৫. আকাশের জন্য কালো গোলাপ

ভোর পাঁচটায় টেলিফোনের ঘুম ভাঙানো কল আকাশকে বিছানা থেকে ওঠালো। ঠিক ছটায় ভয়েস অব আমেরিকার স্থানীয় প্রতিনিধি ডিক পেন-এর সঙ্গে ওর দেখা করার কথা ডাইনিং-এ। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ৬০৩ নম্বর রুমে আছে আকাশ। ডিক থাকে দুই ফ্লোর নিচে ৪১২-তে। সকাল সাতটায় রুমানিয়ার ডাকসাইটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আকাশের জন্য এ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করেছে ডিক। সঙ্গে ডিকও যাবে।

কাঁটায় কাঁটায় ছটায় নিচে ডাইনিং হলে এসে কোনার টেবিলে ডিককে দেখতে পেলো আকাশ। সুপ্রভাত বিনিময় করে ও চেয়ার টেনে বসে পড়লো। ডিককে কিছুটা বিমর্ষ দেখাচ্ছিলো। আকাশের হঠাৎ করে বুখারেস্ট আসাটাকে ডিক সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে নি। তার মানে কি, ডিকের পাঠানো রিপোর্টে ভয়েস অব আমেরিকা যথেষ্ট সন্তুষ্ট নয়? বয়সে আকাশের চেয়ে চার বছরের বড় হলেও চাকরিতে এক গ্রেড নিচে। এটাও ওর দুঃখের একটা বড় কারণ।

তোমাকে বিমর্ষ মনে হচ্ছে। সব কিছু ঠিক আছে তো ডিক?

আকাশের গলায় সমবেদনার সুর ডিকের ভালো লাগলো। বললো, তোমার কি ধারণা হোম মিনিষ্টার ইচ্ছে করলেই চসেস্কুর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?

হোম মিনিস্টার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে যা জেনেছি মনে হয় পারবেন।

আকাশের কথা শুনে ডিকের খুশি হওয়া উচিৎ ছিলো। ভয়েস অব আমেরিকার জন্য এই সময় রুমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকোলাই চসেস্কুর সাক্ষাৎকার নেয়া একটা দারুণ ঘটনা হবে। ডিক গত তিন বছরে বহুবার চসেস্কুর সাক্ষাৎকার নেয়ার চেষ্টা করেছে, পারে নি। আর আকাশ বুখারেস্টে পা দেয়ার আট দিনের ভেতর এমন এক অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেললো ভাবতে গিয়ে ডিকের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। নিজেকে একটা অকর্মার ধাড়ি মনে হলো। পূর্ব ইউরোপের রাজনীতির এই ঝড়ো হাওয়ার ভেতর এই বাঙালি ছেলেটা পোল্যান্ডে গিয়ে লেচ ওয়ালেসার সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তিন মাস না যেতেই চসেস্কুর সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা প্রায় করে ফেলেছে। আগামী বছর ওর প্রমোশন আটকায় কে? আর এরকম নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকলে ডিকের ভবিষ্যৎ যে ঝরঝরে, গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ও দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিল। একটা প্রশ্ন অনেকক্ষণ ধরে ডিকের মাথায় ঘুরছিলো আকাশ কি ভাববে সেজন্যে বলে নি। শেষে থাকতে না পেরে বলেই ফেললো, এতো অল্প সময়ে হোম মিনিস্টারের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা কীভাবে হল বলবে কি?

কেন, তার সেক্রেটারিকে বলে? লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে সহজ গলায় বললো আকাশ।

সেক্রেটারির কাছে পৌঁছলে কীভাবে?

এলেনা ব্যবস্থা করেছে। ওর এক বান্ধবীর বাবা হচ্ছে হোম, মিনিস্টারের সেক্রেটারি।

এলেনা মানে, ওই যে রুমানিয়ার মেয়েটা? তোমার দোভাষী?

ঠিক ধরেছে। তবে সেক্রেটারিকে এক কার্টন কেন্ট সিগারেটও দিতে হয়েছে।

ঘুষ?

আমি ঘুষ বলি না। মৃদু হেসে জবাব দিলো আকাশ–আমি বলি উপহার। হোম মিনিস্টারকেও উপহার দেবে?

নিশ্চয়ই দেবো। তিরিশ বছরের পুরোনো এক বোতল স্কচ হুইস্কি হোম মিনিস্টার আশা করি অপছন্দ করবেন না।

আর চসেস্কুকে? ভাঙা গলায় জানতে চাইলো ডিক।

প্ল্যাটিনামের ওপর হীরে বসানো ছোট্ট একটা টাইপিন আর কাফলিং।

হা করে কিছুক্ষণ আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো ডিক। তারপর তোক গিলে বললো, তার মানে এসব জিনিষ তুমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছো?

ঠিক তাই।

কি করে নিশ্চিত হলে চসেস্কুর সাক্ষাৎকার পাওয়া যাবে?

নিশ্চিত ছিলাম না। সম্ভাবনার কথা ভেবে এসেছি। এলেনার বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলে পরশু নিশ্চিত হয়েছি।

ওয়ালেসাকেও নিশ্চয় ঘুষ দিয়েছিলেম সাক্ষাৎকারের জন্য?

