ইকবাল আজ আট-দশ মাস হতে চলল হোসেন স্যার নামে পরিচিত হয়ে ফুকরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। স্কুলে জয়েন করার পর সেক্রেটারীর সদরে মাস দুয়েক থেকে নিজের ভিটেয় দুইরুমের বাড়ি করে সেখান থেকে চলে এসেছে। তারপর শিক্ষকতার সাথে সাথে ডাক্তারী শুরু করেছে। বাড়ি করার সময় গ্রামের লোকজন আপত্তি করে বলেছিল, ঢাকার লোক গ্রাম দেখতে এসে ফুকরা মেয়েদের। স্কুলে মাস্টারী করত, সেখানে থাকত, ভালো কথা। কিন্তু মরহুম কাজেম সেখের। ভিটেয় বাড়ি করবে কেন? তখন ফজল সেখ ও গেঁদু মুন্সী তাদেরকে বলেছেন, উনি শুধু শিক্ষিত নন, একজন বড় হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারও। গ্রামের গরিবদের অসুখ বিসুখে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করবেন। পরে জমি-জায়গা কিনে একটা হাসপাতালও করবেন। সেখানেও গরিবদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করা হবে। আর উনি যে আমাদের মসজিদ পাকা করে দিয়েছেন, তা তো আপনারা জানেন। তাছাড়া উনি ফজলের কাছে স্টাম্পের উপর লিখে দিয়েছেন, মরহুম কাজেমের ছেলে যদি কখনও ফিরে আসে, তাকে তার বাপের ভিটে ছেড়ে দেবেন।

এই কথা শোনার পর গ্রামের লোকজন আর কোনো আপত্তি করেনি।

ইন্টারভিউ নেয়ার পর স্কুল কমিটি যখন ইকবালকে সিলেক্ট করল তখন সে হেড মাস্টারকে চুপি চুপি বলল, সার্টিফিকেটে আমার পুরো নাম ইকবাল হোসেন আছে। আমি সবার কাছে শুধু হোসেন নামে পরিচিত হতে চাই।

লতিফ স্যার মৃদু হেসে বললেন, মনে হচ্ছে এর পিছনে কোনো কারণ আছে?

ইকবালও মৃদু হেসে বলেছিল, আপনার অনুমান ঠিক।

স্কুলে ও আশ-পাশের গ্রামের লোকজনের কাছে ইকবাল যেমন হোসেন স্যার নামে পরিচিত তেমনি একজন ভালো শিক্ষক ও ভালো ডাক্তার হিসেবেও প্রশংসিত। গরিবরা হোসেন ডাক্তারকে আল্লাহর রহমত মনে করে।

গতকাল পাশের গ্রাম থেকে একটা বুড়ো রুগীকে দেখে ফেরার সময় হোসেন স্যার রুকসানাকে যখন ষাড়ের কবল থেকে রক্ষা করেছিল তখন তার মুখ দেখেই চিনতে পেরেছিল। তাই আজ ওষুধ দেওয়ার অসিলায় আলাপ করতে গিয়েছিল। ফেরার পথে চিন্তা করল, এত বছর না দেখার ফলে গতকাল রুকসানা আমাকে। চিনতে পারেনি। আজ আব্বার ভিটেয় ঘর করে আছি শুনে চমকে উঠেছিল। তাছাড়া আলাপের সময় যেসব কথা বলেছি; আশা করি মনে সন্দেহ জাগাতে সক্ষম হয়েছি। দেখা যাক আল্লাহর কি মর্জি।

আজ যখন সবাই একসঙ্গে খাওয়ার টেবিলে এসে বসল তখন রুকসানা বলল, কাল পলাশপুরের আমাদের কারখানার একজন অসুস্থ শ্রমিককে চিকিৎসা করার জন্য ডাক্তার নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর ফেরার পথে বিপদে পড়ার ও বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার ঘটনা বলে বলল, যিনি আমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তার সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম, তিনি মনিরাদের স্কুলে ইংলিশের টিচার। ঘরে এসে শুধু আব্বা আম্মাকে কথাটা বলেছিলাম। পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছি মনে করে আজ ওষুধ নিয়ে আমাদের কারখানায় এসেছিলেন। আলাপ করে জানতে পারলাম উনি টিচারীর সাথে সাথে হোমিও প্র্যাকটিস করেন। যাই হোক, এক সময় আমি তাকে মনিরাকে পড়াবার কথা বলি। প্রথমে সময়ের অজুহাত দেখালেও পরে ছুটির পর ঘণ্টাখানেক পড়াতে রাজি হয়েছেন। তারপর মনিরার দিকে তাকিয়ে বলল, কাল থেকে ওঁর কাছে পড়বি। সামসু চাচা তোর জন্য অপেক্ষা করবে। সামুস মনিরাকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যায় ও নিয়ে আসে।

আব্দুল মতিন রুকসানার দিকে তাকিয়ে বললেন, কাল বললাম না, দেখা হলে নিয়ে আসবি? দ্রলোক তোকে কত বড় বিপদ থেকে রক্ষা করলেন, তাকে কৃতজ্ঞতা

জানান আমাদের উচিত।

রুকসানা বলল, আসতে বলেছিলাম, বললেন, “আজ সময় নেই অন্য দিন আসবেন।”

এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না, খাওয়া দাওয়ায় মন দিল।

পরের দিন হোসেন ক্লাস নিতে এসে মনিরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, তোমার আপা তোমাকে কিছু বলেছেন।

জ্বি, ছুটির পর আপনার কাছে পড়তে বলেছেন।

ছুটির পর ক্লাসেই থেক কেমন?

