০৬.

সত্যি, মাকড়সার বয়ামে যে ভাবে হাতটা ঢুকিয়েছিলে তুমি, কিশোর বলল, আমি পারতাম না।

আর আমি হলে ঢোকাতামই না, রবিন বলল। ভীতু, কাপুরুষ, যা খুশি বলে বলুকগে আমাকে টেরি।

রোজ রোজ ওসব শোনার চেয়ে সাহস দেখিয়ে মুখটা বন্ধ করে দিলেই কি ভাল না?

ঘুষি মেরে ওর নাক ফাটিয়ে দিতাম আমি…

 টেরি তো একলা নয়। কজনের ফাটাবে?

মাকড়সার বয়ামে হাত ঢোকানোর পরের আরেক শনিবার। কিশোরদের বাড়িতেই আড্ডা দিচ্ছে তিন গোয়েন্দা। সেদিনও কিশোরের চাচা-চাচী বাড়িতে নেই।

গত শনিবারের মত বৃষ্টি হচ্ছে না। আকাশ পরিষ্কার। তবে ঠাণ্ডা পড়েছে বেশ।

কিশোর আর রবিনের তর্কে যোগ দিতে পারল না মুসা। মানসিক অশান্তিতে রয়েছে সে। ভয়ানক দুশ্চিন্তা। পুরোটা সপ্তাহ ধরে তাকে ভয় দেখিয়েছে টেরি, কালটু-আমান, এবার দেখব কেমন তোমার সাহস। এমন প্ল্যান করেছি, তোতলাতেও ভুলে যাবে।

কি করতে যাচ্ছে, জানতে চেয়েছে মুসা।

মুচকে হেসেছে টেরি, ভঙ্গি করেছে সিনেমার দুষ্ট ভিলেনের মত। আগেই বলব কেন…

জানালার কাঁচে শব্দ হতে ধড়াস করে উঠল মুসার বুক। ভাবল টেরিরা এসে গেছে।

কিন্তু না, বারান্দার নয়, বাইরের দিকের জানালায় শব্দ হয়েছে। বোধহয় ডালটাল বাড়ি খেয়েছে।

কিশোর আর রবিনের তর্ক তুঙ্গে উঠেছে, এই সময় ফোন বাজল। উঠে গিয়ে ধরল কিশোর। মিনিটখানেক কথা বলে ফিরে এল হাসিমুখে, টেরিরা আসছে।

আঁতকে উঠল মুসা, মানা করে দিলে না কেন?

মানা করব কেন? ও ব্যাটাদের কাছে হারব নাকি?

কি বলল?

জানতে চাইল, তুমি আছো নাকি। বাড়িতে অন্য কেউ আছে কিনা।

আমি যাই, উঠে দাঁড়াল মুসা।

আরে কি করছ! হাত ধরে টেনে ওকে বসিয়ে দিল কিশোর। মুখে চুনকালি মাখাবে নাকি শেষে! কোনও দিন আর স্কুলে গিয়ে শান্তি পাবে মনে করেছ?

আ-আ-আমি বাবাকে বলে অন্য শহরে চলে যাব। অন্য স্কুলে ভ-ভ ভর্তি হব…

তাতে লাভটা কি? ওখানে গিয়েও তো ভূ-ভই করবে। মূল জিনিসটা না উপড়াতে পারলে শান্তি পাবে না কোনখানে গিয়েই।

উড়ে চলে এল যেন টেরিরা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বেল বাজল।

 মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল মুসার। আমি বাথরূম থেকে আসি!

কেন?

মাথায় পানি দেব।

দরকার নেই, বসে থাকো। ওরা বুঝে যাবে তুমি ভয় পেয়েছ। দরজা খুলে দিতে চলল কিশোর। যেটা তুমি নও, সেটা মানুষকে বোঝাতে যাও কেন?

 কিশোর, তুমি বুঝতে পারছ না, অনুরোধের সুরে বলল মুসা, আমার সাহস সত্যি নেই। আগে যা-ও বা ছিল, মাকড়সাটা কামড়ে দেবার পর আর ছিটেফোঁটাও নেই…

আবার বেল বাজল। অস্থির হয়ে গেছে টেরির দল।

দরজা খুলে দিল কিশোর।

খুলতে এত দেরি কেন? মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দিল টেরি। প্যান্ট বদলাচ্ছে নাকি মু-ম্মুসা! খিকখিক করে হাসল সে।

কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল কিশোর, প্যান্ট বদলাবে কেন?

ভয়ে খারাপ করে ফেলেছে হয়তো…

ওই তো সোফায় বসে আছে। কেন, সেদিন মাকড়সা নিয়ে এসে শিক্ষা হয়নি? কথা কম বলো, হুমকি দিল কিশোর। নইলে বাজিটা অন্য রকম হবে বলে দিলাম।

কি রকম? টাকা বাড়াবে? পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল টাকি।

না। হেরে গেলে গায়ের কাপড় খুলে রেখে বাড়ি যেতে হবে তোমাদের।

কডি বলল, না না, টাকাই ভাল…।

কেন, নিজেরাই ঘাবড়ে গেলে? ভুরু নাচিয়ে হাসল কিশোর।

অ্যাই, তুমি চুপ থাকো! ধমক লাগাল কডিকে টেরি। কিশোরের দিকে তাকাল, তাহলে বাজিটা এখনও বহাল আছে শিওর হতে এলাম। ওটা গিয়ে নিয়ে আসতে হবে তো আমাদের। বাজি যদি না-ই থাকে শুধু শুধু ঝামেলা…

তোমরা কি, বলো তো? রেগে উঠল কিশোর। ফোনেই তো বলে দিলাম যা বলার…

কিন্তু প্ল্যান বদলেছি আমরা।

বদলেছ মানে?

 প্রথম যে জিনিসটা আনার কথা ছিল, সেটা আনিনি।

সেটা কি ছিল?

আনতে চাই না যখন, শুনে আর কি করবে?

তাহলে এখন কি আনতে চাও?

 ফিরে তাকাল টেরি। বন্ধুদের জিজ্ঞেস করল, কি, আগেই বলে দেব?