ঘুষ নয় ডিক, উপহার। শান্ত গলায় জবাব দিলো আকাশ-তোমার জানা উচিৎ এটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।

আমাদের দেশে এসব চলে না।

তুমি বোধহয় জানো না গত বছর পাঁচ মিনিটের সাক্ষাৎকারের জন্য হেনরী কিসিজ্ঞারকে আমরা পাঁচশ ডলার দিয়েছিলাম। আমরা ওটাকে বলি সম্মানী।

আকাশের কথায় বার বার জব্দ হয়ে ডিক কিছুক্ষণ মুখ কালো করে বসে রইলো। তারপর ঘড়ি দেখে শুকনো গলায় বললো, আমাদের যাওয়ার সময় হয়েছে।

আকাশদের হোটেল থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতর গাড়িতে পনের মিনিটের রাস্তা। হোটেলের একটা লিমোযিন গাড়ি নিয়ে আকাশ নিজেই ড্রাইভ করে চলে গেলো সেখানে। সারা পথ গোমড়ামুখো হয়ে বসে রইলো ডিক। আকাশ বুঝলো এটা নিতান্তই পেশাগত ঈর্ষা।

মধ্যবয়সী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ঠিক সাতটায় দেখা করলেন আকাশদের সঙ্গে। প্রথমে জানতে চাইলেন ওরা চা না কফি নেবে। ডিক আর আকাশ কফির কথা বলতেই মন্ত্রী বেল টিপে একজনকে কফি আনতে বলে আকাশের দিকে তাকালেন। মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, বলুন আপনাদের জন্য কি করতে পারি।

আকাশ ওর অভ্যাস অনুযায়ী প্রথমে কাজের কথায় গেলো না। ব্যাগ থেকে স্কচ হুইস্কির বোতল আর এক কার্টুন কেন্ট সিগারেট বের করে টেবিলে রাখলো। হুইস্কির বোতলটা চমৎকার একটা বাক্সে রাখা। দেখে মন্ত্রীর চোখ চকচক করে উঠলো। মৃদু হেসে আকাশ বললো, আপনার জন্য সামান্য উপহার–গ্রহণ করলে বাধিত হবো।

অনেক অনেক ধন্যবাদ। উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন মন্ত্রী—দারুণ জিনিষ এনেছেন। আপনার পছন্দের প্রশংসা না করে পারছি না। এই বলে চট করে ওগুলো তার বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে ফেললেন। অন্য একটা ড্রয়ার টেনে রুমানিয়ার ওপর দুটো বই আর ফ্ল্যাগওয়ালা দুটো কোটপিন বের করলেন। বললেন, আপনার উপহারের তুলনায় এগুলো কিছুই নয়। সামান্য স্যুভেনির, রুমানিয়ার স্মৃতি হিসেবে দয়া করে রাখুন।

ডিক ধন্যবাদ বলে কোটপিনটা নির্বিকার মুখে পকেটে পুরে ফেললো। আকাশ মুখখানা উজ্জ্বল করে কয়েকবার ধন্যবাদ দিয়ে কোটপিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওটাকে জ্যাকেটের পকেটে গেঁথে রাখলো। ওর আচরণে ডিক শুধু অবাক হচ্ছিলো। অতি মামুলি কোট পিন নিয়ে এত উচ্ছ্বাস দেখানোর কোনো কারণই খুঁজে পেলো না। ততক্ষণে একজন সুন্দরী মহিলা কফি বানিয়ে এসেছে। আড়চোখে মহিলাকে একবার দেখে ডিক কফির প্রতি মনোযোগ দিলো। আকাশ মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মন্ত্রীর দেয়া রুমানিয়ার ওপর বইটার কয়েক পাতা উল্টে বললো, চমৎকার বই। প্রচুর তথ্য আছে। আমার অনেক কাজে লাগবে।

মন্ত্রী হাসিমুখে বললেন, কফি নিন। এ ধরনের বই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রের ওপর অনেক আছে। আপনার প্রয়োজন হলে বলবেন, আমি পাঠিয়ে দেবো।

আপনার অনুগ্রহ আমি ভুলবো না। আকাশ বিনয়ে বিগলিত হল।

মন্ত্রী বললেন, অনুগ্রহ দেখাবার কোনো সুযোগ আপনি আমাকে এখনো দেন নি।

আকাশ তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো, আপনার যে বিশেষ অনুগ্রহ ভিক্ষা করতে আমি এসেছি, বুখারেস্টে এক মাত্র আপনার পক্ষেই তা দেয়া সম্ভব।

কী সেটা?

প্রেসিডেন্ট চসেস্কুর একটি সাক্ষাৎকার চাই ভয়েস অব আমেরিকার জন্য।

আকাশের কথা শুনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো–আপনি বোধ হয় জানেন না প্রেসিডেন্ট চসেস্কু বিদেশী কোনো সাংবাদিককে সাক্ষাঙ্কার দেন না।

জানি। তবে আপনাকে আমি অনুরোধ করবো পূর্ব ইউরোপের এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখতে। ওয়ারস জোটের ভেতর একমাত্র আপনারাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সমাজতন্ত্রের পতাকা উঁচু করে তুলে রেখেছেন। গোটা পৃথিবী তাকিয়ে আছে প্রেসিডেন্ট চসেস্কুর দিকে। আমরা চাই তিনি পশ্চিমের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচার মাধ্যমটির সুযোগ গ্রহণ করবেন।

বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে কি যেন ভাবলেন মন্ত্রী। তারপর বললেন, আমি প্রেসিডেন্টের অফিসের সঙ্গে কথা বলবো। প্রেসিডেন্টের সাক্ষাঙ্কার যদি সম্ভব না হয় আপনি কি পররাষ্ট্র মন্ত্রী বা পার্টির কোনো সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী?

কথা আমি সবার সঙ্গে বলতে আগ্রহী। আপনার সঙ্গে কথা বলেও আমি অনেক কিছু শিখতে পারবো। তবে সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট আমার একমাত্র চয়েস?

মাথা নেড়ে সায় জানালেন চিন্তিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী–বুঝতে পারছি। আপনি তো পোল্যান্ডে ওয়ালেসার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন?

