বিজয়া। (মুখ তুলিয়া) তারপরে?
নরেন। তারপরে সব অন্যান্য কথা। তবে, এ পত্র বহুদিন পূর্বের লেখা। খুব সম্ভব, তাঁর এ অভিপ্রায় পরে বদলে গিয়েছিল বলেই কোন কথা আপনাকে বলে যাওয়া তিনি আবশ্যক মনে করেন নি।
বিজয়া। (কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকিয়া) তাহলে বাড়িটা দাবী করবেন বলুন? (হাসিল)
নরেন। (হাসিয়া) করলে আপনাকেই সাক্ষী মানব। আশা করি সত্যি কথাই বলবেন।
বিজয়া। (ঘাড় নাড়িয়া) নিশ্চয়। কিন্তু সাক্ষী মানবেন কেন?
নরেন। নইলে প্রমাণ হবে কিসে? বাড়িটা যে সত্যই আমার সে কথা ত আদালতে প্রতিষ্ঠিত করা চাই।
বিজয়া। অন্য আদালতে দরকার নেই,—বাবার আদেশ আমার আদালত। ও-বাড়ি আপনাকে আমি ফিরিয়ে দেব।
নরেন। (পরিহাসের ভঙ্গীতে) চিঠিটা চোখে না দেখেই বোধ হয় ফিরিয়ে দেবেন!
বিজয়া। না, চিঠি আমি দেখতে চাই। কিন্তু এই এ কথাই যদি থাকে—বাবার হুকুম আমি কোনমতেই অমান্য করব না।
নরেন। তাঁর অভিপ্রায় যে শেষ পর্যন্ত এই ছিল তারই বা প্রমাণ কোথায়?
বিজয়া। ছিল না তারও ত প্রমাণ চাই।
নরেন। কিন্তু আমি যদি না নিই? দাবী না করি?
বিজয়া। সে আপনার ইচ্ছে। কিন্তু সে-ক্ষেত্রে আপনার পিসীর ছেলেরা আছেন। আমার বিশ্বাস অনুরোধ করলে তাঁরা দাবী করতে অসম্মত হবেন না।
নরেন। (সহাস্যে) তাঁদের ওপর এ বিশ্বাস আমারও আছে। এমন কি হলফ নিয়ে বলতেও রাজী আছি। (বিজয়া এ হাসিতে যোগ দিল না। চুপ করিয়া রহিল) অর্থাৎ, আমি নিই-না-নিই আপনি দেবেনই।
বিজয়া। অর্থাৎ, বাবার দান-করা জিনিস আমি আত্মসাৎ করব না এই আমার পণ।
নরেন। (শান্তস্বরে) ও-বাড়ি যখন সৎকাজে দান করেছেন তখন আমি না নিলেও আপনার আত্মসাৎ করায় অধর্ম হবে না। তা ছাড়া ফিরিয়ে নিয়ে কি করব বলুন? আপনার জন কেউ নেই যে তারা বাস করবে। বাইরে কোথাও কাজ না করলে আমার চলবে না, তার চেয়ে যে ব্যবস্থা হয়েছে সেই ত সবচেয়ে ভালো। আরও এক কথা এই যে, বিলাসবাবুকে কিছুতেই রাজী করাতে পারবেন না।
বিজয়া। নিজের জিনিসে অপরকে রাজী করানোর চেষ্টা করার মত অপর্যাপ্ত সময় আমার নেই। কিন্তু আপনি ত আর এক কাজ করতে পারেন। বাড়ি যখন আপনার দরকার নেই, তখন তার উচিত মূল্য আমার কাছে নিন। তা হলে চাকরিও করতে হবে না, এবং নিজের কাজও স্বচ্ছন্দে করতে পারবেন। আপনি সম্মত হোন নরেনবাবু।
[এই মিনতিপূর্ণ কণ্ঠস্বর নরেনকে মুগ্ধ করিল, চঞ্চল করিল]
নরেন। আপনার কথা শুনলে রাজী হতেই ইচ্ছে করে, কিন্তু সে হয় না। কি জানি কেন আমার বহুবার মনে হয়েছে, বাবার ঋণের দায়ে বাড়িটা নিয়ে মনের মধ্যে আপনি সুখী হতে পারেন নি, তাই কোন একটা উপলক্ষ সৃষ্টি করে ফিরিয়ে দিতে চান। এ দয়া আমি চিরদিন মনে রাখব, কিন্তু যা আমার প্রাপ্য নয় গরীব বলেই তা ভিক্ষের মত নেব কি করে?
বিজয়া। এ কথায় আমি কত কষ্ট পাই জানেন?
নরেন। মানুষের কথায় মানুষ কষ্ট পায় এ কি কখনো হতে পারে? কেউ বিশ্বাস করবে?
নাটক : বিজয়া Chapter : 3 Page: 59
- Details
- Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- Category: কবিতার বিষয়
- Read Time: 1 min
- Hits: 231