁকানো শুরু করল মুসা। কিশোর, নিয়ম-কানুনগুলো কি তুমি বানিয়ে নিচ্ছ ইচ্ছেমত?

না। এ ভাবেই এ খেলা খেলতে হয়। মনে মনে রাখতে হয় হিসেবটা। কঠিনই, টেবিলের ওপর অধৈর্য ভঙ্গিতে টোকা দিতে লাগল কিশোর। কথা না। বলে যা বলছি করে ফেলো না।…এত ঝাঁকানো লাগে নাকি? ফেলো ফেলো, পাশা ফেলো। পর পর তিনবার ফেলতে পারবে। তার বেশি না। এই তিনবারে। তোমাকে কম করে এক হাজার নাইট জোগাড় করতে হবে।

পাশাগুলো টেবিলে গড়িয়ে দিল মুসা। তিনটে চার আর একটা ছক্কা পেল।

মোট আঠারো পয়েন্ট, মোমের আলোয় পাশার ফোঁটাগুলো ভালমত দেখে হিসেব করল কিশোর। তারমানে তিনটে ছক্কার সমান। এবং তারমানে তিনশো নাইট জোগাড় হলো তোমার।

মাত্র তিনশো! হতাশ হলো মুসা। তবে মজা পেতে শুরু করেছে। আরও সাতশো সৈন্য…।

থেমে গেল সে। কথা শোনা যাচ্ছে। বহু মানুষের মিলিত কণ্ঠ। চাপা হাসি। একটা ঘোড়া ডাকল। চিৎকার। চেঁচামেচি।

বাইরে থেকে আসছে নাকি?

ঘুরে জানালার দিকে তাকাল মুসা। অন্ধকারে এমনিতেই কিছু দেখা যায় না। তার ওপর জানালার কাঁচে বৃষ্টির পানির পর্দা। দৃষ্টি ভেদ করে ওপাশে যেতে দিচ্ছে না।

শুনতে পাচ্ছ? ফিসফিস করে বলল সে।

ও কিছু না, রবিন বলল। গাছের মাথায় আঘাত হানছে বৃষ্টি আর বাতাস। কি সাংঘাতিক ঝড় শুরু হলোরে বাবা! একেবারে হঠাৎ করেই। একফোঁটা মেঘও তো জমতে দেখিনি।

হুঁ, আবার পাশা ফেলো, কিশোর বলল। আরও সৈন্য দরকার তোমার। মাত্র তিনশোজন নাইট নিয়ে একটা দুর্গ দখল করতে পারবে না তুমি।

আবার পাশা, গড়িয়ে দিল মুসা। বাইরের কথা শোনার জন্যে কান পাতল। কানে এল শুধু বাতাসের গর্জন আর বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ার একটানা শব্দ।

দপ দপ্ করে উঠে কাত হয়ে গেল মোমের শিখা। পাশাগুলো ভাল করে দেখার জন্যে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল তিনজনে।

মুসা পেল দুটো ছক্কা, একটা পাঁচ, একটা এক। আবারও আঠারো পয়েন্ট এবং তিনশো নাইট।

আরও চারখান ছক্কা জোগাড় করতে হবে, হেসে উঠল রবিন। আর পারবে বলে মনে হয় না। দেব নাকি রাজার ওপর জাদুর মায়া ছড়িয়ে?

তোমার দান এখনও আসেনি, কিশোর বলল।

চালো আবার। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। চার ছক্কা উঠেও যেতে পারে। কিশোর বলল। একজন অত্যন্ত শক্তিশালী রাজা বাস করে ওই প্রাসাদে। হাজারের কম নাইট নিয়ে ওর দুর্গ তুমি দখল করতে পারবে না। নাইট কম হলে গথের হাতে মারা পড়বে তুমি।

মারা পড়েই গেছি, বড়ই নিরাশ শোনাল মুসার কণ্ঠ। একসঙ্গে চারটে ছক্কা জীবনেও উঠবে না।

চারটে ছক্কা আছে যখন চারটে পাশায়, না ওঠার কোন যুক্তি নেই, আশ্বাস দিল কিশোর। মারো। যা হবার হবে।

একবার ঝাঁকি দিয়েই পাশাগুলো গড়িয়ে দিল মুসা।

ঠিক চারটে ছক্কা।

ইয়াহু! বলে আবার চিৎকার করে উঠল মুসা। দিলাম রাজার বারোটা বাজিয়ে! লাফিয়ে উঠে দুই হাত ছুঁড়তে শুরু করল সে।

প্রচণ্ড কানফাটা শব্দে ভেঙে পড়ল কি যেন। ক্ষণিকের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গেল মুসা।

পরক্ষণে একই সঙ্গে চিৎকার করে উঠল তিনজনে।

কিসের শব্দ? ভয়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেছে রবিনের।

কোন কিছু বিস্ফোরিত হলো বোধহয়, কান পেতে থেকে বিড়বিড় করল কিশোর। গাড়িও অ্যাক্সিডেন্ট করতে পারে।

রাগত কথার শব্দ শোনা গেল।

জোরাল চিৎকার।

তারপর তীক্ষ্ণ আর্তনাদ।

 সেই সঙ্গে আবারও চিত্তার। কেউ যেন কাউকে আক্রমণ করে বসল।

পরমুহূর্তে ধাতব জিনিসের ঘষাঘষি, ঠোকাঠুকির প্রচণ্ড শব্দ।

তরোয়াল?

আরও চিৎকার। গোঙানি। আর্তনাদ।

জানালার বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল মুসা। পলকের জন্যে। চোখ সরিয়ে ফেলল পরক্ষণে। যদি কিছু ঘটেই থাকে-কি ঘটছে দেখতে চায় না।

মনে হয় যুদ্ধ হচ্ছে বাইরে, কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল রবিন। উঁচুস্বরে বলতে সাহস পাচ্ছে না।

আ-আমার…আমার ভাল লাগছে না এ সব, মুসা বলল। খেলাটা বন্ধ করা দরকার।

কারও কথার অপেক্ষা না করে তাসগুলো সব একখানে জড় করতে শুরু করল সে। হাত কাঁপছে। সব তাসগুলো জড় করার পর একসঙ্গে ঠেলা মেরে সব। ঢুকিয়ে দিল বাক্সের ভেতর।

বন্ধ করে দিল বাক্সের মুখ।

মুহূর্তে ফিরে এল দিনের আলো।

খাইছে! এতক্ষণ অন্ধকারে থাকার পর তীব্র আলোয় চোখ মিটমিট করতে লাগল মুসা।

কি ঘটছিল এতক্ষণ? বিশ্বাস করতে পারছে না রবিন। গাল চেপে ধরেছে। একহাতে। তাসের বাক্সটা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার গেল কোথায়?

