শুঁটকি বাহিনী – তিন গোয়েন্দা – ভলিউম ৬০

০১.

গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সাইকেল চালাচ্ছে মুসা। হঠাৎ এমন বিকট এক চিৎকার দিয়ে উঠল, আশেপাশে কেউ থাকলে রীতিমত আঁতকে যেত।

তার মনে হলো, ঘাড়ের ওপর একটা মাকড়সা পড়েছে। রোমশ পায়ের খোঁচা লাগছে।

ঝট করে হাত উঠে গেল ঘাড়ের কাছে। কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছিল সাইকেলটা। ব্রেক কষে পা নামিয়ে দিয়ে দাঁড় করাল।

হাত দিয়ে বুঝল, মাকড়সা নয়, একটা মরা পাতা। প্রচণ্ড রাগ হলো। দলামোচড়া করে ছুঁড়ে ফেলে দিল পাতাটাকে।

রাগ হলো নিজের ওপরও। ডাক্তারের কথার প্রতিধ্বনি করল সে মনে মনে, দেখো, মুসা, এই অকারণে ভয় পাওয়াটা ছাড়তে হবে তোমাকে। নইলে কোনদিনই আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে না। ভয়কে প্রশ্রয় দিলেই ভয় বাড়ে। যত দিন যাবে, এই ভয় পাওয়ার রোগটা বাড়তেই থাকবে তোমার। মনে রেখো, বার বার মানুষের একই দুর্ঘটনা ঘটে না।

কিন্তু যদি ঘটে!

নিজেকে আবার ধমক লাগাল মুসা। গ্রীনহিলসে থাকতে স্কুলে তোতলা মুসা খেতাব হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় খেতাবটা ছিল ভূত-কাতুরে। দুটোরই কারণ-ভয়।

এখানেও যদি সেটা চালু করতে না চাও তো সাবধান হয়ে যাও আজকে থেকেই, নিজেকে বোঝাল সে। নিজেই নিজের ভীতুপনার কথা ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দিও না। জানতে দিও না তুমি পোকা-মাকড় দেখলে ভিরমি খাও, ভূত দেখলে বেহুঁশ; ভয় পেলে তোতলানি ছাড়া কথা বেরোতে চায় না!

গ্রীনহিলস থেকে চলে এসেছে মুসারী। তার বাবা এখন থেকে রকি বীচেই কাজ করবেন ঠিক করেছেন। রবিনরা এসেছে আরও আগেই।

রকি বীচ মিডল স্কুলে পড়ে রবিন আর কিশোর। মুসাও সেখানেই ভর্তি হয়েছে। আজ তার নতুন স্কুলে প্রথম দিন।

গাছপালার ভেতর দিয়ে চলে গেছে পথ। সকালের ঠাণ্ডা বাতাস লাগছে গালে। সূর্যটা এখনও একটা লাল বলের মত বাড়িঘরের ছাতের ওপর ভাসছে। গাছের পাতায় উজ্জ্বল লাল আর হলুদের মিশ্রণ। এ বছর শীতটা বোধহয় তাড়াতাড়িই পড়তে যাচ্ছে।

একটা বড় গাড়ি চলে গেল পাশ দিয়ে। তাতে বোঝাই ছেলেমেয়ে আর কুকুর। ছেলেমেয়েগুলোও চেঁচামেচি করছে, কুকুরগুলোও। পাল্লা দিয়ে। মুসাকে দেখে জানালার কাঁচে থাবা তুলে দিয়ে ঘেউ ঘেউ শুরু করল একটা কুকুর। একটা মেয়ে জানালা দিয়ে হাত বের করে নাড়ল তাকে উদ্দেশ্য করে।

চেনে না, অতএব হাত নাড়ার জবাব দিল না মুসা। গীয়ার বদল করল। রাস্তা এখানে বেশ ঢালু।

কিছুদূর এগিয়ে দেখল রাস্তার দুই পাশ ধরে হাঁটছে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে। পরনে পরিষ্কার জামা-কাপড়। পিঠে ব্যাকপ্যাক। কলরব করতে করতে স্কুলে চলেছে ওরা। বেশির ভাগই তার বয়েসী।

ওদের দিকে নজর থাকায় রাস্তার পাথরটা চোখে পড়েনি তার। সামনের চাকার নিচে পড়ল। লাফিয়ে উঠল চাকা। অনেক চেষ্টা করেও কোনমতেই সামলাতে পারল না। পড়ে গেল।

পাকা রাস্তায় পড়েছে। প্রচণ্ড ব্যথা পেল। ঝটকা দিয়ে দুই হাত উঠে গেল ওপর দিকে। সাইকেলটা পড়ল তার গায়ের ওপর। হ্যাঁন্ডেলের একটা পাশ খোঁচা মারতে লাগল পাঁজরে।

ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল সে। সাইকেলটা ঠেলে সরাতে গেল গায়ের ওপর থেকে।

এই সময় গাড়িটাকে আসতে দেখল।

 একটা বাচ্চার তীক্ষ্ণ চিৎকার কানে এল। গাড়িতে রয়েছে বাচ্চাটা।

মাথা উঁচু করল মুসা।

পেছনের সীটে বসা বাচ্চাটাকে দেখতে পেল। ড্রাইভিং সীটে কেউ নেই।

ঢাল বেয়ে সোজা তার দিকে ছুটে আসছে গাড়িটা। ক্ষণিকের জন্যে হতবুদ্ধি হয়ে গেল মুসা। আতঙ্কিত।

বাচ্চাটার চিৎকার বাস্তবে ফিরিয়ে আনল তাকে। চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। সাইকেলের হ্যাঁন্ডেলটা কাত হয়ে পড়ল রাস্তার ওপর। পা দিয়ে ঠেলে যতটা পারল সরিয়ে দিল রাস্তা থেকে। গাড়ির চাকার নিচে পড়লে আর চালানোর যোগ্য থাকবে না।

দ্রুত নেমে আসছে গাড়িটা।

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চোখ মিটমিট করতে লাগল মুসা। সত্যি কি ড্রাইভার নেই?

ভাল করে দেখল। না, সত্যি নেই।

মাত্র কয়েক ফুট দূরে আছে আর গাড়ি।

 চিৎকার করে কাঁদছে বাচ্চাটা।

আরেকটা চিৎকার কানে এল মুসার। ওপর দিকে রাস্তার মাথার দিকে তাকাল সে। আমার খোকা! আমার খোকা! বলে চিৎকার করতে করতে পাগলের মত ছুটে আসছে এক মহিলা। হাত ছুঁড়ছে ওপর দিকে। সোনালি চুল ঝাঁকি খাচ্ছে ঘাড়ে। লাল জ্যাকেটের কোনা বাতাসে উড়ছে।

বড় করে দম নিল মুসা। সরে গেল একপাশে।

আসছে গাড়িটা! আসছে!

 ভাবছে না সে। ভেবেচিন্তে কাজ করার সময় নেই এখন।

 নিজেকে তৈরি করে নিল সে। শক্ত হয়ে গেল প্রতিটি মাংসপেশি।

গাড়িটা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাত বাড়িয়ে ধরতে গেল ড্রাইভারের পাশের দরজার হাতল।

মিস করল।

দরজায় বাড়ি লাগল হাতটা। প্রচণ্ড ব্যথা পেল। কিন্তু টু শব্দ করল না। ঝাঁপ দিল গাড়িটাকে লক্ষ্য করে। বডিতে বাড়ি খেয়ে পড়ে গেল রাস্তার ওপর। হাঁটুতেও ব্যথা পেল। তা-ও শব্দ করল না।

চেঁচামেচি কানে আসছে রাস্তার দুই পাশ থেকে। মুখ ফিরিয়ে মহিলাকে দেখতে পেল। বাচ্চার নাম ধরে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসছে।

গাড়ির দিকে তাকাল মুসা। দ্রুত গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে। নিচের দিকে রাস্তার শেষ মাথায় আরেকটা রাস্তা আড়াআড়ি ক্রস করেছে প্রথমটাকে। লাল ট্র্যাফিক লাইট জ্বলছে। রাস্তা পেরোচ্ছে ছেলেমেয়েরা। বেশ ভিড় ওখানটায়।

জলদি ওঠো, মুসা!-নিজেকে তাগাদা দিল সে। বাচ্চাটাকে বাঁচাও!

