পরদিন সারা শহরে প্রচণ্ড উত্তেজনা। সকালে খবরের কাগজগুলোতে বড় বড় হেডিং করা হয়েছে বাবরী মসজিদ বিধ্বস্ত। কাগজের চেহারা দেখে মনে হয় কে কত বড় হেডিং করতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে সবাই। কোনো কোনো কাগজে খুবই উত্তেজক ভাষায় হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের উস্কে দিয়ে অনেক কথা লিখেছে।

সকালে ঢাকা শহরের কোনো হিন্দুর দোকান খোলেনি। যারা সরকারী চাকরি করে তাদের কেউ কেউ সাহস করে বাড়ি থেকে বের হলেও সবাই ভয়ে বাড়িতে বসে থাকলো। দু একজন বাধ্য হয়ে বাজারে গিয়ে পরিচিত দোকানিদের কাছ থেকে আজে বাজে কথা শুনে এসেছে।

রাতে রতনের সেজদি আর ছোড়দি পিন্টুদের বাসায় ছিলো। রাতে অবশ্য কোনো গন্ডগোল হয়নি। সন্ধ্যায় যা দুই একটা মিছিল বেরিয়েছিলো। পিন্টুরা পাড়ায় শান্তি কমিটি করেছে। গত রাতে ইরফান ডালপট্টি, হেমেন্দ্র দাস রোড, রূপচাঁদ লেন, সূত্রাপুর বাজার, গেন্ডারিয়া আর ফরাশগঞ্জের লোকজনদেরও মিটিং-এ ডেকেছিলো। বেশির ভাগই ছিলো তরুণ, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কয়েকজন সবে চাকরিতে ঢুকেছে। শুধু পিন্টু আর ডালপট্টির সোহরাব ছিলো স্কুলের ছাত্র।

মিটিং-এ ঠিক হয়েছে সবাই গ্রুপ ভাগ করে রাত জেগে পালা করে পাড়া পাহারা দেবে। কোথাও হামলা হলে সবাই মিলে শ্লোগান দেবে–জাগো জাগো বাঙ্গালী জাগো। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের আগে এ শ্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান বৌদ্ধ-খৃষ্টান সবাই একজোট হয়েছিলো। হামলাকারীদের যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে। গলির মুখের বাড়িগুলোর ছাদে মেয়েরা ইটের টুকরো, গরম পানি, শুকনো মরিচের গুড়ো নিয়ে তৈরি থাকবে। ছেলেরা থাকবে লাঠি হাতে। কারও যদি বন্দুক থাকে সেটাও তৈরি রাখতে হবে। মোট কথা এ এলাকায় কোনো অবস্থায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি বা মন্দিরে কাউকে হামলা করতে দেয়া হবে না।

সকালে নাশতা খেয়েই পিন্টু ছুটলো। রতনদের বাড়িতে। পাড়ার অন্য হিন্দুরা সব চৌধুরী ভিলায় আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বাড়ির লোহার ফটকের বাইরে চারজন বন্দুকধারী পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। শুধু রতনরা নিজেদের বাড়িতে আছে।

রতনদের বাড়ি গিয়ে পিন্টু দেখলো ওর বাবা, বড়দা কেউ কাজে যায়নি। রতন ভেতরের বারান্দায় বসেছিলো। পিন্টু ওকে জিজ্ঞেস করলো, নাশতা করেছিস?

রতন মাথা নাড়লো। ওর মা জানতে চাইলেন, তপতী আর কেতকী কেমন আছে বাবা?

ঠিকই আছে। এ পাড়ায় কোনো গুন্ডা বদমাশকে আমরা ঢুকতে দেবো না।

রতনের বড়দা বললে, পাড়ায় না হয় কেউ এলো না। কাজে বেরোবার সাহসও তো পাচ্ছি না।

রতনের বাবা বললেন, কথা নেই বার্তা নেই পাশের বাড়ির ছেলেটা সকালে ইনকেলাব পত্রিকাটা দিয়ে গেছে পড়ার জন্য। পড়তে গিয়ে হাত পা সব হিম হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে বাংলাদেশের একজন হিন্দুও আস্ত থাকবে না।

গত রাতে ইরফান যেভাবে বলেছিলো–গম্ভীর হয়ে পিন্টু বললো, দু একদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে কাকাবাবু।

রতনের ঠাকুরমা ভাঙা গলায় বললেন, তাই যেন হয় বাছা।

রতনের মাকে পিন্টু জিজ্ঞেস করলো, কাকিমা, বাজার থেকে কিছু আনতে হবে?

বাজার করে কী হবে বাবা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রতনের মা বললেন, আলু ভাতে ফুটিয়ে রাখবো, কারও ইচ্ছে হলে খাবে।

রতনদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিলো বাড়ির কেউ বুঝি কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে। পিন্টু আর কোনো কথা না বলে চলে এলো। ভেবেছিলো রতন ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেবে, কিন্তু ও এলো না। বারান্দায় খামের গায়ে হেলান দিয়ে যেভাবে বসেছিলো সেভাবেই বসে রইলো৷ পিন্টু বাইরে এসে বললো, রতন দরজাটা বন্ধ কর।

বাড়িতে না গিয়ে পিন্টু সোজা সূত্রাপুর বাজারে এলো। লক্ষ্য করলে বেশ কয়েকটা দোকান বন্ধ। কয়েকজন পরিচিত মাছওয়ালাকেও দেখতে পেলো না। মুদি দোকান থেকে একটা ব্যাগ কিনে দুসের মুগডাল এক কেজি তেল কিনলো। তরকারির বাজারে গিয়ে দু কেজি করে আলু, সিম আর ফুলকপি কিনলো। মাছের বাজারে গিয়ে এক কুড়ি শিং আর মাগুর মাছ কিনলো। এ রকম অবস্থা কদিন চলবে কে বলতে পারে! রতনরা বাজারে যেতে পারবে না, ঘর থেকে বেরোতে পারবে না–শেষে কি ওরা না খেয়ে মরবে?

