বেণী। না হয় আর কিছু বলবি। আজ রাত্তিরে গিয়ে জখম দেখিয়ে আয় না,—কাল ওয়ারেন্ট বার কোরে একেবারে হাজতে পুরবো। রমা, তুমি ভাল কোরে একবার বুঝিয়ে বল না? এমন সুবিধা যে আর কখনো পাওয়া যাবে না!

[রমা নীরবে একবার আকবরের মুখের প্রতি চাহিল]

আকবর।(মাথা নাড়িয়া) না দিদিঠাকরান, ও পারব না।

বেণী।(ধমক দিয়া) পারবি নে কেন শুনি?

আকবর।(ক্রুদ্ধকণ্ঠে) কি কও বড়বাবু, সরম নেই মোর? পাঁচখানা গাঁয়ের লোকে মোরে সর্দার কয় না? দিদিঠাকরান, তুমি হুকুম দিলে আসামী হয়ে জ্যাল যাতি পারি, ফৈরিদি হব কোন্‌ কালামুয়ে?

রমা। সত্যিই পারবে না আকবর?

আকবর। না, দিদিঠাকরান, আর সব পারি, সদরে গিয়ে গায়ের চোট দেখাতে না পারি। ওঠ্‌ রে গহর, এইবার ঘরকে যাই। মোরা নালিশ করতি পারব না।

[এই বলিয়া তাহারা উঠিয়া দাঁড়াইল ও চলিয়া যাইতে লাগিল]

গোবিন্দ। সত্যিই যে চলে যায় বড়বাবু? কিছুই যে হোলো না?

বেণী ! বারণ কর না রমা, এমন সুযোগ ফসকালে যে আর কখনো মিলবে না।

[রমা অধোমুখে নির্বাক হইয়া রহিল; আকবর ও তাহার
দুই পুত্র লাঠিতে ভর দিয়া কোনমতে বাহির হইয়া গেল]

বেণী। ও—বোঝা গেছে সমস্ত।

গোবিন্দ। হুঁ, যা শোনা গেল তা মিথ্যে নয় দেখচি।

[উভয়ের দ্রুতপদে প্রস্থান]

রমা। রমেশদা, এ যে তুমি পারো, এত শক্তি যে তোমার ছিল এ কথা ত আমি স্বপ্নেও ভাবিনি!

পঞ্চম দৃশ্য

[গ্রামের একাংশ। কয়েকটা ভাঙ্গা মন্দিরের কিছু-কিছু দেখা যাইতেছে। বৃক্ষ-লতা-গুল্মে সমস্ত স্থান সমাকীর্ণ। মনে হয় এদিকে কদাচিৎ কখনো কেহ আসে মাত্র]

[বেণী ও গোবিন্দর প্রবেশ]

গোবিন্দ। (সচকিতে ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিয়া) কে জানে কোন্‌ শালা আবার কোথা দিয়ে শুনবে। যে জাল বিস্তার করে দড়িটি ধরে বসে আছি বাবা, একটুখানি টান দিয়েচি অমনি ঝুপ করে পড়েচে।

বেণী। কাজ হাঁসিল ত?

গোবিন্দ। নইলে কি আর তোমাকে এই বনের মধ্যে নাহক ডেকে এনেচি বাবা! তুই শালা ভৈরব আচায্যি,—তোর নেই এক কড়ার মুরোদ, তুই যাস আমাদের বিপক্ষে? তুই যাস পরকে আগলাতে? এখন বাস্তুভিটেটা বাঁচা! কি করে মেয়ের বিয়ে দিস তা একবার দেখি!

বেণী। ডিক্রি হয়েছে তাহলে?

গোবিন্দ। (দুই হাতের দশ আঙুল তুলিয়া ধরিয়া) একটি হাজার! কিন্তু শুধু কথায় চিঁড়ে ভিজবে না বাবা, আধাআধি।

Sarat Chandra Chattopadhyay ।। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়