লাফিয়ে উঠে দৌড় দিল মুসা। ঢাল বেয়ে ছোটা কঠিন। রাস্তায় পড়ে আছে আলগা পাথর। পা পড়লেই সড়াৎ। কোন কিছুই দমাতে পারল না। তাকে। মাথা ঘুরছে। বাচ্চাটার তীক্ষ্ণ চিৎকার বাজছে কানের পর্দায়। পৌঁছে গেল গাড়ির কাছে।

পেছনে থেকে কিছুই করতে পারবে না। পাশে যেতে হবে।

দুই হাত সামনে বাড়িয়ে প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল।

হাতলটা ধরতে চায়।

নাহ! আর বোধহয় পারা গেল না! পারল না ধরতে!

চোখ পড়ল রাস্তা পেরোতে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর ওপর।

সরো! সরো তোমরা! ওদের উদ্দেশে চিৎকার করে উঠল সে।

গাড়ির পেছনের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে খুদে খুদে গোলাপী রঙের আঙুলগুলো দিয়ে কাঁচ আঁকড়ে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করছে বাচ্চাটা।

নিজের অজান্তেই গতি বেড়ে গেল মুসার।

 জোরে…আরও জোরে…

থাবা দিয়ে ধরতে গেল আবার হাতলটা। আবার মিস করল!

.

০২.

তৃতীয়বারের চেষ্টায় ধরে ফেলল হাতলটা। শক্ত হয়ে চেপে বসল আঙুলগুলো। ছাড়ল না কোনমতেই। গাড়ির পাশে পাশে দৌড়াচ্ছে। একই সঙ্গে টেনে খোলার চেষ্টা করছে দরজাটা।

খুলে গেল দরজা।

মাথা নিচু করে ডাইভ দিল সে। গীয়ে পড়ল সীটের ওপর।

হাত ছুঁড়ছে আর চিৎকার করছে বাচ্চাটা। জড়সড় হয়ে আছে পেছনের সীটে।

সেদিকে তাকানোর সময় নেই। গাড়ির মধ্যে নিজেকে ঠেলেঠুলে সোজা করল মুসা। পা নেমে গেল নিচের দিকে। ব্রেক প্যাডালটা ছুঁতে চাইছে।

পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চেপে ধরল ওটা।

 দুলে উঠল গাড়ি। হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ভয়াবহ ঝাঁকুনি।

ড্যাশবোর্ডে ঠুকে গেল মুসার কপাল। তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে গেল সমস্ত শরীরে। যন্ত্রণায় আপনাআপনি চিৎকার বেরিয়ে এল মুখ থেকে। বুজে গেল চোখের পাতা।

গাড়ির প্রচণ্ড ঝাঁকুনি থামিয়ে দিয়েছে বাচ্চাটার চিৎকারও। সীটবেল্ট না থাকলে উড়ে এসে পড়ত সামনের দিকে। যত চিৎকার-চেঁচামেচি এখন গাড়ির বাইরে। কারও মুখ বন্ধ নেই।

আনন্দ আর স্বস্তি জুড়িয়ে দিল যেন মুসার শরীর। পেরেছে সে! সময়মত থামাতে পেরেছে গাড়িটা!

সারা গায়ে ব্যথা। কপাল দপদপ করছে। মাথা ঘুরছে বনবন করে। তুলে রাখতে পারছে না। চোখের সামনে সব যেন উজ্জ্বল লাল। লাল বদলে। সাদা হলো। সাদা আলোটা হাতুড়ির মত বাড়ি মারছে যেন মাথার মধ্যে।

বেহুশ হয়ে যাচ্ছে, বুঝতে পারল।

মায়ের চিৎকার চমকে দিল তাকে। চোখের সামনে থেকে সাদা পর্দার মত সরে গেল বিচিত্র আলোটা। কানের পেছনে চিৎকার করে উঠেছেন মা, আমার খোকা! আমার খোকা!

টের পাচ্ছে মুসা, ঝটকা দিয়ে খুলে গেল পেছনের দরজা। গাড়িতে মাথা ঢুকিয়ে দিয়েছেন মহিলা। বাচ্চার সীট-বেল্ট খুলে নিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলেন।  আপ্রাণ চেষ্টা করছে মুসা, যাতে বেহুঁশ না হয়। শরীর কাঁপছে থরথর করে।

অবশেষে মাথা সোজা করল সে। হ্যান্ডব্রেক তুলে দিয়ে বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে। টলে উঠল। মাথা ঘুরছে এখনও। কপালে হাত বোলাল।

গাড়িটাকে ঘিরে ধরেছে ছেলেমেয়েরা। একযোগে কলরব করছে সবাই। সবার চোখ মুসার দিকে।

বাচ্চাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে ছুটে এলেন মা।

এত সাহসী ছেলে জীবনে দেখিনি আমি! বাচ্চার গা থেকে একটা হাত সরিয়ে এনে সে-হাতে জড়িয়ে ধরলেন মুসাকে। তোমার মত সাহস দুনিয়ায় আর কারও নেই! ঘোষণা করে দিলেন তিনি। কি নাম তোমার, বাবা?

মুসা আমান! কোনমতে বলল মুসা। উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় কান গরম হয়ে যাচ্ছে তার।

এগিয়ে এল স্কুলের ছেলেমেয়েরা। কেউ প্রশংসা করতে লাগল, কেউ বা চাপড়ে দিল পিঠ।

দুই গাল বেয়ে পানির ধারা নেমেছে মায়ের। গাড়ি থেকে নেমে একটা চিঠি পোস্ট করতে গিয়েছিলাম, জানালেন তিনি। হ্যান্ডব্রেকটা তুলে দিতে ভুলে গিয়েছিলাম হয়তো। কি মনে হতে ফিরে তাকিয়ে দেখি গাড়িটা নেমে যাচ্ছে…শুধু আমার ছেলেটাকেই না, কতজনকে যে তুমি আজ বাঁচিয়ে দিলে, মুসা!

তাই কি! বিড়বিড় করল মুসা। প্রচণ্ড শকটা হজম করতে সময় নিচ্ছে। মাথা ঘোরা সারেনি এখনও। পায়ের নিচে যেন মাটি নেই। শূন্যে ভাসছে সে।

মুসাকে ছেড়ে দিয়ে বাচ্চাকে বুকের এক পাশ থেকে আরেক পাশে সরালেন মা। ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, মুসা করলটা কি দেখলে তোমরা? সাইকেল থেকে চলন্ত গাড়িতে ঝাঁপ-এমন দৃশ্য কেবল সিনেমাতেই দেখা যায়।

না না, ঠিক বলেননি আপনি!-বলতে চাইল মুসা, ঘটনাটা ঠিক এ ভাবে ঘটেনি। কিন্তু কথা বেরোল না মুখ দিয়ে। সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। প্রশংসা করছে। পিঠ আর কাঁধ চাপড়ানোর ধুম পড়ে গেছে। প্রতিবাদ করারও সুযোগ পেল না সে।

আরেকটু হলে নিজেই মরত! বলে চলেছেন মুহিলা। কিন্তু অন্যকে বাঁচানোর জন্যে প্রাণের পরোয়া করেনি। অত সাহস জীবনে দেখিনি আমি!

