ছয়

মাইমিতির সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে সুযোগ পেলেই আমাদের সাথে দেখা করতে চলে আসে ক্রিশ্চিয়ান। আসলে আমাদের সাথে তো নয়, আপে মাইমিতির সাথে দেখা করতে। ভাষার ব্যবধান সত্ত্বেও ঘন্টার পর ঘণ্টা দুজন এক সাথে কাটায়, হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়ায় সৈকতে, পাহাড়ে, বনে। কিছুদিনের ভেতর সবাই মাইমিতির প্রেমিক হিসেবে মেনে নিল ওকে।

যখনই তীরে আসে মাইমিতি এবং অন্যদের জন্যে কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসে ক্রিশ্চিয়ান। সে কারণে সবাই ওকে পছন্দ করে। সত্যি কথা বলতে কি ওর জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, মাইমিতিতে বটেই, অন্যরাও।

এভাবে কেটে গেল প্রায় এক মাস। তারপর এক রাতে…

আমি তখন ঘুমিয়ে। হঠাৎ কাঁধে কারও আলতো স্পর্শ পেয়ে জেগে উঠলাম। ক্যান্ডল নাটের প্রদীপ জ্বলছে ঘরের ভেতর। তার অস্পষ্ট আলোয় দেখলাম ক্রিশ্চিয়ান ঝুঁকে আছে আমার ওপর। ওর পাশে মাইমিতি।

সৈকতে এসো, বিয়্যাম, ফিসফিস করে বল ক্রিশ্চিয়ান, একটা কথা বলব তোমাকে।

চোখ রগড়ে ঘুম তাড়াতে তাড়াতে চললাম ওদের পেছন পেছন।

নারকেলের ছোবড়া জ্বালিয়ে বড়সড় একটা আগুন তৈরি করা হয়েছে সৈকতে। সদ্য ধরে আনা মাছ ঝলসানো হচ্ছে তাতে। চারপাশে মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে বসেছে হিটিহিটির পরিবার। নিচু স্বরে আলাপ করছে তারা। অবাক হলাম আমি। না, এত রাতে খাওয়ার আয়োজন করতে দেখে নয়-খাওয়া বা ঘুমানোর কোন সময়সূচি নেই তাহিতীয়দের, সাগর থেকে মাছ ধরে আনার পরই সাধারণত খাওয়ার আয়োজন হয়; সে সকালে হোক, কি দুপুরে হোক, কি মাঝ রাতে হোক-আমি অবাক হলাম আমাকে ডাকা হয়নি দেখে।

একটা নারকেল গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসল ক্রিশ্চিয়ান। মাইমিতি বসল ওর এক পাশে, অন্য পাশে আমি।

নিঃশব্দে পেরিয়ে গেল কয়েকটা মিনিট। তারপর হঠাৎ ক্রিশ্চিয়ান বলল, ওল্ড ব্যাকাস মারা গেছে, বিয়্যাম।

ওহ ঈশ্বর! কি বলছ তুমি! কখন? কি…

কাল রাতে। সম্ভবত বিষাক্ত মাছ খেয়েছিল। টেতিয়ারোয়া থেকে ক্যানো ভর্তি মাছ নিয়ে এসেছিল কয়েক জন ইন্ডিয়ান। তাদের কাছ থেকে পঞ্চাশ পাউন্ড মত মাছ কিনেছিলাম আমরা। একমাত্র তোমাদের মেসকেই কাল ওই মাছ সরবরাহ করা হয়েছিল। রাতে খাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই বমি করতে শুরু করে তোমার মেসমেটরা। হেওয়ার্ড, নেলসন আর মরিসন ছঘন্টা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে গেছে কোন মতে, বুড়ো সার্জন পারেনি। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে আমি এসেছি তোমাকে জানাতে।

ওহ ঈশ্বর! আবার উচ্চারণ করলাম আমি।

ভোরে ওকে কবর দেয়া হবে। তোমাকে থাকতে বলেছেন মিস্টার ব্লাই।

পয়েন্ট ভেনাসে তাঁকে কবর দেয়া হলো। বিশ বছর আগে ক্যাপ্টেন কুক যেখানে মানমন্দির স্থাপন করেছিলেন তার কাছেই। ইন্ডিয়ানরাই কবর খুঁড়ে দিল আমাদের হয়ে। অবশেষে নামানো হয় ওস্ত ব্যাকাস-এর কফিন। ব্লাই পবিত্র-বাইবেল থেকে পাঠ করলেন মৃত আত্মার শান্তির উদ্দেশে। তারপর মুঠো মুঠো মাটি ছড়িয়ে দিলাম আমরা কফিনের ওপর।

.

ও ব্যাকাস-এর মৃত্যুর পর পরই আবার তিরিক্ষি হয়ে উঠল ব্লাই..এর মেজাজ। নিয়ম শৃখলা যেটুকু শিথিল করা হয়েছিল তা আবার কড়াকড়ি করা হলো। শুধু এ-ই নয় এমন সব ঘটনা বাউন্টিতে ঘটতে শুরু করল যে শেষ পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম, আবার অসন্তোষের বিষ জমতে শুরু করেছে নাবিকদের মনে। কিন্তু ঘটনা সাপ্তাহিক অগ্রগতির খবর জানাতে গিয়ে আমি নিজের চোখে ঘটতে দেখেছি। কিছু শুনেছি হিটিহিটি আর ক্রিশ্চিয়ানের মুখে।

আগেই বলেছি, জাহাজের প্রতিটি লোকেরই ইন্ডিয়ান বন্ধু আছে। তারা প্রায়ই তাদের তাইওদের কাছে নানা ধরনের উপহার-বিশেষ করে খাবারদাবার পাঠায়। এই উপহার নিয়েই সূত্রপাত গোলযোগের। একদিন হঠাৎ ব্লাই ঘোষণা করে দিলেন ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে যা-ই আসবে-সে খাবার দাবারই হোক আর অন্য জিনিসই হোক-গণ্য হবে জাহাজের সম্পত্তি হিসেবে। ক্যাপ্টেনের কাছে জমা দিতে হবে সব।

ব্যাপারটা মেনে নেয়া সহজ নয় নাবিকদের পক্ষে। তাদের বন্ধুরা যে জিনিস পাঠাবে কেন তা তারা জাহাজকে মানে ব্লাইকে দিতে যাবে? কারও মনেই সংশয় রইল না, ওসব জিনিস স্রেফ মেরে দেবে ব্লাই।

একদিনের কথা আমার মনে আছে। অভিধানের অগ্রগতি দেখানোর জন্যে গিয়েছি জাহাজে। কিন্তু ব্লাই তখন জাহাজে নেই, রুটিফলের চারা সংগ্রহের তদারকি করতে গেছেন ডাঙায়। অপেক্ষা করতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি ছোট একটা ক্যানোয় চেপে জাহাজের দিকে আসছে টম এলিসন-আমাদের সবচেয়ে কম বয়েসী খালাসী। ক্যানোয় ও ছাড়াও রয়েছে এক ইন্ডিয়ান-ও তাইও। ক্যানোটা বাউন্টির গায়ে ভিড়তেই টম উঠে এল ডেকে। ইন্ডিয়ানটা এবার এগিয়ে দিতে লাগল তার উপহার-ভি নামের এক ধরনের ইন্ডিয়ান আপেল, তিমির দাঁতের হাতলঅলা একটা হাতপাখা আর কাপড়ের ছোট একটা পোটলা। জিনিসগুলো একে একে নিয়ে ডেকের ওপর নামিয়ে রাখল এলিসন।

ইয়ং হ্যালেট নামের এক মিডশিপম্যান, আছে আমাদের জাহাজে। ভীষণ কূট স্বাভাবের ছেলে। এই হ্যালেটের ওপর তখন দায়িত্ব ডেক পাহারা দেয়ার। এলিসন জাহাজে উঠতেই সে এগিয়ে গেল। অনুমতির তোয়াক্কা না করে একটা আপেল তুলে নিয়ে খেতে খেতে বলল, ক্যাপ্টেনের নির্দেশ মনে আছে তো, এলিসন? এগুলো আমার কাছে দিয়ে দাও, আমি পৌঁছে দেব।

মুখটা কালো হয়ে গেল এলিসনের। কোন মতে বলল, জি, স্যার।

আর এই পাখাটা, এলিসনের হাত থেকে ওটা নিতে নিতে হ্যালেট বলল, দেবে আমাকে?

না, স্যার। একটা মেয়ে এটা উপহার দিয়েছে আমাকে।

ও। তা ওটা কি, দেখি!

টাপা কাপড়ের পোঁটলা।

ঝুঁকে পোঁটলাটা তুলে নিল হ্যালেট। টিপে টিপে দেখল কিছুক্ষণ। ক্রুর একটা হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। বলল, মনে হচ্ছে বাচ্চা শুয়োর। মিস্টার স্যামুয়েলকে ডাকব? রক্তলকে উঠল এলিসনের মুখে। ওকে জবাব দেয়ার সুযোগ দিল না হ্যালেট। বলে চলল, এসো, একটা চুক্তি করি,আমরা-পাখাটা আমাকে দিয়ে দাও, শুয়োর সম্পর্কে কাউকে কিছু বলব না আমি!

একটা কথাও না বলে পোটলাটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে ফোকাসলের দিকে চলে গেল এলিসন, পাখাটা রয়ে গেল হালেটের কাছে। ভয়ঙ্কর ক্রোধে গর্জে উঠতে যাব আমি, এই সময় দেখি কেরানী স্যামুয়েল আসছে। হ্যালেট ওকে থামিয়ে বলল, মিস্টার স্যামুয়েল, খানিকটা কচি শুয়োরর মাংস পেতে চান? ফোকাসূলে চলে যান। আমার সন্দেহ, এলিসনের কাছে ইন্ডিয়ান কাপড়ে মোড়া বাচ্চা শুয়োর আছে একটা।

মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেল স্যামুয়েল ফোকাসলের দিকে।

আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম মাস্তুলের আড়ালে। লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলাম এবার।

বদমাশের বাচ্চা! চিৎকার করে উঠলাম।

একটু যেন চমকাল হ্যালেট। চি চি করে বলল, আমার ওপর তুমি গোয়েন্দাগিরি করছিলে!

করতাম না, যদি না জানতাম কেমন বদস্বভাবের লোক তুমি। বলে আর দাঁড়ালাম না আমি, চলে গেলাম অন্যদিকে।

 একটু পরে ক্যাপ্টেন এলেন। আমার পুঁথি পত্র নিয়ে আমি তৈরি হলাম তার সাথে সাক্ষাতের জন্যে। আধঘণ্টা পর স্লাইয়ের কামরা থেকে বেরিয়ে ডেকে এসে দেখি গ্যাঙওয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে ক্রিশ্চিয়ান। সদ্য আসা একটা ক্যানো থেকে মাইমিতির পাঠানো বিপুল পরিমাণ খাবার এবং অন্যান্য জিনিস জাহাজে তুলছে। এখানে পাঠকদের অবগতির জন্যে জানিয়ে রাখা ভাল, পৈতৃক সূত্রে মাইমিত বিরাট ভূ-সম্পত্তির মালিক। ওর পক্ষে এত উপহার পাঠানে অস্বাভাবিক বা অসুবিধাজনক কিছু বয়। ও পাঠিয়েছে মোটাসোটা এক জোড় শুয়োর, বড় এক কাঁদি কলা, প্রচুর রিমাণে টারো এবং অন্যান্য শাক সবজি; এ ছাড়াও সুন্দর কয়েকটা পাটি, ইন্ডিয়ান আলখাল্লা আর এক জোড়া চমৎকার মুক্তা।

ব্লাই কেবিন থেকে বেরিয়ে গ্যায়ের কাছে আসতেই খেয়াল করলেন শুয়োর দুটো। তক্ষুণি স্যামুয়েলকে ডেকে ওগুলো জাহাজের ভাণ্ডারে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন!

মিস্টার ব্লাই, প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বলল ক্রিশ্চিয়ান, শুয়োর দুটো আমি আমার নিজের মেসের জন্যে রাখতে চেয়েছিলাম।

না! দৃঢ় কণ্ঠে বললেন ব্লাই। তারপর পাটি, আলখাল্লা এবং অন্য জিনিসগুলো দেখে আবার কেরানীকে বললেন, এগুলোও নিয়ে যাও, স্যামুয়েল। অন্য কোন দ্বীপে এগুলো বদলে দরকারী জিনিস পাওয়া যেতে পারে।

না, স্যার, আবার প্রতিবাদ করল ক্রিশ্চিয়ান, এগুলো ইংল্যান্ডে আমার বাড়ির লোকদের জন্যে দেয়া হয়েছে।

জবাব দেয়ার বদলে ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন ব্লাই। এই সময় মাইমিতির ভত্য টাপা কাপড়ে মোড়া ছোট্ট একটা পুঁটলি ক্রিশ্চিয়ানের হাতে দিতে দিতে ইন্ডিয়ান ভাষায় বলল, মুক্তা। আমার মনির ইংল্যান্ডে আপনার মায়ের জন্যে দিয়েছেন।

সঙ্গে সঙ্গে থেমে ঘুরে দাঁড়ালো ক্যাপ্টেন। কি বলল ও?-মুক্তা? দেখি, আমাকে দেখাও!

নিঃশব্দে টাপা কাপড়ের পুঁটলিটা খুলে দেখাল ক্রিশ্চিয়ান। নিখুঁত আকৃতির বড় বড় দুটো মুক্তা। বিস্ময়ের অস্কুট একটা ধ্বনি বেরোল স্যামুয়েলের গলা দিয়ে। এমন মুক্তা জীবনে দেখেনি সে। এক মুহূর্ত ইতস্তত করে ব্লাই বললেন:

স্যামুয়েলকে দাও ওদুটো। ফ্রেন্ডলি দ্বীপপুঞ্জে মুক্তার খুব কদর, অনেক জিনিস পাওয়া যাবে এগুলোর

স্যার, আমার মায়ের জন্যে দেয়া হয়েছে এগুলো, ব্লাইকে শেষ করতে দিয়ে বলল ক্রিশ্চিয়ান। সাপের মত শীতল ওর গলা।

স্যামুয়েলকে দাও ওদুটো, আবার বললেন ব্লাই।

না! অতি কষ্টে নিজেকে শান্ত রেখে জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। তারপর আচমকা মুক্তা ধরা হাতটা মুঠো করে চলে গেল সে। ক্যাপ্টেনের হাত দুটো একবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে, একবার খুলছে। কেরানীর দিকে তাকালেন তিনি, যেন কিছু বলবেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য না বলেই চলে গেলেন তিনিও কেবিনের দিকে।

.

প্রাচুর্যের ভেতরে থেকেও মেপে মেপে খাবার দেয়া হচ্ছে নাবিকদের, স্থানীয় বন্ধুরা উপহার হিসেবে যা দিচ্ছে তা কেড়ে নেয়া হচ্ছে, তীর থেকে যখন জাহাজ আসছে প্রত্যেকের সাথে এমন ব্যবহার করা হচ্ছে যেন ওরা সবাই চোরাচালানি-এই পরিবেশে নাবিকদের মনের অবস্থা কেমন হতে পারে সহজেই অনুমেয়।

জানুয়ারির মাঝামাঝি একদিন জাহাজে গিয়ে দেখি কোয়ার্টার ডেকে অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন এ ক্যাপ্টেন। আমাকে দেখে থেমে দাঁড়ালেন তিনি।

আজ তোমার পাণ্ডুলিপি ঘাটাঘাটি করতে পারব না, বিয়্যাম, বিরক্তির সঙ্গে বললেন ব্লাই। মুসভ্যাট আর মিলওয়ার্ডকে নিয়ে চার্চিল ভেগেছে। অকৃতজ্ঞ বদমাশের দল! একবার ধরে নেই, তারপর দেখো কেমন করে শায়েস্তা করি শয়তানগুলোকে?

খুব একটা বিস্মিত হলাম না, এমন কিছু যে ঘটবে তা যেন আমার জানাই ছিল।

ছোট কাটারটা নিয়ে গেছে বদমাশগুলো, বলে চললেন ব্লাই। আটটা বন্দুক আর কিছু গুলি বারুদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। একটু আগে খবর পেলাম, দ্বীপের ওপাশে এক নির্জন সৈকতে কাটার ফেলে রেখে একটা দেশী পাল তোলা ক্যানোয় চেপে টেতিয়ারোয়ার দিকে গেছে ওরা। থেমে এক মুহূর্ত কি যেন ভাবলেন ব্লাই। তারপর আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, তোমার তাইওর একটা বড় ক্যানো আছে না?

হ্যাঁ, স্যার।

তাহলে তোমাকেই দেব বদমাশগুলোকে ধরে আনার ভার। হিটিহিটির কাছে ধার চাও ক্যানোটা; কয়েক জন লোকও চাও, আজই রওনা হয়ে যাও টেতিয়ারোয়ার দিকে। চেষ্টা করবে যেন শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই ধরে আনতে পারে। যদি দেখ টেতিয়ারোয়ায় ওরা নেই তাহলে বাতাস অনুকূল থাকলে কালই ফিরে আসবে।

ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে নিচে নামলাম আমি। স্টুয়ার্ট আর টিঙ্কলারকে দেখলাম বার্থে।

খবরটা শুনেছ নিশ্চয়ই? জিজ্ঞেস করল স্টুয়ার্ট।

হ্যাঁ, ক্যাপ্টেনের মুখেই শুনলাম। মজার কথা কি জানো, ওদের ধরে আনার দায়িত্ব চেপেছে আমার ঘাড়ে।

বেচারা! জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করল স্টুয়ার্ট।

কাটার নিয়ে পালাল কি করে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ডেক পাহারায় ছিল হেওয়ার্ড। বেটা গর্দভ ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোরে উঠে দেখে কাটার নেই, আমাদের তিনজন নাবিকও নেই। ওই, ব্লাই যে কি খ্যাপা খেপেছিল, যদি দেখতে! এক মাস ওকে শিকলে আটকে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

ঘণ্টাখানেকের ভেতর হিটিহিটির বাড়িতে পৌঁছে গেলাম আমি। বাড়িতেই পেলাম ওকে। ক্যাপ্টেনের হয়ে ওর বড় ক্যানোটা ধার চাইলাম। কয়েকজন লোকও চাইলাম ক্যানো চালানোর জন্যে। কি কারণে কোথায় যাব বললাম। তক্ষুণি বারো জন লোক সহ ক্যানোটা দিতে রাজি হয়ে গেল হিটিহিটি। এবং জানাল ও নিজেও যাবে আমার সাথে। আপত্তি করার কোন কারণ দেখলাম না। হিটিহিটির মত একজন গোত্রপতি সঙ্গে থাকলে সম্পূর্ণ অজানা, অচেনা টেতিয়ারোয়ায় বিশেষ খাতির যে পাব তাতে সন্দেহ নেই।

দুপুর দুটো নাগাদ আমরা রওনা হয়ে গেলাম।

তাহিতির মাইল ত্রিশেক উত্তরে পাঁচটা নিচু প্রবাল দ্বীপের সমষ্টি টেতিয়ারোয়া, এ অঞ্চলের গোত্রপতিদের অবকাশ যাপন কেন্দ্র। দ্বীপগুলোকে বেষ্টন করে আছে নিচু একটা প্রবাল প্রাচীর। অর্থাৎ চমৎকার একটা লেগুনের মাঝখানে দ্বীপ পাঁচটার অবস্থান। লেগুনের ভেতর স্বচ্ছ টলটলে সাগর শান্ত। এই ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জের মালিক তাহিতির সবচেয়ে বড় গোত্রপতি টেইনা। টেইনা তো বটেই, তাহিতি এরং আশপাশের দ্বীপগুলোর অন্যান্য গোত্রপতিরাও বছরে এক বা দুমাস কাটিয়ে যায় এখানে। অভিজাত পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে স্বাস্থোদ্ধারের জন্যেও এখানে নিয়ে আসা হয়।

খুবই দ্রুতগামী হিটিহিটির ক্যানোটা। গতি কম পক্ষে ঘন্টায় বারো নট, মানে বাউন্টির প্রায় দ্বিগুণ। আড়াই ঘণ্টাও লাগল না আমাদের টেতিয়ারোয়া লেগুনে পৌঁছুতে। দেখতে দেখতে ছোট ছোট ক্যানো আর নগ্নদেহী সাঁতারুর দল ঘিরে ধরল আমাদের।

একটু চটপটে আর বয়স্ক একজনকে লক্ষ করে আমার হয়ে হিটিহিটি প্রশ্ন করল, পিরিতেন-এর তিনজন সাদা মানুষ ওদের দ্বীপে এসেছে কি না, যদি এসে থাকে তাহলে এখন তারা কোথায়।

লোকটা জবাব দিল, হ্যাঁ, তিন জন সাদা-মানুষ এসেছিল, তবে রেশিক্ষণ থাকেনি এখানে। আরও সাদা মানুষ পিছু ধাওয়া করে আসতে পারে ভেবে চলে গেছে। সে দুতিন ঘন্টা আগের কথা।

কোথায় গেছে জানো নাকি? হিটিহিটি জিজ্ঞেস করল।

না, তবে দেখলাম পশ্চিম দিকে গেল।

আমার মনে হয় এইমিওতে গেছে ওরা, পাশ থেকে এক সাঁতারু বলে উঠল।

হতে পারে, আগের লোকটা বলল। তাহিতির পশ্চিম তীরেও যেতে পারে।

সন্ধ্যা হতে বিশেষ বাকি নেই, বাতাসও পড়ে আসছে ধীরে ধীরে (দক্ষিণ সাগরীয় অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যই এই, শেষ বিকেল থেকে বাতাস পড়তে থাকে, সন্ধ্যা হতে হতে থেমে যায় একেবারে। তাছাড়া চার্চিল ও তার দুই সঙ্গীর গন্তব্যও নিশ্চিত ভাবে জানা যাচ্ছে না; সব দিক বিবেচনা করে হিটিহিটি বলল, রাতটা টেতিয়ারোয়ায় কাটিয়ে দেই, কি বলো, বিয়্যাম? কাল ভোরে বাতাস উঠলে আবার রওনা হওয়া যাবে।

