নলিনী। তারপরে?
নরেন। বিজয়া বললেন, কৈ দেখি বাবার চিঠি। পকেটেই ছিল, ফেলে দিলুম সুমুখে। বাণ্ডিল খুলে ফেলে খুঁজতে লাগল বুভুক্ষু কাঙালের মত—হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল—এই যে আমার বাবার হাতের লেখা। তারপরে চিঠি দুটো নিজের মাথায় চেপে ধরে চক্ষের নিমেষে যেন একেবারে পাথর হয়ে গেল।
নলিনী। তারপরে?
নরেন। মূর্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলুম। একেবারে নিঃশব্দ নিশ্চল! হঠাৎ দেখি চাপা কান্নায় তার বুকের পাঁজরগুলো ফুলে ফুলে উঠছে—আর বসে থাকতে সাহস হলো না, নিঃশব্দে বেরিয়ে এলুম।
নলিনী। নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন? আর যাননি তাঁর কাছে?
নরেন। না, সেদিকেই না।
নলিনী। তাঁকে দেখতে ইচ্ছে করে না আপনার?
নরেন। (হাসিয়া) এ কথা জেনে লাভ কি?
নলিনী। না, সে হবে না, আপনাকে বলতেই হবে।
নরেন। বলতে আপনাকেই শুধু পারি। কিন্তু কথা দিন কখনো কাউকে বলবেন না?
নলিনী। কথা আমি দেব না। তবু বলতেই হবে তাঁকে দেখতে ইচ্ছে করে কি না।
নরেন। করে। রাত্রিদিনই করে।
নলিনী। (বাহিরের দিকে চাহিয়া মহা-উল্লাসে) এই যে! আসুন, আসুন। নমস্কার! ভালো আছেন?
[বিজয়া ও দয়ালের প্রবেশ]
বিজয়া। (নরেনের দিকে সম্পূর্ণ পিছন ফিরিয়া নলিনীকে) নমস্কার! ভালো আছি কিনা খোঁজ নিতে একদিনও ত আর গেলেন না?
নলিনী। রোজই ভাবি যাই, কিন্তু সংসারের কাজে—
বিজয়া। সংসারের কাজ বুঝি আমাদের নেই?
নলিনী। আছে সত্যি, কিন্তু মামীমার অসুখে—
বিজয়া। একেবারে সময় পান না। না?
নরেন। (সম্মুখে আসিয়া হাসিমুখে বলিল) আর আমি যে রয়েছি, আমাকে বুঝি চিনতেই পারলেন না?
বিজয়া। চিনতে পারলেই চেনা দরকার নাকি? (নলিনীর প্রতি) চলুন মিস দাস, ওপরে গিয়ে মামীমার সঙ্গে একটু আলাপ করে আসি। চলুন!
[নরেনের প্রতি দৃষ্টিপাতমাত্র না করিয়া নলিনীকে
একপ্রকার ঠেলিয়া লইয়া চলিল]
নলিনী। (চলিতে চলিতে) ডক্টর মুখার্জী, চা না খেয়ে আপনি যেন পালাবেন না। আমাদের ফিরতে দেরি হবে না বলে যাচ্চি।
[নলিনী ও বিজয়া চলিয়া গেল
দয়াল।তুমিও চল না বাবা ওপরে। সেখানেই চা খাবে।
নরেন। ওপরে গেলেই দেরি হবে দয়ালবাবু, ছ’টার গাড়ি ধরতে পারব না।
দয়াল। তুমি ত সেই আটটার ট্রেনে যাও, আজ এত তাড়াতাড়ি কেন? চা না হয় এখানেই আনতে বলে দি। কি বল?
নরেন। না দয়ালবাবু, আজ চা খাওয়া থাক। (ঘড়ি দেখিয়া) এই দেখুন পাঁচটা বেজে গেছে—আর আমার সময় নেই। আমি চললুম। মামীমা যেন দুঃখ না করেন।
দয়াল। দুঃখ সে করবেই নরেন।
নরেন। না করবেন না। আর একদিন আমি তাঁকে বুঝিয়ে বলব।
[প্রস্থান
[ভিতরে নলিনী ও বিজয়ার হাসির শব্দ শোনা গেল, এবং
পরক্ষণে তাহারা দয়ালের স্ত্রীকে লইয়া প্রবেশ করিল]
দয়ালের স্ত্রী। (স্বামীর প্রতি) নরেন কোথায় গেল, তাকে দেখচি নে ত?
নাটক : বিজয়া Chapter : 4 Page: 68
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 261