মহিলার কথা সমর্থন করে সম্মিলিত চিৎকার উঠল।

দুই হাত জিনসের পকেটে ঢুকিয়ে দিল মুসা। দেহের কাঁপুনি থামানোর চেষ্টা করছে।

নিজেকে ওর অত সাহসী লাগছে না। হিরো মনে হচ্ছে না। কারণ ঘটনাটা ঘটেছে অন্যভাবে। লাফ দিয়ে সাইকেল থেকে গাড়ির ওপর পড়েনি। বরং সাইকেল থেকে পড়ার পর গাড়িটাকে ছুটে আসতে দেখে নিজেকে বাঁচানোর জন্যে লাফিয়ে সরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পেছনের সীটে অসহায় বাচ্চাটাকে দেখে কি যেন কি হয়ে গিয়েছিল, ছুটতে শুরু করেছিল পেছন পেছন…ব্যস, ওই পর্যন্তই।

চিৎকার-চেঁচামেচি, স্বাগত জানানোর পালা চলছেই। কেউ থামতে চাইছে না।

মুখ বন্ধ রেখেছে মুসা। কপাল ব্যথা সত্ত্বেও মুখে হালকা একটা হাসি ফোঁটাতে বাধ্য হলো। সবাই এখন তাকে ছেড়ে সরে গেলে বাঁচে। স্বস্তিতে দম নিতে পারে।

কিন্তু আবার তাকে জড়িয়ে ধরলেন মহিলা। আরেকবার কতজ্ঞতা জানালেন। তারপর গাড়ির দিকে এগোলেন। বাচ্চাকে আবার পেছনের সীটে বসিয়ে সীট-বেল্ট আটকে দিতে লাগলেন।

কাঁধের ওপর আরেকটা হাত পড়ল। চাপ বাড়ল আঙুলগুলোর। কানের কাছে শুনতে পেল পরিচিত কণ্ঠস্বর, মুসা!

ফিরে তাকাল মুসা। হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে কিশোর পাশা।

হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মুসা।

টেনে তাকে ভিড়ের ভেতর থেকে সরিয়ে নিয়ে চলল কিশোর। এদিক ওদিক তাকিয়ে ডাক দিল, রবিন, এসো তো এদিকে! ওকে ধরো! কিভাবে টলছে দেখো,। পড়ে যাবে।

গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বসে ফিরে তাকালেন মহিলা। কিশোরর কথা কানে গেছে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ডাক্তারের কাছে নেয়া লাগবে?

না না, লাগবে না! তাড়াতাড়ি জবাব দিল মুসা। বসলেই ঠিক হয়ে যাবে।

রাস্তার পাশে মুসাকে নিয়ে এল কিশোর আর রবিন।

সামনে এসে দাঁড়াল দুটো ছেলে। একজন ঢ্যাঙা, গায়ে মাংস বলতে নেই। মুখে প্রচুর তিল। পরনে নীল শার্ট, ফেড জিনস, দুই হাঁটুর কাছে ইচ্ছে করে ছিঁড়ে রাখা-স্মার্টনেস-যা দুচোখে দেখতে পারে না মুসা; ভিখিরি মানসিকতা মনে হয়। খোঁচা খোঁচা চুল। এক কান ফুটো করে তাতে একটা রূপার রিঙ পরেছে।

সঙ্গের ছেলেটা খাটো, মোটা, লম্বা লম্বা চুল। নাকের ওপর মস্ত এক আঁচিল। চোখের পাতা সরু সরু করে মুসাকে জিজ্ঞেস করল, হিরোগিরি দেখানোর নেশা আছে মনে হয় তোমার?

টেরা কথা শুনে চোখ গরম করে তাকাল মুসা, কে তুমি?

খিকখিক করে হাসল সঙ্গের ঢ্যাঙা ছেলেটা। হাসিটা শুনলে রাগ লাগে। সঙ্গীকে ধমক দিয়ে বলল, আই, টাকি, থামো তো তুমি! মুসার দিকে তাকাল, ও একটু বেশি কথা বলে। ওর কথায় কিছু মনে কোরো না। হাত বাড়িয়ে দিল, আমি টেরিয়ার ডুয়েল।

হাতটা ধরল মুসা। পাশে তাকিয়ে দেখল কিশোর আর রবিন গম্ভীর।

টেরির দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাল কিশোর, কেন ওকে নিয়ে টানাটানি করছ, শুঁটকি দেখছ না ওর শরীর খারাপ লাগছে?

তুমি আবার এর মধ্যে কথা বলতে আসো কেন, টেটনা শার্লক? মুসাকে দেখিয়ে বলল, হিরোদের আমার পছন্দ। কারণ আমি নিজেও একজন হিরো তো। অবশ্যই ওকে আমার দলে নিয়ে নেব। মুসার দিকে তাকাল, আজই স্কুলে প্রথম যাচ্ছ, তাই না?

মাথা ঝাঁকাল মুসা।

হাসিমুখে টেরিকে বলল কিশোর, তোমার অবগতির জন্যে জানানো দরকার, শুঁটকি, মুসা আমান আমার অনেক পুরানো বন্ধু। গ্রীনহিলস থেকে এসেছে ও। বিশ্বাস না হলে রবিনকে জিজ্ঞেস করে দেখো।

রবিনের দিকে তাকাল টেরি।

 মাথা ঝাঁকাল রবিন, হ্যাঁ।

মুখের আলো দপ করে নিভে গেল টেরির। হাসি উধাও। আঙুল ঢিল হয়ে গেল টেরির। খসে পড়ে গেল মুসার হাতটা। বড়ই হতাশ। ভেবেছিল, মুসার মত একজনকে দলে টেনে নিতে পারলে তার দলের সুনাম বাড়বে, শক্তিশালী হবে দল। কিন্তু টেটনা শার্লকটা যে আগেই ওকে বগলদাবা করে বসে আছে, কে জানত!

মুহূর্তে কিশোর আর রবিনের মত মুসাও টেরির শত্রু হয়ে গেল। চোখের পাতা সরু সরু করে মুসার দিকে তাকাল সে। বলল, হিরো না ছাই! মহিলাটা একটা ইয়ে। এমন সাহস নাকি আর জীবনে দেখেনি! আহা!

মুসাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল কিশোর, কেন, চোখের সামনেই তো দেখলে কি কাণ্ডটা করল! এরপরেও অবিশ্বাস? তোমার দলের সমস্ত ছুঁচোগুলোর সাহস এক করলেও মুসার সমান হবে না, তা জানো?

তাই নাকি? খিকখিক করে হাসল টেরি। ভাল জমবে মনে হচ্ছে। এবার!

চ্যালেঞ্জ করছ?

করছি।

সাহস নেই, সাফ বলে দিল টাকি।

 অ্যাই, তুমি থামো, টাকিমাছ!

বাংলা শব্দটা বোঝে না টাকি। গর্জে উঠল, রোজই ট্যাকিমাছ ট্যাকিমাছ করো! পেয়েছ কি? কোন্‌দেশী গালি এটা? আজ তোমাকে বলতেই হবে! কি মানে এর?

গালি নয়, বাংলাদেশী একটা অতি লোভনীয় খাবারের নাম এটা, হেসে জানিয়ে দিল রবিন। টাকি হলো এক ধরনের মাছ, মরিচ-পেঁয়াজ দিয়ে ভর্তা করে খেতে নাকি খুব টেস্ট। ঠিক আছে, বাংলা পছন্দ না হলে ইংরেজিতেই ডাকা হবে তোমাকে। ট্যাকি-ফিশ! কি, এবার ভাল লাগছে নামটা!

বিকৃত হয়ে গেল টাকির মুখ। দেখিয়ে ছাড়ব একদিন কে কাকে ভর্তা বানিয়ে খায় …

আহা, তোমরা এমন ঝগড়া শুরু করলে কেন… কথা শেষ না করেই বিকট এক চিৎকার দিয়ে উঠল মুসা। থাবা মারল পায়ে। সুড়সুড়ির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখল, লম্বা একটা ঘাসের ডগা লেগেছিল পায়ে। লজ্জা পেয়ে হাসল। আমি মনে করেছিলাম শুয়াপোকা…।

ভুরু কুঁচকে গেছে টেরির। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল মুসার দিকে। ধীরে ধীরে পাতলা হাসি ফুটল ঠোঁটে। কিশোরের দিকে ফিরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, কই, ভয় নাকি পায় না?  

এটাকে কি ভয় বলে?

