হামিদ সাহেব কক্সবাজার জেলার কৃতী সন্তান। তিনি আমেরিকায় সেটেল্ড। সেখানকার বিরাট ব্যবসায়ী। তারা দুভাই এক বোন। বোনের বিয়ে হয়েছে চকরিয়ায় এক ধনাঢ্য পরিবারে। বড় ভাই দেশে থাকেন। হামিদ সাহেব দুএক বছর অন্তর দেশে এসে বেড়িয়ে যান। অনেক বছর আমেরিকায় বসবাস করলেও নিজে যেমন ধর্মের আইন-কানুন মেনে চলেন, তেমনি পরিবারের সবাইকে ধর্মীয় অনুকরণে পরিচালনা করেন। এবারে মা-বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে স্বপরিবারে দেশে আসেন। তাদের রুহের মাগফেরাতের জন্য পঞ্চাশ বেডের একটা দাঁতব্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠান করেন। মা বাবার নামে হাসপাতালের নাম দিয়েছেন, রহিম আফরোজা দাঁতব্য হাসপাতাল। এখানে সব শ্রেণীর মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা করা হয়। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর ধার্মীক ও চরিত্রবান ডাক্তার, নার্স ও অফিস স্টাফ নিয়োগ করার জন্য কাগজে বিজ্ঞপ্তী দেন। তাদের ইন্টারভিউ নিজে নিয়েছেন। সমুদ্র সৈকতের প্রায় এক কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে বিশ একর জমির উপর এই হাসপাতাল। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন অতি মনোরম, তেমনি রাতের সমুদ্রের গর্জন মনকে উতলা করে তোলে। পুরো হাসপাতাল পাকা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এর মধ্যেই ডাক্তার নার্স ও অফিস স্টাফদের থাকার কোয়ার্টার। এটার দুটো গেট। একটা পূর্ব দিকে। আর অন্যটা পশ্চিম দিকে। পূর্ব দিকের গেটের রাস্তা শহরের রাস্তার সঙ্গে মিশেছে। পশ্চিম গেটের রাস্তা সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত গিয়েছে।
ডাক্তার মাহবুবা এখানকার সুপারিন্টেন্ডেন্ট। তার উপরেই পুরো হাসপাতালের দায়িত্ব। তিনি একজন ধার্মীক পর্দানশীল মহিলা। হাতে পায়ে মোজা ও বোরখা পরে ডিউটি করেন।
বেলা তখন দুটো। ডাঃ মাহবুবা যোহরের নামায পড়ে খেয়ে উঠে সবেমাত্র অফিসে এসে বসেছেন, এমন সময় নার্স ইয়াসমীন হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, ম্যাডাম, একটা মুমূর্ষ রুগীকে নিয়ে একজন এসেছেন। কোনো ডাক্তার এখনো লাঞ্চ থেকে ফেরেন নি। আপনি যদি—–।
ডাঃ মাহবুবা তাকে কথাটা শেষ করতে দিলেন না। স্টেথিস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে বললেন, চলুন।
বেডের কাছে এসে ডাঃ মাহবুবা রুগী দেখে চমকে উঠে বাস্তব জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। টোপরের কঙ্কালসার শরীরের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি রোধ করতে পারলেন না।
টোপর তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
ইয়াসমীন ডাঃ মাহবুবার পরিবর্তন দেখে বেশ অবাক হয়ে বলল, ম্যাডাম, রুগীর অবস্থা খুব সঙ্গিন। দেখছেন না, কি রকম ছটফট করছেন?