জ্বি, থাকব।

প্রায় দিন পনের পর পড়ার সময় মনিরা বলল, আপনি যেদিন বড় আপার কারখানায় গিয়েছিলেন, সেদিন তাকে বলেছিলেন, একদিন আমাদের বাড়িতে যাবেন। যান নি কেন?

হোসেন বলল, সেকথা কী তোমার বড় আপা তোমাকে বলেছেন?

আমাকে বলেননি। ঐ দিন রাত্রে খাওয়ার সময় বাড়ির সবার সামনে বলেছে। আমিও সেখানে ছিলাম। আজ আব্বা বললেন, “তোর স্যারকে আমার কথা বলে আসতে বলবি।”

হোসেন অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সময় করে উঠতে পারিনি। সকাল বিকাল রুগীর খুব ভীড় থাকে। ঠিক আছে, তোমার আব্বাকে বলো শুক্রবার সকালে যাব।

মনিরা ঘরে ফিরে স্যারের আসার কথা আম্মা-আব্বা ও বড় আপাকে জানাল।

শুনে রুকসানা ভাবল, হোসেন স্যার ইকবাল কিনা আমি চিনতে না পারলেও আব্বা হয়তো পারবে। যদি চিনতে পারে, তাহলে আব্বা কি করবে ভেবে বেশ চিন্তিত হল।

বৃহস্পতিবার পড়াবার সময় হোসেন মনিরাকে বলল, অত্যন্ত জরুরী কিছু ওষুধ কেনার জন্য কাল সকালে আমি ঢাকা যাব। তাই তোমাদের বাড়িতে যেতে পারব না। তোমার আব্বাকে বলো, কথা দিয়ে রাখতে পারলাম না, তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করেন।

মনিরা বলল, শনিবার ঢাকা গেলে হয় না স্যার?

না হয় না। ওষুধগুলো মুমূর্ষ রুগীর। যে কোনো সময়ে দরকার হতে পারে। ডাক্তার ছাড়া অন্য কেউ এই গুরুত্বের কথা বুঝবে না।

তাহলে কবে যাবেন বলুন?

এবার আর নির্দিষ্ট তারিখ দিতে পারব না। দেখলে তো, একবার দিয়ে রাখতে পারলাম না। তাই আর কবে যাব ওয়াদা করব না। তবে ইনশাআল্লাহ একদিন যাব।

ঘরে এসে মনিরা কথাটা প্রথমে আব্বা আম্মাকে জানাল। তারপর বড় আপার রুমে এসে তাকেও জানাল।

কথাটা শুনে রুকসানা ভাবল, আব্বা চিনে ফেলতে পারে ভেবে এলেন না? না সত্যিই জরুরী ওষুধ কিনতে ঢাকা যাবেন? মনিরাকে চলে যেতে দেখে বলল, এই শোন।

মনিরা ফিরে এসে বলল, কি বলবে তাড়াতাড়ি বল, খুব খিদে পেয়েছে।

তোদের ক্লাসে দক্ষিণ ফুকরার কোনো মেয়ে পড়ে না?

আমাদের ক্লাসে পড়ে না, তবে আমার বান্ধবীর মামাতো বোনের বাড়ি দক্ষিণ ফুকরায়। সে এইটে পড়ে।

তোর বান্ধবীকে ও তার মামাতো বোনকে একদিন নিয়ে আসিস তো।

কেন বড় আপা?

কেন আবার, দরকার আছে।

ঠিক আছে নিয়ে আসব, এবার যাই?

যা।

মনিরার সব কিছু বোঝার মতো জ্ঞান হয়েছে। যেতে যেতে ভাবল, হোসেন স্যার আসবে শুনে বড় আপার মুখে আনন্দের আভা দেখেছিলাম। আজ আসবে না শুনে মুখটা মলিন হতে দেখলাম। তাহলে কি স্যারের প্রতি বড় আপা….., ছিঃ ছিঃ বড় আপাকে নিয়ে একি ভাবছি? চিন্তাটা দূর করে দিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, খেতে দাও।

মনিরা শনিবার স্কুলে গিয়ে বান্ধবী জয়তুনকে বলল, আমি তোদের বাড়িতে কতবার গেছি? তুই যাবি যাবি করে একদিনও গেলি না। আজ যাবি।

জয়তুন বলল, ছুটির পর তুই হোসেন স্যারের কাছে পড়িস। তারপর গিয়ে ফিরে আসতে রাত হয়ে যাবে না?