তাহলে কি বলে?

চমকে যাওয়া, গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল কিশোর। পায়ে সুড়সুড় করলে তুমিও থাপ্পড় মারবে।

মারব, কিন্তু চিৎকার করব না।

দেখাব পায়ে লাগিয়ে? রবিন, ওই ফুল গাছটাতে দেখলাম কালো কালো শুয়াপোকায় ভরে গেছে। কিলবিল করছে। এত বড় বড় লোম। যাও তো, কাঠিতে করে নিয়ে এসো তো একটা।

রবিন যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতেই হাত তুলল টেরি, থামো, থামো…দাঁড়াও! কিশোরের দিকে তাকাল। গাল চুলকাল এক আঙুলে। তারমানে তোমার দোস্ত ভয় পায় না বলতে চাও?

হ্যাঁ, চাই। মনে মনে মুসার মুণ্ডপাত করছে কিশোর। প্রথম পরিচয়েই দিয়েছে নিজের দুর্বলতা টেরির কাছে ফাঁস করে।

টাকি বলল, প্রমাণ দিতে পারবে?

উত্তেজনায় টেরির গালের তিলগুলো যেন ঝিকমিক করে উঠল লাল কালো তারার মত। মুহূর্তে শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল ওর কুটিল মগজে। ঠিক, ঠিক, প্রমাণ! বাজি হয়ে যাক একটা!

বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ভেবে আবার থামাতে গেল মুসা, না না, প্লীজ…

তুমি থামো! মুসাকে কথাই বলতে দিল না কিশোর। তুমি এখানকার হালচাল কিছু জানো না। যা বলার আমি বলছি। টেরির দিকে তাকাল, কত টাকা?

টাকির দিকে তাকাল টেরি। দুজনের মুখেই কুটিল হাসি।

ঘড়ি দেখল টেরি। কিশোরের দিকে মুখ তুলল, তোমার যত ইচ্ছে। ভয় পেলে বাজিতে হারবে কালটু-আমান। টাকাটা কার পকেট থেকে দেবে সেটা তোমাদের মাথাব্যথা।…এই টাকি, চলো। স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

.

০৩.

দূর, টিভিতে কিছু নেই, বিরক্ত হয়ে রিমোটটা সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেলল কিশোর। কম্পিউটার গেমগুলোও বিরক্তিকর! কি করা যায় বলো তো?

চুপ করে রইল মুসা আর রবিন। কি করলে ভাল লাগবে ওরাও বুঝতে পারছে না।

কিশোরদের লিভিং-রূমে বসে আড্ডা দিচ্ছে তিন গোয়েন্দা।

শনিবারের ধূসর এক বিকেল। ঘরের জানালায় একটানা আঘাত হেনে চলেছে বৃষ্টির ফোঁটা। পেছনের আঙিনায় পুরু হচ্ছে খসে পড়া পাতার আস্তর। প্রবল বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে গাছের ডালগুলো।

চিলেকোঠায় যাবে? জিজ্ঞেস করল কিশোর। জায়গাটা দারুণ। অন্ধকার। ছমছমে। যত দুনিয়ার বাক্স-পেটরা আর পুরানো জিনিসে বোঝাই। প্রচুর বইপত্র-ম্যাগাজিন। এক ধরনের উত্তেজনা আছে চিলেকোঠায়।

না রে, ভাই, আমি ওখানে যাব না, সাফ মানা করে দিল মুসা।

যে কোন অন্ধকার জায়গাকে তার ভয়। সেটা চিলেকোঠাই হোক আর পাতাল-ঘর। আলোকিত ঘরে থাকাটাই তার পছন্দ।

তাহলে আর কি করা! ভিডিওতে সিনেমা দেখি। উঠে ওপাশের দেয়াল ঘেঁষে রাখা আলমারিটার সামনে চলে গেল কিশোর।

প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল বাইরে। কেঁপে উঠল মুসা। ভয় ভয় লাগছে। তার। সাপকে ভয়, মাকড়সাকে ভয়, পোকা-মাকড়, ইঁদুর, অন্ধকার, ভূত, আরও অনেক কিছুকে ভয়। ইদানীং বজ্রপাতকেও ভয় পায়।

আলমারি থেকে কয়েকটা ভিডিও ক্যাসেট বের করে আনল কিশোর।

একটা ক্যাসেট হাতে নিয়ে ওপরে লাগানো ট্যাগটা পড়ল মুসা। সবগুলোই হরর ছবি নাকি?

মাথা ঝাঁকাল কিশোর, হ্যাঁ।

তাহলে আমি দেখব না।

 রবিনের দিকে তাকাল কিশোর, তুমি?

আমার আপত্তি নেই। কিন্তু মুসা যদি ভয় পায়….একজনকে সারাক্ষণ ভয়ের মধ্যে রেখে ছবি দেখে আমরাও মজা পাব না।

হতাশ হয়ে ক্যাসেটগুলো টেবিলের ওপর রেখে দিল কিশোর। মুসাকে নিয়ে এক বিরাট সমস্যা হয়েছে। এত ভয় পেলে কি করা! কোন রহস্যের সমাধান করতে গেলেও মনে হচ্ছে আর যোগ দিতে পারবে না মুসা। যা করতে দেয়া হবে তাকে, ভয়ে পিছিয়ে আসবে।

কি করবে ভাবছে, এই সময় চমকে দিল দরজার ঘণ্টা। বেজে উঠল টুং-টাং টুং-টাং করে।

চাচা-চাচী মার্কেট থেকে ফিরল নাকি? না, এত তাড়াতাড়ি তো ফেরার কথা নয়।

ফিরে তাকাল কিশোর।

আই, দরজা খোলো, মু-ম্মুসা! শোনা গেল একটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠ। আমরা জানি, তুমি এখানে বসেই আড্ডা দিচ্ছ।

শুঁটকি টেরির গলা। চিনতে পারল তিনজনেই।

চোখ বড় বড় হয়ে গেল মুসার। তাকে মু-ম্মুসা বলে ডেকেছে! শুঁটকি জানল কিভাবে?

কিশোরও অবাক। উঠে গেল দরজা খুলে দিতে।

ঘরে ঢুকল টেরি, টাকি এবং আরও তিনজন। হাত দিয়ে রেনকোট থেকে বৃষ্টির পানি ঝাড়তে লাগল টাকি। ভেজা জুতো নিয়েই উঠে আসতে গেল কর্পেটের ওপর। হাতটা বাড়িয়ে ঠেকিয়ে দিল কিশোর। বাড়ি বয়ে এসেছে, শত্রু হলেও অদ্ৰতা করল না। সৌজন্য দেখিয়ে ওদের ভেজা রেনকোট আর ম্যাকিনটশগুলো রেখে এল হ্যাঁঙারে। জুতোর তলা ভালমত মুছিয়ে নিল ডোরম্যাটে। কার্পেটে কাদা-পানি দেখলে কাউকেই আস্ত রাখতেন না মেরিচাচী। সবচেয়ে বেশি বকাটা খেতে কিশোর।

খোঁচা খোঁচা চুল থেকে আঙুল দিয়ে পানি ঝাড়ল টেরি। মুসার দিকে তাকিয়ে হাসল। মুসার মনে হলো, ইবলিসের হাসি।

মুসার হাতের পপকর্নের বাটি থেকে এক খাবলা পপকর্ন তুলে নিয়ে মুখে পুরল।

হাই, মু-ম্মুসা! ভুরু নাচাল লাল-চুল একটা ছেলে, ওর নাম কডি। তার সঙ্গী বাকি দুজন নিটু আর হ্যারল্ড ফ্যাকফ্যাক করে হাসল।

সব একই ক্লাসে পড়ে, মুসাদের ক্লাসে। হাসি, কথাবার্তা, আচরণে টেরির ফটোকপি একেকটা। সেজন্যেই দোস্ত হতে পেরেছে। টেরি ওদের নেতা হবার যথেষ্ট কারণ আছে। টেরির বাবার অনেক টাকা। টেরি হাত খরচ পায় প্রচুর। সেগুলো দুই হাতে খরচ করে বন্ধুদের পেছনে। নেতা হবার প্রধান কারণ সেটাই।