কাকতালীয় ব্যাপার, চোখের সামনে যা ঘটে গেল, সেটাকে অবিশ্বাস করতে পারছে না কিশোরও আর। একটা ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে চাইছে।

পায়ের শব্দ শোনা গেল।

 হল ধরে এগিয়ে আসছে। রান্নাঘরের দিকে। দ্রুত।

 ঘরে এসে ঢুকল কুৎসিত চেহারার এক বামন-মানব।

.

০৬.

চিৎকার করে উঠল রবিন।

লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল কিশোর। দুই হাত উদ্যত। বাধা দিতে প্রস্তুত।

লাফ দিয়ে দেয়ালের দিকে সরে গেল মুসা। বুকের মধ্যে হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে যেন।

 গোল মস্ত মাথাটা পেছনে ঝাঁকি দিয়ে হেসে উঠল বামন-প্রাণীটা। তীক্ষ্ণ, উচ্চকিত স্বর।

কালো কোঁকড়া চুল কাঁধের কাছে নেমে গেছে তার। খাটো করে ছাঁটা কালো দাড়ি। সবুজ চোখের মণিতে বন্য দৃষ্টি। লম্বা পাইপের মত নাক। গায়ে লোম ওঠা কালো উলের ফতুয়া। পরনে কালো চামড়ার প্যান্ট। পায়ে লোম বের হয়ে থাকা চোখামাথা বাদামী চটি।

আমি এখন মুক্ত! আনন্দে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল প্রাণীটা। ছোট ছোট হাত দুটো মাথার ওপর তুলে নাচাতে থাকল। পাখির মত স্বাধীন। অনেক ধন্যবাদ তোমাদেরকে। অনেক ধন্যবাদ।

এই, শুনুন শুনুন! চিৎকার করে বলল কিশোর।

কিন্তু থামল না বামনটা। আনন্দে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। টান দিয়ে রান্নাঘরের দরজা খুলল। হারিয়ে গেল বাইরের বৃষ্টিতে।

চেয়ারে নেতিয়ে পড়ল রবিন। একহাত দিয়ে গাল চেপে ধরে আছে এখনও। কিশোর নড়ল না। এখনও হাত দুটো উদ্যত। মুঠোবদ্ধ। বাধা দিতে প্রস্তুত।

ঘন ঘন ঢোক গিলে হৃৎপিণ্ডটাকে শান্ত করতে চাইল মুসা।

অবশেষে নীরবতা ভাঙল কিশোর। আনমনে মাথা নাড়তে নাড়তে বিড়বিড় করে বলল, ক্রেল। ওই জীবটা ছিল ক্রেল।

আবার ঢোক গিলল মুসা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। কিন্তু বাইরের কোন কিছু চোখে পড়ল না।

জীবটা দেখতে অবিকল চরিত্রতাসের গায়ে আঁকা ছবির ক্রেলটার মত, রবিন বলল।

তাই, না? তাসের বাক্সটার দিকে তাকাল মুসা। ঠিকই বলেছ। দেখতে ওরকমই।

বাক্সটা তুলে নিয়ে ঝাড়া দিয়ে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিল সে। পাগলের মত খুঁজতে লাগল তাসটা। কোথায় ওটা? কই গেল?

তাসগুলো সব উল্টে দেখল সে। কিন্তু ক্রেল আঁকা তাসটা পেল না। বামনটা নিয়ে গেল নাকি?

বেশি তাড়াহুড়া করে ফেলেছি, বিশ্বাস করতে পারছে না সে। নিশ্চয় আছে এখানেই।

সময় নিয়ে প্রতিটি তাস উল্টে দেখল সে। রাজা, মিউট্যান্ট বামন, তিন জেকিল, দুই গথ, মুখোশ পরা নাইট…।

কোথায়? কোথায় তুই? বেরো। বেরো বলছি, আনমনে বলছে আর আছাড় দিয়ে দিয়ে একেকটা করে তাস ফেলছে টেবিলে মুসা।

নেই! অবশেষে দুই বন্ধুর দিকে মুখ তুলে ঘোষণা করল সে। হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে ক্রেল-তাসটা।

ভ্রূকুটি করল কিশোর। হাত বাড়াল, আমি দেখি তো একবার।

তাসগুলো তুলতে গিয়ে হাত ফসকে একটা তাস মাটিতে পড়ে গেল।

 নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল মুসা।

একটা ড্রাগন আঁকা তাস।

বিশাল ড্রাগন। জ্বলন্ত চোখ। মাথাটা ওপরে তোলা। গর্জনের ভঙ্গিতে হাঁ করা মুখে ভয়ঙ্কর দাঁতের সারি। নাক দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে।

তাসটা দুই আঙুলে শক্ত করে চেপে ধরল সে।

 কানে এল ভারী পায়ের শব্দ। হল ধরে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে কে যেন।

.

০৭.

 খাইছে! ড্রাগন! দম আটকে আসতে চাইল মুসার।

তাসটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। ভয় দেখা গেল রবিনের চোখেও। চোখ বড় বড়। মুখ হা।

পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে গেছে কিশোর।

ড্রাগন আসছে! বিড়বিড় করে বলল মুসা। দরজার দিকে তাকাল।

মুসা? কিসের ড্রাগন? জিজ্ঞেস করল একটা পরিচিত কণ্ঠ।

রান্নাঘরে ঢুকলেন মুসার বাবা-মা। বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে। মিসেস আমানের ভেজা চুল থেকে গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মিস্টার আমানের নীল শার্ট ভিজে লেপ্টে গেছে গায়ের সঙ্গে।

না, কিছু না, , জবাব দিল মুসা। একটা খেলা খেলছি আমরা।

হাত কাঁপছে ওর। টেবিলের কিনার শক্ত করে খামচে ধরে রাখল, যাতে কাপুনিটা মার চোখে না পড়ে।

যাক তবু ভাল, বাড়িতেই আছিস, মা বললেন। আমি তো ভাবলাম হঠাৎ বৃষ্টি নামতে দেখে বেরিয়ে গেছিস বাইরে, ভেজার জন্যে। ঝাড়া দিয়ে পায়ের ভেজা স্যান্ডেল খুলে ফেললেন তিনি।

টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ালেন মিস্টার আমান। পাশের বাড়িতে কি হয়েছে জানিস? হই-চই শুনিসনি?