ডাঃ মাহবুবা নার্সের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে টোপরকে পরীক্ষা করে চার্টে ব্যবস্থাপত্র লিখলেন। তারপর ঘুমের ইঞ্জেকসান দেওয়ার সময় বললেন, ইনাকে কেবিনে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
ইঞ্জেকসান দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে টোপর নিথর হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ডাঃ মাহবুবা নিজের রুমে ফিরে এসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে আগের জীবনের স্মৃতিচারণে ডুবে গেলেন।
টোপর এস.এস.সি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে পাঁচটা লেটার নিয়ে ষ্টার মার্ক পেয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হল। অল্প দিনের মধ্যে ভালো ছাত্র হিসাবে তার সুনাম সারা কলেজে ছড়িয়ে পড়ল। কলেজ ইলেকশনের সময় এক পার্টির নেতা সাগর তাকে কৌশলে পার্টির মধ্যে টেনে নিল। টোপর প্রথমে খুব আপত্তি করে বলেছিল, পার্টি করলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে। সাগর তাকে কথা দিয়েছিল, পার্টির কাজ করতে গিয়ে তোমার যাতে পড়াশোনার ক্ষতি না হয়, সে দায়িত্ব আমি নিলাম। এরপর টোপর আর আপত্তি করতে পারেনি। অবশ্য সাগর তার কথা রেখেছে। তাই তার সঙ্গে টোপরের বন্ধুত্ব হয়ে যায়।
টোপর এইচ.এস.সি.তেও পাঁচটি লেটার সহ স্টার মার্ক পেয়ে ঢাকা ভার্সিটিতে বি.এস.সি. অনার্সে এ্যাডমিশন নিল। সাগরও পাশ করে ঢাকা ভার্সিটিতে বাংলায় অর্নাস নিয়ে এ্যাডমিশন নিল। ভার্সিটিতেও সাগর টাকার জোরে পার্টির নেতা হল। টোপর পার্টিকে এড়িয়ে চলতে চাইলেও সাগর তাকে ছাড়ল না।
সাগর খুব বড় লোকের একমাত্র ছেলে। তাদের দুটো গাড়ি। একটা তার, অন্যটা তার বাবার। পার্টির পিছনে প্রচুর টাকা খরচ করে। কলেজের বড় লোকের মেয়েদের অনেকে এবং উঁচু সোসাইটির আত্মীয় অনাত্মীয় অনেক মেয়ে তার গার্লফ্রেন্ড। তাদের পিছনে ও বন্ধুদের পিছনে পানির মতো টাকা খরচ করে। টোপরের সঙ্গে সাগরের একটু বেশি অন্তরঙ্গতা। তাই সাগর তাকে বাসায় নিয়ে গিয়ে মা বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে টোপর সময় অসময়ে তাদের বাসায় যায়। টোপরের সঙ্গে টিকলীর সম্পর্ক এবং তাদের দুই ফ্যামিলীর মনোমালিন্যের কথাও সাগর জানে। আর টোপর ও সাগরের অনেক কিছু জানে। তার যে দুতিন জন বান্ধবীদের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক আছে তাও জানে।
একদিন কথায় কথায় সাগর টোপরকে জিজ্ঞেস করল, তোর প্রেমিকার সঙ্গে তোর দৈহিক সম্পর্ক আছে?
টোপর বলল, না।
সে কিরে, যাকে এত বছর ধরে ভালবাসিস, তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক হয় নি, কথাটা কি সত্যি বললি?
হ্যাঁ সাগর সত্যি। আমাদের দুজনের দৈহিক সম্পর্ক করার কথা কখনো মনে হয় নি।
আরে তুই নপুংসক না কি? মেয়েরা এ ব্যাপারে অগ্রভূমিকা নেয় না। পুরুষদের নিতে হয়। টিকলীকে তুই কখনো জড়িয়ে ধরে চুমোও খাসনি?
না।
কেন, খেতে ইচ্ছা করে না?
