বিজয়া। আমার আদেশ ত শুনলেন সরকারমশাই | আজই বিদায় দেবেন।
রাস। (নিজেকে সামলাইয়া লইয়া) এবার কষ্ট করে একটু চল। পুরনো দলিলগুলো বেশ করে একবার পড়া চাই-ই।
বিজয়া। কেন?
রাস। বললাম কারণ আছে। তবুও বার বার এক কথা বলবার ত আমার সময় নেই বিজয়া!
বিজয়া। কারণ আছে বলেছেন, কিন্তু কারণ ত একটাও দেখান নি!
রাস। না দেখালে তুমি যাবে না? (একটু থামিয়া) তার মানে আমাকে তুমি বিশ্বাস করো না।
[বিজয়া নিরুত্তর]
রাস। (লাঠিটা মাটিতে ঠুকিয়া) কিসের জন্যে আমাকে তুমি এত বড় অপমান করতে সাহস করো? কিসের জন্যে আমাকে তুমি অবিশ্বাস করো শুনি?
বিজয়া। (শান্তস্বরে) আমাকেও ত আপনি বিশ্বাস করেন না আমারি টাকায় আমারি ওপর গোয়েন্দা নিযুক্ত করলে মনের ভাব কি হয় আপনি বুঝতে পারেন না? এবং তারপরে আমার সম্পত্তির মূল দলিলপত্র হস্তগত করার তাৎপর্য যদি আমি আর কিছু বলে সন্দেহ করি সে কি অস্বাভাবিক? না, সে আপনাকে অপমান করা?
[রাসবিহারী নির্বাক স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। তাঁহার এত বড় পাকা চাল একটা বালিকার কাছে ধরা পড়িবে এ সংশয় তাঁহার পাকা মাথায় স্থান পায় নাই। এবং ইহাই সে অসঙ্কোচে মুখের উপর নালিশ করিবে সে ত স্বপ্নের অগোচর। কিছুক্ষণ বিমূঢ়ের মত স্তব্ধ থাকিয়া এই প্রকৃতির লোকেরা যাহা চরম অস্ত্র তাহাই তূণীর হইতে বাহির করিয়া প্রয়োগ করিলেন]
রাস। বনমালীর মুখ রাখবার জন্যেই এ কাজ করতে হয়েছে। বন্ধুর কর্তব্য বলেই করতে হয়েছে। একটা অজানা-অচেনা হতভাগাকে পথ থেকে শোবার ঘরে ডেকে এনে রাত-দুপুর পর্যন্ত হাসি-তামাশায় কাটালে এর অর্থ কি বুঝতে পারিনে? এতে তোমার লজ্জা হয় না বটে, কিন্তু আমাদের যে ঘরে-বাইরে মুখ পুড়ে গেল। সমাজে কারো সামনে মাথা তোলবার জো রইল না! (রাসবিহারী আড়চোখে চাহিয়া তাঁহার মহামন্ত্রের মহিমা নিরীক্ষণ করিলেন) বলি এগুলো ভালো না, নিবারণ করার চেষ্টা করা আমার কাজ নয়? (বিজয়া নিরুত্তর) (লাঠি ঠুকিয়া) না, চুপ করে থাকলে চলবে না, এ-সব গুরুতর ব্যাপার। তোমাকে জবাব দিতে হবে।
বিজয়া। ব্যাপার যত গুরুতর হোক, মিথ্যে কথার আমি কি উত্তর দিতে পারি!
রাস। মিথ্যে কথা বলে একে উড়োতে চাও নাকি?
বিজয়া। আমি উড়োতে কিছু চাইনে কাকাবাবু। শুধু এ যে মিথ্যে তাই আপনাকে বলতে চাই। এবং মিথ্যে বলে একে আপনি নিজেই সকলের চেয়ে বেশী জানেন তাও এই সঙ্গে আপনাকে জানাতে চাই।
রাস। মিথ্যে বলে আমি নিজেই জানি?
বিজয়া। হাঁ জানেন। কিন্তু আপনি গুরুজন,—এ নিয়ে তর্কবিতর্ক করতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। দলিলপত্র দেখা এখন থাক, মামলা-মকদ্দমারা আবশ্যক বুঝলে আপনাকে ডেকে পাঠাব।
[বিজয়া চলিয়া গেল। রাসবিহারী অভিভূতের মত দাঁড়াইয়া রহিলেন]
নাটক : বিজয়া Chapter : 3 Page: 63
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 490