কি অবস্থা! মা বললেন। বেচারা হ্যামলিন…

কি হয়েছে, মা? জানতে চাইল মুসা।

হাত দিয়ে মাথা থেকে বৃষ্টির পানি ঝেড়ে ফেললেন মিস্টার আমান। ও, দেখিসনি। যা দেখে আয়গে অবস্থা। ভয়াবহ।

তোরা শুনিসইনি? ভ্রূকুটি করলেন মিসেস আমান। অবাক করলি আমাকে।

রান্নাঘরের পেছনের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল মুসা। ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলে বাইরে বেরিয়ে এল। তার পেছনে এল কিশোর আর রবিন।

বৃষ্টি থেমে গেছে। ভারী, কালো মেঘগুলো ছিঁড়তে আরম্ভ করেছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে শেষ বিকেলের সূর্য। ছুঁড়ে দিয়েছে রোদের বর্শা।

ভেজা ঘাস মাড়িয়ে কাঠের বেড়াটার কাছে ছুটে গেল মুসা। হ্যামলিনদের বাড়িটা চোখে পড়তেই দাঁড়িয়ে গেল।

বাড়ি না বলে বলা ভাল বাড়ির অবশিষ্ট।

 ধসিয়ে দেয়া হয়েছে।

সমস্ত জানালাগুলো ভাঙা। খড়খড়িগুলো ছড়িয়ে পড়ে আছে ভেজা মাটিতে। ধসে পড়ে গেছে একটা দেয়াল। ভাঙা ইটের ছড়াছড়ি। অর্ধেকটা ছাতও ধসে পড়েছে।

বাড়ির সামনে দিয়ে বেরোনোর রাস্তাটার ধারে পাতাবাহারের বেড়া। ভেঙে, মাড়িয়ে ভর্তা করে ফেলা হয়েছে। পাশের বাগানের ফুলগাছগুলো উপড়ানো। কাদার মধ্যে উল্টে পড়ে আছে ডাকবাক্সটা।

বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে নীরব দর্শকরা। সবাই হ্যামলিনের প্রতিবেশী। দুজন গম্ভীর পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথা বলছেন হ্যামলিন দম্পতি। দুজনেই উত্তেজিত। রাগত ভঙ্গিতে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছেন।

কি হয়েছে? একজন পড়শীকে জিজ্ঞেস করল মুসা। ঝড়ে করল নাকি এ কাণ্ড?।

কি জানি, অনিশ্চিত ভঙ্গিতে জবাব দিল মহিলা। হ্যামলিনরা বলল, ওদের ওপর নাকি হামলা চালানো হয়েছিল।

চমকে গেল মুসা।

মিস্টার হ্যামলিনের সীমানায় ঢুকল তিন গোয়েন্দা। জানালার কাঁচ মাড়িয়ে তার দিকে এগোনোর সময় তার কণ্ঠ কানে এল ওদের।

কোনও ধরনের সেনাবাহিনী! যেন ঘোরের মধ্যে কথাগুলো বলছেন মিস্টার হ্যামলিন। বিমূঢ় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছেন। ইউনিফর্ম পরা ছিল। মধ্যযুগীয় নাইটদের মত। ভোজবাজির মত উদয় হলো, আবার ভোজবাজির মতই গায়েব।

নাইট! নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না তিন গোয়েন্দা।

মিসেস হ্যামলিন ফোঁপাচ্ছেন। কি ভয়ানক! ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসেছিল ওরা। মাথায় লোহার হেলমেট। মুখ দেখতে পাইনি ওদের। ওরা…ওরা… কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি।

গলা জড়িয়ে ধরে স্ত্রীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন মিস্টার হ্যামলিন।

বাড়ি আক্রমণ করেছিল ওরা, পুলিশকে বললেন তিনি। মনে হলো যেন সিনেমা। শুনলে হয়তো পাগল ভাববেন আমাকে। কিন্তু সত্যি বলছি। ঘোড়ার পিঠে চড়ে নাইটেরা এসে আমাদের বাড়ি আক্রমণ করেছিল।

কুঁকড়ে গেল মুসা। গলা শুকিয়ে গেছে। ঢোক গিলতে পারছে না। পা দুটো। হঠাৎ করেই দুর্বল লাগতে শুরু করল।

সিনেমা নয় এটা। জানে সে।

এটা ওদের খেলার ফল। ভয়ঙ্কর তাসের খেলা।

খেলার মধ্যে সে ওর সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিল প্রতিবেশীর দুর্গ আক্রমণ করতে।

আর হ্যামলিনরা আক্রান্ত হয়েছে একদল ঘোড়সওয়ার হেলমেট পরা নাইটদের দ্বারা।

হঠাৎ করেই দুর্বল লাগতে লাগল মুসার। দুই হাতে মুখ ঢাকল। পেটের ভেতর পাক দিচ্ছে। সেটা থামার অপেক্ষা করতে লাগল।

কি করবে সে? নিজেকে প্রশ্ন করল। কি ব্যাখ্যা এর?

 হ্যামলিনদের সঙ্গে তর্ক করছে পুলিশ অফিসারেরা। বিশ্বাস করছে না।

কিন্তু মুসা করছে। তার মনে হচ্ছে পুরো দোষটা তার। তাসের খেলা খেলে এই সর্বনাশ করেছে পড়শীদের।

পাতাবাহারের একটা ঝাড়ের দিকে নজর পড়তেই ধড়াস করে উঠল তার বুক। ঘন ছায়ার ভেতর থেকে আলোয় বেরিয়ে এল একজন লোক।

মিস্টার কাকু-কাকু!

চোখে চোখ আটকে গেল দুজনের। শীতল কুটিতে কঠোর হয়ে আছে কাকু-কাকুর চেহারা।

এক পা পিছিয়ে গেল মুসা। প্রয়োজন হলেই যাতে দৌড় দিয়ে বাড়ি চলে যেতে পারে।

দ্রুত এগিয়ে এল কাকু-কাকু। লম্বা লম্বা পায়ে। ভেজা ঘাস মাড়িয়ে। পেছনে বাতাসে উড়ছে তার হলুদ বর্ষাতির কানা। বিশাল ভূঁড়ি নাচছে হাঁটার তালে তালে।

কিছু বলবে নাকি আমাকে, ইয়াং ম্যান? স্থির, কঠিন দৃষ্টিতে মুসার দিকে তাকিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বলল কাকু-কাকু। আমার হারানো তাসের বাক্সটা সম্পর্কে?

তারমানে কাকু-কাকু জানে সব। তাস খেলা হয়েছে বলেই যে হ্যামলিনদের বাড়িটা ধসে পড়েছে, জানে।

.

০৮.