বলল, টাকি বলল। জেনেশুনে আগে থেকে মনের জোর বাড়িয়ে রাখুক মু-ম্মুসা। অত নির্দয় যে নই আমরা, সেটাও বুঝুক।

মাথা ঝাঁকিয়ে কিশোরের দিকে ফিরল আবার টেরি।

উত্তর্ণ হয়ে আছে মুসা। টেরি কি বলে শোনার জন্যে। রবিনেরও কান খাড়া।

 টেরি বলল, একটা সাপ আনব। বড়। বিষাক্ত। ওটার মুখে চুমু খেতে হবে তোমাদের তোতলা মু-ম্মুসাকে। পারবে নাকি জিজ্ঞেস করো।

বলে কি! হাঁ হয়ে গেল মুসার মুখ।

কিন্তু কিশোরের হাসি এক বিন্দু মলিন হলো না। দূর! ভেবে ভেবে শেষে এই জিনিস বের করেছ? হায়রে কপাল, এই না হলে শুঁটকির বুদ্ধি! এ তো মাকড়সার চেয়েও সোজা!

বলছ!

তো আর কি বলব? জানো, কত সাপ ঘেঁটেছে মুসা? এক ভারতীয় বেদের সঙ্গে ভাব হয়ে গিয়েছিল মুসার, গ্রীনহিলসে থাকতে, নির্বিকার কণ্ঠে বলে চলল কিশোর। সাপ খেলানো শিখেছে তার কাছে। তারপর থেকে তো মুসার জয়-জয়কার। মেলা হলেই সার্কাসের লোকের ডাক আসত তার কাছে। ডেকে নিয়ে যেত। কত যে প্রশংসা আর পুরস্কার পেয়েছে সে।

তাই নাকি? সন্দেহ দেখা দিল টেরির চোখে।

কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না?

নিনা তো সাপ খেলানোর কথা কিছু বলল না?

ও তোমার বোন। তোমার মতই চরিত্র। ও কি আর কারও ভালটা বলতে যাবে?  

দমে গেল মনে হলো শুঁটকি। ফিরে তাকাল বন্ধুদের দিকে। আবার ফিরল কিশোরের দিকে। হাসি ফোঁটাল মুখে। ও তুমি যা-ই বলো, নিজের চোখে না দেখে বিশ্বাস করছি না আমি। বারান্দায় বেরিয়ে গেল সে। সহকারীদের বলল, অ্যাই, চলো হে, নিয়ে আসিগে।

কিশোরের মিথ্যের বহর শুনে রবিনও হতবাক। কিশোর দরজা লাগিয়ে ফিরে আসতেই বলে উঠল, এ সব বাহাদুরি না করলে কি চলত না?

না, চলত না। শঠে শাঠ্যং। ওরা যেমন, ওদের ওভাবেই জবাব দিতে হবে।

কি-কি-কিন্তু কেউটে আনে না র‍্যাটল আনে, মুসা বলল, ঠিক আছে কিছু সাপের মুখে চুমু খাব কি করে!

খাবে। তাতে অসুবিধে কি? মুচকি হাসল কিশোর।

তোমার কি হয়েছে বলো তো, কিশোর! তুমি আমাকে কায়দা করে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাইছ নাকি? খুনের মোটিভটা কি? কি করেছি আমি? আমার তো কোন টাকা-পয়সা জমানো নেই, ইনশুরেন্স-ফিনশুরেন্সও নেই…

চুপ করে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকো। সাপ ওরা আনবে না।

যদি আনে?

যদি আনে, তখন দেখা যাবে। তবে আমার এত কথার পর সাপ ওরা আনবে না, লিখে রাখতে পারো। ওদের ধারণা হয়ে গেছে, সাপকে তুমি ভয় পাও না। এনে লাভ হবে না।

কিন্তু শুঁটকি টেরিকে বিশ্বাস নেই। নিশ্চিন্ত হতে পারল না মুসা।

*

বার বার ঘড়ি দেখছে কিশোর। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, টেরিরা গেছে, এখনও আসার নাম নেই।

রবিন বলল, আসবে না নাকি?

না এলেই তো ভাল, মুসা বলল। আসছে না দেখে তুমিও মনে হয় হতাশ! তোমরা কি আমাকে পাগল পেয়েছ…

কথা শেষ হলো না মুসার। দরজার বাইরে থেকে ভেসে এল আতঙ্কিত চিৎকার, কিশোর, দরজাটা খোলো তো, ভাই! জলদি

লাফ দিয়ে উঠে ছুটে গেল কিশোর। হাতল ঘুরিয়ে হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল দরজা।

দরজায় দাঁড়ানো টাকি। চিৎকার দিয়ে উঠল, জলদি এসো! সর্বনাশ হয়ে গেছে!

বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা।

কডির পেছনে হ্যারল্ড আর নিটুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল মুসা। তারপর দেখতে পেল টেরিকে।

দুই হাত দিয়ে দুই চোখ চেপে ধরে রেখেছে টেরি। টকটকে লাল রক্ত গড়িয়ে নামছে গাল বেয়ে।

তাকে ধরে ধরে নিয়ে ঘরে ঢুকল নিটু আর হ্যারল্ড।

তোমার চাচা-চাচী বাড়ি আছে, কিশোর? চিৎকার করে বলল কডি। আমাদের সাহায্য দরকার!

না। কি হয়েছে? জানতে চাইল কিশোর।

একটা বড় বিষাক্ত সাপ নিয়ে এসেছিলাম আমরা, টাকি জানাল। ঝাপির ঢাকনা তুলতেই পালাল ওটা। টেরি ছুটল ওটার পেছনে। জঞ্জালের মধ্যে ঢুকে পড়ল সাপটা। দৌড়ে ধরতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে লোহা-লক্কড়ের মধ্যে পড়ে দেখো কি অবস্থা হয়েছে ওর!

শিকের খোঁচা লেগে একটা চোখ গলে বেরিয়ে চলে এসেছে, আবার চিৎকার করে উঠল কডি।

আহ্! গুঙিয়ে উঠল টেরি।

ধীরে ধীরে ডান হাতটা নামাল চোখের ওপর থেকে। হাতের তালু মেলে দেখাল।

খুলে চলে আসা রক্তাক্ত বিশাল চোখটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল তিন গোয়েন্দা।

আহ, আমাকে…আমাকে বাঁচাও, মুসা! গোঙাতে গোঙাতে বলল টেরি। তোমার অভিশাপেই অমন হয়েছে। প্লীজ, কিছু একটা করো!

ডাক্তার ডাকো, ডাক্তার! চিৎকার করে বলল কডি। অ্যামবুলেন্স!

