রিক্রিয়েশন রুম থেকে তিন দেবতার সম্মিলিত চিৎকার ভেসে আসছে। সেলুনে সব মিলিয়ে মাত্র ছজন লোককে দেখতে পেল ওরা। ছজনের মধ্যে তিনজন। দাঁড়িয়ে আছে, বসে আছে একজন, একজনকে দেখা গেল ডেকে হাঁটু গাড়া অবস্থায়, অপরজন শুয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে হেনেরিক ব্রায়ান, এডি আর জক মুর-সবার চেহারায় উদ্বেগ, তবে ইতস্তত ও অসহায় একটা ভাবও আছে। ক্যাপটেনের টেবিলে একটা চেয়ারে বসে রয়েছে মিখায়েল ট্যাকার, রক্তের দাগ লাগা একটা রুমাল দিয়ে ডান গালের ক্ষত মুছছে। তার রুমাল ধরা হাতের গিটগুলোর চামড়া ছড়ে গেছে। ডেকে হাঁটু গেড়ে রয়েছে পামেলা। রানা তার পিঠটাই শুধু দেখতে পাচ্ছে, লম্বা চুল কোমর ছাড়িয়ে লুটিয়ে পড়েছে ডেকের ওপর, আর তার শিঙের তৈরি চশমাটা পড়ে রয়েছে দুফুট দূরে। পামেলা কাঁদছে, তবে নিঃশব্দে, মাঝে মধ্যে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার সুগঠিত কাঁধ জোড়া। তাকে ধরে সিধে করল রানা, এখনও ডেকে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে সে। চোখ ভরা পানি, রানার দিকে তাকাল মেয়েটা, চোখে চশমা না থাকায় চিনতে পারছে না ওকে।
সব ঠিক হয়ে যাবে, পামেলা, বলল রানা। আমি, আপনাদের ডাক্তার। ডেকে পড়ে থাকা মূর্তিটার দিকে তাকাল ও। তরুণ হুপারকে চিনতে অসুবিধে হলো না। লক্ষ্মী মেয়ে, শান্ত হোন এবার, ওকে একটু পরীক্ষা করি।
ওর আঘাত খুব মারক, মি. রানা, সাংঘাতিক আহত হয়েছে ও! ফুঁপিয়ে। উঠে বলল পামেলা। দেখুন না, এমন মার মেরেছে…এমন মার মেরেছে, আবার কেঁদে ফেলল সে।
মি. ব্রায়ান, মুখ তুলে তাকিয়ে বলল রানা, গ্যালিতে গিয়ে মি. মরিসনের কাছ থেকে খানিকটা ব্র্যাণ্ডি চেয়ে আনবেন? বলবেন আমি পাঠিয়েছি। মাথা ঝাঁকিয়ে সেলুন থেকে বেরিয়ে গেল ব্রায়ান। ক্যাপটেনের দিকে ফিরল রানা। দুঃখিত, আপনার অনুমতি চাওয়া উচিত ছিল।
ও কিছু না, ডক্টর রানা, বললেন ক্যাপটেন, তাকিয়ে আছেন মিখায়েল ট্যাকারের দিকে।
পামেলাকে রানা বলল, উঠুন, ওই সেটীতে গিয়ে বসুন। ব্র্যাণ্ডি এলে দুঢোক খাবেন, কেমন?
না…না
ডাক্তারের নির্দেশ, বলে এডি আর জক মুরের দিকে তাকাল রানা। কথা না বলে পামেলাকে নিয়ে সেটীর দিকে এগোল তারা।
এরপর হুপারকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল রানা। এখন একটু একটু নড়ছে সে। ট্যাকার তাকে ভালই মেরেছে-কপালটা কেটে গেছে, ফুলে উঠেছে একটা চোখ, একটা দাঁত নেই, নাকের দুই ফুটো থেকেই রক্ত বেরিয়ে আসছে, থেঁতলানো ঠোঁট থেকেও রক্ত গড়াচ্ছে। ট্যাকারের দিকে তাকাল ও। আপনার কীর্তি, মি. ট্যাকার?