কাকু-কাকুর কুতকুতে গোল চোখজোড়া যেন লেজার রশ্মির মত এসে বিদ্ধ করতে লাগল মুসার চোখকে। সাদা গোঁফের নিচে ঠোঁট দুটো নড়ছে। বিড়বিড় করে বলছে কিছু। গম্ভীর কুটিতে গভীর ভাঁজ পড়েছে চামড়ায়।

জোরে ঢোক গিলল মুসা। সত্যি কথাটা বলতে পারছে না। ভীষণ বিপদে পড়ে যাবে তাহলে। বলতে পারছে না তাসগুলো ওদের কাছে আছে।

হ্যামলিনের বাড়িটা ধ্বংসের জন্যে ওরাই দায়ী, সেটাও বলার উপায় নেই। বড় অনুশোচনা হচ্ছে।

কাকু-কাকুর পেছনে দাঁড়িয়ে ঘন ঘন মাথা নাড়ছে পুলিশ অফিসারেরা। প্রতিবেশীরা জটলা করছে এখানে ওখানে। নিচু স্বরে কথা বলছে। সবাইই মোটামুটি অবাক, এটুকু বোঝা যাচ্ছে।

না, আমার কিছু বলার নেই, কাকু-কাকুকে বলে দিল মুসা। গলা কাঁপছে! বুকের মধ্যে এত জোরে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা, মনে হচ্ছে গলার কাছে উঠে চলে আসবে। কাশি দিল সে। বড় করে দম নিল। নাহ, কিছু বলার নেই।

তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে ভেজা পিচ্ছিল ঘাসের ওপর দিয়ে দৌড়ানো শুরু করল।

পালাতে চায়। ব্যাপারটা নিয়ে শান্ত মাথায় ভাবতে চায়। কি করা উচিত বোঝা দরকার।

রবিন কিংবা কিশোরের জন্যে অপেক্ষা করল না সে। ফিরে তাকাল না ওদের দিকে।

নিজের বাড়ির নিরাপত্তার মধ্যে পৌঁছানোর আগে থামলও না। সোজা ওপরতলায় নিজের শোবার ঘরে এসে ঢুকল। দরজা লাগিয়ে দিল।

জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে। ঠাণ্ডা ঘামে ভিজে গেছে সারা দেহ। ধপ করে বসে পড়ল বিছানার কিনারে। মাথা ঘুরছে। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে।

চোখ বুজল। চোখের সামনে ভেসে উঠল তাসের বাক্সটা। ওপরে লেখা: ভয়াল তাস!

*

সে-রাতে কাকু-কাকুর স্বপ্ন দেখল সে।

সাদা পোশাক পরে আছে কাকু-কাকু। সাদা সুট, সাদা শার্ট, সাদা টাই। সব সাদা। ওর চুল আর গোঁফের মত সাদা।

হাত তুলল সে। গম্ভীর সম্মোহনী ভাষায় বলল: ভয় পাও, মুসা! ভীষণ ভয়!

তারপর ঘুরে দাঁড়াল দরজার দিকে। ট্রাফিক পুলিশের মত হাত তুলে সঙ্কেত দিতে লাগল।

স্বপ্নের মধ্যেই ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসল মুসা। নিজের বিস্মিত চেহারা নিজেই দেখতে পেল। স্বপ্নে সবই সম্ভব।

দরজার বাইরে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। নানা রকম শব্দ। ঘোৎ-ঘোৎ চিৎকার, জোরাল গোঙানি।

জোরে জোরে হাত নাড়তে শুরু করল কাকু-কাকু। মাথাটাকে পেছনে ছুঁড়ে দিয়ে মুখ ওপরে তুলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। ঝাঁকি খেতে থাকল তার কাঁধ ছোঁয়া চুল।

গটমট করে ঘরে ঢুকল ঝকঝকে ধাতব বর্ম পরা একজন নাইট। ঢোকার সময় তার চওড়া কাঁধ ঢাকা বর্ম বাড়ি খেল দরজার সঙ্গে।

খাইছে!…এই, যান, যান! চিৎকার করে উঠল মুসা।

স্বপ্নের মধ্যেও বুঝতে পারছে সে, স্বপ্ন দেখছে। গলা চিপে ধরেছে যেন ভয়। বর্ম পরা নাইটের পেছন পেছন আরও কতগুলো প্রাণীকে ঢুকতে দেখে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল সে।

গথ আর ক্রেল। লম্বা নাকওয়ালা বামন প্রাণী। মুখোশ পরা নাইট। শুয়োরমাথা মানবদেহী প্রাণী।

অদ্ভূত ভঙ্গিতে পেছনে মাথা ঝাঁকি দিতে দিতে চেঁচাতে শুরু করল প্রাণীগুলো। কোনটা লম্বা ডাক ছাড়ছে, কোনটা গোঙাচ্ছে, কোনটা বা গর্জন করছে জানোয়ারের মত।

এত চিৎকার! এত শব্দ! এত হট্টগোল! কান চেপে ধরল মুসা।

কিন্তু মনে শব্দ ঢোকা কোনমতে আটকাতে পারল না। তার ওপর মারামারি বাধিয়ে দিল প্রাণীগুলো। চেঁচামেচি আর হট্টগোল বেড়ে গেল আরও বহুগুণ।

বড় বড় ছুরি আর তরোয়াল তুলে একে অন্যকে লক্ষ্য করে কোপ মারতে শুরু করল ওরা। ধস্তাধস্তি করছে। বর্মধারীরা বুকের সঙ্গে বুক ঠেকিয়ে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করছে একে অন্যকে। তরোয়ালের আঘাত ঠেকাতে বর্ম বাড়িয়ে ধরছে সামনে।

ধস্তাধস্তি করতে করতে বিছানার ওপর এসে পড়ছে ওরা। তরোয়ানোর আঘাতে পর্দা কেটে যাচ্ছে। ডেস্কে রাখা জিনিসপত্র সব ছড়িয়ে ফেলছে মেঝেতে।

যুদ্ধরত একজন ক্রেল ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গিয়ে জানালার কাঁচের ওপর ফেলল একজন মুখোশধারী নাইটকে। ঝনঝন করে হাজারও টুকরো হয়ে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল কাঁচ। দেয়ালের কাগজ চিরে দিল তরোয়ালের আঘাত।

বেরোন! বেরোন! বেরোন! গানের সুরে চিৎকার করে উঠল মুসা।

বেরোল না ওরা।

বেরোন! বেরোন! বেরোন! আবার চিৎকার করে উঠল সে। চিৎকার করতে করতে জেগে গেল। থরথর করে কাঁপছে। সারা শরীর ঘামে ভেজা। শার্টের পেছনটা ভিজে পিঠের সঙ্গে আটকে গেছে।

বিছানায় বসে রইল সে। পুরো সজাগ। জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে আসছে সকালের কমলা রোদ।

জানালার কাঁচ! না, ভাঙেনি তো! ভাঙেনি!

ওয়ালপেপারও কাটেনি।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পা রাখল বিছানার বাইরে। উঠে দাঁড়াল।

কিন্তু মেঝের দিকে চোখ পড়তেই খাড়া থাকতে পারল না আর। ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। সমস্ত কার্পেটে কাদা। কাদামাখা অসংখ্য পায়ের ছাপ। ছোট, বড়, নানা রকম।

নিজের অজান্তেই একটা অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে।

নিশ্চয় তাসের কাণ্ড! বিড়বিড় করল সে। দুই হাতে শক্ত করে নিজের বুক জড়িয়ে ধরল। কাঁপুনি বন্ধ করার চেষ্টা করল।

সর্বনেশে তাসের খেলা! আর কিছু না!