আহ…বাচাও আমাকে…কি যন্ত্রণা…মাগোহ! ক্রমাগত গোঙাচ্ছে টেরি।

ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে খুলে আসা চোখটা। পেটের মধ্যে মোচড় দিচ্ছে মুসার। মুখে হাত চাপা দিল বমি ঠেকানোর জন্যে।

অস্ফুট শব্দ করে উঠল কিশোর।

 রবিনও তাকাতে পারছে না চোখটার দিকে। মুসা তাকিয়ে আছে।

দাঁড়িয়ে আছো কেন তোমরা… ককাতে ককাতে টেরি বলল। কিছু একটা করো না!…উফ, কি ব্যথা!

চোখটার দিকে তাকিয়েই আছে মুসা।

ছুটে গেল হঠাৎ। টেরির হাত থেকে এক থাবায় চোখটা তুলে নিয়ে লজেন্সের মত ছুঁড়ে দিল মুখের মধ্যে। চুষতে শুরু করল।

.

০৭.

চিৎকার করে উঠল কিশোর।

 ঘৃণায় মুখ বাঁকাল রবিন।

ভীষণ চমকে গিয়ে টাকিও চেঁচিয়ে উঠল। হাঁ হয়ে গেছে কডি আর বাকি তিনজন।

টেরির দিকে ফিরে চোখটা এ গাল-গাল করতে থাকল মুসা।

হাসতে শুরু করল টেরি। অন্য হাতটা নামিয়ে আনল চোখের ওপর থেকে।

ঠোঁট ফাঁক করে জিভের ডগায় চোখটা বসিয়ে সামনে ঠেলে দিল মুসা।

টাকি হাসল। হাসতে লাগল কডি, নিটু আর হ্যারল্ড।

মুখ থেকে চোখটা হাতের তালুতে ফেলে দিল মুসা। ছুঁড়ে দিল টেরির দিকে। দেখতে একেবারে আসল চোখের মত। প্ল্যাস্টিকের। মলের কার্ড স্টোর থেকে কিনেছ, তাই না? আজই দেখে এলাম, সকাল বেলা। হ্যালোউইন ডিসপ্লেতে সাজিয়ে রেখেছিল।

হ্যাঁ, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল টাকি।

 কিশোরের দিকে তাকাল টেরি। পেপার টাওয়েল আছে? নকল রক্তটা মুখ থেকে মুছে ফেলতাম। ফোঁটা পড়ে কাপড় নষ্ট হচ্ছে।

কিশোর চলে গেল পেপার টাওয়েল আনতে।

ফিরে এল মিনিটখানেকের মধ্যে। বড় একটা কাগজের দলা তুলে দিল টেরির হাতে। দেখলে তো? আমরা সবাই ভয় পেয়ে গেলাম, কিন্তু চোখের পাপড়িটাও একবার কাঁপেনি মুসার। তা, এটাই তোমার দুই নম্বর চ্যালেঞ্জ নাকি? বললাম না, মুসাকে ভয় দেখাতে হলে সত্যিকারের ভয়াল জিনিস দরকার।…যাও, আজও নেব না টাকা। এত সহজ কাজের জন্যে টাকা নিতে নিজের কাছেই খারাপ লাগে।

চোখটা টোকা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল টেরি। কিশোরের কাঁধে বাড়ি খেয়ে কার্পেটে পড়ল সেটা।

এটা আমাদের চ্যালেঞ্জ নয়, শার্লক পাশা, টাকি বলল, সামান্য রসিকতা করলাম তোমাদের সঙ্গে। দেখলাম চেষ্টা করে মু-ম্মুসা রাক্ষসটার রাতের খাওয়াটা মাটি করতে পারি কিনা।

বরং খিদেটা আরও বাড়িয়ে দিলে ওর, টাকি মাছ! কিশোর বলল। টাকি মাছের ভর্তা খাওয়ার জন্যে প্রাণ এখন আনচান করতে থাকবে ওর।

ভাবছে মুসা, কি সাংঘাতিক বাঁচা বেঁচে গেছে। ভাগ্যিস মলে দেখে এসেছিল চোখটা। নইলে বমি করে ভাসিয়ে ফেলত এতক্ষণে।

মাটি থেকে চোখটা তুলে নিয়ে হ্যারল্ডের দিকে ছুঁড়ে মারল কডি। হ্যারল্ড আবার মারল নিটুকে। ঘরের মধ্যে চোখ ছোঁড়াছুঁড়ি খেলা শুরু করে দিল ওরা।

 মুখ থেকে লাল রঙ মুছে ফেলল টেরি। কাগজটা দলা পাকিয়ে আচমকা টোকা দিয়ে ছুঁড়ে দিল মুসার মুখ লক্ষ্য করে।

বোধহয় সেদিকে নজর থাকাতেই চোখটা ধরতে মিস করুল কডি। একটা ল্যাম্পের ওপর গিয়ে পড়ল সেটা। নড়ে উঠল ল্যাম্পটা, কিন্তু পড়ল না।

কি করছ! ধমকে উঠল কিশোর। সামান্য ভদ্রতাটাও শেখনি নাকি? চাচা-চাচী এসে পড়বে এক্ষুণি। তোমাদের এ সব করতে দেখলে খুশি হবে না। টেরির দিকে ফিরল সে, তারমানে সাপ তুমি আননি?

মাথা নাড়ল টেরি। না, পরে ভেবে দেখলাম, ঠিকই বলেছ তুমি, সাপ জিনিসটা ভয়াল কিছু না। যে কেউ হাতে নিতে পারে।…ভাগ্যক্রমে আবারও জিতে গেলে তুমি হিরো মিয়া। মুসার কাঁধে চাপড় দিল সে। তবে তোমাকে আমি মু-ম্মুসা না বানিয়ে ছেড়েছি তো আমার নাম টেরিয়ার ডয়েল নয়।

ভালই হবে, কিশোর বলল। শেষ পর্যন্ত বাপের দেয়া নামটা বদলে আমাদের দেয়া নামটাই ব্যবহার করতে হবে তোমাকে-টকি টেরি।…কিন্তু হেরে গিয়েও অত বড় বড় কথা কেন? মুসাকে ভয় পাওয়ানো তোমাদের কমো নয়। বাজি আর তোমরা কোন কালেই জিততে পারলে না।