এর চেয়ে ভাল প্রস্তাব আর হতে পারে না। সুতরাং রয়ে গেলাম টেতিয়ারোয়ায়।

প্রবাল দ্বীপে সে রাতটার কথা আমি জীবনে ভুলব না। আগেই বলেছি টেতিয়ারোয়া এ অঞ্চলের গোত্রপতিদের অবকাশযাপনকেন্দ্র; সে কারণে বছরের প্রায় সব সময়েই কোন না কোন গোত্রপতি এখানে থাকে। কখনও কখনও এক সাথে তিন চারজনও থাকে। এখন আছে তিন জন। হিটিহটি আসায় হয়েছে চারজন। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো পইনো নামের এক বিখ্যাত যোদ্ধার বাসায়। পইনো এসেছে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে। অত্যধিক আভা (এক ধরনের স্থানীয় মদ পান করে মরতে বসেছিল বেচারা। মাদুরের ওপর শুয়ে থাকতে দেখলাম ওকে, নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই বললেই চলে, গায়ের চামড়া তুঁতের মত নীল। দেখে আমার দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। হিটিহিটি অবশ্য বলল, মাসখানেকের মধ্যে ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে।

পইনোর সেবা শুশ্রষার জন্যে এসেছে ওর বেশ কয়েকজন আত্মীয়। এক তুরুণী আছে তাদের ভেতর। অপূর্ব সুন্দরী। তাইয়াপুর নাম করা ভেহিয়াটুয়া পরিবারের মেয়ে সে। দুই বৃদ্ধা মহিলা আছে তার দেখাশোনার জন্যে। খাওয়ার সময় দূর থেকে এক পলক দেখলাম মেয়েটাকে। এরপর দেখতে ইচ্ছে হওয়া সত্ত্বেও রাতে হেইভার (এক ধরনের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান) আগে আর ওর দেখা পেলাম না।

সন্ধ্যার পর বেড়াতে বেরোলাম আমি আর হিটিহিটি। নারকেল বীথির মাঝ দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পর দূর থেকে ভেসে এল ঢাকের আওয়াজ। আরও কিছু

দূর এগিয়ে দেখতে পেলাম মশালের আলো। আমার তাইওর হাঁটার গতি দ্রুত। হয়ে গেল। সামনে বিরাট এক টুকরো সমতল ফাঁকা জায়গার এক প্রান্তে ঘষে ঘষে চারকোনা করা প্রবালের টুকরো সাজিয়ে একটা মঞ্চ মত তৈরি করা হয়েছে। তার সমনে বসে আছে কম পক্ষে দুতিনশো দর্শক। নারকেল পাতার, মশাল জ্বেলে উজ্জ্বল আলোকিত করে তোলা হয়েছে জায়গাটা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন দুই ভাড়-স্থানীয় ভাষায় ফাআতা-অভিনয় কুশলতার প্রমাণ দিয়ে বিদায় নিচ্ছে। হাসির ঝড় বয়ে যাচ্ছে দর্শকদের ভেতর।

হিটহিটিকে দেখে পথ করে দিল কিছু দর্শক। মঞ্চের একেবারে সামনে। গিয়ে বসলাম আমরা। ভঁড় দুজন নেমে যাওয়ার পর মঞ্চে উঠল দুজন তরুণী, সঙ্গে চার টুলী। ঢোলের তালে তালে নাচতে লাগল তারা। অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি। কোন কোনটা তো রীতিমত অশ্লীল মনে হলো। হিটিহিটি আমার কানে কানে জানাল জমির উর্বরা শক্তি বাড়ানোর জন্যে নাচা হয় এই নাচ।

অবশেষে শেষ হলো ছয় তরুণীর উন্মাদ উদ্দাম নৃত্য। মঞ্চ এখন শূন্য। আমার তাইও বলল, এবার নাকি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের একটা নাচ হবে।

দর্শকদের মাঝ দিয়ে এগিয়ে এল নাচের দ্বিতীয় দলটা। দুজনের দল। প্রতিটি মেয়ের সঙ্গে দুজন করে বৃদ্ধা আর একজন ঘোষক। ঘোষকরা একে একে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে লাগল নর্তকীদের নাম এবং পদবী, এক এক করে মঞ্চে উঠল দুই মেয়ে। বৃদ্ধারা রইল নিচে। একই রকম সাজসজ্জা করেছে দুটি মেয়ে। তুষারধবল টাপা কাপড়ের পোশাক, মাথায় টামাউ নামের বিচিত্র এক ধরনের সাজ। হাতে ছোট হাত পাখা, অদ্ভুত ভাবে বাঁকানো সেগুলোর হাতল। শুধু এ-ই না, নানা ধরনের স্থানীয় প্রসাধনী মেখে উজ্জ্বল করা হয়েছে চোখ, গাল, তুক-মোটকথা সৌন্দর্য।

দ্বিতীয় মেয়েটা মঞ্চে উঠতেই একটু যেন থমকালাম আমি। সেই মেয়েটা-পইনের আত্মীয়া; অভিজাত ইন্ডিয়ানরা সচরাচর যেমন হয়, সাধারণদের চেয়ে এক মাথা উঁচু। সন্ধ্যায় খাওয়ার সময় এক পলক দেখে বুঝতে পারিনি ওর সৌন্দর্য। এখন পারলাম। অপূর্ব মুখশ্রী আর দেহের গঠন। দক্ষ কোন শিল্পীর হাতে গড়া যেন। এমন রূপ ইউরোপীয় মেয়েদের মধ্যেও খুব কমই দেখা যায়। ঘোষক যতক্ষণ তার দীর্ঘ নাম, এবং আরও দীর্ঘ পদবীর তালিকা ঘোষণা করল ততক্ষণ সে নত মুখে গর্বিত অথচ বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল আমাদের মুখোমুখি। এত লম্বা নাম আর পদবীর কিছুই আমি বুঝতে পারব না অনুমান করে হিটিহিটি একটু ঝুঁকে নিচু কণ্ঠে ওর ডাক নামটা জানাল আমাকে।

তেহানি, বলল সে, অর্থাৎ সুপ্রিয়। মনে মনে বললাম, যোগ্য নামই বটে।

দুজনের নাচ বুরা। দুই ঘোষক মঞ্চ থেকে নেমে যেতেই নাচ শুরু করল তেহানি আর অন্য মেয়েটা। ধীর লয়ে বাজছে ঢাক আর স্থানীয় এক ধরনের বাঁশি। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুলছে দুই তরুণী। কি অপূর্ব দেহ ভঙ্গিমা, বাহুর সঞ্চালন, বঙ্কিম গ্রীবার নড়াচড়া! মুগ্ধ হয়ে দেখলাম আমি।

তেহানি আর তার সঙ্গিনী নেমে যাওয়ার পর মঞ্চে এল দুই ভাড়। আবার হাসির হররা উঠল দর্শকদের ভেতর। ইতোমধ্যে তৈরি হতে লাগল বুরা নাচের পরবর্তী জোড়া। কিন্তু আমার মন আর অনুষ্ঠানের দিকে নেই, বাসায় ফেরার জন্যে ব্যস্ত সে তখন; নিশ্চিত জানে, নাচ শেষে সেখানেই গেছে তেহানি।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই প্রায় জোর করে হিডিহিটিকে উঠিয়ে নিয়ে ফিরে এলাম পইনোর বাসায়। কিন্তু তেহানিকে দেখার সৌভাগ্য আর হলো না। দুই বৃদ্ধার পাহারায় আলাদা একটা ঘরে শুয়ে পড়েছে সে।

.

সূর্যোদয়ের ঘণ্টা দুয়েক পরে আমরা রওনা হলাম টেতিয়ারোয়া থেকে। সেদিনই দুপুরে মিস্টার ব্লাইকে জানালাম আমার অভিযানের ফলাফল। পরবর্তী তিন সপ্তাহ পলাতকদের কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। তারপর নিজেরাই এসে ধরা দিল তারা। আমি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পর সব ইন্ডিয়ান গোত্রপতিকে ডেকে ব্লাই অনুরোধ করে বলেছিলেন, তারা যদি পলাতক তিন বদমাশকে ধরে দেয়ার ব্যাপারে সাহায্য করে, তিনি খুব খুশি হবেন, ইংল্যান্ডে রাজা জর্জও খুশি হবেন। রাজা জর্জ খুশি হবেন শুনে সাহায্য করতে রাজি হয়েছিল গোত্রপতিরা। এবং সবাই যার যার প্রজাদের নির্দেশ দিয়েছিল, তিন পলাতককে দেখা মাত্র যেন ধরে নিয়ে আসে। ফলে চার্চিল, মুসাট আর মিলওয়ার্ড কোথাও একদিনের বেশি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেনি। ইন্ডিয়ানরা ওদের খবর পাওয়া মাত্র দলে দলে গিয়ে ধাওয়া করে, আর ওরা পালায়। এভাবে সপ্তাহ তিনেক কাটানোর পর আত্মসমর্পণ না করে পারেনি ওরা।

তিন জনকেই চাবকানো হলো-চার্চিলকে দুজন আর মুসভ্যাট ও মিলওয়ার্ডকে চার ডজন করে।

.

মার্চ-এর শেষ দিকে আমি-আমার সতীর্থ নাবিকরাও-মোটামুটি আন্দাজ করতে পারলাম, বাউন্টির যাত্রা করার সময় কাছিয়ে এসেছে। এক হাজারেরও বেশি রুটিফলের চারা যোগাড় হয়েছে, সেগুলো জাহাজে তোলাও হয়ে গেছে। এখন বাউন্টির পেছন দিককার বড় কেবিনটায় ঢুকলে মনে হয় কোন বোটানিক্যাল গার্ডেনে এসে পড়েছি।

যাত্রার অন্যান্য আয়োজন সম্পন্ন প্রায়। প্রচুর শুয়োরের মাংস নুন দিয়ে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও নেয়া হয়েছে বিপুল পরিমাণ ইয়াম (এক ধরনের আলু)। একমাত্র ব্লাই জানেন কখন আমরা পাল তুলে দেব। তবে এটুকু স্পষ্ট, রওনা হওয়ার দিন আর বেশি দূরে নয়।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তাহিতি ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে মনের ভেতর খুব একটা তাড়া অনুভব করছি না আমি। হিটিহিটি আর ওর পরিবারের সাথে একাত্ম হয়ে গেছি এই কমাসে। ওরা আমার আত্মীয় হয়ে উঠেছে যেন। দেশে যদি মা না থাকত আর বলা হত বাকি জীবন আমাকে এই আধা সভ্য আধা অসভ্যদের দেশে কাটাতে হবে, খুশি মনেই আমি মেনে নিতমি প্রস্তাবটা।

এখন আমি স্থানীয় ভাষায় মোটামুটি আলাপ চালাতে পারি। যদিও জানি এই মোটামুটিটাকে পুরোপুরিতে পরিণত করতে হলে বহু বছরের সাধনার প্রয়োজন, কিন্তু সেই সাধনার সময় আমি পাব না-অন্তত এখন নয়। ইংল্যান্ডে গিয়ে স্যার জোসেফ ব্যাঙ্কসকে জানাতে হবে আমার কাজের ফলাফল, তারপর স্যার জোসেফ চাইলে আবার আমি আসব। যদি জানতাম আগামী ছমাস বা এক বছরের ভেতর ইংল্যান্ড থেকে আরেকটা জাহাজ তাহিতিতে আসবে তাহলে হয়তো কাজ শেষ করার জন্যে আমাকে রেখে যাওয়ার অনুরোধ করতাম মিস্টার ব্লাইকে। কিন্তু জাহাজ তাহিতিতে আসবেই এ মুহূর্তে এমন নিশ্চয়তা দেয়ার কেউ নেই হাতের কাছে। সুতরাং মনে মনে প্রস্তুত হলাম কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই তাহিতি ছেড়ে যাওয়ার জন্যে।

ক্রিশ্চিয়ানের অবস্থাও আমার মত। তাহিতি ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না ওর। মাইমিতির সঙ্গে ওর সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন বিচ্ছেদ দুজনের জন্যেই খুব কষ্টদায়ক হবে। এক অবস্থা মিশিপম্যান স্টুয়ার্ট, ইয়ং আর খালাসী আলেকজান্ডার স্মিথেরও। টাউরুয়া নামের এক মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ইয়ং-এর। স্টুয়ার্ট ভালবেসেছে এক গোত্রপতির মেয়েকে মেয়েটাকে ও পেগি বলে ডাকে। স্মিথের ঘনিষ্ঠতা হয়েছে চঞ্চল এক মেয়ের সাথে। তার নাম পারাহা ইটি। এই তিন জনের জন্যেও তাহিতি ছেড়ে যাওয়ার অর্থ কিছু হারানো। আমার ব্যাপারটা অবশ্য অন্য রকম। জাগতিক কিছু আমি হারাব না ঠিক, কিন্তু যা হারাব তার মূল্যও অনুভূতির বিচারে কম নয়। সহজ সরল মানুষদের এই সুন্দর দেশটাকে সত্যিই ভালবেসে ফেলেছি আমি-আরও বেশি ভালবেসেছি হিটিহিটির মত সহৃদয় বন্ধুকে।

বাউন্টি রওনা হওয়ার দিন দুই আগে ইয়ং, স্টুয়ার্ট আর স্মিথকে নিয়ে, ক্রিশ্চিয়ান এল আমার কাছে। ওদের দেখেই বুঝলাম কিছু একটা খবর আছে। ক্রিশ্চিয়ান, ইতোমধ্যে ইন্ডিয়ানদের রীতিনীতি সম্পর্কে মোটামুটি জ্ঞানার্জন, করেছে, ও জানে গুরুত্বপূর্ণ কোন খবর হুট করে জানানো পছন্দ করে না ওরা, আগে কিছু হালকা কথাবার্তা বলে নিতে হয়। তাই সে তক্ষুণি খবরটা ভাঙল না, আমার কাছে।

মাইমিতি গভীর আবেগে স্বাগত জানাল প্রেমিককে। বৃদ্ধ হিটিহিটি উঠানের ধারে চালার নিচে নিয়ে গিয়ে মাদুর পেতে বসতে দিল অতিথিদের। ভুত্যরা ডাব কেটে এনে দিল। স্টুয়ার্ট, ইয়ং আর স্মিথের বান্ধবীরাও এসে গেছে বন্ধুদের খবর পেয়ে। খেতে খেতে আলাপ করতে লাগলাম আমরা। কিছুক্ষণ পর ক্রিশ্চিয়ান মুখ তুলে তাকাল আমার দিকে।

তোমার জন্যে খবর আছে, বিয়্যাম, বলল সে। শনিবার মানে পরশু দিন আমরা রওনা হব। ব্লাই তোমাকে শুক্রবার রাতের ভেতর জাহাজে চলে যেতে বলেছে।

কথাগুলো বুঝতে পারল মাইমিতি। ভার মুখে চাইল আমার দিকে, তারপর প্রেমিকের একটা হাত তুলে নিয়ে শক্ত করে ধরে রইল।

আমার একদম যেতে ইচ্ছে করছে না, আবার বলল ক্রিশ্চিয়ান, ভালই ছিলাম এখানে।

আমারও, পেগির দিকে এক পলক তাকিয়ে যোগ করল স্টুয়ার্ট।

আমি-বাবা তোমাদের মত ছিচকাঁদুনে নই, মন্তব্য করল ইয়ং। আমি চলে গেলে নিশ্চয়ই শোকে পাথর হয়ে যাবে না টাউরুয়া। কয়েক দিন খারাপ, লাগবে, তারপর আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে। হয়তো এখানকার কোন সুপুরুষ ছেলের সাথে শিগগিরই বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলবে আমাকে ভোলার জন্যে।।

পাশেই বসে ছিল মেয়েটা। ভয়ানক ভাবে মাথা নেড়ে সে বোঝাতে চাইল, না, কখনও সে অমন করবে না। ক্রিশ্চিয়ান হাসল।

আমার মনে হয় ইয়ং ঠিকই বলেছে, সে বলল। মানুষের কোন দুঃখই চিরস্থায়ী নয়। দুঃখ শোক থাকে তবু মানুষ এগিয়ে যায়, মানুষের ধর্মই এই।

সন্ধ্যার সামান্য আগে ওরা ফিরে গেল জাহাজে। পরদিন সন্ধ্যায় আমিও বিদায় নিলাম হিটিহিটি ও তার পরিবারের কাছ থেকে। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, চোখ দুটো আমার ভিজে উঠেছিল তখন, এই ভেবে যে, এই সুন্দর মানুষগুলোকে হয়তো আর কখনও দেখব না।

বাউন্টিতে ফিরে দেখি ইন্ডিয়ানে গিজ গিজ করছে জাহাজ! ডাব, নারকেল, কলা, শুয়োর, ছাগলে বোঝাই ডেক। তাহিতির মহা গোত্রপতি টেইনা আর তার স্ত্রী ইটিয়াকেও দেখলাম। ক্যাপ্টেনের অতিথি হয়ে সে রাতটা ওরা থাকল আমাদের জাহাজে। ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ওদের লঞ্চে করে পৌঁছে দিয়ে আসা হলো তীরে। তারপর আমরা নোঙ্গর তুলে পাল উড়িয়ে দিলাম। বাউন্টি এগিয়ে চলল খোলা সাগরের দিকে।

.

সাত

আবার আমরা সাগরে ভাসলাম।

তাহিতিকে পেছনে ফেলে যত এগিয়ে চলেছি ততই সেখানকার স্মৃতি স্বপ্নের মত লাগছে। যতক্ষণ না ছোট হতে হতে দিগন্তে বিলীন হয়ে গেল ততক্ষণ আমরা তাকিয়ে রইলাম দ্বীপটার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে, পুরানো নিয়ম মত সবাই লেগে গেলাম যার যার কাজে।

তেইশ এপ্রিল সকালে দেখা পেলাম ফ্রেন্ডলি আর্কিপিলাগোর দ্বীপ নামুকার! ক্যাপ্টেন কুকের সঙ্গে এখানে আগে এসেছেন ব্লই। এন্ডেভার প্রণালীর দিকে আরও এগোনোর আগে এখান থেকে আমাদের কাঠ আর পানির ভাণ্ডার কিছুটা সমৃদ্ধ করে নিতে চাইলেন তিনি।

দক্ষিণ দিকে বইছে বাতাস, সে কারণে জাহাজ তীরের দিকে চালাতে বেশ বেগ পেতে হলো। নামুকা উপকূলে যখন নোঙ্গর ফেললাম তখন সন্ধ্যা হয় হয়।

দ্বীপের যে দিকটায় বাউন্টি নোঙ্গর ফেলেছে সেদিকটা পাহাড়ী, গাছপালা শূন্য; পানির উৎস, সেই সাথে লোক বসতিও, কাছাকাছি আছে বলে মনে হলো না। সুতরাং পরদিন সকালে আবার নোঙ্গর তুলতে হলো। কয়েক মাইল পুবে গিয়ে নতুন করে নোঙ্গর ফেললাম আমরা। এবার চারদিক থেকে ইন্ডিয়ানরা ঘিরে ধরল আমাদের। শুধু নামুকা নয়, আশপাশের অন্যান্য দ্বীপ থেকেও এগিয়ে আসতে লাগল ক্যানোর ঝাঁক। কিছুক্ষণের ভেতর বাউন্টির ডেকে এত ইন্ডিয়ান উঠে এল যে আমাদের কাজকর্ম সব বন্ধ হওয়ার যোগাড় হলো। অবশেষে দুজন গোত্রপতি যখন এল তখন একটু যেন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গেল জাহাজে। ব্লাই ওদের বোঝাতে পারলেন, ডোকের ওপর এত লোক থাকলে আমাদের পক্ষে কাজ করা অসম্ভব ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর পরিষ্কার হয়ে গেল ডেক। দুই গোত্রপতি কেবল রইল জাহাজে, বাকি সবাই নেমে গেল যার যার ক্যানোয়। ব্লাই এবার আমাকে ডাকলেন দোভাষীর কাজ করার জন্যে। কিন্তু দেখা গেল আমার তাহিতীয় ভাষার জ্ঞান সামান্যই কাজে আসছে। ফ্রেন্ডলি দ্বীপপুঞ্জের লোকদের ভাষার সঙ্গে বিস্তর পার্থক্য তাহিতীয় ভাষার। যাহোক ইশারা ইঙ্গিত আর কিছু কিছু শব্দ প্রয়োগে শেষ পর্যন্ত দুই গোত্রপতিকে বোঝানো গেল আমরা কি জন্যে এসেছি। চিৎকার করে দুজন কিছু নির্দেশ দিল তাদের লোকদের উদ্দেশ্যে, অমনি বেশির ভাগ ক্যানো দ্রুত তীরের দিকে এগোতে শুরু করল।

ক্যাপ্টেন কুক অঞ্চলটার নাম দিয়েছিলেন বটে ফ্রেন্ডলি আর্কিপিলাগো, কিন্তু হিটিহিটির মুখে বা এ এলাকা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল সতীর্থ দুএকজন নাবিকের কাছে যা শুনেছি তাতে মনে হয় না এখানকার লোকেরা স্বভাবগত ভাবে খুব একটা ফ্রেন্ডলি বা বন্ধুভাবাপন্ন। নামুকা থেকে পানি আর কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রমাণ হয়ে গেল ব্যাপারটা। চরম অসৎ রীতিমত ধড়িবাজ এখানকার মানুষ। সামান্য সুযোগ যদি দেয়া হয় যে কোন জিনিস চুরি করে এমন কি কেড়ে নিয়ে পালাতে পারে এরা। এসব কথা ভেবে ক্রিশ্চিয়ান তীরে যাওয়ার সময় ব্লাইকে বলল সঙ্গে সশস্ত্র রক্ষী দিতে। প্রস্তাব শুনে হাসলেন ক্যাপ্টেন।

এই অসভ্যগুলোকে ভয় পাচ্ছ তুমি, ক্রিশ্চিয়ান?