ওই তাসগুলোর কবল থেকে মুক্তি দরকার। যতক্ষণ ঘরে আছে ওগুলো, এই অত্যাচার চলতেই থাকবে। বাঁচতে চাইলে কাকু-কাকুকে তার জিনিস ফিরিয়ে দিয়ে আসা দরকার।

নিজেকে টেনে তুলল আবার। খাড়া হলো।

ঠিক করল, এখনই ফিরিয়ে দিয়ে আসবে। না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ নয়। তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে নিয়ে দিয়ে আসবে গিয়ে এখনই।

মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে। সামনের সিঁড়ির ওপর রেখে এলেও হয়।

হ্যাঁ। তা-ই করবে। তাসের খেলা

তার সঙ্গে কথা বলার কোন দরকার নেই। চুরি করা যে কত বড় অপরাধ, সেই উপদেশ শোনারও প্রয়োজন নেই।

ওসব তার জানা। অন্যের কাছ থেকে সদুপদেশ নেয়া লাগবে না। তা ছাড়া সে নিজে চুরি করেনি। তাস খেলতে গিয়ে অন্যের বাড়িঘর ধ্বংসটাও ইচ্ছে করে করেনি। কি করে জানবে, তাস খেলা বাস্তব হয়ে ওঠে! নিজের চোখে না দেখলে পাগলেও বিশ্বাস করবে না। সে নিজেও করত না। অন্যায় একটাই করেছে, মিথ্যে কথা বলে। পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাসগুলো দিয়ে দেয়া উচিত ছিল কাকু-কাকুক। দিয়ে দিতও। কাকু-কাকুর ভয়েই দিতে পারেনি। দিতে গেলে ঠিকই চোর বলত।

একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরে অনেকটা শান্ত হয়ে এল সে। ভাল লাগছে এখন। কাকু-কাকুর মুখোমুখি না হয়ে কি ভাবে ফেরত দেবে, সেটাও ঠিক করে ফেলল।

জিনসের প্যান্ট আর একটা টি-শার্ট পরে নিল। জুতোর ফিতে বাঁধতে গিয়ে দেখে হাত কাঁপছে। কই? শান্ত হলো কোথায়?

বড় করে দম নিল।

মুসা, সব ঠিক হয়ে যাবে, নিজেকে বোঝাল সে। তাসগুলো শুধু ফিরিয়ে দিয়ে এসো। আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

কিন্তু তাসগুলো রাখল কোথায়?

ড্রেসারের ওপর।

 ড্রেসারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

 কিন্তু তাসগুলো নেই সেখানে।

.

০৯.

ড্রেসারের ওপর জিনিসপত্রের অভাব নেই। এলোমেলো। এক মহা বিশৃঙ্খল অবস্থা। তার মধ্যেই খুঁজতে শুরু করল সে। পেল না।

হাঁটু গেড়ে বসে ড্রেসারের নিচে খুঁজল। সেখানেও নেই তাসগুলো।

নিচতলা থেকে কথার শব্দ আসছে। রবিনের হাসি চিনতে পারল। চেয়ার টানার শব্দ হলো। সকাল সকালই চলে এসেছে। নিশ্চয় তাসের নেশায়।

এতক্ষণে মনে পড়ল, তাসগুলো নিচেই ফেলে এসেছে। নিচতলায়। রান্নাঘরের টেবিলের ওপর।

 মাথা নাড়তে নাড়তে উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে বেরিয়ে দ্রুত এগোল সিঁড়ির দিকে।

রান্নাঘরে ঢুকে দেখল টেবিলে বসে আছে কিশোর আর রবিন। তাসগুলোকে আগের মত চার ভাগে ভাগ করেছে আবার কিশোর।

ঠিকই অনুমান করেছিল মুসা। তাসের নেশাতেই অত সকালে হাজির হয়ে গেছে কিশোর আর রবিন।

কিন্তু মা-বাবা কোথায়? ঘুম থেকেই ওঠেনি এখনও? নাকি বাইরে বেরিয়ে গেছে? বাইরেই গেছে হয়তো। যাবার কথা আছে।

তোমার জন্যেই বসে আছি আমরা, রবিন বলল। তোমার ঘুম ভাঙাতে চাইনি।

মার সঙ্গে দেখা হয়েছে? মুসা জিজ্ঞেস করল।

মাথা ঝাঁকাল রবিন। আঙ্কেল-আন্টি দুজনেই বাইরে গেছেন। কি নাকি জরুরী কাজ আছে।

তুমি জলদি জলদি নাস্তা খেয়ে নাও, কিশোর বলল। তাস নিয়ে শাফল করতে শুরু করল সে।

আবার খেলা! চিৎকার করে উঠল মুসা। বাক্সে ঢোকাও। কাকু-কাকুকে ফেরত দিয়ে আসব। এখনই।

এখনই? ভুরু কুঁচকে গেল কিশোরের। খেলাটা শেষ না করেই? মাত্র তো অর্ধেক খেলোম।

মাত্র একটা দুর্গকে ধ্বংস করেছ, রবিন বলল। জিততে আরম্ভ করেছ। কিন্তু আমাদেরকে, অর্থাৎ গথ আর ক্রেলদের তোমাকে ধরার একটা সুযোগ দেয়া উচিত।

পারব না! মুসা বলল। তোমাদের হলোটা কি? খেলাটা ভয়ানক বিপজ্জনক। আমাদের পাশের বাড়িটার অবস্থা দেখনি? কাকু-কাকু তো সাবধানই করে দিয়ে গেছে আমাদের। বলেছে…

সেটাই তো দেখতে চাইছি, কিশোর বলল, সত্যি কথা বলেছে কিনা। ওর রূপকথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না আমার। করতে হলে আরও প্রমাণ চাই। ছোটদের ঘৃণা করে সে। ভাল করেই জানো।

আমাদের ভয় দেখানোর জন্যেও বানিয়ে বলতে পারে, রবিন বলল। তুমি তার কথা বিশ্বাস করে ভয় পেয়েছ, মুসা। তাসের চরিত্র কখনও বাস্তব হতে পারে না। তোমাকে বোকা বানিয়েছে।

কিন্তু…কিন্তু… কথা খুঁজে পাচ্ছে না মুসা। হ্যামলিনদের বাড়িটা?