আপনি জানেন তাহলে। ওয়ারসতে আমি কমিউনিস্ট পার্টির প্রদান জেরুজালিস্কির সাক্ষাৎকারের চেষ্টাও করেছিলাম। সময়ের অভাবে পারি না।

জেরুজালিস্কি নাম শুনে বিরক্ত হলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী–ভালো করেছেন ওই কাপুরুষের সাক্ষাৎকার না নিয়ে। আমরা ফোর্স পাঠিয়ে ওকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। গর্দভটা রাজি হয় নি। থেচারের ধমক খেয়ে কাপড় খারাপ করে ফেলেছে। তা ওয়ালেসার সঙ্গে কথা বলে কি মনে হলো?

আমেরিকা যদি বড় আকারে কোনো সাহায্য না পাঠায় তাঁর পক্ষে সামাল দেয়া খুব কঠিন হবে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ।

ওয়ারস জোটের ভেতর হাঙ্গেরি আর ওদের অবস্থা কখনোই ভালো ছিলো না। তবে আমেরিকা তেমন কোনো সাহায্য পাঠাবে না।

কেন ভাবছেন পাঠাবে না?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এক গাল হেসে বললেন, মরা ঘোড়ার ওপর কেউ বাজি ধরে না। ওখানে কমিউনিস্টরা আর ক্ষমতায় নেই। আমেরিকার স্বার্থ মিটে গেছে।

রুমানিয়ার ব্যাপারে আমেরিকার মতলব কিছু জানেন? 

তেমন কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই। তবে ঝামেলা পাকাতে গেলে ভুল করবে, এটা আমি বলতে পারি।

সোভিয়েত ইউনিয়নের তরফ থেকে কোনো ঝামেলার আশঙ্কা আছে? খুব সাবধানে প্রশ্নটা করলো আকাশ।

ওদের সঙ্গে মলদোভিয়া নিয়ে গণ্ডগোল তো লেগেই আছে। নতুন করে আর কি ঝামেলা করবে। গর্বাচেভ এখন নিজের ঘর সামলাতেই ব্যস্ত।

প্রফেসর গর্ডনের কথা মনে পড়লো আকাশের। সোভিয়েতের পক্ষ থেকে এরা কোনো ঝামেলা আশা করছে না। ইচ্ছে করলে সোভিয়েত নেতারা এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারে। রুমানিয়ার পরিস্থিতি, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ কথা বললো আকাশ। দেড় ঘন্টা পর ওরা তার দফতর থেকে বেরোলো। মন্ত্রী বলেছেন প্রেসিডেন্টের দফতরের সঙ্গে কথা বলে কালই আকাশকে জানিয়ে দেবেন চসেস্কুর সাক্ষাৎকার নেয়া সম্ভব হবে কি না।

আকাশের পরের প্রোগ্রাম এলেনার সঙ্গে। ওখানে ডিককে নেয়া যাবে না। গাড়িতে উঠে আকাশ ওকে বললো, চলো তোমাকে তোমার অফিসে নামিয়ে দিই। হোম মিনিস্টারের সঙ্গে কথা বলে অনেক তথ্যই তো পেলে। একটা রিপোর্ট লিখে পাঠিয়ে দাও। আমি ব্যক্তিগত কাজে কিছুক্ষণ ব্যস্ত থাকবে।

ডিক মুখ কালো করে বললো, হোম মিনিস্টারের সঙ্গে তো তুমিই কথা বললে। রিপোর্টে কি তোমার কথা উল্লেখ করবো?

কোনো দরকার নেই ডিক। এত সামান্য ব্যাপারে আকাশ কৃতিত্ব নিতে চায় না। বললো, ধরে নাও বৈঠকে আমি ছিলামই না।

আকাশের কথা শুনে ডিকের মুখে হাসি ফুটলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে আকাশের কথা বলার সময় ওর মন খারাপ হচ্ছিলো এটা ভেবে যে আকাশ কি চমৎকার একটা রিপোর্টের বিষয় পেয়ে যাচ্ছে। ডিকের জন্য এসব তথ্য খুবই জরুরি। রিপোর্টটা আকাশের নামে যাবে না শুনে আকাশের ওপর থেকে ওর সব রাগ উঠে গেলো। হেসে বললো, তোমাকে এখনো বুঝে উঠতে পারলাম না আকাশ।

ভয়েস অব আমেরিকার অফিসের সামনে ততক্ষণে গাড়ি থামিয়েছে আকাশ। ডিককে নামিয়ে দিয়ে বললো, আমাকে বোঝার চেয়ে ব্লেন্ডাকে বোঝা তোমার জন্য বেশি জরুরি ডিক।

ডিক কিছু বলার আগেই আকাশের লিমোযিন স করে বেরিয়ে গেলো।

এলেনা ওর জন্য অপেক্ষা করছিলো বোটানিকাল গার্ডেনে। বুখারেস্টে এই এক ঝামেলা। বিদেশী কারো সঙ্গে রুমানিয়ান কাউকে বেশি মেলামেশা করতে দেখলেই চসেস্কুর গুপ্ত পুলিশের নজর পড়বে। এলেনার সঙ্গে মেশার জন্য আকাশ সেজন্যে প্রথম দিনই ওকে দোভাষী হিসাবে ভাড়া করেছে। দোভাষী ভাড়া দিয়ে পর্যটন দফতর প্রচুর টাকা আয় করে। এলেনার জন্য আকাশের কাছ থেকে ওরা যা নিচ্ছে তার মাত্র পনেরো ভাগের এক ভাগ দেয়া হবে ওকে, তাও দেশী মুদ্রায়।

আকাশ জানে এলেনাকে কীভাবে ঠকানো হয়। সে জন্যে গতবারের মতো এবারও ওর জন্য দামি উপহার এনেছিলো। এলেনা অবশ্য গতকালও বলেছে, দোভাষী হিসেবে আকাশের কাছ থেকে টাকা নিতে ওর খুব খারাপ লাগে। আকাশ বলেছে, টাকা তুমি নিচ্ছো না, নিচ্ছে তোমার অফিস। আর এভাবে টাকা যদি না নাও তাহলে তোমার সঙ্গে দেখা করার কোনো সুযোগ থাকবে না।