করে, তবে টিকলী আমাকে খারাপ ভাবতে পারে মনে করে সংযত থাকি।
আরে বোকা, সে তোকে খারাপ ভাববে কেন? বরং খুশিই হবে। তুই কি জানিস, একটা যুবক তার প্রেমিকার কাছে যা চায়, একজন যুবতীও তার প্রেমিকের কাছে তাই চায়? আমার কথা সত্য না মিথ্যা যাচাই করে দেখ। একদিন তাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খা, দেখবি সেও প্রতিদানে মেতে উঠবে।
টিকলী খুব ধার্মীক, হিতে বিপরীত হতে পারে।
আরে রাখ তোর ধার্মীক। এই বয়সে কে কতটা ধার্মীক তা আমার জানা আছে। যা বললাম, তা যদি করতে পারিস, তা হলে দেখবি অল্পদিনের মধ্যে তোদের দৈহিক সম্পর্কও গড়ে উঠবে। আর তা যদি না পারিস, তা হলে বুঝবো সত্যি সত্যি নপুংসক।
টোপর উঠতি বয়সের যুবক। তার উপর ধর্মের জ্ঞান নেই। সিনেমা ও ভি.সি.আর দেখে নায়ক নায়িকাদের মতো তারও টিকলীকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সাহসে কুলায় না। আজ সাগরের মুখে নাপুসংক কথাটা শুনে পৌরুষে আঘাত লাগল, নিজেকে অপমানিত বোধ করল। ভাবল, কাল ওকে কোনো পার্কে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে চুমো খাবে।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সাগর বলল, কিরে, কিছু বলছিস না কেন? তা হলে সত্যিই কি তুই নপুংসক।
টোপর রেগে উঠে বলল, দেখ, বারবার নপুংসক বলবি না।
সাগর হেসে উঠে বলল, তা যদি না হস, তা হলে কাজ করে দেখা।
নিশ্চয় দেখাব, বলে টোপর রাগে ফুলতে ফুলতে সেখান থেকে চলে যেতে লাগল।
সাগর হাসতে হাসতেই বলল, এই টোপর দাঁড়া যাসনি, আরো কথা আছে।
টোপর কিন্তু দাঁড়াল না।
যেখানে প্রতিদিন টিকলীর সঙ্গে দেখা করে, কলেজ ছুটির পরে টোপর আজ সেখানে যাচ্ছিল। পথে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল, এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছিস কেন?
টিকলী বলল, আজ মা কলেজে আসতে নিষেধ করেছিল। রাজশাহী থেকে খালা, খালু ও খালাত ভাই কাল এসেছেন। খালাত ভাই আমেরিকায় থাকেন। আজ চলে যাবেন। তাকে সি-অফ করতে এয়ারপোর্টে যেতে বলেছিল। আজ আমাদের কলেজে বিজ্ঞানের উপর সেমিনার ছিল। সে কথা জানিয়ে বললাম, আমাকে কলেজে যেতেই হবে। মা বলল, তা হলে তাড়াতাড়ি ফিরিস। তাই তোকে কথাটা জানাব বলে এখানে অপেক্ষা করছিলাম।
তুই এখন বাসায় গিয়ে এয়ারপোর্টে যাবি?
এগারটায় প্লেন ফ্লাই করার কথা, এতক্ষণে সবাই বাসায় চলে এসেছে।
তা হলে এখন বাসায় গিয়ে কাজ নেই, চল আজ কোনো পার্কে বেড়াতে যাই।
আমি যে মাকে কথা দিয়ে এসেছি তাড়াতাড়ি ফিরব।
তাতে কি হয়েছে, বলবি সেমিনার শেষ হতে দেরি হয়েছে।
আমি কখনো মিথ্যা বলি না।
আজ আমার জন্য না হয় বলবি।
টিকলী জানে টোপরের কথা না রাখলে রেগে গিয়ে পনের দিক দেখা করবে না। এরকম ছোট বেলা থেকে অনেক বার ঘটেছে। একটু চিন্তা করে বলল, ঠিক আছে চল।
টোপর বলল, খিদে পেয়েছে, আগে কোনো হোটেলে খেয়ে তারপর পার্কে যাব।
হোটেলে খেয়ে ওরা রমনা পার্কে এসে ঝোঁপের আড়ালে একটা পাকা বেঞ্চে বসল।
বসার পর টোপর অনেক্ষণ টিকলীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
টিকলী বোরখা ব্যবহার করে। রাস্তায় চলা ফেরা করার সময় চোখ দুটো ছাড়া নেকাব দিয়ে মুখ পেঁচিয়ে ঢেকে রাখে। তবে টোপরের সঙ্গে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ সম্পূর্ণ মুখ খোলা রাখে। তাকে অনেকক্ষণ মুখের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে বলল, চুপচাপ কি দেখছিস?
তোকে।
এত দেখছিস তবু সাধ মেটেনি?
না, তোকে যত দেখি তত দেখতে ইচ্ছা করে।
টিকলী লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে বলল, আমারও।
তা হলে বোঝা যাচ্ছে আমরা দুজন দুজনকে ভীষণ ভালবাসি, তাই না?