বুঝতেই তো পারছেন, তারপরও জিজ্ঞেস করছেন কেন?
জিজ্ঞেস করছি এই জন্যে যে আপনার তুলনায় হুপারকে একদম বাচ্চাই বলা যায়। মারামারি করার জন্যে নিজের সমান কাউকে খুঁজে পেলেন না?
অর্থাৎ আপনার মত কাউকে?
মাই গড! বিড়বিড় করল রানা। ট্যাকারের সভ্য-ভব্য চেহারার আড়ালে। অত্যন্ত কর্কশ ও হিংস্র কি যেন একটা আছে। তাকে অগ্রাহ্য করে জক মুরকে গরম পানি আনতে বলল ও, যতটা সম্ভব পরিষ্কার করল হুপারের ক্ষতগুলো। তারপর কপালে প্লাস্টার লাগাল, নাকে তুলো গুঁজে দিল, সেলাই করল ঠোঁট। ও সিধে হলো, এই সময় ট্যাকারকে প্রশ্ন করলেন ক্যাপটেন।
কি ঘটেছিল, মি. ট্যাকার?
ঝগড়া।
ঝগড়া? কি থেকে ঝগড়া হলো? গলা শুনে মনে হলো ক্যাপটেন ডানহিল বিদ্রূপ করছেন।
অপমান থেকে। ও আমাকে অপমান করে।
ও? আপনাকে? ও তো একটা বাচ্চা ছেলে, মি. ট্যাকার! ক্যাপটেন আর রানার অনুভূতি একই রকম। একটা বাচ্চা ছেলে কি এমন বলল যে অপমান বোধ করলেন আপনি?
ব্যক্তিগত বিষয়ে অপমানকর কথা বলেছে। গালের ক্ষতে রুমাল চাপল ট্যাকার। কেউ আমাকে অপমান করলে তাকে আমি ছাড়ি না।
এই জাহাজের ক্যাপটেন হিসেবে আমি…
আমি আপনার ক্রু নই, ক্যাপটেন, কর্কশ গলায় বলল টাকার। ওই বোকা ছোকরা যদি কোন অভিযোগ না করে–আমি জানি করবে না-আপনি নিজের চরকায় তেল দিতে পারেন। দাঁড়াল সে, সেলুন ছেড়ে চলে গেল। ক্যাপটেন ডানহিলকে দেখে মনে হলো অনুসরণ করবেন তিনি, তারপর সিদ্ধান্ত পাল্টে নিজের টেবিলের মাথায় বসলেন, হাত বাড়ালেন নিজের বোতলের দিকে। ইতিমধ্যে পামেলাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে তিনজন, তাদের দিকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, কি ঘটেছে আপনারা কেউ দেখেছেন?
না, স্যার, জবাব দিল ব্রায়ান। ওখানে, জানালার সামনে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন মি. ট্যাকার, এই সময় মি. হুপার তার সঙ্গে কথা বলার জন্যে এগিয়ে যান। কি কথা, বলতে পারব না। পরমুহূর্তে দেখি দুজনই মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। কয়েক সেকেণ্ড পরই অবশ্য থেমে যায় ব্যাপারটা।
সতর্ক ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন ক্যাপটেন, তারপর নিজের গ্লাসে হুইস্কি ঢাললেন। তার মধ্যে সেলুন ছেড়ে বেরুবার কোন লক্ষণ না দেখে রানা ধরে নিল, অ্যাংকারিজ-এ পৌঁছুনোর জন্যে ওয়েনের ওপর নির্ভর করছেন তিনি। হুপারকে দাঁড় করাল ও, দরজার দিকে হটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ক্যাপটেন বললেন, আপনি কি ওঁকে নিচে নিয়ে যাচ্ছেন, মি. রানা?
