[কালীপদ প্রবেশ করিল]
কালীপদ। (নরেনকে দেখাইয়া) উনি চা খাবেন না।
বিজয়া। (কালীপদকে) কেন খাবেন না? যা তুই ঠিক করে আনতে বলে দি গে।
[কালীপদ প্রস্থান করিল
নরেন। আমাকে মাপ করবেন, আজ আমি চা খেতে পারব না।
বিজয়া। কেন পারবেন না?—আপনাকে নিশ্চয় খেয়ে যেতে হবে!
নরেন। (মাথা নাড়িয়া) না না, সে ঠিক হবে না। সেদিন তাঁদের কথা দিয়েছিলুম আজ এসে তাঁদের বাড়িতে খাব। না খেলে তাঁরা বড় দুঃখ করবেন।
বিজয়া। তাঁরা কে? দয়ালবাবুর স্ত্রী, না নলিনী?
নরেন। দুজনেই দুঃখ পাবেন। হয়ত আমার জন্যে আয়োজন করে রেখেচেন।
বিজয়া। আয়োজনের কথা থাক, কিন্তু দুঃখ পেতে বুঝি শুধু তাঁরাই আছেন, আর কেউ নেই নাকি?
নরেন। আর কেউ কে, দয়ালবাবু? ( হাসিয়া ) না না, তিনি বড় শান্ত মানুষ—সাদাসিধে নিরীহ লোক। তা ছাড়া তাঁকে ত এ বাড়িতেই দেখলুম। তাঁকে ভয় নেই, কিন্তু ওঁরা বড় রাগ করবেন।
বিজয়া। ওঁরা কারা নরেনবাবু? ওঁরা কেউ নেই—আছেন শুধু নলিনী। এখানে খেয়ে গেলে তিনিই রাগ করবেন। বলুন তাঁকেই আপনার ভয়, বলুন এই কথাই সত্যি।
নরেন। রাগ করতে আপনারা কেউ কম নয়। আপনাকে কথা দিয়ে সেখানে খেয়ে এলে আপনিই কি রাগ কম করতেন নাকি?
বিজয়া। হাঁ, তাই যান। শিগগির যান, আপনার অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর আপনাকে আটকাব না।
নরেন। হাঁ, দেরি হয়ে গেছে বটে। ফিরে যাবার সাতটার ট্রেনটা হয়ত আর ধরতে পারব না।
বিজয়া। পারবেন না কেন? এখন থেকে সাতটা পর্যন্ত আপনাকে ধরে বসিয়ে নলিনী খাওয়াবেন নাকি? এখানে ত একটুখানি খেয়েই—না না করতে থাকেন, শত উপরোধেও কথা রাখেন না, উপেক্ষা করে উঠে পড়েন।
নরেন। একেবারে উলটো অভিযোগ? মানুষকে বেশী খাওয়ানোর রোগ আপনার চেয়ে সংসারে কারো আছে নাকি? উপেক্ষা করা? আপনাকে উপেক্ষা করে কারো নিস্তার আছে? ভয়েই ত সারা হয়ে যায়।
বিজয়া। কিন্তু আপনার ত ভয় নেই। এই ত স্বচ্ছন্দে উপেক্ষা করে চলে যাচ্চেন।
নরেন। উপেক্ষা করে নয়, তাঁদের কথা দিয়েছি বলে। আর খাওয়াই শুধু নয়, একটা বইয়ের কতকগুলো জিনিস নলিনীর বেধেছে সেইগুলো তাঁকে বুঝিয়ে দিতে হবে।
বিজয়া। কি বই?
নরেন। একটা ডাক্তারি বই। তাঁর ইচ্ছে বি. এ. পাসের পরে মেডিকেল কলেজে গিয়ে ভর্তি হন। তাই সামান্য যা জানি অল্পস্বল্প তাঁকে সাহায্য করি।
বিজয়া। আপনি কি তাঁর প্রাইভেট টিউটার? মাইনে কি পান?
নরেন। এ বলা আপনার অন্যায়। আপনার কথাবার্তায় আমার প্রায় মনে হয় তাঁর প্রতি আপনি প্রসন্ন নন। কিন্তু তিনি আপনাকে কত যে শ্রদ্ধা করেন জানেন না। এখানে এসে পর্যন্ত যত ভালো কাজ আপনি করেছেন সমস্ত তাঁর মুখে শুনতে পাই। আপনার কত কথা। এক কলেজে পড়তেন আপনারা — আপনি কলেজে আসতেন মস্ত একটা জুড়ি–গাড়ি করে, মেয়েরা সবাই চেয়ে থাকত। নলিনী বলছিলেন, যেমন রূপ তেমনি নম্র আচরণ,—পরিচয় ছিল না, কিন্তু তখন থেকে আমরা সবাই বিজয়াকে মনে মনে ভালবাসতুম। এমনি কত গল্প হয়।
নাটক : বিজয়া Chapter : 3 Page: 52
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 552