তাই নাকি? মুখ বাঁকাল টাকি। টেরির প্ল্যান কি, কল্পনাও করতে পারবে না তোমরা। বাজির টাকাটা আগেভাগেই দিয়ে রাখতে পারো আমার কাছে। হেরে তোমরা যাবেই।

তোমাদের আসলে লজ্জা-শরম একেবারেই নেই, নিমের তেতো ঝরল কিশোরের কণ্ঠে। দুই-দুইবার টাকা মাপ করে দিলাম, আর এখন টাকা দেয়ার কথা তুলছ। জেতার বেলায় নাম নেই, আগেই টাকা দিই, তাই না। যাও, টাকা আমরা নেবই না। বাজি হবে অন্যভাবে। টেরি বলেছে, মুসাকে হারাতে না পারলে তার নাম টেরিয়ার ডয়েল নয়। খুব ভাল কথা। এবারের বাজি, হারলে আমরা যে নামে ডাকব ওকে, সেটা বহাল করতে হবে। ওর নাম হবে স্রেফ শুঁটকি। সারা স্কুলে ছড়িয়ে চাউর করে দেব সেটা আমরা।

তা দিও, পারলে, দমল না টাকি। ওর প্ল্যানটা জানলে এখনই প্যান্ট খারাপ করে বাথরূমে দৌড়াত তোমাদের মু-ম্মুসা মিয়া।

কি প্ল্যান? দুর্বল কণ্ঠে জানতে চাইল মুসা।

টেরির তিলে-পড়া মুখে মুচকি হাসি ফুটল। আগাম ইঙ্গিত চাইছ তো? বেশ বলছি। আমাদের একটা ফিউনরল পারলার আছে, জানো তো?

জানি, জবাবটা দিল কিশোর। তাতে কি?।

হাসি ছড়িয়ে পড়ল টেরির সারা মুখে। তাতে? নিজের বুদ্ধির তো খুব বড়াই করো। আন্দাজ করে নাও।

.

০৮.

সোমবার লাঞ্চের সময় ক্লাস থেকে বেরিয়ে ক্যাফিটেরিয়ার দিকে। রওনা হয়েছে মুসা আর কিশোর। রবিনকে দেখতে পেল না। সে বেরিয়েছে ওদের আগে। ডেকে নিয়ে গেছে নাইনথ গ্রেডের মরফি।

হলের মোড় ঘুরতেই কানে এল হই-চই, রাগত চিৎকার।

অন্যপাশে এসে টাকিকে দেখতে পেল মুসা আর কিশোর। ওদের দেখে চিৎকার করে বলল, জলদি যাও! রবিনকে পেটাচ্ছে মরফি।

দৌড়ে গেল দুই গোয়েন্দা। রবিনের কলার চেপে ধরেছে মরফি। বিশালদেহী ছেলেটার সঙ্গে পাত্তাই পেল না রবিন। তাকে শূন্যে তুলে নিয়ে গিয়ে ঠেসে ধরল টাইলস বসানো দেয়ালে।

ছাড়ো! ছাড়ো আমাকে ছাড়া পাওয়ার জন্যে ছটফট করছে রবিন।

খলখল করে হেসে উঠল মরফি, না ছাড়লে কি করবে? মারবে? মারো! মারো!

রবিনকে মাটিতে নামাল সে। কাঁধ দিয়ে প্রচণ্ড এক গুলো লাগাল রবিনের বুকে। কলার ছাড়ল না। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল একটা লকারের কাছে। হ্যাঁচকা টানে লকারের দরজা খুলে তার মধ্যে ঠেসে ভরতে শুরু করল।

অ্যাই, মরফি! ও কি করছ! এতক্ষণে যেন সংবিত ফিরে পেল কিশোর। ধমকে উঠল, ছাড়ো ওকে! রবিনকে সাহায্য করার জন্যে এগোতে গিয়েও কি ভেবে এগোল না। থমকে গিয়ে মুসার দিকে তাকাল, হাঁ করে চেয়ে দেখছ কি? ছাড়াও না ওকে! শিক্ষা দিয়ে দাও মরফিকে!  

আ-আ-আমি! এখানে সবার সামনে তোতলানো নিরাপদ নয়, ভুলে গেছে মুসা। পিছিয়ে গেল এক পা।

যাও! যাও! মুসাকে ঠেলে দিল কিশোর। একমাত্র তুমিই ওর সঙ্গে পারবে।

হা হা, যাও না, হিরো মিয়া, টাকি বলল। তুমি তো কোন কিছুকেই ডরাও না। গায়ে-গতরেও বড়ই। একচোট দেখিয়ে দাও মরফিটাকে। বড় বাড় বেড়েছে পাজিটার। যাকে পায় তাকেই মারে।

ঢোক গিলল মুসা, কিন্তু…আমি…আমি…

আরে আমি আমি করছ কেন? তোমার বন্ধুকে পেটাচ্ছে দেখতে পাচ্ছ না? বন্ধুর জন্যে মায়া-দরদ নেই? নাকি ভয় পেয়ে গেলে?

যাও, আবার মুসার পিঠে ঠেলা মারল কিশোর। মরফি তোমার কাছে নস্যি। তুষের মত উড়িয়ে দাও ওকে। ভেঙে চুরচুর করো!

লকারে ঢুকিয়ে রবিনকে ঠেলতেই আছে মরফি। বুকে হাত দিয়ে ঠেসে ধরে রেখে বলল, বলল, গু খাই!  

তা কেন বলব! হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রবিন। ফুসফুসে চাপ পড়াতে গলা দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ বেরোল।

হাতটাকে মুঠো করে তার বুকে প্রচণ্ড এক গুতো মারল মরফি। ব্যথায় কাতরে উঠল রবিন। আবার বলল মরফি, বলো জলদি, গু খাই! নইলে ছাড়ব না।

না, বলব না!