মু-ম্মুসা ডাক শুনে পেটের মধ্যে খামচে ধরল মুসার। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে চাইছে।

আ-আ-আমাকে এ রকম করে ডা-ডা-ডাকছ কেন? রাগ করে বলল মুসা।

যে-যে-যে রকম করে কথা বলছ, সে-সে-সে রকম করেই তো ডাকছি! খিকখিক করে হাসল টেরি। ভেবেছ জানি না? গ্রীনহিলসে যে স্কুলে পড়তে তুমি, সেটাতে পড়ে আমার কাজিন নিনা। আবার পপকর্ন নেয়ার জন্যে হাত বাড়াল সে।

বাটিটা সামনে বাড়িয়ে দিল মুসা। তাতে কি? চেহারা স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

বাটিটা নিজের হাতে নিয়ে নিল টেরি। কিছুক্ষণ চুপচাপ চিবাল। অপেক্ষা করিয়ে রাখল মুসাকে। তারপর মুচকি হেসে বলল, নিনা আমাকে সব বলে দিয়েছে, মু-ম্মুসা। পোকা-মাকড় থেকে শুরু করে দুনিয়ার তাবৎ জিনিসকে ভয় পাও তুমি। ভয় পেলে তোতলাতে থাকো। নিজের ছায়া দেখলে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেল।

হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে মুসা।

নিনা আমাকে বলেছে, গত বছর দুপুরবেলা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলে। রাস্তায় মানুষ ছিল না। নিনা আর তার এক বান্ধবী বনের ভেতর থেকে নাকি স্বরে কথা শুরু করল। তুমি নাকি বেদিশা। পাশের খালে দিলে ঝাঁপ। সাতরে ওপারে উঠে প্রায় বেহুশ। এমন কাণ্ড করেছিলে, তুমি মরে গেছ। ভেবে ভড়কে গিয়ে নিনা আর তার বান্ধবী ঝেড়ে দিয়েছিল দৌড় বাড়ির দিকে।

মুখ কাচুমাচু করে কিছু বলতে যাচ্ছিল মুসা, তাকে থামিয়ে দিয়ে হো হো করে হেসে উঠল কিশোর। মিথ্যে বলার আর জায়গা পেলে না! ভূতের ভয়ে পানিতে ঝাঁপ দেবে মুসা আমান? ভূতের ঘাড় মটকে দেবে। কতদিন অমাবস্যার রাতে ভূত খুঁজে বেড়িয়েছে ও। আর তুমিও যেমন, টেরি! তোমার মিথ্যুক বোনটা এসে কি না কি বানিয়ে বলল, আর তুমিও তার কথা বিশ্বাস করলে। অবশ্য তোমার আত্মীয় তো, ভাল আর কোত্থেকে হবে। কিংবা হয়তো নিনা কিছুই বলেনি, তুমি নিজেই বানিয়েছ। মুসাকে হিংসে করো তুমি। ওর মতো দুঃসাহসী তুমি আরও চোদ্দবার জন্মালেও হতে পারবে না।

কিশোরের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাল টাকি। মুখে হাসি। তাই নাকি? তাহলে স্কুলে তোতলা মুসা খেতাব হয়ে গিয়েছিল কেন? মু-ম্মুসা বলে খেপাত কেন?

টা-টা-টা-ট্টাকির মত শয়তানগুলো সবখানেই আছে বলে।

তোমার সঙ্গে কথা বলছি নাকি? মুসার দিকে তাকাল টাকি। কেন খেপাত, বলো? নাকি এটাও মিথ্যে?

ঘেমে যাচ্ছে মুসা। গ্রীনহিলসে থাকতে শেষ দিকে সহপাঠীদের খেপানোর জ্বালায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গিয়েছিল তার। ভেবেছিল, রকি বীচে এসে বাঁচল। কিন্তু অত্যাচারটা তো এখানে আরও বেশি হবে মনে হচ্ছে! বলতে গেল, আসলে একদিন একটা মা-মা-মা-মা-মা…

টাকির শয়তানি ভরা হাসিটা চওড়া হলো। কালো চোখের তারায় ঝিলিক। জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করল। কথা বের করতে পারছ না? আহারে! মোলায়েম কণ্ঠে বলল সে। ঠিক আছে, আপাতত তোমার তোতলামি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না আমরা। তুমি যে সাহসী সেটা প্রমাণ করে দাও।

হ্যাঁ, প্রমাণ করে দাও, এক সুরে কথা বলে উঠল টেরি। পপকর্নের খালি বাৰ্টিটা ঠাস করে টেবিলে রাখল সে। তুমি যে সাহসী সেটা প্রমাণের জন্যে একটা ছোট্ট পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি আমরা।

জানালায় বিদ্যুতের আলোর ঝিলিক। ভয়ানক শব্দটা আসছে! অগ্রাহ্য করার জন্যে টেরিকে জিজ্ঞেস করল মুসা, পরীক্ষা? কিসের পরীক্ষা?

গুড়ম করে বিকট শব্দ হলো। নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল সে। আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল চোখের পাতা। চোখ মেলে শুনল, কিশোর বলছে, কি পরীক্ষা?

কডির কাছে আছে, সহকারীর দিকে ফিরল টেরি। এনেছ না?

হ্যাঁ, ঘাড় কাত করল কডি। নিজে ভিজেছি, কিন্তু এগুলোকে ভিজতে দিইনি। জানি, কাজের জিনিস। এক ফোঁটা পানিও লাগেনি গায়ে। জ্যাকেটের নিচ থেকে লম্বা একটা কাঁচের বয়াম টেনে বের করল সে।

কি-কি-কি আছে ওর মধ্যে? নিজের অজান্তেই আবার তোতলানো শুরু করল মুসা।

বয়ামটা টেরির হাতে তুলে দিল কডি।

টেরি সেটা তুলে ধরল মুসার চোখের সামনে।

.

০৪.

মাকড়সা!

কালো, কুৎসিত, রোমশ অসংখ্য মাকড়সা কিলবিল করছে বয়ামটার মধ্যে। হেঁটে বেড়াচ্ছে বয়ামের দেয়ালে, একে অন্যের গায়ের ওপর।

মুসার নাকের কাছে বয়ামটা ঠেলে দিল টেরি। ঝাঁকি দিল বয়ামে। বয়ামের দেয়াল বেয়ে ওঠা মাকড়সাগুলো খসে পড়ল তলায়। প্রচণ্ড আক্রোশে খামচা-খামচি শুরু করে দিল।

মুসাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে টেরি, বুঝতে পারল কিশোর। থাবা দিয়ে টেরির হাত থেকে কেড়ে নিল বয়ামটা। মাকড়শাগুলো দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, এত মাকড়সা জোগাড়ের কারণ? ভেজে খাও নাকি তোমরা?

খিকখিক করে হাসল টেরি। আমরা খাব কেন? তোমার দোস্তকে খাওয়াতে নিয়ে এলাম।

সাংঘাতিক রসিকতা করে ফেলেছে যেন টেরি। হাসাহাসি শুরু করে দিল তার দোস্তরা।

ভড়কে গেল মুসা। সর্বনাশ! সত্যি সত্যি খেতে বলবে নাকি!