এলেনাও জানে কথাটা পুরোপুরি সত্যি। ওর কাছে অসহ্য লাগে এই জেলখানার জীবন। নিজের ইচ্ছায় দেশের বাইরে যেতে পারবে না, বিদেশী কারো সঙ্গে কথা বলতে পারবে না, ভোর না হতে রুটির জন্য লাইন দিতে হবে, কাঁহাতক সহ্য করা যায় এসব? নিজের সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গেও মন খুলে কথা বলতে পারে না। সারা দেশে চসেস্কুর গুপ্ত পুলিশের চর গিজগিজ করছে। হয়তো যাকে বন্ধু ভেবে নিজের খারাপ লাগার কোনো কথা বললো, দেখা গেলো সেই সরকারের গুপ্তচর। বাড়িতে বাবা মা আর ওর বড় এক ভাই আছে। বাড়িতেও প্রাণ খুলে কথা বলার জো নেই। নাকি বুখারেস্টের দেয়ালেরও কান কাছে।

এই দম বন্ধ করা জীবনে আকাশ ওর কাছে মুক্ত আকাশের ঠিকানা নিয়ে এসেছে। যে কারণে আকাশকে খুব কাছের একজন বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে এলেনা। মনের ভেতর জমে থাকা যত রাগ আর দুঃখের কথা ছিলো সব ওকে বলে হালকা হয়েছে। শ্রোতা হিসেবে আকাশের জুড়ি নেই। আর আকাশও রুমানিয়ার মতো শেকল বাঁধা দেশে এলেনার মতো একজন ভোলামনের বান্ধবী পেয়ে বর্তে গিয়েছে।

বোটানিকাল গার্ডেনে নির্ধারিত জায়গা লিলি পণ্ডের পাশেই এলেনাকে বসে থাকতে দেখলো আকাশ। কাছে এসে বললো, মিনিস্টারের ওখানে আটকা পড়ে গেলাম। ভদ্রলোক ছাড়তেই চাইছিলেন না।

আকাশ রুমানিয়ান ভাষা জানে না। এখানে সে ব্যবহার করে ফরাশি। এরা ইংরেজির চেয়ে অনেক বেশি বলে জার্মান আর ফ্রেঞ্চ। এলেনা ফরাশি আর ইংরেজি দুই বলতে পারে। আকাশের সঙ্গে ও ইংরেজিতে কথা বলে, যাতে আশেপাশের লোকজন কম বোঝে। আকাশ ওর পাশে বসতেই জানতে চাইলো–কি কথা হল এতক্ষণ?

আকাশ গত কদিনে জেনে ফেলেছে রুমানিয়ার মানুষও পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ওদের ডিক্টেটরকে হটাতে চাইছে। তবে অন্য সব দেশে সরকার বিরোধীদের যে রকম সংগঠন ছিলো এখানে সেরকম কিছু না থাকাতে ও নিজেও বুঝতে পারছিলো না শুরুটা কোত্থেকে আর কীভাবে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে কি কথা হয়েছে সব ও এলেনাকে বললো।

আকাশের কথা শুনে এলেনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে কি যেন ভাবলো। তারপর বললো, তুমি যা জানতে চাইছো আমার মনে হয় তিমিশোয়ারায় গেলে কাজ হবে।

আকাশ একটা সিগারেট ধরিয়ে পুকুরে ফোঁটা আমাজান লিলির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, সেটা কোথায়? ভাবখানা ওর এমন যে মুগ্ধ হয়ে ফুল দেখছে।

এলেনা লিলির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো–গাড়ি নিয়ে গেলে এখান থেকে ছঘন্টার রাস্তা।

তুমি যাবে?

না, আমাকে যেতে দেবে না।

আমি একা গিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করবো? তার কোনো বিপদ হবে না তো?

দেখাটা গোপনে হবে। তুমি সেন্ট পলের গীর্জার সামনে বার বছরের একটা ছেলের দেখা পাবে যে সাদা কারনেশান আর কারো গোলাপ বিক্রি করে। ওকে বলবে, পুরো গোছা নেবো না, কোটের বটন হোলের জন্য ছোট্ট একটা কালো গোলাপ চাই, কত নেবে। ছেলেটা বলবে পাঁচ লেই দিলে আমি খুশি হবো। তুমি দশ লেই এর নোট দেবে। ছেলেটা তোমাকে পাঁচ লেই-এর নোট ফেরত দেবে। সেই নোটে লেখা থাকবে কীভাবে তার সঙ্গে দেখা করবে। এবার বলো কবে যেতে চাও? এলেনা এমনভাবে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছিলো দূর থেকে মনে হবে আকাশকে ও আমাজান লিলির জন্ম বৃত্তান্ত শোনাচ্ছে।

আকাশ বললো, আমি পরশু যেতে পারি। কাল আমাকে হোম মিনিস্টারের ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। রাতে বাংলাদেশ এম্বাসির কাউন্সিলার ডিনারে দাওয়াত দিয়েছেন।

এলেনা উঠে দাঁড়ালো, বললো–চলো কিছুক্ষণ হাঁটি। মনে হচ্ছে কেউ আমাদের ওয়াচ করছে। খবর আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কালো গোলাপে ফেরি করা ছেলেটাকে না পেলে ফেরত চলে আসবে। সেখানে একমাত্র কালো গোলাপ হচ্ছে তোমার ঠিকানা।

আকাশ লক্ষ্য করলো এলেনার কোটের বাটন হোলেও ছোট্ট একটা কালো গোলাপের কুঁড়ি।

.