তুই যেতে চাইলে আজ পড়ব না। কী যাবিতো?

আজ নয় কাল যাব।

কেন আজ গেলে কি হয়?

বারে, মাকে বলে আসতে হবে না?

তাহলে কাল যাবি তো?

হ্যাঁ যাব। সঙ্গে আনোয়ারাকেও নেব। তা না হলে ফেরার সময় একা একা খারাপ লাগবে। আজ ওকে বলে দেব, কাল আসার সময় বাড়িতে যেন বলে আসে, কাল আমাদের বাড়িতে থাকবে।

.

ইকবাল প্রায় এক বছরের মতো হল গ্রামের বাড়িতে এসেছে। এর মধ্যে একবারও ঢাকায় না গেলেও শত ব্যস্ততার মধ্যে খালেক চাচাকে মাঝে মধ্যে চিঠি দিয়েছে। খালেকও চিঠির উত্তর দিয়েছে। মালেকার সঙ্গে দেখা করার জন্য একবার ফরিদপুর গিয়েছিল। সে সময় একমাস কলেজ বন্ধ থাকায় মালেকা ঢাকায় চলে গিয়েছিল। তাই তার সঙ্গে দেখা হয়নি। পরে সময়ের অভাবে আর যেতে পারেনি। এবারেও ওষুধ কিনতে ঢাকায় এসে খালেক চাচার বাড়িতে উঠল। এক সময় খালেক। বলল, মালেকা চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, সে যখন ছুটিতে এখানে ছিল তখন তুমি নাকি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে। যাওয়ার সময় তোমার ঠিকানা নিয়ে গেছে তোমাকে চিঠি দেবে বলে। দিয়েছিল চিঠি?

ইকবাল বলল, কই আমি তো তার কোনো চিঠি পাইনি। তারপর বলল, গ্রাম দেশে অনেক চিঠি মার যায়। কাজের চাপে আমিও আর যেতে পারিনি। এবারে ফিরে গিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।

সেখানে ফরিদা ছিল। স্বামীকে কী যেন ইশারা করল। খালেক বুঝতে পেরে বলল, আমরা তোমার বিয়ে দেওয়ার কথা বলতে তুমি বলেছিলে গ্রামের মেয়ে বিয়ে করবে। সে ব্যাপারে কতদূর কি করলে? তোমার বিয়ের বয়স তো পার হয়ে যাচ্ছে।

ইকবাল চাচির ইশারা দেখে ফেলে, তারপর চাচার কথা শুনে বুঝতে পারল, তারা তাকে জামাই করার আশা এখনো ছাড়েনি। বলল, আব্বা আম্মার নামে একটা হাসপাতালের কাজে হাত দিয়েছি। সেটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে তারপর যা করার করব।

খালেক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, কি জানি বাবা। আজকালকার ছেলেমেয়েরা কেন যে সময় মতো বিয়ে করতে চায় না, তা তারাই জানে।

ইকবাল দুদিন পরে ফিরে যাবে মনে করেছিল। কিন্তু মিটিং এ স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেক্রেটারিয়েটে বেশ কয়েকদিন ছুটাছুটি করতে হল। তবু মিটিংএ আনার ব্যবস্থা করতে পারল না। তবে উনি কথা দিয়েছেন, হাসপাতাল উদ্বোধন করতে যাবেন।

.

এদিকে পরের দিন মনিরা স্কুল ছুটির পর বান্ধবী জয়তুন ও তার মামাতো বোন আনোয়ারাকে নিয়ে বাড়িতে এল।

আলাপ পরিচয় ও আপ্যায়নের পর রুকসানা আনোয়ারাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি গেঁদু মুন্সীকে চেন?

আনোয়ারা বলল, আমাদের ঘর থেকে ওনাদের ঘর দূরে। তবু চিনি। তারপর হেসে ফেলে বলল, ছেলেবেলায় রাস্তায় দেখলে আমরা কিরপীন চাচা বলে দৌড়ে পালিয়ে যেতাম।

ওঁর মেয়ে আসমাকে চেন?

জ্বি বড় আপা, আসমা আপাকে সব মেয়েরাই চিনে। উনি ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েদেরকে তবলীগ করেন। কুরআন ও নামায পড়া শেখান। আমিও শিখি।

রুকসানা একটা মুখ বন্ধ খাম তার হাতে দিয়ে বলল, এটা তোমার আসমা আপাকে দিয়ে বলবে, সেও যেন এরকম একটা খাম তোমার হাতে দেয়। দিলে তুমি স্কুলে মনিরাকে দিও। তাহলে আমি পাব। তারপর বলল, তোমরা গল্প কর আমি যাই।

বড় আপা চলে যাওয়ার পর মনিরা ওদেরকে বলল, আসমা আপা বড় আপার সই। অনেক দিন খোঁজ খবর পাইনি তাই চিঠি দিল।

ফেরার পথে আনোয়ারা জয়তুনকে বলল, আচ্ছা আপা, মনিরার বড় আপা ঘরের ভিতরেও সানগ্লাস পরেছিল কেন?