শুধু ভালবাসি বললে ভুল হবে, আমরা দুজন দুজনের জন্য উৎসর্গকৃত।
তুই ঠিক কথা বলেছিস। সেই ভালবাসার দাবিতে আজ তোর কাছে কিছু চাইব, দিবি তো?
অফকোর্স। তোকে অদেয় আমার কিছু নেই। তবে এমন কিছু চাইবি না, যা ইসলামের পরিপন্থি।
ইসলামের পরিপন্থি হবে কিনা জানি না, তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে কোনো লোকজন নেই দেখে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে গেল।
টিকলী কল্পনাও করেনি, টোপর এই কাজ করবে। তাড়াতাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বেশ রাগের সঙ্গে বলল, এ-তুই কি করলি? এত বড় গোনাহর কাজ করতে পারলি! পবিত্র ভালবাসার মধ্যে পাপ ঢুকিয়ে দিলি। তুই জানিস না, বিয়ের আগে এসব করা জঘন্যতর অন্যায়? তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
তার কান্না দেখে ও কথা শুনে টোপর খুব অবাক হয়ে বলল, এটা আর এমন কি অন্যায়, আমি বুঝতে পারছি না। এত কাঁদছিস বা কেন? বিয়ে না হলেও তুই তো এক্ষুণী বললি, আমরা দুজন দুজনের জন্য উৎসর্গকৃত।
টিকলী কান্না থামিয়ে চোখ মুখ মুছতে মুছতে বলল, তুই তো ধর্মীয় বই পুস্তক একদম পড়িসনি, পড়লে জানতে পারতিস, এটা কত বড় অন্যায়।
টোপর বলল, আমার বন্ধু সাগর তার গার্লফ্রেন্ডদেরকে এভাবে কত আদর করে। কই তারা তো তোর মতো কান্নাকাটি করে না। বরং তারাও সাগরকে আদরের প্রতিদান দেয়।
টিকলী বুঝতে পারল, বন্ধুর পাল্লায় পড়ে টোপর আজ এই রকম করেছে। বলল, তোর বন্ধু ও তার গার্লফ্রেন্ডরা ধর্মের কিছু যেমন জানে না, তেমনি মানে না। তারা যে সমাজের, সে সমাজে ধর্ম নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। প্রথম বার বলে মাফ করে দিলাম। ভবিষ্যতে বিয়ের আগে এরকম আর কখনো করবি না। আর শোন, ঐ বন্ধুর সঙ্গে একদম মেলামেশা করবি না। কথা দে, যা যা বললাম, করবি?
কিন্তু তোকে আদর করতে আমার যে খুব ইচ্ছা করে। তোর করে না?
হ্যাঁ করে। তাই বলে যা গোনাহ, তা করা কারো উচিত নয়। তোকে কতবার বলেছি, অবসর সময়ে কিছু কিছু ধর্মীয় বই পড়বি, তুই আমার কথা শুনলে এরকম করতে পারতিস না।
টোপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বিয়ের আগে যদি ধর্মে এসব নিষেধ থাকে, তবে কালই কাজী অফিস গিয়ে বিয়ে করে ফেলি চল।
টিকলী কান্না মুখে হেসে ফেলে বলল, বিয়ে কি দোকানের সদাই, মনে কইল আর কিনে ফেললাম।
দেখ টিকলী কথা ঘোরাবিনা। যা বললাম রাজি আছিস কিনা বল!
টিকলী থমথমে গলায় বলল, রাজি হব কিনা তুই জানিস না? জিজ্ঞেস করছিস কেন?
তা হলে শোন, কাল বেলা এগারটার সময় শান্তিনগরের মোড়ে থাকবি। আমি এসে কাজি অফিসে নিয়ে যাব।
এর পরিণতির কথা ভেবেছিস?
পরিণতির কথা ভেবে আমি কোনো কাজ করিনি।
শিক্ষিত ছেলে হয়ে এরকম কথা বলতে পারলি?
দেখ, আমাকে, রাগাবি না বলছি। যা বললাম, তা করবি কিনা বল।
টিকলী টোপরকে রেগে যেতে দেখে হা না কিছু বলতে না পেরে চুপ করে রইল।
কিরে কিছু বলছিস না যে? তা হলে কি ভাববো, তুই আমাকে শুধু মুখেই ভালবাসিস।
টিকলী চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, এ কথা বলতে পারলি?