না, স্যার, ভয় নয়, জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান, আমি চাইছি সাবধান হতে। আমার মতে…

তোমার মতে? কে চেয়েছে তোমার মত? তোমার চেয়ে সহকারী হিসেবে একজন মেয়েমানুষকে আনলে ভাল করতাম দেখছি! এসো, নেলসম, ভীতুর ডিমগুলোকে দেখিয়ে দেই, কি করে তীরে যেতে হয়। বলে আর দাঁড়ালেন না ব্লাই, মই বেয়ে নেমে গেলেন কাটার-এ। নেলসন গেল পেছন পেছন–গত কয়েক দিনে বেশ কিছু রুটিফলের চারা মরে গেছে, শূন্যস্থান পূরণ করার জন্যে নতুন কিছু চারা সগ্রহ করতে চান উদ্ভিদবিজ্ঞানী।

দুই গোত্রপতি আগেই নেমে গিয়েছিল কাঁটার-এ। ব্লাই আর নেলসন নামতেই এবার নাবিকরা দাঁড় টানতে লাগল ডাঙার দিকে।

ছোট ঘটনা, কিন্তু ঘটল জাহাজের বেশির ভাগ নাবিকের সামনে। আমি খেয়াল করলাম কি প্রচণ্ড চেষ্টা করতে হলে ক্রিশ্চিয়ানকে রাগ সামলানোর জন্যে। এই বদ অভ্যাসটা আছে ব্লাইয়ের, যখন তখন এধরনের হুল বেঁধোনো কথা বলে বসেন অফিসারদের, সামনে কে আছে না আছে তা দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না।

যা হোক, সেদিন অস্বাভাবিক কিছু ঘটল না। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে ব্লাই যখন তীরে যান তার সাথে ছিল দুজন গোত্রপতি। তাদের সামনে তাকে হেনস্থা করার সাহস কেউ পায়নি। কিন্তু পরদিন যখন আমরা গেলাম তখন ক্রিশ্চিয়ানের ধারণাই সত্য প্রমাণিত হলো।

তীরে নেমে উপযুক্ত গাছ বেছে সবে কাটতে শুরু করেছি, এই সময় আমরা আক্রান্ত হলাম। কয়েকশো দ্বীপবাসী চারদিক থেকে ঘিরে ধরল আমাদের। আমাদের চেহারা পোশাক আশাক দেখে খুব মজা পাচ্ছে এমন ভঙ্গিতে হাসতে লাগল ওরা। কেউ কেউ এগিয়ে এসে খোঁচা মারল বুকে, পেটে, কোমরে। দুএকজন আরও দুঃসাহসের পরিচয় দিল, আমাদের যারা কাঠ কাটছিল তাদের হাত থেকে কুড়াল কেড়ে নিল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা, কোনমতে সসম্মানে পালিয়ে আসতে পারলে বাঁচি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ব্লাই সশস্ত্র রক্ষী দিয়েছিলেন সঙ্গে, তবে তাদের ওপর কড়াকড়ি নির্দেশ জারি করে দিয়েছিলেন, যেন কোন অবস্থাতেই গুলি চালানো না হয়। সেজন্যে হাতে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও আমরা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হলাম।

জাহাজে পৌঁছে ক্রিশ্চিয়ান সব বলল ব্লাইকে। শুনে তার চেহারা যা হলো সে দেখার মত। তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাগলেন।

তুমি একটা-তুমি একটা অযোগ্য কাপুরুষ গাধা! চিৎকার করে উঠলেন তিনি। কয়েকটা অসভ্য বদামশের ভয়ে পালিয়ে এলে, সঙ্গে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও?

ব্যবহার করতে নিষেধ করে অস্ত্র দিলে লাভ কি, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান।

কথাটা যেন কানেই ঢুকল না ব্লাইয়ের। এমন গালাগালির তুবড়ি ছোটালেন যে পালিয়ে বাচল বেচারা ক্রিশ্চিয়ান।

আগেও দেখেছি, আজ আবার দেখলাম, রেগে গেলে একেবারে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যান ব্লাই। কিছুই তখন তার মনে থাকে না। নিজে যে কথা বলেছিলেন তাও ভুলে যান অবলীলায়। এধরনের মানুষকে যদি কোন প্রতিষ্ঠানের মাথায় বসিয়ে দেয়া হয়, সে প্রতিষ্ঠানের কপালে যে দুর্ভোগ নেমে আসবে তাতে সন্দেহ নেই। বাউন্টির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়নি।

.

পরদিন অর্থাৎ ছাব্বিশ এপ্রিল বিকেলে আমরা রওনা হলাম নামুকা থেকে। বাতাস হালকা বলে জাহাজ খুব দ্রুত এগোচ্ছে না! সারা রাত আর পরের সারা দিন জাহাজ চালিয়েও উপকূল থেকে সাত আট লিগের বেশি দূরে আসতে পারলাম না।

সাতাশ তারিখ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেবিনেই কাটালেন ব্লাই। বিকেলের শুরুতে ডেকে বেরিয়ে এলেন স্যামুয়েলকে কিছু নির্দেশ দেয়ার জন্যে। তাহিতি থেকে আনা জিনিসপত্রের বেশিরভাগই এখনও ছড়িয়ে আছে ডেকের ওপর। কোয়াটার ডেকে কামানগুলোর মাঝখানে স্তূপ করা রয়েছে বিপুল সংখ্যক নারকেল। স্যামুয়েল তখন হিসেব করে দেখছে তা থেকে দুএকটা খোয়া গেছে, বা নষ্ট হয়েছে কিনা। ব্লাইকে দেখেই সে কলকল করে উঠল:

নারকেল কয়েকটা কম মনে হচ্ছে, স্যার!

ভাল করে শুনে দেখেছ?

হ্যাঁ, স্যার।

তক্ষুনি সব অফিসারকে ডেকে আসার নির্দেশ দিলেন স্নাই। তারপর একে একে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন তারা ব্যক্তিগত ভাবে কে কতগুলো নারকেল কিনেছে, এবং কোয়ার্টার ডেক থেকে কাউকে নারকেল চুরি করতে দেখেছে কিনা ইত্যাদি। সবাই বলল তারা দেখেনি। এদিকে খেপতে শুরু করেছেন ব্লাই। তার ধারণা, চোরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে অফিসাররা। অবশেষে ক্রিশ্চিয়ানের সামনে এলেন তিনি।

এবার, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, বলো, ঠিক কতগুলো নারকেল কিনেছিলে তুমি?

গুনে দেখিনি, স্যার, জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। কিন্তু তাই বলে আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন মা,আমি আপনারগুলো থেকে চুরি করেছি?

হ্যাঁ, শয়তানের বাচ্চা! আমি তা-ই ভাবছি। নিশ্চয়ই আমার নারকেল তুমি চুরি করেছ, না হলে নিজেরগুলোর হিসেব ঠিক মত দিতে পারতে! তুমি-তুমি শুধু না, তোমরা সবাই চোর-জঘন্য চোর, বদমাশ। আজ নারকেল চুরি করেছ, কাল করবে ইয়াম-তোমরা না করলেও তোমাদের হয়ে তোমাদের স্যাঙাৎ খালাসীরা করবে। কিন্তু ভেবো না এত সহজে আমি ছেড়ে দেব! কি ভাবে তোমাদের মত কুকরদের শায়েস্তা করতে হয়, আমি জানি

টকটকে লাল হয়ে উঠেছে প্রত্যেকটা অফিসারের মুখ। কিন্তু কেউ কোন কথা বলল না। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল সব কজন। দুহাত পেছনে নিয়ে পায়চারি করছেন ব্লাই। মুঠো একবার খুলছে একবার বন্ধ হচ্ছে। হঠাৎ

দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁক ছাড়লেন তিনি।

স্যামুয়েল!

জি, স্যার?

পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই বদমাশগুলোর মদ বন্ধ রাখবে! আর ইয়াম, দেবে মাথা পিছু এক পাউন্ডের জায়গায় আধ পাউন্ড করে! পরের আদেশটা জাহাজের সবার জন্যে প্রযোজ্য হবে। বোঝা গেছে?

জি, স্যার।

অফিসারদের দিকে তাকালেন ব্লাই। খোদার কসম বলছি, আর যদি কিছু খোয়া যায় সিকি পাউন্ডে নামিয়ে আনব বরাদ্দ, দেখে নিও!

এখানেই ক্ষান্ত হলেন না ব্লাই। এরপর তিনি আদেশ দিলেন যার কাছে যত নারকেল আছে সব জমা দিতে হবে জাহাজের ভাণ্ডারে। অফিসার নাবিক। সবাইকেই। একটা শব্দ উচ্চারণ করল না কেউ-না, নাবিকরা, না অফিসাররা, যার যে কটা নারকেল ছিল এনে জমা দিল স্যামুয়েলের কাছে।

নীরব নিথর একটা সন্ধ্যা এল জাহাজে। ইংল্যান্ড থেকে রওনা হওয়ার পর এমন নীরব সন্ধ্যা বাউন্টিতে আর এসেছে বলে আমার মনে পড়ে না। সবার মনে এক চিন্তা, এখনও দীর্ঘ সময় সাগরে থাকতে হবে। হয়তো দুমাস, হয়তো এক বছর। কেমন কাটবে সে দিনগুলো?

.

মাঝরাতে যখন আমার কাজের সময় শেষ হলো তখন চারপাশে সান্ত্রর পুকুরের মত শান্ত। কাঁচের মত চকচকে জলের উপর প্রতিফলিত হচ্ছে আকাশের তারা।

নিচে নেমে টের পেলাম আমাদের ছোট্ট কুঠুরিটা জ্বলন্ত চুল্লীর মত হয়ে আছে। কয়েক দিন ধরে বাতাস নেই বললেই চলে। উপরে খোল ডেকেই গরমে তিষ্ঠানো দায়, জাহাজের নিচে বদ্ধ জায়গায় অবস্থা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এমনিতে মনে নানা রকম দুশ্চিন্তা, তার ওপর এই গরম-ঘুম আসবে না ভেবে আবার ডেকে উঠে এসে রেলিংয়ের ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম।

তাকিয়ে আছি কালো সাগরের দিকে হঠাৎ পাশে কারও নিশ্বাস ফেলার শব্দ পেয়ে, ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, টিঙ্কলার।

নিচে বড্ড গরম, সে বলল।

বেশ কিছুক্ষণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলাম দুজন। হঠাৎ টিঙ্কলার ফিসফিস করে, ডাকল আমাকে

বিয়্যাম!

ঘাড় ফেরালাম আমি। সতর্ক চোখে চারদিকে তাকাচ্ছে টিঙ্কলার। আশেপাশে কেউ নেই, নিশ্চিত হয়ে ও আবার ডাকল:

বিয়াম!

হ্যাঁ, বলো।

আমি একটা জঘন্য লোক, বিশ্বাস করো তুমি?

মানে!?

ক্যাপ্টেনের খোয়া যাওয়া নারকেলের একটা আমি চুরি করেছি।

তাহলে তুমিই সেই হতভাগা, আমাদের এই দুর্ভোগের জন্যে দায়ী?

হ্যাঁ, বিয়্যাম, ভাঙা গলায় বলল টিঙ্কলার। তবে আমি একা নই, আরও দুজন ছিল আমার সঙ্গে, নাম বলব না। ভীষণ পিপাসা পেয়েছিল, বুঝলে, কিন্তু এমন আলসেমী লাগছিল মাস্থলে উঠতে-এদিকে সামনে রয়েছে কচি ডাবগুলো, লোভ সামলাতে পারলাম না। জাহান্নামে যাক বুড়ো নেলসনের রুটিফলের বাগান!

রুটিফলের চারাগুলো সম্পর্কে আমাদের সবার মনের অবস্থা কম বেশি এরকম। কারণও আছে তার। পিপসার সময় নাবিকরা পানি পাক না পাক, চারাগুলোতে নিয়মিত পানি দিতেই হবে, না হলে মরে যাবে ওগুলো। সেজন্যে দিনে দুবারের বেশি পানি খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন ব্লাই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এতেও ক্ষান্ত হননি তিনি, আমরা যাতে বাধ্য হয়েই পানি কম খাই সেজন্যে অদ্ভুত এক কৌশল অবলম্বন করেছেন। বড় একটা মগ ঝুলিয়ে রেখেছেন প্রধান মালের মাঝামাঝি জায়গায়, সেই সাথে আদেশ জারি করে দিয়েছেন, কাজের সময় পানি খেতে হলেসে যে-ই হোক না কেন-এই, মগ পেড়ে এনে খেতে হবে, তারপর আবার মগটা রেখে আসতে হবে জায়গা মত। ব্লাই-এর বুদ্ধিটা যে কাজে লেগেছে তাতে সন্দেহ নেই। খুব বেশি তেষ্টা না পেলে পানি খাওয়ার কথা ভুলেও ভাবে না কেউ। বেচারা টিঙ্কলার অন্য দুজনও-এই কষ্টটুকুর হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে করে বসেছে অপকর্মটা।

বাবা, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি, আমাকে সন্দেহ করেনি, বলে চলল টিঙ্কলার। অবশ্য যদি করতও আমি সোজা অস্বীকার করতাম। কিন্তু, ভাই, ক্রিশ্চিয়ানের জন্যে দুঃখ হচ্ছে আমার। আমি তো জানি ও দোষ করেনি।

ক্রিশ্চিয়ান জানে, তুমি যে, ডাব নিয়ে কয়েকটা?

কয়েকটা না-মাত্র একটা! আগেই তো বললাম, আমার সাথে আরও লোক ছিল। যা, ক্রিশ্চিয়ান জানে। ও দেখে ফেলেছিল আমাকে ডাব নিতে।

কিছু বলেনি।

না। না দেখার ভান করে অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল-যে কোন ভদ্র অফিসার এক্ষেত্রে তা-ই করত। এমন কোন অপরাধ আমি করিনি যার কথা ক্যাপ্টেনকে নালিশ করতে হবে। কয়েক হাজার নারকেলের ভেতর থেকে একটা মাত্র সরিয়েছি-তা-ও পিপাসায় অস্থির হয়ে। এর জন্যে যে শাস্তি ঈশ্বর আমাকে দেবেন আমি খুশি মনে ভোগ করব।

কোয়ার্টার ডেকের একটা কামানের কাছে চলে গেল টিঙ্কলার। একটা হাতকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়ল। আর দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না, এবার আমারও উচিত কোথাও শুয়ে পড়া, ভেবে ঘুরে দাঁড়াতেই ডেকের উল্টোদিকে দেখতে পেলাম পেকওভারকে। কেমন একটু অস্বস্তি হলো আমার। টিঙ্কলারের কথা কি শুনে ফেলেছে ও? যদি শুনে থাকে তাহলে কি ক্যাপ্টেনকে জানাবে। আসলে নারকেল চুরি করেছে টিঙ্কলার আর আরও দুজন যাদের নাম ও বলেনি?

এই সব সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় নিচে নামার মইয়ের মুখে দেখতে গেলাম একটা ছায়া মূর্তি। মূর্তিটা ক্রিশ্চিয়ানেরবার কয়েক ডেকের এমাথা ওমাথা পায়চারি করার পর আমাকে দেখতে পেল ও।

এখনও ঘুমাওনি, বিয়্যাম? আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল ক্রিশ্চিয়ান।

নাহ, নিচে এত গরম…

হুঁ…। চুপ করে গেল সে। অনেকক্ষণ পর হঠাৎ বলল, রাতে আমাকে খেতে ডেকেছিল, জানো? বিকেলে গায়ে থুতু দিয়ে রাতে ডেকেছে খেতে! কেন বলতে পারো, বিয়্যাম?

আপনি যাননি?

মাথা খারাপ! আমার গায়ে তো কুত্তার চামড়া নয়!

ও গলায় এমন গম্ভীর হতাশার সুর, আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ক্রিশ্চিয়ান আবার বলল, আমরা সবাই ওর হাতের মুঠোয়। অফিসার নাবিক সবাই। কুত্তার চেয়ে ভাল কিছু আমাদের ও মনে করে না। জানো, বিয়্যাম, এক মুহূর্তও আর এ জাহাজে থাকতে ইচ্ছে করে না আমার।

আবার চুপ হয়ে গেল ক্রিশ্চিয়ান। অনেকক্ষণ পর বলল, আমার একটা কাজ করে দেবে তুমি, বিয়্যাম?

কি?

দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় কখন কি ঘটে কেউ বলতে পারে না। কোন কারণে, ধরো, আমি দেশে ফিরতে পারলাম না, তখন কি তুমি কাম্বারল্যান্ডে আমার বাড়ির লোকদের সাথে একটু দেখা করতে পারবে?

পারব না কেন? আমি জবাব দিলাম।

যেদিন বাউন্টিতে যোগ দিতে আসি সেদিন আসার আগে বাবা বলেছিলেন, জাহাজের কারও সাথে যেন এই ব্যবস্থা করে রাখি। যদি আমার কিছু ঘটে যায়, বাবা বলেছিলেন, আমার কোন বন্ধুর সাথে আলাপ করতে পারলে আর কিছু না হোক মনে অন্তত একটু স্বস্তি পাবেন তিনি। আমি কথা দিয়েছিলাম বাবাকে! এতদিন এ নিয়ে কাউকে কিছু বলিনি, এখন মনে হচ্ছে বলা দরকার!

আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন, স্যার, ওর হাত ধরে একটু নেড়ে আমি বললাম।

বেশ, তাহলে, এই কথা রইল।

পেছন থেকে ভেসে এল একটা গলা, এখনও জেগে আছ, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান?

সাঁ করে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি আর ক্রিশ্চিয়ান। খুব বেশি হলে এক গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছেন ব্লাই। খালি পা, সেজন্যে তার পায়ের আওয়াজ আমরা শুনতে পাইনি।

হ্যাঁ, স্যার, শীতল কণ্ঠে জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান।

আর তুমি, বিয়্যাম, ঘুম আসছে না?

নিচে ভীষণ গরম, স্যার।

তাতে কী? একটা কথা তোমার জেনে রাখা দরকার, মিস্টার বিয়্যাম, সত্যিকারের নাবিক হতে হলে, প্রয়োজন বোধে চুল্লীর ভেতর বা বরফের ওপর ঘুমানোর জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।

একথার কোন জবাব হয় না। হলেও ক্যাপ্টেনের মুখের ওপর তা দেয়া যায় না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। মিস্টার ব্লাইও দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন জবাব আশা করছেন। তারপর হঠাৎই ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে গেলেন মইয়ের দিকে।

শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিল ক্রিশ্চিয়ান।

কামানের পাশে গাঢ় ছায়ায় শুয়ে ছিল টিঙ্কলার। এবার উঠে বসন্থ। দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে হাই তুলল লম্বা করে।

নিচে যাও, বিয়্যাম, প্রমাণ করো, তুমি সত্যিই সত্যিকারের নাবিক। যত্তসব, ঘুমটা যেই লেগে এসেছে অমনি হাজির ব্যাটা।

তুমি শুনছ ওঁর কথা? 

হ্যাঁ, ক্রিশ্চিয়ানের কথাও। আমার বাবা ওর বাবার মত কোন অনুরোধ করেনি। তাতে কি প্রমাণ হয়?- আমার বাবা বেচারা ধরেই নিয়েছিল আমি ফিরব না…একটু পানি খাওয়া দরকার। এক ঘণ্টা ধরে শুয়ে শুয়ে এই একটা কথাই ভাবছিলাম। কি করি বলো তো? দুবার পানি খাওয়া হয়ে গেছে, সকালের আগে আর খেতে পাব না। আমার জায়গায় তুমি হলে কি করতে?

পেকওভার নিচে গেছে, আমি বললাম, সুযোগটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে দেখতে পারো।

তাই নাকি? লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল টিঙ্কলার। বিড়ালের মত নিঃশব্দে, বানরের মত দ্রুত উঠে গেল মাস্তুল বেয়ে। মগ পেড়ে এনে পানি খেল। ওটা আবার মাস্তুলে রেখে মাত্র ও নিচে নেমেছে এই সময় পেকওভারকে আবার দেখা গেল ডেকের ওপর। ওর দিকে একবারও না তাকিয়ে মইয়ের দিকে এগোলাম,আমি আর টিঙ্কলার। নিচে নামতে নামতে শুনলাম ঘণ্টার শব্দ। তিন বার। মানে রাত তিনটা। মাস্তুলের ওপর থেকে ভেসে এল পাঞ্জেরীর (পাহারাদার) চিৎকার: সব ঠিক আছে?

হ্যামকে উঠে শুয়ে পড়লাম আমি।

.

আট

দিনের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে কি করেনি।

কাঁধে কারও জোর ধাক্কা খেয়ে ঘুম ভেঙে গেল আমার। উঠে বসতে না। বসতেই ওপর থেকে ভেসে এল ভারী পায়ের ধুপধাপ আওয়াজ আর অনেক মানুষের সম্মিলিত চিৎকার। মিস্টার ব্লাইয়ের গলাও আছে তার ভেতর। হতবুদ্ধি হয়ে ভাবছি, কি হতে পারে, এই সময় লক্ষ করলাম বাউন্টির, মাস্টার অ্যাট আর্মস চার্চিল পঁড়িয়ে আমার হ্যামকের পাশে, হাতে পিস্তল। থম্পসন বেওনেট লাগানো একটা মাস্কেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে মেইন হ্যাঁচের কাছে, তার পাশেই মুখ ভোলা অবস্থায় পড়ে আছে অস্ত্র এবং গোলা-বারুদ রাখার একটা সিন্দুক। ব্যাপার কি কিছু বুঝতে পারছি না। ভাবলাম চার্চিলকে জিজ্ঞেস করি। কিন্তু আমি মুখ খোলার আগেই দুজন খালাসী ছুটতে ছুটতে ঢুকল আমাদের বার্থে। তাদের একজন চিৎকার করে উঠল:

আমরা আছি তোমাদের সাথে, চার্চিল! অস্ত্র দাও আমাদের!