জয়তুন বলল, আমি জানব কি করে? তোর মতো আমিও আজ প্রথম ওদের ঘরে গেলাম। আমার মনে হয়, ওনার চোখে কোনো ডিফেক্ট আছে।

আনোয়ারা বলল, তোমার অনুমান বোধ হয় ঠিক। আমারও তাই মনে হয়েছে। তারপর বলল, ওরা খুব বড়লোক তাই না আপা?

জয়তুন বলল, হ্যাঁ। আব্বার মুখে শুনেছি, ওদের পূর্বপুরুষরা নাকি জমিদার ছিল।

ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেল বলে জয়তুন আনোয়ারাকে ঘরে যেতে দিল না।

পরের দিন স্কুল থেকে ঘরে ফেরার পথে আনোয়ারা আসমাদের ঘরে গিয়ে খামটা তার হাতে দিয়ে বলল, এটা মনিরা আপার বড় আপা আপনাকে দিয়েছে।

বিয়ের পর আসমা মাঝে মধ্যে রুকসানাকে ডাকে চিঠি দেয়। রুকসানাও উত্তর দেয়। বছরে দু’একবার স্বামীকে নিয়ে বেড়িয়ে আসে। বছর খানেক হল ইকবাল ভাই আসার ফলে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। তাই যোগাযোগ রাখতে পারেনি। মনিরাকে আসমা চিনে। আনোয়ারার কথা শুনে বলল, তোমাকে কী মনিরা এটা দিয়েছে?

আনোয়ারা বলল, না। আমার ফুপাতো বোন জয়তুন আপা মনিরা আপার বান্ধবী। জয়তুন আপা ও আমি কাল মনিরা আপাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। এক সময় মনিরা আপার বড় আপা এই খামটা দিয়ে বললেন, আপনিও যেন এরকম একটা খাম আমার হাতে দেন এবং আমিও যেন সেটা স্কুলে মনিরা, আপাকে দিই।

আসমা বলল, ঠিক আছে, তুমি কাল স্কুলে যাওয়ার সময় নিয়ে যেও।

তাই নিয়ে যাব। এবার আসি আপা বলে আনোয়ারা চলে গেল।

আসমা খামটা খুলে চিঠিটা পড়ল।

সই,

আশা করি, আল্লাহর রহমতে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছিস। অবশ্য। আমার কামনাও তাই। মনে হয় আমাকে ভুলে গেছিস। তা না হলে এক বছরের। মধ্যে একটা চিঠি দিয়েও খোঁজ নিলি না কেন? যাই হোক, কর্মব্যস্ততায় আমার দিন একরকম কেটে যাচ্ছে। তবে রাতের একাকীত্ব বড় পীড়া দেয়। আর ইকবালের কথা। মনে পড়লে সেই পীড়া হাজারগুণ বেড়ে যায়। যাকে বার তের বয়সের পর থেকে। আজ বত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত একবার চোখের দেখাও দেখলাম না। তার স্মৃতি কেন। আমাকে এত পীড়া দেয় বলতে পারিস? সেই স্কুল লাইফ থেকে তাকে ভুলে যাওয়ার জন্য তুই আমাকে অনেক উপদেশ দিয়ে বুঝিয়েছিস। আমিও অনেক সময় চিন্তা করেছি যার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি সে তো জানে না, আমি তাকে কত ভালবাসি, তার অপেক্ষায় জীবন যৌবন পার করে দিচ্ছি। সে হয়তো বিয়ে করে স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছে। তবু কেন যে তাকে ভুলতে পারিনি, তা আমি নিজেই জানি না। এটাই আমার তকৃদিরের লিখন ভেবে মনকে বোধ দিয়ে দিন কাটাচ্ছি। মনের আবেগে অনেক কিছু লিখলাম। এবার আসল কথায় আসি।

ফুকরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হোসেন স্যার নামে ঢাকার এক ভদ্রলোক নাকি কাজেম চাচার ভিটেয় দু’কামরা ঘর তুলে বসবাস করছেন। আর ডাক্তারখানা খুলে। গবিরদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করছেন। ব্যাপারটা আমার মাথায় ঠিক ঢুকছে না। অবশ্য কিছু দিন আগে হঠাৎ একদিন দৈব দুর্ঘটনার মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। চিঠিটা বড় হয়ে যাবে ভেবে দুর্ঘটনাটা লিখলাম না। তোর চিঠি পাওয়ার পর জানাব। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছি ভেবে পরের দিন কারখানায় এসে ওষুধ দিয়ে যান। সেই সময়। তাকে ছুটির পরে স্কুলে মনিরাকে পড়াবার ব্যবস্থা করি; কিন্তু উনি যে পরিচয় আমাকে দিয়েছেন এবং লোক মুখে যা কিছু শুনেছি তাতে ওঁকে ইকবাল বলে সন্দেহ হচ্ছে। তোদের ঘর যখন ওঁর ঘরের কাছে তখন নিশ্চয় তুই ও দাইহান ভাই ওঁকে। ভালোভাবে জেনেছিস? যা জেনেছিস দু’কলম লিখে পত্রবাহকের হাতে দিলে আমি পাব। একটা কথা জেনে রাখ, আমি এইট্টি পারসেন্ট সিওর, হোসেন স্যারই ইকবাল। কালকেই উত্তর দেওয়া চাই।