৬. মারিয়ার জন্য ভালোবাসা

কার্পেথিয়ান পর্বতের এক চমৎকার স্বাস্থ্য নিবাস তুশনাদে ছিলো সুজনদের ক্যাম্প। তিনদিকে উঁচু পর্বতের সারি একদিকে হ্রদ। পর্বতের চূড়ো থেকে হ্রদ পর্যন্ত সব কিছু সাদা বরফে ঢাকা। পর্বতের গায়ে চাদর জড়ানো পাইন গাছগুলো সারি সারি বর্শাফলকের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাকি সব বরফে এমনভাবে চাপা পড়েছে যে বোঝার উপায় নেই কোথায় কি ছিলো। মারিয়া ওকে বলেছে গরমের সময় বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা এখানে আসে বেড়াতে। সারাদিন জঙ্গলে ছুটোছুটি করে, হ্রদের স্বচ্ছ নীল পানিতে হুটোপুটি করে, কেউ বারণ করে না।

মাঝখানে মস্ত বড় একটা মাঠের চারপাশে গোটা বার তিনতলা ইমারত। বাইরে থেকে দেখতে আহামরি কিছু নয়, ভেতরে আরামের সব ব্যবস্থা আছে। নিচের তলায় অফিস, ডাইনিং রুম আর ইনডোর গেমস-এর ব্যবস্থা, দুই আর তিন তলায় থাকার জায়গা। সবগুলো ইমারতের তিনতলার ছাদে কাঁচ দিয়ে ঘেরা চমৎকার একটা বসার জায়গা রয়েছে। প্রত্যেকটা ঘরের সঙ্গে এটাচড বাথরুম। ঘরে দুটো করে বিছানা, দুটো দেয়াল আলমারি, দুটো পড়ার টেবিল, টেলিভিশন, টেলিফোন আর ছোট্ট একটা রেফ্রিজারেটর। সুজনের ঘরে বরুণের থাকার ব্যবস্থা ছিল। ও না আসাতে সুজন একা এক ঘরে থাকে। মারিয়া অনেক রাত পর্যন্ত ওর সঙ্গে গল্প করে। ফ্রিজ ভর্তি আপেল, আঙ্গুর আর অরেঞ্জ জুস। গত দশ দিনে কার্পেথিয়নের তাজা বাতাস আর সব ভালো খাবার খেয়ে চেহারা আরো উজ্জ্বল হয়েছে ওর, ওজনও বেড়েছে। সকালে মারিয়া ওকে বলছিলো, আর কদিন এখানে থাকলে তোমাকে তোমার মাও চিনতে পারবেন না।

সুজন আর মারিয়া কফি খেতে খেতে ছাদের কাঁচঘরে বসে গল্প করছিলো। সেদিন বিকেলে ওদের কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। ক্যাম্প শুরু হওয়ার চতুর্থ দিন সকালে ছিলো বাংলাদেশের অধিবেশন। সুজনকে একঘন্টা বলতে হয়েছে বাংলাদেশের ছাত্র ও যুব আন্দোলন আর দেশের পরিস্থিতির ওপর। এক ঘন্টা শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। ও বলেছে ইংরেজিতে। মাঝে মাঝে মারিয়া দোভাষীর কাজ করেছে। হল ভর্তি ওর বয়সী বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের বাংলাদেশ সম্পর্কে কৌতূহলী প্রশ্ন শুনতে দারুণ ভালো লেগেছিলো সুজনের। মনে হয়েছিলো ও বুঝি সেই মুহূর্তে রুমানিয়ার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

কালো কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে মারিয়া ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলো। গত তিন বছর ধরে মারিয়া পাইওনিয়ার ক্যাম্পে দোভাষীর কাজ করছে। আগে কখনো ওর এমন হয় নি। গত দশ দিনে ওর চেয়ে চার বছরের ছোট বাংলাদেশের এই ছেলেটার জন্য অদ্ভুত এক ধরনের মায়া জন্মে গেছে। বাইরে বরফ ঢাকা কার্পেথিয়ান পর্বতমালার দিকে তাকিয়ে সুজন সুখকর কোনো কিছু ভাবছিলো। ওর দু চোখে স্বপ্ন, ঠোঁটের ফাঁকে হাসির রেখা। মারিয়ার মনে হল সুজন যদি থেকে যেতো তাহলে বেশ হতো। সুজন বলেছে ওর বেড়াতে খুব ভালো লাগে। মারিয়ার বাবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন আমলা। কয়েক বছর রাষ্ট্রদূত ছিলেন এশিয়ার কয়েকটি দেশে। বাংলাদেশে না থাকলেও মারিয়ার বাবা সেখানকার অনেক খবর জানেন। বাবার কাছে শুনে ছোট্ট গরিব এই স্বাধীনতা প্রিয় দেশ সম্পর্কে মারিয়ার কৌতূহল জন্মেছিলো। ওর ইংরেজি জানা বন্ধুরা জাপান, কোরিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ভারত আর ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধিদের দোভাষী হতে বেশি আগ্রহী ছিলো। ওদের বলা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুজন প্রতিনিধি আসবে। সবচেয়ে ছোট দল। এই দলের দোভাষী হওয়ার জন্য মারিয়ার আগ্রহে বান্ধবীরা অবাক হয়েছিলো। ওরা জানে না বিপ্লবের জন্য মারিয়ার দুই চাচা জীবন দিয়েছেন।

অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মারিয়া সুজনকে জিজ্ঞেস করলো, কি ভাবছো?