বাজার নিয়ে পিন্টু আবার রতনদের বাড়ি এলো। বাজারের থলেটা রতনের মার হাতে দিয়ে বললো, কাকিমা, কোনো কিছুর দরকার হলে রতনকে বলবেন আমাকে খবর দিতে। পাড়ার ভেতর কোনো ভয় নেই।

রতনের মা শুকনো গলায় বললেন বটে–এসব কেন আনতে গেলে, কিন্তু তিনি ভালো করেই জানেন ঘরে কয়েক সের চাল ছাড়া খাবার কিছুই নেই। পিন্টু চলে যাওয়ার পর ভাবছিলেন ওকে দিয়ে সের দুই আলু পটল আনিয়ে নিলে ভালো হতো। ছেলেটার জন্য গভীর মমতায় তার বুক ভরে গেলো।

যাবার সময় পিন্টু রতনকে বললো, আমি একটু স্কুলের দিকে যাব। তুই দুপুরে একবার আসিস।

বাড়িতে মাকে বলে পিন্টু হাঁটতে হাঁটতে লক্ষীবাজারের দিকে গেলো। পথে ঋষিকেশ দাস রোডে একটা মিষ্টির দোকান লুট হতে দেখলো। বেশি নয় দশ বারো জন লোক লাঠি, রড, হকি ষ্টিক হাতে দোকানের কাঠের ঝাঁপ ভেঙে ফেলেছে। কয়েকজনের মুখে দাড়ি, মারমুখী চেহারা। দোকান ভাঙার পর একজন ক্যাশ বাক্স নিয়ে দৌড় দিলো আর রাস্তার টোকাইরা আঁপিয়ে পড়লো শো কেসে সাজিয়ে রাখা মিষ্টির ওপর। বোধহয় কাল বিকেলে বানানো হয়েছে, প্রায় সবগুলো থালাই ভরা ছিলো নানা রঙের মিষ্টিতে।

অল্প দূরে তামাশা দেখার জন্য তোকজন ভিড় করেছে। দূরে মোড়ের কাছে দুটো পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। এদিকে যে এত হল্লা হচ্ছে, সেদিকে ওদের নজরই নেই।

নিজের ওপরই প্রচন্ড রাগ হলো পিন্টুর। চোখের সামনে এমন একটা অন্যায় ঘটনা দেখেও ওর করার কিছু নেই। সবাই মিলে বাধা দিলে দোকান লুট করতে আসা শয়তানগুলো ঠিকই পালিয়ে যেতো। কেউ কিছু বললো না। বরং কয়েকজনের চেহারা দেখে মনে হলো এতে ওরা খুশি হয়েছে। দ্রুত পা চালিয়ে ওখান থেকে সরে এলো পিন্টু। নিজেকেই ওর অপরাধী মনে হচ্ছিলো।

সোহরাওয়ার্দী কলেজ পেরিয়ে নন্দলাল দত্ত লেনের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো পিন্টু। পরনে পায়জামা পাঞ্জাবি, হাতে বাজারের খালি ব্যাগ, গলির মুখে দাঁড়িয়ে ভীত সন্ত্রস্ত মুখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন বুড়ো নলিনী স্যার। গলি পেরিয়ে লক্ষীবাজারের বড় রাস্তায় নামার সাহস পাচ্ছিলেন না তিনি। স্কুলের শুরু থেকে গত দশ বছর যাকে ধূতি পাঞ্জাবি ছাড়া দেখেনি, যার চেহারায় সারাক্ষণ কর্তৃত্বপূর্ণ একটা রাগী ভাব ফুটে থাকে, তাকে ভীত অসহায় অবস্থায় এরকম পোষাকে দেখে পিন্টুর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কোথায় কারা কোন বাবরী মসজিদ ভেঙেছে তার জন্য নলিনী স্যারের এ অবস্থা কেন হবে এর কোনো কারণ খুঁজে পেলো না ও।

কাছে এসে নরম গলায় প্রশ্ন করলো, স্যার, আপনি কি বাজারে যাচ্ছেন?

চমকে উঠে পিন্টুর দিকে তাকালেন নলিনী স্যার। যেন অকূল সমুদ্রে ডুবতে গিয়ে একটা শক্ত অবলম্বন খুঁজে পেলেন। ভাঙা গলায় বললেন, হ্যাঁ বাবা। ওদিকে শুনছি লুটপাট আর আগুন লাগানো শুরু হয়ে গেছে। ঘরে এক মুঠো চাল নেই।

পিন্টু ওঁর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বললো, স্যার আপনি বাড়ি যান। আমি চাল নিয়ে আসছি।

নলিনী স্যার ওর হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, বাবা, পারলে এক সের আলুও এনো।

কথা না বাড়িয়ে পিন্টু একটা রিকশা ডেকে রায় সাহেবের বাজারে এলো। এ বাজারের অবস্থাও সূত্রাপুর বাজারের মতো। অনেকগুলো মুদির দোকান বন্ধ। মাছের বাজারও বেশ ফাঁকা। জেলেদের ভেতর এখনও হিন্দুর সংখ্যা কম নয়।