দ্রুত দুটো মাস্কেট তুলে দিল থম্পসন দুজনের হাতে। আবার ডেকের ওপর উঠে গেল ওরা।

আমার পাশের হ্যামকটা স্টুয়ার্টের। উঠে পড়েছে সে-ও। কিন্তু ইয়ং এত হৈ-চৈ, সত্ত্বেও ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে।

কি হয়েছে, চার্চিল। কেউ আক্রমণ করেছে আমাদের। অবশেষে আমি জিজ্ঞেস করতে পারলাম।

তাড়াতাড়ি কাপড় পরে নাও, মিস্টার বিয়্যাম, ও জবাব দিল। আমরা জাহাজ দখল করে নিয়েছি, ক্যাপ্টেন ব্লাই এখন আমাদের হাতে বন্দী।

ঘুম ঘুম ভাব ভাল করে কাটেনি আমার। বোধহয় সে কারণেই কথাগুলোর মর্ম সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে পারলাম না। বোকার মত মুখ করে তাকিয়ে রইলাম চার্চিলের দিকে।

ওরা বিদ্রোহ করেছে বিয়্যাম। চিৎকার করে বলল স্টুয়ার্ট। হায় ঈশ্বর! চার্চিল, তোমরা পাগল হয়ে গেছ যা করছ, তার ফলাফল সম্পর্কে কোন ধারণা। আছে তোমাদের?

কি করছি, ভাল করেই জানি আমরা, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল চার্চিল। ব্লাই নিজে তার এ পরিণতি ডেকে এনেছে। ওর বারোটা এবার আমরা বাজিয়ে ছাড়ব, খোদার কসম বলছি!

কুত্তাটাকে গুলি করে মারব আমরা, ভয় দেখানো ভঙ্গিতে মাকেটটায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল থম্পসন। তোমরা যদি কোন রকম চালাকির চেষ্টা করো, কয়েকটা খুন বেশি করতে হবে আমাদের! চার্চিল, বেঁধে ফেল দুটোকে! ওদের বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।

বেশি বকবক না করে যা বলেছি তাই করো, জবাব দিল চার্চিল। সিন্দুকটার দিকে খেয়াল রাখো। মিস্টার বিয়্যাম, জলদি কাপড় পরে নাও। কুইনটাল, তুমি ওই দরজার কাছে দাঁড়াও। আমার হুকুম ছাড়া কেউ যেন সামনে আসতে না পারে-বুঝেছ।

জি, জি, স্যার!

ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, বার্থের পেছন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ম্যাপ্ত কুইনটাল। যে মুহূর্তে আমি তাকিয়েছি ঠিক সেই সময় স্যামুয়েল এসে দাঁড়িয়েছে ওর পেছনে; পরনে কেবল ট্রাউজার, মাথার চুলগুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে, মুখটা ফ্যাকাসে।

মিস্টার চার্চিল! স্যামুয়েল ডাকল।

যা ভাগ, ভটকু শুয়োর, নইলে তোর হুঁড়ি আমি ফাঁসিয়ে দেব! চেঁচাল কুইনটাল।

মিস্টার চার্চিল, স্যার! আবার ডাকল স্যামুয়েল, আমার দুটো কথা শুনুন দয়া করে।

ভাগাও বদমাশটাকে, চার্চিল বলল, এবং তক্ষুণি কুইটাল এমন এক হিংস্র ভঙ্গি করল মাস্কেট নেড়ে যে বেচারা কেরানী অদৃশ্য হয়ে গেল আর একটা কথাও না বলে।

কষে একটা লাথি লাগাও, কুইনটাল, হারামীটার পাছায়, কেউ একজন চিৎকার করল ওপর থেকে। মুখ তুলতেই দেখলাম, আরও দুজন সশস্ত্র মানুষ উঁকি দিচ্ছে যাচের ভেতর দিয়ে।

চার্চিলের আদেশ পালন করা ছাড়া আর কোন উপায় দেখলাম না আমি আর স্টুয়ার্ট। চার্চিল, থম্পসন দুজনেই শক্ত সমর্থ শক্তিশালী পুরুষ। যদি নিরন্তু থাকত তবু ওদের সাথে লড়ার কথা ভাবতাম না আমরা। সুতরাং আর দেরি না করে কাপড় পরে নিলাম দুজনেই। চার্চিল এবার আমাদের সামনের মইয়ের দিকে এগোনোর নির্দেশ দিল, ও আসতে লাগল পেছন পেছন। থম্পসন রইল বার্থে অন্য যারা ছিল তাদের পাহারায়।

মই বেয়ে উপরে উঠে দেখলাম সামনের ব্যাচের কাছে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কজন সশস্ত্র লোক। সবার অস্ত্র মিস্টার ব্লাইয়ের দিকে তাক করা।

ক্যাপ্টেন ব্লাই, গায়ে কাপড় বলতে একমাত্র জামা-ভাগ্য ভাল তার জামার ঝুলটা হাঁটু পর্যন্ত-দুহাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন সামনের মাস্তুলের কাছে। ক্রিশ্চিয়ান দাঁড়িয়ে তার সামনে, এক হাতে ধরে আছে ব্লাইয়ের হাত বাধা হয়েছে যে রশি দিয়ে তার এক প্রান্ত, অন্য হাতে একটা বেওনেট। বেশ কয়েকজন খালাসী তার চারপাশে, সবাই সম্পূর্ণ সশস্ত্র। লোকগুলোকে চিনতে পারলাম আমি-জন মিলস, আইজাক মাটিন, রিচার্ড স্কিনার এবং টমান বারকিট।

এখানে দাঁড়াও, আমাদের উদ্দেশ্যে বলল চার্চিল। আমাদের বিরুদ্ধে যদি না যাও তোমাদের কিছু করব না আমরা। বলে চলে গেল সে।

বুঝতে পারলাম, তাহিতিতে থাকতে জাহাজ ছেড়ে পালানোর অপরাধে যে কঠিন শাস্তি ওকে ব্লাই দিয়েছিলেন তার শোধ নিচ্ছে এখন চার্চিল। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ান!-ও কি করে যোগ দি বিদ্রোহীদের সাথে! যত দুর্ব্যবহারই পেয়ে থাক, ওর মত অফিসার এ কাজ করতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

মিস্টার ব্লাই তারস্বরে চিৎকার করছেন। জীবনে যত কুৎসিত শব্দ শিখেছেন সব ব্যবহার করে গালাগাল দিচ্ছেন বিদ্রোহীদের। আমি আর স্টুয়ার্ট কয়েক পা এগিয়ে যেতেই শুনতে পেলাম ক্রিশ্চিয়ানের শান্ত গলা, দয়া করে, স্যার, চুপ করবেন আপনি, না কি জোর খাটাতে হবে চুপ করানোর জন্যে

বিদ্রোহী কুত্তা! আগের চেয়ে জোরে চেঁচালেন ব্লাই। আমি তোকে দেখে নেব! তোকে ফাঁসি দেব! চাবকে তোর চামড়া মাংস…।

হাতের বেওনেটটা ঝট করে ব্লাইয়ের গায় ঠেকিয়ে ক্রিশ্চিয়ান গর্জে উঠল, চুপ করো এক্ষুণি। নইলে মৃত্যু তোমার কেউ ঠেকাতে পারবে না।

কুত্তাটার ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দাও। কেউ একজন চিৎকার করল।

ঠিক, ঠিক, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান! সমর্থন করল একজন।

সাগরে ফেলে দাও বদমাশটাকে! আরেক জন বলল।

হাঙ্গর দিয়ে খাওয়াও! যোগ করল অন্য একজন।

এবার যেন পরিস্থিতিটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারলেন ব্লাই। চুপ করে একবার চারপাশে তাকালেন। তারপর বললেন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আমার কথা, শোনো, এখন অনেক শান্ত তার গলা। আমাকে ছেড়ে দাও-অস্ত্র সমর্পণ করো! আমরা আবার বন্ধু হতে পারি। কথা দিচ্ছি, দেশে ফিরে এ সম্পর্কে একটা কথাও উচ্চারণ করব না আমি।

কে চায় তোমার বন্ধু হতে? জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। আর তোমার কথা-ও জিনিসের যদি কোন দাম থাকত অবস্থা এতদূর গড়াত না কখনও।

নীরব ব্লাই। একটু পরে আবার বললেন, আমাকে নিয়ে কি করতে চাও তোমরা?

গুলি করব তোমাকে, শয়তানের বাচ্চা! হাতের মাস্কেটে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করল বারকিট।

না, না, তাহলে তো ও বেঁচে যাবে। মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আমাদের একটা সুযোগ দাও, চাবুকের ঘা খেতে কেমন ওকে দেখিয়ে দেই!

ঠিক, ঠিক! বাঁধো শালাকে! ওর নিজের বিষ নিজে একটু চেখে দেখুক!

চামড়া ছিলে নাও ওর।

হয়েছে, এবার তোমরা চুপ করো! কড়া গলায় আদেশ করল ক্রিশ্চিয়ান; তারপর ব্লাইয়ের দিকে তাকিয়ে: তোমার ওপর সুবিচার করা হবে, আমাদের ওপর কক্ষনো যেটা তুমি করোনি। আমরা তোমাকে শিকল বেঁধে ইংল্যান্ডে নিয়ে যা…

একসঙ্গে অনেকগুলো কণ্ঠস্বর প্রতিবাদ করে থামিয়ে দিল ওকে।

ইংল্যান্ডে! কক্ষনো না! না, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, এটা আমরা হতে দেব না!

শুরু হলো হৈ-চৈ। দেখা গেল বিদ্রোহীদের সবাই ক্রিশ্চিয়ানের প্রস্তাবের বিপক্ষে। ব্লাইকে নিয়ে এমন গুরুতর পরিস্থিতির মুখোমুখি কেউ হয়নি কখনও, ব্লাই নিজেও না। বিদ্রোহীরা সব বুনো হয়ে উঠেছে প্রতিহিংসায়। সামান্য ছুতো পেলে সত্যি সত্যিই ভূড়ি ফাঁসিয়ে দেবে ব্লাইয়ের।

ভাগ্য ভাল কয়েক মিনিট পরেই সবার মন অন্য দিকে ঘুরে যাওয়ার মত একটা ঘটনা ঘটল। হাতে বেনেট নাচাতে নাচাতে ছুটে এল এলিসন। বয়স খুব কম ছেলেটার। এখনও কৈশোর পেরোয়নি। ভীষণ চঞ্চল স্বভাবের। যখন যা মনে আসে করে বসে, পরিণাম নিয়ে ভাবাভাবির ধার খুব একটা ধারে না। ও এসেই এমন সব হাস্যকর অঙ্গভঙ্গি শুরু করল যে মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল থমথমে ভাব। বিদ্রোহীরা সবাই এক সঙ্গে চিৎকার করে উঠল।

হুররে, টমি! তুই কি আমাদের দলে?

অর্বাচীন না হলে কেউ এমন প্রশ্নের জবাব দেয়-মুখে এরকম একটা ভাব ফুটিয়ে তুলে ক্রিশ্চিয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল এলিসন।

আমার হাতে ছেড়ে দিন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, সে বলল। আমি পাহারা দেই ওকে! এমন পাহারা দেব! বলে হাতের বেওনেটটা নাড়তে নাড়তে তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাগল সে। সেই সাথে চিৎকার: ব্যাটা বদমাশ! বুড়ো শয়তান! আর চাবুক মারবে আমাদের? মদ বন্ধ করে দেবে? ঘাস খাইয়ে তবে ছাড়বে না?

শুনে হৈ-হৈ করে উঠল বিদ্রোহীরা। চালিয়ে যা, টমি! আমরা আছি তোর পেছনে! লাগা শালার পেটে একটা খোঁচা!

তুমি আর তোমার স্যামুয়েল-চোরে চোরে মাসতুতো ভাই দুজন। আমাদের খারাপ জিনিস খাইয়ে ভালগুলো খেতে তোমরা! আর খাবে? কী, পাকা চোর?-কথা, নেই কেন মুখে? ছোট্ট একটা নৌকায় করে সাগরে ছেড়ে দেয়া উচিত তোমাদের।

এলিসনের শেষ কথাটায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল ক্রিশ্চিয়ানের মাথায়। ছেলেটাকে থামিয়ে দিয়ে সে বলল:

কাটারটা পরিষ্কার করে দাও! মিস্টার চার্চিল।

এই যে, এখানে, স্যার!

মিস্টার ফ্রায়ার আর মিস্টার পার্সেলকে নিয়ে এসো। বারকিট!

জি, স্যার!

তুর্মি আর সামনার আর মিলস আর মার্টিন-এখানে থাকো, মিস্টার ব্লাইকে পাহারা দাও।

বিশাল লোমশ একটা হাত বাড়িয়ে ক্রিশ্চিয়ানের কাছ থেকে রশির প্রান্তটা নিল বারকিট।

নিশ্চিন্ত থাকুন, স্যার, এক চুল নড়তে দেব না শালাকে।

আপনি ঠিক কি করতে চাইছেন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান নিশ্চয়ই আমাদের জানার অধিকার আছে, বলল সামনার।

দ্রুত ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকাল ক্রিশ্চিয়ান। শান্ত কণ্ঠে বলল, তোমাকে যা বলেছি তাই করো, সামনার। এখন আমি এ জাহাজের ক্যাপ্টেন! কই, কাটারটা পরিষ্কার হলো?

বেশ কয়েকজন লোক একসঙ্গে হাত লাগাল ছোট নৌকাটার ভেতর থেকে ইয়াম, মিষ্টি আলু ইত্যাদি নামিয়ে রাখার কাজে। অন্য কয়েকজন দড়ি-দড়া ঠিক করতে লাগল কাটারটাকে সাগরে ভাসানোর জন্যে।

বারকিট দাঁড়িয়ে গেছে ক্যাপ্টেন ব্লাইয়ের সামনে। হাতের বেওনেটটার আগা তার বুক থেকে খুব বেশি হলে এক ইঞ্চি দূরে। ওর পেছনে সামনার মাস্কেট হাতে তৈরি। অন্য দুজন তার দুপাশে। তাদের হাতেও একটা করে মাস্কেট। ব্লাই চুপ। হম্বিতম্বি দূরে থাক, একটা শব্দও করছেন না। অন্য বিদ্রোহীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ডেকের বিভিন্ন জায়গায়। দুই মইয়ের মুখে আছে তিনজন করে। সবকিছু এমন সুলভাবে চলছে যে আমি না ভেবে পারলাম না, ব্যাপারটা পূর্ব পরিকল্পিত। কিন্তু পূর্ব পরিকল্পিতই যদি হবে আমরা কিছু টের পেলাম না কেন? এতগুলো লোক একজোট হয়েছে অথচ কোন ঘটনায়ই তা প্রকাশ পায়নি,তা কি করে সম্ভব?

ব্লাইকে কেন্দ্র করে যে ঘটনাগুলো এতক্ষণ ঘটছিল সব আমি এমন মগ্ন হয়ে দেখছিলাম যে স্টুয়াটের কথা মনেই ছিল না। খেয়াল হতে দেখলাম ও নেই আমার পাশে। ওর খোঁজে তাকাতে লাগলাম চারদিকে। এই সময় প্রথম বারের মত আমাকে দেখল ক্রিশ্চিয়ান। তক্ষুণি আমার কাছে এল সে। গলার স্বর শান্ত শোনালেও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফুটছে সে।

বিয়্যাম, ক্রিশ্চিয়ান বলল, জাহাজে কি ঘটছে এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছ। নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, কাউকে কিছু বলা বা করা হবে না, তবে কেউ যদি আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করার চেষ্টা করে তাহলে কি হবে আমি বলতে পারি না। সুতরাং কিছু করলে বুঝে শুনে নিজের দায়িত্বে করবে।

কি করতে চান আপনি? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

আমি চেয়েছিলাম ব্লাইকে বন্দী করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাব। কিন্তু মনে হচ্ছে না তা সম্ভব, আমার সাথীরা তা হতে দেবে না। এখন ঠিক করেছি, কাটারটা একৈ দিয়ে দেব, যেখানে খুশি চলে যাক। মিস্টার ফ্রায়ার, হেওয়ার্ড, যালেট আর স্যামুয়েলকেও যেতে হবে ওর সঙ্গে।

আর কথা বলার সময় পেলাম না। মিস্টার ফ্রায়ার আর পার্সেলকে নিয়ে এসেছে চার্চিল। মাস্টার, ছুতোর মিস্ত্রী-দুজনেরই মুখে আতঙ্কের ছাপ, তবে দিশেহারা হয়ে পড়েনি কেউ। দুজনই আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাবান। সুযোগ পেলে ওরা যে জাহাজ পুনর্দখলের চেষ্টা করবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই ক্রিশ্চিয়ানের তাই ওদের কড়া পাহারায় রাখতে সে ভোলেনি।

মিস্টার বিয়্যাম, তুমি নিশ্চয়ই নেই এসবের ভেতর? ফ্রায়ার জিজ্ঞেস করল।

আপনার চেয়ে বেশি না, স্যার, আমি জবাব দিলাম। হ্যাঁ, বিয়্যাম এসবের কিছু জানে না, বলল ক্রিশ্চিয়ান। মিস্টার

পার্সেল…

ফ্রায়ার বাধা দিল ওকে।

তুমি! তুমি, ক্রিশ্চিয়ান! ওহ, ঈশ্বর! কি করেছ, যদি জানতে! এখনও সময় আছে, এ পাগলামি সরাও মাথা থেকে, আমি কথা দিচ্ছি, আমরা সবাই তোমার স্বার্থ আমাদের নিজের স্বার্থ বলে মনে করব। আমাদের খালি ইংল্যান্ডে পৌঁছাতে…

না, মিস্টার ফ্রায়ার, শান্ত কণ্ঠে বলল ক্রিশ্চিয়ান, তা আর সম্ভব নয়। গত কয়েকটা সপ্তাহ নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছি আমি। সত্যি বলছি, আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তোমার ব্যক্তিগত ঝগড়ার কারণে আমাদের সবাইকে দুর্ভোগের ভেতর টেনে আনবে তুমি?

বেশি কথা না বলে চুপ করে থাকুন, মিস্টার ফ্রায়ার। পালে, তুমি যাও, নিচে থেকে তোমার যন্ত্রপাতি আর সহকারীদের নিয়ে এসে কাটারটা ঠিক ঠাক করে দাও। চার্চিল, ওকে নিচে যেতে দাও, সঙ্গে পাহারাদার দিতে ভুলো না।

পার্সেলকে নিয়ে সামনের মইয়ের দিকে এগিয়ে গেল চার্চিল।

আমাদের সাগরে ভাসিয়ে দিতে চাও?ফ্রায়ার জিজ্ঞেস করল।

ডাঙা এখান থেকে নয় লিগের বেশি হবে না, জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। এমন শান্ত সাগরে এটুকু পথ সহজেই পাড়ি দিতে পারবেন আপনারা।

আমি জাহাজেই থাকব।

না, মিস্টার ফ্রায়ার, ক্যাপ্টেন ব্লাইয়ের সাথে যাবেন আপনি। উইলিয়ামস! মাস্টারকে কেবিনে নিয়ে যাও। যতক্ষণ না আমি ডেকে পাঠাই ততক্ষণ ওখানেই রাখবে ওকে।

এই সময় ফিরে এল ছুতোর মিস্ত্রী পার্সেল, পেছনে কাটারের সাজসরঞ্জাম হাতে তার দুই সহকারী নরম্যান আর ম্যাকইন্টশ। সোজা আমার কাছে এল পার্সেল।

মিস্টার বিয়্যাম, আমি জানি তুমি ওদের দলে নও। তবু মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান তোমার বন্ধু অন্তত ছিল; আমাদের হয়ে একটু অনুরোধ করো না ওকে, লঞ্চটা যেন দেয়। কাটারটার অবস্থা এমন খারাপ, কিছুতেই ওটা ডাঙা পর্যন্ত পৌঁছাবে না।

সত্যি খুবই দুরবস্থা কাটারটার। অসংখ্য ফুটো তলায়; জায়গায় জায়গায় কাঠ পচে, পোকায় খেয়ে ফোপড়া করে ফেলেছে। এই কাটার নিয়ে কিছুতেই তীরে পৌঁছুতে পারবেন না ব্লাই।

তুমিও চলো আমার সঙ্গে, পার্সেলকে বললাম।

না, ও জবাব দিল, আমাকে ক্রিশ্চিয়ান পছন্দ করে না। আমি অনুরোধ করেছি টের পেলে না-ও দিতে পারে লঞ্চটা।

আর সময় নষ্ট না করে তক্ষুণি আমি গেলাম ক্রিশ্চিয়ানের কাছে। লঞ্চের কথা বলতেই ও রাজি হয়ে গেল।

ঠিক আছে, লঞ্চই পাবে, ক্রিশ্চিয়ান বলল। ছুতোরকে বলো, ঠিকঠাক করে দিক ওটা। এরপর ও চিৎকার করল, এই তোমরা! কাটার থাক। লঞ্চটা পরিষ্কার করো?

চার্চিলের নেতৃত্বে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানাল কয়েকজন বিদ্রোহী।

লঞ্চ! কি বলছেন আপনি, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান?