সুজন মারিয়ার দিকে ঘুরে তাকালো। ও ভাবছিলো কীভাবে স্বপ্নের ঘোরে কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। গত দশ দিনে এত সব অভিজ্ঞতা ওর হয়েছে, যেন ওর বয়স দশ বছর বেড়ে গেছে। কতজনের সঙ্গে পরিচয় হল! এই ক্যাম্পে এসেও কত বন্ধু হল, উপহার বিমিনয় হল–পৃথিবী যে এত বড় জানা ছিলো না সুজনের। চীনের শেন, মিশরের আব্দুল্লাহ, ইন্দোনেশিয়ার ফাতিমা, ইরানের গুলরুখ ওর কাছ থেকে কথা

আদায় করে নিয়েছে দেশে ফিরে মাসে কম পক্ষে একটা চিঠি লিখবে। গত চার সন্ধ্যায় ওকে নাচ শিখিয়েছে বুলগেরিয়ার নিনা। কাল রাতে নাচ শেষ করে সবার সামনে ওর গালে চুমু খেয়েছে। যদিও এতে কেউ কিছু মনে করে নি, এসব দেশে বন্ধুদের চুমা খাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা, কিন্তু সুজন লজ্জায় আপেলের মতো লাল হয়ে গিয়েছিলো।

ক্যাম্পে আসার দুদিন পর ওকে দারুণ এক সারপ্রাইজ দিয়েছেন বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলার ইফতেখার হোসেন। যদিও তার দায়িত্বের ভেতর পড়ে না, খবর পেয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তিনি। সুজন তখন ব্রেকফাস্ট সেরে ওর ঘরে এসেছে কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে লেকচার হলে যাওয়ার জন্য। সেদিন সকালে পরপর ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম আর কোরিয়ার সেশন। এমন সময় ওর ঘরে টেলিফোন বাজলো। তুলতেই অফিস থেকে বললো, তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য বাংলাদেশ এম্ব্যাসির কাউন্সিলার অপেক্ষা করছেন রিসেপশনে।

সুজন একটু ঘাবড়ে গেলো। বুঝে উঠতে পারলো না কাউন্সিলার কেন ওর সঙ্গে দেখা করতে আসবেন। রিসেপশনে যেতেই ছোটখাট গড়নের হাসিখুশি চেহারার মাঝবয়সী ভদ্রলোক ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন–তুমি তাহলে সুজন। তোমার কাগজপত্র দেখেই তোমাকে চিনে ফেলেছি, আমার নাম ইফতেখার। কখনো মার কাছে শুনেছো আমার কথা।

সুজন অবাক হল। মনে করতে পারলো না মা কখনো এ নামের কারো কথা বলেছেন। অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়তেই কাউন্সিলার গলা খুলে হাসলেন–তোমার মার রাগ তাহলে এখনো পড়ে নি। আমি জাফরের বন্ধু ছিলাম। সত্তর সালে তোমার বাবা মার শেষ বিয়ে বার্ষিকীতে যেতে পারি নি বলে তোমার মা রাগ করে বলেছিলো আর কোনোদিন নাকি আমার সঙ্গে কথা বলবে না। বাহাত্তরে তোমার জন্মের পর একবার তোমাদের দেখতে গিয়েছিলাম। তারপর থেকেই দেশের বাইরে। প্রথম দিকে চিঠিপত্র লিখতাম। তোমার মা উত্তর দিতে না দেখে তাও বন্ধ হয়ে গেছে অনেক বছর।

সুজন মনে মনে বললো, চাচাঁদের সংসারে ঝি গিরি করে মা সময় পান কখন যে কারো চিঠির উত্তর দেবেন।

ওকে চুপ থাকতে দেখে কাউন্সিলার বললেন, কি বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি আমি যে তোমার বাবার বন্ধু ছিলাম? আমার বাসায় গেলেই দেখতে পাবে তোমার বাবা মার সঙ্গে আমার অনেক ছবি আছে। কখন যাবে বলো?

সুজন বললো, ক্যাম্প যদ্দিন চলবে বাইরে যাবো কীভাবে? সব প্রোগ্রাম তো। এদের হাতে। ক্যাম্প শেষ হলে সোজা নিয়ে প্লেনে তুলে দেবে।

কাউন্সিলার ওর কথার কোনো গুরুত্ব দিলেন না–বললেই হল প্লেনে তুলে দেবে? ক্যাম্প শেষ হওয়ার পর দু সপ্তাহ তুমি আমাদের সঙ্গে কাটাবে। তোমাকে বুলগেরিয়া থেকেও ঘুরিয়ে আনবো।

বাবার বন্ধুর প্রস্তাব সুজনের খুবই ভালো লাগলো। তবু বললো, মা জানেন আমি দু সপ্তাহ পরে ফিরবো। এখান থেকে ঢাকায় চিঠি লিখলে নাকি চোদ্দ দিন লাগে যেতে।

আমাকে তুমি ইফতি চাচা ডেকো। তোমার বাবা মা আমাকে ইফতি নামে ডাকতো। খবর দেয়ার জন্য ভেবো না। আমি ফোনে কথা বলবো তোমার মার সঙ্গে।

আমাদের বাসায় ফোন নেই ইফতি চাচা।

তাহলে আমি ডিপ্লোমেটিক ব্যাগে তোমার মার নামে চিঠি পাঠিয়ে দেবো।

আমার ভিসা যে পনের দিনের।

পাগল ছেলের কথা শোন! হেসে সুজনের সব কথা উড়িয়ে দিলেন ইফতেখার হোসেন। বললেন, ফরেন মিনিষ্ট্রি আর হোম মিনিষ্ট্রি সবজায়গাতেই আমার বন্ধু আছে। তোমার পনের দিনের ভিসাকে এক মাসে বানানো কোনো সমস্যাই না।

মাত্র আধঘন্টা ছিলেন সুজনের হঠাৎ পাওয়া ইফতি চাচা। সারাক্ষণ ওকে মাতিয়ে রাখলেন, বাবা আর ওঁর ছেলেবেলার সব মজার মজার কথা বলে।

তিন দিন পর আবার এসেছিলেন ইফতি চাচা। এবার সঙ্গে চাচি আর ওঁদের একমাত্র মেয়ে কবিতাও ছিলো। ওর চেয়ে এক বছরের ছোট কবিতা, অথচ ওর গম্ভীর চেহারা দেখলে মনে হয় চার পাঁচ বছরের বড়। চাচা-চাচি দুজনেই বললেন বার তারিখে ক্যাম্প শেষ হওয়ার পর ওকে এসে নিয়ে যাবেন।

আগামী কাল ক্যাম্প শেষ হয়ে যাচ্ছে। দুপুরের পর থেকে সবাই যাওয়া আরম্ভ করবে। ইফতি চাচার ওখানে না গেলে সুজনকেও বিকেলে মস্কোর ফ্লাইট ধরতে হতো। ওকে যেতে হবে এ্যারোফ্লোটে মস্কো হয়ে।

মারিয়া আবার জিজ্ঞেস করলো, এত কি ভাবছো জন?