আল্লাহপাকের দরবারে তোদের সবার সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করে আজকের মতো বিদায় নিলাম।

ইতি
তোর সই
রুকসানা।

চিঠিটা পড়ে আসমা বালিসের তলায় রেখে দিয়ে সংসারের কাজে লেগে গেল।

মাগরিবের নামায পড়ে দাইহান ঘরে এলে চা-মুড়ি খেতে দিয়ে চিঠিটা এনে। তার হাতে দিয়ে বলল, পড়ে দেখ। রুকসানা ও পাড়ার আনোয়ারার হাতে পাঠিয়েছে।

দাইহান ফাঁইভ পর্যন্ত পড়লেও বিয়ের পরে আসমা তাকে পুরো একটা বছর ঘুমাবার আগে উঁচু ক্লাসের বাংলা ও ইংলিশ পড়িয়েছে। এখন দাইহান যেকোনো বাংলা ও ইংরেজি বই ভালোভাবে পড়তে পারে।

দাইহান চিঠিটা পড়ে বলল, হোসেন তার সম্বন্ধে কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করেছে। এখন উত্তরে কী লিখবে?

আসমা বলল, চিঠি পড়ার পর থেকে চিন্তা করছি, কিন্তু আমার মাথায় তো কিছুই আসছে না।

দাইহান বলল, এক কাজ কর, চিঠিটা হোসেনকে দাও, সে কী বলে দেখ।

আসমা বলল, তুমি ঠিক বলেছ। এমন সহজ বুদ্ধিটা আমার মাথায় এল না কেন বলতে পার?

পারি?

বলতে শুনি?

বিয়ের আগে মেয়েদের বুদ্ধি বেশি থাকে; বিয়ের পরে সেই বুদ্ধি সংসার, স্বামী ও ছেলেমেয়েদের পিছনে খরচ করতে করতে কমে যায়। তোমারও তাই হয়েছে।

আসমা হেসে উঠে বলল, আর ছেলেদের বিয়ের আগে বুদ্ধি কম থাকে। বিয়ের পর স্ত্রীর উপর সবকিছু ছেড়ে দেয় বলে ছেলেদের বুদ্ধি বাড়তে থাকে তাই না?

নিশ্চয় বলে দাইহানও হাসতে লাগল।

এখন ইয়ার্কি রেখে যা বলছি শোন, এশার নামাযের পর হোসেন ভাইকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।

দাইহান বলল, সে তো দু’তিন দিন হল ঢাকা গেছে। ফিরে এলে ডেকে নিয়ে আসব।

পরের দিন আনোয়ারা স্কুলে যাওয়ার সময় আসমার কাছে এল।

তাকে দেখে আসমা বলল, কাজের জন্য চিঠিটা লিখতে সময় পাইনি। মনিরাকে বলিস, কয়েকদিন পরে তার বড় আপার চিঠির উত্তর দেব।

আনোয়ারা স্কুলে গিয়ে আসমা আপা যা বলতে বলেছিল মনিরাকে বলল।

মনিরার মুখে কথাটা শুনে রুকসানার প্রথমে আসমার উপর দুঃখ হল। ভাবল, এত কি কাজে ব্যস্ত যে দু কলম লিখবার সময়ও পেল না। পরক্ষণে মনে হল, কাজের ব্যস্ততা অজুহাত নয় তো? অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে? কয়েকদিন অপেক্ষা করেই দেখা যাক।

হোসেন আটদিন ঢাকায় থেকে যেদিন ফিরে এল, সেইদিন এশার নামাযের পর দাইহান তাকে ঘরে নিয়ে এল।

আসমা সালাম ও কুশল বিনিময় করে চিঠিটা দিয়ে বলল, আমার কথা সত্য কিনা পড়ে দেখ। পাঁচ দিন আগে পেয়েছি, কি জানাব ভেবে না পেয়ে উত্তর দিইনি। কয়েকদিন পরে দেব বলে জানিয়েছি।

হোসেন চিঠি পড়ে ভীষণ আনন্দিত হল। মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে চিঠিটা পকেটে রেখে বলল, তোমাকে উত্তর দিতে হবে না। ইনশাআল্লাহ, আমিই কাল তার সঙ্গে দেখা করব। এখন আসি কেমন?

আসমা বলল, এক মুঠো খেয়ে যাও তোমার জন্য রান্না করেছি।

খাওয়ার পর আসমা বলল, দেখা করার পর সই কি বলল, আমাকে জানাবে তো ভাই?