ঘাবড়ে গেছে রবিনও। শুঁটকি-বাহিনীকে বিশ্বাস নেই। ওদের পক্ষে সব সম্ভব। মুসার জন্যে দুশ্চিন্তায় সাদা হয়ে গেল তার মুখ।

সেদিন বাজির কথা বললে না, কিশোরকে বলল টাকি। সেজন্যেই তো নিয়ে এলাম।

ভাল করেছ, আড়চোখে মুসার দিকে তাকাল কিশোর।

মুসার মুখ দেখে মনে হলো বেহুশ হয়ে যাবে। পোকা-মাকড়ের মধ্যে মাকড়সাকে সবচেয়ে বেশি ভয় তার। ভয়ঙ্কর-দর্শন প্রাণীগুলোর ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। একনাগাড়ে কামড়া-কামড়ি, খামচা-খামচি করে যাচ্ছে। অদ্ভুত ওগুলোর কুস্তি-যুদ্ধ।

তা কি করতে হবে মুসাকে? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

কিছুই না, জবাব দিল টেরি। বয়ামের মধ্যে ওর হাতটা কেবল পাঁচটা মিনিট ঢুকিয়ে রাখতে হবে।

হাঁ হয়ে গেল মুসা। উঠে দৌড়ে পালানোর কথা ভাবতে লাগল। কানে এল কিশোরের কথা, কোন সমস্যা নেই। পাঁচ মিনিট কেন, পাঁচ ঘণ্টা বয়ামে হাত ঢুকিয়ে রাখতে পারবে মুসা। রবিনের দিকে তাকিয়ে সমর্থন চাইল, কি বলো, রবিন? মুসাকে আমরা চিনি।

মিনমিন করে কি বলতে গেল রবিন। তাকে থামিয়ে দিয়ে কিশোর বলল, মাকড়সাকে তুমি ভয় পাও, এই তো বলতে চাও? তা তো পাই। আমিও পাই। কিন্তু মুসা পায় না।

কিশোর, দোহাই তোমার, থামো!-বলতে গেল মুসা। বলতে পারল না।

মাকড়সাগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে মুসা। ভুরু নাচাল কিশোর, ভাবছ কি? ঢোকাও হাত। তোমার কতটা সাহস, দেখিয়ে দাও না শুঁটকিগুলোকে!

এক বিন্দু সাহস নেই আমার, তুমি তো ভাল করেই জানো!-বলতে ইচ্ছে করলু মুসার, পারল না। দাঁত চেপে রাখতে রাখতে চোয়াল ব্যথা হয়ে গেছে। মুক্তির উপায় খুঁজছে। উঠে ছুটে পালাবে দরজা দিয়ে? উঁহু, স্কুলে আর যেতে পারবে না পরদিন। টিকতে পারবে না রকি বীচে। রবিনের দিকে তাকাল অসহায় চোখে। সেখানেও সাহায্যের কোন আশা দেখল না। হঠাৎ কি যেন কি হয়ে গেল মগজে। ঝটকা দিয়ে হাত বাড়াল, দেখি, দাও বয়ামটা!  

সরিয়ে নিল কিশোর, আরে রাখো রাখো। আগে কথা শেষ করে নিই। টেরির দিকে তাকাল সে, কি বুঝলে? ভেবেছিলে মুসা আমান মাকড়সা দেখলেই কুঁকড়ে যাবে? বমি করে ফেলবে? কিংবা ছুটে পালাবে? কোনটাই তো করল না ও। প্রমাণ কি হলো না, ও যে ভয় পায়নি?

না, হলো না, জোরে জোরে মাথা নাড়ল টেরি। হাত ঢোকাতেই হবে। এবং পাঁচ মিনিট রাখতে হবে। এটাই শর্ত।

কত টাকা বাজি?

তুমিই বলো।

তুমি বলো।

দশ লাখ হলে কেমন হয়? হেসে বলল কডি।

কঠিন কণ্ঠে জবাব দিল কিশোর, তোমাকে বেচলে হবে দশটা পয়সা? ফুটানি তো করো টেরির পয়সায়।

জ্বলে উঠল কডির চোখ। মুখ কালো করে ফেলল। কিন্তু কিশোরের কথার জবাব দিতে পারল না।

পঞ্চাশ ডলার? টাকি বলল।

তোমাকেই বা কথা বলতে কে বলেছে? খেঁকিয়ে উঠল কিশোর। আমি টেরির মুখ থেকে শুনতে চাই।

টেরি বলল, আমার আপত্তি নেই।

বয়ামটার দিকে তাকাল রবিন। দেয়াল বেয়ে উঠছে কালো কালো মাকড়সাগুলো। খসে পড়ছে। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিচেরগুলোর সঙ্গে মারামারি বেধে যাচ্ছে। যে যাকে পারছে কামড়াচ্ছে। বিষাক্ত হলে সর্বনাশ হবে। মস্ত ঝুঁকি নিতে যাচ্ছে কিশোর। মুসাকে এ ভাবে বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়ার কারণ বুঝতে পারছে না।

আমারও না, টেরির কথার জবাব দিল কিশোর। তবে আরেকটু বেশি হলে ভাল হত। যাকগে, টাকাটা তো আসলে কিছু না। তোমরা দেখতে চাইছ মুসার সাহস।

দাও বয়ামটা, হাত বাড়াল টেরি।

দিয়ে দিল কিশোর।

টেবিলে রাখল সেটা টেরি। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধাতব মুখটা খুলে ফেলল। সহকারীদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, ঘড়ি দেখবে কে?

আমি, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল টাকি। অতি আগ্রহ তার। নিজের হাত ঘড়িটা নিয়ে এল চোখের সামনে।

মুসার দিকে তাকাল টেরি। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, পাঁচ মিনিট।

ঘড়ি ঠিক আছে তো ওর? কিশোরের প্রশ্ন।

 মাথা ঝাঁকাল টেরি, না থাকলে আরও পাঁচ-ছয়টা ঘড়ি আছে।

সবাই ঘিরে এল মুসাকে।

মাঝখানে এসে দাঁড়াল কিশোর। মুসার দিকে তাকিয়ে সাহস দিল, দাও হাত। কি হবে? মাকড়সার বিষেও যে তোমার কিছু হয় না দেখিয়ে দাও ওদের। গ্রীনহিলসে তো এতবড় মাকড়সাটা কামড়েছিল, মারা গেছ? মরনি। এগুলোর কামড়েও কিছু হবে না তোমার। নিশ্চিন্তে হাত ঢোকাও।

কিশোরের আচরণ অদ্ভুত ঠেকছে মুসার কাছে। ও তার সঙ্গে শত্রুতা করছে, না তার ভাল চায়, বুঝতে পারছে না। গ্রীনহিলসে বেড়াতে যাওয়া কিশোরের সঙ্গে রকি বীচের এই কিশোরকে মেলাতে পারছে না সে। কোথায় যেন একটা গণ্ডগোল!

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে টাকি। সেকেন্ডের কাটাটা বারোর ঘরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, শুরু!

লম্বা দম নিল মুসা। হাত কাঁপছে। বয়ামের মধ্যে ঢোকানোর সময় দেখে ফেলবে না তো ওরা!

আঙুলের মাথা ঢোকাল প্রথমে। ঠাণ্ডা লাগছে কাঁচের ছোঁয়া। চোখ বন্ধ করে আচমকা হাতের পুরোটাই ঠেলে দিল ভেতরে।

কয়েক সেকেন্ড কিছুই ঘটল না।

তারপর হাতের উল্টোপিঠে সুড়সুড়ে অনুভূতি। চোখ মেলে দেখল হাত বেয়ে উঠতে শুরু করেছে মাকড়সাগুলো।

নিজের অজান্তেই গোঙানি বেরিয়ে এল মুখ থেকে। ঠেকাতে চেয়েছিল। পারল না। সেটা ঢাকার জন্যে জোর করে হাসি ফোঁটাল মুখে।

কপালে ঘাম জমছে। বেশি হয়ে গেলে ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়বে। ঘামাটা কি দেখতে পাচ্ছে কেউ?

না, বয়ামের মধ্যে হাতটা ছাড়া আর কোনদিকে চোখ নেই কারও।

হাতের তালুতে সুড়সুড়ি দিচ্ছে মাকড়সাগুলো। রোমশ পাগুলো বেয়ে বেয়ে উঠে আসছে কব্জির কাছে।

তিরিশ সেকেন্ড! ঘোষণা করল টাকি।

 মুসার মনে হলো তিরিশ বছর।

কম করে হলেও বারোটা মাকড়সা এখন আঁকড়ে ধরে আছে তার হাত। চামড়া চুলকাচ্ছে। সারা শরীরেই চুলকানিটা ছড়িয়ে পড়ল যেন।

এক মিনিট! চিৎকার করে জানাল টাকি।

এখনও চার মিনিট বাকি, টেরি বলল। হাসিমুখে মুসার দিকে ঝুঁকল। কি বের করে আনবে? না পারবে?