রতনদের জন্য যে রকম বাজার করেছিলো, নলিনী স্যারের জন্যেও সে রকম করলো পিন্টু। স্যারের বাড়িতে ও আগেও কয়েকবার গেছে। বাড়িতে স্যারের স্ত্রী, পিসিমা, এক বিধবা বোন আর দুই মেয়ে আছে। বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে শুধু তিনি। স্যারের একটাই ছেলে, বিয়ে করে কানাডায় আছে। বাপের কোনো খোঁজ খবর নেয় না। বেতনের টাকায় সংসারের খরচ চলে না বলে স্যার বাড়িতে কোচিং ক্লাস করেন।

বাজার থেকে বেরিয়ে পিন্টু রিকশায় উঠতে যাবে এমন সময় দেখলো রড আর লাঠি হাতে কতগুলো লোক হই হই করে নবাবপুরের দিকে ছুটে যাচ্ছে। বেশির ভাগই লুঙ্গি পরা। কারো গায়ে সুয়েটার, কারও গায়ে চাদর। ওদের সামনে পায়জামা আর লম্বা কোর্তা পরা দুই কালো দাড়িওয়ালা লোক ছিলোবোঝা যায় এরাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। মারমুখী মিছিলের শেষে কয়েকটা টোকাইও দৌড়াচ্ছে। পিন্টু জানে নবাবপুরে হিন্দুদের বেশ কিছু দোকান আছে। ওদের ক্লাসে পড়ে দীপক, নবাবপুরে ওদের বিরাট ওষুধের দোকান। তাছাড়া মরণাদের মিষ্টির দোকান, গন্ধবণিকদের পসারির দোকান, ঘোষদের দুধের আড়ত, পদ্মনিধি প্রেস,সবই নবাবপুরে। লাঠি আর রড হাতে লোকগুলোর লক্ষ্য যে এসব দোকান, বুঝতে কারও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

ব্যাগ ভর্তি জিনিসপত্র দেখে নলিনী স্যার অবাক হয়ে বললেন, হারে এত সব কেনার টাকা কোথায় পেলি?

টাকা আমার কাছে ছিলো স্যার।

নিশ্চয় বাড়ির টাকা! কত খরছ হয়েছে বল, আমি দিয়ে দিচ্ছি।

বাড়ির টাকা না স্যার। এটা আমার নিজের কামাই করা টাকা।

তুই কোত্থেকে টাকা কামাই করলি?

আমি সূত্রাপুর ক্লাবে ফুটবল খেলে পেয়েছি স্যার। আপনার কাছ থেকে টাকা নিতে পারবো না।

তা হয় না–পিন্টু। তুই কেন আমার জন্য এতগুলো টাকা খরচ করবি?

স্যার, আমাদের মতো গাধা পিটিয়ে আপনি মানুষ করেছেন। সারা জীবনই আমাদের দিয়ে এসেছেন। ক্লাসে আপনিই বলেন শিক্ষক পিতার তুল্য। ছেলে হয়ে এটুকুও কি করতে পারবো না?

নলিনী স্যার পিন্টুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। খেলাধুলোর ব্যাপারে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই বলে পিন্টুকে কখনও আলাদা ভাবে তিনি দেখেননি। ক্লাসের অন্য সব ছেলের মতোই ওকে জানেন। ও কার ছেলে, কোথায় থাকে তাও তিনি জানেন না। তাঁর নিজের ছেলে তাকে ভুলে গেছে আর এমন ঘোর বিপদের দিন কোন বাড়ির ছেলে এসে আপনজনের মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, ভাবতে গিয়ে তাঁর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ধরা গলায় বললেন, পিন্টু, চারদিকে এত অন্যায়, অবিচার দেখে মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম। তোকে দেখে মনে হচ্ছে এখনো পৃথিবীর সবটুকু পাপে ভরে যায় নি। তোকে আমি প্রাণভরে আর্শীবাদ করছি বাবা, জীবনে তুই অনেক বড় হবি।

স্যারের কথা শুনে পিন্টুর কান্না পেলো। তাঁর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে বললো, স্যার, আপনার আর্শীবাদের চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে!

কোনো কথা না বলে বুড়ো সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ নলিনী ভট্টাচার্য বিধর্মী ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন।

যে কজনকে খবর দেয়া সম্ভব হয়েছে সবাইকে নিয়ে বিকেলে পিন্টুদের ছাদে জরুরী বৈঠকে বসলো ইরফান। রতনদের বাসায় গিয়ে ওকে আর স্বপনকে ও নিজেই নিয়ে এসেছে। বলেছে, মার খাওয়ার ভয়ে তোরা ঘরে কেন লুকিয়ে থাকবি? কেউ মারতে এলে রুখে দাঁড়াতে হয়।

সরকারদের বড় ছেলে বাসব ইরফানদের বয়সী, সেও এসেছে বৈঠকে। পিন্টু গুণে দেখলো সব মিলিয়ে পনেরো জন। দুটো বড় চাদর বিছিয়েছিলো ছাদে। তাতেও সবার জায়গা হয়নি। রতন বসেছে পাচিলের গায়ে হেলান দিয়ে।

ইরফান বললো, আমি আজ শহরে বেরিয়েছিলাম। অবস্থা ভালো নয়। গুণ্ডারা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হামলা করেছে। অনেকগুলো দোকান ভেঙে লুটপাট করেছে।