তুফানে ধসে পড়েছে, রবিন বলল। ঝড়ে এরচেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হয় ঘরবাড়ির।

কিন্তু বিদ্যুৎ আঁকা তাসটা আমি তুলে নেয়ার আগে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়নি! তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল মুসার কণ্ঠ।

কিশোর আর রবিন দুজনেই হেসে উঠল।

তারমানে ওসব ভুয়া কথা সত্যি বিশ্বাস করে বসে আছ তুমি? কিশোর বলল।

বোসো, রবিন বলল। অকারণে সময় নষ্ট করছ। এসো, শেষ করে ফেলি খেলাটা।

দুজনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মুসা। খেলাটা চালিয়ে যাবে, মনস্থির করে ফেলেছে ওরা। কিশোর যখন একবার ঠিক করেছে খেলবে, খেলবেই। কোন কথা বলেই থামানো যাবে না ওকে।

বেশ। বিড়বিড় করে আরও কি বলল মুসা, বোঝা গেল না। তাসের খেলা

রেফ্রিজারেটর থেকে কমলার রসের বোতল বের করে গ্লাসে ঢেলে নিল সে। ফিরে তাকাল কিশোর আর রবিনের দিকে। এক গেম খেলব আমি। মাত্র একটা গেম। ব্যস। তারপর কিছু ঘটুক বা না ঘটুক, তাসগুলো আমি ফেরত দিয়ে আসব। কাকু-কাকুকে।

তাস শাফল করে টেবিলে উপুড় করে রাখল কিশোর।

একটা তাস টেনে নিতে হাত বাড়াল রবিন। তিনজনেই সামনের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছে কি ওঠে দেখার জন্যে।

ঘাড়ের পেছনে শিরশির করছে মুসার।

তাস ওল্টানোটা কি ঠিক হচ্ছে? ভুল করছে না তো আবার?

তাস টেনে নিল রবিন।

উল্টে ফেলল।

চিৎকার করে উঠল মুসা।

.

১০.

রবিনের হাতের তাসটায় ড্রাগন আঁকা।

মাথা তুলে রেখেছে ড্রাগনটা। গাঢ় রূপালী রঙ। লম্বা ঘাড়টা বাকা করে রেখেছে আক্রমণের ভঙ্গিতে। পিঠের মেরুদণ্ড বরাবর বড় বড় মারাত্মক কাটা খাড়া হয়ে আছে। প্রচণ্ড রাগে চোখ দুটো জ্বলছে। বুকের আঁশগুলোকে মনে হচ্ছে। ধাতব বর্মের মত। বুঝিয়ে দিচ্ছে যেন কোন বাধাই বাধা নয় ওটার কাছে। আধ ছড়ানো অবস্থায় রয়েছে কাঁধের কাছের ডানা দুটো।

লম্বা কুমিরের মত মুখটা হাঁ করে আছে গর্জনের ভঙ্গিতে। মুখের ভেতরে অসংখ্য ধারাল দাঁতের সারি। নাকের ফুটো দুটো ছড়ানো। কমলা রঙের আগুন বেরোচ্ছে নিঃশ্বাসের সঙ্গে।

হাঁ করে তাসটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে তিনজনে।

রবিন, একটা ভাগ্যতাস তুলে নাও। আরেক গাদা তাস রবিনের দিকে ঠেলে দিল কিশোর।

এক মুহূর্ত দ্বিধা করল রবিন। তারপর ভাগ্যতাসের প থেকে সবচেয়ে ওপরের তাসটা তুলে নিয়ে ওল্টাল। দুটো কালো রঙের তীর এমন করে বাঁকা। করে আঁকা হয়েছে, ফলার মাখা দুটো পরস্পরের দিকে মুখ করে আছে।

এর মানে কি? কিশোরকে জিজ্ঞেস করল রবিন।

এটা হলো নিয়ন্ত্রক তাস, কিশোর বলল। এর সাহায্যে চরিত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তুমি। তুমি আর এখন গথ নও। ড্রাগনটাকে চালু করো।

হ্যাঁ, করছি।

চোখ বুজল মুসা। স্বপ্নের দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল আবার মনের পর্দায়। শোবার ঘরে চিৎকার-চেঁচামেচি আর গর্জন করতে থাকা, কুৎসিত ভয়ঙ্কর জানোয়ারগুলোর চেহারা স্পষ্ট দেখতে পেল।

নাহ, খেলাটা চালিয়ে যেতে ভাল লাগছে না তার।

চোখ মেলে দেখল, পাশাগুলো রবিনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিশোর। শক্তি সঞ্চয় করো। দেখাও তোমার ড্রাগনটা কত শক্তিশালী! নাক দিয়ে খোতখেত শব্দ করল সে। দুই-এক পয়েন্ট পেয়ে বোনো না আবার।

পাশা চালল রবিন। চারটেই গড়িয়ে দিল একসঙ্গে। দুটো ছক্কা, একটা পচ, একটা চার।

দারুণ! চমৎকার! চিৎকার করে টেবিলে কিল মারল কিশোর। সাংঘাতিক শক্তিশালী করে তুলেছ ড্রাগনটাকে!

ড্রাগনের শক্তিশালী হবার কথা শুনে পেটের মধ্যে খামচি দিয়ে ধরল মুসার।

এখনও আমি রাজা, তাই না? মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল সে। নাইটেরা এখনও আমার দখলে?

মাথা ঝাঁকাল কিলোর।

বেশ, মুসা বলল। আমি তাহলে আমার সেনাবাহিনী পাঠাচ্ছি ড্রাগনটাকে ধ্বংস করার জন্যে।

পাশাগুলোর জন্যে হাত বাড়াল সে।

হাতটা সরিয়ে দিল কিশোর। এখন আমার পালা। রবিনের দিকে তাকিয়ে হাসল। ড্রাগনের সঙ্গে হাত মেলানোর সময় হয়েছে ক্রেলের।

মানে? বুঝতে পারল না মুসা।

ক্রেলেরা ভীষণ চালাক, কিশোর বলল। খুব সাবধানী। কখন কোন পক্ষ নিয়ে খেলতে হবে, ভাল করেই জানে।

কিন্তু এর মানেটা কি?