না, স্যার, লঞ্চ দেয়া চলবে না! ওটা পেলে ঠিকই দেশে পৌঁছে যাবে বুড়ো শেয়ালটা।

হ্যাঁ, ওটাই যদি দিলাম তো আর শাস্তি হলো কি ব্যাটার?

এমনি সব বক্তব্য, মন্তব্য আসতে লাগল। কোনটায় কান দিল না ক্রিশ্চিয়ান। শেষ পর্যন্ত ওর জেদের কাছে হার মানল লোকগুলো।

পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। ক্রিশ্চিয়ান এবার ওর দলে নয় এমন সবাইকে ডেকে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল।

প্রথমেই আনা হলো স্যামুয়েলকে। নাবিকদের সব অপমান টিটকারি নীরবে হজম করে সোজা সে ক্যাপ্টেন ব্লাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল নির্দেশের অপেক্ষায়। কিন্তু ক্যাপ্টেন তাকে কি নির্দেশ দেবেন-নির্দেশ দিল ক্রিশ্চিয়াম।

যাও, কেবিনে গিয়ে তোমার স্যারের জামা কাপড় সব নিয়ে এসো, বলল সে।

ক্যাপ্টেনের ব্যক্তিগত ভৃত্য জন স্মিথকে নিয়ে চলে গেল স্যামুয়েল। সঙ্গে গেল সশস্ত্র এক বিদ্রোহী।

একটু পরেই এল হেওয়ার্ড আর হ্যালেট। দুজনেরই মুখ শুকনো, চোখে ভীতি। হ্যালেট তো কাঁদছেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। কে একজন আমার কাঁধে হাত রাখল। ঘাড় ফেরাতেই দেখি মিস্টার নেলসন।

যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে দূরে চলে এসেছি বাড়ি থেকে, কি বলো, বিয়্যাম? আমাদের নিয়ে কি করবে ওরা জানো নাকি?

আমি যা জানি বললাম তাকে। শুকনো একটু হাসি ফুটল নেলসনের মুখে। দূরে দিগন্ত রেখার কাছে অস্পষ্ট একটা রেখার মত দেখা যাচ্ছে তোফোয়া দ্বীপ। হাত তুলে সেদিকে ইশারা করে তিনি বললেন, ক্যাপ্টেন ব্লাই বোধহয় ওখানে নিয়ে যাবেন আমাদের।

মইয়ের মুখে ছুতোর মিস্ত্রীকে দেখা গেল। পেছনে কসাই ল্যাম্ব। দুজন ধরাধরি করে তুলে আনছে ছুতোর মিস্ত্রীর যন্ত্রপাতির বাক্স।

এই যে ঘটনাটা ঘটছে, পার্সেল বলল, এর সব কৃতিত্ব কার বলে মনে হয় আপনার, মিস্টার নেলসন?

আমাদের কপালের, আর কি বলব বলো?

না, স্যার, কপাল টপাল কিছু না। এসবের জন্যে দায়ী আমাদের মিস্টার ব্লই, আর কেউ না। লোকটা যা শুরু করেছিল এমন কিছু না ঘটলেই আমি বরং আশ্চর্য হতাম।

ব্লাইয়ের সম্পর্কে ঘৃণা-গভীর ঘৃণা ছাড়া আর কিছু নেই পার্সেলের মনে। ভ্যান ডিয়েমেনস ল্যান্ডে সেই ঘটনার পর একান্ত প্রয়োজন না হলে কখনও সে কথা বলেনি তার সাথে। তবু মিস্টার নেলসন যখন বললেন, সে ইচ্ছে করলে থেকে যেতে পারে জাহাজে তখন তার মুখের অবস্থা যা হলো সে দেখার মত।

জাহাজে থেকে যাব? আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল পার্সেল। বদমাশ দস্যুদের সাথে? না, স্যার, তার চেয়ে ওই জঘন্য লোকটার সাথে যেতেই আমি বেশি পছন্দ করব।

এই সময় হঠাৎ চার্চিলের চোখ পড়ল আমাদের ওপর।

ওটা কি তোমার সাথে, পার্সেল? গর্জে উঠল সে। আমাদের সব যন্ত্রপাতি চুরি করার মতলব এটেছ?

তোমাদের যন্ত্রপাতি, নচ্ছারের দল! এগুলো আমার; আমি যেখানে যাব এগুলোও সেখানে যাবে।

জাহাজ থেকে একটা পেরেকও তুমি সরাতে পারবে না, জবাব দিল চার্চিল। এর পর সে একজনকে পাঠিয়ে ডাকিয়ে আনল ক্রিশ্চিয়ানকে। শুরু হলো বিতর্ক, শুধু যন্ত্রপাতি নয় স্বয়ং ছুতোর মিস্ত্রীকে নিয়েও। মিস্ত্রীগিরিতে ওর দক্ষতার কথা বিবেচনা করে ক্রিশ্চিয়ান ভাবছে ওকে রেখে দেবে জাহাজে। কিন্তু বাকি সবাই এর ঘোর বিরোধী। মেজাজের দিক থেকে কোন অংশে কম নয় সে ব্লাইয়ের চেয়ে। তাই ওদের ধারণা পার্সেলকে সঙ্গে রাখলে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই হবে বেশি।

স্যার, ব্লাইয়ের চেয়ে কম নয় ও বদমায়েশিতে, একজন বলল।

ওর সহকারী দুজনকে রেখে দিন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আরেক জনের পরামর্শ, আমাদের যা প্রয়োজন ওরাই মেটাতে পারবে।

জোর করে হলেও ওকে নৌকায় তুলে দিতে হবে, বলল আরেক জন।

জোর করবি, গুণ্ডার দল? চিৎকার করল পার্সেল, আমি এমনিই যাব, দেখি কে আমাকে ঠেকায়!

দুর্ভাগ্যক্রমে পার্সেল লোকটা নির্ভীক হলেও একটু মাথা মোটা ধরনের। ব্লাইয়ের দলের সুবিধা অসুবিধার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে, সে হাম্বড়ার মত চিৎকার করতে লাগল বিদ্রোহীদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্র সে কি করবে না করবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার কথা শুনে রাখ, বদমাশরা! চেঁচাল সে। তোদের সব কটাকে কাঠগড়ায় তুলে তবে ছাড়ব! আমাদের ভাসিয়ে দিবি?-দে। তাতে আমাদের কচু হবে। আমরা জাহাজ একটা বানিয়ে…

ঠিক, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, অনেকগুলো লোক এক সাথে চিৎকার করে উঠল, শালা এত ভাল মিস্ত্রী, যন্ত্রপাতি সঙ্গে থাকলে ঠিকই জাহাজ বানিয়ে ফেলবে।

বড়াই করতে করতে কি করে ফেলেছে যখন পার্সেল বুঝল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস অনেক যন্ত্রপাতিই ওকে দিত ক্রিশ্চিয়ান-প্রতিটা যন্ত্র দুটো তিনটে করে আছে জাহাজে, সুতরাং দিলে বিদ্রোহীদের খুব একটা অসুবিধা হত না-কিন্তু এখন, জাহাজ বানিয়ে নেবে এই কথা শোনার পর সে ঝুঁকি আর নিল না, ক্রিশ্চিয়ান। যন্ত্রপাতির বাক্সটা নিচে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল তার লোকদের। ছোট একটা কুঠার, একটা হাতুড়ি আর এক থলে পেরেক কেবল সাথে রাখতে দিল পার্সেলকে।

লঞ্চটা খালি করা হয়ে গেছে। পাল, মাস্তুল, দড়ি-দড়া, দাঁড়, বৈঠা-া যা দরকার ওটা চালানোর জন্যে সব এবার উঠিয়ে দেয়া হলো। কিছু খাবার, মদ এবং পানিও দেয়া হলো। তারপর ক্রিশ্চিয়ানের নির্দেশে পানিতে নামিয়ে দেয়া হলো লঞ্চটা।

প্রথম যাকে লঞ্চে নামতে বলা হলো সে স্যামুয়েল। তারপর হেওয়ার্ড আর হ্যালেট। এখন দুজনই কাঁদছে। হাত জোড় করে ক্ষমা ভিক্ষা করছে হাউ মাউ করে। কেউ কর্ণপাত করল না ওদের কথায়। টেনে হিঁচড়ে রেলিংয়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো দুজনকে। নামিয়ে দেয়া হবে লঞ্চে, এই সময় হেওয়ার্ড তাকে ধরে থাকা লোকটার হাত থেকে কোন মতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফিরল ক্রিশ্চিয়ানের দিকে।

আমি আপনার কি করেছি, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, যে আমার সাথে এমন ব্যবহার করছেন? আপনার দুটো পায়ে ধরি, আমাকে জাহাজে থাকতে দিন!

তোমাকে ছাড়াও আমরা কাজ চালিয়ে নিতে পারব, গম্ভীর কণ্ঠে বলল ক্রিশ্চিয়ান। যাও নেমে পড়ো লঞ্চে, দুজনই!

এরপর গেল পার্সেল। ওকে কোন রকম পীড়াপীড়ি করতে হলো না। বিদ্রোহীদের দখল করা জাহাজে থাকার চেয়ে মরতে রাজি ও। ওর পেছন, পেছন গেল সারেং কোল। এর পর ব্লাইকে রেলিংয়ের ধারে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল ক্রিশ্চিয়ান।

আনা হলো ব্লাইকে। দুহাতের বাঁধন খুলে দেয়া হয়েছে।

এবার, মিস্টার ব্লাই, ক্রিশ্চিয়ান বলল, ওই যে আপনার নৌকা তৈরি, যান উঠে পড়ুন!

ক্রিশ্চিয়ান, শান্ত কণ্ঠে ব্লাই বললেন, শেষবারের মত তোমাকে অনুরোধ করছি, আরেকবার ভেবে দেখ? আমি কথা দিচ্ছি-ঈশ্বরের কসম খেয়ে বলছি, আত্মসমর্পণ করো, একথা আমি ভুলে যাব না। আমার স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েদের কথা একবার ভাবো!

না, মিস্টার ব্লই, এ ঘটনা ঘটার আগে আপনারই ভাবা উচিত ছিল আপনার স্ত্রী-পরিবারের কথা। আর আপনার কসমের মূল্য কতটুকু সে আমাদের জানা আছে। যান, স্যার, নৌকায় উঠে পড়ুন।

অনুনয় বিনয় অর্থহীন বুঝতে পেরে আর কথা বাড়ালেন না ব্লাই। মই বেয়ে নেমে গেলেন লঞ্চে। পেকওভার আর নর্টন গেল পেছন পেছন। এরপর একটা সেক্সট্যান্ট আর মানচিত্রের বই ছুঁড়ে দিল ক্রিশ্চিয়ান ব্লাইয়ের দিকে। বলল, আমার মনে হয় এগুলো দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন। কম্পাস তো আছেই আপনার কাছে।

বিদ্রোহীদের হাতের বাইরে গিয়েই আবার স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করলেন ব্লাই।

তোমাকে আমি দেখে নেব, বদমাশ–আঙুল উঁচিয়ে ক্রিশ্চিয়ানের দিকে নাড়তে নাড়তে চিৎকার করলেন তিনি। মনে রেখো, অকৃতজ্ঞ শয়তান! প্রতিশোধ আমি নেবই। দুবছরের ভেতর তোমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে তুলব! তোমার সঙ্গের বদমাশগুলোকেও!

ভাগ্য ভাল ব্লাইয়ের, ক্রিশ্চিয়ানের মনোযোগ তখন অন্য দিকে। ও খেয়াল করতে পারল না কথাগুলো। তবে বিদ্রোহীদের কয়েক জন জবাব দিল ওর হয়ে। ব্লাইয়ের ভঙ্গি অনুকরণ করেই তারা চিৎকার করল: যা ব্যাটা ছুঁচো, যা পারিস করিস!

হাতে বন্দুক থাকা সত্ত্বেও কেন যে সেদিন কেউ গুলি করে বসেনি ভেবে আজও আমি বিস্মিত বোধ করি।

যা হোক, একটু পরেই বুঝতে পারলাম, আরও অনেককে, অর্থাৎ যে যেতে চাইবে তাকেই, যেতে দেয়া হবে স্নাইয়ের সাথে। ক্রিশ্চিয়ান হয়তো ভেবেছে, ব্লাইয়ের পক্ষের বা নিরপেক্ষ লোক জাহাজে যত কম থাকে ততই মঙ্গল। লোকগুলোকে চোখে চোখে রাখার ঝামেলা থেকে তারা রেহাই পাবে। এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না আমি। মিস্টার নেলসন দাঁড়িয়ে ছিলেন কাছেই, তাকে নিয়ে দ্রুত এগোলাম পেছনের মইয়ের দিকে; নিচ থেকে দুচারটা কাপড়-চোপড় নিয়ে এসে উঠে পড়ব লঞ্চে। মইয়ের মুখে আমাদের থামাল ক্রিশ্চিয়ান।

মিস্টার নেলসন, সে বলল, আপনি আর বিয়্যাম ইচ্ছে হলে থাকতে পারেন জাহাজে।

যে দুর্ভোগ তুমি ভুগেছ সেজন্যে সত্যিই আমি সহানুভূতিশীল তোমার প্রতি, জবাব দিলেন নেলসন। কিন্তু তার অর্থ এই নয়…

আপনার কাছে সহানুভূতি আমি চেয়েছি? বাধা দিয়ে বলল ক্রিশ্চিয়ান। বিয়্যাম, কি করবে তুমি

ক্যাপ্টেনের সাথে যাব।

তাহলে তাড়াতাড়ি, তোমরা দুজনেই।

দুএকটা কাপড়-চোপড় নেয়ার অনুমতি পাব তো? জিজ্ঞেস করলেন নেলসন।

হ্যাঁ। কিন্তু সাবধান, কোন রকম চালাকির চেষ্টা করলে কিন্তু বেঘোরে মারা পড়বেন।

নিচে নেমে নেলসন তার কেবিনের দিকে চলে গেলেন, আমি ঢুকলাম মিডশিপম্যানদের বার্থে। থম্পসন এখনও পাহারা দিচ্ছে অন্ত্রের সিন্দটা। টিঙ্কলার আর এলফিনস্টোনকে কাল থেকে দেখিনি একবারও। গেল কোথায় দুজন? ডান দিকের স্বার্থে নেই তোক একবার খুঁজে দেখি, ভেবে যে-ই পা বাড়িয়েছি অমনি থম্পসনের গলা শুনতে পেলাম।

না! ওদিকে যাবে না। কাপড় নিতে এসেছ, নিয়ে ভেগে পড়ো তাড়াতাড়ি!

ডান দিকের বার্থে আর যাওয়া হলো না, কাপড় গোছাতে শুরু করলাম দ্রুত। হঠাৎ একটা জিনিস দেখে ভীষণ অবাক হলাম আমি। ইয়ং এখনও ঘুমাচ্ছে তার হ্যামকে। রাত রোটা থেকে ভোর চারটে পর্যন্ত কাজ করেছে। ইয়ং। নিয়ম মত এটা ওর ঘুমানোর সময়। কিন্তু জাহাজে যে হৈ-হট্টগোল চলছে তার ভেতর কি করে ও ঘুমাচ্ছে আমি ভেবে পেলাম না। নিঃশব্দে গায়ে ঠেলা দিয়ে ওকে জাগানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। অসম্ভব গাঢ় ইয়ংয়ের ঘুম। ওকে ছেড়ে দিয়ে আবার আমার জিনিসপত্র নিয়ে পড়লাম। যে সব জিনিস সবচেয়ে জরুরী, না নিলেই নয় সেগুলো বাছাই করছি এমন সময় চোখ গেল বার্থের কোনায় খাড়া করে রাখা কয়েকটা ইন্ডিয়ান লাঠির দিকে। ইন্ডিয়ানরা ওগুলো লড়াইয়ের সময় ব্যবহার করে। নামুকার জংলীদের কাছ থেকে আমি যোগাড় করেছিলাম লোহাকাঠের এই লাঠিগুলো। ওগুলো দেখেই একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়: এর একটা দিয়ে যদি মারি থম্পসনের মাথায়, জ্ঞান হারাবে না?

আমি জানি, বেশি ভাবনা চিন্তা করতে গেলে অনেক কাজই অনেক সময় করা হয় না। সুতরাং বেশি ভাবাভাবির ধার না ধেরে তুলে নিলাম একটা লাঠি। দরজার কাছে গিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখলাম, থম্পসন বসে আছে সিন্দুকের ওপর। মাস্কেটটা দুপায়ের মাঝে খাড়া করে রাখা। আমাকে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখে ও চিৎকার করে উঠল।

সাবধান, বেরিয়ে এসো ওখান থেকে! এক্ষুণি!

দুই বার্ধের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসতে দেখলাম মরিসনকে। আর কি কপাল, ঠিক তখনই ওপর থেকে কে যেন ডাকল থম্পসনের নাম ধরে। ও ওপরে তাকাতেই আমি হাতের ইশারায় মরিসনকে ডাকলাম। এবং থম্পসন মুখ নামানোর আগেই মরিসন ঢুকে পড়ল আমার বার্থে। কোন কথা না বলে আমি একটা লাঠি ধরিয়ে দিলাম ওর হাতে। তারপর দুজনে মিলে শেষ বারের মত একবার চেষ্টা করলাম ইয়ংকে জাগানোর। তাতে সময়ই নষ্ট হলো শুধু। হ্যামক থেকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে প্রায় নামিয়ে ফেললাম, কিন্তু ঘুম ভাঙল না ওর। বাইরে থেকে থম্পসনের চিৎকার ভেসে এল: ও, স্যার, কাপড় গোছাচ্ছে পাঠিয়ে দিচ্ছি এক্ষুণি।

দরজার এক পাশে গিয়ে দাঁড়াল মরিসন। আমি অন্য পাশে। দুজনই উচিয়ে ধরেছি লাঠি। দুজনই আশা করছি, আমাকে ডাকতে ভেতরে ঢুকবে থম্পসন। কিন্তু না, খুবই হুঁশিয়ার সে। বাইরে থেকেই চিৎকার করল: বেরিয়ে এসো, বিয়্যাম, এক্ষুণি!

আসছি, বলে আমি আবার উঁকি দিলাম। যা দেখলাম তাতে ধড়াস করে উঠল বুকের ভেতর। বিশালদেহী বারকিট আর ম্যাককয় এগিয়ে আসছে হ্যাঁচের দিক থেকে। দুজনেরই হাতে মাস্কেট। থম্পসনের কাছে পৌঁছে থামল, ওরা। আশা নেই বুঝতে পেরেও আরও মিনিট দুয়েক কাটালাম বার্থের ভেতর। তিন বিদ্রোহীও রইল যেখানে ছিল সেখানে। হ্যাঁচের কাছ থেকে চিৎকার শুনতে পেলাম নেলসনের: বিয়্যাম। জলদি করো, নইলে কিন্তু রয়ে যাবে তুমি!

এক মুহূর্ত পর টিলারের গলা? আসলে এসো, বিয়্যাম! আমরা ৪ গেলাম!

আর কিছু করার রইল না আমাদের। লাঠি দুটো যেখানে ছিল সেখানে রেখে ছুটে বেরিয়ে গেলাম বার্থ থেকে। এতক্ষণে থম্পসন আসছে ব্যাপার কি দেখার জন্যে। ওর সাথে ধাক্কা খেতে খেতে বেঁচে গেল মরিসন।

আরে, মরিসন! তুমি এখানে কি করছ? চিৎকার করল থম্পসন।

জবাব দেয়ার জন্যে দাঁড়ালাম না আমরা। এক ছুটে মাঝের পথটুকু পেরিয়ে পৌঁছুলাম মইয়ের গোড়ায়। তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে দুবার পা হড়কাল। কোন মতে যখন ডেকে পৌঁছলাম, চার্চিল এসে ধরল আমাকে।

অনেক দেরি করে ফেলেছ, বিয়্যাম, সে বলল। তুমি যেতে পারছ না।

যেতে পারছি না! মানে? চিৎকার করে উঠে চার্চিলের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করলাম। ভীষণ অবস্থা তখন আমার। চোখের। সামনে দেখছি লঞ্চটা পেছনে চলতে শুরু করেছে, অথচ আমি এখনও দাঁড়িয়ে আছি ডেকের ওপর। বিদ্রোহীদের একজন লঞ্চ বাধা রশিটা উঁচু করে নিয়ে চলেছে পেছন দিকে। বারকিট আর কুইনটাল ধরে রেখেছে কোলম্যানকে। আমার মত, হাত পা ছুড়ছে সে-ও। মরিসন যুঝছে চার পাঁচ জনের সঙ্গে।

আমরা সত্যি সত্যিই দেরি করে ফেলেছি। লঞ্চটা এখন কানায় কানায় ভর্তি বলতে যা বোঝায় তাই। ওতে যদি আর একজনও ওঠে সব কজনেরই জীবন বিপন্ন হবে। ব্লাইয়ের চিৎকার শুনতে পেলাম; আর কাউকে নিতে পারছি না! দুশ্চিন্তা কোরো না, ইংল্যান্ডে যদি পৌঁছাতে পারি তোমাদের যাতে সুবিচার হয় আমি দেখব?