পিন্টু বললো, ঋষিকেশ দাস রোডে মিষ্টির দোকান আমার চোখের সামনে লুট হয়েছে।

বাসব বললো, নগেন বাবু খবর পেয়েছেন আজ রাতে নাকি সূত্রাপুর বাজার লুট হবে।

হতে পারে। ইরফান বললো, আমাদের সব রকম খারাপ পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে হবে। আমি সূত্রাপুরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে কথা বলেছি। ওদের কমিটিতে আওয়ামী লীগ, জাসদ, বাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি–সব দলেরই ছেলেরা আছে। বাজার পাহারা দেয়ার দায়িত্ব ওরা নিয়েছে। আমরা পাড়ায় পাড়ায় কাল রাতের মতো পাহারা দেবো। লক্ষ্য রাখতে হবে বাবরী মসজিদ ভাঙার কথা বলে কেউ যেন উত্তেজনা ছড়াতে না পারে। আমাদের বলতে হবে বাংলাদেশের হিন্দুরা বাবরী মসজিদ ভাঙেনি। একাত্তরে সালে আমরা মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান সবাই মিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। দেশের জন্য হিন্দু, মুসলমান সবাই জীবন দিয়েছে। সবার এদেশে থাকার সমান অধিকার আছে। ধর্মের নামে যারা নিরীহ মানুষের ওপর হামলা করে, জিনিসপত্র লুট করে, দোকান-পাট, মন্দির, মসজিদ ভেঙে ফেলে, ঘর বাড়িতে আগুন দেয় তারা হিন্দুও না মুসলমানও না, তারা অসভ্য জানোয়ার। তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

সবাই গভীর আগ্রহ নিয়ে ইরফানের কথা শুনছিলো। হঠাৎ দূরে লোকজনের হইচই আর শ্লোগানের শব্দ শোনা গেলো। সবাই কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলো। সামনের রাস্তায় কয়েকটা দোকান ঝটপট করে ঝাঁপ নামিয়ে দিলো। দূরে ডালপট্টির ওদিক থেকে দাড়িওয়ালা মোল্লাদের মিছিল আসছিলো। শ্লোগান দিচ্ছে, নারায়ে তকবির……, একটা একটা মালাউন ধর, সকাল বিকাল নাশতা কর। ভারতের দালালেরা, হুশিয়ার সাবধান। হিন্দু যদি বাঁচতে চাও, বাংলা ছেড়ে ভারত যাও।

শ্লোগানের কথা শুনে রতনের বুক কেঁপে উঠলো। ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। বললো, সবাই লাঠি নে। আমরাও মিছিল বের করবো।

পিন্টুদের ছাদে আগের দিন সন্ধ্যায় সূত্রাপুর বাজার থেকে এক মণ গজারির লাঠি এনে রাখা হয়েছিলো। ইরফানের বলার সঙ্গে সঙ্গে সবাই লাঠি হাতে নিয়ে নিচে নামলো। কয়েকজন দুই হাতে দুই লাঠি নিয়েছে।

রাস্তায় নেমেই ইরফান শ্লোগান দিলো, হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই। অন্যরা বললো, ভাইয়ে ভাইয়ে ভেদ নাই।

শ্লোগানের শব্দ শুনে চৌধুরী ভিলা থেকে কয়েকজন যুবক বেরিয়ে এলো। ইরফান মিছিল নিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে গলা ফাটিয়ে শ্লোগান দিলো-মন্দির মসজিদ ভাঙে যারা, অন্যরা বললো, সব ধর্মের শক্র তারা। ইরফান বললো, তুমি কে আমি কে, সবাই বললো, বাঙ্গালী, বাঙ্গালী। ইরফান বললো, জামাত শিবির রাজাকার। অন্যেরা বললো, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়। ইরফান বললো, তোমার আমার ঠিকানা। সবাই বললো, পদ্মা মেঘনা, যমুনা। মিছিল নিয়ে ইরফান এগিয়ে গেলো ডালপট্টির দিকে।

উল্টো দিক থেকে আসা দাড়িওয়ালাদের মিছিল ইরফানদের দেখে থমকে দাঁড়ালো। রূপচাঁদ লেনের মাহবুব ছিলো ইরফানদের মিছিলে। ও নিয়মিত নির্মূল কমিটির মিটিঙ মিছিলে যায়। ইরফানকে বললো, রাজাকার গুলারে একটা ধাওয়া দেই। ইরফান ভাই। আমি শ্লোগান দিমু। সবাই খালি কইবা জবাই কর।

মাহবুব মিছিলের মাঝখান থেকেই চেঁচিয়ে বললো, এই-ই জামাত ধর। সবাই বললো, জবাই কর।

মাহবুব লাঠি উঁচিয়ে সামনের দিকে ছুটলো। এরপর ইরফানদের মিছিলের সবাই–জামাত ধর জবাই কর, শিবির ধর জবাই কর, গোলাম ধর জবাই কর, আযম ধর জবাই কর, আবার জামাত ধর জবাই কর……. বলতে বলতে ডালপট্টির দিকে দৌড়ালো। ইরফানকে এলাকার সবাই চেনে। ওদের দৌড়াতে দেখে সামনে থেকে লোকজন সরে গেলো। কেউ মিছিলে জুটে গেলো, অনেকে রাস্তার দু পাশে দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে ওদের উৎসাহিত করলো।

পিন্টু আর রতন আগে কখনও মিছিলে যায়নি। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ওরা প্রভাতফেরি করে বটে, কিন্তু সেখানে গান হয়, শ্লোগান হয় না। ওরা দুজন এমনিতেই উত্তেজিত ছিলো। মাহবুবের জবাই করার শ্লোগান ওদের আরও উত্তেজিত করলো। পিন্টুর মনে হলো,যারা নিরীহ মানুষকে খুন করতে পারে, গরিব মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে পারে, তাদের ধরতে পারলে লাঠির বাড়ি মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়া উচিৎ।

ডালপট্টির মোড়ে থমকে দাঁড়ানো মোল্লাদের মিছিলটা উল্টোদিক থেকে লাঠি হাতে ভয়ঙ্কর রাগী মিছিল আসতে দেখে রণে ভঙ্গ দিলো। যে যেদিকে পারলো চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেলো।

