বিজয়া। তবে এ-ও তিনিই স্থির করুন। আমার বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই।

দয়াল। (সবিস্ময়ে) এ কেমনধারা জবাব হলো মা! এ বললে আমরা কাজের জোর পাব কোথা থেকে?

বিজয়া। হাঁ দয়ালবাবু, সেদিন নরেনবাবুকে কি আপনি একতাড়া চিঠি দিয়েছিলেন?

দয়াল। দিয়েছি মা। সেদিন হঠাৎ দেখি একটা ভাঙ্গা দেরাজের মধ্যে এক বাণ্ডিল পুরানো চিঠি। তাঁর বাবার নাম দেখে তাঁর হাতেই দিলাম। কোন দোষ হয়েছে কি মা?

বিজয়া। না দয়ালবাবু, দোষ হবে কেন? তাঁর বাবার চিঠি তাঁকে দিয়েছেন এ ত ভালোই করেছেন। চিঠিগুলো কি আপনি পড়েছিলেন?

দয়াল। (সবিস্ময়ে) আমি? না, না, পরের চিঠি কি কখনো পড়তে পারি?

বিজয়া। চিঠির সম্বন্ধে আপনাকে তিনি কি কিছু বলেন নি?

দয়াল। একটি কথাও না। কিন্তু কিছু জানবার থাকলে তাঁকে জিজ্ঞেসা করে আমি কালই তোমাকে বলতে পারি।

বিজয়া।কালই বলবেন কি করে? তিনি ত আর এদিকে আসেন না।

দয়াল। আসেন বৈ কি। আমাদের বাড়িতে রোজ আসেন।

বিজয়া। রোজ? আপনার স্ত্রীর অসুখ কি আবার বাড়লো? কৈ, সে কথা ত আপনি একদিনও বলেন নি?

দয়াল। (হাসিয়া) না মা, এখন তিনি বেশ ভালোই আছেন। তাই বলিনি। নরেনের চিকিৎসা এবং ভগবানের দয়া।

[হাতজোড় করিয়া উদ্দেশে নমস্কার করিলেন]

বিজয়া। ভালো আছেন, তবু কেন তাঁকে প্রত্যহ আসতে হয়?

দয়াল। আবশ্যক না থাকলেও জন্মভূমির মায়া কি সহজে কাটে? তা ছাড়া, আজকাল ওঁর কাজকর্ম নেই, সেখানে বন্ধু-বান্ধব বিশেষ কেউ নেই—তাই সন্ধ্যেবেলাটা এখানেই কাটিয়ে যান। আমার স্ত্রী ত তাঁকে ছেলের মত ভালবাসেন। ভালবাসার ছেলেও বটে। এমন নির্মল, এমন স্বভাবতঃ ভদ্রমানুষ আমি কম দেখেচি মা। নলিনীর ইচ্ছে সে বি. এ. পাস করে ডাক্তারি পড়ে। এ বিষয়ে তাকে কত উৎসাহ কত সাহায্য করেন তার সীমা নেই। ওঁর সাহায্যে এরই মধ্যে নলিনী অনেকগুলো বই পড়ে শেষ করেছে। লেখাপড়ায় দু’জনের বড় অনুরাগ।

বিজয়া। তা হোক, কিন্তু আপনি কি আর কিছু সন্দেহ করেন না?

দয়াল। কিসের সন্দেহ মা?

বিজয়া। আমার মনে হয় কি জানেন দয়ালবাবু?

দয়াল। কি মনে হয় মা?

বিজয়া। আমার মনে হয় নলিনীর সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব স্পষ্ট করে প্রকাশ করা উচিত।

দয়াল। ও—এই বলচ? সে আমারও মনে হয়েছে মা, কিন্তু তার ত এখনো সময় যায়নি। বরঞ্চ দু’জনের পরিচয় আরো একটু ঘনিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত সহসা কিছু না বলাই উচিত।

বিজয়া। কিন্তু নলিনীর পক্ষে ত ক্ষতিকর হতে পারে। তাঁর মনস্থির করতে হয়ত সময় লাগবে, কিন্তু ইতিমধ্যে নলিনীর—

দয়াল। সত্যি কথা। কিন্তু আমার স্ত্রীর কাছে যতদূর শুনেচি তাতে,—না না নরেনকে আমরা খুব বিশ্বাস করি। তাঁর দ্বারা যে কারো কোন ক্ষতি হতে পারে, তিনি ভুলেও যে কারো প্রতি অন্যায় করতে পারেন, এ আমি ভাবতেই পারিনে। কিন্তু একি, কথায় কথায় যে তুমি অনেক দূর এগিয়ে এসেছ। এতখানিই যদি এলে, চল না মা, তোমার এ বাড়িটাও একবার দেখে আসবে। নলিনীর মামী কত যে খুশী হবে তার সীমা নেই।

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়