পেছনে চলছে লঞ্চ। রশি হাতে বিদ্রোহী যেতে যেতে চলে গেছে জাহাজের একেবারে শেষ মাথায়। এবার সে রশির প্রান্তটা ছুঁড়ে দিল লঞ্চের দিকে। লঞ্চের কেউ একজন টেনে তুলে নিল সেটা। আমরা যারা বিদ্রোহী নই অথচ কপাল দোষে জাহাজে রয়ে গেছি তারা হুড়মুড় করে গিয়ে দাঁড়ালাম রেলিং ঘেঁষে। আকুল নয়নে তাকিয়ে আছি লঞ্চটার দিকে। আমাদের সর্বস্ব যেন রাহাজানি করে নিয়ে যাচ্ছে ওটা। ব্লাইকে দেখলাম, পেছন দিকের একটা আড় কাঠে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যদের কেউ কেউ বসে, কেউ কেউ দাঁড়িয়ে। নৌকাটা এমন বোঝাই হয়েছে, খুব বেশি হলে সাত কি আট ইঞ্চি জেগে আছে জলের ওপর। জাহাজ এবং লঞ্চ দুদিক থেকেই ছুটছে চিৎকার আর গালাগালির তুবড়ি। ব্লাইয়ের গলাও শোনা যাচ্ছে মাঝে মধ্যে, নৌকায় তার সঙ্গীদের আদেশ নির্দেশ দিচ্ছেন চিৎকার করে।

বিদ্রোহীদের কয়েকজন গম্ভীর, কিছুটা চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে। অন্যরা প্রাণ-খুলে পি করছে ব্লাইকে। একজনকে চেঁচাতে শুনলাম: এবার যাও, পরখ করে দেখ আধ পাউন্ড ইয়ামে দিন চলে কি না, ব্যাটা বুড়ো উল্লুক!

ঈশ্বরের দোহাই, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আমাদের কিছু অস্ত্রশস্ত্র দাও! ফ্রায়ার চিৎকার করল। একবার ভাবো আমরা কোথায় যাচ্ছি! অন্তত প্রাণ বাঁচানোর জন্যে লড়ার একটা সুযোগ আমাদের দাও!

মামা বাড়ির আবদার, না? জাহাজ থেকে কেউ একজন চিৎকার করল।

অস্ত্রের কোন দরকার তোমাদের হবে না, অন্য একজন।

বুড়ো শয়তানটা তো জংলীদের দোস্ত, ও-ই বাঁচাবে তোমাদের।

কোলম্যান দাঁড়িয়ে ছিল আমার পাশে। ওকে নিয়ে ক্রিশ্চিয়ানের কাছে গিয়ে অনুরোধ করলাম কয়েকটা মাস্কেট আর কিছু গুলি বারুদ যেন দেয়া হয় ব্লাইকে।

না! বলল ক্রিশ্চিয়ান। কোন আগ্নেয়াস্ত্র ওদের দেয়া হবে না।

তাহলে অন্তত কয়েকটা তলোয়ার দিন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, মিনতি করল কোলম্যান, নইলে ডাঙায় পা রাখা মাত্র হয়তো খুন হয়ে যাবে সব কজন। নামকার কথা একবার ভাবুন!।

এই প্রস্তাবে রাজি হলো ক্রিশ্চিয়ান। চারটে তলোয়ার একটা দড়ির মাথায় বেঁধে ছুঁড়ে দেয়া হলো লঞ্চে।

কাপুরুষের দল! রাগে গর্জন করে উঠল পার্সেল। এছাড়া আর কিছু দিবি না?

আর কি চাও, বাবা ছুতোর? উইলিয়াম ব্রাউন চেঁচাল, অস্ত্রের পুরো সিন্দুকটাই নামিয়ে দেব ভাবছ নাকি?

ম্যাককয় বলল, আরও চায়? পেটটা ওর সীসা দিয়ে ভরে দাও দেখি!

শোনা মাত্র মাস্কেট তুলে তাক করল বারকিট। ক্রিশ্চিয়ানের নির্দেশে তাড়াতাড়ি দুতিন জন এসে ওর হাত থেকে কেড়ে নিল মাস্কেটটা। ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো নিচে।

চুপ করে গেল পার্সেল। এদিকে ফ্রায়ার এবং অন্যরা শিগগির শিগগির জাহাজের কাছ থেকে লঞ্চ সরিয়ে নেয়ার জন্যে ব্লাইকে তাড়া দিতে শুরু করেছে। বিদ্রোহীদের গতিক সুবিধার নয়, যে কোন মুহূর্তে গুলি গোলা চালিয়ে বসতে পারে। ব্যাপারটা ব্লাই-ও বুঝেছেন। সবাইকে দাঁড় তুলে নেয়ার নির্দেশ দিলেন তিনি।

একটু পরেই লঞ্চের মুখ ঘুরে গেল। ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে বাউন্টির কাছ থেকে। ওটার মুখ এখন প্রায় দশ লিগ উত্তরপুবে তোফোয়া দ্বীপের দিকে। এতদিন কখনোই আমরা বারো জনের বেশি উঠিনি লঞ্চটায়-ভাবতাম এর বেশি উঠলে বিপদ ঘটতে পারে, অথচ ওটাই এখন উনিশ জনকে বয়ে নিয়ে চলেছে। তাছাড়া কিছু মালপত্র, খাদ্য এবং পানীয় তো আছেই।

ঈশ্বরকে? ধন্যবাদ, আমরা দেরি করে ফেলেছিলাম, বিয়্যাম! মরিসন বলল আমার পাশ থেকে।

মন থেকে বলছ এ কথা? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

একটু যেন থমত খেল মরিসন। ভাবল এক মুহূর্ত। তারপর বলল, না, বিয়্যাম, এমনি কথার কথা বললাম। সুযোগ পাইনি, পেলে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতাম। যদিও জানি তাতে লাভ কিছু হত না-ওরা কখনোই ইংল্যান্ডে পৌঁছুতে পারবে না।

আধঘন্টার ভেতর লঞ্চটা বিলীন হয়ে গেল দিগন্তে। ক্রিশ্চিয়ানের নির্দেশে পাল তুলে দেয়া হলো বাউন্টির। বাতাস এখনও কাল রাতের মতই হালকা। পালগুলো ফুললও না ভাল মত। ধীর গতিতে এগিয়ে চলল জাহাজ, পশ্চিম উত্তর পশ্চিম দিকে।

.

নয়

ভাগ হয়ে গেছে বাউন্টির নাবিকরা।

ব্লাই ছাড়াও মাস্টার জন ফ্রায়ার, সহকারী সার্জন টমাস লেডওয়ার্ড, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ডেভিড নেলসন, গোলন্দাজ পেকওভার, সারেং উইলিয়াম কোল, মাস্টারের মেট উইলিয়াম এলফিনস্টোন, দুতোর উইলিয়াম পার্সেল; মিডশিপম্যান টমাস হেওয়ার্ড, জন হ্যালেট, রবার্ট টিঙ্কলার; দুই কোয়ার্টার মাস্টার জর্জ নর্টন, পিটার স্কেলেটার; কোয়ার্টার মাস্টারের মেট জর্জ সিম্পসন, পালনির্মাতা লরেন্স লেবোগ, কেরানী স্যামুয়েল, কসাই ল্যাম্ব, বাবুর্চি জন স্মিথ আর টমাস হলকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে লঞ্চে।

বাকিরা রয়েছে জাহাজে। তাদের ভেতরও দুটো ভাগ-একদল সক্রিয়ভাবে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে, আর একদল বিদ্রোহে অংশ না নিয়েও কপাল দোষে রয়ে গেছে জাহাজে।

বিদ্রোহে যারা সক্রিয় অংশ নিয়েছে তারা হলো: ভারপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট ফ্লেচার ক্রিশ্চিয়ান, গোলন্দাজের মেট জন মিলস, মাস্টার অ্যাট আর্মস চার্লস চার্চিল, মালী উইলিয়াম ব্রাউন; খালাসী টমাস বারকিট, ম্যাপ্ত কুইন্ট্রাল, জন সামনার, জন মিলওয়ার্ড, উইলিয়াম ম্যাককয়, হেনরি হিভ্রান্ডট, আলেকজান্ডার স্মিথ, জন উইলিয়ামস, টমাস এলিসন, আইজাক মার্টিন, রিচার্ড স্কিনার আর ম্যাথু থম্পসন।

যারা বিদ্রোহে অংশ না নিয়েও জাহাজে থেকে যেতে বাধ্য হয়েছে তাদের দলে আছে: মিডশিপম্যান এডওয়ার্ড ইয়ং, জর্জ স্টুয়ার্ট; সারেং-এর সহকারী জেমস মরিসন, আর্মারার জোসেফ কোলম্যান; ছুতোর মিস্ত্রীর দুই সহকারী চার্লস নরম্যান ও টমাস ম্যাকইন্টশ আর খালাসী উইলিয়াম মুস্যাট। এছাড়াও আছে সেই প্রায় অন্ধ নাবিক মাইকেল বায়ার্ন আর আমি।

যারা সক্রিয়ভাবে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে তারা যারা নেয়নি তাদের সন্দেহের চোখে দেখবে, বা নাজেহাল করবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল বিদ্রোহীদের কেউই খুব একটা দুর্ব্যবহার করল না আমাদের সাথে। চার্চিল কেবল বলল, তোমাদের নিয়ে কি করা হবে, যতক্ষণ না ঠিক হচ্ছে ততক্ষণ ডেকেই থাকতে তোমরা।

কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে ছাড়া পেয়ে টমাস বারকিট ওপরে এল। মার্কেট তুলেও গুলি করতে পারেনি বলে মেজাজটা ওর খিঁচড়ে ছিল। এবার আমাদের ওপর চোখ পড়তেই আগুন হয়ে উঠল, যেন ও গুলি করতে পারেনি সেটা আমাদেরই দোষ। কুৎসিত একটা গালাগাল দিয়ে আমাদের নিয়ে ঠাট্টা মশকরা শুরু করল,সে। ওর সাথে যোগ দিল থম্পসন, ম্যাককয় আর জন উইলিয়ামস। কয়েক মিনিটের ভেতর আমাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। হাতাহাতি লেগে যায় আর কি দুদলে। হৈ-চৈ শুনে এগিয়ে এল ক্রিশ্চিয়ান। রাগে ওর চোখ দুটো জ্বলছে ভাটার মত।

থম্পসন, তুমি তোমার কাজে যাও, গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ করল সে। আর, বারকিট, আর যদি ঝামেলা পাকাও, তোমাকে শিকলে বাধার নির্দেশ দিতে বাধ্য হব আমি!

 আচ্ছা! তাই নাকি? বিদ্রূপ করল থম্পসন। দেখুন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আরেকজন ক্যাপ্টেন ব্লাইকে ঘাড়ের ওপর বসানোর জন্যে, আমরা বিদ্রোহ করিনি, কথাটা আপনার জেনে রাখা দরকার!

ঠিক, আর কোন ব্লাইকে আমরা চাই না, জুড়ে দিল উইলিয়ামস।

কোন কথা বলল না ক্রিশ্চিয়ান। ওদের দিকে তাকাল শুধু। আমি দেখলাম, ওর চোখে ক্রোধ নেই তিরস্কার নেই; যা আছে তার একটাই নাম দেওয়া যেতে পারে-কর্তৃত্ব। একে একে চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হলো চারজন।

আরও কয়েকজন বিদ্রোহী এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের আশেপাশে। তাদের ভেতর থেকে আলেকজান্ডার স্মিথকে ডেকে ক্রিশ্চিয়ান বলল, সবাইকে ডেকে আসতে বলো।

 এল সবাই। একে একে প্রত্যেকের দিকে তাকাল ক্রিশ্চিয়ান। কোন রকম ভাব বা অনুভুতি নেই ওর চোখে।। একটা ব্যাপার চিরদিনের জন্যে ফয়সালা হয়ে যাওয়া দরকার, শান্ত কণ্ঠে উরু করল সে, কে এই জাহাজের ক্যাপ্টেন হবে। তোমাদের সাহায্য নিয়ে আমি একে দখল করছি। কেন একজন স্বেচ্ছাচারী, যে আমাদের প্রত্যেকের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে। এখন। থেকে নিজেদের সম্পর্কে কোন ভুল ধারণা মনে ঠাঁই দেয়া আমাদের উচিত হবে না। আমরা বিদ্রোহী। বিদ্রোহ করে আমরা রাজার জাহাজ দখল করে নিয়েছি। রাজার আর কোন জাহাজ যদি আমাদের খোঁজ পায়, এবং কোন মতে ধরে। ইংল্যান্ডে নিয়ে যেতে পারে, তোমরা নিশ্চিত থাকতে পারে; মৃত্যু ছাড়া আর কোন শাস্তি আমাদের দেয়া হবে না। তোমাদের কেউ কেউ হয়তো ভাবছ, সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, সম্ভাবনা আছে এবং বেশ ভাল পরিমাণেই আছে। ব্লাই যদি কোন মতে ইংল্যান্ডে ফিরতে পারে, ও পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খোঁজে যুদ্ধ জাহাজ পাঠানো হবে। ও যদি না পৌঁছায়, তবু এক বা দুবছরের ভেতর যদি বাউন্টি না ফেরে যুদ্ধ জাহাজ পাঠানো হবে। আর কিছু না হোক বাউন্টির গায়েব হয়ে যাওয়ার কারণ খোঁজার। জন্যে হলেও পাঠানো হবে। সুতরাং আমাদের সামনে আসলে খুশি হওয়ার মত তেমন কিছু নেই। একটা কথা তোমরা মনে গেঁথে নিতে পারো, ইংল্যান্ড থেকে আমরা চিরদিনের জন্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। ওখানে ফেরার কথা স্বপ্নেও আমাদের মনে ঠাঁই দেয়া উচিত হবে না।

এখন প্রশ্ন, তাহলে আমরা কী করব? আমাদের সামনে পেছনে, ডানে বায়ে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর। এই মহাসমুদ্রের কোথায় কি আছে সে সম্পর্কে এত সামান্য আমরা জানি যে, যদি আমরা নিজেদের দোষে ধরা না পড়ি তো আমার মনে হয় না কেউ আমাদের খুঁজে বের করে ধরতে পারবে। সুতরাং এই মুহূর্তে আমাদের যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো একজন নেতা, যার নির্দেশ কোন রকম প্রশ্ন না তুললেই আমরা মেনে নেব। আমাকে যদি তোমরা নেতা নির্বাচন করো, আমি নিঃশর্ত বাধ্যতা চাইব তোমাদের কাছে-হ্যাঁ, নিঃশর্ত বাধ্যতা। বিনিময়ে আমি শুধু এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি, তোমাদের কারও ওপর কোন অন্যায় আমি করব না; যথার্থ কারণ না থাকলে কাউকে শাস্তি দেব না। আমি এমন কোন কাজ করব না-অন্তত আমার জ্ঞান মতে-যাতে, তোমাদের কারও কোন ক্ষতি হয়।

এখন বলো তোমরা কি করবে? আমি চাই তোমরাই ঠিক করবে কে পরিচালনা করবে বাউন্টিকে। যদি মনে করো আমার চেয়ে যোগ্য লোক তোমাদের ভেতর আছে, নাম বলো, তার সমর্থনে আমি ছেড়ে দেব আমার নেতৃত্বের দাবি। আর যদি মনে করো, আমিই যোগ্য তাহলে আমার ওই কথা-কোন প্রশ্ন না তুলে মেনে নিতে হবে আমার আদেশ-সে যেকোন পরিস্থিতিতে যেকোন আদেশই হোক।

থামল ক্রিশ্চিয়ান। চুপ সবাই। কি বলবে বা বলা উচিত কেউ যেন বুঝতে পারছে না। যা, বলো, কি বলার আছে তোমাদের? অবশেষে নীরবতা ভাঙল চার্চিল।

আমার মনে হয় মিস্টার ক্রিশ্চিয়ানই সবচেয়ে যোগ্য লোক আমাদের ভেতর, স্মিথ বলল।

সঙ্গে সঙ্গে স্মিথের সমর্থনে হ্যাঁ, হ্যাঁ করে উঠল বেশির ভাগ বিদ্রোহী। বাদ রইল কেবল থম্পসন আর উইলিয়ামস। তবে ক্রিশ্চিয়ান যখন হাত তুলতে বলল তখন অন্যদের সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলল ওরাও।

আর একটা ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বলে চলল ক্রিশ্চিয়ান। আমাদের সঙ্গে এমন কয়েকজন লোক রয়েছে যারা জাহাজ দখলের ব্যাপারে কোন ভূমিকা নেয়নি। সুযোগ পেলে ব্লাইয়ের সঙ্গে চলে যেত…

শিকল দিয়ে বেঁধে রাখুন,বলে উঠল মিলস। নয়তো সুযোগ পেলেই আমাদের ক্ষতি করবে ওরা। _ এই জাহাজে সত্যিকারের কারণ না থাকলে কোন দিনই কাউকে আর শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হবে না, জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়নি মানেই ওরা দোষ করেছে তা আমি মনে করি না। ওদের কাছে যা ভাল মনে হয়েছে তা-ই ওরা করেছে; ওদের সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করি। কিন্তু এখন-যখন আমাদের আর ওদের ভাগ্য এক সাথে বাধা হয়ে গেছে তখন যদি কোনরকম ছল-চাতুরী বা বিশ্বাসঘাতকতা করে কি শাস্তি ওদের দিতে হবে তা আমি জানি। ওদের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি ঠিক করার ভার-ওরা কি করবে।

এর পর এক একে আমাদের প্রত্যেককে আলাদা ভাবে ডেকে ক্রিশ্চিয়ান জিজ্ঞেস করল, আমরা এই জাহাজের একজন হিসেবে অন্যদের সাথে সহযোগিতা করতে রাজি আছি কি না। আমরা বললাম, নতুন, ক্যাপ্টেনের নির্দেশ আমরা মেনে চলব, আমাদের সাধ্যমত সাহায্য করব জাহাজ পরিচালনায়, এবং বিশ্বাসঘাতকতা করার কোন রকম চেষ্টা করব না-অন্তত যতক্ষণ জাহাজে আছি ততক্ষণ না।

এটুকুই যথেষ্ট, আমাদের সবার বক্তব্য শোনার পর ক্রিশ্চিয়ান বলল। তোমাদের কাছ থেকে এর বেশি কিছু চাই না আমি।

এর পর নতুনভাবে বাউন্টির অফিসারদের নির্বাচন করা হলো। ইয়ংকে করা হলো মাস্টার, স্টুয়ার্টকে মাস্টারের মেট, আমাকে কোয়ার্টার মাস্টার, মরিসনকে সারেং আর আলেকজান্ডার স্মিথকে সারেং-এর মেট। চার্চিল যা ছিল তা-ই রইল, অর্থাৎ মাস্টার অ্যাট আর্মস। বারকিট আর হিন্দ্রান্ডটকে করা হলো কোয়ার্টার মাস্টারের মেট। মিলওয়ার্ড আর বায়ার্নের ওপর দায়িত্ব দেয়া হলো রান্নাঘরের। আগের মতই তিন চৌকিতে ভাগ করা হলো আমাদের।

এই সব খুঁটিনাটি বিষয়গুলো মীমাংসা হয়ে যেতেই আমরা লেগে গেলাম যার যার কাজে। নিচের বড় কেবিনটা ফাঁকা করা হলো প্রথমে। রুটিফলের চারাগুলো সব ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হলো সাগরে। এই কেবিনেরই এক অংশে সামান্য কিছু অদলবদল করে ক্রিশ্চিয়ানের থাকার জায়গা করা হলো। অস্ত্রের সিন্দুকটা নিয়ে যাওয়া হলো সেখানে। ক্রিশ্চিয়ান ওটাকে চৌকি হিসেবে ব্যবহার করতে লাগল। সিন্দুকটার চাবি ও নিজের কাছে রাখল। বিদ্রোহীদের একজনকে রাতদিন পাহারা দেয়ার জন্যে বসিয়ে দেয়া হলো কেবিনটার দরজায়।

বিকেল পর্যন্ত আগের গতিপথেই চলল বাউন্টি। অর্থাৎ পশ্চিম-উত্তর পশ্চিম দিকে। তারপর দিক বদলানোর নির্দেশ দিল ক্রিশ্চিয়ান। সোজা পুব দিকে চললাম আমরা।

কয়েক ঘণ্টার ভেতর সম্পূর্ণ অজানা-যেখানে আগে কখনও কোন ইংলিশ জাহাজ আসেনি এমন সাগরে এসে পড়ল বাউন্টি। ক্রিশ্চিয়ানের মনোভাব আমি যদ্র অনুমান করতে পারছি; নির্জন বা এখন পর্যন্ত সভ্য দুনিয়ার কাছে

.

দিন কাটছে নিরুত্তাপ নিরুদ্বেগে। বাউন্টিতে, ওঠার পর এমন নিরুদ্বেগ দিন আমি বা আর কোন নাবিক কাটিয়েছে বলে মনে পড়ে না। ব্লাইয়ের অনুপস্থিতি আমাদের-যারা বিদ্রোহ করেছে, যারা করেনি, সবার জীবনে পরম এক স্বস্তি এনে দিয়েছে যেন। আগের মত সারাক্ষণ মানসিক চাপের ভেতর থাকা নেই; ক্যাপ্টেন ডেকে এলেই কি ঘটবে, কি ঘটবে-এই দুশ্চিন্তা নেই, নাবিকদের ভেতর নেই কোন অসন্তোষ, চাপা বিক্ষোভ। ক্রিশ্চিয়ানও ব্লাইয়ের মতই কড়াকড়ি ভাবে শৃঙ্খলা রক্ষা করে, কিন্তু সেজন্যে তার কথায় কথায় নাবিকদের চাবকানোর প্রয়োজন পড়ে না। ক্রিশ্চিয়ান জন্ম নেতা। চাবুক না মেরেও কি করে মানুষকে বশে রাখতে হয়, সুশৃঙ্খল রাখতে হয় সে জানে। একমাত্র ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা যদি সারাক্ষণ আমাদের মনকে কুরে কুরে না খেত তাহলে বলতে পারতাম ভালই আছি ক্রিশ্চিয়ানের অধীনে।

বেশ কয়েকটা দিন চলে গেল এভাবে। তারপর এক ভোরে মাস্তুলের ওপর থেকে চিৎকার ভেসে এল পাঞ্জেরীর:

ডাঙা দেখা যায়?