ইরফানরা ডালপট্টির মোড়ে এসে থামলো। মিছিলের ভেতর থেকে একজন বললো, ইরফান ভাই আপনি কিছু বলেন।

সামনে ছিলো শিকদারদের বাড়ির উঁচু বারান্দা। এক লাফে বারান্দায় উঠে ইরফান ছোট খাট একটা বক্তৃতা দিয়ে ফেললো। পিন্টুদের ছাদে যে কথাগুলো বলেছিলা সেগুলোই আরও গুছিয়ে বললো।

পিন্টু রতনের হাত ধরে পেছনে দাঁড়িয়েছিলো। বেশ কিছু পথচারীও দাঁড়িয়ে গেছে। বক্তৃতা শুনতে। রতনের মনে হলো–ওরা একা নয়, এখন আর ভয়ের কিছু নেই।

.

৮.

সূত্রাপুর এলাকায় দাঙ্গা যাতে না হয় সেজন্য ইরফানরা সব রকম ব্যবস্থাই নিয়েছিলো। রতন আর পিন্টু ভেবেছিলো অন্যান্য জায়গায় বুঝি এভাবেই দাঙ্গাবাজদের রুখে দেয়া হয়েছে। রাতে রতন এসেছিলো পিন্টুর সঙ্গে ঘুমোতে। কাল থেকে তপতী আর কেতকী হাসির ঘরে থাকছে। পিন্টুদের রাত পাহারার ডিউটি ছিলো নটা থেকে বারোটা পর্যন্ত। ইরফান প্রত্যেক এলাকায় চারটা করে টীম তৈরি করে দিয়েছে। প্রত্যেক টীম পালা করে তিন ঘন্টা পাহারা দেয়। বয়সে যারা ছোট তাদের দেয়া হয়েছে নটা বারোটার টীমে। কাগজিটোলায় পিন্টুদের টীমে ছিলো আটজন। পিন্টুকে বানানো হয়েছে টীম লিডার। সবাইকে ও বলেছে খেয়ে দেয়ে পৌনে নটার ভেতর ওদের বাসায় চলে আসতে। রতন বিকেল থেকেই পিন্টুর সঙ্গে রয়েছে। মিছিল শেষ করে স্বপন বাসায় ফিরে গেছে।

এক হাতে গজারির লাঠি, আরেক হাতে পাঁচ ব্যাটারির লম্বা টর্চ, গায়ে মোটা সুয়েটার আর মাথায় উলের মাফলার পেঁচিয়ে পাড়ায় টহল দিতে দিতে নিজেকে খুব দায়িত্বশীল মানুষ মনে হচ্ছিলো পিন্টুর। যদিও রতনকে বলেনি, মনে মনে ও চাইছিলো গুন্ডারা একবার হামলা করতে আসুক ওদের পাড়ায়। ও ঠিক করে রেখেছে সব কটাকে ঠ্যাং ভেঙে নুলো করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে। আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে শুকনো নারকেলের মতো এক বাড়িতে মাথা ফাটিয়ে দেবে।

যারা সূত্রাপুর বাজার লুট করার কথা ভেবেছিলো বিকেলে ইরফানদের ধাওয়া খেয়ে ওরা দমে গেছে। রাতে আর এ এলাকায় হামলা করার সাহস কারও হয়নি। পিন্টুদের পরের ব্যাচে ছিলো স্বপনরা। ওরা বেরিয়ে আসার পর পিন্টু ওর টীমের সবাইকে যার যার বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। বলে দিলো সবাই যেন আবার কাল বিকেলে ইরফানের মিটিঙে চলে আসে।

ডিসেম্বরের রাত বারোটা মানে গভীর রাত। বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরে ঢুকে কাপড় বদলে পিন্টু আর রতনও বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লো। রতন বিছানায় শুয়ে ওর দিদিদের কথা ভাবছিলো। বড়দি ভোলায়, মেজদি চট্টগ্রামে। কে জানে ঢাকার মতো সে সব জায়গায় মোল্লারাও ক্ষেপে গেছে কিনা। ওর বাবা দুপুরে চৌধুরী ভিলা থেকে চট্টগ্রাম আর ভোলা দু জায়গাতেই ফোন করার চেষ্টা করেছেন, লাইন পাননি। বাড়িতে বড়দা অবশ্য বলেছে ওসব জায়গায় কিছু হলে খবরের কাগজে নিশ্চয় বেরুতো।