মাথা ঝাঁকাল রানা। ফিরে এসে বলব আপনাকে, কিভাবে ব্যাপারটা শুরু করেছিলাম। এমনভাবে মুখ কোচকালেন ক্যাপটেন, দেখে মনে হতে পারে। ভেঙুচালেন, তারপর গ্লাস তুলে আড়াল করলেন মুখটা। দরজার দিকে এগোবার সময় রানা লক্ষ করল, সেটীতে বসে ব্র্যাণ্ডির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে পামেলা, প্রতিবার চুমুক দেয়ার সময় শিউরে উঠছে সে। তার চশমাটা রয়েছে জক মুরের হাতে, তিনি সেটা পামেলাকে ফিরিয়ে দেয়ার আগেই হুপারকে নিয়ে সেলুন থেকে বেরিয়ে এল রানা।
হুপারকে তার বাঙ্কে শুইয়ে, গায়ে একটা কম্বল চাপিয়ে দিল ও। খানিকটা রঙ ফিরে এসেছে তার চেহারায়, তবে এখনও কোন কথা বলেনি। রানা জিজ্ঞেস করল, ব্যাপারটা আসলে কি নিয়ে ঘটল?
ইতস্তত করল হুপার। দুঃখিত, মি. রানা। আমার বরং মুখ না খোলাই ভাল।
কেন?
সত্যি দুঃখিত। খানিকটা ব্যক্তিগত ব্যাপারই বলতে পারেন।
কারও কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে?
হ্যাঁ, আমি…, চুপ করে গেল হুপার।
ঠিক আছে, থাক। মেয়েটাকে সত্যি আপনি ভালবাসেন। রানার দিকে নিঃশব্দে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল হুপার, তারপর সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল। আপনি চান, তাকে আমি এখানে পাঠিয়ে দিই?
নো, ডক্টর, নো! আমি চাই না…মানে, এই চেহারা নিয়ে… না, আমি তাকে মুখ দেখাতে পারব না!
মাত্র পাঁচ মিনিট আগে আপনার চেহারা আরও খারাপ ছিল। তখনও আপনার জন্যে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছিল মেয়েটা।
তাই কি? হাসতে গিয়ে ব্যথা পেল হুপার, বিকৃত করল চেহারা। তাহলে…ঠিক আছে।
এরপর ট্যাকারের কেবিনের সামনে চলে এল রানা। নক করায় সাড়া দিল ট্যাকার, তবে রানাকে দেখে খুশি হয়েছে বলে মনে হলো না। তার ক্ষতটার দিকে তাকাল ও, জিজ্ঞেস করল, আপনি চান, ওটা আমি পরিষ্কার করে দিই?
কেবিনের একমাত্র চেয়ারটায় ট্রাউজার আর ফার পারকা পরে বসে রয়েছে। মোনাকা, দেখতে লাগছে লালচুলো এস্কিমোদের মত। কুকুর দুটো কোলের ওপর আদর খাচ্ছে। রানাকে দেখে মহিলার চোখ-ধাঁধানো হাসি পলকের জন্যে ম্লান হলো।
না।
এমনি ফেলে রাখলে দাগটা থেকে যেতে পারে, বলল রানা। থাক বা না থাক, ওর কিছু আসে যায় না।
সর্বনাশ! আঁতকে উঠল ট্যাকার।
কেবিনের ভেতর ঢুকল রানা, বন্ধ করল দরজা, ক্ষতটা পরীক্ষা করল, ধুয়ে এক টুকরো প্লাস্টার লাগিয়ে দিয়ে বলল, শুনুন, মি. ট্যাকার, আমি ক্যাপটেন ডানহিল নই। ছেলেটাকে কি ওভাবে আঘাত করা উচিত হয়েছে আপনার? মৃদু একটা টোকা দিলেই তো পারতেন, মেঝে থেকে উঠতে পারত না।
ক্যাপটেন ডানহিলকে কি বলেছি আপনি তা শুনেছেন-এটা একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার, রুক্ষসুরে বলল ট্যাকার। রানা ভাবল, ওর সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টে কোন কাজ হয়নি-স্বেচ্ছায় চিকিৎসা সেবা দান বা যুক্তির পথে আসার সকৌতুক আমন্ত্রণ প্রভাবিত করতে পারেনি তাকে। আপনি ডাক্তার বলে অন্যায় কৌতূহল দেখাতে পারেন না। আপনার মনে আছে, আর কি বলেছি আমি। ক্যাপটেনকে?