জানাব বলে হোসেন বিদায় নিয়ে নিজের ঘরে চলে এল। তারপর অনেক রাত পর্যন্ত রুকসানার সঙ্গে কিভাবে আলাপ করবে চিন্তা করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

হাসপাতালের জন্য জমি কেনার পর গেঁদু মুন্সী, ফজল, দাইহান ও গ্রামের চার পাঁচজন গণ্যমান্য লোক নিয়ে হোসেন একটা কমিটি গঠন করেছে। তারা হাসপাতাল বিল্ডিং তৈরির কাজের তদারকি করছেন। ইতিমধ্যে বিল্ডিং এর কাজ অনেক এগিয়ে গেছে। পরের দিন সকালে ফজরের নামায পড়ে হোসেন কমিটির সদস্যদের নিয়ে মিটিং করে কাজের অগ্রগতি শুনল। তারপর তাদেরকে বলল, আমি ঢাকায় গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। উনি আগামী মাসের পঁচিশ তারিখে হাসপাতাল উদ্বোধন করতে আসবেন। আজ দশ তারিখ, আমরা দেড় মাস সময় পাচ্ছি। এর মধ্যে হাসপাতালের কাজ কমপ্লিট করে ফেলতে হবে। আর আগামী সপ্তাহে একটা বড় ধরনের মিটিং ডাকুন। মিটিং এ যাতে আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে সেজন্য যে ব্যবস্থা করা দরকার করবেন। তারপর তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসে রুগীদের বিদায় করে স্কুলে রওয়ানা দিল। আজ বৃহস্পতিবার স্কুল ছুটি হওয়ার পর হোসেন মনিরাকে বলল, আজ পড়াব না, চল, তোমাদের বাড়িতে যাব।

মনিরা বলল, তাই চলুন স্যার। এই কয়েকদিন আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে বড় আপা প্রতিদিন আপনি ঢাকা থেকে ফিরেছেন কিনা জিজ্ঞেস করে। আব্বাও মাঝে মাঝে বলেন, তোর স্যারকে আসতে বলিস।

হোসেন কিছু না বলে তাকে নিয়ে হাঁটতে লাগল। কাঁচারী বাড়ির কাছে এসে হোসেন মনিরাকে বলল, তুমি যাও, আমি তোমার বড় আপার সঙ্গে দেখা করে তাকে নিয়ে আসছি।

পাঁচ ছয়দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও যখন আসমার চিঠি পেল না তখন রুকসানা ভাবল, হোসেন স্যার যদি ইকবাল হয়, তাহলে আসমার তো জানার কথা। আর দাইহান ইকবালের বাবার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। তারও জানার কথা, তাছাড়া পাশা-পাশি ঘর। নিশ্চয় ঘনিষ্ঠতা আছে। তবু কেন আসমা চিঠি দিয়ে জানাচ্ছে না? তাহলে কি এর মধ্যে কোনো রহস্য আছে।

আজ ঢাকা থেকে মাল কেনার জন্য ট্রাক নিয়ে এক পার্টি এসেছিল। মাল ডেলেভারী দিয়ে বিদায় করতে তিনটে বেজে গেল। রুকসানা অফিসেই যোহরের নামায পড়ে খাওয়ার পর চেয়ারে বসে এইসব ভাবছিল। এমন সময় পিয়ন আতাহার এসে বলল, কিছুদিন আগে যে একজন দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক এসেছিলেন, উনি এসেছেন।

রুকসানা চমকে উঠতে গিয়েও সামলে নিল। বলল, আসতে বল।

হোসেন পর্দা ঠেলে ঢুকে সালাম দিয়ে বলল, কেমন আছেন?

রুকসানা সালামের উত্তর দিয়ে বলল, ভালো। তারপর বসতে বলে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তখন তার হার্টবিট বেড়ে গেল।

হোসেন বসে মৃদু হেসে বলল, কী দেখছেন?

রুকসানা সামলে নিয়ে প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ব্যথা সারার ওষুধ দিয়ে। গিয়েছিলেন, এতদিন পরে সারল কিনা খোঁজ নিতে এসেছেন বুঝি?

ঠাট্টা করছেন?

যদি তাই মনে করেন, তাহলে তাই। কী দেখছিলেন, বললেন না যে?

হাদিসে আছে, “মানুষের মুখটা হল দীলের আয়না।” দীলে কি আছে মানুষের মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায়।

আমারটা কী বুঝলেন?

আপনি খুব শক্ত দীলের মানুষ, তাই বুঝতে পারিনি। যাক গে, ঢাকা থেকে ফিরলেন কবে?

গতকাল।

জরুরী ওষুধ কিনতে আটদিন সময় লাগে, তা আমার জানা ছিল না।

অন্য একটা জরুরী কাজে আটকা পড়েছিলাম।

কাজটা বলতে অসুবিধা আছে?