তাতে যেন খুশিই হলো মরফি। রবিনকে অত্যাচার করার সুযোগ পেল। ওর পেটে ঠেসে ধরল মুঠো পাকানো হাতটা। জোরে চাপ দিতে লাগল।

আর্তনাদ করে উঠল রবিন।

তুমি কি, মুসা? তিরস্কার করল কিশোর। এখনও যাচ্ছ না! প্রচণ্ড এক ধাক্কা মারল মুসার পিঠে।

মরফির গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল মুসা।

হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল মরফি। কোনমতে সামলে নিল। ঝাড়া মেরে পিঠ থেকে সরিয়ে দিল মুসাকে। তারপর সোজা হয়ে ঘুরে দাঁড়াল।

পিছিয়ে গেল মুসা।

হেসে উঠল টাকি, ভয় পেয়েছে, ভয় পেয়েছে, তোতলাটা ভড়কে গেছে…

কিন্তু ওর মুখের কথা শেষ হলো না। মাথা নিচু করে তীব্র গতিতে ছুটে গেল মুসা। মরফির পেটে লাগল মাথাটা। হুক করে সমস্ত বাতাস বেরিয়ে। এল মরফির মুখ দিয়ে। ব্যথায় নীল হয়ে গেল মুখ। নিগ্রোর খুলির ভয়ঙ্কর আঘাতে বাঁকা হয়ে গেছে। দমল না তারপরেও। হাত বাড়াল মুসার কলার ধরার জন্যে। সরে গেল মুসা। প্রচণ্ড রাগে অন্ধ হয়ে তাকে ধরার জন্যে ছুটে এল সে।

চট করে এক পাশ থেকে একটা পা সামনে বাড়িয়ে দিল কিশোর। কারও চোখে পড়ল না সেটা। মরফিরও না। হোঁচট খেয়ে উড়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ল সে।

ছেলেমেয়েরা ঘিরে দাঁড়িয়েছে ওদের। দুই দলেরই সমর্থক আছে। হট্টগোল করছে সবাই। চেঁচিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে।

মরফি পড়ে যেতেই হাততালি দিতে শুরু করল মুসার পক্ষের সমর্থকরা। হাসতে লাগল। শিস দিল।

কাবু হয়ে গেছে মরফি। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে দাঁড়াল। মুখ টকটকে লাল।

হঠাৎ জেগে ওঠা আবেগ কেটে গেছে মুসার। ভয়টা ফিরে এসেছে। মরফি যখন হুমকি দিল, দেখে নেব আমি! ছাড়ব না!-এক পা পিছিয়ে গেল মুসা।

সামনে এসে দাঁড়াল কিশোর। এখনও বাহাদুরি? বড় বড় কথা! যাও যাও, যা পারো কোরো। মুসা আমান কাউকে ভয় পায় না।

জ্বলে উঠল মরফির চোখ। পারলে কিশোরকেই মেরে বসে। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারল না। লকার থেকে রবিনও বেরিয়ে চলে এসেছে ততক্ষণে। তিনজনের সঙ্গে কোনমতেই পারবে না বুঝে মানে মানে কেটে পড়ল ওখান থেকে।

তার সঙ্গে চলে গেল তার সমর্থকরা।

বাকি সবাই প্রচুর চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। কেউ শতমুখে প্রশংসা করতে লাগল মুসার। কেউ বা এসে পিঠ চাপড়ে দিয়ে আন্তরিকতা প্রকাশ করল।

চারপাশে তাকিয়ে টাকিকে কোথাও দেখল না কিশোর। মুচকি হাসল সে। টেরির আরেকটা প্ল্যান বরবাদ হয়েছে।

*

লাঞ্চের পর আবার ক্লাস। সবাই আরেকবার হিরোর সম্মান দিতে লাগল মুসাকে। মেজাজটা তাই ওর ফুরফুরে লাগছে। আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতে শুরু করেছে। যে ভাবে এগোচ্ছে, এখানে তাকে তোতলা মুসা বলার সাহসই পাবে না হয়তো আর কেউ। বিশেষ করে মরফিকে পেটানোর পর।

কিন্তু ক্লাস শেষে এমন একটা ঘটনা ঘটল, আবার চুরমার হয়ে গেল তার বিশ্বাস। ফিরে এল পুরানো ভয়টা। ঘণ্টা বাজার পর ক্লাস থেকে বেরিয়ে লকারের দিকে এগোচ্ছে, হঠাৎ কানে এল টেরি আর টাকির কথা। নিজের নাম শুনে থমকে দাঁড়াল মুসা। কান খাড়া করে শুনতে লাগল।

টাকি বলছে, সত্যি করবে?

নিশ্চয়ই, জবাব দিল টেরি। মরফি হাদাটা যে এমন করে কেঁচে দেবে সব কে জানত!…তবে আমি কেলোটাকে মু-ম্মুসা না বানিয়ে ছাড়ব না।

একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে মুসা। মনে হলো, টেরি আর টাকি তাকে দেখেছে। তাই নিজেরা কথা বলার ছলে ইচ্ছে করেই এ সব শোনাচ্ছে।

কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, টেরি, টাকি বলল। এত ভয়ানক!…নাহ এতটা করা ঠিক হবে না।

এতটাই করব! শুধু তাই না, দরকার হলে আরও ভয়ঙ্কর কিছু করতেও দ্বিধা করব না আমি।

.

০৯.

 কয়েক রাত পর। মুসাদের ডাইনিং রূমের টেবিলে হুমড়ি খেয়ে আছে তিন গোয়েন্দা। সবাই মিলে হোমওঅর্ক করছে। মুসার বাবা-মা বাড়ি নেই। বাড়িতে সে একা। তাই ফোন করে আনিয়ে নিয়েছে দুই বন্ধুকে। তিনজনেই গভীর মনোযোগে অঙ্কের সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত।

এই সময় দরজার ঘণ্টা বাজল। এতটাই চমকে গেল মুসা, কাগজে চাপ লেগে পেন্সিলের সীস ভেঙে গেল। হঠাৎ করেই মনে হলো তার, নিশ্চয় টেরির দল। আবার এসেছে তার সাহস পরীক্ষা করতে।

এত আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই-মনে মনে নিজেকে বোঝাল মুসা। দেখাই যাক না আগে কে এসেছে।

উঠে দরজা খুলতে এগোল সে। পেছন পেছন চলল কিশোর।

দরজা খুলে দিল মুসা। ঠিকই অনুমান করেছে সে। টেরির বাহিনীই। ঘরে ঢুকল টাকি। গায়ে নীল জ্যাকেট। মাথায় উলের স্কি হ্যাট। বাপরে বাপ, বাইরে কি ঠাণ্ডা!

টান দিয়ে টুপিটা খুলে নিয়ে অস্বস্তিভরে চারপাশে তাকাতে লাগল সে। মুসা, সত্যি ভাই, আমি দুঃখিত। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি ওকে। থামাতে পারিনি?  