অনেকক্ষণ শুয়ে থাকার পরও রতনের ঘুম আসছিলো না। কোথায় কোন মসজিদ কারা ভেঙেছে তার জন্য ওদের উপর কেন হামলা হবে এটা সে কিছুতেই মানতে পারছিলো না। পাশে শুয়ে আছে ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ পিন্টু, এতক্ষণে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। পিন্টুকে ও ভাবে ওরই বুঝি আরেক রূপ, অবনী স্যার বলেন হরিহর আত্মা। অথচ পিন্টুর কোনো ভয় নেই। ও শহরে ঘুরতে যেতে পারে, ওকে কেউ কিছু বলবে না। রতনের গলির বাইরে যাওয়া বারণ। ও কী অপরাধ করেছে? বাবা, বড়দা কেউ আজ কাজে যায়নি। পিন্টু বলেছে শহরে হিন্দুদের দোকান পাট সব বন্ধ। ডালপট্টিতে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় রতনও দেখেছে রহমত ব্যাপারীর গদি খোলা অথচ ঠিক তার পাশে সাহাদের গদিতে তালা মারা। সকালে মা বলছিলেন তপতী আর কেতকীকে কলকাতা পাঠিয়ে দেবেন। স্বপন বলেছে, আমিও কইলকাতা যামু গিয়া। এই দ্যাশে আমার কপালে কুনদিন চাকরি জুটবো না। রতন কিছু বলে নি। আজ পিন্টুর সঙ্গে বাইরে যেতে না পেরে ওর বুকের ভেতর প্রচন্ড অভিয়ান জমেছে। বার বার মনে হয়েছে–এ শহর কি পিন্টুর, রতন কি এ শহরে জন্মায়নি? শহরের কোন উৎসবে সে যায়নি? গত চার বছর ধরে ওরা একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাত ফেরি নিয়ে শহীদ মিনারে যায় ফুল দিতে। সবার সঙ্গে রতনও গায় আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি….। আজ মনে হচ্ছে সালাম, বরকত, জব্বার ওর ভাই নয়। এ শহর ওর নয়। এখানে ওকে থাকতে হলে সবার দয়ার আশ্রয়ে থাকতে হবে, পিন্টুরা যেমন ওদের তিন ভাই বোনকে আশ্রয় দিয়েছে। রতন আগে বহুবার পিন্টুদের বাসায়। থেকেছে। আগেকার থাকা আর আজকের থাকার ভেতর অনেক তফাৎ। এভাবে তো পিন্টুরা কখনও রতনদের বাসায় থাকেনি? পিন্টু ওর দশ বছরের বন্ধু। আজ প্রথম মনে হলো পিন্টু আর ও এক নয়। কথাটা মনে হতেই ওর বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেলো। বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো রতন।

পিন্টু জেগেছিলো। রতনের মতো সেও এসব কথা ভাবছিলো। রতনের পাশে নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছিলো। সকালে নলিনী স্যারের ভয় পাওয়া শুকনো চেহারা আর অস্বাভাবিক পোষাক দেখে মনে হয়েছিলো বুঝি এর জন্য ও দায়ী। নইলে ওর কেন ভয় নেই? নলিনী স্যার কেন ওর মতো নিশ্চিন্ত মনে রিকশা ডেকে বাজারে যেতে পারলেন না?

বিকেলে মিছিল নিয়ে ওরা যখন ডালপট্টির দিকে যাচ্ছিলো তখন ও রতনের মুখে প্রচন্ড ভয়ের ছায়া দেখেছে। সারাক্ষণ ও রতনের হাতে হাত রেখে হেঁটেছিলো। মনে মনে বলছিলো, রতন ভয় পাবি না, আমি তোর পাশে আছি। নিজের বুকের সাহস ভয়ার্ত বন্ধুর বুকে সঞ্চারিত করতে চাইছিলো পিন্টু। হঠাৎ রতনের চাপা কান্নার শব্দ শুনে চমকে উঠলো ও। উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়েছিলো রতন। পিন্টু ওর পিঠে হাত রেখে উদ্বিগ্ন গলায় বললো, রতন কী হয়েছে? খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস?

পিন্টুর ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে রতনের চোখে বাঁধ ভাঙা স্রোতের মতো কান্নার ঢল নামলো। পিন্টু ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল গলায় বললো, কী হয়েছে রতন? আমার ভাই, এভাবে কাঁদিস না। বল কী হয়েছে।

ধীরে ধীরে রতনের কান্না থামলো। পিন্টু ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলছিলো, তোর কোনো ভয় নেই রতন। চিরকাল আমি তোকে এভাবে আগলে রাখবো। আমার জান থাকতে তোর কোনো ক্ষতি হতে দেবো না।

রতন জানে পিন্টু ওকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছে না। ও যতক্ষণ পাশে আছে রতনের কিছু হবে না। তারপরও আজকের ঘটনা জানিয়ে দিয়েছে রতন আর পিন্টু এক নয়।

আস্তে আস্তে ও পিন্টুকে বললো, আমার একটা কথার জবাব দে।

কী কথা রতন?

আমি যে হিন্দু–এ জন্য কি আমি দায়ী?

এ কথা কেন ভাবছিস রতন?

কোনদিন ভাবিনি। আজ সবাই আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে।

নলিনী স্যারের কথা ভুলে গেছিস রতন? স্যার তো সব সময় বলেন, আমরা হিন্দু মুসলমান এটা কোনো পরিচয় হতে পারে না। আমরা মানুষ, এটাই আমাদের বড় পরিচয়। হরিমতিয়াকে তুই কী বলেছিলি মনে নেই?

কী বলেছিলাম?

হরিমতিয়ার মা যখন জানতে চেয়েছিলো আমরা হিন্দু না মুসলমান, তুই বলেছিলি আমরা হিন্দুও নই মুসলমানও নই, আমরা মানুষ।

সে তো বইয়ের কথা। নলিনী স্যারের শেখানো কথা।

এভাবে কেন বলছিস রতন! স্যার কি আমাদের ভুল শিখিয়েছিলেন?

নলিনী স্যারের কথা যদি সত্যি হবে তাহলে আজ তাঁকে কেন ধুতির বদলে পায়জামা পরতে হলো? যার ভয়ে স্কুলের সবাই কাঁপে তিনি কিসের ভয়ে আজ

অন্যরকম হয়ে গেলেন?

পিন্টু কয়েক মুহূর্তে কোনো কথা বলতে পারলো না। রতন অসহিষ্ণু গলায় আবার বললো, জবাব দে পিন্টু, নলিনী স্যার যদি হিন্দু না হতেন, আজ কি এই দূরবস্থায় পড়তে হতো তাকে? তুই না গেলে হয়তো সারাদিন ওঁরা না খেয়ে থাকতেন। কেন আমাদের এরকম ভয়ের ভেতর থাকতে হবে?