সুজন মৃদু হেসে বললো, তোমার কথা ভাবছি।

কি ভাবছো আমার কথা? জানতে চাইলো মারিয়া।

এখানে এসে তোমার মতো একজন বন্ধু পাবো আমি স্বপ্নেও ভাবি নি।

আমি ছাড়াও এখানে অনেকের সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব হয়েছে। কাল যে তোমাকে চুমু খেলো–নীনা কি আমার চেয়ে দেখতে খারাপ?

তোমার কি ধারণা চেহারা সুন্দর হলেই ভালো বন্ধু হয়?

কি হলে ভালো বন্ধু হওয়া যায়?

সুন্দর একটা মন থাকলে। অবশ্য তুমি দেখতেও সুন্দর। তার চেয়ে বেশি–তুমি হচ্ছে সুন্দর মনের বন্ধু।

সুজনের কথা শুনে মারিয়ার চোখ ছলছল করে উঠলোকালই তো চলে যাবে তুমি। তোমাকে আমি খুব মিস করবো।

আমিও তোমাকে মিস করবো মারিয়া। চিঠি লিখলে জবাব দেবে?

নিশ্চয়ই দেবো। তুমি যদি কখনো ভুলে যাও লিখতে তবু আমি লিখবো।

তোমাকে লিখতে আমার কখনো ভুল হবে না।

তুমি তো আরো কিছুদিন থাকবে রুমানিয়ায়?

হ্যাঁ, তুমি তো দেখেছো আমার বাবার বন্ধুকে।

চমৎকার ভদ্রলোক। রাতে আমাকে ফোন করো।

বলতে হবে না মারিয়া। ফোন করে সারারাত জাগিয়ে রাখবো তোমাকে।

রাত জাগতে আপত্তি নেই যদি ফোনে গান শোনাও।

গান গাইবো ফোনে! কী সর্বনাশ! আমার চাচার মেয়েটাকে দেখেছো? কী রকম পুলিশের মতো দেখতে।

ধ্যেত! কবিতা পুলিশ হতে যাবে কেন! হেসে ফেললো মারিয়া–ওকে আমি ফরেন মিনিস্ট্রির একটা ফাংশনে দেখেছি। কি চমঙ্কার গিটার বাজিয়ে গাইলো–কান্ট্রি রোড টেক মি হোম। গানটা এখনো মনে আছে আমার।

কবিতা গান গায়! বলো কি! আমি তো ভেবেছিলাম গান শুনলে ওর কপালে ভাঁজ পড়বে।

না, না। কবিতা খুব ভালো মেয়ে। তোমার ভালো বন্ধু হবে।

আমার বেশি বন্ধু দরকার নেই মারিয়া। তুমি যতদিন বন্ধু আছো ততদিন আর কোনো বন্ধুর কথা আমি ভাববো না।

মারিয়া মিষ্টি হাসলো। বললো, আরেক কাপ কফি আনবো? আমার ইচ্ছে করছে তোমার সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ বসি।

আমারও তাই ইচ্ছে। সুজনও হাসলো।

মারিয়া টেবিলে রাখা কাগজের কাপ দুটো তুলে নিয়ে নিচে গেলো কফি আনতে। ঢাকায় থাকতে আসিফ ওকে তিন চারদিন কফি খাইয়েছিলো। এখানে মারিয়ার সঙ্গে কফি খেতে খেতে রীতিমতো নেশা ধরে গেছে। মারিয়া শুনে কালই ওর সুটকেসে এক কৌটা কফি গুঁজে দিয়েছে। ভাগ্যিস আসিফ ওকে কিছু হ্যাঁন্ডিক্রাফট কিনে দিয়েছিলো বন্ধুদের উপহার দেয়ার জন্য। মারিয়াকে ও দিয়েছে হাড়ের নকশা করা বালা। মারিয়া ওকে দিয়েছে ফারের এই কোটটা, যেটা পরে ও এখন বসে আছে। অন্য সব বন্ধুর দেয়া উপহারে বোঝাই হয়ে গেছে ওর সুটকেস।

মারিয়া দু কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি এনে টেবিলে রাখলো। সুজন বললো, আজ আমাদের ব্লকটা বেশি চুপচাপ কেন মনে হচ্ছে বলো তো?