তাই নাকি? মুসার আগেই জবাব দিল কিশোর, কিসের দুঃখ? কাকে থামাতে পারনি।

উঠে এসে রবিনও দাঁড়াল ওদের পেছনে। আরে ধূর, কিসের থামাথামি! হাত নেড়ে বলল সে। বুঝতে পারছ না, নাটক করে মুসাকে ঘাবড়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।

কিন্তু তাতে কোনই লাভ হবে না, বুড়ো আঙুল নাড়ল কিশোর। ঘটে সামান্যতম ঘিলু থাকলে এতদিনে বুঝে যাওয়া উচিত ছিল ওদের, মুসাকে ওরা ভয় দেখাতে পারবে না।

 কিন্তু, দেখো, কিশোর, শান্তকণ্ঠে বলল টাকি, মুসা তোমার বন্ধু। উত্তেজিত করে করে এ ভাবে ওকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়া তোমার উচিত হচ্ছে না। তোমরা জানো না টেরি এবার কি করতে চলেছে। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি ওকে। শুনল না। সে করবেই করবে। এ বাজি তাকে জিততেই হবে।

অজানা আশঙ্কায় মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল শিহরণ বয়ে গেল মুসার। সেদিন স্কুলে আড়ালে দাঁড়িয়ে শোনা কথাগুলো মনে পড়ে গেল। ভাঁজ হয়ে আসতে চাইল হাট। টাকি যাতে বুঝতে না পারে, সেভাবে সরে গিয়ে একটা কাউচের হেলান খামচে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ভাবছে, বাদ দেয়া দরকার এ খেলা! টেরিকে বিশ্বাস নেই। বাজি জেতার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে সে। কি করবে কে জানে!

আমি টেরির সঙ্গে একমত হতে পারলাম না বলেই তোমাদের সতর্ক করে দিতে এলাম, টাকি বলল। ভয়ানক কোন বিপদ যদি ঘটে যায় পরে আমাকে দোষ দিতে পারবে না।

ঢোক গিলল মুসা।

ভয়ানক কোন বিপদে যদি পড়ে কেউ, শীতল কণ্ঠে জবাব দিল কিশোর, তো পড়বে তোমার ওস্তাদ শুঁটকি আর বাকি চামচাগুলো। মুসার কিছু হবে না। তোমার ওস্তাদকে গিয়ে বলে দাও, ইচ্ছে সে করতে পারে। তবে এবার আর টাকা মাপ করব না আমরা। দুশো ডলার যেন রেডি রাখে।

টাকাটা বরং তোমরাই নিয়ে যেয়ো পকেটে করে। মুসার দিকে তাকাল টাকি, মুসা, মনে রেখো বিপদটা তোমার হবে, আর কারও না।

কটাক্ষটা যে তাকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়েছে, বুঝতে পারল কিশোর। তুমি আসলে বেশি কথা বলো। কে বলেছে তোমাকে ভালমানুষী দেখাতে আসতে? মুসা চ্যালেঞ্জটা নিয়েছে, যত বিপজ্জনকই হোক। ওসব বোলচাল না ঝেড়ে কি করতে হবে এখন তাকে, সেটা বলো।

হতাশ ভঙ্গিতে জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল টার্কি। টুপিটা মাথায় দিল আবার। যাবেই?

মাথা ঝাঁকাল কিশোর, হ্যাঁ।

বেশ। কোট-টোটগুলো পরে এসো আমার সঙ্গে।

*

টাকির সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা। দরজায় তালা দিল মুসা। ওর বাবার কাছে বাড়তি চাবি আছে। দরজা খুলতে অসুবিধে হবে না।

অক্টোবরের ঠাণ্ডা রাত। তা ছাড়া শীতটা এবার তাড়াতাড়ি পড়াতে ঠাণ্ডাটা জাকিয়ে বসেছে। তার ওপর রয়েছে ঝোড়ো বাতাস, লনের শুকনো ঝরা পাতায় ঘূর্ণি তুলছে। পাতাহারা শূন্য গাছগুলো বাতাসের ঝাপটায় যেন পাতার শোকেই গুঙিয়ে উঠছে বারবার, বিচিত্র শব্দে আর্তনাদ করছে।

বৃষ্টির দুচারটা ঠাণ্ডা ফোঁটা এসে পড়ল মুসার কপালে। গায়ের কালো পারকাটার জিপার টেনে দিল সে। মাথায় তুলে দিল হুড।

টাকির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার মোড়ে চলে এল তিন গোয়েন্দা। সশব্দে বড় রাস্তা ধরে চলে গেল একটা বাস। ভেতরে যাত্রী মাত্র। দুতিনজন।

বাসটা চলে গেলে নির্জন রাস্তা পেরোল ওরা। হাঁটতে থাকল।

কোথায় চলেছে জানে মুসা। আগেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে টেরি। বলার সময় টেরির তিলে ভরা মুখটার উজ্জ্বলতা কল্পনা করে মনে মনে দমে গেল সে।

একটা পার্কিং লটের পেছনে পাতাবাহারের বেড়ার কাছে এসে থামল ওরা। ওপাশে অন্ধকার লম্বা একটা বিল্ডিং। সামনে কাঠের সাইনবোর্ডের ওপর জ্বলছে হলুদ স্পটলাইট। লেখাগুলো পড়া যায়: দা এন্ডলেস স্লীপ!

অনন্ত ঘুম! বাংলায় বিড়বিড় করল কিশোর।

ফিরে তাকাল রবিন। বুঝতে পারল, বোর্ডের লেখাগুলোর বাংলা অনুবাদ করেছে কিশোর। চুপ করে রইল।

ফিউনরল পারলারটার মালিক টেরির বাবা।

বাড়িটার দিকে তাকিয়ে গায়ে কাঁটা দিল মুসার। ভেতরে কি লাশ আছে এখন? মানুষের মৃতদেহ? নিশ্চয় আছে-নিজের প্রশ্নের জবাব নিজেই দিল মনকে মুসা। ফিউনরল পারলার মানেই তো লাশ রাখা, কবর দেয়ার আগে গোসল করানো, কাপড় পরানো, সুগন্ধি মাখিয়ে কফিনে ভরার জন্যে তৈরি করার জায়গা।

পারকার পকেটে যতটা যায়, হাত দুটো ঠেলে ঢোকাল সে। পাশে দাঁড়ানো কিশোরের দিকেও তাকাতে ইচ্ছে করছে না। টেরিকে এতখানি আগে বাড়তে দেয়ার জন্যে সে-ই দায়ী। কি দরকার ছিল এ সব বাজি ধরাধরির!