বিকেল নাগাদ দ্বীপটার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম আমরা। বাইরে থেকে যতটুকু বুঝলাম, মাইল আটেক লম্বা দ্বীপ। ভেতরের অংশ তাহিতির মতই পাহাড়ী, যদিও পাহাড়গুলো তাহিতির মত অত উঁচু নয়। উপকূলের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে বেশ কতকগুলো ক্যানো। বাউন্টিকে দেখে এগিয়ে এল কয়েকটা। প্রত্যেকটায় দশ বারো জন করে মানুষ। গায়ের রঙ, দেহের গঠন, চেহারা ইত্যাদি তাহিতীয়দের মতই। সবার চোখে অদ্ভুত এক বিস্ময়ের ভাব। বুঝতে অসুবিধা হলো না, এর আগে কখনও ইউরোপীয় জাহাজ দেখেনি ওরা।

ক্রিশ্চিয়ানের নির্দেশে ওদের সাথে তাহিতীয় ভাষায় আলাপ করলাম আমি। আমার কথা সহজেই বুঝতে পারল লোকগুলো। ওদের দেশের নাম জিজ্ঞেস কমতে জানাল রারোটোঙ্গা। একটা আশ্চর্য ব্যাপার এই রারোটোজার, মানুষগুলোর ভেতর দেখলাম, ওরা কেউ আমাদের জাহাজে উঠতে চাইল না। নানাভাবে আমরা ওদের ডাকলাম, উপহার দিলাম। কিন্তু লাভ হলো না। উপহারগুলো নিল, নিয়ে খুশি হলো, কিন্তু জাহাজে উঠল না একজনও। শেষমেষ ক্রিশ্চিয়ান পাল তুলে দেয়ার নির্দেশ দিল। হতাশ হলো নাবিকরা। রারোটোঙ্গা তাহিতির চেয়ে মোটেই কম সুন্দর নয়। লোকগুলোকেও বন্ধুভাবাপন্নই মনে হলো। তাছাড়া তাহিতি থেকে কম পক্ষে সাতশো মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে দ্বীপটা, আমরা ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কোন ইউরোপীয় এটার খোঁজ পেয়েছে বলে মনে হয় না। তবু ক্রিশ্চিয়ান কেন যে দ্বীপটাকে লুকিয়ে থাকার জন্যে পছন্দ করল না আমি বুঝতে পারলাম না।

কয়েক দিন পর এক সন্ধ্যায় ভীষণ অবাক করে দিয়ে ক্রিশ্চিয়ান ওর সঙ্গে খেতে ডাকল আমাকে।

আমি যখন কেবিনে ঢুকলাম ও তখন গভীর মনোযোগ দিয়ে ক্যাপ্টেন কুকের তৈরি করা একটা মানচিত্র দেখছে। সাড়া পেয়ে মুখ তুলে তাকাল। রক্ষীকে বিদায় করে দরজা বন্ধ করল। বিদ্রোহের আগে আমাদের সম্পর্ক যেমন সহজ ছিল, তেমনি সহজ ভঙ্গিতে হাসল একটু।

আমার সাথে খেতে ডেকেছি তোমাকে, বিয়্যাম, বলল ক্রিশ্চিয়ান। অবশ্য ইচ্ছে না হলে আমার আমন্ত্রণ তুমি, না-ও গ্রহণ করতে পারো।

সত্যি কথা বলতে কি বিদ্রোহের আগে ক্রিশ্চিয়ান সম্পর্কে আমার যে ধারণা ছিল এখন তা নেই। আমাদের এতগুলো জীবন নষ্ট করে দেয়ার মূলে রয়েছে ও, কথাটা আমি ভুলতে পারি না কিছুতেই। মনে তাই একটা বিষ্ণার ভাব আমার আছে ওর সম্পর্কে। তবে এখন তা প্রকাশ করলাম না। শুধু বললাম, না; না, গ্রহণ না করার কি আছে?

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম আমরা। তারপর একসময় ক্রিশ্চিয়ান বলল, ব্লাই সম্পর্কে যখন ভাবি, কোন রকম অনুশোচনা হয় না আমার। বিন্দুমাত্র না। কিন্তু যখনই ওর সঙ্গে যারা গেছে তাদের কথা মনে হয়…

কথাটা শেষ না করে চোখ বুজে দুহাতে কপাল চেপে ধরল ও। মৃদু মৃদু নড়তে লাগল মাথাটা। খানিকক্ষণ পর আবার বলল, আমার মত হঠাৎ উত্তেজনা বা আবেগের বশে কোন কাজ কখনও করে বোসো না, বিয়্যাম। জীবনে শান্তি বলে আর কিছু থাকবে না তাহলে।

সুপরিকল্পিত একটা বিদ্রোহকে আপনি আবেগের বশে করা কাজ বলছেন! রূঢ় শোনালেও ক্রিশ্চিয়ানের মুখের ওপর আমি কথাটা না বলে পারলাম না।

কি বলছ তুমি! সবিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল সে। ভেবেছ আগে থাকতে আটঘাট বেঁধে আমরা বিদ্রোহ করেছি।

তাছাড়া আর কি? আমি জবাব দিলাম। ঘটনাটা যখন ঘটে তখন আপনার চৌকির ওপর জাহাজের ভার। চার্চিলের ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভেঙে উঠে দেখলাম পুরো জাহাজ আপনার দখলে; হ্যাঁচের মুখে, ডেকের কোনায় কোনায় দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র লোক। এর পরও কি করে ভাবব বিদ্রোহটা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না?

কিন্তু সত্যিই ওটা পূর্বপরিকল্পিত ছিল না, বলল ক্রিশ্চিয়ান। ঘটনা ঘটার মাত্র পাঁচ মিনিট আগেও আমি ভাবিনি বিদ্রোহ করর। তাহলে বলি তোমাকে…সে রাতে তোমার সাথে আমার কি কি কথা হয়েছিল, মনে আছে?

হ্যাঁ।

আমি বলেছিলাম, আমার যদি কিছু হয়, আমার বাড়িতে গিয়ে দেখা কোরো আমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে। কেন বলেছিলাম ওকথা জানো? আমি পালাতে চেয়েছিলাম বাউন্টি থেকে।

আচ্ছা!

হ্যাঁ, নর্টন ছাড়া আর কেউ জানত না এ কথা। ও আমার জন্যে একটা ছোট্ট ভেলা তৈরি করেছিল। ভেবেছিলাম ওই ভেলা নিয়ে আমি তোফোয়ায় পৌঁছে যেতে পারব।

সত্যি!

হ্যাঁ, বিয়্যাম সত্যি। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না ব্লাইকে। জন নটন নিজের ইচ্ছায় ব্লাইয়ের সঙ্গে গেছে। ও আমাকে পালাতে সাহায্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমার সঙ্গে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ করতে চায়নি। ও থাকলে ওর কাছেই শুনতে পেতে আমি সত্যি বলছি কি না।

তারপর?

ভাগ্য আমার সহায় ছিল না, আর কি। সে রাতে কেমন গরম ছিল তোমার মনে আছে তোমার মত জাহাজের বেশির ভাগ লোকই ছিল ডেকে। ফলে ভেলাটাকে জলে ভাসানোর কোন সুযোগই আমি পাইনি।

ভোর চারটেয় যখন পেকওভারের কাছ থেকে ডেকের দায়িত্ব নিলাম তখনও কিন্তু বিদ্রোহের কথা আমার মনে আসেনি। বিশ্বাস করো, আমি সত্যি কথা বলছি। কিছুক্ষণ পায়চারি করলাম একা একা। আমার মনে তখন হানা দিয়ে বেড়াচ্ছে ব্লাইয়ের অপমানকর কথাগুলো। সে-সময় একবার ওকে খুন করার কথাও ভেবেছিলাম। সত্যি সত্যি খুন। তাহলে বুঝে দেখ, আমার মনের অবস্থা তখন কোথায় পৌঁছে ছিল!

মনটাকে শান্ত করার জন্য জাহাজের সামনে গেলাম। ওখানে তখন পাহারায় থাকার কথা হেওয়ার্ডের। দেখি আরও তিনজন নাবিকের সঙ্গে ও ঘুমিয়ে আছে। কাজে গাফিলতির জন্যে ওর ওপর আমার রেগে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আশ্চর্য, একটুও রাগ হলো না আমার। বরং একটু স্বস্তির ভাব হলে মনে। এবং তথনই কে যেন আমার কানে কানে বলে গেল কথাগুলো, ব্লাইও এখন মুমিয়ে, দখল করে মাও না জাহাজটা!

মুহূর্তে সচেতন হয়ে উঠলাম আমি। কথাটা নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলাম মনে মনে। দ্রুত একবার চক্কর দিলাম সারা জাহাজে। বেশির ভাগ লোকই ঘুমিয়ে আছে। একমাত্র বারকিটকে দেখলাম জেগে থাকতে। বহুবার ব্লাইয়ের কাছে শাস্তি খেয়েছে ও। তাই মনে হলো ওকে হয়তো বিশ্বাস করা যায়। বারকিটের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, চার্চিল, মাটিন, থম্পসন আর কুইনটালকে জাগাতে পারবে অন্য কাউকে বিরক্ত না করে?

হ্যাঁ, স্যার, জবাব দিল বারকিট। কিন্তু কেন।

আমি বললাম, কারণ আছে, ওদের নিয়ে সামনের মইয়ের কাছে এসো, বলব।

বারকিটকে পাঠিয়ে দিয়ে আমি গিয়ে দাঁড়ালাম কোলম্যানের হ্যামকের কাছে। নিঃশব্দে ওকে জাগিয়ে অস্ত্রের সিন্দুকের চাবিটা চাইলাম। কারণ দেখালাম, জাহাজের আশপাশে একটা হাঙর ঘোরাঘুরি করছে, ওটা মারার জন্যে একটা মাস্কেট বের করব। কোলম্যান চাবিটা আমার হাতে দিয়ে পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

অস্ত্রের সিন্দুকের কাছে গিয়ে দেখি, হ্যালেট শুয়ে আছে তার ওপর। ওরও তখন কাজের সময়, ঘুমানোর কথা নয়। তাই ধমকে ওকে ডেকে পাঠিয়ে দেয়া কঠিন কিছু হলো না। বেচারা ধরা পড়ে এমন ভয় পেয়েছিল যে প্রায় উধ্বশ্বাসে ছুটে চলে গেল ডেকে। সামনের মইয়ের কাছে চলে গেলাম আমি। বারকিট এবং অন্যরা তখন পৌঁছে গেছে ওখানে। ওদের খুলে বললাম আমার পরিকল্পনার কথা-হ্যাঁ এর ভেতরে একটা পরিকল্পনা আমি খাড়া করে ফেলেছি মনে মনে। রা এক কথায় রাজি হয়ে গেল। শুধু রাজি নয়, উৎসাহে রীতিমত টগবগ করতে লাগল। অন্ত্রের সিন্দুক খুলে আমরা সবাই মাস্কেট, পিস্তল-যার যেমন পছন্দ-হাতে তুলে নিলাম। এবার ম্যাককয়, উইলিয়ামস, আলেকজান্ডার স্মিথ এবং অন্যদের জাগানো হলো। ওদেরও অস্ত্র দিলাম। কে কোথায় কি দায়িত্ব পালন করবে বুঝিয়ে দিয়ে আমি ঢুকলাম ব্লাইয়ের কেবিনে। বাকিটা তো তুমি জানো।

চুপ করল ক্রিশ্চিয়ান। আমিও চুপ।

আপনার কি মনে হয় ব্লাই ইংল্যান্ডে পৌঁছাতে পারবেন? কিছুক্ষণ পর আমি প্রশ্ন করলাম।

সম্ভাবনা কম। খুব কম। টিমোর ছাড়া সাহায্য পাওয়ার মত কোন জায়গা আশেপাশে নেই। যেখানে ওদের ছেড়েছি সেখান থেকে টিমোরের দূরত্ব কমপক্ষে বারোশো লিগ। সুতরাং বুঝতে পারছ…। আমি অবশ্য সাগরে ভাসিয়ে দিতে চাইনি। ভেবেছিলাম, বন্দী করে ওকে নিয়ে যাব ইংল্যান্ডে। কিন্তু অন্যরা রাজি হলো না-তুমি নিজেই তো দেখেছ।

আমরা যারা বিদ্রোহ করিনি অথচ কপাল দোষে বলুন আর যে কারণেই বলুন জড়িয়ে গেছি আপনাদের সাথে তাদের নিয়ে কি করবেন, ভেবেছেন কিছু। 

এ প্রশ্ন যে তুমি করবে আমি জানতাম, বলে উঠে দাঁড়াল ক্রিশ্চিয়ান। পেছন দিকের একটা জানালার পর্দা তুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সাগরের দিকে। তারপর আবার ঘুরল আমার দিকে।

তোমাদের যদি তাহিতিতে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেই, আমি জানি, তোমরা কেউই বিদ্রোহের কথা গোপন রাখবে না। তাই দুঃখের সাথে হলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি আমাদের সাথে থাকতে হবে তোমাদের। আপাতত এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।

.

আটাশ মে-বিদ্রোহের ঠিক চার সপ্তাহ পর সকাল বেলা জাহাজ থেকে প্রায়, ছলিগ দূরে একটা দ্বীপ দেখতে পেলাম আমরা। সারাদিন জাহাজ চালিয়ে দ্বীপটার পশ্চিম উপকূলের মাইল তিনেকের ভেতর পৌঁছানো গেল। ওখানেই নোঙর ফেলে রাতটা অপেক্ষা করে ভোরে আবার পাল তুলে পৌঁছলাম তীরের কাছে। আমাদের স্টুয়ার্টের স্মরণশক্তি খুব তীক্ষ্ণ। কোন মানচিত্রে কোন দ্বীপের অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ একবার দেখলে ভোলে না কখনও। ও ওর স্মৃতি হাতড়ে জানাল দ্বীপটার নাম টুপুয়াই। ক্যাপ্টেন কুক আবিষ্কার করেছিলেন এ দ্বীপ।

একটানা দুমাস সাগরে কাটিয়ে আমরা সবাই-কি বিদ্রোহী কি অবিদ্রোহী-তখন ডাঙায় নামার জন্যে উদগ্রীব। কিন্তু দুর্ভাগ্য, টুপুয়াইবাসীরা সে সুযোগ আমাদের দিল না। বাউন্টি তীরের কাছাকাছি হতেই ক্যানোয় চেপে এসে ওরা হামলা চালাল আমাদের ওপর। কমপক্ষে একশো হবে ক্যানোর সংখ্যা। প্রতিটায় আট থেকে দশজন করে ইন্ডিয়ান। তাদের হাতে বর্শা, লাঠি। কারও কারও হাতে দুরকমই আছে। ক্যানোগুলো বোঝাই ছোট ছোট নুড়ি পাথরে। বুঝলাম ভোরে দুর থেকে আমাদের জাহাজ দেখেই ওরা প্রস্তুত হয়েছে যুদ্ধের জন্যে।

বাউন্টি নুড়ি পাথর বা বর্শার পাল্লায় না পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করল ওরা। তারপর আচমকা অনেকটা হা-রে-রে-রে ধরনের শব্দ করে ছুঁড়তে শুরু করল পাথর আর বর্শা। কিছুক্ষণের ভেতর আমাদের জনা চারেক নাবিক আহত হলো। আঘাত খুব সামান্য যদিও তবু আঘাত তো। তীরের কাছ থেকে জাহাজ সরিয়ে নিলাম আমরা। কয়েকজন বিদ্রোহী কামান দাগার প্রস্তাব দিল। তা যদি করা হত সন্দেহ নেই বহু জংলী হতাহত হত, যারা বেঁচে থাকত তারা এমন আতঙ্কিত হয়ে পড়ত যে সহজেই তাদের বশ মানিয়ে আমরা এ দ্বীপে থেকে যেতে পারতাম। কিন্তু দুটোর একটাও ক্রিশ্চিয়ানের ইচ্ছা নয়।

কোয়ার্টার ডেকে নিজের দলের লোকদের নিয়ে আলোচনায় বসল ও। আমরা যারা অবিদ্রোহী তাদের পাঠিয়ে দেয়া হলো সামনে, যেন ওদের আলাপ শুনতে না পাই। মিনিট পনেরো পরেই দেখলাম হাসতে হাসতে যে যার কাজে লেগে গেল বিদ্রোহীরা। উত্তর দিকে চলতে শুরু করল বাউন্টি।

কেউ আমাদের কিছু বলেনি তবু উত্তর দিকে এগোনো দেখে বলতে পারলাম বাউন্টির গন্তব্য একটাই হতে পারে-তাহিতি।

সেদিনই বিকেলে মরিসন, স্টুয়ার্ট আর আমি বার্থে বসে ফিসফিস করে যুক্তি করলাম, সত্যি যদি তাহিতিতেই আমাদের নিয়ে যায় ক্রিশ্চিয়ান, যে করে হোক পালাব আমরা। আজ হোক কাল হোক সভ্য দুনিয়ার কোন জাহাজ ওখানে আসবে। তখন আশা করা যায় দেশে ফেরা কঠিন হবে না আমাদের জন্যে।

.

দশ

পরদিন ক্রিশ্চিয়ান আবার আমাকে ডেকে পাঠাল ওর কেবিনে। গিয়ে দেখলাম চার্চিলও আছে। আমি ঢুকতেই রক্ষীকে বিদায় করে দরজা বন্ধ করে দিল সে।

তোমাকে একটা কথা বলার জন্যে ডেকেছি, বিয়্যাম, ক্রিশ্চিয়ান শুরু করল। আমরা এখন তাহিতির দিকে এগোচ্ছি। ওখানে সপ্তাহ খানেক থেকে খাবার, পানি ইত্যাদি সংগ্রহ করব।

আমার মুখ দেখেই মনের খবর আঁচ করতে পারল যেন ক্রিশ্চিয়ান। মাথা নেড়ে বলল, না, তোমাদের ছেড়ে দেব না তাহিতিতে। প্রথমে অবশ্য তা-ই ভেবেছিলাম। কিন্তু আমার সাথীরা কেউ রাজি হলো না।

হ্যাঁ, মিস্টার বিয়্যাম, বলল সর্দিল। কাল অনেক রাত পর্যন্ত আমরা আলাপ করেছি তোমাদের নিয়ে। একটা ব্যাপারে সবাই এক মত, তোমাদের ভাল ছাড়া খারাপ আমরা কেউ চাই না। তবু ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

কারণটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ? জিজ্ঞেস করল ক্রিশ্চিয়ান। ছেড়ে যাওয়া তো পরের কথা, তাহিতিতে নামতেই দেয়া হবে না তোমাদের। ওরা বলছিল নিচে আটকে রাখতে। কিন্তু আমি তা চাই না। তাই ওদের বলেছি, বিদ্রোহ সম্পর্কে তাহিতীয়দের কাছে মুখ খুলবে না এরকম প্রতিশ্রুতি যদি দাও, তোমাদের ডেকে থাকতে দিতে আপত্তি করা উচিত হবে না। ওরা রাজি হয়েছে আমার কথায়।

বুঝতে পেরেছি, স্যার, আমি বললাম, যদিও আমি মনে করি আমাদের তাহিতিতে নামিয়ে দিয়ে গেলেই আপনারা…

অসম্ভব। ক্রিশ্চিয়ান বলল। যদিও ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোমাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আমি একদম মানতে পারছি না, তবু এছাড়া কোন উপায় নেই। তোমাদের ছেড়ে দিলেই ইন্ডিয়ানদের জানাবে বিদ্রোহের কথা। তখন ওরা আমাদের খাবার, পানি দেবে? দেবে না।

দেবে তো না-ই, হয়তো হামলা করে বসবে, বলল চার্চিল।

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, আমি বললাম, সারা জীবন আমরা আপনাদের সাথেই থাকব?

আঁ-হ্যাঁ। সভ্য দুনিয়ার কাছে এখনও অজানা এমন কোন দ্বীপে নেমে আমরা ধ্বংস করে দেব বাউন্টিকে। বাকি জীবন ওই দ্বীপেই কাটাতে হবে আমাদের। তোমাদেরও।

হ্যাঁ, চার্চিল বলল, এছাড়া কোন পথ খোলা নেই আমাদের সামনে।

উঠে দাঁড়াল ক্রিশ্চিয়ান। অর্থাৎ, এবার তুমি বিদায় হতে পারো।

সুতরাং আমি বিদায় নিলাম।

ডেকের ওপর এসে বিষণ্ণ মুখে তাকিয়ে রইলাম ভোলা সাগরের দিকে।

.

মনের ভেতর ঘুর পাক খাচ্ছে ক্রিশ্চিয়ানের কথাগুলো।-প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, বিদ্রোহের কথা ফাঁস করব না ইন্ডিয়ানদের কাছে। তার মানে পালানোর আশা নেই বললেই চলে। বিদ্রোহীরা নিশ্চয়ই চোখ রাখবে আমাদের ওপর। এর পর যদি পালাব না এই প্রতিশ্রুতি চেয়ে বসে।

বাৰ্থে ফিরে স্টুয়ার্টকে একা পেয়ে বললাম ক্রিশ্চিয়ান যা যা বলেছে। শুনেই গম্ভীর হয়ে গেল স্টুয়ার্ট। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, অন্তত পেগির সঙ্গে একবার দেখা করতে পারব তো।

তা বোধ হয় পারবে, যদি প্রতিশ্রুতি দাও।

দেব। পেগিকে এক পলক দেখার জন্যে হলেও দেব। হঠাৎ করেই উঠে পায়চারি শুরু করল স্টুয়ার্ট। আস্তে আস্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওর মুখ। বলল, পেগি হয়তো পালানোর ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে আমাদের।

লাফ দিয়ে উঠলাম আমি। হ্যাঁ পারবে, স্টুয়ার্ট! পারলে ও-ই পারবে। ওর সঙ্গে দেখা হলে এক ফাঁকে জানাবে, চার্চিল যেমন অন্যদের নিয়ে পালিয়েছিল আমরাও তেমনি পালাতে চাই, ও যেন গভীর রাতে একটা বড় ক্যানো নিয়ে চলে আসে জাহাজের কাছে। ক্যানোয় চেপে অন্য কোন দ্বীপে চলে যাব আমরা।

হ্যাঁ, পেগিই আমাদের একমাত্র ভরসা, বলল স্টুয়ার্ট। মাত্র দশটা মিনিট ওর সাথে একা থাকতে পারলে আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলতে পারব। বলব, ক্যানো চালানোর সময় বেশি শব্দ যেন না হয়। অবশ্য হলেও তেমন অসুবিধা নেই। ইন্ডিয়ানরা মাছ ধরার সময় দিন রাতের বাছ বিচার তো করে না। সুতরাং কে সন্দেহ করবে? ডেকে যে পাহারায় থাকবে তাকে বোকা বানানো শক্ত হবে না। নিঃশব্দে আমরা নেমে যাব পানিতে। ডুব সাঁতার দিয়ে ক্যানোর কাছে। পৌঁছুতে পারব সহজেই। তারপর ওটার আড়ালে আড়ালে জাহাজের দৃষ্টিসীমার বাইরে গিয়ে উঠব ক্যানোয়।

হ্যাঁ, স্টুয়ার্ট, আমার বিশ্বাস, পারব আমরা!