তিনি যেন নিজের চরকায় তেল দেন।
ঠিক তাই।
আমার ধারণা, হুপারও সম্ভবত তাই বলবেন।
ছোকরাকে উচিত শাস্তি দেয়া হয়েছে, এবার কথা বলল মোনাকা, তার গলাও ট্যাকারের মত কর্কশ। তার কথা দুটো কারণে মজার বলে মনে হলো রানার। শোনা যায় সে তার স্বামীকে ঘৃণা করে, কিন্তু এখানে তার কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না-কাজেই সত্যি ঘৃণা করে কিনা ভাল করে খোঁজ নিয়ে দেখা দরকার। আরেকটা ব্যাপার হলো, সে তার স্বামীর মত জিভ আর ভাবাবেগকে সামলে রাখতে জানে না।
আপনি কিভাবে তা জানলেন, মিস মোনাকা? আপনি তো ওখানে ছিলেন।
থাকার দরকার কি। আমি…।
ডার্লিং! অকস্মাৎ বাধা দিল ট্যাকার, সতর্ক হবার জরুরী তাগাদা তার সুরে।
স্ত্রীকে কথা বলতে দিতে ভয় পান নাকি? জিজ্ঞেস করল রানা। শুনে শক্ত মুঠো হয়ে গেল ট্যাকারের হাত। গ্রাহ্য না করে মোনাকার দিকে তাকাল রানা। আপনি জানেন, হুপারের কি অবস্থা করেছেন আপনার বীরপুরুষ স্বামী? জানেন, ওখানে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বাচ্চা একটা মেয়ে? এ-সব আপনাকে স্পর্শ করে না?
আপনি কি ডাইনী কনটিনিউইটি মেয়েটার কথা বলছেন? হিস হিস করে উঠল মোনাকা। আমি বলব, তারও উচিত শাস্তি হচ্ছে।
ডার্লিং! অস্থির হয়ে উঠল ট্যাকার।
চোখে অবিশ্বাস, মোনাকার দিকে তাকিয়ে থাকল রানা। তবে সে যা বলেছে। তা যে তার অন্তরের কথা, বুঝতে অসুবিধে হলো না। না, শুধু রাগের মাথায় বলেনি। ঘৃণায় ও আক্রোশে চোখ দুটো জ্বলছে তার। ওই ভালমানুষ লক্ষ্মী মেয়েটা? তাকে আপনি ডাইনী বলবেন?
শুধু ডাইনী? খানকি, বেশ্যা, ছেনাল, নর্দমার কীট, স-ব বলব!
স্টপ ইট! চাবুকের মত সপাং করে উঠল ট্যাকারের গর্জন। তার চেহারা দেখে মনে হলো, বাধ্য হয়ে বেপরোয়া হতে হচ্ছে তাকে, স্ত্রীর সঙ্গে এই সুরে কথা না বলে উপায় দেখছে না।
ইয়েস, স্টপ ইট, বলল রানা। জানি না কি ছাইপাশ প্রলাপ বকছেন আপনি, মিস মোনাকা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনিও তা জানেন না। আমি শুধু জানি, আপনি অসুস্থ একটা মেয়েমানুষ।
ফেরার জন্যে ঘুরল রানা। ওর পথ আটকাল ট্যাকার। তার মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে এভাবে কেউ কথা বলে না, বলল সে, বলার সময় খুব সামান্যই নড়ল তার ঠোঁট।
হঠাৎ ট্যাকারকে একঘেয়ে লাগল রানার। আমি আপনার স্ত্রীকে অপমান করেছি?
এমন অপমান করেছেন যার কোন ক্ষমা নেই।
আর তাতে আপনি নিজেও অপমানবোধ করেছেন?
এতক্ষণে ব্যাপারটা আপনি বুঝতে শুরু করেছেন।
এবং কেউ আপনাকে অপমান করলে তাকে আপনি ছাড়েন না। ক্যাপটেন ডানহিলকে এই কথাই বলেছেন আপনি।
এই কথাই বলেছি।
আই সী।
আই থট ইউ মাইট। ট্যাকার এখনও রানার পথ আগলে রেখেছে।
আর যদি আমি ক্ষমা চাই?
