বিজয়া। কেবল গল্পই যদি হয় আপনি পড়ান কখন?
নরেন। পড়াই কখন? আমি কি তাঁর মাস্টার, না পড়ানোর ভার আমার ওপর? আপনার কথাগুলো সব এত বাঁকা যে মনে হয় সোজা কথা বলতে কখনো শেখেন নি।
বিজয়া। শিখব কি করে, মাস্টার ত ছিল না।
নরেন। আবার সেই বাঁকা কথা!
বিজয়া। (হাসিয়া ফেলিয়া) কিন্তু আপনি যাবেন কখন? খাওয়া আজ না হয় না–ই হলো, কিন্তু পড়ানো না হলে যে ভয়ানক ক্ষতি!
নরেন। আবার সেই! চললুম। (টুপিটা হাতে লইয়া কয়েক পদ অগ্রসর হইয়া দ্বারের নিকটে সহসা থমকিয়া দাঁড়াইয়া) একটা কথা বলবার ছিল, কিন্তু ভয় হয় পাছে রাগ করে বসেন।
বিজয়া। রাগই যদি করি তাতে আপনার ভাবনা কি? দেনা শোধ করুন বলে চোখ রাঙ্গাবো সে জো–ও নেই। ভয়টা আপনার কিসের?
নরেন। আবার তেমনি বাঁকা কথা। কিন্তু শুনুন। এখানে এসে পর্যন্ত আপনি বহু সৎকার্য করেছেন। কত দুঃস্থ প্রজার খাজনা মাপ করেছেন, কত দরিদ্রকে দান করেছেন, ধর্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন—
বিজয়া। এ-সব শোনালে কে? নলিনী?
নরেন। হাঁ, তাঁর মুখেই শুনেছি। কত দরিদ্র কত কি পেলে, আমি কি কিচ্ছু পাব না? আমাকে সেই মাইক্রোস্কোপটা আজ উপহার দিন, কাল–পরশু দামটা তার পাঠিয়ে দেব।
বিজয়া। দাম দিয়ে উপহার নেবার বুদ্ধি আপনাকে কে যোগালে? নলিনী?
নরেন। না না, তিনি নয়। তিনি শুধু বলছিলেন সেটা আপনার ত কোন কাজে লাগল না, কিন্তু তিনি পেলে অনেক কিছু শিখতে পারেন—সে শিক্ষা পরে তাঁর অনেক কাজে লাগবে।
বিজয়া। অর্থাৎ, সেটা গিয়ে পৌঁছবে তাঁর হাতে? আমি বেচলে আপনি নিয়ে গিয়ে তাঁকে উপহার দেবেন—এই ত প্রস্তাব?
নরেন। না না, তা নয়। কিন্তু সেটা আপনারও কোন কাজে এল না, অথচ, সকলেরই চক্ষুশূল হয়ে রইল। তাই বলছিলুম—
বিজয়া। বলার কোন দরকার ছিল না নরেনবাবু। আপনার টাকার অভাব নেই, দোকানেও মাইক্রোস্কোপ কিনতে পাওয়া যায়। কিনেই যদি উপহার দিতে হয় তাঁকে বাজার থেকে কিনেই দিবেন। এটা আমার চক্ষুশূল হয়েই আমার কাছে থাক।
নরেন। কিন্তু—
বিজয়া। কিন্তুতে আর কাজ নেই। আপনি নিরর্থক নিজেরও সময় নষ্ট করছেন, আমারও করছেন। আরও ত কাজ আছে।
নরেন। (ক্ষণকাল হতবুদ্ধিভাবে চাহিয়া থাকিয়া) আপনার সুমুখে সব কথা আমি গুছিয়ে বলতে পারিনে, আপনিও রেগে ওঠেন। হয়ত আপনার মনে হয় নিজের অবস্থাকে ডিঙিয়ে আপনাদের সমকক্ষ হয়ে আমি চলতে চাই, কিন্তু তা কখনো সত্যি নয়। আপনার বাড়িতে আসতে কত যে সঙ্কুচিত হই সে আমিই জানি। এসে কি বলতে কি বলি, নিজের ওজন রাখতে পারিনে, আপনি উত্যক্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু সে আমার অন্যমনস্ক প্রকৃতির দোষে, আপনাকে অমর্যাদা করার জন্যে না। কিন্তু আর আপনাকে বিরক্ত করতে আমি আসব না। নমস্কার।
[নরেন ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল
নাটক : বিজয়া Chapter : 3 Page: 53
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 432