পারতেই হবে।

.

জুনের পাঁচ তারিখ বিকেলে আমরা তাহিতির দেখা পেলাম। পরদিন বিকেলে পয়েন্ট ভেনাসের কাছে নোঙ্গর ফেলল বাউন্টি। ইন্ডিয়ানরা ক্যাননীয় চেপে এসে ঘিরে ধরল আমাদের। এত তাড়াতাড়ি আবার আমরা এসেছি দেখে অবাক সবাই। টেইনা, হিটিহিটি, এবং আরও কয়েকজন গোত্রপতি উঠে এল জাহাজে। তাদের মুখে প্রশ্ন, এত তাড়াতাড়ি আমরা ফিরে এলাম কেন। ক্রিশ্চিয়ানের হয়ে জবাব দিলাম আমি। যা বললাম তার মর্মার্থ হলো; আইটুটাকিতে ব্লাইয়ের বাবা মানে ক্যাপ্টেন কুকের সাথে দেখা হয়ে যায় আমাদের। ওই দ্বীপে একটা ইংরেজ উপনিবেশ গড়ে তুলছেন কুক। সেজন্যে ব্লাই, নেলসন এবং আরও কয়েকজনকে নিজের জাহাজে তুলে নিয়েছেন। রুটিফলের চারাগুলোও তিনি রেখে দিয়েছেন, এবং আমাদের পাঠিয়েছেন তাহিতি থেকে আরও খাবার দাবার এবং জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্যে। এবার আমরা বেশির ভাগই জ্যান্ত জীব জানোয়ার নিতে চাই, জানাতে ভুললাম না।

এই ব্যাখ্যা শুনে পুরোপুরিই সন্তুষ্ট হলো ইন্ডিয়ানরা। শুরু হলো বিনিময় এবং ব্যবসা।

সেদিন সন্ধ্যায় ক্রিশ্চিয়ান, আর আমার তাইও হিটিহিটির সাথে খেতে বসেছি আমি। ক্রিশ্চিয়ানের মনের মানুষ মাইমিতিও আছে। ও খাচ্ছে না-ইন্ডিয়ান নারীরা পুরুষের সঙ্গে খায় না কখনও। গল্প করতে করতে খাওয়া চলল।

ডাঙায় আমার বাড়িতে থাকো, বিয়্যাম, এক সময় হিটিহিটি বলল।

জবাব দেয়ার সময় ক্রিশ্চিয়ানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ছোঁয়া অনুভব করলাম আমি।

না, হিটিহিটি, জবাব দিলাম, এবার বোধহয় তা সম্ভব হবে না। মাত্র কয়েকদিন থাকব এখানে। তাছাড়া আমাদের লোক অনেক কমে গেছে। আমি তোমার বাড়িতে গেলে জাহাজের কাজে অসুবিধা হবে।

অবাক হয়ে ক্রিশ্চিয়ানের দিকে তাকাল হিটিহিটি।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকিয়ে ক্রিশ্চিয়ান বলল, জাহাজে ওকে দরকার হবে আমার।

ব্রিটিশ জাহাজের শৃঙ্খলা সম্পর্কে জানে হিটিহিটি, তাই এ নিয়ে আর কথা বাড়াল না।

বিকেলেই পেগি জাহাজে এসে উঠেছে। খাওয়ার পর ডেকে গিয়ে দেখি ও আর স্টুয়ার্ট পাশাপাশি বসে আছে প্রধান মাস্তুলের গোড়ায়। ইন্ডিয়ান ভাষায় কথা বলছে দুজন। পেগি চলে যাওয়ার পর স্টুয়ার্ট, মরিসন আর আমি পূর্বপরিকল্পনা মত মিলিত হলাম প্রধান হ্যাঁচের কাছে। * পেগিকে সব বুঝিয়ে বলেছি, স্টুয়ার্ট বলল। ও ভেবেছে ওর জন্যেই আমি পালাতে চাইছি জাহাজ ছেড়ে-একেবারে মিথ্যে নয় কথাটা। আর তোমাদের ব্যাপারটা ভেবেছে, ইন্ডিয়ান জীবন খুব পছন্দ হয়ে গেছে তাই তোমরা পালাতে চাইছ।

যা-ই ভাবুক, ও সাহায্য করবে কিনা তাই বলল, আমি বললাম।

হ্যাঁ। কিন্তু সমস্যা হয়েছে, ওদের পরিবারের একমাত্র বড় ক্যানোটা এখন টেতিয়ারোয়ায়। কাল যদি বাতাস অনুকূল থাকে একটা ছোট ক্যানো ও পাঠাবে ওটা নিয়ে আসার জন্যে।

আচ্ছা, ছোট ক্যানোয় করে পালাতে পারি না আমরা? জিজ্ঞেস করল মরিসন।

উঁহু, ছোট ক্যানোয় বেশি দূর যাওয়া যাবে না।

তার মানে অনুকূল বাতাসের জন্যে প্রার্থনা করা ছাড়া আপাতত আর কিছু করার নেই আমাদের? বলল মরিসন।

হ্যাঁ। রাতে খুশি মনে ঘুমাতে গেলাম। প্রায় নিশ্চিত, আমরা পালাতে পারব। তারপর এক বা দুবছর বড় জোর ইন্ডিয়ানদের ভেতর কাটাতে হবে। এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোন জাহাজ এসে যাবে ইংল্যান্ড থেকে।

পরদিন সকালে দুজন শক্ত পোক্ত মানুষ পেগির ছোট ক্যানোটা নিয়ে চলে গেল উত্তরে টেতিয়ারোয়ার দিকে। রাতের ভেতরেই আশা করা যায় বড় ক্যানোটাকে নিয়ে ফিরে আসবে ওরা। সারা দুপুর উদ্বেগের সঙ্গে আবহাওয়ার ভাব চাল খেয়াল করলাম আমরা। তারপর যা ভেবেছিলাম ঠিক তা-ই ঘটল; বিকেল থেকে মেঘ জমতে শুরু করল আকাশে। সন্ধ্যা নাগাদ শুরু হয়ে গেল তুমুল ঝড়। এই ঝড়ে কোন ক্যানোর তীরে আসার কথা কল্পনাও করা যায় না।

নদিন পর থামল ঝড়। আকাশ আবার আগের মত ঝকঝকে নীল। দুপুরের সামান্য আগে পেগির বড় ক্যানোটা ফিরে এল টেতিয়ারোয়া থেকে। নদিন ধরে মনের ওপর চেপে বসে থাকা উদ্বেগ দূর হয়ে গেল মুহূর্তে। পেগি এল জাহাজে। ঠিক হলো সে-রাতেই পালাব আমরা।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে আরও একবার ভাগ্য আমাদের সাথে প্রবঞ্চনা করল। বিকেল তিনটের সময় কারও সাথে কোন পরামর্শ না করে আচমকা নোঙর তোলার নির্দেশ দিল ক্রিশ্চিয়ান। তাহিতি পেছনে ফেলে এগিয়ে চলল কাউন্টি।

.

প্রথমবারের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও টুপুয়াইএ-ই বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্রিশ্চিয়ান। এবার আমাদের সাথে রয়েছে নানা প্রজাতির অনেকগুলো করে জীব জন্তু-দ্বীপে ওগুলোকে ছেড়ে দেয়া হবে, যাতে ইচ্ছেমত বংশবৃদ্ধি করে আমাদের ভবিষ্যৎ খাবারের চাহিদা মেটাতে পারে। আরও আছে তিনজন ইন্ডিয়ান রমণী-ক্রিশ্চিয়ানের মাইমিতি, ইয়ং-এর টাউরুয়া, আর আলেকজান্ডার স্মিথের পারাহা ইটি। মাইমিতি আর টাউরুয়া এসেছে স্বেচ্ছায়, পারাহা ইটিকে অনেক বলে কয়ে আসতে রাজি করিয়েছে স্মিথ।

তাহিতি দৃষ্টিসীমার আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার বেশ কয়েক ঘণ্টা পর আবিষ্কার করলাম, শুধু ওই তিনজন নয় আরও ইন্ডিয়ান আছে জাহাজে। নারী পুরুষ দুরকমই। নজন পুরুষ, বারোজন নারী আর আটটা ছেলে। কখন যে ওরা জাহাজে উঠে খোলের ভেতর লুকিয়েছে আমরা টেরও পাইনি।

অবশেষে টুপুয়াই-এ পৌঁছুলাম আমরা। এবার আর আগের মত মারমুখী হয়ে উঠল না স্থানীয় অধিবাসীরা। আমাদের সাথের তাহিতীয় লোকগুলোই তার কারণ। আমাদের ওপর প্রথম দর্শনে যে অবিশ্বাস জন্মেছিল, ওদের দেখে তা বোধহয় দূর হয়েছে টুপুয়াইবাসীদের। আমাদের সঙ্গী তাহিতীয়রা ওদের বোঝাল, আমরা ওদের দেশে বসতি করতে চাই, ওদের সাথে শত্রুতা আমাদের কাম্য নয়, আমরা থাকলে ওদের অনেক সুবিধা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা মেনে নিল।

প্রচণ্ড পরিশ্রম করে জাহাজটাকে ডাঙায় টেনে তুললাম আমরা। সূর্য থেকে ডেকগুলোকে রক্ষা করার জন্যে ওপরে লতা পাতার চালা তুলে দিলাম। এরপর স্থানীয় এক গোত্রপতির কাছ থেকে সাগর তীরে এক টুকরো জমি কিনে একটা দুর্গ তৈরি করা হলো। দুর্গ মানে পাতায় ছাওয়া কুটির কয়েকটা, আর পুরো এলাকা ঘিরে চারপাশে শক্ত কাঠের বেড়া আর পরিখা। বিশ ফুট গভীর, চল্লিশ ফুট চওড়া পরিখাটা খোঁড়ার কাজে হাত লাগাতে হলো সবাইকে। বেশির ভাগ লোকই এই ভয়ানক পরিশ্রমসাধ্য কাজের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল। জবাবে ক্রিশ্চিয়ান শুধু বলল, আমার নেতৃত্ব সম্পর্কে তোমরা প্রশ্ন তুলছ। ব্যসচুপ হয়ে গেল সবাই।

পরিখার কাজ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রমাণ পাওয়া গেল ক্রিশ্চিয়ানের দূরদৃষ্টির।

দ্বীপে নেমেই আমাদের আনা জন্তু জানোয়ার সব ছেড়ে দিয়েছিলাম পাহাড়ে, বনে। ইতোমধ্যে সেগুলোর কোন কোনটা বাচ্চা দিয়েছে। এখন আর শুধু বনের খাবারে কুলায় না তাদের। বন ছেড়ে এসে হামলা চালায় দ্বীপবাসীদের টারো খেতে। ওদের ধরতে বা মারতে ব্যর্থ হয়ে দ্বীপবাসীরা ক্রিশ্চিয়ানের কাছে প্রতিকার চাইল। প্রথমবার ক্রিশ্চিয়ান বুঝিয়ে দিল, একটু সহ্য করো, কদিন পরেই আর তোমাদের খাবারের অভাব থাকবে না।

কয়েক দিন পর আবার এল জংলীরা। এবার ওরা মারমুখী। বলল, মারো ওগুলোকে, না হলে তোমাদেরই এদেশ ছাড়া করে ছাড়ব।

এবার আমরা বুঝতে পারলাম কেন এত পরিশ্রম করে পরিখা খুঁড়িয়েছিল ক্রিশ্চিয়ান। কয়েক সপ্তাহ আমরা বন্দী হয়ে রইলাম দুর্গের ভেতর। বেরোনোর চেষ্টা করলেই বাধা দেয় হিংস্র টুপুয়াইবাসীরা। একটু একটু করে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে শুরু করেছিল সবাই। অবশেষে একদিন আমাদের ডেকে হাত তুলতে বলল ক্রিশ্চিয়ান। টুপুয়াই ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিল সব কজন। ষোলো জন তাহিতিতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা জানাল, বাকিরা জনশূন্য কোন দ্বীপের সন্ধানে পাড়ি জমাতে চাইল বাউন্টিতে চেপে। যারা বাউন্টিতে থাকবে বলে ঠিক করল তারা হলো: ফ্লেচার ক্রিশ্চিয়ান, জন মিলস, এডওয়ার্ড ইয়ং, উইলিয়াম ব্রাউন, আইজাক মার্টিন, উইলিয়াম ম্যাককয়, জন উইলিয়ামস, ম্যাপ্ত কুইনটাল, আর আলেকজান্ডার স্মিথ।

আমরা টুপুয়াই ছেড়ে চলে যাব জানাতেই ইন্ডিয়ানরা অবরোধ তুলে নিতে রাজি হলো। আবার অমানুষিক পরিশ্রম করে বাউন্টিকে জলে ভাসানো হলো। খাবার, পানি, এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বোঝাই দেয়া হলো। ছেড়ে দেয়া জন্তু জানোয়ারের যতগুলোকে সম্ভব ধরে খাঁচায় পোরা হলো, বাকিগুলোকে মেরে মাংস নুন দিয়ে নেয়া হলো। তারপর আবার পাল তুলল বাউন্টি এবং পাঁচদিন পর নোঙ্গর ফেলল মাতাভাই উপসাগরে শেষ বারের মত।

.

হিটিহিটির বাড়িতে ফিরে এলাম আমি।

সব জিনিসপত্র বিশেষ করে অভিধানের অমূল্য পাণ্ডুলিপিটা (এত কিছুর ভেতরেও আমি সযত্নে সংরক্ষণ করেছি ওটা) সহ যখন পৌঁছলাম সবাই ঘিরে ধরল আমাকে। বিশ্রামেরও সময় দেবে না, এতদিন কোথায় ছিলাম, কি করেছি তা শোনাতে হবে। বারান্দায় বসে শুরু করলাম আমার কাহিনী বিদ্রোহের অংশটুকু ছাড়া (ক্রিশ্চিয়ানকে আমরা কথা দিয়েছি, ইন্ডিয়ানদের কাছে বিদ্রোহের কথা কোন দিন প্রকাশ করব না। আর সব বলে গেলাম।

চোখ বড় বড় করে শুনল ওরা। তারপর হিনা প্রশ্ন করল, এবার তোমরা কি করবে? কিছুদিন থাকবে আমাদের এখানে?

কাল অথবা পরশু ক্রিশ্চিয়ান আর অন্য আটজন আইটুটাকির পথে রওনা হয়ে যাবে। আমরা বাকিরা-যারা তোমাদের দ্বীপটাকে ভালবেসে ফেলেছি, থেকে যাব এখানে। বাকি জীবন এখানেই কাটিয়ে দেব যদি তোমরা অনুমতি দাও।

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই হিনা বুকে জড়িয়ে ধরল আমাকে। নাকে নাক ঠেকিয়ে লম্বা করে কয়েকবার শ্বাস টানল ওদের রীতিতে। তারপর বলল, আহ, বিয়্যাম, কি খুশি যে হয়েছি তোমাকে পেয়ে আমরা সবাই। তুমি চলে যাওয়ায় আমাদের বাড়িটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল একেবারে।

হ্যাঁ, বলল হিনার স্বামী। এখন থেকে তুমি আমাদের একজন। তোমাকে আমরা আর কোথাও যেতে দেব না!

সন্ধ্যার সামান্য আগে ক্রিশ্চিয়ান এল মাইমিতিকে নিয়ে। মাইমিতি সম্ভবত শেষ বারের মত এসেছে আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করতে। ক্রিশ্চিয়ানের সঙ্গে ও-ও অজানার পথে বেরিয়ে পড়বে, ঠিক করেছে। হিটিহিটির বাড়িতে কিছুক্ষণ বসে আমাকে নিয়ে সৈকতের দিকে এগোল ক্রিশ্চিয়ান। মাইমিতি রইল বাড়িতে।

গোধূলি বেলার ম্লান আলোয় বালুবেলার ওপর দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে চললাম আমি আর ক্রিশ্চিয়ান। দুজনই নিশ্চুপ।

এই আমাদের শেষ দেখা, অনেকক্ষণ পর আচমকা বলে উঠল ক্রিশ্চিয়ান। কাল ভোরেই আমরা রওনা হয়ে যাচ্ছি।

বিদ্রোহের কাহিনী শুনিয়েছি তোমাকে, বলে চলল ও। মনে রেখো, আমি-যা, একমাত্র আমিই দায়ী ও ব্যাপারে। আর কেউ না। ব্লাই আর তার সঙ্গে যারা গেছে বোধহয় অনেক আগেই তারা মারা পড়েছে, হয় ডুবে নয়তো জংলীদের হাতে। ব্লাইয়ের জন্যে আমার কোন দুঃখ নেই। ওর মত লোক পৃথিবীতে থাকা না থাকা সমান। কিন্তু অন্য যারা বিনা কারণে ওর সঙ্গে প্রাণ দিতে বাধ্য হলো তাদের স্মৃতি আমার বুকের ওপর পাথরের মত চেপে আছে। কোন দোষ করেনি বেচারিরা। তবু.. মিস্ত্রী কি পরিস্থিতিতে আমি অমন ভয়ানক কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলাম তুমি জানো। আর সবাই জানে। তবু, আমি জানি, আমাকে কেউ ক্ষমা করতে পারবে না। আমার জন্যে দুঃখ বোধ করবে সবাই, সেই সাথে আমার অপরাধটাও দেখিয়ে দেবে চোখে আঙুল দিয়ে। তাই সবার চোখের আড়ালেই চলে যাব আমি। নিজে বাঁচার চেয়ে যারা আমার সঙ্গে তাদের জীবন জড়িয়ে নিয়েছে তাদের বাঁচানো আমার কাছে বড় এখন। বিশাল এই প্রশান্ত মহাসাগরের কোন না কোন অজানা দ্বীপে আমাদের ঠাঁই হবে। বাউন্টিকে ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে আমরা থেকে যাব জীবনের জন্যে। আমাদের আর কখনও দেখবে না তোমরা। তোমাদের এই দুর্বিপাকে ফেলার জন্যে অন্তর থেকে আমি অনুতপ্ত। ক্ষমা আমি চাইব না। যদি জানতাম পাবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে তাহলে চাইতাম।

আবার নৈঃশব্দ্য গ্রাস করল আমাদের। সৈকতে সাগরের ঢেউ ভেঙে পড়ার মৃদু শব্দ আর নারকেল পাতার মৃদু সর সর আওয়াজ কেবল শোনা যাচ্ছে।

আজ হোক কাল হোক,অনেকক্ষণ পর আবার শুরু করল ক্রিশ্চিয়ান, কোন ব্রিটিশ জাহাজ এখানে নোঙ্গর ফেলবে। তোমরা যারা বিদ্রোহে জড়িত ছিলে না, সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে গিয়ে বোলো সত্যি কথাটা। আমার মনে হয় না তোমাদের কোন ক্ষতি হবে। কেন হবে? তোমরা তো নিরপরাধ।

সেই অনুরোধটা আরেকবার তোমাকে করতে চাই, বিয়্যাম-যদি কখনও দেশে ফিরতে পারো কষ্ট করে একটু দেখা কোরো আমার বুড়ো বাবার সাথে। তাকে বুঝিয়ে বোলা, কি পরিস্থিতিতে আমি ওই জঘন্য কাজটা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার বাবার নাম চার্লস ক্রিশ্চিয়ান। কাম্বারল্যান্ডের মেয়ারল্যান্ডক্লের-এ খোঁজ করলেই পাবে তাঁকে।

এক মুহূর্ত থেমে অনুনয়ের সুরে ও বলল, বিয়্যাম, করবে না এটুকু আমার জন্যে।

করব, মাথা ঝাঁকিয়ে আমি বললাম।

হিটিহিটির বাড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে ক্রিশ্চিয়ান ডাকল, মাইমিতি!

ডাকটার জন্যে যেন উন্মুখ হয়ে ছিল মেয়েটা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একগুচ্ছ নারকেল গাছের আড়াল থেকে সে বেরিয়ে এল। দুজন হাত ধরাধরি করে গিয়ে উঠে পড়ল সৈকতে ঠেকে থাকা একটা ক্যানোয়। আমিও গেলাম ওদের পেছন পেছন। ক্রিশ্চিয়ান আমার হাত ধরে বলল, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।

দাঁড় টানতে শুরু করল দাড়িরা। যতক্ষণ না ক্যানোটা গিয়ে ভিড়ল বাউন্টির গায়ে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম অন্ধকার সৈকতে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে এলাম বাড়িতে।

পরদিন ভোরে স্নান করার জন্যে সাগর তীরে গিয়ে দেখি রওনা হয়ে গেছে। বাউন্টি। সবগুলো পাল মেলে দিয়ে ছুটে চলেছে উত্তর দিকে।

<

Super User