অ্যাই যে, এসে গেছে আমাদের সুপারহিরো! কানের কাছে কথা বলে উঠল কডি, চাপড়ে দিল মুসার পিঠ।

এত চমকে গেল মুসা, মনে হলো দশ হাত শূন্যে লাফিয়ে উঠেছে।

ছায়া থেকে বেরিয়ে এল নিটু আর হ্যারল্ড। কডির পাশে দাঁড়াল।

 টেরি কোথায়? জানতে চাইল কিশোর।

এক ঝলক ঝোড়ো বাতাস কাঁপুনি তুলল পাতাবাহারের বেড়ায়। আধো অন্ধকারে বেড়ার ওপরের অংশের কাঁপুনি দেখে মনে হলো এঁকেবেঁকে চলে গেল একটা বিরাট সাপ। বাতাসের ঝাপটায় মাথার হুড পেছনে খসে পড়ল মুসার। সঙ্গে সঙ্গে কপালে লাগল বৃষ্টির ফোঁটা।

টেরিকে আটকে ফেলেছে, জবাব দিল টাকি।

আটকে ফেলেছে? মুসা অবাক। কই, আগে তো বলনি?

মাথা ঝাঁকাল টাকি, হ্যাঁ, আটকে ফেলেছেন, ওর বাবা। চুপি চুপি বেরোতে যাচ্ছিল টেরি, ধরা পড়ে গেছে।

মজাটা আর উপভোগ করতে পারল না আজকে, হেসে বলল কডি।

 মজা না ছাই! তেতো হয়ে গেছে মুসার মন।

চিন্তা কোরো না, মুসা, কড়ি বলল। ত্রাহি চিৎকার করে কিভাবে ছুটে পালিয়েছ তুমি, মুখে বলেই সেটার ছবি দেখিয়ে দেব আমরা ওকে।

ত্রাহি চিৎকার মুসা নয়, তোমরা করবে, গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল কিশোর। সেই সঙ্গে মাতম। চাপড়ে চাপড়ে রক্তাক্ত করে ফেলবে কপাল, এতগুলো টাকা পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার শোকে।

ফিউনরল পারলারের দিকে তাকাল আবার মুসা। সাধারণ দেখতে, অনেক লম্বা, একতলা একটা বাড়ি। অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু মুসার কাছে ভয়ানক অস্বাভাবিক লাগল। কালো, অশুভ, ভুতুড়ে একটা বাড়ি-হরর সিনেমার বাড়িগুলোর মত।

ভেতরে সারি দিয়ে রাখা কফিনগুলো কল্পনা করল সে। ধাতব টেবিলে চিত করে ফেলে রাখা অসংখ্য লাশ।…কফিনের ডালা একের পর এক উঠে যেতে শুরু করল…দেখা দিল পচে বিকৃত হয়ে যাওয়া লাশের মাথা… সবুজ হয়ে যাওয়া লাশগুলো বেরিয়ে আসতে লাগল…টলছে, গোঙাচ্ছে। এগিয়ে আসতে লাগল মাংস খসে পড়া ফোলা ফোলা হাত বাড়িয়ে দিয়ে। বড় বড় ময়লা নখওয়ালা আঙুলগুলো বাঁকা করে রেখেছে তাকে খামচে ধরার জন্যে। বসে যাওয়া কোটরে নিষ্প্রাণ চোখগুলোর দিকে তাকানো যায় না…।

থামো! আর এগিয়ে না! নিজেকে ধমকে উঠল মুসা। মনে মনে। বেপরোয়া কল্পনার রাশ টেনে থামানোর চেষ্টা করল।

ঢোক গিলল একবার। মাথা ঝাড়া দিল। হাত দিয়ে মুছল বৃষ্টি ভেজা কপাল। টাকির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কি করতে হবে আমাকে, বলো!  

.

১০.

মুসার প্রশ্ন হাঁ করিয়ে দিল টাকি আর তার তিন দোস্তকে। সবার আগে সামলে নিল কডি। নিষ্ঠুর, শীতল হাসি হাসল। সে তাতে যোগ দিল নিটু আর হ্যারল্ড।

টাকি হাসল না। গম্ভীর হয়ে বলল, আমি তোমাকে এখনও কাজটা না করতে অনুরোধ করব, মুসা।

কেন, তোমার হঠাৎ এত মুসার জন্যে দরদ উথলে উঠল কেন? কিশোর বলল। ওর নাটকে কান দিয়ো না, মুসা। কথা বুলে ভয় দেখিয়েই ও তোমাকে কাবু করে ফেলার চেষ্টা করছে।… শোনো টাকি, আমি বলি কি, অকারণে সময় নষ্ট না করে টাকাগুলো দিয়ে বিদেয় হও। টেরিকে গিয়ে বোলো, বাজিফাজি খতম। কত আর বলব, মুসা কোন কিছুকে ভয় করে না।

না দেখে কিছু বিশ্বাস করব না। হাত তুলে বাড়িটা দেখাল টাকি। মুসা, পেছনের ওই জানালাটা দেখতে পাচ্ছ?  

পাতাবাহারের ওপর দিয়ে গলা লম্বা করে তাকাল মুসা। সবগুলো জানালাই অন্ধকার। কোনটাতে আলো নেই। সমস্ত বাড়িটায় আলো বলতে শুধু ওই একটাই, বোর্ডের ওপরের স্পটলাইট। এ পরিবেশে হলুদ আলোটাকেও কেমন ভুতুড়ে লাগছে।

দেখছ না জানালাটা? জিজ্ঞেস করল টাকি।

 মাথা ঝাঁকাল মুসা।

 ওটা দিয়ে ঢুকতে হবে তোমাকে।

ঢুকতে হবে!

 কেন, ঘাবড়ে গেলে?

হেসে উঠল টাকি বাদে টেরির বাকি তিন সহচর।

আমি বলতে চাইছি, কাজটা বেআইনি হবে না? কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল মুসা। টেরির বাবা কি জানেন?