না নেই। বলছি শুনুন, আমি একটা হাসপাতাল করার চেষ্টা করছি। সে ব্যাপারে মিটিং-এ স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে নিয়ে আসার জন্য তার কাছে ছুটাছুটি করতে হয়েছে।

তাই নাকি? শুনে খুশি হলাম। তা স্বাস্থ্য মন্ত্রী আসবেন?

মিটিং-এ আসতে পারবেন না। তবে হাসাপাতাল উদ্বোধন করতে আসবেন। মিটিং-এ আসার জন্য আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনার আব্বাকেও জানাব।

ইনশাআল্লাহ আসব। এবার দু’একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?

করুন।

দাইহান ও আসমাকে চেনেন?

চিনি।

কতটা চেনেন?

দাইহান ফজল সেখের ছেলে, আর আসমা গেঁদু মুন্সীর মেয়ে। বর্তমানে তারা স্বামী-স্ত্রী। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। আরো কিছু বলা লাগবে?

ওদের সাথে আপনার ঘনিষ্ঠতা আছে?

গ্রামের সকলের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। তবে পাশা-পাশি বাড়ি হিসাবে ওদের সঙ্গে একটু বেশি আর কি। এবার আমি একটা কথা বলব, মাইণ্ড করবেন না বলুন?

না, বলুন কী বলবেন।

অনেকে রোদের কারণে সানগ্লাস পরে, আপনি রুমের ভিতর পরেন কেন?

রুকসানা কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে বলল, আমার চোখের অসুখ। তাই ডাক্তার সব সময় সানগ্লাস পরে থাকতে বলেছেন।

ডাক্তার হিসাবে আমি যদি আপনার চোখটা একটু পরীক্ষা করতে চাই, তাহলে কি অন্যায় হবে?

না হবে না, তবে আমি আপনাকে চোখ দেখাব না।

কেন?

সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

এবার নিশ্চয় পারবেন বলে রুকসানা যে চিঠিটা আসমাকে দিয়েছিল সেটা পকেট থেকে বার করে হোসেন টেবিলের উপর তার সামনে রাখল।

রুকসানা চিঠিটা দেখেই চমকে উঠে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। এক সময় সানগ্লাসের পাশ দিয়ে গাল বেয়ে চোখের পানি টপটপ করে পড়তে লাগল।

হোসেন তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। তারও চোখে পানি আসার উপক্রম হল। সামলে নিয়ে ভিজে গলায় বলল, আমাকে মনে রেখে এত কষ্ট সহ্য করা তোমার উচিত হয়নি। ছেলেবেলায় ছেলেমানুষি খেয়ালে যে অন্যায় করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি শাস্তি পেয়েছিলাম। তাই সেই সময় তোমাকে দায়ী ভেবে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যেমন করে হোক তোমাকে বিয়ে করে প্রতিশোধ নেব। বড় হওয়ার পর। আল্লাহ যখন মেহেরবানী করে ধর্মীয় জ্ঞান দিলেন তখন সেই প্রতিজ্ঞা মন থেকে দূর করে দিই। তবে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতাম, “তোমার উপযুক্ত হওয়ার তওফিক যেন তিনি আমাকে দেন এবং তোমাকে আমার জন্য কবুল করেন।” তাই এত বছর। কষ্ট করে সাধনা করে এতদূর পৌঁছেছি। তারপর গ্রামে এসে আত্মগোপন করে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। যখন আসমার কাছে জানতে পারলাম তুমি আমার জন্য অপেক্ষায় আছ তখন খুব আনন্দিত হলেও বিশ্বাস করিনি। কাল আসমা যখন এই চিঠি দিল তখন পড়ে আনন্দ পেয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানিয়েছি। সারারাত ঘুমাতে পারিনি। তাই আজ না এসে থাকতে পারলাম না। আল্লাহপাকই জানেন এর পর কি হবে। যেদিন পথে তোমাকে আঁড় তাড়া করেছিল, সেদিন তোমাকে দেখেই আমি চিনেছি। তুমি হয়তো চিনতে পারনি। আসমার মুখে তোমার সব কথা শোনার পর সত্য মিথ্যা যাচাই করার জন্য তোমার কাছে ছুটে আসতে মন চেয়েছিল, কিন্তু আসিনি। আসমা ও দাইহানকেও আমার কথা তোমাকে জানাতে নিষেধ করেছি। তাই আসমা তোমার চিঠির উত্তর দিতে পারেনি। যে বুকভরা আশা নিয়ে এসেছিলাম, তা আল্লাহর দয়ায় সত্য প্রমাণিত হল। কিন্তু সেই আশা সফল হওয়ার কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না। তুমি যদি পেয়ে থাক বল।