পিন্টু বললো, সাপকে মানুষ ভয় পায় রতন। ঘরের ভেতর হঠাৎ যদি সাপ দেখা যায় আমরা প্রথমে ভয় পাই। তারপর সবাই মিলে সাপটাকে মারি।

এ সাপ মানুষ বেছে কামড়ায়। সবাইকে কামড়ায় না।

ইরফান ভাই পরশু রাতে আমীর হোসেনের কথা বলেছিলো, তুই শুনিসনি। পাকিস্তান আমলে রায়ট ঠেকাতে গেলে মুসলমান গুপ্তারাই তাকে মেরেছিলো। বিকেলে আমরা যেভাবে মিছিল নিয়ে গিয়েছিলাম, ওরা যদি সংখ্যায় বেশি হতো, যদি তৈরি থাকতো, তাহলে আমাদের অনেককেই মারতে পারতো।

তুই যাই বলিস পিন্টু, সকালে তুই আমাকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতে পারিস নি। এর কারণ তো একটাই, আমি হিন্দু। এদেশের অনেক মানুষ মনে করে এটা হিন্দুদের দেশ নয়।

পরশু দিন ক্লাবে লালু ভাইকেও ইন্ডিয়ার দালাল বলেছে। কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে, করতে দে। তেড়ে এলে লাঠি ঘুরিয়ে মাথায় বাড়ি মারবি।এই বলে একটু থামলো পিন্টু। তারপর রতনের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো, কাল থেকে তুই আমার সঙ্গে শহরে যাবি।

আট তারিখ ছিলো জাতীয় সমন্বয় কমিটির হরতাল। গোলাম আযমের ফাঁসি আর জামাত শিবিরের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করার দাবিতে বাবরী মসজিদ ভাঙার আগেই তারা হরতাল ডেকেছিলো। জামাতীরাও একই দিনে হরতাল ডাকলো বাবরী মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে। সারাদিন শহরে দুই দলের কর্মীদের মধ্যে মারপিট হলো। পিন্টুরা পাড়ার বাইরে যায়নি। নয় তারিখ সকালে খবরের কাগজ দেখে রতন আর পিন্টুর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। শুধু ঢাকার নয়, দেশের বহু জায়গায় হিন্দুদের ওপর হামলা হয়েছে। ঘর বাড়ি, মন্দির, দোকানপাট আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে দাঙ্গাবাজরা, লুটপাট করেছে বহু জায়গায় তখন পর্যন্ত কেউ মারা না গেলেও হামলায় অনেকে আহত হয়েছে। রতন আরও বেশি ভয় পেলো, যখন পত্রিকায় দেখলো ভোলা আর চট্টগ্রামেও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। পিন্টুকে বললো, আমি এখনই বাড়ি যাবো।

পিন্টু বললো, চল, আমিও যাই।

খবরের কাগজ আসার আগেই পিন্টুরা সকালের চা নাশতা খেয়ে নিয়েছিলো। কাপড় বদলে ও রতনের সঙ্গে ওদের বাড়িতে গেলো।

বাড়ির কাঠের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিলো। রতন জোরে কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে ভয় পাওয়া ভাঙা গলায় ওর বাবা বললেন, কে?

রতন বললো, বাবা, আমি।

রতনের বাবা দরজা খুললেন। রতন আর পিন্টু ঘরের ভেতরে ঢুকতেই তিনি ব্যস্ত হাতে দরজা বন্ধ করলেন। ওদের বাড়িতে খবরের কাগজ রাখা হয় না। রতন ওর বাবাকে শুকনো গলায় বললো, সংবাদে লিখছে চট্টগ্রাম আর ভোলায়ও নাকি গন্ডগোল লাগছে।

মানুষ মরছে?

না, মানুষ মারনের কথা ল্যাখে নাই। তয় গ্যারামের দিকে ঘর বাড়িতে আগুন দিছে, মন্দির ভাঙছে, দোকানপাট লুট করছে।

নিজের কপাল চাপড়ে অসহায় গলায় রতনের বাবা বললেন, হায় ভগমান, আমি অখন কই যাই!

পিন্টু বললো, কাকাবাবু, আমি এখনই যাচ্ছি টেলিফোন করতে। আপনি দিদিদের নম্বর দিন।

রতন বললো, আমি নম্বর জানি। বাবা, পিন্টুর লগে যামু আমি?

তোর যাওন কি ঠিক ওইবো?

আপনি রতনের জন্য ভাববেন না। শক্ত গলায় পিন্টু বললো, আমি থাকতে রতনের কিছু হবে না।

ভেজা গলায় রতনের বাবা বললেন, ঠিক আছে যাও। তুমি ছাড়া রতনের আর কে আছে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামার পর রতন জানতে চাইলো, ফোন কোত্থেকে করবি?

পোস্ট অফিস খুলে গেছে। চল, ওখানেই যাই। আসার পথে স্কুলটা ঘুরে আসবো।

ওরা দুজন গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় পা দিতেই ইরফানের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। পিন্টুর সঙ্গে রতনকে বাইরে যেতে দেখে ইরফান অবাক হলো-রতনকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো পিন্টু?