আরে নাহ! পাগল নাকি! টাকি বলল।

কডি বলল, টেরির বাবা জানলে আমাদের সবাইকে ধরে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবেন।

যেন মস্ত এক রসিকতা করে ফেলেছে কডি। হো হো করে হেসে উঠল নিটু আর হ্যারল্ড। পিঠে চাপড় মারতে শুরু করল পরস্পরের।

আস্তে! সাবধান করল টাকি। অত জোরে হেসো না। কেউ শুনে ফেলবে।

ধূর, এ সব বাঁচালের দলের সঙ্গে কে গেম খেলতে যায়! রেগে উঠল কিশোর। এই টাকি, আমাদের টাকা দিয়ে দাও, আমরা চলে যাই। বসে বসে এখানে যত খুশি প্যাচাল পাড়োগে তোমরা। আমি সারারাত ঠাণ্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না।

কাজটা সহজ, মুসার কাঁধে হাত রেখে আন্তরিক স্বরে বলল টাকি। বাড়ির পেছনের জানালাটার দিকে ইঙ্গিত করল আবার। জানালাটা খুলবে। চৌকাঠে উঠে বসবে। লাফ দিয়ে নামবে নিচে। সামনে প্রথম যে কফিনটা পড়বে সেটার মধ্যে ঢুকে শুয়ে পড়বে।

কিন্তু…কিন্তু… বলতে গেল মুসা। কিশোরের জন্যে পারল না।

কিশোর বলল টাকিকে, ব্যাস, এই? শুধু এটুকুর জন্যে এত ভণিতা? এ কোন কাজ হলো! নাহ, টাকার কোন মায়াদয়া নেই তোমাদের।

কিশোর, শোনো… আবার বলতে গেল মুসা, কফিনে ঢোকার কথা শুনেই ঘাবড়ে গেছে। ক-ক…।

শুনল না কিশোর। টাকিকে বলল, ভয় দেখানোর মত আর কিছুই কি মাথায় আসে না তোমাদের? না এলে হাতজোড় করে সাহায্য চাও, আমিই নাহয় বলে দেব একটা কিছু।

কিশোরের কথাবার্তায় অবাক হচ্ছে রবিন। টেরির দলকে উস্কে দিয়ে মুসাকে বার বার এ ভাবে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে কেন কিশোর? কারণটা কি?

কিশোর বলল, মুসা, যাও না, চট করে সেরে চলে এসো কাজটা। আজ আর টাকা না নিয়ে ছাড়ছি না ওদের কাছ থেকে। দুই-দুইবার মাপ করলাম, আর কত। যাও, যাও।

টাকিকে জিজ্ঞেস করল মুসা, আমি ঢুকলাম কিনা, কি করে জানছ তোমরা?

আমরা চেয়ে থাকব, জবাব দিল টাকি। পেছনের জানালায় দাঁড়িয়ে সবাই দেখব আমরা।

টেরির বাবার লোক যদি আমাদের ধরে ফেলে?

ধরবে না। আর কোন মানুষই থাকে না এখানে, লাশগুলো বাদে।

 লাশকে নিশ্চয় ভয় পাও না তুমি? ফ্যাকফাঁক করে হাসল কডি।

হ্যাঁ, পাই!-মুসা বলল। তবে শুনিয়ে নয়, মনে মনে। লাশকে ভয় পায় না কে!

তার কথার সমর্থনেই যেন আরেক ঝলক বাতাস কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। পাতাবাহারের বেড়াকে। বাতাসের শব্দকে লাগল প্রেতাত্মার দীর্ঘশ্বাসের মত। কেঁপে উঠল মুসা। কপালে আঘাত হানছে বৃষ্টির ফোঁটা। বৃষ্টি বেড়েছে। হুডটা আবার তুলে দিল সে।

যাও, মুসা, তাগাদা দিল কিশোর, কাজটা যত তাড়াতাড়ি পারো শেষ করে চলে এসো। বাড়ি যাই। এই ছাগলগুলোর চেহারা দেখতেও বিরক্ত লাগছে আমার।

দেখো, মুখ সামলে কথা বলো! রেগে গেল কডি।

কেন, মারবে নাকি? মরফির কি অবস্থা করে ছেড়েছে মুসা, বলে বলে কল্পনায় ছবি দেখায়নি তোমাদের দোস্ত টাকি? খোঁচাটা ঠিকই দিয়ে দিল কিশোর। তোমার ওস্তাদ টেরিই তো ঘুস দিয়ে পাঠিয়েছিল ওকে, নাকি?…এসো হয়ে যাক তাহলে আরেকটা বাজি, মারামারির…

কিশোর, প্লীজ! নতুন আর কোন চ্যালেঞ্জে যেতে চায় না মুসা।

 থেমে গেল কিশোর।

 বাড়িটার দিকে তাকাল মুসা। পারবে কি? লাশ ভর্তি ঘরে ঢুকে কফিনের মধ্যে শুতে পারবে?

বেড়ার কাছ থেকে বাড়িটা মাইলখানেক দূরে মনে হলো তার। যে হারে পা কাঁপছে হেঁটে জানালা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে কিনা সন্দেহ হলো।

সত্যি কথাটা বলে ফেল, মুসা!-ভাবল সে। জানিয়ে দাও ওদের, এ কাজ তুমি পারবে না। বলে দাও, এত সাহস তোমার নেই। ল্যাঠা চুকে যাক। কিন্তু এর পরে যে কি হবে ভাবতেই দমে গেল সে। এতগুলো টাকা গচ্চা যাবে। তার ওপর রয়েছে তোতলা মুসা খেতাব নিয়ে টিকে থাকা।

না, মুসা, কোন উপায় নেই আর তোমার। ভাল ফাঁদে জড়িয়েছ তুমি। সব রাগ গিয়ে পড়ল কিশোরের ওপর। কিশোরই তাকে এ রকম করে ফাঁসিয়েছে! টেরির দলের সঙ্গে অতটা বাড়াবাড়ির কি কোন প্রয়োজন ছিল?

আমি যাচ্ছি, বলল সে। কপালের ওপর থেকে হুডটা সরিয়ে দিল। বাতাসের অনুকূলে মাথা নিচু করে রেখে, গাছের বেড়া ফাঁক করে ঠেলে বেরিয়ে এল অন্যপাশে। পার্কিং লটে ঢুকল।

আধাআধি গিয়েছে, এই সময় হঠাৎ জ্বলে উঠল উজ্জ্বল আলো। সরাসরি তার গায়ে এসে পড়ল।

Super User