ক্ষমা চাইবেন? ঠাণ্ডা হাসি ফুটল ট্যাকারের মুখে। আগে দেখা যাক ক্ষমার ধরনটা কি।
মোনাকার দিকে ফিরল রানা। বলল, জানি না কি ছাইপাঁশ প্রলাপ বকছেন আপনি, মিস মোনাকা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনিও তা জানেন না। আমি শুধু জানি, আপনি অসুস্থ একটা মেয়েমানুষ।
চেহারার পরিবর্তন দেখে মনে হলো, অদৃশ্য দুটো থাবা তার মুখের দুই পাশেই অনেক গভীরে সেঁধিয়ে গেল, কপাল থেকে চিবুক পর্যন্ত, তারপর হাড়ের ওপর টান টান হলো চামড়া। ট্যাকারের দিকে ফিরল রানা, তার মুখের চামড়া মোটেও টান টান নয়। সুন্দর একটা চেহারা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এমন কুৎসিত হয়ে উঠতে পারে, ওর কোন ধারণা ছিল না। মুখে কোন রঙ নেই, যেন একটা মড়া। চোয়াল ঝুলে পড়েছে। তাকে ধাক্কা দিয়ে এগোল রানা, দরজা খুলে ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে তাকিয়ে বলল, ইউ পুওর বাস্টার্ড। চিন্তা করবেন না। ডাক্তাররা কখনও কাউকে কিছু বলে না।
আপার ডেকের পরিষ্কার হিম ঠাণ্ডা বাতাসে বেরিয়ে আসতে পেরে খুশি হলো রানা। অসুস্থ, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা একটা পরিবেশ পিছনে ফেলে এসেছে ও; অসুস্থতা কি বা কোথায় তা জানার জন্যে কারও ডাক্তার হবার দরকার নেই।
ইতিমধ্যে তুষারপাত কমেছে। পোর্ট সাইডে দাঁড়িয়ে দূরে তাকাল রানা। বেয়ার আইল্যাণ্ডের একটা পাহাড়কে আধ মাইল পিছনে ফেলে এসেছে ইভনিং স্টার, পোর্ট বোর দিকে সমান দূরত্বে অপর একটা পাহাড় দেখা যাচ্ছে। কাপ কলথপ আর কাপ মালমাগ্ৰেম, চার্ট দেখে নাম দুটো জেনেছে ও। ধারণা করল, আরও মাইল তিনেক এগোতে হবে ওদেরকে।
ব্রিজের দিকে তাকাল রানা। আবহাওয়ার অবস্থা নিশ্চয়ই আগের চেয়ে ভাল, তা না হলে ধরে নিতে হবে গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পড়ায় আরোহীদের মধ্যে আগ্রহ আর কৌতূহল মাথাচাড়া দিয়েছে-ব্রিজের দুই উইং-এই ছোটখাট ভিড দেখা যাচ্ছে, তবে হুডগুলো দিয়ে মুখ প্রায় ঢাকা থাকায় চেনা যাচ্ছে না কাউকেই। হঠাৎ ওর কাছাকাছি একজনের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল রানা। ব্রিজের সামনের সুপারস্ট্রাকচারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। লম্বা চুল উড়ছে বাতাসে, পামেলাকে চিনতে পারল ও। তার দিকে এগোল, ডাক্তারের পাওয়া সুবিধে কাজে লাগিয়ে এক হাতে জড়িয়ে ধরল তাকে, অপর হাতে ধরে উঁচু করল মুখটা। পামেলার চোখ লাল হয়ে আছে, নাকের দুপাশ চোখের পানিতে এখনও ভেজা ভেজা। চমশাটা নাকে বাঁকা হয়ে রয়েছে। ডাইনী… ইত্যাদি?