পারবে না!-বুঝে গেছে মুসা।

হাতের উল্টোপিঠে নাচানাচি শুরু করেছে মাকড়সাগুলো। কাঁটা কাঁটা রোমের খোঁচা লাগছে। দুটো মাকড়সা কব্জি পার হয়ে বেয়ে বেয়ে উঠে আসতে লাগল কনুইয়ের কাছে। থাবা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল ওগুলোকে। পা ধরে তুলে নিয়ে গিয়ে জানালা দিয়ে দুটোকেই বাইরে ফেলে এল কিশোর।

কুট করে কামড় মারল একটা মাকড়সা। ঝাঁকি দিয়ে হাতটা বের করে আনতে চাইল মুসা।

পারল না। বয়ামের মধ্যে আটকে গেছে হাতটা।

.

০৫.

বের করার জন্যে হাত মোচড়াতে শুরু করল মুসা। শক্ত হয়ে গেছে মুঠো।

যত চেষ্টা সব বিফল। হাত আর বেরোল না।

 দুই মিনিট, ঘোষণা করল টাকি।

কি করছ তুমি? ভুরু নাচাল টেরি। হাত নাড়াচ্ছ কেন ওরকম করে?

 মাথা ঝাঁকাল মুসা।

দেখলে তো? হাসিমুখে টেরির দলের দিকে তাকাল কিশোর। মুসার সাহস দেখলে! পাগলের মত কামড়াচ্ছে, তা-ও হাত বের করছে না ও!

পারলে তো কখন বের করে ফেলতাম!-কাঁদতে ইচ্ছে করছে মুসার।

আবার বের করার চেষ্টা করল হাতটা। পারল না। আটকেছে ভালমতই।

রবিন শঙ্কিত হয়ে আছে, বিষের ক্রিয়ায় কখন চোখ উল্টে দিয়ে পড়ে যায় মুসা। ভয়ঙ্কর এ খেলা ভাল লাগছে না তার।

বুড়ো আঙুলে কামড় মারল একটা মাকড়সা। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করল মুসা। চিৎকার করল না।

বের করা দরকার হাতটা! কি করা যায়। বাড়ি মেরে ভেঙে ফেলবে নাকি বয়ামটা?

কিশোর কোন সাহায্য করবে না, বুঝে গেছে। রবিনের দিকে তাকাল।

অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রবিন। একেবারে চুপ। বোবা হয়ে গেছে যেন। কি করবে সে-ও বুঝে উঠতে পারছে না। একটা ব্যাপার বুঝতে পারছে, টেরির কাজিন নিনা সত্যি কথাই বলেছে, যতই হেসে উড়িয়ে দেয়ার ভান করুক না কেন কিশোর। আজ যদি মুসা বাজিটা হারে, খেপানো শুরু হবে তাকে। গ্রীনহিলসের মত এখানেও জীবনটা নরক হয়ে যাবে ওর।

মুসার হাতের দুই পাশ দিয়েই এখন ওঠানামা করছে মাকড়সাগুলো। কব্জির কাছে ঘোরাফেরা করছে।

আবার তীক্ষ্ণ ব্যথা। আবার কামড়।

হাতটা বের করতে না পারলে নিস্তার নেই।

মাথা ঘুরছে মুসার। ঘরটা পাক খাচ্ছে চরকির মত। বেহুঁশ হয়ে যাবে না তো!

সুড়সুড়ি আর চুলকানি কোনমতে সহ্য করেছে। কিন্তু কামড়? এক কামড় খেয়েই তো মরতে বসেছিল। ভয়টা তখন থেকেই বেড়েছে। ভয় পাওয়াটা রোগ হয়ে গেছে। গ্রীনহিলসে নদীর ধারে বসে মাছ ধরছিল। গাছের ওপর থেকে টুপ করে ঘাড়ে পড়েছিল একটা মাকড়সা। কামড়ে দিল। থাবা দিয়ে ওটাকে ঘাড় থেকে ফেলে তীক্ষ্ণ ব্যথাটা ডলে সারানোর। চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। মাথা ঘুরতে লাগল। এবং বেহুঁশ।

চব্বিশ ঘণ্টা পর হাসপাতালে জ্ঞান ফিরল। ডাক্তার বললেন, ভাগ্যিস ওটা ব্ল্যাক উইডো স্পাইডার ছিল না। তাহলে মরে যেত মুসা। তবে যেটাতে কামড়েছে সেটাও কম বিষাক্ত নয়। মুসার ভাগ্য ভাল, সময়মত চিকিৎসা পেয়েছে। নইলে বাঁচা কঠিন হয়ে যেত।

তিন দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল সে। কামড়ের জায়গাটায় টিপ দিলে ব্যথা লাগত। এক মাসেরও বেশি ছিল সেই ব্যথা। সবই জানে কিশোর। তারপরেও মাকড়সার বয়ামে হাত ঢোকাতে তাকে বাধ্য করল!

মাথা ঘুরছে। তারমানে এই মাকড়সাগুলোও বিষাক্ত!…যাচ্ছে…বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছে ও…

পাঁচ মিনিট! ঘোরের মধ্যে শুনতে পেল টাকির ঘোষণা।

মাথা ঝাড়া দিল মুসা। পরিষ্কার করতে চাইল ভেতরটা।

গুঙিয়ে উঠল টেরি। মাথা নেড়ে তিক্তকণ্ঠে বলল, জিতেই গেল!

একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল পাঁচজনেই। হতাশ।

দুই হাত মাথার ওপর তুলে নাচতে লাগল কিশোর। চিৎকার করে বলল, রবিন, আমার জিতে গেছি! জিতে গেছি! পেয়ে গেলাম পঞ্চাশটা ডলার! ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যেন টাকার জন্যেই এতসব করেছে সে।

মুসার দিকে তাকাল। হয়েছে, মুসা। সময় শেষ। হাত বের করে আনো।

ঢোক গিলল মুসা। গলাটা শুকিয়ে তুষের মত খসখসে হয়ে গেছে। হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে লাফাচ্ছে, কথা সরছে না মুখ দিয়ে।

বয়ামের মধ্যে ওর হাত আটকে গেছে যখন বুঝতে পারবে, কি করবে টেরি? বলবে, না হয়নি, আবার নতুন করে শুরু করো?

জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট চেটে মুসা বলল, না, বের করব না। আমার মজা লাগছে। আরও কিছুক্ষণ রাখব।

আঁ! হাঁ হয়ে গেল টেরি।

সব কটা চোখ এখন মুসার দিকে। সবগুলো চোখে বিস্ময়। ওর হাতের দিকে তাকাল রবিন। হাত বেয়ে উঠে আসছে মাকড়সাগুলো। বিড়বিড় করল, পাগল হয়ে গেল নাকি!

ঠিক, তা-ই হয়েছে! চিৎকার করে উঠল কডি। আতঙ্কে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারমানে ভীতু…

কিশোর তার কথা কানেও তুলল না। দেখলে তো, টেরির পিঠে এত জোরে থাপ্পড় মারল সে, উপুড় হয়েই পড়ে যাচ্ছিল টেরি, আমাদের মুসা আমানের সাহস! পাঁচ মিনিট ওর জন্যে কিছু না। ও আরও রাখতে চায়। আরও পাঁচ মিনিট হয়ে যাক। কি বলো?