পোস্ট অফিসে যাচ্ছি টেলিফোন করতে। চট্টগ্রাম আর ভোলায় রতনের দুই দিদি আছেন।

পোস্ট অফিসে এত লোকজনের ভেতর রতনকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আমার চেম্বারে চল, ওখান থেকে টেলিফোন করা যাবে।

বড় রাস্তায় দোকানপাটের চেহারা কালকের মতোই। হিন্দুদের একটা দোকানও খোলেনি। সাহাদের গদির বাইরে রোয়াকে দুটো পুলিশ বসেছিলো।

ইরফানের ফার্মেসি খুলেছে, তবে ওদের হিন্দু কর্মচারী শিবু আসেনি। ইরফান গতকাল ওদের বাড়িতে গিয়ে খবর নিয়েছিলো। বলেছে অবস্থা একটু শান্ত হলে বাড়ি থেকে বেরোতে।

রতনের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে পিন্টু প্রথমে ভোলায় ফোন করলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই লাইন পেয়ে গেলো। ওপাশে শেখরদা নিজে ফোন ধরেছে। পিন্টু জানতে চাইলো–শেখরদা, আপনাদের ওখানকার খবর কী?

বেশি ভালো না। শহরের বাইরের অবস্থা খুবই খারাপ। শহরের ওপর তিনটা মন্দির ভেঙেছে।

পিন্টুর হাত থেকে রিসিভার নিয়ে রতন বললো, শেখরদা, বড়দি কই? বড়দিরে ফোন দেন।

ওপাশে ওর বড়দি টেলিফোন ধরেই কেঁদে ফেললেন–রতন, তোরা কেমন আছস? ঢাকার অবস্থা কেমন?

ঢাকার অবস্থা সুবিধার না। তয় আমগো এদিকে গন্ডগোল করবার দেই নাই। কাল আইছিলো, সবতে মিলা ধাওয়া দিছি।

তপু, কেতুরে বাড়ির থনে বাইর ওইতে দিস না। বাবারে কইস, গন্ডগোল একটু কমলে আমরা ঢাকা আসুম। তগো অখন ভোলা আসনের দরকার নাই। লালমোহনের খবর খুব খারাপ।

সেজদি আর ছোড়দি পিন্টু গো বাড়িত আছে। আমরা কেউ পাড়ার থনে বাইরে যাই না। বাবায় কইতাছে সেজদি গো কইলকাতা পাঠায়া দিবো।

আমি আইয়া লই। একলগে বইসা বুজ করুম। নবনীর কুন খবর পাইছস?

অখন ফোন করুম। আইজ রাখি বড়দি। কুন কিছু ওইলে এই নম্বরে ফোন কইরো। এইটা ইরফান বাইর নম্বর। ইরফানের ফার্মেসির ফোন নম্বর বলে রতন রিসিভার নামিয়ে রাখলো।

পিন্টু জানতে চাইলো, বড়দিরা কি ঢাকা আসবে?

বললো, গন্ডগোল কমলে আসবে। আমাদের এখন ভোলা যেতে মানা করেছে।

কাষ্ঠ হেসে পিন্টু বললো, ভোলা যাওয়ার কথা আমার মনেই ছিলো না। তিনটা টিকেট শুধু নষ্ট হলো।

তুই টিকেটের মায়া করছিস! বিষণ্ণ গলায় রতন বললো, ঘর বাড়ি হারিয়ে কত মানুষ রাস্তার ফকির হয়ে গেলো!

প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য পিন্টু বললো, মেজদির নম্বর দে। দেরি করলে লাইন পাওয়া যাবে না।

চট্টগ্রামে রতনের মেজদির অবস্থাও ভোলার বড়দির মতো। বললো, সীতাকুণ্ডের ওদিকে নাকি হিন্দুদের কারও ঘরবাড়ি আস্ত নেই। লুটপাট করে পুড়িয়ে সব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।

ফার্মেসি থেকে বেরিয়ে রতন বললো, বাড়িতে খবরটা দিয়ে একবার শ্যামবাজারের দিকে যাবি পিন্টু?

শ্যামবাজারে কেন?

বাবার আড়তের কী অবস্থা দেখে আসি। বসাক বাবুরা তো একই বাড়িতে থাকেন।

চল যাই। বলে পিন্টু একটা রিকশা ডাকলো।

শ্যামবাজার পর্যন্ত হিন্দুদের একটা দোকানও খোলা ছিলো না। বসাকদের চালের আড়তের ভারি কাঠের দরজায় মস্ত বড় তালা ঝুলছে। আড়তের পাশ দিয়ে ওপরে যাওয়ার পথ। রতন বললো, চল, মদন জ্যাঠার সঙ্গে দেখা করে যাই।

অন্য সময় হলে পিন্টু আপত্তি করতো না। এখনকার পরিস্থিতি আলাদা। একটু ইতস্তত করে বললো, আমার যাওয়া কি ঠিক হবে রতন! বরং আমি এখানে দাঁড়াই, তুই দেখা করে আয়।

পিন্টু কেন আসতে চাইছে না এটা বুঝতে পেরে রতনের বুকের ভেতরটা মোড় দিয়ে উঠলো। ধরা গলায় বললো, ঠিক আছে পিন্টু, আমি এক্ষুণি আসছি। রতন ওপরে যাওয়ার একটু পরেই ফরাশগঞ্জের দিক থেকে নারায়ে তকবির… বলতে বলতে মোল্লাদের একটা মিছিল এগিয়ে এলো। বসাকদের আড়তের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো পিন্টু। মিছিলওয়ালারা আড়তের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বসাকদের বাড়িতে ঢিল ছুঁড়ে মারলো। মিছিলের পেছনে পুলিশের ভ্যান ছিলো। পুলিশ কিছু বললো না। মিছিল চলে গেলো সূত্রাপুরের দিকে। পিন্টুর বুকের ভেতর রাগ আর ঘৃণার আগুন তখন দাউদাউ করে জ্বলছিলো। অথচ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া তখন ওর কিছুই করার ছিলো না।

<

Super User