পিতা আশ্চর্য হইয়া বলিলেন—বিপদ হবে?

অধ্যাপক হাঃ হাঃ হাঃ করিয়া উচ্চহাস্য করিয়া উঠিলেন। বলিলেন—বিপদ হবে না,—আপনি কোন ভয় করবেন না। ড্রেসিং টেব্‌ল্‌ আর কাঁটা-চামচে-ডিশের নীচে সমস্ত চাপা পড়ে যাবে।

আঘাত করিতে পাইয়া আলেখ্যের মনের তিক্ততা এই অপরিচিত লোকটির বিরুদ্ধে কতকটা ফিকা হইয়া আসিয়াছিল, কিন্তু অকস্মাৎ অপরের তীক্ষ্ণ পরিহাসের প্রতিঘাতে হঠাৎ সে যেন একেবারে ক্রুর হইয়া উঠিল। আলেখ্য সব ভুলিয়া প্রত্যুত্তরে কহিল, চাপা পড়তে পার বটে, কিন্তু বুটের ধুলোর দামটাও ত আপনাকে দিতে হবে!—কিন্তু বলিয়া ফেলিয়াই সে নিজেই যেন লজ্জায় একেবারে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। এতবড় নিষ্ঠুর কদর্য কথা যে কি করিয়া তাহার মুখ দিয়া বাহির হইয়া গেল, সে ভাবিয়াই পাইল না। রে-সাহেব অত্যন্ত বিস্ময়ে কন্যার মুখের দিকে চাহিলেন। তিনি যত সাদাসিধাই হউন, এ কথার তাৎপর্য বুঝিতে পারিলেন। বেহারা আসিয়া স্মরণ করাইয়া দিল যে, ভদ্রলোকগুলি বাহিরের ঘরে বহুক্ষণ অবধি অপেক্ষা করিতেছেন।

বল গে যাচ্ছি, বলিয়া সাহেব উঠিয়া দাঁড়াইলেন। শান্তকণ্ঠে কহিলেন,—কথাটা তোমার ভাল হয়নি আলো। অমরনাথ, তুমি একটু বসো, আমি এখনি আসছি।—এই বলিয়া তিনি বাহির হইয়া গেলেন। আলেখ্য তাঁহার পিছনে পিছনেই ঘর ছাড়িয়া যাইতে পারিল না। পিতা দৃষ্টির অন্তরালে যাইতেই নিরতিশয় লজ্জার সহিত আস্তে আস্তে কহিল—আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই, কিন্তু নিজের ব্যবহারের জন্য আমি অতিশয় দুঃখিত। আমি স্বীকার করছি, আপনাকে ও-কথা বলা আমার ভাল হয়নি।

অধ্যাপক কহিলেন—না, ভাল হয়নি।

এই সোজা কথাটাও আলেখ্যের কিন্তু ভাল লাগিল না। সে এক মুহূর্ত মৌন থাকিয়া কহিল, পিতাকে মর্যাদা দেখালে কন্যার খুশী হবারই কথা। আমার বাবা অত্যন্ত ভালমানুষ, তাঁর সঙ্গে ছলনা কারও আপনার উচিত হয়নি।

অধ্যাপক কহিলেন—ছলনা ত করিনি!

আলেখ্য প্রশ্ন করিল—আড়ম্বর করে হঠাৎ পায়ের ধূলা নেওয়াই কি সত্য?

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়