কিশোর, প্লীজ… বলতে গেল মুসা।

শুনল না কিশোর। দাও, টাকা দাও, টেরির দিকে হাত বাড়াল সে। পঞ্চাশ ডলার। কি ভেবে ফিরিয়ে আনল হাতটা। দাঁড়াও দাঁড়াও, সময়টা যেহেতু ডাবল করা হবে, টাকাটাও ডাবল…

কিশোর…কাতর অনুনয় ফুটল মুসার চোখে।

টাকার জন্যে ভাবছ তো? কিশোর বলল। কোন চিন্তা নেই। তোমার কাছে এখন না থাকলে আমি দিয়ে দেব। তবে আমারও দেয়া লাগবে না। জানি তো, তুমি হারবে না। টেরির দিকে তাকাল, কি, একশো ডলারের কথা শুনেই ঘেমে যাচ্ছ?

কি যে বলো! ঠিক আছে, দেবো একশো! রাজি হয়ে গেল টেরি।

মুসার হাতের ওপর হাঁটাহাঁটি করছে মাকড়সাগুলো। আবার কুট করে কামড়ে দিল একটা। ব্যথায় দপদপ করছে হাতটা।

মারা যাচ্ছি আমি!-হাল ছেড়ে দিল মুসা। আর বাঁচব না! আজ এই ঘরেই আমার মৃত্যু হবে! হায় খোদা, শেষ পর্যন্ত মাকড়সার কামড়ে মরণ লেখা ছিল আমার কপালে!

পরের বার অন্য কিছু ভেবে বার কোরো, টেরিকে উপদেশ দিচ্ছে কিশোর। তবে পারবে না। কোন কিছুকেই ভয় পায় না মুসা, হেসে রবিনের দিকে তাকাল। সমর্থনের আশায় বলল, তাই না, রবিন?  

মুখ চুন করে আছে রবিন। বুঝতে পারছে, টেরিকে খোঁচাচ্ছে কিশোর! উস্কে দিচ্ছে। প্রকারান্তরে সে নিজেই প্রস্তাব দিচ্ছে, আরেকটা বাজি হোক।

দশ মিনিটও শেষ।

হাসি উধাও হয়ে গেছে টেরি-বাহিনীর।

টেরিকে বলল কিশোর, যাও, তোমাদের একশো ডলার মাফ করে দিলাম। নিতে লজ্জা লাগছে। এত সহজ বাজি। মনে হচ্ছে টাকাটা নিলে ঠকানো হবে তোমাদের।

তাই নাকি? অপমানে মুখ কালো হয়ে গেল টেরির। বেশ, মনে থাকল কথাটা। পরের বার যাতে ভয় পায়, এমন কিছুই নিয়ে আসব।

বাজির টাকাটাও বাড়াতে হবে তাহলে।

বাড়াব। যত বলল। এত সহজে ছাড়া পাবে না ও।

হ্যাঁ, সুর মেলাল টাকি, পরের বার ওকে মু-ম্মুসা বানিয়েই ছাড়ব।

দলবল নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে গেল টেরি।

মুসার দিকে তাকিয়ে হাসল কিশোর, কত সহজেই না টাকা রোজগার করা যায়, তাই না?

আমি যাচ্ছি মারা, আর তুমি করো টাকার চিন্তা! ককিয়ে উঠল মুসা। জলদি খোলো আমার হাত! বয়ামে আটকে গেছে!

মাথা ঝাঁকাল কিশোর, কিছু যে একটা হয়েছে, বুঝতেই পারছিলাম।

তাহলে পাঁচ মিনিটের পরই বিদেয় করে দিতে পারতে ওদের, ঝঝাল কণ্ঠে বলল রবিন।

জবাব দিল না কিশোর। মুসাকে বলল, তোমার হয়েছে আমাজনের বাদরের অবস্থা। জানো না কি করে বাদর ধরে ওরা?

দোহাই তোমার, কিশোর, লেকচার থামাও! চিৎকার করে উঠল মুসা। আগে বয়ামটা খোলার ব্যবস্থা করো। নইলে আজ ঠিক কবরে যেতে হবে আমাকে।

খোলার ব্যবস্থাই তো করছি। না শুনলে বুঝবে কি করে কেন আটকে আছে হাতটা? আমাজনের শিকারিরা একটা বাঁশের মধ্যে ফল রেখে দেয়। বানরে হাতটা ঢোকায়। ফলটা তুলে নিয়ে যতই বের করতে চায় হাত আর বেরোয় না। ফলও ছাড়ে না, হাতও বেরোয় না। প্রথমে লোভ, তারপরে আতঙ্ক। মাথা যায় গরম হয়ে। কি করবে বুঝতে পারে না। শিকারি এসে ধরে ফেলে। কেন এমন হয় জানো? হাতটা ঢোকানোর সময় আঙুলগুলো সোজা থাকে, সরু থাকে, ফলটা তুলে নিলেই মুঠো বড় হয়ে যায়, বাঁশের ফাঁকে আটকে যায়…

হাতের দিকে তাকাল মুসা। এখনও মুঠো করে আছে। খুলে নিল আঙুলগুলো। সহজেই বেরিয়ে এল হাতটা। ধপাস করে বসে পড়ল সোফায়। আ-আ-আমি একটা গা-গাধা!

গা-গাধাই হও আর যা-ই হও, সত্যি তোমার সাহস আছে…

ইয়ার্কি মারছ! আমি এদিকে মরে যাচ্ছি….উহ! হাত ডলতে লাগল মুসা।

 দেখি, কি হয়েছে? এগিয়ে এল কিশোর। হাতটা তুলে নিল। বাপরে, কি ফোলা ফুলেছে! আগে বের করা গেলে এটাও দেখাতাম টেরিদের-তোমার সাহসের আরও বড়াই করা যেত; এত যন্ত্রণার পরেও বের করনি বলে। যাকগে, যা গেছে গেছে…।

কিশোরের কাণ্ড দেখে রেগে গেল রবিন, তোমার হলো কি, কিশোর!…ফালতু কথা বাদ দিয়ে আগে দেখো কোন ক্রীমটিম আছে কিনা।

আছে, আছে। নিয়ে আসছি। দৌড়ে চলে গেল কিশোর।

মুসার দিকে তাকাল রবিন, বেশি ব্যথা করছে?

ব্যথার চেয়েও চুলকাচ্ছে বেশি।

হু, তারমানে বিষাক্ত না মাকড়সাগুলো।

 তা তো নয়ই। আমাকে যেটা কামড়েছিল সেটার মত হলে কখন মরে যেতাম…

আঁউক! করে এক চিৎকার দিয়ে উঠল মুসা।

 কি হলো! লাফ দিয়ে এগিয়ে এল রবিন।

জবাব না দিয়ে পাগলের মত জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে হাতড়াতে শুরু করল মুসা। একটা মাকড়সা বের করে এনে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। রাগের চোটে পা দিয়ে মাড়িয়ে ভর্তা করল। কার্পেট নষ্ট হওয়ার পরোয়া করল না। মেরিচাচীর বকা খাবে এখন কিশোর। দুঃখ অনেকটা কমল ওর।

ক্রীম নিয়ে ফিরে এল কিশোর। হাতটা লম্বা করো, মাখিয়ে দিই।

ওষুধের প্রভাবে চুলকানিটা কমল। তবে কামড়ের কারণে যে সব জায়গা ফুলে গেছে ওগুলো ফুলেই রইল।

মাকড়সাগুলো বিষাক্ত ছিল না, দেখেই চিনেছিলাম… কিশোর বলল। বাথরূমে গিয়ে ঠাণ্ডা পানি ঢালো, সেরে যাবে। আমি দেখি, ফ্রিজে কি কি পাওয়া যায়।

থাক, আর লোভ দেখাতে হবে না, উঠে দাঁড়াল মুসা। গরু মেরে জুতো দান!

বাথরূমে এসে ঢুকল মুসা। পানি ঢালায় সত্যি কাজ হলো। আয়নার দিকে তাকাল। কি রকম বিকৃত করে রেখেছে মুখটা। স্বাভাবিক করল। পরক্ষণে একটা কথা মনে পড়তে আপনাআপনি বিকৃত হয়ে গেল আবার। হুমকি দিয়ে গেছে টেরি, পরের বার আর এত সহজে ছাড়বে না। কি নিয়ে যে হাজির হবে, খোদাই জানে!

Super User