পামেলা, বলল রানা। এখানে আপনি কি করছেন? এই ঠাণ্ডায় তো স্রেফ মারা পড়বেন। নিচে বা ভেতরে থাকা উচিত ছিল আপনার।
আমি একা হতে চেয়েছিলাম। মেয়েটার গলায় এখনও কান্নার সুর রয়ে গেছে। কিন্তু মি. মুর বারবার শুধু ব্র্যাণ্ডি সাধছিলেন। আর… মানে… শিউরে উঠল সে।
তারমানে মি. মুরকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছেন আপনি। তাহলে ভালই করেছেন…
ডক্টর রানা! হঠাই খেয়াল করল পামেলা রানা তাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করল সে, তবে জোর নেই তেমন। লোকজন আমাদের দেখে ফেলবে!
আমি গ্রাহ্য করি না, বলল রানা। আমি চাই আমাদের ভালবাসার কথা দুনিয়ার সবাই জানুক।
আপনি চান দুনিয়ার সবাই…, পামেলার চোখে গভীর মনোযোগ, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল রানার দিকে। কাঁচের পিছনে তার বিশাল চোখ দুটো আরও বড় হয়ে উঠল, তারপর সেই চোখের তারায় ফুটতে শুরু করল হাসির আভাস। ওহ, মি. রানা!
তরুণ এক ভদ্রলোক নিচে এখুনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন, বলল রানা।
ওহ্! হাসিটা অদৃশ্য হলো পামেলার চোখ থেকে। সে কি…আমি বলতে চাইছি, তাকে তো হাসপাতালে যেতে হবে, তাই না?
বিকেলের মধ্যে তাকে আমরা হাঁটাচলা করতে দেখতে পাব।
সত্যি? সত্যি এবং সত্যি? ব্যাকুল আগ্রহে রানাকে ধরে ঝাঁকাল পামেলা।
আপনি যদি আমার পেশাগত যোগ্যতায় সন্দেহ পোষণ করেন…
ওহ, ডক্টর রানা! তাহলে কি জন্যে, কেন…?
আমার ধারণা, তিনি আপনার হাত ধরতে চান। নিজেকে আমি তিনি ধরে নিয়ে বলছি আর কি।
ওহ্, ডক্টর রানা! তারমানে কি…বলতে চাইছি, তার কেবিনে গেলে…?
ওখানে কি আপনাকে আমার টেনে নিয়ে যেতে হবে?
না। হাসল পামেলা। আমার মনে হয় না তার কোন প্রয়োজন আছে। ইতস্তত করল সে। ডক্টর রানা?
ইয়েস?
আপনি খুব সুন্দর মানুষ। সত্যি তাই।
এবার ভাগুন।
আবার হাসল পামেলা, এবারের হাসিতে প্রায় সুখী দেখাল তাকে, তারপর ভাগল। একটা ব্যাপারে মনে মনে খুশি হলো রানা। ওর ভয় ছিল পামেলার মনে আঘাত দিয়ে ফেলে, কিন্তু তা দিতে হয়নি। ট্যাকারের কেবিন থেকে বেরুবার সময় যে প্রশ্নগুলো জেগেছিল ওর মনে সেগুলো জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনই হয়নি। মোনাকা যে অভিযোগগুলো করল সে-সবে মোনাকার ছবিই ফোটে, পামেলার নয়। পামেলার বিরুদ্ধে মোনাকার অভিযোগ সত্যি হলে চলচ্চিত্র জগতে আজও সামান্য কনটিনিউইটি গার্ল হিসেবে পরিচিত হত না পামেলা, বর্তমান যুগের অন্যতম ধনী ও তারকা শিল্পীদের একজন হত সে।
যেখানে ছিল সেখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল রানা। এইমাত্র কয়েকজন ক্রু এসেছে ফোরডেকে, ডেক কার্গোয় জড়িয়ে থাকা বাধনগুলো এখন আর প্রয়োজন নেই বলে খুলে নিচ্ছে, গুটিয়ে নিচ্ছে তারপুলিন। আরও দুদল ক্রু ডেরিক ও উইঞ্চ পরীক্ষা করছে। বোঝা গেল, গন্তব্যে পৌঁছুনোর পর সময় নষ্ট করার কোন ইচ্ছে ক্যাপটেন ডানহিলের নেই।
সেলুনে চলে এল রানা। জক মুর ছাড়া কাউকে দেখল না। তিনি একা, তবে ঠিক নিঃসঙ্গ নন, তাকে সঙ্গ দিচ্ছে হুইস্কির একটা বোতল। তার পাশে রানা বসতে হাতের গ্লাসটা নিচু করলেন। ব্যস্ততার নাম ডক্টর রানা, মৃদু হেসে বললেন তিনি। টোকা দিলেন বোতলে। চলবে নাকি?