তা না হলে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিস না কেন?
অরাজির কথা কখন বললাম, আমি তো পরিণতির কথা চিন্তা করতে বলেছি।
পরিণতির যা হয় হবে, কালই কাজি অফিসে আমাদের বিয়ে হবে। আমার বন্ধুরা প্রেমিকাদের কত আদর করে। আমি এমনই হতভাগা, তোকে একটু আদরও করতে পারি না। বিয়ের পর তো আর কোনো বাধা থাকবে না। তখন তোকে ইচ্ছামত আদর করব। তুইও আমাকে আদর করবি। বল, কাল এগারটার সময় আসবি?
টিকলী বুঝতে পারল, বন্ধুদের সাথে মিশে টোপর নষ্ট হওয়ার পথে এগোচ্ছে। বিয়ে করলে শুধু আদর নয় আরো কিছু করতে চাইবে। বলল, তুই তা হলে শুধু আদর করার জন্য বিয়ে করতে চাচ্ছিস, ভালবেসে নয়?
ভালবাসি কিনা জানিস না?
জানি; কিন্তু সে ভালবাসা তো আদর করার জন্য বিয়ে করে না।
কি করে তা হলে?
ভালবাসা হল পবিত্র জিনিস, তা পাওয়ার জন্য ধৈর্য্য ধরতে হয়, উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এখনো আমাদের সেই সময় আসেনি। তুই পড়াশোনা শেষ করে উপার্জন কর। আমিও ততদিন পড়াশোনা শেষ করি। তারপর বিয়ে। বিয়ের পর দুজন ভালবাসার সাগরে হাবুডুবু খাব।
টোপর রেগে উঠে বলল, তুই কিন্তু ভালবাসার দর্শন আওড়াচ্ছিস। দর্শন আমি বুঝি না। বুঝতে চাইও না। তুই কাল কাজি অফিসে বিয়ে করতে রাজি আছিস কিনা স্পষ্ট করে বল।
টিকলী মিনতি স্বরে বলল, তুই রেগে যাচ্ছিস কেন? যে কোনো কাজ করার আগে ভেবে চিন্তে করতে হয়। আমাদের এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। ভালোমন্দ বিবেচনা করার জ্ঞানও তেমন হয় নি। তুই বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা ছেড়ে দে। পার্টিও ছেড়ে দে। ধর্মীয় বইপত্র পড়। দেখবি, যা করতে চাচ্ছিস, তা ঠিক নয়।
টোপর আরো রেগে গিয়ে বলল, তোর ধর্মের বুলি শোনার মত মন মানসিকতা আমার নেই। আমার কথার উত্তর দে।
তুই বার বার একই কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন? এখন আমাদের পড়াশোনা করার সময়। বিয়ে করলে তা হবে না। শুধু আমি কেন, এই পরিস্থিতিতে কোনো মেয়েই বিয়ে করতে চাইবে না। তোকে আমি নিজের থেকে বেশি ভালবাসি। তোর সর্বনাশ আমি করতে পারি না। তুই আমার কথাগুলো ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখ।
থাক, তোকে আর উপদেশ দিতে হবে না, আজ থেকে তোর সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ। কথা শেষ করে টোপর হন হন করে পার্কের গেটের দিকে হাঁটতে লাগল।
টিকলী তার পিছনে আসতে আসতে বলল, টোপর রাগ করে চলে যাসনি। আমার ভালবাসার কসম লাগে, দাঁড়া বলছি।
টোপর দাঁড়াল না। রাগে ফুলতে ফুলতে গেটের বাইরে এসে একটা রিকশায় উঠে চলে গেল।
টিকলী দ্রুত হেঁটে এসেও তাকে ধরতে পারল না। কিছুক্ষণ তার রিকশার দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলল। তারপর সেও একটা রিকশায় উঠে বাসার ঠিকানা বলল।
এরপর প্রায় পনের দিন টোপর টিকলীর সঙ্গে দেখা করল না। একদিন নিউমার্কেট থেকে একটা বই কিনে গেটের কাছে এসেছে এমন সময় টিকলীকে হকারের কাছে চুলের ক্লীপ কিনতে দেখে পাশ কেটে চলে যাচ্ছিল।
টিকলী দেখতে পেয়ে ক্লীপ না কিনে তাড়াতাড়ি তার পিছনে আসতে আসতে বলল, টোপর, এই টোপর, দাঁড়া বলছি।
টোপর গেটের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
টিকলী কাছে এসে ভিজে গলায় বলল, আজ পনের দিন আমার সঙ্গে দেখা করিসনি। এখন আবার দেখেও চলে যাচ্ছিস।
কেন যাচ্ছি জেনেও জিজ্ঞেস করছিস কেন? কথা শেষ করে টোপর গাড়ির দিকে এগোল।
টিকলীও তার সঙ্গে গাড়ির কাছে এসে বলল, তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
টোপর গাড়িতে উঠবে বলে গেট খুলেছিল, বন্ধ করে বলল, বল কি বলবি।
তুই তা হলে এখনো আমার উপর খুব রেগে আছিস?