এত সহজ কথাটা বুঝলে না? আমি আমার শক্তি ড্রাগনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলব।

সাংঘাতিক হবে তাহলে? চিৎকার করে উঠল রবিন। আমাদের মিলিত শক্তির কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হবে দুষ্ট রাজা, সে যত শক্তিশালীই হোক।

কাজটা কি ঠিক হলো? জিজ্ঞেস করল মুসা।

 না হওয়ার কি হলো? খেলা খেলাই।

তাসের গাদা থেকে সবচেয়ে ওপরের তাসটা টেনে নিল সে। ওল্টাল। দাড়িওলা একটা এলফের ছবি। বাদামী অ্যাপ্রন পরে আছে কল্পিত বামন-মানবের মত প্রাণীটা। হাতে মাছ ধরার জাল।

একজন এলফ জেলে, বলে পাশাগুলোকে গড়িয়ে দিল কিশোর। মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ভীষণ বিপদে পড়তে যাচ্ছ তুমি, রাজা। সেনাবাহিনী হিসেবে লড়াই করার জন্যে দুই হাজার এলফ জেলেকে তার পক্ষে পেয়ে গেছে ক্রেল। নিঃশব্দে তোমার নাইটদের কাছে গিয়ে মাথার ওপর জাল ফেলবে এলফরা। ওদের পরাস্ত করে তোমার ওপর হামলা চালাবে। বাঁচাটা কঠিন হয়ে গেছে তোমার জন্যে।

এত্ত সহজ না! আবার খেলায় ফিরে আসতে শুরু করেছে মুসা। তাসের খেলা।

এতই সহজ, জবাব দিল কিশোর।

তারমানে আমাকে আটকে ফেলা হয়েছে?

হ্যাঁ, তুমি এখন ক্রেলের হাতে বন্দি, ঘোষণা করল কিশোর। পাশাগুলো রবিনের দিকে ঠেলে দিল। রাজা এখন বন্দি। ড্রাগন আসছে তাকে খতম করার জন্যে।

না না, দাঁড়াও! দাঁড়াও! চিৎকার করে উঠল মুসা।

কিন্তু ততক্ষণে পাশা গড়িয়ে দিয়েছে রবিন।

রাস্তার দিক থেকে গর্জন শোনা গেল।

খানিক পরেই মহিলাকণ্ঠের চিৎকার।

গাড়ির চাকার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। পরক্ষণে সংঘর্ষের শব্দ।

আবার শোনা গেল খেপে ওঠা জান্তব গর্জন। আগের চেয়ে জোরে। আরও কাছে থেকে।

কিশোর আর রবিনের চেহারায় বিস্ময়।

মনেপ্রাণে দোয়া চাইতে শুরু করল মুসা, ড্রাগনটা যাতে জ্যান্ত হয়ে উঠতে না পারে।

.

১১.

 লাফ দিয়ে উঠে জানালার দিকে দৌড় দিল মুসা।

হই-হট্টগোল শুরু হয়েছে।

আরেকটা গাড়ি থামার শব্দ হলো। ব্রেক কষার ফলে কর্কশ আর্তনাদ করে উঠল চাকা।

শব্দ শুনছে, কিন্তু বাড়ির পেছনটা চোখে পড়ছে না বলে কিছু দেখতে পাচ্ছে না।

ঘুরে সামনের দরজার দিকে দৌড় দিল মুসা। পেছনে ছুটল কিশোর আর রবিন।

ঠেলা দিয়ে পাল্লাটা খুলে ফেলল মুসা। ভয়ঙ্কর আরেকটা গর্জন শুনতে পেল।

এ রকম শব্দ জীবনে শোনেনি সে।

বাঘ-সিংহের ভারী গলার কর্কশ গর্জন নয়। এমনকি হাতির কানফাটা চিৎকারও নয়।

শব্দটা কেমন বোঝানো খুব কঠিন। এ শব্দটা শুরু হচ্ছে মেঘের চাপা গুড়গুড় ডাকের মত। পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার সময় দ্রুত বেড়ে যায়। মাটি কাঁপতে থাকে। বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে। ভারী এই গমগমে গর্জনের সঙ্গে মিলিত হয় শিসের মত তীক্ষ্ণ একটানা শব্দ।

মড়মড় শব্দ শোনা গেল। একটা গাছ ভেঙে পড়ল।

মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচি বাড়ছে।

মুসাদের সামনের লনে নেমে এল তিন গোয়েন্দা। দৌড় দিল রাস্তার দিকে। মোড়ের কাছে পৌঁছেই থমকে দাঁড়াল। রাস্তার ওপর মস্ত এক ছায়া পড়েছে।

ড্রাগনটাকে দেখতে পেল মুসা। ছায়ার ওপর সরে আসছে।

টাওয়ারের মত উঁচু। কাটা বসানো। বদমেজাজী। অবিকল তাসের গায়ে আঁকা ছবিটার মত।

আমি…আমি বিশ্বাস করতে পারছি না! চিৎকার করে উঠল মুসা।

কাঁটা বসানো মেরুদণ্ডটার দুপাশে দুটো রূপালী ডানা। ছড়িয়ে রেখেছে। জাহাজের পালের মত। হাঁটার সময় ওই ডানা লেগে ছিঁড়ে যাচ্ছে বিদ্যুতের তার। ঝরঝর, ছরছর করে স্ফুলিঙ্গ ছিটাচ্ছে বিদ্যুৎ।

বিশাল মাথাটা কাত করে আবার প্রচণ্ড গর্জন করে উঠল দানবটা। থপ থপ শব্দ তুলে ঝোলা ভারী দেহটা নিয়ে দুলে দুলে সামনে এগোচ্ছে। ধাক্কা লেগে মাটিতে ভেঙে পড়ছে বিদ্যুতের খুঁটি।

মস্ত একটা পা উঁচু করল ড্রাগনটা। একটা গাড়ির ওপর ফেলল। দিয়াশলাইয়ের বাক্সের মত চ্যাপ্টা হয়ে গেল গাড়িটা।

লোকে চিৎকার করতে করতে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। বাচ্চারা কাঁদছে। চেঁচাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ হারাল একটা গাড়ি। চাকার আর্তনাদ আর ইঞ্জিনের গর্জন তুলে এলোপাতাড়ি ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ল একটা বাড়ির লনে।

মুসার পাশে দাঁড়িয়ে হাঁ করে ড্রাগনটার দিকে তাকিয়ে আছে কিশোর। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সিনেমা হলে গডজিলার ছবি দেখছে। যেন। বিড়বিড় করে বলল, ড্রাগন…একটা সত্যিকারের ড্রাগন!

আমরা ওটাকে এখানে নিয়ে এসেছি, কিশোরের হাত খামচে ধরল মুসা। ওটাকে সরানোও আমাদেরই দায়িত্ব। কিছু একটা করা দরকার। জলদি।

ঘুরে তাকাল রবিন। চোখেমুখে আতঙ্ক। করা তো দরকার। কিন্তু কি?

ইয়ে…

 মুসার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে উঠল কিশোর, এক কাজ করা যায়।

আবার গর্জন করে উঠে আরেকটা গাড়ি পায়ের নিচে ফেলে ভর্তা করল ড্রাগন।

জলদি… তাগাদা দিল কিশোর। বাড়ির ভেতরে চলো। লন ধরে দৌড়ানো শুরু করল সে।

শেষবারের মত ড্রাগনটার দিকে তাকাল আরেকবার মুসা। নাক দিয়ে আগুন বের করছে তখন ওটা। তারপর দৌড় দিল কিশোর আর রবিনের পেছন পেছন। দৌড়াতে দৌড়াতেই জিজ্ঞেস করল, তোমার উদ্দেশ্যটা কি?