বোতলটা প্যানট্রির, মি. মুর।
প্রকৃতির ফুল ও ফলে সমস্ত মানবজাতির অধিকার আছে। দেব নাকি সামান্য?
শুধু এই জন্যে দিন, তা না হলে আপনি সবটুকু খেয়ে ফেলবেন। আমার একটা ভুল হয়েছে, সেটা সংশোধন করা দরকার, মি. মুর। আমাদের মূল নারী চরিত্র অর্থাৎ নায়িকা সম্পর্কে। এখন আমার মনে হচ্ছে, দয়া-ধর্মের এমনিতেই আকাল, এই অবস্থায় তার জন্যে ও-সব বরাদ্দ করা মানে স্রেফ অপচয়।
অনুর্বর ভূমি, বলতে চান? পাথুরে জমি?
বলতে চাই।
তারমানে আমাদের সুন্দরী মোনাকার কোন উদ্ধার নেই?
তা আমি বলতে পারব না। শুধু বলতে পারব, তাকে উদ্ধার করা আমার। সাধ্যের বাইরে।
আমেন। আরও খানিকটা হুইস্কি খেলেন মুর।
বাকি দুজন সম্পর্কে আপনার কি ধারণা? জিজ্ঞেস করল রানা।
বাকি দুজন-এলিনা আর পামেলা? পামেলা তো লক্ষ্মী মেয়ে। এমনকি আমার এই বয়েসেও ওদেরকে আমি ভালবাসি। ভাল মেয়ে বলেই তো উন্নতি করতে পারছে না। এলিনাও খুব ভাল মেয়ে। ওদের দুজনকেই আমি ভালবাসি।
ওদের পক্ষে খারাপ কিছু করা সম্ভব নয়?
অসম্ভব!
বলা সহজ। কিন্তু যদি অ্যালকোহলের প্রভাব থাকে?
কি? জক মুরকে হতচকিত দেখাল। কি বলছেন আপনি! অচিন্তনীয় ব্যাপার, মি. রানা, অচিন্তনীয় ব্যাপার।
ধরুন যদি দুগ্লাস করে জিন খায়?
এ কি ধরনের প্রলাপ বকছেন আপনি!
ওরা যদি আপনার কাছে দুএক ঢোক মদ চায় আপনি কি সেটাকে ক্ষতিকর ভাববেন?
কেন ভাবব! চেহারা দেখে মনে হলো জক মুরের বিস্ময় নির্ভেজাল।
তাহলে অনেক দিন আগের একটা ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিই আপনাকে, বলল রানা। সেদিন একটানা অনেকক্ষণ কাজ হয়েছে সেটে, সবাই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, শুনেছি এই সময় মাত্র এক ঢোক মদ খেতে চাওয়ায় এলিনার ওপর সাংঘাতিক খেপে যান আপনি।
অদ্ভুত এক মন্থরগতিতে বোতল আর গ্লাস টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে টলতে টলতে চেয়ার ছাড়লেন জক মুর। তাঁকে ক্লান্ত, অথর্ব আর অসহায় দেখাচ্ছে। আপনি এখানে ঢোকার পর থেকে…এখন আমি বুঝতে পারছি। প্রায় বিষণ্ণ সুরে ফিসফিস করছেন, আপনি এখানে ঢোকার পর থেকে এই প্রশ্নটাই করতে চাইছিলেন।
মাথা নাড়লেন মুর, চোখ ফিরিয়ে রানার দিকে তাকাচ্ছেন না। আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার বন্ধু, শান্ত সুরে আবার বললেন, তারপর এলোমেলো পা ফেলে বেরিয়ে গেলেন সেলুন থেকে।
<