হোসেন স্যারের কথা শুনতে শুনতে রুকসানার চোখ থেকে আরো বেশি পানি পড়ছিল। সে থেমে যেতে প্রথমে মুখের নেকাব সরাল। তারপর সানগ্লাস খুলে চোখ মুখ মুছে ভিজে গলায় বলল, আল্লাহর কসম, তখন আমার সেক্স সম্পর্কে কোনো জ্ঞান হয়নি। তাই আম্মা যখন বুকে তেল মালিশ করে দিচ্ছিল তখন ব্যথা পেয়ে উহ করে উঠেছিলাম। মা ব্যথার কারণ জিজ্ঞেস করতে বলেছিলাম, তুমি বুকে হাত দিয়েছিলে। এই কথায় আম্মা যে আব্বাকে দিয়ে তোমাকে ঐরকম শাস্তি দেওয়াবে, তা যদি জানতাম, তাহলে কিছুতেই বলতাম না। তোমাকে যখন শাস্তি দেয় তখন আমি গাছের আড়াল থেকে দেখেছি। তখন মনে হয়েছে তোমার গায়ে যতগুলো চাবুক পড়েছে তার সবগুলো আমার গায়েও পড়েছে। সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে গাছতলায় পড়েছিলাম আব্বা কোলে করে ঘরে নিয়ে আসে। সেই থেকে তোমার স্মৃতি আজ ও আমার মনকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তারপর ফুঁপিয়ে উঠে দু’হাতে মুখ ঢেকে বলল, আমিও তো কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না।

হোসেন বলল, আমি জানি রুকসানা, তোমাদের বংশ মর্যাদা, তোমার বাবার মান সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে তুমি যেমন আমাকে গ্রহণ করতে পারবে না, একজন দারোয়ানের ছেলে হয়ে তোমাদের মান মর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে মালিক কন্যাকে গ্রহণ করতে আমিও পারব না। হয়তো ইহকালে আমাদের মিলন কুদিরে নেই। তাই বলব, এত বছর যখন আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করে আছি, আর কিছুদিন তারই উপর ভরসা করে ধৈর্য ধরে থাকি এস। তকদিরে মিলন থাকলে তিনিই কোনো না কোনো পথ দেখিয়ে দিবেন। আর না থাকলে সবর করে এভাবেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে হবে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, এত ভেঙ্গে পড়ছ কেন? জানত, ধৈর্যই সাফল্যের চাবি? এবার সংযত হও, তোমাকে নিয়ে তোমার আব্বার সঙ্গে দেখা করতে যাব।

রুকসানা সামলে নিয়ে চোখ মুখ মুছে চোখে চশমা পরে বলল, আর একটু বস চা খেয়ে যাব।

প্রতিদিন অফিস ছুটির কিছুক্ষণ আগে রাবেয়া ও কায়সার কারখানার কাজ কর্ম সম্পর্কে রুকসানার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা করে। আজ রুমে ঢুকে অচেনা একজন ভদ্রলোককে দেখে দুজনেই সালাম দিল।

হোসেন সালামের উত্তর দিল।

রুকসানা তাদেরকে বসতে বলে বলল, পরিচয় করিয়ে দিই। হোসেনকে দেখিয়ে বলল, ইনি হোসেন স্যার ফুকরা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ইংলিশের টিচার। শুধু তাই নয়, একজন ভালো হোমিও ডাক্তারও।

তারপর ওদের দুজনকে দেখিয়ে হোসেনকে বলল, এরা হল একে অপরের জীবনসাথী রাবেয়া ও কায়সার। আমরা তিনজনই এই কারখানার মালিক। তারপর মেয়ে পিয়ন আসিয়াকে ডেকে চা দিতে বলল।

চা খাওয়ার সময় কায়সার হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ভাল টিচার ও ডাক্তার হিসাবে আপনার অনেক সুনাম শুনেছি। আজ পরিচিত হয়ে খুশি হলাম। তারপর বলল, শুনলাম আপনি নাকি একটা হাসপাতাল করার জন্য চেষ্টা করছেন?

হোসেন বলল, হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। তবে এতবড় কাজ আমার একার দ্বারা কি সম্ভব? তাই আশ-পাশের গ্রামের মানুষের কাছে সাহায্য সহযোগিতার আশা নিয়ে এই কাজে হাত দিয়েছি।

রুকসানা ওদের দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল, সেই জন্য উনি আব্বার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। আজ আর আমাদের আলাপ আলোচনা হবে না। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ছুটির সময় পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেছে। তোরা যা, আমি ওঁকে নিয়ে যাব।

রাবেয়া ও কায়সার বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার পর রুকসানা হোসেনকে বলল, চল আমরাও যাই।

যেতে যেতে রাবেয়া বলল, জান, কিছুদিন আগে ঐ ভদ্রলোক রুকসানাকে ষাড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছিলেন।

কায়সার বলল, তাই নাকি? ঘটনাটা বলত?

রাবেয়া ঘটনাটা বলে বলল, রুকসানার কথাবার্তায় মনে হল, ভদ্রলোকের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।

কায়সার বলল, কই আমিতো তেমন কিছু আভাস পেলাম না।

তুমি না পেলেও আমি পেয়েছি।

দেখা যাক সময় কি বলে।

<

Super User