রান্নাঘরে ঢোকার আগে আর জবাব দিল না কিশোর। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তাস! ড্রাগন আঁকা তাসটা দরকার। ওটাকে বাক্সে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই হয়তো ড্রাগনটাও চলে যাবে।

হ্যাঁ হ্যাঁ! একমত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ঠিকই বলেছ। কাল রাতের কথা মনে আছে? তাসটা বাক্সে রাখতেই ঝড়-বৃষ্টি সব থেমে গেল।

জানি না কি ঘটবে, অনিশ্চিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। তবে কাজ হলেও হতে পারে।

বিকট শব্দে আছড়ে পড়ল কি যেন। চমকে গেল তিনজনেই। আরেকটা গাছ পড়ল নাকি? এত কাছে! যেন ওদের জানালাটার বাইরেই।

কোথায় ওটা? চিৎকার করে উঠল মুসা। ড্রাগনের তাসটা কোনখানে?

চিত করে রেখেছিলাম আমি ওটা, রবিন বলল। মনে পড়ে? আমার সামনে টেবিলের ওপর রেখেছি।

খুঁজে না পেয়ে হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল কিশোর। এখানে নেই ওটা!

হাল ছাড়ল না মুসা। তাসগুলোর মধ্যে খুঁজতে শুরু করল। বুঝল, কিশোর ঠিকই বলেছে।

ড্রাগনের তাসটা উধাও।

তারমানে একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, যাকেই ডেকে আনা হচ্ছে, ফিরে যাবার সময় মুক্ত হয়ে যাচ্ছে ওটা। তাতেই সম্ভবত উধাও হয়ে যাচ্ছে তাসগুলো, কিশোর বলল।

এখন? এবার কি করা? গুঙিয়ে উঠল রবিন।

বাইরের হট্টগোল বেড়েই চলেছে। সাইরেনের শব্দ ওঠা-নামা করছে। মড়মড় করে কাঠ ভেঙে পড়ার শব্দ হলো।

মেরুদণ্ডে শীতল শিহরণ বয়ে গেল কিশোরের। টেবিলে পড়ে থাকা একটা তাসের দিকে তাকিয়ে থেকে আরেকটা বুদ্ধি এল মাথায়।

মুখোশ পরা নাইট! চেঁচিয়ে উঠল সে।

হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল মুসা আর রবিন।

নাইট দিয়ে কি হবে? জিজ্ঞেস করল মুসা।

খাবলা দিয়ে টেবিল থেকে পাশাগুলো তুলে এনে মুসার দিকে বাড়িয়ে ধরল কিশোর, নাও, চালো। নাইটদের এক বিশাল বাহিনী দরকার আমাদের। রূপকথার গল্পে এ ধরনের সৈন্যরাই লড়াই করে ড্রাগন তাড়াত।

কিন্তু… পাশাগুলোর দিকে অনিশ্চিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে বলতে গেল মুসা।

ওকে কথা শেষ করতে দিল না কিশোর। চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি? যত বেশি সম্ভব পয়েন্ট জোগাড় করতে হবে এখন আমাদের। প্রচুর শক্তি দরকার।

সাহস জোগানোর জন্যে মুসার পিঠে চাপড় মারল কিশোর। গুড লাক, মুসা। চালো। সবগুলোতেই ছক্কা তোলো। জলদি!

বাইরে আবার গর্জন। বিদ্যুতের চড়চড়ানি। রাস্তায় আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি।

পাশাগুলো হাতের তালুতে নিয়ে চেপে ধরল মুসা। হাতের তালু খুলে ঝাঁকাল। চোখ বুজল। প্রার্থনা করতে লাগল চারটে ছক্কার জন্যে।

হাতটা নামাল টেবিলের ওপর। আস্তে করে গড়িয়ে দিল পাশাগুলো।

.

১২.

দূর! গুঙিয়ে উঠল মুসা।

তিনটে এক আর একটা দুই।

আবার চালো! আবার চালো! তাগাদা দিল কিশোর। চেষ্টা করে যাও, মুসা। তিনটে চাল আছে হাতে।

পাশাগুলোর জন্যে হাত বাড়াল মুসা। বাইরে একটা শব্দ থামিয়ে দিল ওকে। টেবিলের কাছ থেকে সরে এসে দৌড় দিল সামনের জানালার দিকে।

খাইছে! বিড়বিড় করে বলল সে। সামনের রাস্তায় মুখোশ পরা পাঁচজন নাইট চোখে পড়ল। একসঙ্গে হাঁটছে। মার্চ করে। ধীরে ধীরে। এক হাতে ধরা বর্মগুলো সামনে বাড়ানো। অন্য হাতের তরোয়াল খাড়া করে ধরে রেখেছে ওপর দিকে।

রোদে চকচক করছে পরনের ধাতব বর্ম। ড্রাগনের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াল। গভীর ধূসর ছায়াতে মিশে গেল ওদের বর্ম পরা দেহ।

এ ক’জনকে দিয়ে আর কি হবে, পাশ থেকে বিড়বিড় করল কিশোর। চারটেতেই যদি ছক্কা উঠত, তাহলেও নাহয় একটা কথা ছিল…

কথা শেষ হলো না তার।

তিনজনেই দম আটকে ফেলল। একসঙ্গে দুজন নাইটকে কামড়ে ধরে তুলে নিয়েছে ড্রাগনটা। মাথাটাকে ঝাড়া দিয়ে ছুঁড়ে দিল একপাশে। একটা বাড়ির ছাতের ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেহ দুটো।

আবার মুখ নামাল ক্ষিপ্ত জানোয়ারটা। রাগে গর্জন করে মুখ দিয়ে তিনবার আগুন নিক্ষেপ করল বাকি তিনজন নাইটকে লক্ষ্য করে।

আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে তরোয়াল, বর্ম সব ফেলে দিয়ে দৌড় মারল নাইটেরা। নিজেদের গায়ের বর্মের ঝনঝনানিতে ঢাকা পড়ে গেল ওদের চিৎকার।

ড্রাগনটাই জিতছে, বিড়বিড় করে বলল রবিন।

আতঙ্কে জমে গিয়ে দেখল ওরা, ড্রাগনটা এগিয়ে আসছে মুসাদের বাড়ির দিকে। মাথাটা বার বার ঝুঁকি দিয়ে পেছনে টেনে নিচ্ছে আক্রমণের ভঙ্গিতে।

ঢুকে পড়ল ওটা সামনের লনে। বিশাল ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেল বাড়িটা।

সর্বনাশ! এদিকেই তো আসছে! ভয়ে দম আটকে আসছে মুসার। আমাদেরকে ধরতে আসছে!

<

Super User