আর কিছু বলবি?
টিকলী ছল ছল চোখে ভিজে গলায় বলল, আমার কথাগুলো চিন্তা করলে এতদিনে তোর রাগ পড়ে যেত। বিশ্বাস কর, তোর ভালোর জন্য আমি বিয়েতে রাজি হইনি। আমার জন্য তোর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাক, তা আমি চাই না। তুই আমাকে ভুল বুঝিস না। কোনো জিনিসই গোপন থাকে না। একদিন না একদিন তোর আর আমার মা-বাবা জানতে পারবেই। তখন কি হবে ভেবে দেখ। তা ছাড়া আমি মেয়ে আর তুই পুরুষ। পুরুষরা যা পারে মেয়েরা কি তা পারে?
কেন পারবে না? আজ কাল তো নারী পুরুষের সমান অধিকার। নারীরা আগের যুগের মতো ঘরে থাকে না। এখন তাদের বিচরণ সর্বত্র।
কিছু কিছু বিষয়ে সমান অধিকার পেলেও সব বিষয়ে এখনো পাইনি। যেমন ছেলেরা একাকি দূরে কোথাও যেতে পারলেও মেয়েরা পারে না। ছেলেরা লুঙ্গি, ফুল প্যান্ট বা হাফ প্যান্টের উপর স্যান্ডো গেঞ্জী পরে অথবা খালি গায়ে চলাফেরা করতে পারে; কিন্তু মেয়েরা তা পারে না।
কে বলেছে পারে না। বিদেশের সি-সোরে মেয়েরা দ্বিগম্বরী হয়ে সূর্য স্নান করছে। অলিম্পিক গেমসে মেয়েরা কি পোষাক পরে দেখিস নি? আসলে তুই আমাকে মনে প্রাণে ভালবাসিস না।
এরকম কথা বলতে পারলি? জানিস তোর জন্য আমি জান দিতে পারি?
টোপর বিদ্রূপ কণ্ঠে বলল, যে একটু আদর করতে দেয় না, যে বিয়েও করতে চায়, সে নাকি জান দেবে।
টিকলী বিদ্রূপটা গায়ে মাখল না। বলল, এ দুটো জিনিস ছাড়া তুই যা প্রমাণ চাইবি তাই দেব। দুবছর আগের কথা মনে করে দেখ, যখন আমাদের মা-বাবা আমাদেরকে মেলামেশা করতে নিষেধ করেছিল তখন আমরা কি বলেছিলাম। এখন যদি গোপনে বিয়ে করি, তা হলে একদিকে যেমন আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবে, তেমনি দুই ফ্যামিলীর মধ্যে রক্তারক্তি হবে, মামলা হবে। তুই তো এরকম ছিলি না টোপর। বন্ধুরাই তোকে এরকম করেছে। ওদের সাথে মেলামেশা ছেড়ে দে টোপর, ছেড়ে দে। কথা শেষ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
টোপর বলল, থাক তোকে আর প্রমাণ দিতে হবে না, আর লেকচারও দিতে হবে না। তুই আর কোনো দিন আমার সামনে আসবি না। আমিও তোর কাছে আসব না, তারপর গাড়িতে উঠে ষ্টার্ট দিল।
টিকলী চোখের পানি ফেলতে ফেলতে তার গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। অদৃশ্য হয়ে যেতে চোখ মুখ মুছে নিজের গাড়ির দিকে এগোল।
<