জানো না বুঝি! মারিয়া হেসে বললো, নিচে অডিটোরিয়ামে সিনেমা দেখাচ্ছে। সবাই সেখানে। যাবে নাকি।

না মারিয়া, সিনেমা দুটো দেখেছি আর নয়। আমার খুব ভালো লাগছে তোমার সঙ্গে গল্প করতে।

মারিয়াকে ওর সব কথাই বলেছে সুজন। এমন কি রোম আসার পথে জামাল আহাদের সঙ্গে যে পরিচয় হয়েছে সে কথাও বলেছে। মারিয়া বলেছে, তোমার মিষ্টি স্বভাবের জন্য সবাই তোমার বন্ধু হতে চাইবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এখানে আসার পর নিজেকেও ভালোভাবে চিনতে পেরেছে সুজন। মারিয়ার সঙ্গে পরিচয় না হলে অনেক অভিজ্ঞতা ওর অজানা থেকে যেতো।

পরদিন বিকেলে ক্যাম্প যখন ফাঁকা হতে শুরু করেছে ইফতি চাচা এলেন ওকে নিতে। দুপুরের পর থেকে মারিয়া ছিলো ওর সঙ্গে। বিদায় নেয়ার সময় সুজন খুব স্বাভাবিকভাবে মারিয়ার গালে চুমু খেলো। হাত মেলাতে গিয়ে মারিয়া বেশ কিছুক্ষণ ওর হাত চেপে ধরে রাখলো নিজের হাতের মুঠোয়। সুজনের বুঝতে অসুবিধে হল না মারিয়া ওর ভালোবাসার উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে চাইছে।

সুটকেসটা পেছনের সিটে রেখে সুজন মারিয়াকে বললো, আজ রাতেই ফোন করবো। মন খারাপ করো না।

মারিয়া হাসার চেষ্টা করলো-তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকলাম।

সুজনের জন্য একটি রুমানিয়ান মেয়ের ভালবাসা ইফতি চাচার হৃদয় স্পর্শ করলো। মারিয়াকে বললেন, কাল রাতে আমার বাড়িতে সুজনের অনারে ডিনার দিচ্ছি। আমি খুব খুশি হবো তোমার বাবা মার সঙ্গে যদি তুমি আসো। তোমার বাবার সঙ্গে কাল অফিসে গিয়েই কথা বলবো।

মারিয়া অভিভূত হয়ে বললো, ডিনার নিমন্ত্রণের জন্য অনেক ধন্যবাদ আঙ্কেল। আমার মনে হয় না বাবা আপত্তি করবেন।

ইফতি চাচা নিজেই চালাচ্ছিলেন গাড়ি। সুজন ওঁর পাশের সিটে বসেছিলো। গাড়ি ছাড়ার পর ও বললো, আমার অনারে ডিনার আর আমিই জানি না। এটা কি রকম হলো ইফতি চাচা? এখানে আসর পর ওর কথার ধরণও বদলে গেছে।

তোকে সারপ্রাইজ দেবো বলে বলি নি।

সুজন হেসে ফেললো–জেনেই তো গেলাম। সারপ্রাইজ আর থাকলো কোথায়?

তোর বান্ধবীর কান্না দেখে মনটা কেমন করে উঠলো। তাই ওকে কান্না ভোলাবার জন্য তোর সামনে কথাটা বলে ফেললাম।

সুজন লজ্জা পেয়ে কথা ঘুরিয়ে বললো, ডিনারে আর কে আসবেন?

আমাদের এ্যাম্বাসাডর আসবেন ম্যাডামসহ, ইণ্ডিয়ান এম্ব্যাসির কাউন্সিলার আসবেন আর ভয়েস অব আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি হয়ে এসেছে আমাদের দেশী এক ছেলে, সে আসবে।

আমাদের দেশী ছেলে, কি করে ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিনিধি হল?

দেশী নামেমাত্র। জন্মেছে আমেরিকায়, পড়ালেখা ওখানেই করেছে। মেরিট ভালো, তাই ভয়েস অব আমেরিকা ওকে ইস্ট ইউরোপিয়ান ডেস্কে বসিয়েছে। রুমানিয়ায় আগেও দুবার এসেছে। এবার চসেস্কুর ইন্টারভিউ নেয়ার চেষ্টা করছে।

আপনার সঙ্গে পরিচয় হলো কীভাবে?

গতবার ও যখন এখানে ছিলো তখন আমেরিকান এম্ব্যাসির এক পার্টিতে পরিচয় হয়েছিলো। জন্মগতভাবে আমেরিকার নাগরিক হলেও বাঙালি রান্না ওর খুব পছন্দ, তাই সেবারও ওকে বাড়িতে একদিন নেমন্তন্ন করে খাইয়েছিলাম।

আপনি খুব অতিথিপরায়ন, তাই না ইফতি চাচা?

বুঝিস তো, এমন এক জায়গায় থাকি, দেশের মানুষের চেহারা দেখা, দেশী কথা শোনার সুযোগ খুব কমই হয়। তাই তোর চাচি আর আমি সুযোগ পেলে ছাড়ি না।

মা শুনলে খুব অবাক হবেন আপনার সঙ্গে এভাবে দেখা হয়ে গেলো।

অবাক হলে ক্ষতি নেই, তোকে আটকে রাখার জন্য রেগে না গেলেই বাঁচি।

রাগবেন কেন, মা জানেন বেড়াতে আমি কত ভালবাসি। জীবনে প্রথম এত বড় একটা সুযোগ পেয়েছি। রুমানিয়া যাবো শুনে মা খুশিতে কেঁদে ফেলেছিলেন।

ইফতি চাচা চিন্তিত গলায় বললেন, ডিনারের ব্যাপারটা যে জেনে ফেললি, তোর চাচি জানলে আমাকে বকবে। ও ঠিক করেছিলো সারপ্রাইজটা ও-ই তোকে দেবে।

সুজন একটু ভেবে বললো, ঠিক আছে ইফতি চাচা। আমি সারপ্রাইজড হবো। ধরে নিন কথাটা আমি শুনি নি। মারিয়াকে আপনি আড়ালে ডেকে বলেছেন।

তোর মাথায় খুব বুদ্ধি আছে। এই বলে হা হা করে গলা খুলে হাসলেন ইফতি চাচা। তারপর বললেন, ডিনারে যখন সারপ্রাইজ দেয়া গেলো না দেখি তোকে আর কীভাবে সারপ্রাইজ দেয়া যায়।

ইফতি চাচাকে এ নিয়ে বেশি ভাবতে হয় নি। পরদিন ডিনারে আকাশ ওদের। এমন এক সারপ্রাইজ দিয়েছিলো যে সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলো।

<

Super User